মানবতা ধর্মনিরপেক্ষতা ও ইসলাম -মু. দেলোয়ার হোসেন ফাহিম

সেক্যুলারিজম নিয়ে মুসলিমবিশ্বে বিশেষ করে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, রাজনৈতিক সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে যারা নিজেদেরকে প্রগতিশীল বলে দাবি করেন, তারা এ দাবির ব্যাপারে নিজেরা পুলকিত হন। এ মতবাদের পক্ষে-বিপক্ষে বহু লোকের অবস্থান। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে  যারা এর পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছেন তাঁদের অধিকাংশই এ মতবাদ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না রেখেই ক্লাস রুমে, সেমিনারে-সিম্পাজিয়ামে মুক্তবুদ্ধির চর্চার নামে তরুণদের এবং সাধারণ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটাচ্ছেন। পৃথিবীতে ধর্ম ততটাই পুরনো যতটা পুরনো মানুষ। মানুষের শান্তি-প্রগতি ও মুক্তির তাগিদেই ধর্মের আয়োজন। কিন্তু এ ধর্ম সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতা,  গোঁড়ামি এবং এর ব্যবসায়িক ব্যবহার বর্তমান বিশ্বের এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা। আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা এর বাস্তব উদাহরণ। এ মতবাদটি ১৭শত শতাব্দীতে ইউরোপে আত্মপ্রকাশ করে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এটি প্রাচ্যে প্রসারিত হয়। প্রথম দিকে মিসর, তুরস্ক, ইরান, লেবানন, সিরিয়াতে প্রসার লাভ করে। ধীরে ধীরে তিউনিশিয়াতে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষদিকে ইরাকে প্রসারিত হয়। এ ছাড়া বিংশ শতাব্দীতে এসে অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোতেও বিস্তার লাভ করে। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইউরোপে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, বস্তুবাদ ও যুক্তিবাদ দৃঢ়ভাবে শিকড় গেড়ে বসে। আর ইতিহাসের এ যুগ-সন্বিক্ষণে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থা  মুসলিম দেশগুলোতে প্রসার লাভ করতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে মুসলিম শিক্ষাবিদ-বুদ্বিজীবীদের মন-মানসকে ধর্মের প্রতি সন্দেহপ্রবণ করে তোলে।
সেক্যুলার শব্দের উৎপত্তি :Secularism ইংরেজি শব্দ। এটি ল্যাটিন শব্দ Seculam  থেকে এসেছে। যার অর্থ পার্থিব। ইউরোপ-আমেরিকায় সেক্যুলারিজম বলতে সকল ধর্মের সমানাধিকার নয় বরং ধর্মহীনতাকেই বোঝায়। ফ্রেঞ্জ ভাষায় Secularismকে বলা হয় Lacism  যার অর্থ অধর্মীয় অবস্থা। আরবিতে সেক্যুলারিজমকে আল লাদিনাহু  বলা হয়, যার অর্থ হলো ধর্মহীন মতবাদ। বাংলাতে সেক্যুলারিজম বলতে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদকে বোঝায়। এখানে ‘নির’ প্রত্যয় যোগ করা হয়েছে যার অর্থ নেই। অর্থাৎ, ধর্মের পক্ষে নেই। বাংলা একাডেমির অভিধানে অপেক্ষার অর্থ ভরসা বা নির্ভরতা। অর্থাৎ যে ব্যক্তির ধর্মের ওপর নির্ভরতা বা বিশ্বাস নেই সেই কেবল ধর্মনিরপেক্ষ। শব্দগত অর্থ দিয়ে পুরো বিষয়কে পর্যালোচনা করা যায় না, আর বর্তমানে সেক্যুলারপন্থীরা সেক্যুলারিজম বলতে সকল ধর্মের মানুষের সমানাধিকারকেই বোঝায়। তাই শব্দগত অর্থের পাশাপাশি ব্যবহারিক দিকটাও বিশদভাবে পর্যালেচনার দাবি রাখে।
সেক্যুলারিজমের ক্রমবিকাশের কারণ : তৎকালীন ইউরোপের ধর্মযাজকেরা বাইবেলের ব্যাখ্যা প্রদানের সব অধিকার নিজেদের হাতে রাখে এবং গির্জার বাইরে কোন চিন্তাবিদের এ গ্রন্থের মূল্যায়ন করার অধিকার ছিল না। মূলত খ্রিষ্টান চার্চের সঙ্কীর্ণমনা নেতাদের দ্বারা ধর্মীয় অসহনশীলতা প্রদর্শিত হয়েছে, মানুষের চিন্তাকে শৃঙ্খলিত করার জঘন্য প্রচেষ্টাও তারা করেছেন। তাদের ধারণা ছিল তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, সৃষ্টিজগৎ ও মানুষ সম্পর্কে বাইবেলে বর্ণিত কোন একটা ভুল প্রমাণিত হওয়া মানে মানুষের ওপর তাদের কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যাওয়া। এ ভয়ে তারা যেকোনো বিষয় পুর্নবিবেচনার পরিবর্তে অধিকতর  কঠোর হাতে তা মোকাবেলার অপচেষ্টায় নিমজ্জিত থাকত। কিন্তু এর ওপর ভিত্তি করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া সম্পূর্ণ অযৌক্তিক যে, ধর্ম গোঁড়ামি ও অসহনশীলতর জন্ম দেয়। কারণ খ্রিষ্টান ধর্মের কোথাও ধর্মীয় অসহনশীলতা, চিন্তাকে শৃঙ্খলিত করার বিষয় উল্লেখ করা হয়নি। তারা প্রচার করতে শুরু করল যে, যেহেতু যিশু গির্জাকে পাপ মোচেনের ক্ষমতা দিয়েছেন সেহেতু পোপরা মানুষের পাপ মোচন করতে পারবে, তবে শর্ত হচ্ছে গির্জা থেকে Certificate ক্রয় করতে হবে অতি চড়া দামে। ধনীরা  সবাই Certificate এ  আশায় ক্রয় করত যে, এ Certificate   থাকলে কেউ তাদের স্বর্গে প্রবেশে বাধা দিতে পারবে না, ফলে অপরাধপ্রবণতা এত বেড়ে যায় যে সমাজের সর্বত্র অরাজকতা ছড়িয়ে পড়ে এবং খ্রিষ্টান ধর্মের প্রতি মানুষের বিদ্বেষ ক্রমেই বাড়তে থাকে। এর মাধ্যমে তারা আর্থিকভাবে লাভবান হতে শুরু করে এবং এই সার্টিফিকেট বিক্রির উদ্দেশ্য খ্রিষ্টজগৎ চারদিকে কমিশনের মাধ্যমে দালাল নিযুক্ত করে। অথচ বাইবেলে উল্লেখ আছে-“পৃথিবীতে নিজের জন্য সম্পদ পুঞ্জীভূত কর না। কেননা এখানে সম্পদ পোকায় খায়, জং ধরে। সম্পদ আকাশে পুঞ্জীভূত কর। (মথি : ১৬ : ১৯)বাইবেলে এমন সব কথা সংযোজন করা হলো যেগুলো দুর্বোধ্য ও অবিশ্বাস্য যেমন-ইউকারিস্ট অনুষ্ঠান। এ অনুষ্ঠানে রুটি ও মদকে যিশুর শরীর ও রক্ত জ্ঞান করা হয় এবং যারা এ রুটি ও মদ খাবে, তারা প্রভুর ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে। সাথে সাথে এগুলোর গবেষণা নিষিদ্ধ করা হলো এবং যারা গবেষণা করবে তারা খ্রিষ্টধর্মচ্যুত হবে। মার্টিন লুথার, জন ক্যালভিন এবং উলরিখ উইংলি এসব আজগুবো চিন্তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নিশান উড়িয়ে প্রোটেস্টানটিজমের জন্ম দেন। ইউকারিস্ট অনুষ্ঠানটি খ্রিষ্টবাদের একটা নতুন সংযোজন। অবতীর্ণ গ্রন্থে, খ্রিষ্টধর্মের প্রাথমিক ইতিহাস অথবা ইকিউম্যানিক্যাল কাউন্সিলের কোন ঘোষণায় এ অনুষ্ঠানের উল্লেখ নেই।
ধর্মযাজকেরা মহিলাদেরকে Door of Devil অর্থাৎ শয়তানের প্রবেশদ্বার হিসেবে আখ্যায়িত করে। তাদের মতে, আদম (আ) নিষিদ্ধ গাছের ফল খেতে প্রথম রাজি হননি। হাওয়া (আ) তাকে খেতে বাধ্য করেন। তাই তারা মহিলা সমাজকে শয়তানের প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করে। খ্রিষ্টজগতের এক বড় মাপের পাদরি Tartulian বলেন, “নারী হচ্ছে মানুষের মনের মধ্যে শয়তানের প্রবেশ করার প্রধান ফটক। এ অভিযোগ ছিল মহিলা সমাজের প্রতি চরম অবমাননা। অথচ আল্লাহ ঈসা (আ)-এর মাতা মরিয়ামকে করেছেন সম্মানিত। বাইবেলে কোথাও বলা হয়নি নারী হচ্ছে  Door of Devil।
যাজকেরা অনেক বিলাসবহুল জীবনযাপন করত। Prof. Drapper তার Science & Religion গ্রন্থে লেখেন, যাজকদের টেবিলগুলো ছিল স্বর্ণখচিত এবং রুপার বাসনকোসন ছিল মণিমুক্তাখচিত। যেখানে বাইবেলে বলা হয়েছে, “আমি তোমাদের বলছি, ধনীদের আসমানি সাম্রারাজ্যে প্রবেশ করা দুঃসাধ্য। আমি আবার বলছি, সুচের ছিদ্র দিয়ে উট চলে যাওয়া, ধনীদের স্বর্গে যাওয়া থেকে অধিক সহজতর।” (মথি : ১৯-২১) আর সেখানে ধর্মযাজকরাই সবচেয়ে বিলাসবহুল জীবন-যাপন করত।
Prof. Drapper Zvi Science & Religionগ্রন্থে লেখেন, যাজকদের জৈবিক চাহিদা নিবারণের জন্য পাশে থাকত অর্ধ উলঙ্গ বালিকা দল। যে শহরগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক যাজক বসবাস করত, সে শহরগুলোতে সর্বোচ্চ সংখ্যক বেশ্যাদের আড্ডা দেখা যেত। আত্মার-উন্নতির পথ ছেড়ে দিয়ে ধর্মযাজকরা দেহের চাহিদা  মেটানোর দিকে ঝুঁকে যায়। রাষ্ট্রনায়কদের সাথে পোপদের বিরোধ চলাকালে তারা পাদরিদের গোপন-অশ্লীল পাপাচারের কাহিনী জনসমক্ষে ফাঁস করে দিলো। পাদরিসুলভ পোশাকের আড়ালে যে লাম্পট্য লুকিয়ে ছিলো তা জনগণের সামনে নগ্ন হয়ে গেল। এর ফলে ইউরোপে ধর্ম এবং জীবনের মাঝে সম্পর্ক স্থাপনের সব সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
পোপ এবং সম্রারাটদের মাঝে বিবাদ চলাকালে পোপরা জনগণের ওপর অতিরিক্ত করারোপ করতে থাকে যা জনগণের দুর্ভোগ চরমভাবে বাড়িয়ে দেয়। এতে জনগণ পোপদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। জনগণের এ অসন্তোষকে পুঁজি করল রাষ্ট্র নায়করা। তারা জনগণকে গির্জার শোষণের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলেন এই বলে যে, জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত করারোপ করে পোপরা বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত। সুতরাং পোপরা কখনোই জনগণের বন্ধু হতে পারে না।
পোপদের প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে খ্রিষ্টানরা চারবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয় এবং প্রতিবারই মুসলমানদের হাতে বিপর্যস্ত হয়ে অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হয়ে ফিরে আসে। পোপ Urban-2, পোপ Eugenius 3, পোপ Gregory 8, জার্মানির Conrad 3 ও ফ্রান্সের রাজা Louis  ৭। এরা সবাই গির্জার সৈন্যবাহিনী এবং সাধারণ মানুষকে এই বলে প্ররোচিত করে যে,  God son যিশু নিজে নেতৃত্ব দেবেন এবং তারা অবশ্যই জয়লাভ করবেন। কিন্তু পোপদের ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। এতে করে পোপদের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।
পঞ্চম চার্লসের ছেলে দ্বিতীয় ফিলিপ, তিনি কট্টর ক্যাথলিকপন্থী ছিলেন। ভিন্ন মতালম্বীদের দমিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে তিনি ঘোষণা করেন, প্রোটেস্টেন্টসহ সকল ক্যাথলিক ধর্মের বিদ্রোহীদেরকে “আগুনে পুড়িয়ে, গর্তে ফেলে কিংবা তলোয়ার দিয়ে দ্বিখন্ডিত করে হত্যা করা হবে।” সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে  তিনি  Inquisition  আদালত প্রতিষ্ঠা করেন এবং অসংখ্য লোককে হত্যা করান। এই কোর্টে প্রায় তিন লক্ষ লোককে দন্ড দেয়া হয়েছিল যাদের মধ্যে ৩২ হাজার লোককে জীবন্ত অবস্থায় পুড়িয়ে ফেলা হয়। জীবন্ত দগ্ধ ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ব্রুনো। তার “বহু জগৎ” সম্পর্কিত মতবাদ গির্জার নেতৃবৃন্দের ক্রোধের উদ্রেক করে এবং তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়।
পোপদের পতন এবং সেক্যুলারিজমের উৎপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পোপদের চরম বিজ্ঞানবিদ্বেষী মনোভাব। ঐ সময় ইউরোপে যুক্তিবিদ্যার ব্যাপক প্রসার ঘটে। বিজ্ঞানীরা ধর্মীয় ঐতিহ্য ভেঙে ফেলেছিলেন, তারা পোপদের মতবাদ প্রত্যাখ্যান করলেন। এতে করে বিজ্ঞানীদের ধর্মত্যাগী বলে ফতোয়া দিতে শুরু করলো। পোপরা গোয়েন্দা নিয়োগ করলো এবং নতুন চিন্তাকে সন্দেহের চোখে দেখা হতো। এটাই ছিল খ্রিষ্টবাদের ওপর শেষ আঘাত, কেননা অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক এ মতামতগুলো সামান্য পরীক্ষণের মাধ্যমেই পরিত্যক্ত। পোপদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে গিয়ে কোপার্নিকাসের ১৫৪৩ সালে ‘‘আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের আবর্তন’’ নামক একটি বই প্রকাশ করেন। গির্জা কর্তৃক বইটি নিষিদ্ধ করা হয়।
টেলিস্কোপ আবিষ্কার করার কারণে ৭০ বছর বয়সী বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর ওপর কঠোর নির্যাতন নেমে আসে। ১৬৪২ সালে তিনি মারা যান। ইতিহাস সমালোচনার প্রবক্তা ছিলেন স্পিনোজা। তাঁর শেষ পরিণতি হয়েছিল তরবারির আঘাতে মৃত্যুদন্ড। জন লক দাবি উত্থাপন করেছিলেন যে, স্ববিরোধিতা পাওয়া গেলে ঐশী বাণীর বিপক্ষে বিবেকের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।
বুদ্ধিজীবীরা দেখতে পান  যাজকরা God father, God son, Holy ghost, আসমানি গ্রন্থ, আসমানি সাম্রাজ্যের কথা বলে  সাধারণ মানুষকে সুখ-স্বপ্ন এবং ভয় প্রদর্শন করে অথচ তারা নিজেরাই  ইহজগতে যত ধরনের মজা আছে সব ভোগ করেন। মানুষের ওপর অকথ্য জুলুম নির্যাতন চালায়। এমনকি স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় বিধিবিধানের পরিবর্তন-পরিবর্ধন করতেও কুণ্ঠাবোধ করেন না। পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল কথা হচ্ছে মানুষের শান্তি-মুক্তি ও প্রগতি নিশ্চিত করা।  ফলে ইউরোপের মানুষেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং এসব ঘৃণিত যাজকদের পরিত্যাগ করে ইহজাগতিক চিন্তাভাবনা শুরু করে। এই পার্থিব জগতে কিভাবে মানুষের উন্নতি নিশ্চিত  করা যায় এটাই হয়ে ওঠে তাদের আন্দোলনের মূল বিষয়। আর এ জাতীয় চিন্তা গবেষণার ফসল হচ্ছে সেক্যুলারিজম।
শেষ পর্যন্ত শিক্ষিত সম্প্রদায় এবং সংস্কারকগণ আর ধৈর্য ধারণ করতে পারল না। তারা সাধারণ মানুষকে নিয়ে গির্জার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। গির্জার সাথে সংশ্লিষ্ট সব কিছু তারা বর্জন করল। প্রথম দিকে খ্রিষ্টবাদের  বিরুদ্ধে অতঃপর ক্রমান্বয়ে সকল ধর্মের বিরুদ্ধে বৈরিতা সৃষ্টি হয়। বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদের নেতৃবৃন্দের সাথে খ্রিষ্টবাদ তথা ‘সেন্টপলের’ মতবাদের পক্ষের নেতৃবৃন্দের লড়াই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান ও ধর্মের লড়াইতে পরিণত হলো। একপর্যায়ে সাধারণ মানুষের সামনে যখনই খ্রিষ্টধর্মের নাম উচ্চারিত হতো, তখনই আকস্মিকভাবে ধর্মীয় প্রতিনিধি ও গির্জার পুরোহিতদের লোমহর্ষক জুলুম-নিপীড়নের ভয়াবহ ছবি তাদের চোখে জীবন্ত হয়ে ভেসে উঠত। আর ভেসে উঠত তাদের বিজ্ঞানবিরোধী অবস্থান।
ধর্মযাজক ও পোপদের শোষণের  শৃঙ্খল থেকে মানুষের মুক্তির জন্য যে আন্দোলন শুরু হয় এবং তাতে বুদ্বিজীবীদের অনুপ্রেরণা অবশ্যই সময়ের দাবি ছিল কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এসব বুদ্বিজীবী মানবতার মুক্তির সনদ রচনা করতে গিয়ে বিষয়টির গভীরে প্রবেশ করার ধৈর্য অবলম্বন করতে পারেনি। ধর্ম এবং এর ব্যবসায়িক ব্যবহারের পার্থক্য করার সুস্থিরতা এবং চিন্তার সচ্ছতা তারাও দেখাতে পারেনি। তারা ধর্মীয় বিধানের সাথে ধর্মযাজকদের স্বেচ্ছাচারিতা, অনমনীয়তা ও ধর্র্মের বিকৃত উপস্থাপনার মধ্যে পার্থক্য করতে সম্পূর্ণ রূপে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মযাজকদের প্রতি ঘৃণা ও অপরিণত চিন্তাশক্তি তাদেরকে ধর্মের প্রতি ন্যায়ানুগ মনোভাব দেখাতে বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে প্রচন্ড নেতিবাচক মানসিকতা শুরুতে ইউরোপ ও পরে পৃথিবীর অন্যান্য অংশকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। তারই ফলস্বরূপ যে আন্দোলন ইউরোপে গির্জাতন্ত্রের বিরুদ্ধে শুরু হয় সেই একই আন্দোলন অন্য দেশগুলোতে ধর্মেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় যদিও যাজকতন্ত্রের মতো কোন বিষয় যেগুলো ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে তার একটি কারণও উপস্থিত ছিল না বরং ধর্মই ছিল মানুষের শান্তি এবং মুক্তির ঠিকানা। এ কথা অনস্বীকার্য যে ইউরোপে ধর্ম ছিল শোষণের অন্যতম হাতিয়ার, কিন্তু তাই বলে ধর্মকে দোষারোপ করা যৌক্তিক নয়। এ ক্ষেত্রে ডা: জাকির নায়েকের একটি উদাহরণ দেয়া যায়- ধরুন আপনি অফিসে যাওয়ার জন্য একটি ল্যান্ড-ক্রুজার গাড়ি ক্রয় করলেন এবং একজন ড্রাইভার দিয়ে তা পরীক্ষা করতে চাইলেন। এ ক্ষেত্রে গাড়িটি ১০০% ভালো হওয়ার পরও যদি ড্রাইভার অদক্ষ হয়, তাহলে কোন প্রকার দুর্ঘটনার জন্য গাড়িকে বা গাড়ির কোম্পানিকে  দোষারোপ না করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধানের আলোকে সকল ধর্মের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশের সংবিধানে সেক্যুলারিজমকে মূলনীতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক অঙ্গন থেকে ইসলামকে সরিয়ে ফেলার হীনষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই সেক্যুলারিজম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা অব্যাহত থাকে। তার কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো-
১.    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম থেকে কুরআনের আয়াত ‘রাব্বি জিদনি ইলমা’ উঠিয়ে দেয়া হয়।
২.    ঢাকা শিক্ষাবোর্ডের মনোগ্রাম থেকে ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’ তুলে দেয়া হয়।
৩.    সলিমুল্লাহ মুসলিম হল, ফজলুল হক মুসলিম হল, জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের নাম অপরিবর্তিত আছে।
৪.    কবি নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে ‘ইসলাম’ শব্দটি বাদ দিয়ে এর নাম রাখা হয় কবি নজরুল কলেজ অথচ তার দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
৫.    দেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন ড. কুদরত-এ-খোদা শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়-প্রথম শ্রেণী থেকে ৮ম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা প্রদান করা যাবে না। এর ওপরের স্তরের শিক্ষার্থী ইচ্ছা করলে অপশনাল সাবজেক্ট হিসেবে ধর্ম শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।
৬.    স্বাধীন বাংলা বেতারে যুদ্ধের সময় কুরআন তেলাওয়াত হতো, দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রথম দিকে কট্টর সেক্যুলারদের দৈারাত্ম্যে তা বন্ধ হয়ে যায়। পরে অবশ্য শেখ মুজিবের নির্দেশে তা আবার চালু হয়।
৭.    দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাথায় স্কার্ফ  ও বোরখা পরার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বহিষ্কার, জামার হাতা কেটে দেয়া,  লাঞ্ছিত করার   ঘটনা  নিয়মিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
৮.    পাঠ্যপুস্তক থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর জীবনী উঠিয়ে ফেলা হয় এবং সম্প্রতি ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা নামক বই পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ইসলামকে নৈতিকতাবর্জিত ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
৯.    রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ও পৃষ্ঠপোষকতায় অসংখ্য মূর্তি, মন্দির স্থাপন করা হলেও নির্মাণ করা হয়নি তেমন কোনো ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বরং সম্প্রতি দেশের অন্যতম বিদ্যাপীঠ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁড়া অজুহাতে আইনসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাদরাসার ছাত্রদের ভর্তি নিষিদ্ধ করা হয়।
১০.    খেলার জন্য আজান বন্ধ রাখার ঘটনাও ঘটেছে এই দেশে।
১১.    সেক্যুলার শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রদূত বলেছেন, “আজানকে একমাত্র শেয়ালের ডাকের সাথেই তুলনা করা যায়।” (বুদ্ধিজীবী : ১৪৮) আবার আজানকে বেশ্যাবৃত্তি বলেও আখ্যায়িত করেছে সেক্যুলার আন্দোলনের মডেল কবি শামসুর রাহমান। তিনি তাঁর “জন্মান্ধের মত” শিরোনামে একটি কবিতায় লিখেছেন-
‘‘মুয়াজ্জিনের ধ্বনি
যেন ক্যানভাসের একটানা
অলজ্জিত বেশ্যাবৃত্তি।”

এ ছাড়াও ভারতবর্ষের সম্রারাট আকবর দ্বীনের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ করেন আর দ্বীন ইসলামকে তার মর্জিমত ‘দ্বীনে ইলাহী’ বানিয়ে ফেলেন। আমেরিকার জনগণ আজানের বিরুদ্ধে আপিল করে, পরে গণভোটের আয়োজন পর্যন্ত করা হয় (২০০৪ সালের ২০ জুলাই)। ফ্রান্স সর্বপ্রথম ১৯৩৭ সালে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে হিজাব বিরোধী পদক্ষেপ নেয়। ১৯৮৯ সালে হিজাব পরাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালের ১৩ জুলাই নিকোলাস সারকোজির ফ্রান্স সরকার জনসমুক্ষে পর্দা করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করে। বেলজিয়াম ফ্রান্সের পরপরই হিজাববিরোধী আইন পাস করে। স্পেনে নাজওয়া নামক ১৬ বছরের এক ছাত্রীকে হিজাব পরার অপরাধে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয় যা সারা বিশ্বে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করে। সুইজারল্যান্ডের তৎকালীন আইনমন্ত্রী এফিলিন ফেডমার বলেন, মেয়েদের মধ্যে হিজাবের অধিকতর উপদ্রব লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তুরস্কের  কামাল আতাতুর্ক আজানকে ‘তানরে উলুদুর’ ধ্বনি বানিয়েছে তার সময়ে।  তিউনিশিয়ার হাবিব বারগুইবা রমজান মাসের ফরজ রোজা রাখা নিষিদ্ধ করে  দেয়। রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর বিশ্ববিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ বুখারি শরীফের সঙ্কলক ইমাম বুখারীর বুখারা, সমরকন্দ, তাসখন্দসহ ইতিহাসখ্যাত ইসলামী জনপদের মসজিদগুলো ঘোড়ার আস্তাবল আর নাট্যশালায় পরিণত করেছিল। ভারতের হাইকোর্ট ১৯৮৫ সালের ১১ মে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ যা বিজ্ঞানীদের মতে House of Science, মহা বিশ্বের বিস্ময় সেই গ্রন্থকে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে ।
যারা প্রতিনিয়ত সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অজ্ঞতার কারণে অথবা ধর্মবিদ্বেষী হয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বলেন, সেক্যুলারিজম  মানে সকল ধর্মের সমানাধিকার তাদের জন্য আবরাহাম লিঙ্কনের উক্তিটি বলা বাহুল্য, ‘তুমি কিছু মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার, তুমি সব মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার, কিন্তু তুমি সব মানুষকে সব সময়ের জন্য বোকা বানিয়ে রাখতে পার না।’
লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply