মানবাধিকারের শাশ্বত স্বরূপ

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান

বিখ্যাত আইনবিদ Louts Henkin তাঁর ”The International Bill of rights” গ্রন্থের ভূমিকাতে মন্তব্য করেছেন যে,  মানবাধিকার হলো বর্তমানকালের ধারণা। মানবাধিকার সম্পর্কে পশ্চিমা প্রায় সকল আইনবিদের বিশ্বাস এ রকমই। কিন্তু সাধারণভাবে অনুসৃত মানবাধিকার সম্পর্কিত এহেন ধারণা কতটুকু সত্য? মানবাধিকার কি আসলেই বর্তমানকালের ধারণা? ম্যাগনাকার্টা, ফরাসি বিপ্লব-এ সবের পথ ধরেই কি দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনের যথাযথ বিকাশ হয়? আন্তর্জাতিক বা সার্বজনীন মানবাধিকার সংক্রান্ত ধারণার ইতিহাসের সূচনা কেবল ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বরে? এর পূর্বে কি পৃথিবীর মানুষ সার্বজনীন মানবাধিকারের ধারণার সঙ্গে পরিচিতি লাভ করেনি? সমাজে, রাষ্ট্রে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর সফল বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করেনি? এখন থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে তমসায় নিমজ্জিত ধরণীতে আল-কুরআনের আলোকবর্তিকা, রহমতের বার্তা নিয়ে যিনি এই নশ্বর ধরাধামে এসে পৃথিবীকে আলোকিত করে গেছেন সেই রাহমাতুল্লিল আলামীন, সাইয়েদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবীঈন, মানবমুক্তির দূত, সেই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মময় জীবনের ওপর যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা করলে এমন সব তথ্য অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে আমাদের সামনে ভেসে উঠবে যাতে সকলেই বলতে বাধ্য হবেন যে, সার্বজনীন বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের ধারণা দিয়েছেন হযরত মুহাম্মদ (সা), প্রতিটি পর্যায়ে সকলের জন্য মানবাধিকারকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনিই, নিঃসন্দেহে তিনিই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানবদরদি, সার্বজনীন মানবাধিকার ধারণা বাস্তবরূপ পরিগ্রহ করেছিল তাঁর পবিত্র হাতেই। গ. ঘ. জড়ু বলেছেন,  ইতিহাসের রঙ্গশালায় ইসলামের সুমহান অবদান সম্পর্কে আজকের খুব অল্পসংখ্যক মুসলমানই অবগত। যেখানে অধিকাংশ মুসলমানই বিশ্বসভ্যতায় তাদের ধর্ম ইসলাম এবং ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর সুমহান অবদান সম্পর্কে ওয়াকেবহাল নয়, সেখানে পশ্চিমা জগতের ধারণা কেমন হবে তা বলাই বাহুল্য। পশ্চিমা আইনবিদরা হয় ইসলাম ও এর নবী সম্পর্কে অজ্ঞ, না হয় আদর্শিকভাবে তারা ইসলামবিরোধী। আর এ জন্যই মানবাধিকার আইনকে আধুনিককালের বলে চালিয়ে দিয়ে তারা এক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর অবদানকে অস্বীকার করতে চাইছেন।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়। ইসলাম ধর্ম প্রথম স্পষ্ট সুনির্দিষ্ট আকারে সকল মৌলিক অধিকার তথা মানবাধিকার প্রদান করেছে। কিন্তু এ বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ না করে যারা মানবাধিকার আইনকে বর্তমানকালের বলতে চান, তাদের বক্তব্যকে খণ্ডন করার জন্য, সত্যের উদঘাটনের জন্য পাশ্চাত্যে মানবাধিকার আইনের উৎপত্তির ওপর আলোকপাত করা জরুরি।
পাশ্চাত্য আইনবিদগণ মানবাধিকারকে বর্তমানকালের ধারণা বলে মনে করেন- এ কথা আমরা ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছি। তাদের বিশ্বাস মতে ১৯৪৫ সালে প্রণীত জাতিসংঘ সনদ হলো প্রথম দলিল যেটা নাকি মানবাধিকারের ধারণাকে আন্তর্জাতিকরণ  করেছে যদিও এই সনদের কোথাও মানবাধিকার সমূহের উল্লেখমাত্র করা হয়নি। তারপর আসে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর যে দিনটি বিশ্বমানবাধিকার দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। ১৯৪৮ সালের এ দিনে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র তৈরি করা হয়। বিশ্বের মানুষ এখন এটিই স্বীকার করে যে, সার্বজনীন মানবাধিকারের ধারণা মূলত এ সময়েরই। তবে এ কথা ঠিক যে, পাশ্চাত্যে সার্বজনীন মানবাধিকারের ধারণার জন্ম ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে নির্ধারণ করা হলেও প্রকৃত অর্থে এর পেছনেও রয়েছে পর্যায়ক্রমিক একটি ইতিহাস। তবে এ ইতিহাস কোনোক্রমেই ১২১৫ ঈসায়ী সালের পূর্বের নয়।
যে ইংরেজ জাতি নিজেদের ‘সভ্য’ বলে দাবি করে থাকে তারা আসলে কতটুকু সভ্য, তাদের তথাকথিত এই ‘সভ্য’ হবার ইতিহাসই ক’দিনের এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য পাঠকদের জন্য আমি প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য তুলে ধরছি। ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল রাজতন্ত্র। তখন মানুষের অধিকার বলতে কিছু ছিল না। পূর্বে ইংল্যান্ডে মনে করা হতো যে, মানুষকে কোন অধিকার দেয়া বা না দেয়া রাজার স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী সেইসব রাজা মানুষকে মানুষ হিসেবে মনে করত না। রাজাদের নির্মম অত্যাচারে অতিষ্ঠ জনগণ শত শত বছরের করুণ ইতিহাসের পথপরিক্রমায় দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে অবশেষে মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন সময় জন্ম নেয় মানুষের অধিকারসংক্রান্ত কিছু বিল। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ডা. এম এরশাদুল বারী মন্তব্য করেন : মানবাধিকার ধারণার অনেকাংশে বিকাশ ঘটে স্বেচ্ছাচারী শাসকের স্বেচ্ছাতন্ত্রের ফল হিসেবে, যখন অত্যাচারী ও স্বেচ্ছাচারী সরকারসমূহের সকল অবিচার ও অমর্যাদাকর ব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার একটি শ্লোগানে পরিণত হয়। ইংল্যান্ডে মানবাধিকার বিকাশের পথপরিক্রমার চারটি পর্যায় হলো ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস, ১৬৮৮ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৭০১ সালের অ্যাক্ট অব সেটেলমেন্ট।
১২১৫ সালের জুন মাসে ইংল্যান্ডের রাজা জন এবং রাষ্ট্রের বিত্তশালীদের মধ্যে স্বাক্ষরিত এ সনদটিকে মানবাধিকারের চাবিকাঠি বলা হয়। ইংরেজ আইনবিদ Loard chathan মন্তব্য করেন,  পিটিশন অব রাইট, বিল অব রাইট এবং ম্যাগনাকার্টা ইংলিশ সংবিধানের বাইবেল স্বরূপ। ইংল্যান্ডে মানবাধিকারের বিকাশ তথা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার পেছনে যে দলিলটিকে চিহ্নিত করা হয় তা হল ১২১৫ সালের ম্যাগনাকার্টা। কিন্তু এ ম্যাগনাকার্টার পেছনে রয়েছে শত শত বছরের রক্তাক্ত ইতিহাস। নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ এর মাধ্যমে ক্ষমতাসীনদের নিকট হতে যৎসামান্য অধিকার লাভের পথ খুঁজে পায়। অবশ্য যে ম্যাগনাকার্টাকে ইংল্যান্ডে মানবাধিকার আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তা কোন বিচারেই জনগণের সনদ  হিসেবে মর্যাদা প্রাপ্তি দাবি রাখে না। প্রথমত, এটি জনগণের সঙ্গে নয়, বরং প্রভাবশালীদের সঙ্গে রাজার একটি চুক্তি ছিল। দ্বিতীয়ত, এর বিধানসমূহ ছিল রাজকীয় অফিসারদের দ্বারা স্বেচ্ছাচারভাবে কর আরোপ এবং সম্প্রতি আটক বা দখলের বিধান রহিত করা, রাজ্যের মধ্যে ব্যবসায়ীদের চলাফেরার স্বাধীনতা প্রদান, জুরি কর্তৃক বিচার প্রভৃতি। সর্বসাধারণের বিষয়টি এখানে বিবেচনায় আনা হয়নি। বলা হয়  যদিও প্রথমে ম্যাগনাকার্টার লক্ষ্য ছিল রাজাকে ন্যায়পন্থায় শাসন করতে বাধ্য করানো এবং সরকারের অন্যায় আচরণ থেকে ‘ব্যারন’দের রক্ষা করা। কিন্তু তাদেরকে প্রদত্ত অধিকারসমূহের অনেকগুলোই পরবর্তীতে সাধারণ মানুষদের প্রদান করা হয়। সুতরাং যে সনদটিকে ইংল্যান্ডের মানবাধিকার আইনের প্রথম মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, তা প্রকৃত অর্থে জনগণের সনদ ছিল না।
ব্রিটিশ জনগণের মানবাধিকার ইতিহাসের দ্বিতীয় দলিলটি হলো ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস। এই বিলের মাধ্যমে জনগণের কয়েকটি অধিকারকে স্বীকার করা হয়। কিন্তু রাজা কর্তৃক এটি প্রত্যাখ্যাত হতে পারে এ ভয়ে খুব কৌশলে ‘বিল’ আকারে নয়, বরং ‘পিটিশন’ আকারে এটি পেশ করা হয়। এতে মোট ৪টি ধারা রয়েছে। ৪টি ধারায় পর্যায়ক্রমে বলা হয়েছে :
পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া কোনো ব্যক্তির ওপর কর আরোপ করা যাবে না।
কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তিকে জেলে আটক রাখা যাবে না।
সেনাবাহিনীর কোনো দল গৃহকর্তার পূর্ব অনুমতি ছাড়া গৃহে অবস্থান করতে পারবে না, এবং
রাজা বা রানী কর্তৃক আইনে প্রসিডিং এর জন্য কমিশন জারি করা যাবে না।
১৬৮৮ সালে প্রণীত এ বিলের মাধ্যমে রাজা বা রানী কর্তৃক স্বেচ্ছাচারীভাবে আদালত গঠন সংক্রান্ত ক্ষমতা হ্রাস করা হয়। এর দ্বারা রাজার নিকট প্রজাদের আবেদন করা, পার্লামেন্টে সদস্যদের কথা বলা এবং বিতর্কে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়।
১৭০১ সালে প্রণীত এ আইনটিতে মূলত বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা হয়।
আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয় ১৭৭৬ সালে এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়  জন্মগতভাবে সব মানুষ সমান, আর তাদের রয়েছে জীবন ও স্বাধীনতা এবং সুখ অন্বেষণের অবিচ্ছেদ্য অধিকার। আমেরিকার ইতিহাসে এটিই হলো মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রথম উচ্চারণ। তবে আমেরিকার মূল সংবিধানে প্রকৃতপক্ষে বিল অব রাইটস তা অধিকার সংক্রান্ত বিল ছিল না। পরবর্তীতে ১৭৯১ সালে তাদের সংবিধানের প্রথম দশটি সংশোধনী গৃহীত হয় যেগুলো একত্রে ‘বিল অব রাইটস’ নামে পরিচিত। এতে যে সকল অধিকার সংযোজন করা হয়, সেগুলো হচ্ছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশের অধিকার, অভিযোগ প্রতিকারের জন্য সরকারের নিকট আবেদন করার অধিকার, নিরপেক্ষ জুরির মাধ্যমে অনতিবিলম্বে ও প্রকাশ্যে বিচার লাভের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, আইন উপদেষ্টা নিয়োগের অধিকার, নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দেয়ার অধিকার, একই অপরাধে দুইবার শাস্তি না পাবার অধিকার, আইনের চোখে সমান অধিকার, দাসপ্রথার বিলুপ্তি।
১৭৮৯ সালে  মানুষ ও নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কিত ফ্রান্সের ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়। ব্রিটেন এবং আমেরিকায় ঘোষিত মানবাধিকারের আলোকেই এটি প্রণীত হয়। ১৭৮৯ সালের এই ঘোষণা এবং ১৭৯১ সালের ফ্রান্সের রেনেসাঁ উত্তর প্রথম সংবিধানে যে সকল অধিকার প্রদান করা হয় সেগুলো হল, ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার, আইনের চোখে সমান অধিকার, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি ইত্যাদি।
পাশ্চাত্যের আইন ব্যবস্থার ক্রমবিকাশের ওপর আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা বলতে পারি যে, তাদের মানবাধিকারের ইতিহাস বড় জোর ১২১৫ সাল থেকে শুরু হওয়া ইতিহাস এবং এ ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে তারা মানুষের অধিকারসমূহকে স্বীকার করেনি। এ স্বীকৃতি আদায়ের জন্য শত শত বছরব্যাপী রক্ত ঝরাতে হয়েছে। আর একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, মানবাধিকারের সার্বজনীনতায় তারা বিশ্বাস করতেন না, আন্তরিক ছিলেন না। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত পাশ্চাত্যে মানবাধিকার সংক্রান্ত যে সকল দলিল আমরা পাই, সেগুলোর কোনটিই আন্তর্জাতিক তথা সার্বজনীন বা বিশ্বজনীন ছিল না। বলা হয়ে থাকে,  মানবাধিকারের ধারণাটির আন্তর্জাতিকরণ করেছে, জাতিসংঘ সনদ। সকলেই এটি স্বীকার করেন  জাতিসংঘ সনদ (১৯৪৫)-এর আগে মানবাধিকারের ধারণাটি বিশ্বজনীন ছিল না। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে সার্বজনীন, বিশ্বজনীন মানবাধিকারের ধারণা ইতঃপূর্বে আসলেই কি কেউ দেননি, কোন আইনব্যবস্থা তা কার্যকর করেনি এসব প্রশ্নের ওপর আলোকপাত করার আগে আমরা আবার পাশ্চাত্যের মানবাধিকার আইনের ওপর নজর দেবো।
আজকের তথাকথিত সভ্যতার ধ্বজাধারী মানবাধিকারের স্বঘোষিত ধারক হিসেবে যারা আত্মপ্রসাদ লাভ করে, আমরা দেখেছি যে, তারা মানবাধিকার সম্বন্ধে বুঝতে শিখেছে মাত্র সেদিন থেকে। পাশ্চাত্য মানবাধিকারের বিকাশ পর্বে মানবাধিকারের রূপ কেমন ছিল এর ওপর সংক্ষিপ্ত আলোচনা প্রয়োজন। ব্যক্তি মানুষের অধিকার  এখনও স্বীকৃত হয়নি। ‘বিশেষ কারণে’ কিছু ব্যক্তি সমষ্টির অধিকার সম্বন্ধে পাশ্চাত্য সমাজের কণ্ঠ উচ্চারিত হয়। অবশ্য তাদের এ মাথা ব্যথার কারণ ছিল ভিনদেশে তাদের নিজ সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা। কিন্তু তারাই নিজেদের দেশে অপর সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের ওপর অমানবিক নির্যাতন করত। নিন্মে এর উপর সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করা হলো :
ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে গোটা ইউরোপ ব্যাপী ধর্মীয় হানাহানি বিরাজ করে। এসব ধর্মযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ বিরাজমান দেশসমূহে নিজ ধর্মের অনুসারীদের ধর্মীয় স্বাধীনতার জন্য প্রভাবশালী দেশগুলো সোচ্চার ভূমিকা পালন করে। জার্মানিতে রোম ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্টদের ধর্মীয় সম-অধিকার প্রদানের জন্য ১৬৪৮ সালে Peace of westphalla স্বাক্ষরিত হয় যার মাধ্যমে জার্মানিতে ৩০ বছরের ধর্মীয় হানাহানি শেষ হয়। এ শান্তিচুক্তি সম্পর্কে ড. এম এরশাদুল বারী মন্তব্য করেন : উক্ত শান্তিচুক্তির প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল সকলের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদানের পরিবর্তে পক্ষপাতমূলক ধর্মমত প্রতিষ্ঠা করা।
কোন চুক্তির আওতায় কোন রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের অংশবিশেষ অপর রাষ্ট্রের নিকট হস্তান্তরিত হলে নতুন রাষ্ট্রে তারা যেন ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান করা হতো। উদাহরণ, ১৭১৩ সালের নেদারল্যান্ডস চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স হাডসন উপসাগর এবং আকাভিয়া গ্রেট ব্রিটেনের নিকট হস্তান্তর করে। উক্ত চুক্তির ১৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়, সে এলাকার ক্যাথলিকরা এক বছরের মধ্যে ইচ্ছে করলে ফ্রান্সে চলে আসতে পারবে। আর যারা থেকে যাবে তাদেরকে গ্রেট ব্রিটেনের আইনানুযায়ী যতটুকু সম্ভব ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করতে হবে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, এরা সকল ধর্মের অনুসারীদেরকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করত না, কেবল স্ব-ধর্মের কেউ অপর কোন রাষ্ট্রে বৈষম্যের শিকার হলো কিনা তা নিয়ে চিৎকার করত। ডা. এম এরশাদুল বারী এ প্রসঙ্গে খুব সুন্দর কথা বলেছেন :  ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার সকল প্রচেষ্টাই ছিল মূলত একই ধর্মের অনুসারীদের হয়ে তাদের সহ অনুসারীদের প্রচেষ্টা। প্রোটেস্ট্যান্টরা সাধারণত চেষ্টা করত ক্যাথলিক অধ্যুষিত দেশসমূহে প্রোটেসট্যান্টদের ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা। কিন্তু মুসলমান বৌদ্ধ, ইহুদিদের ব্যাপারে এদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
পাশ্চাত্য সভ্যতা প্রকৃতপক্ষে মানুষে মানুষে সমতা নীতিতে বিশ্বাস করে না। বর্তমানে মুখে তারা যত সুন্দর বুলি আওড়াক না কেন  মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করা, তাদের প্রতিপক্ষ মানব সন্তানদেরকে নির্মূল করা, দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করা, এদের আজন্ম খায়েশ। পাশ্চাত্য পাণ্ডিত্যের পুরোধা প্লেটো এরিস্টেটল দাসপ্রথাকে শুধু বৈধতা দান করেই ক্ষান্ত হননি, উপরন্তু মানবসমাজে দাসপ্রথার প্রয়োজন আছে বলে মন্তব্য করেছেন। হাজার হাজার বছরব্যাপী সে সমাজে দাসপ্রথা, দাস বাণিজ্য প্রচলিত ছিল। দাস বাণিজ্য  ছিল তাদের একটি লোভনীয়(!) পেশা। নিকট অতীতে ১৮০২ সালে প্রথমে ডেনমার্কে আমরা দাস প্রথা উচ্ছেদের প্রথম পদক্ষেপ লক্ষ করি। পরে দাস বাণিজ্যকে রহিত করণার্থে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮০৭ সালে একটি বিল পাস করে। এ আইনটি কেবল ব্রিটেনের জন্য ছিল। ১৮৩৩ সালে অবশ্য ব্রিটিশ সা¤রাজ্যভুক্ত সকল অঞ্চলে অনুরূপ আইন প্রণয়ন করা হয়। নেপোলিয়ন ১৮১৪ সালে ফ্রান্সে দাস বাণিজ্য বন্ধকরণের জন্য আইন পাস করেন, যদিও এ আইনটি পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি। সংবিধানের ১৩ শ’ সংশোধনীর মাধ্যমে আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৫ সালে আমেরিকায় দাসপ্রথা রহিত করেন। আর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দাসপ্রথা উচ্ছেদের প্রথম পদক্ষেপ হলো ১৮১৫ সালের ভিয়েনা কংগ্রেস যেখানে কেবল নীতিগতভাবে দাসপ্রথা উচ্ছেদের কথা বলা হয়, কিন্তু এ নীতি বাস্তবায়নের দিন-ক্ষণ ঠিক করা হয়নি। এক্ষেত্রে একটি মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য : বৃহৎ পাঁচটি শক্তির অভিপ্রায় বিশুদ্ধ মানবিকতার চেয়ে অনেকটা কম ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং ল্যাটিন আমেরিকায় দাস ব্যবসা করে উন্নতি লাভ করা, স্পেনের বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তিকে ধ্বংস করা। সুতরাং এটি পরিষ্কার হলো যে, দাসদেরকে ভালোবেসে নয়, বরং বৃহৎ শক্তিগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে দাসপ্রথা উচ্ছেদের জন্য এগিয়ে আসে।
হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর আগমনের পূর্বে পৃথিবীতে এবং তাঁর আগমনের পরও ইসলাম ভিন্ন অপর কোনো ব্যবস্থায় যুদ্ধবন্দীদের প্রতি মানবিক আচরণ করা হয়নি, যুদ্ধাহতদের প্রতি কেউ সহানুভূতি প্রদর্শন করেনি। অবশ্য পাশ্চাত্যের সমাজ ও আইনব্যবস্থা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ঊনবিংশ শতকে এবং বিংশ শতকের প্রথম দিকে যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধাহতদের প্রতি সামান্য নজর দেয়া শুরু হয়। সেনাবাহিনীর সদস্যদের মধ্যে যারা যুদ্ধে আহত হয় তাদের জন্য ১৮৬৪ সালের জেনেভা কনভেনশনের মাধ্যমে কিছু নীতি প্রণয়ন করা হয়। ১৮৬৮ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গ ঘোষণার মাধ্যমে কতিপয় বিস্ফোরক ও দাহ্য বুলেটের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধাহতদের স্বার্থে পশ্চিম বিশ্বে আরও যে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, সেগুলো হল ১৮৯৯ ও ১৯০৭ সালের হেগ কনভেনশন, ১৯৪৯ সালের ১২ আগস্ট জেনেভায় স্বাক্ষরিত ৪টি কনভেনশন ইত্যাদি। কিন্তু এত কিছুর পরও বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? বসনিয়া হার্জেগোভিনা, চেচনিয়া, কাশ্মীরসহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধবন্দী আর যুদ্ধাহত মুসলিমদের আর্তচিৎকারে আল্লাহর আরশ পর্যন্ত কেঁপে উঠেছে। তাছাড়া শুধু মুসলিম বলে নয় সকল যুদ্ধবন্দী আর যুদ্ধাহতদের প্রতিই এরা বড় নিষ্ঠুর। যুদ্ধবন্দীদের গায়ের চর্বি দিয়ে জার্মানিতে সাবান বানানোর লোমহর্ষক কাহিনী কারও অবিদিত নয়। আসলে যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধাহতদের এরা মানুষই মনে করে না।
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হযরত মুহাম্মদ (সা)
প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন : “আমি তো তোমাকে বিশ্ব-জগতের কেবল রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।’’ আর রহমতের নবী, মানবমুক্তির দূূত হযরত মুহাম্মদ (সা) মানুষকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে যখন মানুষের মধ্যে মানবতারোধের কোনো বালাই ছিল না, সমস্ত পৃথিবী যখন অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। সেই সময় রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সা) মানবতাবোধের আলোকবর্তিকা নিয়ে দিশেহারা মানবজাতির নিকট হাজির হন। পাশ্চাত্য সভ্যতা মানবাধিকার সম্বন্ধে বুঝতে শিখেছে এই তো মাত্র সেদিন থেকে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাদের মানবতাবোধের ধারণাটুকুও বিতর্কের ঊর্ধ্বে নয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা পক্ষপাতমূলক ও একপেশে।
হযরত মুহাম্মদ (সা) মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ, চিরন্তন রূপরেখা মানবজাতির সামনে পেশ করেছেন। দিশেহারা, দিগভ্রান্ত, অসহায় নির্যাতিত-নিপীড়িত মানবজাতির মুক্তিকল্পে তিনি সকল ‘মানুষ’ কে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন যা পৃথিবীতে কখনও হয়নি এবং হবে বলেও আশা করা যাবে না। আল্লাহপ্রদত্ত চিরন্তন জীবনপদ্ধতি ইসলাম তিনি দিশেহারা মানবজাতির সামনে পেশ করেন। ইসলামের মানবাধিকার বলতে সেই সকল অধিকারকে বুঝানো হয় যেগুলো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদের প্রদান করেছেন এবং পৃথিবীর কোনো অপশক্তির দ্বারা যেসকল অধিকার কখনও রহিত হয় না, হরন হয় না। এ সকল অধিকার কেউ হরণ করতে পারে না। ইসলামে মানবাধিকারের ধারণা শুধু কোনো ঘোষণার মধ্যে সীমিত নয় বরং এটি প্রত্যেকটি মুসলমানের বিশ্বাসেরও অবিচ্ছেদ অংশ। মানুষকে তার পূর্ণাঙ্গ অধিকারের ঘোষণা প্রদান করেই ইসলাম থেমে থাকেনি, বরং প্রত্যেকটি অধিকার কার্যকর করে মানবজাতিকে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। ইসলাম কোনো ভ্রান্ত বা অপূর্ণাঙ্গ মতবাদ নয়; আর মানুষের মঙ্গল-চিন্তা তার ¯্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের চেয়ে কে বেশি করতে পারে? ইসলাম ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষকে তার ন্যায্য মানবাধিকার দিতে কোনো কুণ্ঠাবোধ করেনি, ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা) তাঁর জীবনব্যাপী সংগ্রাম করে সকল মানুষের সকল ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। জাতিপুঞ্জ, জাতিসংঘ এবং পাশ্চাত্য সমাজের মত মানবাধিকারকে ইসলাম পদদলিত করেনি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে কোনোরূপ প্রতারণার আশ্রয় নেয়নি। হযরত মুহাম্মদ (সা) মানবজাতির সত্যিকার মুক্তির লক্ষ্যে সত্যিকারার্থে সকল মানুষকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করতে যে সমস্ত মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার প্রদান করেন, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখা নিম্নে প্রদান করা হলো :
জীবন ধারণ বা জীবনের নিরাপত্তা লাভের অধিকার মানুষের অন্য সব অধিকারের মূল। কেননা এ ছাড়া অন্য সব অধিকার অর্থহীন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-সংস্কৃতি নির্বিশেষে সব মানুষের জীবনের নিরাপত্তা প্রদান করেছে ইসলাম। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো মতামত, সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় অবস্থান কোনো কারণেই কেউ অপর মানুষের এ মৌলিক অধিকার খর্ব করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে আল-কুরআনের ফরমান :
“নরহত্যা অথবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ব্যতিরেকে কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন পৃথিবীর সমগ্র মানবজাতিকে প্রাণে রক্ষা করল।’’ যথার্থ কারণ ব্যতিরেকে তথা আইনের যথাযথ পদ্ধতি (উঁব ঢ়ৎড়পবংং ড়ভ ষধ)ি ব্যতিরেকে কাউকে হত্যা করাকে ইসলাম নিষেধ করেছে। উপযুক্ত আদালতের সিদ্ধান্ত ব্যতিরেকে কারও প্রাণ হরণ করা ইসলামে পুরোপুরি নিষিদ্ধ। এক্ষেত্রে মহানবী (সা)-এর বহুসংখ্যক হাদিসও রয়েছে। বলা হয়েছে, “অমুসলিম জিম্মীকে যদি কেউ হত্যা করে তাহলে সে বেহেশতের ঘ্রাণও পাবে না।’’ বিদায় হজ্জের ভাষণে প্রিয়নবী (সা) ইরশাদ করেন, “হে লোকসকল! পরস্পরের জানমাল ও ইজ্জত আবরুর ওপর হস্তক্ষেপ তোমাদের জন্য হারাম করা হলো।’’
আইনের দৃষ্টিতে সমতা হল আইনের শাসন এবং মানুষের স্বাধীনতা সংক্রান্ত অধিকারের মূলমন্ত্র। প্রিয়নবী (সা) সকল মানুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা করেন। ধর্ম-বর্ণ-গোত্র- ভাষা প্রভৃতি কোনো কারণে কারও প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ ইসলাম সমর্থন করে না। ইসলামী সমাজব্যবস্থার মূলমন্ত্র হলো সকল মানুষ ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। এ ধারণার ওপর প্রিয়নবী (সা) মানবজাতির সামনে আল্লাহর ফরমান পেশ করেন, ‘‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে। অতঃপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যেন তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার।’’ প্রিয়নবী (সা) ইরশাদ করেন : “কোনো আরবের প্রাধান্য নেই অনারবের ওপর, কোনো অনারবের প্রাধান্য নেই কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর, কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রাধান্য নেই শ্বেতাঙ্গদের ওপর। বরং তোমরা সকলে আদমের সন্তান এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয় মাটি থেকে।
ইসলাম অবশ্য একটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একে অপরের ওপর প্রাধান্যকে স্বীকার করে। প্রিয়নবী (সা) মানবজাতির সামনে আল্লাহর ফরমান পেশ করেন : “নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্মানিত যে সর্বাধিক পরহেজগার।’’ প্রত্যেকের জন্য তাদের কৃতকর্ম অনুযায়ী বিভিন্ন স্তর রয়েছে, যাতে আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিফল দেন। বস্তুত তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। আইনের দৃষ্টিতে সমতা নীতিটি কার্যকর করার পাশাপাশি একে অপরের উপর প্রাধান্য সম্পর্কিত উল্লেখিত মানদণ্ডের মাধ্যমে ইসলাম মূলত প্রত্যেক মানুষকে সৎকর্মে প্রতিযোগী করে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
শুধু জীবনের নিরাপত্তা নয়, বরং মান-মর্যাদার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রদান করেন। মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত-এর মর্যাদা দেয়া হয়েছে। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং এ মানুষ সম্পর্কে ইসলামের ভাষ্য : “নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষকে সর্বোত্তম আদর্শরূপে সৃষ্টি করেছেন।” মানুষের মান-মর্যাদার নিশ্চয়তা প্রদান করতে যেয়ে প্রিয়নবী (সা) আল্লাহর বাণী পেশ করেন : “হে ঈমানদারগণ! কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে এবং কোনো নারী অপর কোনো নারীকে যেন উপহাস না করে; কেননা যাকে উপহাস করা হয় উপহাসকারিনী অপেক্ষা সে উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। তোমরা একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের কেউ কি তার আপন মৃত ভাইয়ের মাংস ভক্ষণ করতে পছন্দ কর? বস্তুত তোমরা তা অপছন্দ কর।’’
ইসলাম এভাবে সকল মানুষের মান-মর্যাদার নিরাপত্তা প্রদান করছে। উল্লেখ্য, নারীর মান-মর্যাদা সংরক্ষণে ইসলাম এবং তার নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশেষ যতœশীল ছিলেন। আল-কুরআনের বাণী তিনি পেশ করেন : “যারা সতী-সাধ্বী, নিরীহ ঈমানদার নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা ইহকাল ও পরকালে ধিকৃত এবং তাদের জন্য রয়েছে গুরুতর শাস্তি।’’
প্রিয়নবী (সা) আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগেই সকল মানুষের সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা একটি সুশীলসমাজ, আদর্শরাষ্ট্র এবং সৌহার্দ্যময় বিশ্ব গড়ার রূপরেখার বাস্তবায়ন করে গেছেন। আল্লাহর ফরমান তিনি বিশ্ববাসীকে শোনান : “তোমরা অন্যায়ভাবে একে অপরের সম্পদ ভোগ করো না এবং জনগণের সম্পদের কিয়দংশ জেনে-শুনে পাপ পন্থায় আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে শাসন কর্তৃপক্ষের হাতেও তুলে দিও না।’’ নবীজী (সা) ঘোষণা করেন : “যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ রক্ষা করতে যেয়ে নিহত হয় সে শহীদ।’’
রাসূলে আকরাম (সা) মানুষকে মতামত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। শুধু তাই নয়, ভয়-ভীতি এবং পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে থেকে সত্য প্রকাশ করা মুসলমানদের ঈমানী দায়িত্ব বটে। আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে : “আর ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভালো কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে।…”
নবীজী (সা) ইরশাদ করেন : “সবচেয়ে সম্মানজনক জেহাদ হল অত্যাচারী শাসকের সামনে সত্য বলা।” সুতরাং ইসলাম কেবল মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাই প্রদান করেনি, বরং এটিকে একটি অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবেও গণ্য করে।
সৎ উদ্দেশ্যে সংগঠিত হওয়ার মৌলিক অধিকার প্রিয়নবী (সা) প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। তবে তা অবশ্যই কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে হবে না। রাসূলে করীম (সা) মানবজাতির সামনে আল্লাহর হুঁশিয়ারি পেশ করেন : “আর তাদের মত হয়ো না, যারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং নিদর্শনসমূহ আসার পরেও বিরোধিতা করতে শুরু করেছে-তাদের জন্য রয়েছে ভয়ঙ্কর আজাব।”
জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের ন্যায়বিচার লাভের অধিকার রাসূলে করীম (সা) প্রদান করেন। এক্ষেত্রে কুরআনি বক্তব্য : “আর যখন তোমরা মানুষের কোনো বিচার মীমাংসা করতে আরম্ভ কর, তখন মীমাংসা কর ন্যায়ভিত্তিক। আমি (নবী) তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে আদিষ্ট হয়েছি।’’
প্রিয়নবী (সা) প্রত্যেক মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ইসলামে আইনের সুস্পষ্ট বিধান ছাড়া কাউকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার, আটক বা বল প্রয়োগ করা নিষেধ এবং একের দায় অন্যের ওপর চাপানো অবৈধ।
প্রিয়নবী (সা) সকল ধর্মের মানুষকে পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করেছেন। ধর্মের ব্যাপারে ইসলাম কারো প্রতি জবরদস্তি করে না। মদীনা নগররাষ্ট্রে কোনো অমুসলমানের প্রতি ধর্মীয় ব্যাপারে জবরদস্তিমূলক আচরণ করা হয়েছে- এ ধরনের তথ্য প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করতে পারে। নবীজী (সা) এদেরকে মুসলমানদের আমানত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। রাসূলে করীম (সা) তাঁর পবিত্র জীবনে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন, তা হলো, ইসলামী রাষ্ট্রে ধর্ম-গোত্র-বর্ণ ইত্যাদি বিদ্বেষের কারণে কোনো ব্যক্তির মৌলিক অর্থনৈতিক চাহিদা যেমন অন্ন, বস্ত্র, বাবস্থান, চাকরি লাভের অধিকার হরণ করা যায় না। নবীজী রাষ্ট্রে সকল মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা লাভের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত মুহাম্মদ (সা) যে রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন করেন, সে রাষ্ট্রের কার্যক্রম চলত পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কার্যে অংশগ্রহণকে মৌলিক অধিকার হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন। এক্ষেত্রে আল্লাহর ফরমান তিনি পেশ করেন : “যারা তাদের পালনকর্তার আদেশ মান্য করে, নামাজ কায়েম করে, পারস্পরিক পরামর্শক্রমে কাজ করেন এবং কাজে কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করুন।’’
নবীজী তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানবসমাজের প্রতিটি সদস্যকে শিক্ষার অধিকার প্রদান করেছেন বললে বোধ হয় ঠিক বলা হবে না, বরং তিনি শিক্ষাকে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক করে মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম একটি অনতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
মানব ইতিহাসে মানবদরদি হযরত মুহাম্মদ (সা) দাস-দাসীদেরকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের অধিকার প্রদান করেন। তিনি দাসপ্রথাকে সমূলে উচ্ছেদ করেন। খাদিজাতুল কুবরা (রা)-এর সঙ্গে তাঁর শুভ বিবাহের সময় আরবের তৎকালীন ঐতিহ্য অনুযায়ী যায়েদকে দাস হিসেবে প্রদান করা হয়। কিন্তু নবীজী (সা) তাঁকে মুক্ত করে দেন। অবশ্য রাসূলে করীম (সা)-এর সাহচর্য ছেড়ে যায়েদ তাঁর নিজের পিতার সঙ্গে যেতে না চাইলে সারাজীবন নবীজী (সা) তাকে এমন মর্যাদার আসনে রাখেন যে, সকলে যায়েদ (রা)কে নবীজীর ছেলে মনে করতেন।
হযরত মুহাম্মদ (সা) যুদ্ধবন্দী ও যুদ্ধাহতদের প্রতি এত চমৎকার ব্যবহার করতেন যার দৃষ্টান্ত পাশ্চাত্য সমাজে আজও কল্পনা করা যায় না। যুদ্ধবন্দীদের তিনি শিক্ষিত ও অশিক্ষিত এ দু’ভাগে ভাগ করে শিক্ষিতদের দায়িত্ব দিতেন অশিক্ষিত মুসলমানদের পড়ানোর এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক মুসলমানকে জ্ঞানের আলো বিতরণের বিনিময়ে তাদেরকে মুক্ত করে দিতেন। আর অশিক্ষিতদেরকে সামান্য কিছুর বিনিময়ে মুক্ত করে দিতেন।
নারীদেরকে তিনি পুরুষদের সঙ্গে কেবল সম-অধিকার নয়, বরং মান-মর্যাদার দিক থেকে তাদেরকে পুরুষদের ওপরে স্থান দেন। নারীদেরকে তিনি সকল অধিকার প্রদান করেন যার মধ্যে মোহরের অধিকার, ভরণ-পোষণের অধিকার, অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অধিকার সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
অধিকার শুধু প্রদান করলেই হয় না; বরং তা বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। অধিকার প্রদান করে তার বাস্তবায়ন না করা মারাত্মক প্রতারণার শামিল। নবী করীম (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতিকে সকল প্রয়োজনীয় অধিকার শুধু প্রদান করেননি, বরং সব ক’টি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বাস্তবায়ন করেন। উপরন্তু, পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে যে, যদি কোনো ব্যক্তি অপরের সঙ্গে প্রতারণা করে এবং অন্যের অধিকার হরণ করে তাহলে পরকালে তাকে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
ইসলামে যে সকল মানবাধিকারের কথা বলা হয়েছে এগুলো পূর্ণাঙ্গ, সার্বজনীন, শাশ্বত ও চিরন্তন। সুতরাং ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকারের ধারণার আন্তর্জাতিকীকরণ করেছে এ বক্তব্য সত্যের অপলাপ বৈ কিছু নয়। তাছাড়া ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্রণীত সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র মানবাধিকারকে সার্বজনীন করেছে এ ধরনের বক্তব্যও ডাহা মিথ্যা। মানবাধিকারের পরিপূর্ণ রূপ দিয়েছে ইসলাম, মানবাধিকারের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করেছেন ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)। মানবাধিকারকে সার্বজনীনতা, শাশ্বত আর চিরন্তন রূপ দিয়েছে আল-কুরআন এবং আল-কুরআনের পথ ধরে মদীনা সনদ, বিদায় হজের ভাষণ, নবীজীর সুন্নাহ ও হাদিস। সুতরাং মানবাধিকার আইনের প্রথম এবং একমাত্র পূর্ণাঙ্গ রূপদাতা মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষে তাঁর পেয়ারা নবী হযরত মুহাম্মদ (সা)।
বক্ষ্যমাণ নিবন্দে আমরা দেখেছি পাশ্চাত্য জগত মানবাধিকার সম্পর্কে টুকটাক বুঝতে শিখেছে ত্রয়োদশ শতক থেকে এবং তাদের স্বীকৃতি মতেই মানবাধিকারের ধারণা তাদের মধ্যে ‘সার্বজনীন’ হিসেবে এসেছে এই তো মাত্র সেদিন বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে। আবার তাদের মানবাধিকার আইনের ক্রমবিকাশ আলোচনা প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি, তাদের এ ধারণা সকল মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাবোধ থেকে আসেনি। তাদের মানবাধিকারের ধারণার স্বরূপ যতটা না মানবিক, তার চেয়ে বহুলাংশে রাজনৈতিক। অথচ আল্লাহর নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) সকল মানুষের প্রতি কেবল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাবোধ থেকে সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পূর্ণাঙ্গ মানবাধিকারের পুরোপুরি নিশ্চয়তা প্রদান করেন এবং তিনি এ মহতী কাজের আঞ্জাম দেন আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে।
শুধু মদীনা নয়, বরং মদিনাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সমস্ত মুসলিম বিশ্বের কোথাও কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবে না। প্রিয়নবী (সা) সকল মানুষের সকল অধিকার ও চমৎকারভাবে প্রতিষ্ঠা করেন যার তুল্য দৃষ্টান্ত আর নেই। আজ জাতিসংঘ সনদ বা সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র মানুষের অধিকার সম্বলিত যে সকল নীতি প্রবর্তন করেছে তা মানবমুক্তির দূত হযরত মুহাম্মদ (সা) প্রদত্ত শিক্ষা ও আদর্শের ছিটেফোঁটা মাত্র। তবে ছিটেফোঁটা নয়, বরং নবীজীর আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণের মাধ্যমেই গোটা বিশ্বের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল সম্ভব।
লেখক : শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply