মানবতা বিপর্যয়ের নেপথ্যে -শেখ মুহাম্মদ এনামুল কবির

Humanity শব্দটি Latin (humanitas) শব্দ থেকে নেয়া হয়েছে। যার অর্থ দয়া যা মানব প্রকৃতি। তবে এটা মানুষ একে অপরের প্রতি যে ধরনের অনুভূতি ধারণ করে সেটিকেও বোঝায়। কিন্তু আপনি যখন মানবতার কথা বলবেন তখন সামগ্রিকভাবে সকল মানুষের কথা বলবেন। যখন মানুষ কোন খারাপ কাজ করে তখন তা মানুষ হিসেবে আপনার মানবতার প্রতি বিশ্বাসের অনুভূতিকে পরীক্ষা করে (অর্থাৎ এই খারাপ কাজ আপনার হৃদয়ে এক ধরনের বেদনার অনুভূতি জাগ্রত করে)। যখন মানুষ অনাহারী শিশুদের খাওয়ানোর জন্য টাকা সাহায্য চায় তখন তারা আপনার মানবতার অনুভূতির প্রতি আবেদন করে। মানুষ হিসেবে ব্যথা বেদনা, দুঃখ-কষ্ট, আবেগ-অনুভূতি সর্বত্রই এক এবং অভিন্ন। পৃথিবীর সব মানুষের মাঝে এই অনুভূতি বিদ্যমান। সেক্ষেত্রে প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্য, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দূরপ্রাচ্যের মাঝে কোথাও কোনো ভিন্নতা নেই। পৃথিবীর সবত্রই মানুষ আঘাত পেলে কষ্ট পায় আর্তনাদ করে সব শিশু অভিন্নভাবে কাঁদে। সিরিয়া, আফগানিস্তান, ইরাক ফিলিস্তিনে যখন বোমারু বিমান বোমা মারে এবং তার আঘাতে মানুষ মারা যায়, আহত হয়, শরীর থেকে ফিনকি দেয়া লাল রক্ত বের হয়, আপন গৃহ থেকে বিতাড়িত হয়, সে একই ধরনের ঘটনা যদি আমেরিকাতে, ইংল্যান্ডে চীন বা রাশিয়ায় ঘটে তাহলে সেদেশের মানুষও মারা যাবে, আহত হবে, শরীর থেকে ফিনকি দিয়ে লাল রক্ত বের হবে। আর এই ঘটনায় মানুষ হিসেবে যদি আপনার বিবেক আর্তনাদ করে উঠে তবে বুঝতে হবে আপনার ভিতরে মানবতাবোধ আছে। আর যদি সে ধরনের কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব আপনি আপনার মাঝে অনুভব না করেন তাহলে বুঝতে হবে আপনার মধ্যে মানবতাবোধ নেই।

মানবতা একটা ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। এর কোনো আকার নেই কিন্তু ভববষরহমং/ ংবহংব বা অনুভূতিসম্পন্ন একটি বোধ আছে এর মাঝে। যে ংবহংব বা বোধ মানুষের মাঝে প্রকৃত মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটায়। এক কথায় মানুষকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে যে গুণাবলি তাকে মানবতা বলে। ইংরেজি ডিকশনারিতে মানবতার চমৎকার সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এ ভাবে- (Humanity is the human race, which includes everyone on Earth. It’s also a word for the qualities that make us human, such as the ability to love and have compassion, be creative, and not be a robot or alien. অথার্ৎ পৃথিবীর গোটা মানবজাতি মানবতা শব্দটির অন্তর্ভুক্ত। এটি এমন এক শব্দ যা এমন সব গুণাবলির সমন্বয় যা আমাদের মানুষ করে তোলে; যে অনুভূতি আমাদের রোবট বা এলিয়েন না বানিয়ে আমাদের ভিতর ভালোবাসা বা মমত্ববোধের অনুভূতি জাগ্রত করে এবং সৃজনশীল হতে সাহায্য করে।)
মানবতার সমার্থক শব্দ (ঝুহড়হুসং)
দয়া (kindness), দানশীলতা (charity), সমবেদনা (compassion), বুঝশক্তি (understanding), সহানুভূতি (sympathy), ক্ষমা (সবৎপু), সহনশীলতা (tolerance), আবেগপ্রবণতা (tenderness), মানবপ্রীতি (philanthropy), দয়াশীলতা (benevolence), সমব্যথী (fellowfeeling), সদয়তা (benignity), ভ্রাতৃপ্রেম (brotherly love), মহৎ হৃদয় (kind-heartedness) ইত্যাদি। বর্ণিত মানবতার সমার্থক শব্দ দ্বারা আমাদের সামনে মানবতার ব্যাপ্তি বা পরিসর এবং রূপ বা ধরনের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। এই ব্যাপক শব্দ সমষ্টিগুলো প্রত্যেকটি নিজ নিজ জায়গায় এবং পরিমণ্ডলে মানবতার স্বরূপ ধারণ করে। অর্থাৎ একজন মানুষের মধ্য যখন দয়া (kindness) থাকে তখন তাকে আমরা বলি লোকটি মানবিক। যখন দানশীলতা (charity) থাকে তখন তাকে আমরা আরো বেশি মানবিক বলি। এভাবে এই প্রত্যেকটি গুণ যখন মানুষের চরিত্রে মানুষ ধারণ করে তখন সে বা তারাই সমাজের সব থেকে বেশি মানবিক মানুষ হয়। মানবিকতা হয় তাদের ধর্ম। সবগুণ সবার মধ্যে সমানভাবে থাকার প্রয়োজন নেই বা থাকে না এটাই স্বাভাবিক। কারো মাঝে একটু কম কারো মাঝে একটু বেশি থাকতে পারে। তবে তাদের মধ্যে মোটামুটি একটি ইতিবাচক অনুভূতি যদি সদা জাগ্রত থাকে তাহলে সে বা তারা হতে পারে অধিক মানবিক। আরো পরিষ্কার করে বললে বলতে হয় ভালো বা মন্দ কাজ পৃথক করার অনুভূতি। যে অনুভূতি মানুষকে ভালোর দিকে ধাবিত করে আর মন্দ থেকে বিরত রাখে সেটিকে আমরা মানবতা বলতে পারি।

অন্য কথায় বলতে গেলে মানবতা হচ্ছে মৌলিক মানবাধিকারগুলোর যথাযথ প্রয়োগের সুব্যবস্থাপনা। যেমন মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। খাদ্য পাবার অধিকার, চলাফেরা করার অধিকার, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার, জীবনের নিরাপত্তা পাবার অধিকার, সুশিক্ষা পাবার অধিকার, চিকিৎসা পাবার অধিকার, খাদ্য পাবার অধিকার, পরনের কাপড় পাবার অধিকার এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে সমান অধিকার। অর্থাৎ ধনী-দরিদ্র, উঁচু-নিচু, সাদা-কালোর বিভাজন না করে প্রত্যেককে তার যথাযথ সুযোগ ও তার প্রাপ্ত অধিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা। মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো যখন বিপর্যস্ত ও উপেক্ষিত হয় তখন মানবতার বিপর্যয় ঘটে।
মানুষের পরিচয় মানুষ কেন?
মানুষের পরিচয় মানুষ হওয়ার কারণ হলো মানুষের রয়েছে মনুষ্যত্ববোধ। এই মনুষ্যত্ববোধের কারণে মানুষ পশু থেকে উন্নত জীব। ভালো-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা একমাত্র মানুুষকে দেয়া হয়েছে। আর এ জন্যই মানুষ সৃিষ্টর শ্রেষ্ঠজীব। অন্যায় ও মন্দকে পরিহার করে ন্যায় ও সুন্দরের পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষকে এই ভালো মন্দ পৃথক করার যে জ্ঞান দেয়া হয়েছে তা কাজে লাগিয়ে কয়জনে সত্যিকারের মানুষ হতে পারছে? এই সংখ্যা নিতান্তই কম।
মনুষ্যত্ববোধের অতীত বনাম বর্তমান
বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে আমাদের সামনে মানুষের মনুষ্যত্ববোধ ও বিবেকবোধের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। মানবতাবোধ আজ ভোঁতা হয়ে গেছে। এই কিছুদিন আগেও আমরা দেখেছি কেউ যদি কোন গুরুজনদের সাথে বেয়াদবি করতো তাহলে তা সমাজের বড় ধরনের অন্যায় করার অপরাধ সমতুল্য মনে হতো। ছোট বড় বৃদ্ধ সবাই তার এই কাজটিকে নেগেটিভ ভাবে নিত। মানুষের এই নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার কারণে কোন ব্যক্তি দ্বিতীয়বার আর এ ধরনের কাজ করার সাহস পেত না। বয়োবৃদ্ধরা তখন সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিল। সবার মাঝে একটা সম্প্রীতির ভাবছিল। দু’-একজন অসৎলোক যা ছিল তারা তাদের খারাপ কাজ প্রকাশ্যে করার দুঃসাহস দেখাতো না। গ্রামের কোন মানুষ অসুস্থ হলে বা কোন বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়লে গ্রামের সবার মাঝে একটা সমবেদনা কাজ করতো। সবাই সম্মিলিতভাবে তাকে সহযোগিতা করতো বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য। যাদের সামর্থ্য ছিল না তারা কিছু না করতে পারার কারণে আফসোস করতো এবং আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করতো। আবার কারো কোনো ভালো খবর শুনলে গ্রামের বা পাড়ার সবাই খুশি হতো। মোট কথা দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের লালন সে সমাজে তৈরি করতো অনেক গুণী লোকের যারা সমাজ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখতো। আজ অতীতের সেই মানবিকতায় পরিপূর্ণ সমাজের চিত্র বর্তমান প্রজন্মের কাছে স্বপ্নের মতো আর বয়োবৃদ্ধদের কাছে শুধুই মিয়¤্রাণ সুখস্মৃতি।

বর্তমানে আমাদের সমাজ এক ভয়াবহ মানবতার সঙ্কট মোকাবেলা করছে। এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত। গ্রামের মানুষের মাঝে যে ঐতিহ্যগতভাবে মিল মহব্বতের যে সুখী পরিবেশ ছিল তা এখন সঙ্কীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করা এবং হীন দলীয় স্বার্থ উদ্ধার আর হিংসা বিদ্বেষের অগ্নিশিখায় ছারখার হয়ে গেছে। সমাজে এমন কোন লোক খুঁজে পাওয়া কষ্টের যে লোক দলান্ধ নয়। আগেও মানুষ দলাদলি করতো তবে সেটা শখ করে এবং বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে সৎ লোকদের নেতা নির্বাচন করতো। যে ব্যক্তি নিঃস্বার্থ সাধারণের জন্য কাজ করতো সেই হতো নেতা। যে যার মতো করে দল করতো কোন ধরনের হিংসা-বিদ্বেষ ছিল না। ভিন্ন দলের লোকের প্রতি কারও কোনো ঘৃণা ছিল না বরং পাশাপাশি বসবাস করতো, থাকতো সবাই কাছাকাছি, একে অপরের সুখে দুঃখের ভাগীদার হতো। এখন দলাদলি হয় টাকা কামানোর মেশিন হিসেবে। আর নিজেকে নেতা বানানোর হীন মানসিকতা নিয়ে। যেন গাঁয়ে মানে না আপনে মোড়ল। প্রতিপক্ষের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা এবং চূড়ান্তভাবে সমাজ থেকে তাকে বের করে দেয়া প্রয়োজনে দুনিয়া থেকে বিদায় করে তার সহায় সম্পত্তি দখল করার জন্য হয় দলবাজি। আগে কোন এলাকায় একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে মারা গেলেও মানুষ ব্যথিত হতো। আর হত্যা! এটার কথা তারা স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারতো না। তারপরও যদি দু’-একটি ঘটতো না তা নয় । সে ধরনের কোন হত্যার যদিও কোন সময় ঘটতো তাহলে সে ঘটনা সমাজের প্রত্যেক শ্রেণী পেশার মানুষের হৃদয়ে গভীর রেখাপাত করতো দাগ কাটতো। তাদের ভেতরে থাকা মানবতাবোধ আর্তচিৎকার করে উঠতো। আর এখন খুন, গুম ধর্ষণ একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার যেন এটা কোন ব্যাপারই না। আগের বাংলাদেশ ছিল গোয়াল ভরা গরু, গোলা ভরা ধান, আর নদী ভরা মাছের। আর এখনকার বাংলাদেশ হচ্ছে গোলা ভরা গাঁজা ইয়াবা আর নদী ভরা লাশের। খালে বিলে নদীতে ঝোপে ঝাড়ে কোথায় পাওয়া যায় না লাশ? চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। শূন্যতা আর হাহাকার সবজায়গায়। ংড়পরধষ ফরংড়ৎফবৎ যাকে বলে তার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে বর্তমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা। সামাজিক সকল বন্ধন এখন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে গেছে।

এখন সৎ লোক দু’ একজন যা আছে তারা তাদের সততা নিয়ে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে কিন্তু তাদের অবস্থা ক্রমে নাজুক হয়ে যাচ্ছে। প্রকাশ্যে অসৎকাজ হয় ক্ষমতাবানদের ছত্রছায়ায়। মিথ্যা আজ সত্যের টুঁটি চেপে ধরছে। জীবননাশের ভয়ে মানুষ সত্য কথা বলা ছেড়ে দিয়েছে। জাতির জাগ্রত বিবেক সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা আজ মিথ্যার কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। আর জাতির সবচেয়ে কার্যকর শক্তি যাদেরকে জাতির সেভ গার্ড বলা হয় সেই যুবসমাজ ভয়াবহ মাদক আর পর্নগ্রাফির নীল দংশনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মানুষের শেষ ভরসাস্থল দেশের বিচারব্যবস্থা সেটাও আজ সরকারের হাতের ইশারায় চলে। সত্যিকারের অপরাধীরা সমাজ পরিচালনা করে। অনেক নিরপরাধ মানুষ ন্যায়বিচারের অভাবে কারাগারের চার দেয়ালে বন্দি। কোন এক মনীষী বলেছেন কোন জাতিকে ধ্বংস করতে হলে তার যুবসমাজকে ধ্বংস করে দাও। আবার কোন একজন বলেছিলেন তুমি যদি কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাও তাহলে তার সংস্কৃতি ধ্বংস করে দাও। মানুষে মানুষে এত বিভেদ এত হানাহানি কিভাবে এই সর্বনাশা ব্যাধির সূত্রপাত হলো। কেনই বা হলো? এই সত্য আমাদের জানা অতীব জরুরি। তা না হলে এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধি বিবেকসম্পন্ন প্রাণী মানুষের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে। আকার আকৃতিতে হয়তো তাকে মানুষ বলা হবে। কিন্তু সত্যিকারের মনুষ্যত্ব তাদের মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বনের পশু আর মানুষের মাঝে কোন ধরনের তফাৎ থাকবে না। তার আগে আমাদের মানবিকতা ও সভ্যতার একটা ধারণা নেয়া জরুরি।

মানবিকতা ও সভ্যতা : সভ্যতা ল্যাটিন শব্দ পরারং থেকে এসেছে যার অর্থ যিনি নগরে বা শহরে বাস করেন। মোটামুটি সমাজের যারা অগ্রসর ও উন্নত জীবন যাপন করে তারাই শহরে বসবাস করে। এর মানে হলো নগরে যিনি বা যারা বাস করে তাদেরকে হতে হবে ন¤্র, ভদ্র, রুচিশীল, বিবেক বুদ্ধির দিক থেকে অগ্রসর। শহরে যারা বসবাস করেন তারা হয় শিক্ষিত মার্জিত উন্নত চরিত্রসম্পন্ন মানুষ। প্রাচীনকালের গোত্রপ্রথা থেকে কালের পরিক্রমায় মানুষ ক্রমান্বয়ে সভ্য হয়েছে। অর্থাৎ গোত্রের মানুষের মাঝে যখন চিন্তার পরিবর্তন এসেছে তখন তাদের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন এসেছে। নিজেদের প্রয়োজনে তারা সভ্যতার জন্ম দিয়েছে। এভাবে সমাজে একত্রে থাকতে থাকতে মানুষের মাঝে একে, অপরের প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা, মমত্ববোধ, দায়িত্ববোধ তৈরি হয়েছে। এই গুণাবলির সমষ্টি মানুষকে মানবিকতার মূল্যবোধে পরিপূর্ণ করেছে। যে বোধ একে অপরের দুঃখে দুঃখী করে সুখে সুখী করে। তাই মানবিকতা ও সভ্যতা একে অপরের পরিপূরক। যে সমাজে মানুষের মাঝে মানবিকতা আছে সে সমাজকে আমরা সভ্য সমাজ বলি। আর যে সমাজে মানুষের মাঝে মানবিক মূল্যবোধের কোন অস্তিত্ব নেই সে সমাজকে আমরা কোনো অবস্থাতে সভ্য সমাজ বলতে পারি না। মানবিকতা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোন ধর্মের, বর্ণের, গোত্রের লোকের জন্য সীমাবদ্ধ নয়।

Antonym of Humanity
নিষ্ঠুরতা (cruelty), অমানবিকতা (inhumanity), নৃশংসতা (atrocity), পাশবিকতা (brutality), অর্থলিপ্সা (avarice), বর্বরতা (barbarity), কুৎসিত কামনালিপ্সা (sadism), হৃদয়হীনতা (heartlessness), নির্মমতা (mercilessness), পৈশাচিকতা (savagery), রূঢ়তা (harshness), নীচতা (meanness)
উপরে বর্ণিত খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলো ভিন্নভাবে বারবার আমাদের সামনে ফিরে আসছে। পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানে যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের কাজের গতি তত বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানুষ তার স্বাভাবিক সত্তা যেন দিন দিন হারিয়ে মনুষ্যত্ব বোধহীন জাতিতে পরিণত হচ্ছে এবং তাতে আমাদের কাছে এই খারাপ বৈশিষ্ট্যগুলোর তিক্ততা ও বিষক্রিয়ার অনুভূতি আরো তীব্র হচ্ছে। এর ফলে বর্তমান সমাজব্যবস্থা এবং বিশ^ব্যবস্থার দিকে তাকালে আমরা মানুষের মাঝে বিরাজমান অস্থিরতাএবং বিবেকহীনতার এক করুণ চিত্র পাবো। সারা পৃথিবী চষে বেড়ানোর প্রয়োজন নেই আমাদের বাংলাদেশের দিকে তাকালে আমরা এর অসংখ্য উদাহরণ খুঁজে পাবো।

মনুষ্যত্ব হারানোর ফলে সমাজের মানুষের মধ্য থেকে হারিয়ে গেছে ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা আর তার স্থলে প্রতিহিংসা, প্রতিশোধপরায়ণতা, লোভ তার স্থান দখল করে আছে। প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার জন্য যেকোন ধরনের- অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করাও এখন নিত্য-নৈমিত্তিক হয়ে গেছে- সমাজের মানুষগুলো যেন হিং¯্র জানোয়ারে পরিণত হয়েছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করাতো দূরের কথা বরং অন্যায়কে ন্যায় বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।

আমরা আইয়ামে জাহেলিয়াতের কথা শুনেছি কিন্তু বর্তমান সমাজের মানবিকতার চরম বিপর্যয় আইয়ামে জাহেলিয়াতেকেও ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান পৃথিবীতে শিক্ষিত মানুষের পরিমাণ বাড়লেও বাড়েনি সভ্য মানুষের সংখ্যা। western country গুলোর মধ্যে যারা নিজেদের সভ্য বলে দাবি করে তারাই চরম বর্বরতা উপহার দিচ্ছে পৃথিবীবাসীকে, বড় বড় অঘটনগুলো তারাই ঘটাচ্ছে।

পৈশাচিক বর্বরতা আর নির্যাতন চালিয়ে একজন মানুষ আর একজন মানুষকে, এক জাতি আর এক জাতিকে কিভাবে নির্মূল করছে ভাবতে গা শিউরে ওঠে। বর্তমানে স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেটের যুগে পৃথিবীব্যাপী মানবতার উপর চলা বর্বরতার ছবি এখন মানুষ সহজে দেখতে পারছে। মানুষ হয়ে মানুষের উপর এমন বর্বর পৈশাচিক নির্দয় আচরণ করতে পারে! সরাসরি প্রত্যক্ষ করছে। এমন অমানবিক বর্বরতার দৃষ্টান্ত।
মানবিকতার এই বিপর্যয়ে কে দায়ী?
মানবতার বিপর্যয়ের জন্য অনেক কারণ আছে। আমি সকল কারণ ব্যাখ্যা করতে চাই না। মোটা দাগে দুটি বিষয় ব্যাখ্যা ও উদাহরণসহ বলতে চাই যা অন্যান্য কারণের মূল উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখে।

প্রথমত, বিশ^পরিস্থিতি আজ বড় উত্তপ্ত। সবাই মানবতার কথা বলে অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার প্রদর্শনী করে যাচ্ছে। কিন্তু মানবতা আজ মরীচিকায় পরিণত হয়েছে। যে পশ্চিমা বিশ^ নিজেদের সবচেয়ে সভ্য জাতি হিসেবে নিজেদের পরিচয় করানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে তারাই তাদের নিষ্ঠুর বর্বরতার মাধ্যমে গোটা মানবজাতিকে এক চরম অনিশ্চিত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রেখেছে। তারা তাদের মোড়লিপনা আর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার এক বন্য উন্মত্ততায় লিপ্ত হয়ে একে অপরের সাথে যুদ্ধে নামতে দ্বিধা করছে না। শুধু তাদের খামখেয়ালিপনা আর অহংকারের কারণে পৃথিবী আজ বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে। বিশে^ আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের সূচনালগ্নে তথাকথিত আত্মস্বীকৃত সভ্যতার ফেরিওয়ালারা পৃথিবীবাসীকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ উপহার দিয়েছিল। এর কয়েক বছর যেতে না যেতে তারাই আবার নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আরও একটি বিশ^যুদ্ধ উপহার দিয়েছিল। এই দুটি বিশ^যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছিল। তথাকথিত সভ্যরাষ্ট্র্র বলে পরিচিত আমেরিকা ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে প্রথম মানবতাবিধ্বংসী আণবিক বোমা মেরে জঘন্য হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল, পঙ্গুত্ব বরণ করেছিল আরো লক্ষ লক্ষ মানুষ। যার নিষ্ঠুর প্রভাব এখনও সেখানের মানুষদের বয়ে বেড়াতে হয়। সেই ভয়ঙ্কর অভিশপ্ত দিন পৃথিবীতে আবার ফিরে আসুক আমরা তা কখনই কামনা করি না। কিন্তু বর্তমানে হিরোশিমা ও নাগাসাকির মত অ্যাটোমিক বোমার আঘাতের মতো ভয়াবহতা না এলেও পৃথিবীব্যাপী মানুষের উপর প্রতিনিয়ত যে ধরনের বর্বরতা সংঘটিত হচ্ছে তার ক্ষত কোন অংশে হিরোশিমা আর নাগাসাকির বিধ্বস্ত মানুষদের চেয়ে কম না। পৃথিবীর দিকে দিকে আজ মজলুম জনতার আর্তচিৎকারে প্রকম্পিত। কিন্তু এই মজলুম জনতার আর্তচিৎকার শোনার কেউ নেই। বরং দিন দিন তাদের উপর নির্যাতনের মাত্রা বেড়েই চলছে।

সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ২০০৩ সালে যখন ইরাকে হামলা চালায় তখন বলা হয়েছিল ইরাক মানবতাবিধ্বংসী মারণাস্ত্র তৈরি করছে যা মানবতার জন্য বড় ধরনের হুমকি। মানবতাকে বাঁচাতে তাদের ইরাক আক্রমণ করা প্রয়োজন! কি নিদারুণ পরিহাস মানবতার সাথে! যে মানবতা রক্ষার জন্য ইরাকে হামলা চালানো হলো সেই হামলায় আমেরিকা নিজেরাই অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করে লক্ষ লক্ষ বনি আদমকে নির্বিচারে হত্যা করে মানবতাকে চরম বর্বরতা উপহার দিয়েছে। বৃদ্ধ, অসুস্থ- সুস্থ, নারী-পুরুষ, নিষ্পাপ শিশুও তাদের পৈশাচিক বর্বরতার হাত থেকে রেহায় পায়নি। দীর্ঘ দুই দশক ধরে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর এবং মারণাস্ত্রের কোনো অস্তিত্ব না পেয়ে একটি প্রতিষ্ঠিত সভ্যতাকে ধ্বংস করে এখন তারা নিজেরাই বলছে ইরাকে হামলা ছিলো সম্পূর্ণ ভুল তথ্যের উপর ভর করে! ভুল তথ্যের উপর ভর একটি সভ্যতাকে ধ্বংস করে, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষকে হত্যা করে এখন জাস্ট কোন অপরিচিত লোকের গায়ে ধাক্কা লাগলে যেমন বলে স্যরি ভুল হয়ে গেছে সেরকম ভাবেই আমেরিকাও বলছে স্যরি ভুল হয়ে গেছে। কী নির্মম তামাশা? কে তাদের জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে? একই ঘটনা তারা আফগানিস্তানে করেছে টুইন টাওয়ারে হামলার অজুহাতে কোনো ধরনের প্রমাণ ছাড়া দায় চাপানো হয় আফগানিস্তানে বসবাসরত ওসামা বিন লাদেনের ওপর। সম্পূর্ণ অন্যায় ভাবে ২০০১ সালে ইঙ্গ মার্কিন যৌথভাবে হামলে পড়ে আফগানিস্তানের উপর। একটি প্রতিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাত করতে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে তারা। দেশ পুনর্গঠনের নামে তাদের পুতুল সরকার বসিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর ধরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে এখন পাততাড়ি গুটিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে রাশিয়া একই কাজ করেছে আফগানিস্তানে। অসংখ্য অগণিত নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ও তাদের গৃহহারা করে মানবতাকে মাটির সাথে মিশিয়ে নির্লজ্জের মতো বলছে স্যরি ভুল হয়ে গেছে। উপরে বর্ণিত ঘটনাগুলো থেকে আমরা এটাই বুঝতে পারি যে বিশ্বের তথাকথিত স্বঘোষিত মোড়লদের ইচ্ছাকৃত চাপিয়ে দেয়া নৃশংসতার বলি হয়েছে অগণিত বনি আদম। এখানে শুধু তাদের সা¤্রাজ্যবাদী নীতি এবং একটি বিশেষ ধর্মের লোকদের দুনিয়া থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ঘৃণ্য মানসিকতাই পৃথিবীকে এই মানবিক বিপর্জয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরকম আরো অসংখ্য ঘটনা এবং ঘটনাপ্রবাহ আছে যা স্বল্পপরিসরে এখানে লেখা আসলেই খুবই কঠিন যা মানবতার বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।

আমাদের সমাজের বর্তমান চিত্র বিশ্ব পরিস্থিতির মতো অনেকটা। বিশ্বের তথাকথিত সভ্যদেশগুলোর শাসকদের থেকে এদেশীয় শাসকগোষ্ঠী অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের গদিকে স্থায়ী করার জন্য সমাজের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চেয়ে গদি রক্ষাকেই বেশি গুরুত্বারোপ করছে। এর জন্য তারা নিয়মনীতি বা ন্যায় ও ইনসাফের তোয়াক্কা না করে দুষ্ট লোকদের লালন পালন করছে যাতে তারা এই শাসক গোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়নক হয়ে ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। এই সুযোগেই দুষ্ট লোকগুলো সমাজের উপর চেপে বসে এমন কোন খারাপ কাজ নেই যা আজ তারা করছে না। তাদের সকল অমানবিক নিষ্ঠুরতা মানবতার উপর চরম অভিশাপ হয়ে সমাজব্যবস্থাকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে।
এক কথায় বলতে গেলে পৃথিবীব্যাপী মানবতার যে বিপর্যয় তার জন্য বিশ্বের তথাকথিত সভ্যতা ও মানবতার ফেরিওয়ালা আধিপত্যবাদী ও সা¤্রাজ্যবাদী অপশক্তিগুলো এবং স্থানীয়ভাবে তাদের দোসরদের ক্ষমতা লিপ্সাই আজকের এই মানবিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী।

দ্বিতীয়ত, মনুষ্যত্ব বোধের বিকাশ হয় সৎগুণের চর্চা ও সৎকাজ করার সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানোর মাধ্যমে। সমাজের মানুষের মধ্যে থেকে যখন সৎগুণের চর্চা বন্ধ হয় এবং ভালো কাজ করার সামান্যতম সদিচ্ছাটুকুও প্রকাশ করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষের মনুষ্যত্ববোধ জাগ্রত করার কোনো পথ খোলা না রেখে বরং রুদ্ধ করার সকল আয়োজন সম্পন্ন করা হয় তখন চরম পন্থা তৈরির পথ উন্মুক্ত হয়, মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়। আর সে সমাজ আর মানুষের সমাজ থাকে না। সেখানে মানবতার তথা মনুষ্যত্বের চরম বিপর্যয় নেমে আসে। মানবতার বাণী সেখানে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। অত্যন্ত হৃদয় ভারাক্রান্ত ভাবে আমরা প্রত্যক্ষ করছি মানুষের মাঝ থেকে সকল প্রকার মানবিক গুণ নির্বাসিত হয়ে যাচ্ছে। আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সব আবিষ্কার মানুষের জীবনে যান্ত্রিক গতি এনেছে ঠিক কিন্তু মানুষ তার সত্যিকার মনুষ্যত্ববোধকে হারিয়ে ফেলেছে। আজকে পৃথিবীব্যাপী সভ্যতার উন্নতির কথা বলা হলেও সামগ্রিকভাবে আমরা সভ্যজাতির ও সভ্য মানুষের কোন অস্তিত্ব দেখতে পাচ্ছি না। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মহান আল্লাহ তায়ালা অতি উত্তম আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এই মানুষ জাতিকে। শুধু উন্নত আকৃতিই দেননি তাকে বিবেক ও বুদ্ধি দিয়ে সকল সৃষ্টির সেরা জীবে পরিণত করেছেন। অথচ মানুষ তাদের সেই বিবেক ও বুদ্ধিকে বিসর্জন দিয়ে পশুর পাশবিকতায় আজ সুখ খুঁজে বেড়ায়।

সুতরাং পরিশেষে বলতে হয় মানুষের পৃথিবীতে যদি সত্যিকারের মনুষ্যত্ববোধ সম্পন্ন মানুষের অভাব দেখা যায় বা মানুষ তাদের বিবেকবুদ্ধি কাজে লাগিয়ে ভালোকে ভালো এবং মন্দকে মন্দ বলার সৎ সাহস না দেখায় তাহলে এই ধরনের মানবতার বিপর্যয় ঘটতেই থাকবে। তাই সকল বিবেকবান মানুষকে আজ ভাবতে হবে তারা কি সত্যিকার ভাবে এই মানবতার বিপর্যয় নিয়ে এগিয়ে যাবেন? না তারা এই অবস্থার পরিবর্তন করে সমাজকে আবারো অকৃত্রিম সৌহার্দ ও সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ করে বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তুলবেন। যদি দ্বিতীয়টি হয় তাহলে এখনই সময় সকল অন্যায়কে রুখে দিয়ে ন্যায় ও সাম্যের পক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখার।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply