মানবাধিকার ধারণা, বিকাশ, বর্তমান চিত্র এবং করণীয়

শাহ মাহফুজুল হক #

Rights-Of-Bangladeshমানবাধিকারের আক্ষরিক অর্থ হলো মানুষের অধিকার। সাধারণত মানবাধিকার বলতে মানুষের সেই সকল অধিকার বুঝায়, যা নিয়ে সে জন্মগ্রহণ করে, যা তাকে বিশিষ্টতা দান করে এবং যা হরণ করলে সে আর মানুষ থাকে না। অর্থাৎ মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য যে সকল অধিকার দরকার তাই মানবাধিকার। মানবাধিকার সে সকল অধিকারকে নির্দেশ করে যা স্বাভাবিক ও সহজাত। মানবাধিকার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য এবং সামাজিক জীব হিসেবে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য। মানবাধিকার একটি সহজাত বিষয় যা মানুষ জন্ম নেয়ার সূত্রেই দাবি করতে পারে। মানবাধিকার প্রত্যেক ব্যক্তির মর্যাদাকে সম্মান প্রদর্শনেই নিহিত। মানবাধিকার ব্যক্তিকে স্বাধীনতা, সমতা এবং মর্যাদা নিশ্চিত জীব করে ক্ষমতা দিয়ে থাকে।
Robert L. Barker  বলেন, Human Rights are the opportunity to be accorded the some progressive and obligations as to race, sex, language, or religion. [Robert L. Barker (edit): The Social work Dictionary, NAS, New York, 1995, p.- 173] অর্থাৎ মানবাধিকার হলো কিছু সুযোগ-সুবিধা, যা জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকলের জন্য সমান। সুতরাং মানবাধিকারকে একটা Mechanism or Instrument অথবা মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যায় যা সকল মানুষের জন্য সহজাত ও সার্বজনীন এবং যা ব্যক্তির আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্রগতির জন্য সহায়ক।
মানবাধিকার ধারণার বিকাশ
মানবাধিকার ধারণা কেবল কয়েক দশক ধরে নয় বরং কয়েক শতাব্দী ধরে বিকশিত হয়ে বর্তমান রূপ লাভ করেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫০ অব্দে রাজা হাম্বুরাবি প্রণীত ব্যাবিলনীয় কোড (Babylonian Code) থেকে জানা যায় যে বিপদকালে নাগরিকগণ পরস্পরকে সাহায্য করার কিছু বিধি বিধান তিনি প্রণয়ন করেন। এ ছাড়াও তার  Code of Justice মানবাধিকার সংরক্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দে গ্রিকে দানশীলতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দানের মাধ্যমে মানবাধিকারকে সমুন্নত করার চেষ্টা করা হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রচারিত গৌতম বুদ্ধের নীতি মানবাধিকারের ধারণা বিকাশে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ অব্দে সামাজিক জীব হিসেবে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন বাধ্যতামূলক এই ঘোষণা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মানবাধিকার ধারণাকে শক্তিশালী করে।
ঈসা আ: পরিণত বয়সে (৩০ সালের দিকে) ঘোষণা করেন ‘খ্রিষ্টান ধর্ম তথা বাইবেলের শিক্ষা হচ্ছে ¯্রষ্টার কাছে সবাই সমান’ এ ছাড়াও তিনি Brotherhood of nan under Fatherhood of God ‘¯্রষ্টার নেতৃত্বে সকল মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্ব’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেন যা মানবাধিকার ধারণাকে সুসংহত করে।
৪০০ খ্রি: ভারতে দরিদ্র, অক্ষম ও আশ্রয়হীনদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বিশেষ ধরনের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৫৪২ খ্রিষ্টাব্দে চীন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে ভারতের অনুকরণে এ ধরনের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা হয় যার নাম দেয়া হয় House of God.
তবে মানবাধিকার বিকাশে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হল ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ। এসময় সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে রচিত হয় মদীনা সনদ এবং প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর ইতিহাসের প্রথম কল্যাণ রাষ্ট্র, যেখানে প্রত্যেকের মৌলিক অধিকারসহ মানবাধিকার ছিল সুরক্ষিত। এ সম্পর্কে প্রফেসর Brifault বলেন,   The ideals of freedom for all human beings, of human brotherhood of the equality of all men before law of democratic government by constitution and universal suffrage. The ideals that inspired the French Revolution and the declaration of Rights that guided the Framing of American Constitution and enflamed the struggle of independence in Latin American countries were not invention of the west. They find their ultimate inspiration a source in Quran.. (এহসানুল বারী, আইনের শাষণও মানবাধিকার, পৃষ্ঠা : ১৫-১৬)
১২১৫ : ম্যাগনা কার্টা
ইংল্যান্ডে দীর্ঘদিন রাজতন্ত্র প্রচলিত থাকায় সেখানে মানুষের অধিকার বলতে কিছুই ছিল না। মানুষকে অধিকার দেওয়া বা না দেওয়া ছিল রাজার ইচ্ছাধীন। কিন্তু জনগণের প্রবল আন্দোলনের কারণে রাজার এই স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা অস্তমিত হয় এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
১২১৫ সালে প্রণীত ম্যাগনা কার্টা হলো ইংল্যান্ডে মানবাধিকার বিকাশে সবচেয়ে বড় দলিল। এটি ছিল মূলত ইংল্যান্ড এর রাজা ও ভূ-স্বামীদের মধ্যকার একটা চুক্তি যার অধীনে রাজা প্রজাদের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। ব্রিটেনের পার্লামেন্ট ১৩৫৫ সালে একে অনুমোদন দেয় এবং একটি আইন পাস করে যার অধীন কোন ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা ও ভূমির অধিকার স্বীকৃত হয়। এই চার্টারের ৩৯ অনুচ্ছেদে কোন ব্যক্তিকে বিনা বিচারে জেলে বন্দী না রাখা, কর আরোপ না করা, চার্চের স্বাধীনতা এবং জনগণকে আদালতের আশ্রয় গ্রহণ করার অধিকার প্রদান করা হয়। এতেই জুরির মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা এবং অধিকার রক্ষায় Writ করার বিধান চালু হয়।
১৬২৮ : পিটিশন অব রাইটস : এতে ৪টি ধারা সন্নিবেশিত ছিল :
পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া কোন ব্যক্তির ওপর কর আরোপ করা যাবে না।
কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তিকে জেলে আটক রাখা যাবে না।
সেনাবাহিনীর কোন দল গৃহকর্তার অনুমতি ব্যতীত কারো গৃহে প্রবেশ করতে পারবে না।
রাজা বা রানী কর্তৃক সামরিক আইনে প্রসিডিং এর জন্য কমিশন জারি করা যাবে না।
১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস : বিল অব রাইটস ইংল্যান্ডের সাংবিধানিক আইনের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল এবং এই দলিলের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক সংবিধানে মৌলিক অধিকার সংক্রান্ত বিধানাবলি সংযোজন করা হয়।
১৭০১ সালের Act of Settlement : এর মাধ্যমে সিংহাসনের উত্তরাধিকার নির্ধারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়। এর মাধ্যমে রাজতন্ত্রেও স্বেচ্ছাচারিতা দূর করা ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা : এই ঘোষণায় বলা হয়েছে ‘‘All men are created with inalienable rights to life, liberty, and the pursuit of happiness” এ তে আরও বলা হয় ‘‘যদি কোন সরকার জনগণের এসকল অধিকার হরণ করে তাহলে জনগণের অধিকার থাকবে ঐ সরকার বাতিল করার এবং নতুন সরকার প্রতিষ্ঠা করার।”
আমেরিকান বিল অব রাইটস :
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল সংবিধানে বিল অব রাইটসের অধিকাংশই ছিল অনুপস্থিত। সংবিধান প্রণেতাগণ সংবিধানের মাধ্যমে কেবল মাত্র ক্ষমতারোহণে ব্যস্ত ছিলেন। কিন্তু জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে অবশেষে কংগ্রেসে ১৯৭১ সালে সংবিধানে প্রথম দশটি সংশোধনী গৃহীত হয় যা পরবর্তীকালে American Bill of Rights হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। প্রথম দশটি সংশোধনীতে যে অধিকারগুলো সঙ্কলিত হয় তা হচ্ছে, ধর্মীয় স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার ও তল্লাশির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা, আইনি প্রতিকারের জন্য সরকারের নিকট আবেদন করার অধিকার ইত্যাদি।
ফ্রান্সের Declaration of the Rights of Men and the Citizens 1789: এতে ঘোষণা করা হয়, ‘Men are born and remain free and equal in rights.’ এই রাষ্ট্রীয় ঘোষণায় কার্যত জনগণের সকল মৌলিক অধিকার স্বীকার করে নেয়া হয়।
জাতিসংঘ সনদ
১৯৪৫ সালের ২৪ শে অক্টোবর ৫১টি সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতিসংঘ যার বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৯২। প্রতিষ্ঠার সময়ই গঠিত হয় জাতিসঙ্ঘের সংবিধান যা UN Charter বা জাতিসংঘ সনদ হিসেবে পরিচিত। এই সনদের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এতে মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বাস্তবায়ন ও উন্নয়নের জন্য সংযোজিত হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশেষভাবে এই সনদের মুখবন্ধ, অনুচ্ছেদ ১(৩), ১০, ১৩ প্যারা ১(৯), ৫৫, ৬২, ৬৮ ও ৭৬ নং ধারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তা ছাড়া জাতিসংঘের অধীনন্থ মানবাধিকার কাউন্সিল সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্ব মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

UN Declaration of Human Rights  (বিশ্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা):
জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার ও মানবাধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা অনুমোদন করে। এই মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে ৩০টি অধিকারকে মানবাধিকার হিসেবে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয় এবং এ সকল অধিকার বাস্তবায়নে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণের ঘোষণা দেয়া হয়। এ জন্য UDHR-কে মানবাধিকারের পরশপাথর বা মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মানবাধিকারের মৌলিক বৈশিষ্ট্য বা   মূলনীতি :
সার্বজনীনতা : মানবাধিকার সারা পৃথিবীতে সকল মানুষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষ এই অধিকারগুলো সমানভাবে ভোগ করতে পারবে।
অবিচ্ছেদ্য নিরবচ্ছিন্নতা : যথাযথ বা ন্যায়সঙ্গত কোন কারণ ব্যতিরেকে কোন দেশ বা রাষ্ট্র মানবাধিকারসমূহ বা কোন একটি মানবাধিকারও কখনও কেড়ে নিতে পারবে না।
পারস্পরিক নির্ভরশীলতা : মানবাধিকার সমূহ একটি অপরটির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ও নির্ভরশীল। একটিকে অপরটি থেকে পৃথক করা যায় না। যেমন : সার্বজনীন চিকিৎসা বা শিক্ষার অধিকারটি কোন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর নির্ভর করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা মুক্তি এবং সচেতনতা ছাড়া চিকিৎসার অধিকার পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।
সমতা ও বৈষম্যহীনতা : মানবাধিকারগুলো জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, রাজা, প্রজা ভেদে কোন পার্থক্য করা যাবে না। সকল মানুষ সমানভাবে এই অধিকারগুলো ভোগ করবে।
আইনের শাষণ ও কর্তব্যপরায়ণতা : ব্যক্তির ক্ষেত্রে মানবাধিকারগুলো ভোগ করতে হলে অবশ্যয়ই কর্তব্য পালন করতে হবে। নিজের অধিকার পেতে হলে অবশ্যয়ই অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। আবার রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই জনগণের এই অধিকারগুলো নিশ্চিত করার পজিটিভ Policy গ্রহণ করতে হবে এবং কোন কারণে এই অধিকার লঙ্ঘন করলে জবাবদিহি করতে হবে।
মানবাধিকারগুলোকে ৫ ভাগে ভাগ করা যায়:
১. রাজনৈতিক অধিকার : ভোটাধিকার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার।
২. নাগরিক অধিকার : জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার। মতামত এবং অভিব্যক্তি প্রকাশের অধিকার।
৩. অর্থনৈতিক অধিকার : ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কাজের পরিবেশের অধিকার।
৪. সামাজিক অধিকার : বাসস্থান, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবার অধিকার।
৫. সাংস্কৃতিক অধিকার: প্রত্যেকের নিজ নিজ প্রথা এবং সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকার।

মৌলিক মানবাধিকারসমূহ:
জাতিসংঘ ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার সনদ অনুযায়ী প্রধান প্রধান মানবাধিকার সমূহ নি¤œরূপ :
সমতা এবং বৈষম্যহীনতার অধিকার
জীবন ধারণ এবং স্বাধীনতা লাভের অধিকার
খাদ্যের অধিকার
চিকিৎসার অধিকার
শিক্ষার অধিকার
রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের অধিকার
মতপ্রকাশ ও বাকস্বাধীনতার অধিকার
সমিতি বা সংগঠন করার অধিকার
শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশ করার অধিকার
ভোটাধিকার
ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার
নিজ সংস্কৃতি চর্চার অধিকার
তথ্য পাওয়ার অধিকার
সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ গ্রহণ করার অধিকার
নির্যাতন ও বন্দিদশা থেকে মুক্তির অধিকার
আইনের দৃষ্টিতে সমতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার
স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার
গোপনীয়তার অধিকার
জাতীয়তার অধিকার
বিয়ে ও পরিবার গঠনের অধিকার
কর্মসংস্থান লাভের অধিকার
সামাজিক নিরাপত্তা লাভের অধিকার

মানবাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা : সমতা ও বৈষম্যহীনতার ভিত্তিতে প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে শ্রদ্ধা করা, রক্ষা করা এবং পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের।
১. শ্রদ্ধা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to Respect): বলতে বুঝায় ব্যক্তির প্রাপ্য অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র এমন কিছু করবে না যাতে কোন নাগরিকের অধিকার ক্ষুন্ন হয়।
২. অধিকার রক্ষা করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to protect): যদি তৃতীয় কোন পক্ষ কোন নাগরিকের অধিকার ভোগে বাধা প্রদান করে, রাষ্ট্র সেই বাধা থেকে নাগরিকের অধিকারকে সুরক্ষা করবে।
৩. পরিপূর্ণ করার বাধ্যবাধকতা (Obligation to fulfill) : রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিকের অধিকারগুলোকে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এগুলোকে সহজলভ্য ও উন্নতর করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বা সামাজিক উদ্যোগকে সহযোগিতা প্রদান করতে রাষ্ট্র বাধ্য থাকবে।
৪. পদক্ষেপ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা (Obligation to take step) : নাগরিকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতি সম্মান রেখে যথাযথ পন্থায় ধারাবাহিকভাবে অর্জনের জন্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকার :
আন্তর্জাতিক সার্বজনীন মানবাধিকারগুলোর মধ্যে যে সকল অধিকারগুলো কোন দেশ তার সংবিধানে সংযোজন নেয়, সে সকল অধিকারগুলোকে মৌলিক মানবাধিকার বলা হয়। আমাদের সংবিধানের দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগে এই অধিকারগুলো সম্পর্কিত ধারাগুলো বর্ণিত রয়েছে। তবে শুধুমাত্র তৃতীয় অধ্যায়ের (২৭-৪৪নং) ধারায় বর্ণিত অধিকারগুলোর গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে যার কোন একটি লঙ্ঘিত হলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদালতে রিট করার মাধ্যমে তার অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে।
মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রধান প্রধান আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাংলাদেশের অবস্থান:
চুক্তি বাংলাদেশের অনুমোদন  সকল প্রকার বর্ণবৈষম্য বিলোপ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ, ১৯৬৫ ১১জুন ১৯৭৯  নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৬ ৬ সেপ্টেম্বর ২০০০  অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৬ ৫ অক্টোবর ১৯৯৮  নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ, ১৯৭৯ ৬ নভেম্বর ১৯৮৪  নির্যাতন ও অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক অথবা মর্যাদাহীনকর আচরণ বা শক্তির বিরুদ্ধে চুক্তি, ১৯৮৪ ৫ই অক্টোবর, ১৯৯৮  শিশু অধিকার সনদ, ১৯৮৯ ৩ আগস্ট ১৯৯০  সকল অভিবাসী শ্রমিকদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক সনদ, ১৯৯০ ২৪ আগস্ট ২০০  প্রতিবেশীদের অধিকার বিষয়ক চুক্তি, ২০০৬ ৩০ নভেম্বর ২০০৭  বলপূর্বক অপহরণ বা গুম থেকে সকল ব্যক্তিদের সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সনদ, ২০০৬ এখন পর্যন্ত গৃহীত হয়নি
বর্তমান সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের খন্ডচিত্র
বেঁচে থাকার অধিকার: প্রত্যেক মানুষের স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ও জান-মালের নিরাপত্তা লাভ করার অধিকার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা পত্রের ৩ নং ধারা ও বাংলাদেশের সংবিধানের ৩২ নং অনুচ্ছেদে এই অধিকারের গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানুষের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। যে কোন সময় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী যে কাউকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলছে অথবা ক্রসফায়ারের নাটক সাজিয়ে সরাসরি গুলি করে হত্যা করছে। ইলিয়াস আলী, ওয়ালী উল্লাহ ও মোকাদ্দাসসহ ১১১ জন লোক Enforced Disappearence বা গুমের শিকার হয়েছেন। অধিকারের রিপোর্ট অনুযায়ী পাঁচ বছরে ৭৬৪ জন মানুষ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে শুধু ২০১৩ সালেই নিহত হয়েছে ৩২৯ জন। এছাড়া আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বাড়ি-ঘরে মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। সাংবাদিক সাগর-রুনি, টিভি উপস্থাপক মাওলানা ফারুকসহ প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নিজ গৃহে খুন হচ্ছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি আর পুলিশের গণগ্রেফতারের কারণে রাস্তায় মানুষ চলাফেরা করতে সাহস পাচ্ছে না। এক কথায় বাংলাদেশের প্রায় সকল মানুষ (মন্ত্রী-এমপিরা ছাড়া কারণ তারা সব সময় নিরাপত্তা বেষ্টনীতে থাকে) চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

আইনের দৃষ্টিতে সমতা : গণতন্ত্র, আইনের শাসন, সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা ও বাংলাদেশের সংবিধানের মূল স্তম্ভ হচ্ছে আইনের দৃষ্টিতে সমতা লাভের অধিকার ( UDHR- ৬ ও ৭ এবং সংবিধানের ২৭ নং ধারায় এটি বর্ণিত আছে)। কিন্তু এই সরকারের আমলে দলীয় বিচারক নিয়োগদান, দলীয় স্বার্থ বিবেচনায় আইন প্রণয়ন, বিচারকদের স্বাধীন রায় প্রদানে মন্ত্রী-এমপিদের অযাচিত হস্তক্ষেপ, দলীয় নেতা-কর্মীদের সকল মামলা প্রত্যাহার, ফাঁসির আসামিদের ছেড়ে দেয়া, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা, মৃত্যুদন্ডসহ কঠোর শাস্তি প্রদান। অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে মামলার রায় প্রদান ইত্যাদি কারণে মানুষ আইন ও আদালতের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছে। আইনের আশ্রয় নেয়ার পরিবর্তে আইনকে মারণফাঁদ হিসেবে বিবেচনা করছে সাধারণ মানুষ। বিচার চলাকালীন সরকারের মদদপুষ্ট শাহবাগীদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার আইন পরিবর্তন করে, রিভিউ নিষ্পত্তি না করে ও পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হওয়ার পূর্বেই কাদের মোল্লাকে ফাঁসি প্রদান, জামায়াত-শিবিরের হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে কারাগারে আটক রাখা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া ও মির্জা ফখরুলের বিরুদ্ধে আনীত মামলা বাস্তব প্রমাণ বহন করে।
সরকারি নিয়োগ লাভে সমতা : সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২১ (২) এবং বাংলাদেশের সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদে প্রত্যেকেরই সরকারি চাকরিতে সমান প্রবেশাধিকারের গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে দেশের অধিকাংশ মানুষ বিশেষ করে বেকার যুবকরা এই অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে হতাশাগ্রস্ত হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। সরকারি কর্মকমিশনে দলীয় লোক নিয়োগদানে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ ও নিয়োগবাণিজ্য, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ভাইভায় হওয়ার পরও NSI তদন্তের নামে ভিন্নমতের প্রার্থীদেরকে বাদ দেয়াসহ নামে বেনামে অযৌক্তিক কোটা সিস্টেমের নানা অপকর্মে যোগ্যতা থাকার পরও প্রার্থীরা তাদের প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছে না। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি তে ছাত্রলীগের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা শুধু লিখিত পরীক্ষায় ভালো কর তারপর আমরা তোমদেরকে টেনে নেবো, ভাইভার বিষয়টি আমরা দেখবো।’ এই বক্তব্যই প্রমাণ করে বর্তমান সরকার মেধা নয় বরং শতভাগ দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। এতে করে ছাত্রসমাজ লেখাপড়ার পরিবর্তে লেজুড়বৃত্তির ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে মাদকাসক্তি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, ইভটিজিংসহ নানা সামাজিক অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জাতির ভবিষ্যৎ।

ধর্মীয় স্বাধীনতা
প্রত্যেক ব্যক্তির কোন নির্দিষ্ট ধর্ম অনুসরণ, প্রচার ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ধর্মের ভিত্তিতে কোন বৈষম্য করা যাবে না। UDHR ও বাংলাদেশের সংবিধানে যথাক্রমে ২৭ ও ৪১ অনুচ্ছেদে এই অধিকারের গ্যারান্টি দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ বর্তমানে নিরাপদে ধর্মীয় বিধিবিধান পালন করতে পারছে না। শুধুমাত্র দাড়ি রাখা, টাকনুর ওপর পোশাক পরা, হিজাব পরা, ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া, কুরআন-হাদিস, ইসলামী সাহিত্য পড়া ও তা সংরক্ষণ করার অপরাধে প্রতিনিয়তই অগণিত মুসলিম বিনা বিচারে আটক, বিভিন্ন ধরনের তিরস্কার, বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে খোদ রাষ্ট্রীয়ভাবেই। নামাজ পড়া ও কুরআন-হাদিস শিক্ষা অবস্থায় ঢাবি, রামপুরা, মগবাজার ও মেহেরপুর থেকে শতাধিক হিজাব পরিহিতা নারী গ্রেফতার, রিমান্ড ও কারাগারে প্রেরণ; বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিসহ সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে সার্টিফিকেটের মান ও যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না দেওয়া। কুরআন-হাদিস ও ইসলামী সাহিত্য রাখার অপরাধে হাজার হাজার তরুণকে গ্রেফতার ও নির্মম নির্যাতন এ সরকারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের নমুনা মাত্র।
মিছিল, সমাবেশ ও সংগঠন করার    অধিকার : মানুষ হিসেবে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ করা, সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা অথবা সংগঠনের অধীনে সংঘবদ্ধ হওয়া, কোন দাবিতে মিছিল বা সমাবেশ করা এবং স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করা মানুষের মানবাধিকার। সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ১৯ ও ২০ ধারায় এ অধিকারগুলোকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে (সাংবিধানিকভাবে) বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ নং অনুচ্ছেদে একজন নাগরিককে সভা-সমাবেশ ও সংগঠন করার অধিকার দেয়া হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি সরকার গঠন করার পর থেকে জনগণের এসকল মৌলিক মানবাধিকারগুলোকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে কেড়ে নিয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বৃহত্তম ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যায়ের সকল অফিস। বড় সভা-সমাবেশতো দূরের কথা নেতাকর্মীদের বাসাবাড়িতে ঘরোয়া বৈঠকগুলোর ওপরও গোপন ও নাশকতার পরিকল্পনার বৈঠক নাম দিয়ে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং প্রতিনিয়তই এসব অভিযোগে বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। সরকারের যে কোন অযৌক্তিক নীতি বা পদক্ষেপের বিরোধিতা করা জনগণের মৌলিক অধিকার হলেও বর্তমান সরকার মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের মাধ্যমে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত মিছিল বা প্রতিবাদকে দমিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত আইন শৃংখলা বাহিনী জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেয়ার পরিবর্তে দলীয় বাহিনীর মত ভিন্নমত দমনে জনগণের বুকে গুলি চালাচ্ছে।
ইসলাম ও মানবাধিকার : বিশ্বের ইতিহাসে মানবাধিকারের দলিলসমূহের মধ্যে ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে রাসূল (সা) কর্তৃক প্রণীত মদিনাসনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এটি হচ্ছে পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান। তার আগে কোনো লিখিত সংবিধান কোন রাষ্ট্রের ছিল কি না তা ইতিহাস থেকে সুস্পষ্টভাবে জানা যায় না। এ সংবিধানে বিভিন্ন দিকের কথা বলা হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে রাষ্ট্র কেমন হবে, এর শাসক কে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে এ সনদে বিভিন্ন গোষ্ঠীর কী অধিকার হবে তাও বলে দেয়া হয়েছিল। কাজেই এটি শুধুমাত্র একটি সংবিধানিক দলিল নয়, এটি একটি মানবাধিকার দলিলও।
ইসলামী বিধান নি¤œলিখিত অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা প্রদান করে : স্বাধীনতা, যোগ্যতার ভিত্তিতে সম-অধিকার, নাগরিকদের মাঝে পার্থক্যসূচক বিভেদ না রাখা, সম্পত্তি, বিবেকের স্বাধীনতা, বিবাহ, আত্মপক্ষ সমর্থন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত আইনের দৃষ্টিতে নিষ্পাপ মর্যাদা, সতর্ক না করে শাস্তি আরোপ না করা, নির্যাতন থেকে প্রতিরক্ষা এবং বিদেশী নাগরিককে প্রদেয় রাজনৈতিক আশ্রয়। এসবই আজ থেকে ১৪০০ বছর আগেই আইনগতভাবে নিশ্চিত হয়ে রয়েছে। ইসলাম মানুষকে সর্বোত্তম সৃষ্টি ও আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি বলে উল্লেখ করেছে। তাই ইসলামে মানবাধিকার এমন কিছু মৌলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত যা তার মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিশীল। মোটামুটিভাবে বলা যায় ইসলামে মানবাধিকার পাঁচটি মৌলনীতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত :
১. তার মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিশীল জীবন।
২. মানুষের সত্তাগত মর্যাদা ও মূল্য।
৩. উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ।
৪. দায়িত্বপূর্ণ স্বাধীনতা।
৫. ন্যায়বিচার ও আইনের ক্ষেত্রে সাম্য।
এই মূলনীতিসমূহ সকল মানুষের জন্যই সমভাবে প্রযোজ্য। এই মূলনীতিসমূহের সঙ্গে পাশ্চাত্য মানবাধিকার ধারণার মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যদিও এই মূলনীতিসমূহকে পাশ্চাত্যের আইনবিদগণও গ্রহণ করেন, তবে উল্লেখিত শর্ত ব্যতিরেকেই তা উপস্থাপন করে থাকেন। যেমন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদে জীবনের অধিকার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে স্বীকৃত, কিন্তু উপযুক্ততার বিষয়টি সেখানে উল্লেখিত হয়নি। তেমনি মানুষের মর্যাদা ও সত্তাগত মূল্যের বিষয়টিকে তারা মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করলেও মানুষের প্রকৃষ্টতা ও শ্রেষ্ঠত্বের জন্য আত্মিক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাকওয়া ও ধর্মীয় প্রশিক্ষণের বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি। অনুরূপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ঘোষণায় স্বাধীনতার বিষয়টি শর্তহীনভাবে উল্লেখিত হয়েছে যা মানুষের সত্তাগত মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল নয়। এর বিপরীতে যেহেতু ইসলামে মানবাধিকারের বিষয়টি ঐশী বিশ্বদৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং ইসলাম মনে করে মানুষ এক উচ্চতর লক্ষ্যে সৃষ্ট হয়েছে সেহেতু ইসলামী মানবাধিকারের মূলনীতিও এর সঙ্গে সঙ্গতিশীল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
পাশ্চাত্য আইন বিজ্ঞানের সাথে ইসলামী আইন বিজ্ঞানের আরো একটি পার্থক্যসূচক দিক হচ্ছে, এখানে মানবাধিকারসহ সব ধরনের অধিকারগুলোকে তখনই সুনিশ্চিত মনে করা হয় যখন ইসলামী সমাজ এবং আইনব্যবস্থা সুচারুরূপে ক্রিয়াশীল থাকে, অর্থাৎ ইনসাফের সুউচ্চ ধারণাটি তখনই বাস্তবায়ন করা সম্ভব যখন পুরো সমাজ সুস্থভাবে বাঁচতে সক্ষম হয়। অনৈসলামিক পরিবেশে ইসলাম মানবাধিকার তো দূরের কথা সাধারণভাবে ন্যায়বিচারকেই নিরাপদ মনে করে না।
করণীয় : সারা বিশ্বে এখন মানবাধিকারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়। আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেকটি দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য মানবাধিকার সংস্থা। বিশ্বের যে কোন প্রান্তে মানবাধিকার লংঘনে সোচ্চার হয়ে ওঠে এ সকল সংগঠন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা একচোখা হিসেবে প্রতীয়মান হয়। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটলেও এ সকল পাশ্চাত্য কেন্দ্রিক পরিচালিত মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করে আসছে। এমতাবস্থায় মুসলমানদের করণীয় কী হওয়া উচিত সেটি আলোচনার বিষয়। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেদেরই উদ্যোগী হতে হবে। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঘোষণাসমূহ এবং দেশীয় আইন গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।
জনগণকে তাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার করে তোলা।
সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের দাবি তুলে ধরার প্লাটফর্ম তৈরি করা।
মানবধকিার টিম গঠন করে আপনার অঞ্চলের মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো পর্যবেক্ষণ করা ও সচিত্র প্রতিবেদন আকারে কেন্দ্রীয় মানবাধিকার বিভাগ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নিকট পৌঁছানো।
অঞ্চলের স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের সাথে যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমাদের ওপর পরিচালতি অমানবিক নির্যাতনের চিত্র তাদের রিপোর্টে নিয়ে আসার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
সমাজের অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর (সংখ্যালঘু, পথশিশু, বস্তিবাসী এতিম, শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগণ) অধিকার সুরক্ষা ও আদায়ে অগ্রণী ভূমকিা পালন করা।
জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মানবাধিকার বাস্তবায়নে বিদ্যমান আইনসমূহের যথাযথ প্রয়োগ ও আরো কঠোর আইন প্রণয়নে সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করা।
মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে র‌্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার এর আয়োজনের মাধ্যমে জনগণকে মানবাধিকার সচেতন করে তোলা।
সর্বোপরি, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে হাতে হাত রেখে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় নিয়োজিত হওয়া ।
পরিশেষে বলা যায়, ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসকে সামনে রেখে সবাই নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হওয়া এবং অন্যের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার করা উচিত নতুনভাবে। সর্বোপরি ইসলামের মূল লক্ষ্য সকল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করার মাধ্যমে সমাজ, দেশ, উম্মাহ ও বিশ্বের নেতৃত্ব দেয়ার যোগ্যতা অর্জন করা।

লেখক : কেন্দ্রীয় মানবাধিকার সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply