মানুষ ভালোবাসার আনন্দ । ফেরদৌস হাসান

মানুষকে গ্রহণ করার ভীষণ আনন্দ আছে। এ আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়ে হৃদয়ে। ছড়িয়ে পড়ে জীবনের বাঁকে বাঁকে। জীবন হয়ে ওঠে অন্যরকম সুন্দর। অন্য সুখে ভরে থাকে জীবনের সব। মানুষের সাথে আদান প্রদান এবং বিনিময় মানুষকে মুগ্ধ করে। আপ্লুত করে। আগ্রহী করে। জন্ম দেয় নতুন চিন্তার। নতুন ভাবনার। খুলে যায় এক চিন্তা থেকে অন্য চিন্তার দরোজা। এবং ক্রমাগত বড় হতে থাকে মানুষের পরিসর।
পৃথিবীতে মানুষ সুন্দর! সুন্দরের সাধক মানুষ। মানুষই সুন্দর লালন করে। চর্চা করে। সুন্দরের প্রচার প্রসার ঘটায়। এবং সুন্দর প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লিপ্ত হয়। জগতের সব সৃষ্টি ধারণ করে আছে সুন্দর। সমস্ত সৃষ্টির গভীরে সুন্দরের নদী প্রবাহিত। এভাবে বিশ্বজাহানের সর্বত্র সুন্দর ডানা মেলে আছে। মানুষ এ সুন্দরের প্রতিনিধি। সুন্দরের দর্শক এবং সুন্দরের গ্রাহক। অনুভূতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুন্দরের জয়গান।
সুন্দরকে গ্রহণ করাই সুন্দর। মানুষ সুন্দর বলেই তাকে গ্রহণ করতে হয়। তার কাছে যেতে হয়। তাকে অনুধাবন করতে হয়। অনুধ্যান করতে হয় মিশতে হয় মন থেকে। মনের আঙিনা বিশাল হলে মন হয় খোলা। খোলা মন নিয়ে যেতে হয় মানুষের কাছে। তবেই মানুষকে গ্রহণ করা যায়। মানুষকে ভালোবাসা যায়। গ্রহণ করা না গেলে ভালোবাসাও যায় না। ভালোবাসা ছাড়া কোনো মানুষকে সুন্দরের দিকে ডাকা যায় না। সুন্দরের পথ দেখাতে হলে মানুষকে ভালোবেসেই দেখাতে হবে। হৃদয় দিয়েই ডাকতে হবে। হৃদয়ের কথার প্রভাব বিস্তারিত হয় সহজে। গ্রহণ করাও হয় সহজ।
একজন ভালো মানুষ যিনি তার উচিত যারা ভালো নয় অথবা ভালো বোঝে না তাদের সাথে গভীরভাবে মেশা। তাদের সাথে মতের আদান প্রদান করা। বিনিময় করা। চিন্তার সংমিশ্রণ ঘটানো। এতে ভালো মানুষটাকে বোঝা যাবে। যে মন্দ সে ভালোর উপমা খুঁজে পাবে। দেখবে ভালো কী! বুঝবে ভালোর মাধুর্য। ভাববে নিজেকে নিয়ে। নিজের মন্দ কর্ম নিয়ে! একইভাবে ভালোর মুখটিও দেখবে সে। তখন ভালো হওয়ার চিন্তা করবে সে।
মানুষের সাথে না মিশলে মানুষকে বোঝা যায় না। অধিকার করা যায় না। মানুষের ভেতরে প্রবেশ করা যায় না। মানুষের কথা যদি বলা না-ই যায় মানুষ তা গ্রহণ করবে কিভাবে! এখানেই আদান প্রদানের প্রশ্ন। এখানে মানুষের কাছে যাওয়ার প্রসঙ্গ। একজন সুন্দরের চর্চাকারীর এটুকু বুঝতে হবে। বুঝতে হবে মানুষকে ঘৃণা করে সুন্দরের অনুধ্যান চলে না। কোনোভাবেই ঘটবে না সুন্দরের প্রসার। ঘটবে না তার প্রতিষ্ঠা।
মানুষকে ভালোবাসার মতো আনন্দ জগতে কমই আছে। মানুষের সমাজের মতো সুন্দরও কম আছে পৃথিবীতে। জগতের যা কিছু কল্যাণকর সেতো মানুষই আবিষ্কার করেছে। মানুষের পৃথিবীতে তবুও মানুষ অসহায়। তবুও মানুষ বঞ্চিত। নিগৃহীত। নৃশংসতার শিকার। অধিকারবঞ্চিত। তাদের অধিকার লুট হয়ে যায়। স্বাধীনতা খুন হয়ে যায়। ভোটাধিকার ধ্বংস হয়ে যায়। নাগরিক মর্যাদা থাকে না। নিরাপত্তা থাকে না। কোনো নিশ্চয়তা থাকে না জীবনের। এভাবে মানুষের কাছে বন্দি মানুষ। মানুষের অধিকার হরণ করে মানুষ। মানুষের স্বাধীনতা লুট করে মানুষ। মানুষই মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর আজ। মানুষই মানুষের হন্তারক।
এসবই মানুষকে ভালো না বাসতে পারার ফল। মানুষকে গ্রহণ করতে না পারার দুর্গতি। গ্রহণ করা ভালোবাসা ব্যক্তিক হয়। রাষ্ট্রিকও হয়। রাষ্ট্র অর্থাৎ ক্ষমতাশালী মুখ যদি মানুষকে ঘৃণা করেন। অথবা দেশের সকল মানুষকে তার কল্যাণ চিন্তায় না আনেন। তখনই সমস্যা হয়। এখানেই হয় বিপদটা। এমন বিপদের সীমা থাকে না। এমন অবস্থায় নিরাপত্তা থাকে না কারো। তখন মুখে গণতন্ত্রের বুলি থাকে। বাস্তবে জুলুমতন্ত্র অথবা ব্যক্তিতন্ত্র কাজ করে। ব্যক্তিগত খায়েশ মেটানোর তৃষ্ণা থাকে। থাকে ক্ষমতা প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। এসব প্রতিযোগিতায় দলায় মলাই হয় শুধু মানুষ। বিপন্ন হয় মানুষের সব। স্বপ্ন মরে যায়। সৃষ্টিশীলতা শুকিয়ে যায়। হুমকির মুখে পড়ে মূল্যবোধ। খানিকটা দিশেহারা হয়ে ওঠে মানুষ। এমন পরিস্থিতির শিকার হলে ব্যক্তিমানুষকে দাঁড়াতে হয়। দাঁড়াতে হয় সুন্দরের আনন্দ নিয়ে। সত্যের উদ্ভাসন নিয়ে। ন্যায়ের দণ্ড হাতে তুলে।
একবুক ভালোবাসা নিয়ে যেতে হয় মানুষের কাছে। মানুষের সুখ দুঃখ শুনতে হয়। বেদনায় থাকতে হয় মানুষের পাশে। থাকতে হয় অন্তর খুলে। মন জুগিয়ে। হৃদয় উন্মুক্ত করে। মানুষের মন বুঝতে হবে। মনের কথা বুঝতে হবে। এবং নিজেকে বোঝাতে হবে। নিজের কল্যাণ চিন্তার কথা জানাতে হবে। যিনি সুন্দরের সাধক তার ব্যক্তিগত স্বার্থ কাজ করে না। স্বার্থের পক্ষে লোভ থাকে না তার। তিনি সদা সর্বদা সত্য ও সুন্দরের সঙ্গী থাকেন।
তিনি পথকে ঘৃণা করেন। পাপীকে পাপমুক্ত করার চেষ্টা করেন। নিজের স্বার্থকে উপেক্ষা করেন সব সময়। প্রতিশোধ কিংবা প্রতিহিংসা চরিতার্থ থেকে দূরে থাকেন। তিনি মানুষের ভালোর কথা বলেন। কল্যাণের কথা ভাবেন। ভাবেন মানুষের মুক্তির কথা। মানুষ কিভাবে শান্তির পথে সত্যের পথে থাকবে সেই কথা।
ব্যক্তি মুক্ত হলে হয়তো মুক্ত হয় পরিবার। পরিবার থেকেই আসে সমাজের মুক্তি। সমাজ যেখানে মুক্তি পায় দেশ সেখানে স্বনির্ভর হয়। দেশের শাসন হয় মানুষের কল্যাণের পক্ষে। মানুষের দায় মানুষেরই। যে যা করে তার বোঝা তাকেই বহন করতে হয়। তাকেই বইতে হয় তার ভার। সুতরাং কোনো মানুষের দায় নেই অন্য মানুষের অপরাধ বহন করার। তবে? তবে কথা পরিষ্কার যারা সুন্দরের পথ গ্রহণ করে তারা সাফল্য পেয়ে যান। যারা গ্রহণ করে না তারা ব্যর্থতায় ডোবে। এখানে একজন সত্য চর্চাকারী সুন্দর সাধনাকারীর কোনো রকম দুশ্চিন্তার কারণ নেই। সুন্দর কে গ্রহণ করলো আর কে করলো না এ নিয়ে সুন্দরের কিছু যায় আসে না। সুন্দর চর্চাকারী অথবা সুন্দরের আহ্বানকারীরও নয়। যে গ্রহণ করলো সে সুন্দর হলো। যে গ্রহণ করলো না সে অসুন্দরের নোংরা ডোবায় হাবুডুবু খেলো। এর সমস্ত দায় তার।
কিন্তু সুন্দরের আহ্বানকারীকে হতে হবে মানুষপ্রিয়। যেতে হবে সব ধরনের মত ও পথের মানুষের কাছে। বোঝে না যারা বোঝাতে হবে তাদের। দেখে না যারা তাদের দেখাতে হবে। এবং যারা অনুভব করে না তাদের অনুভূতির জায়গায় নাড়া দিতে হবে। বলতে হবে-এ পৃথিবী মানুষের। মানুষের জন্যই এতো আয়োজন। মানুষের পক্ষেই এত ফুল পাখি আর নদী। এতো রোদ এতো বৃষ্টি আর এতো ছায়ার আরাম। মানুষ না থাকলে কে শুনতো পাখির গান। কে দেখতো ফুলের বাহার। কে অনুভব করতো রোদ বৃষ্টি ও ছায়ার ঘ্রাণ। মানুষ আছে বলেই পৃথিবী এতো সুন্দর। মানুষ বানিয়েছে বাগান। প্রাসাদ। আর নান্দনিক সমস্ত আয়োজন। সুতরাং মানুষ ভালোবাসা পাবে না তো পাবে কে? কাদের জন্য মায়াবী পরশ নিয়ে ছুটে আসে পৃথিবীর বাতাসেরা। বাতাসে ফুলের সৌরভ গ্রহণ করবে কে? নদীর লবণাক্ত পানি চেখে দেখার মানুষ ছাড়া কে আছে? আকাশের মিষ্টি পানির স্বাদ নেবে কে মানুষ ছাড়া?
হায় মানুষ তোমাদের পথগুলো বড় বিচিত্র। তোমাদের ভাবনাগুলো বড় ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তোমাদের কার্যক্রম বেশ স্বার্থপর। তোমরা সত্যকে মিথ্যায় আচ্ছাদিত করো। সুন্দরকে ঢেকে দাও অসুন্দরের চাদরে। জীবনকে দুর্বিষহ করো অকারণ। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে জগতে কেউ বড় হতে পারেনি। পারে না। পারবেও না। প্রতিশোধপ্রবণ মন কখনো উদার হতে পারে না। প্রতিহিংসা নিয়ে সুস্থতার চিন্তা করা যায় না। অন্যায়ের পক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠাও অসম্ভব। হায় মানুষ কি হয় সুন্দরের সান্নিধ্যে থাকলে! কি হয় মানুষকে মুক্তির আনন্দ দিলে! দেখো না মাথার ওপর কি বিশাল শূন্যতা। কি উদার আকাশ! কি বিশাল তার বিস্তৃতি। কত ঝড় ওঠে আকাশের বুকে। কত মেঘ জমে বুকের কাছে। আকাশ কখনো রাগ করে! মন খারাপ করে! বরং মেঘ সরে গেলেই আকাশ তার মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে দেয়। তার প্রাণ খোলা নীল হৃদয় বেরিয়ে আসে। মানুষকে রৌদ্র ও জোছনার আনন্দে জাগিয়ে তোলে। এমন আকাশ মাথায় তুলে ছুটছে মানুষ। অথচ নিজেদের বুকের আকাশ কতটা ক্ষীণ! কতটা ছোট এবং কত হীন সে কথা আর কিইবা বলি।
হে সত্য ও সুন্দরের পথিক তুমি আকাশ ধারণ করো বুকের ভেতর। আকাশের ঔদার্য নিয়ে আসো নিজের কাছ। ঝড়ঝঞ্ঝা ঘূর্ণিতে যেভাবে আকাশ থাকে প্রশান্ত; তুমিও হিংসা-বিদ্বেষ বিসংবাদ ভুলে স্থির হও। ধৈর্যের সঙ্গী হও। মানুষের কল্যাণকামী হও। মানুষকে ভালোবাসতে শেখো। ভালোবাসাতে শেখো তবেই আনন্দিত হবে জীবন। মুখরিত হবে জীবনের সব। সুখের ঔদার্যে জ্বলবে প্রাণের শিখা।
মানুষ নিয়ে ভাবে যারা তাদের ব্যবহার অন্যরকম। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তাদের আচরণ দেখার মতো। তারা মুখে যা বলে বাস্তবে তাই করে। কথা আর কাজের মাঝে কোনো পর্দা থাকে না তাদের। তাদের কাছে কথার মূল্য অনেক। তারা ওয়াদা রক্ষাকারীদের অন্যতম। মানুষ জানবে এ লোকটি নীতির বিষয়ে আপস করে না। অসুন্দর চর্চা করে না। অসুন্দরের প্রশ্রয় দেয় না। যা সুন্দর তাকেই আঁকড়ে ধরেন তিনি। মানুষের দোষ খুঁজে বেড়ান না তিনি। দোষ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন না। মানবীয় দুর্বলতা দেখে উপহাস করেন না। দোষ ক্ষমা করে দেয়ার সাহস রাখেন তিনি। অসুন্দরকে উপেক্ষা করার শক্তি আছে তার। তিনি তার সঙ্গীদের ব্যাপারে সাবধান থাকেন। নমনীয় থাকেন। থাকেন কোমল করুণার সাথে। কঠোরতা বর্জন করেন তিনি। অন্যায় আচরণের ক্ষেত্রে তিনি প্রতিবাদী। বিবেকহীন কাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তিনি কারো অকল্যাণ কামনা করেন না। কারো প্রতি অকারণ বিদ্বেষ পোষণ করেন না। তিনি দায়িত্ববান। কিন্তু ভারমুক্ত। তিনি জানেন জগতে সত্যের মতো সুন্দর কিছু নেই। এবং সুন্দরের মতো সত্যও কিছু নেই।
জীবনকে জীবনের পক্ষে জাগিয়ে রাখার আনন্দ আছে তার। স্বপ্নকে স্বপ্নের দিকে চাগিয়ে দেয়ার হিম্মতে তিনি দৃঢ়। তিনি খুব সহজ জীবনের প্রতিনিধি। খুব সহজেই মিশে যান মানুষের সাথে। তিনি মানুষকে ভালোবাসেন। মানুষও ভালোবাসে তাকে। তার ভালোবাসায় কোনো খাদ নেই। জীবনের প্রতি কোনো খেদ থাকে না। প্রকৃতির মতো তিনি সবার হয়ে ওঠেন। তাকে ভালোরা ভালো জানে। খারাপেরাও জানে ভালো। সবার আস্থায় ভালো হয়ে ওঠার ভাগ্য সবার হয় না। কিছু কিছু মানুষের হয়। এই কিছু মানুষের একজন হয়ে যান আপনিও।
লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply