মানবতাবিরোধী অপরাধের নজিরবিহীন ঘটনা

মতিউর রহমান আকন্দ

২৮শে অক্টোবর ২০০৬ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। দুনিয়ার ইতিহাসে এভাবে মানবতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধের ঘটনা বিরল। সেদিন যারা লগি-বৈঠা নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে রাজপথে মানুষ হত্যা করেছিল আজ তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আরও নির্মমভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধে মেতে উঠেছে। আর তাদের হাতে মানুষের জানমাল, ইজ্জত-আব্র“ কোন কিছুই নিরাপদ নয়। তারা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
মনে পড়ে সেদিনের কথা- আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা লগি-বৈঠা নিয়ে রাজপথ দখলের দায়িত্বহীন আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এ আহ্বান ছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট। সেদিন তারা ফ্যাসিবাদী কায়দায় লগি-বৈঠা দিয়ে শুধু মানুষই হত্যা করেনি, তারা হত্যা করেছে মানবতা, মনুষ্যত্ববোধ ও গণতন্ত্রকে। সেদিন নির্মম পৈশাচিক ঘটনা দেখে বিশ্ববাসী হতবাক হয়ে গিয়েছিল। সারা দুনিয়ার মানুষ অঝোরে চোখের পানি ফেলেছে। ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়েছে ওই ঘটনার জন্য। আজও বিশ্ববাসী এ ঘটনাকে ধিক্কার ও নিন্দা জানিয়ে চলছে।
কেন এ হত্যাকাণ্ড
২০০৬ সালে চারদলীয় জোটের মেয়াদ শেষে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ বুঝতে পেরেছিল স্বাভাবিক অবস্থায় নির্বাচন হলে তাদের পক্ষে ক্ষমতায় আসা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই তারা নির্বাচন বানচালের উদ্দেশ্যে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে জামায়াতকে চারদলীয় জোট থেকে আলাদা করতে না পারলে জোটের বিজয় ঠেকিয়ে রাখা যাবে না, তাই তারা জামায়াতকে টার্গেট করে।
অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ২৮শে অক্টোবর ২০০৬ সারা দেশ থেকে খুনি, দাগি ও সন্ত্রাসীদের ডেকে এনে ঢাকায় পৈশাচিক তাণ্ডব চালায়। অত্যন্ত নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয় জসিমউদ্দিন (লালবাগ), হাবিবুর রহমান, জসিমউদ্দিন (ঢাকা মহানগরী), মুজাহিদুল ইসলাম, গোলাম কিবরিয়া শিপন ও সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমকে। আহত করা হয় এক হাজারেরও অধিক লোককে। তারা এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। তাদের আক্রোশ, ক্রোধ ও আক্রমণ জামায়াত ও ছাত্রশিবিরের ওপর। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জামায়াতে ইসলামীসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা। কিন্তু সেদিন রাজপথে শিবির ও জামায়াতের নিরপরাধ কর্মীরা নিজের জীবনকে মৃত্যুর সাথে বাজি রেখে যে মানবঢাল তৈরি করেছিল তার ফলেই তাদের টার্গেট বাস্তবায়ন হয়নি।
আওয়ামী লীগ অত্যন্ত ভেবেচিন্তে ঠাণ্ডা মাথায় সেদিন এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। তার কারণ ১৯৯৬ সালে জামায়াত ৩০০ আসনে নির্বাচন করায় ইসলাম ও জাতীয়তাবাদী ভোটারদের ভোট বিভক্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সুযোগ পায়। আবার ২০০১ সালে জামায়াত, বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের কারণে আওয়ামী লীগের নির্বাচনে ভরাডুবি ঘটে। এ ভরাডুবির জন্য তারা জামায়াতকেই দায়ী করে জামায়াতের ওপর প্রতিশোধে মেতে ওঠে।
চারদলীয় জোটের নেতৃত্বে সরকার পরিচালনার সময় জামায়াত তিনটি মন্ত্রণালয় (২ জনে) অত্যন্ত সফলতা ও সঠিকভাবে পরিচালনা করেছে। সততা, দক্ষতা ও সফলতার এ দৃষ্টান্ত জনগণের মাঝে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে। জামায়াতের এ সুনাম ও মর্যাদা ওদের সহ্য হয়নি।
সরকারে থাকা অবস্থায় দেশে-বিদেশে জামায়াতের ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা গড়ে ওঠে। জামায়াতের আমীর কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রীয় সফরে চীনসহ বিভিন্ন দেশে সফর করায় জামায়াতের ব্যাপকভাবে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তাদের সততার সুনাম সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ে। তারা ছলেবলে কৌশলে জোট ভাঙার চেষ্টা চালায়। কিন্তু জোট ভাঙতে ব্যর্থ হয়ে তারা জামায়াতকে আঘাত করার কৌশল অবলম্বন করে।
আওয়ামী লীগের দ্বৈতনীতি
আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক স্বার্থে যে কোন সময় নীতির পরিবর্তন করতে পারে। তারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ১৯৯১-১৯৯৬ সালে জামায়াতের সাথে কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে। এ আন্দোলন চলাকালে শেখ হাসিনা, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মরহুম আব্দুস সামাদ আজাদ ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান মাওলানা নিজামীর পাশাপাশি বসে সাংবাদিক সম্মেলন ও বিভিন্ন বৈঠক করেন যার অনেক ছবি আজও সাক্ষী হয়ে আছে।
১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থীকে জামায়াতের আমীর প্রফেসর গোলাম আযমের নিকট পাঠানো হয়েছিল সমর্থনের জন্য ও দোয়া নেয়ার জন্য। অথচ যখনই জামায়াত চারদলীয় জোটগতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করে তখনই তাদের সমস্ত আশা ও স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। তারা তাদের অতীত রাজনৈতিক আন্দোলন, জামায়াত নেতাদের পাশাপাশি বসে বৈঠক ও সাংবাদিক সম্মেলনের কথা ভুলে গিয়ে জামায়াত নিধনে মেতে ওঠে। এর অংশ হিসেবে ২৮শে অক্টোবরের ঘটনা সংঘটিত হয়।
আওয়ামী লীগ তাদের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড অব্যাহত রেখেছে
২০০৬ সালের ২৮শে অক্টোবর প্রকাশ্য দিবালোকে মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের যে সূচনা আওয়ামী লীগ করেছিল তা আজও তারা অব্যাহত রেখেছে। সেনাসমর্থিত অনিয়মিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঁধে ভর করে ডিজিটাল কারচুপির মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েই তারা জামায়াতকে টার্গেট করে।
১. জামায়াতের আমীরসহ ৫ জন শীর্ষ নেতাকে ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করে যুদ্ধাপরাধ মামলায় গ্রেফতার দেখায়। অথচ আইন অনুযায়ী চার্জশিট অভিযোগ তৈরির আগে কাউকে যুদ্ধাপরাধী মামলায় গ্রেফতারের সুযোগ নেই। অহঙ্কারী সরকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে ৩৮-৪০ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন চালায়। আন্তর্জাতিকভাবে এ আইন ও ট্রাইব্যুনাল গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় তারা বলে এটা ডমেস্টিক ট্রাইব্যুনাল এবং আইনটিও ডমেস্টিক। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো জামায়াত নেতৃবৃন্দকে শাস্তি দেয়া।
২. জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম ও প্রচার সম্পাদক সাপ্তাহিক সোনার বাংলার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক অধ্যাপক তাসনীম আলমকে গ্রেফতার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। হাতে হ্যান্ডকাফ ও পায়ে এবং কোমরে ডাণ্ডাবেড়ি পরিয়ে তাদেরকে কোর্টে আনা হয়।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তানের স্বৈরশাসকবিরোধী আন্দোলন ও বাংলাদেশের ৪০ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে কোন দলের কেন্দ্রীয় নেতাকে এভাবে ডাণ্ডাবেড়ি ও হ্যান্ডকাফ পরানোর নজির নেই। আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য জামায়াত নেতৃবৃন্দের ওপর এ ধরনের জুলুম-নিপীড়ন, নির্যাতন পরিচালনা করছে।
৩. আওয়ামী লীগ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য দলীয় স্বার্থে পুলিশ ও র‌্যাবকে ব্যবহার করছে। পুলিশ ও র‌্যাবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায় দেশে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটছে। সংঘটিত হচ্ছে লোমহর্ষক ঘটনা। পুলিশের বাড়াবাড়ির সীমা অতিক্রম করে গেছে। সাভারে ৬ জন ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যায় পুলিশের গাফিলতি ধরা পড়েছে, লিমনের ওপর র‌্যাবের নির্যাতন দেশবাসীকে হতবাক করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরের ওপর নির্যাতন জাতিকে বিস্মিত করেছে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের ওপর পুলিশের আক্রমণ, ২২শে অক্টোবর হরতাল চলাকালে জনৈক পথচারীর ওপর পুলিশের বুট দিয়ে আঘাত সরকারের ফ্যাসিবাদী চরিত্র ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের নজির তুলে ধরেছে।
এ জুলুম ও অত্যাচারের অবসান হবে ইনশাআল্লাহ
আওয়ামী সরকারের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড, অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী ভূমিকায় গোটা জাতি আজ অতিষ্ঠ। আওয়ামী লীগ জনগণের সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান, ঘরে ঘরে চাকরি দেয়ার ওয়াদা, ১০ টাকা কেজি চাল, বিনামূল্যে সার, দুর্নীতি উচ্ছেদ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইন শৃঙ্খলার উন্নতিসহ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে ওয়াদা জাতির সাথে আওয়ামী লীগ করেছিল তার কোনটিই বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তাই দিশেহারা আওয়ামী লীগ কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চায়।
দুনিয়ার ইতিহাস সাক্ষী, কোন অত্যাচারী স্বৈরশাসক জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। অতীতে বাংলাদেশে কোন স্বৈরশাসক তার গদি রক্ষা করতে পারেনি। জনগণের আন্দোলনের মুখে তাদের পতন হয়েছে। সম্প্রতি মিসর, তিউনিসিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার জনগণ প্রমাণ করেছেন কোন স্বৈরশাসকই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। আওয়ামী লীগও জুলুম-নিপীড়ন চালিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না।
২৮শে অক্টোবর ২০০৬ মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে যারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে তাদের হাত থেকে জাতি মুক্তি পাবে। মানবতা, মনুষ্যত্ব ও মানবাধিকার হবে সুপ্রতিষ্ঠিত। জনতার বাঁধভাঙা জোয়ার আওয়ামীপন্থীদের ভাসিয়ে দেবে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply