মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের পথে! -মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র বহুদিনের। একটি পক্ষ শুধু অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। দেশের চলতি কাল সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মোক্ষম সময়। মাদরাসা শিক্ষাকে জাতির জন্য বিষফোঁড়া হিসেবে উপস্থাপন করে এর বিরুদ্ধে বিষোদগার ছড়িয়ে ইসলামপ্রিয় জনসাধারণকে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিমুখ করে ইসলামী জ্ঞান থেকে দূরে রাখার দুরভিসন্ধি প্রতিনিয়ত তীব্রতর হচ্ছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বহুমুখী অপপ্রচার ও সরকারের নেপথ্যে থাকা ইসলামবিদ্বেষী ব্যক্তিবর্গের এই শিক্ষাব্যবস্থার শিকড় উপড়ে ফেলার আয়োজন লক্ষণীয়। যে কারণে এই শিক্ষাব্যবস্থার অবকাঠামো প্রতিনিয়ত ধ্বংসের অতল গহবরে ধাবমান। মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপ্তি ইসলামবিদ্বেষীদের জন্য ভয়ঙ্কর হৃদকম্পন। এমন সেক্যুলার দৃষ্টিভঙ্গির ভয়াল থাবা থেকে এই দ্বীনি শিক্ষাব্যবস্থাকে রক্ষার জন্য আলেম-ওলামা ও ইসলামী সংগঠনসমূহের উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও দৃশ্যমান নয়। এ যাবৎকাল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সরকারের ইসলামবিদ্বেষী নীতির ব্যাপারে তেমন কিছু অনুমান করতে না পারলেও সাম্প্রতিক ইসলাম, আল্লাহ, রাসূল ও মাদরাসা-মসজিদ নিয়ে ন্যক্কারজনক প্রকাশ্য ভূমিকার কারণে সরকারের ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান সবার কাছে স্পষ্ট। মূলত সম্প্রতি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের জাতীয় স্কেলে বেতনের দাবিতে টানা ধর্মঘট নিয়ে নিবন্ধন লেখার ইচ্ছা থাকলেও কলম ধরতে গিয়ে মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে সরকারে গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়ে পাঠকদের নিকট উপস্থাপন করাই যুক্তিযুক্ত মনে করছি, যদিওবা এই ছোট নিবন্ধনে তা লিখে শেষ করা অসম্ভব।

মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে কী ষড়যন্ত্র হয়েছিল?
সরকারি দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতা-নেত্রী, ইসলামবিদ্বেষী আমলা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্য, লেখনীতে স্পষ্ট যে এরা বহু আগে থেকে এর বিরুদ্ধে আদা জল খেয়ে নেমেছে। তাই এর বিরুদ্ধে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অপপ্রচার, মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিষোদগার (মিডিয়ায়) করা নিত্যদিনের কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষাকে একটি অ-আধুনিক ও অচল শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করা, জঙ্গি প্রজননকেন্দ্র হিসেবে নানা ছুঁতোয় উপস্থাপন করা, ইসলামকে বিকৃতভাবে পাঠ্যবইয়ে উপস্থাপন, উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ করা, মাদরাসা শিক্ষার্থীদেরকে সরকারি উচ্চপদস্থ পদে নিয়োগ না দেয়া, নিবন্ধিত মাদরাসার নিবন্ধন বাতিল করা এবং নতুন মাদরাসাকে নিবন্ধন না দেয়া মাদরাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রের উল্লেখযোগ্য দিক।

যেভাবে ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন হচ্ছে
দেশে দুই ধরনের মাদরাসা শিক্ষা প্রচলিত আছে। আলিয়া ও কওমি ধারা। আলিয়া ধারায় সাধারণত বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সিলেবাসের মাধ্যমে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, সরকারি অনুদানে এসব মাদরাসার শিক্ষকদের কিয়দংশ বেতন প্রদান করা হয়, অবশিষ্টাংশ মাদরাসা তহবিল থেকে পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সুদীর্ঘকাল ইবতেদায়ি থেকে কামিল পর্যন্ত পরিচালিত হলেও ফাজিল ও কামিল শ্রেণী Islamic University (Amendment) Act, 2006 মোতাবেক সাধারণ শিক্ষার সাথে আলিয়া শিক্ষার সমন্বয় করার কারণে ফাজিল (ডিগ্রি) ৩ বছরের ১০৮৬টি এবং কামিল (স্নাতকোত্তর) ২ বছরের ১৯৮টি মাদরাসার পরিচালনার ভার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুষ্টিয়া) ওপর বর্তায়। সীমাহীন দুর্নীতি ও পাঠকার্যক্রমের অস্বাভাবিক স্থবিরতার অভিযোগের কারণে ২০১৪ সাল থেকে ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যায়ের কার্যক্রম শুরু হয়। এর নেপথ্যে ষড়যন্ত্র কী এখনো তা আঁচ করতে না পারলেও মাদরাসা শিক্ষার অগ্রগতি যে আর ত্বরান্বিত হচ্ছে না এটা সহজে অনুমেয়।
আলিয়া ধারায় পরিচালিত মাদরাসাসমূহের বেশির ভাগ অবকাঠামোগত উন্নয়ন অনেকটা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আর্থিক কোরবানির মাধ্যমে হয়ে থাকে। অপর দিকে কওমি শিক্ষা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সম্পূর্ণটাই মুক্ত হস্তে দানের ওপর নির্ভরশীল। এভাবেই সারাদেশে অসংখ্য মাদরাসা গড়ে উঠেছে। কওমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড (বেফাক) এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। সরকার নানাভাবে এই শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রিত করার চেষ্টা করছে। তাই ইতোমধ্যে কওমি মাদরাসাসমূহ পরিচালনার জন্য সরকার নীতিমালা ঠিক করছে।
শত চড়াই-উতরাই মাড়িয়ে এদেশে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা এখনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে প্রাণাধিক প্রিয়। মুসলমানদের দৃঢ়বিশ^াস যে কেবলমাত্র মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাই দেশ ও পরিবারের জন্য একজন ভালোমানুষ ও ভালো মুসলমান উপহার দিতে পারে। মূলত এমতাবস্থায় জনগণের বিশ্বাসকে সমূলে মূলোৎপাটন করতেই ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের সর্বস্বান্ত করতে আত্মনিয়োগ করেছে। ষড়যন্ত্রের কিছু নমুনা নিম্নরূপ :

এক. মাদরাসা শিক্ষাবিরোধী ষড়যন্ত্রের একটি চলমান দিক হচ্ছে এই শিক্ষাব্যবস্থার ঘাড়ে জঙ্গিবাদের তকমা চাপানোর অপচেষ্টা। মাদরাসাসমূহকে জঙ্গি আস্তানা ও জঙ্গি প্রজননকেন্দ্র হিসেবে প্রমাণ করার জন্য সরকার ও তার সমর্থক গোষ্ঠী মরিয়া হয়ে উঠেছে। জঙ্গি দমনের নামে দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় অন্যায়ভাবে পুলিশি অভিযান চালানো হচ্ছে। ক’দিন আগে বি-বাড়িয়ায় জামিয়া ইউনিছিয়া মাদরাসায় নৃসংশভাবে মাদরাসা ছাত্র হাফেজ মাসউদকে স্থানীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হত্যা করে উল্টো মাদরাসা ছাত্রদেরকে সকল ঘটনার জন্য দায়ী করা হয়, যা সমগ্রজাতি প্রত্যক্ষ করেছে। নিরপরাধ ব্যক্তিদের আটক করে নাটক সাজিয়ে জঙ্গি বানানোর চেষ্টা চলছে প্রতিনিয়ত। সরকার সমর্থক গণমাধ্যমগুলো এ ক্ষেত্রে ঘৃণ্য অপপ্রচারে মেতে উঠেছে। দৃশ্যত তাদের ভূমিকায় মনে হয় মাদরাসা বন্ধ করলেই দেশ সন্ত্রাসমুক্ত হয়ে যাবে। তারা কি বলতে পারবে শতকরা কতজন মাদরাসা ছাত্র সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংসহ অন্যান্য অপরাধের সাথে জড়িত? যখন দেশের অন্যতম বিশ্ববিদ্যালয়কে ডাকাতদের গ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন একটি মাদরাসাও কি পাওয়া যাবে যেটাকে মানুষ খুনি অথবা ডাকাতদের গ্রাম বলেছে? ধর্ষণের সেঞ্চুরি পালনকারী বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া মানিকের মতো কোন ছাত্র কি মাদরাসা তৈরি করেছে? এরপরও যখন মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে অপপ্রচার চলে, তখন বোঝাই যায় নন ইস্যুকে ইস্যু করা হচ্ছে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে।

দুই. ষড়যন্ত্রকারীরা মাদরাসায় ছাত্র কমানোর কাজও  শুরু করে দিয়েছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সুচিন্তা ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন আয়োজিত ‘রূপকল্প ২০২১ : গত পাঁচ বছরের অর্জন এবং আগামী ৫ বছরের অঙ্গীকার’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান বক্তার বক্তব্যে পঁচাত্তরের পর দেশে স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল বলে দাবি করে প্রধানমন্ত্রী পুত্র ও তার তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, “স্কুল বন্ধ করে দেয়ায় প্রতি তিনজন স্কুলছাত্রের বিপরীতে এখন একজন মাদরাসা ছাত্র তৈরি হয়েছে। এটা কমিয়ে দিতে আমরা ইতোমধ্যে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছি!”

তিন. পাঠপুস্তকে মনগড়া বিষয় উপস্থাপন করে ইসলামের বিকৃতি। যার ফিরিস্তি সুদীর্ঘ। প্রায় প্রতিটি শ্রেণীর পাঠ্যবইয়ে এমন বিকৃতি। শুধুমাত্র পাঠকদের জ্ঞাতার্থে কিছু বিকৃতির উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো :
ক) দাখিল নবম-দশম (বাংলাসাহিত্য) এই বইয়ের গদ্যাংশের ৯৬ পৃষ্ঠায় ‘বিদায় হজ্জ’ প্রবন্ধে লেখা হয়েছে ‘আল্লাহর সকল সন্তানকে আরাফাত ময়দানে সমবেত হইবার জন্য আহবান করিয়াছিলেন।’ পাশাপাশি তারা নিজেদের কিছু মনগড়া ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যায় যা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেমন-কুরআনে নবির নাম আছে-২৬ জনের, অন্য জায়গায় ২৫ জন, রাসুল ছিলেন ৩১৩ জন, আল্লাহ বান্দাহকে সরাসরি কিছু দেন না অলির ওসিলা ব্যতীত।
খ) ষষ্ঠ শ্রেণী- ১২ নং পৃষ্ঠার সৃজনশীল প্রশ্নের নমুনা : শাহেদ সব সময় পাঞ্জাবি পরিধান করে থাকে, কিন্তু প্রায়ই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে। একজন লোক তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দেখে বলল, ইসলাম তো মানুষকে সন্ত্রাস শিক্ষা দেয় না, তুমি কেন এ অন্যায় করছ?
গ) সপ্তম শ্রেণী : তাযকিয়ার পরিচয়ে বলা হয়েছে ‘মানুষের শারীরিক রোগ চিকিৎসার জন্য যেভাবে ডাক্তার প্রয়োজন, তদ্রƒপ আত্মিক রোগের জন্য শায়খের প্রয়োজন, যিনি আল্লাহ-রসূল ও সালেহ বান্দাগণের তরিকা মোতাবেক তাযকিয়া জ্ঞান দান করবেন। (পৃষ্ঠা-১১) এ ছাড়াও ৫ম ও ৮মসহ উল্লেখিত শ্রেণীর বইয়ে ভূরি ভূরি বিভ্রান্তিমূলক ও গাঁজাখোরি তথ্য দেয়া হয়েছে, যারা সাথে কোরআন, হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের সাথে লেশমাত্র সামঞ্জস্যতা নেই। যা সরাসরি কোমলমতি (মুসলমান) শিশু কিশোরদের তাওহিদ শিক্ষার পরিবর্তে শিরক শিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম সহায়ক হিসেবে ভূমিকা পালন করবে।

চার. উচ্চশিক্ষায় মাদরাসা ছাত্ররা কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে বিষয়ে আলোকপাত করা জরুরি। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ দিন দিন সঙ্কোচিত হচ্ছে। শর্তের বেড়াজাল তৈরি করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাদরাসা ছাত্রদের ভর্তি হওয়ার সুযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যেমন (১) ঢাবি, জবি ও জাবিতে বাংলা, ইংরেজি, উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, অর্থনীতিসহ প্রায় ১২টি বিষয় ভর্তি বন্ধ। ২) ইবির অধীনে ফাজিল (বিএ পাস) করার পরও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ও ইংরেজিসহ কয়েকটি বিষয়ে মাস্টার্স করতে দেয়া হয় না। ৩) ইবির অধীনে অনার্সের মান দেয়া মাদরাসাগুলোতে পরীক্ষা নিতে বিলম্ব হওয়া (২০১০-১১ অনার্স-ফাজিল)। সাংবিধানিকভাবে উচ্চশিক্ষা নেয়ার অধিকার সবার জন্য সমান থাকলেও মাদরাসা ছাত্ররা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এমনকি সরকারের সদিচ্ছা না থাকায় মাদরাসা ছাত্ররা উচ্চ আদালতে গিয়েও তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ প্রতিটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাগুলোতে মাদরাসার ছাত্ররা ভালো রেজাল্ট করছে। মেধাবী ছাত্রদের যদি সরকার মূল্যায়ন না করে তাহলে কী করে দেশে প্রত্যাশিত আগামীর নির্মাতা তৈরি হবে?

পাঁচ. কামিল (এমএ) ও ফাজিল (অনার্স) সমমান দেয়ার কথা থাকলেও বিসিএসসহ সরকারি প্রায় সকল উচ্চ পদে অলিখিতভাবে মাদরাসার ছাত্রদের চাকরি পাওয়ার কোন সুযোগ নেই বললেই চলে। গভীর ষড়যন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মাদরাসায় পড়–য়ারা দেশের সম্পদ হওয়ার পরিবর্তে দেশের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিগত কয়েক বছর সেনাবাহিনীতেও মাদরাসা ছাত্রদের চাকরির সুযোগ মিলছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একবার বলে বসলেন যে, সেনাবাহিনীতে বড় একটি অংশ মাদরাসার ছাত্র। তার আশঙ্কা যে তাদের সাথে জঙ্গি কানেকশন থাকতে পারে! আওয়ামী সরকারের এমন আচরণে দেশের মানুষ আজ আশাহত। যেখানে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের একটা বড় অংশই মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের ব্যাপারে নেতিবাচক বক্তব্য প্রদান ও পদক্ষেপ গ্রহণ কোনভাবেই সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ছয়. এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি সরকারের অনুমোদন সাপেক্ষে মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড থেকে মঞ্জুরি নিয়ে ১৮ হাজার স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এর সংখ্যা সুপরিকল্পিতভাবে কমিয়ে আনে। চলতি মাসে জাতীয় প্রেস ক্লাবে টানা ১২ দিনে অবস্থান ধর্মঘট পালনকারী ইবতেদায়ি মাদরাসা ঐক্য পরিষদের সভাপতি শামসুল আলম বলেন, “এরই মধ্যে ১১ হাজার ১৫২টি মাদরাসা বিলুপ্ত হয়েছে গেছে, সরকারি হিসাবে ছয় হাজার ৮৪৮টি ইবতেদায়ি মাদরাসা চালু আছে।” ধর্মঘটে আগত ইবতেদায়ি শিক্ষক নেতাদের ভাষ্যমত “পাঁচ হাজার ৩২৯টি ইবতেদায়ি মাদরাসার ২৬ হাজার ৬৪৫ জন শিক্ষক কোনো ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা পান না। আর এক হাজার ৫১৯টি মাদরাসার সাত হাজার ৫৯৫ জন শিক্ষক প্রতি মাসে মাত্র ১২০০ টাকা করে সরকারি অনুদান পান। গত বছরের (২০১৫) ৯ জানুয়ারি ২৬ হাজার ২০০ নিবন্ধিত প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারীকরণের ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সব বিদ্যালয় ইতোমধ্যে জাতীয়করণের আওতায় এসেছে। অথচ রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়গুলো জাতীয়করণ করা হলেও ছয় হাজার ৮৪৮টি ইবতেদায়ি মাদরাসাকে সরকারি করা হয়নি।” এভাবে সরকারি অনুদান বন্ধ, অপ্রতুল বেতন ও মাদরাসা শিক্ষার প্রসারে সরকারের অবহেলা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকলে এটাকে ষড়যন্ত্র ছাড়া কী বলা চলে? স্কুলে যেভাবে ছাত্রদের জন্য উপবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে এর যথাযথ ব্যবস্থা মাদরাসার শিক্ষায় না থাকায় হতদরিদ্র নারীরাও দ্বীনিশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে মাদরাসা বন্ধের নতুন ফন্দি ফিকির করছে। ফাজিল ও কামিল শ্রেণীর মাদরাসাগুলোতে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্র, শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সুয়োগ সুবিধা না থাকলে ফাজিল কামিল শ্রেণী বন্ধ করে দেয়া হবে! গোড়া কেটে আগায় পানি দেয়ার হাস্যকর পদক্ষেপ! একদিকে ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষা বন্ধ (শিক্ষকদের বেতন বন্ধ, অপ্রতুল বেতন ও নতুন প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন না দিয়ে উল্টো নানা ছোতায় পুরাতন প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল) করার মাধ্যমে ছাত্র কমানোর পদক্ষেপ অপর দিকে শিক্ষার মান নিশ্চিতের অজুহাতে কামিল ও ফাজিল শ্রেণীতে সরকারের নির্ধারিত সংখ্যক ছাত্র! কোনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই নির্দিষ্ট সংখ্যক শিক্ষক ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর হাস্যকর পদক্ষেপ! এসব ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কী হতে পারে?

মাদরাসার বিরুদ্ধে কেন বিদ্বেষ?
মাদরাসা শিক্ষার প্রসার ঘটলে দেশে ধর্মহীনতার (ঝবপঁষধৎরংস) দাপট প্রতিনিয়ত কমতে থাকবে। মানুষের চিন্তা চেতনায় মন মগজে মনগড়া মতবাদের পরিবর্তে আল্লাহর দাসত্বের প্রতি নুয়ে পড়বে। ধীরে ধীরে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের সম্ভাবনা প্রকট হবে, দেশে নাস্তিক ও ইসলামবিদ্বেষীদের স্থান সঙ্কোচিত হয়ে পড়বে। অসৎ নেতৃত্বের মূলোৎপাটন হয়ে সর্বক্ষেত্রে সৎ নেতৃত্বকে জনগণ বাছাই করে নেবে। দুর্নীতি ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিনিয়ত কমতে থাকবে। অবৈধভাবে ক্ষমতা বা কারো সম্পদ কেউ কুক্ষিগত করতে পারবে না। আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা বিশ^াস ও ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হবে। এই শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজনীয় সংস্কারপূর্বক পরিচালিত হলে হক্কানি আলেম-ওলামা তৈরি হবে। উপরোক্ত সব কল্যাণধর্মী দিকসমূহ ইসলামবিদ্বেষীদের জন্য অসহ্য। মূলত ক্ষমতা হারানোর ভয়েই তারা ইসলামী শিক্ষার অগ্রযাত্রাকে দাবিয়ে রাখতে চায়। অনেকে জানা সত্ত্বেও ক্ষমতা হারানোর ভয়ে আল্লাহপ্রদত্ত নিখুঁত ও নির্ভেজাল জীবনব্যবস্থার শিক্ষাকে গ্রহণের পরিবর্তে তাগুতের শিক্ষার পথে মানুষকে আহ্বান করে।
সরকার মাদরাসা শিক্ষাকে ঢেলে সাজাবার নাম করে ‘কাঠ মোল্লা’ তৈরির ব্যবস্থা জারি করতে চাইছে, যারা সরকারের আজ্ঞাবহ হবে। যাদের দৃষ্টি মসজিদ-মাদরাসাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। সমাজে কী হচ্ছে তা নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা থাকবে না। যাদের কাজেই হবে মৃত ব্যক্তির নামাজে জানাজা পড়ানো, কবর জিয়ারত করা, খতমে কুরআন পড়া, ঝাড়-ফুঁ দেয়া ও ক্ষমতাধরদের জন্য কল্যাণ কামনা করা। যারা সত্য জেনেও না জানার ভান করবে, যাদের শাসকবর্গের কোনো অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে ধরিয়ে দেয়ার বা প্রতিবাদ করার সাহস থাকবে না। এক কথায় যারা হবে সরকারের হাতের পুতুল। স্বৈরাচারী ইসলামবিদ্বেষী চিন্তা থেকে নেয়া সরকারের এসব পদক্ষেপ রুখে না দিলে ভবিষ্যতে তা সমগ্র জাতি ও উম্মাহর জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply