‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ ও শহীদ মনসুর আহমেদ

এম ফয়সাল পারভেজ #

Shaheed-Monsur‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ ২৯ ডিসেম্বর ২০১৩, অবৈধ ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ২০ দলীয় জোটের এক অহিংস প্রোগ্রাম। সারাদেশের গণতন্ত্রমনা ইসলামপ্রিয় জনতা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য ঢাকা অভিমুখে রওনা হলেও সরকার তা পেশিশক্তি ও বাকশালীয় কায়দায় রুখে দেয় এবং ২০ দলীয়জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গৃহবন্দী করে রাখে।
২৯ তারিখের কয়েক দিন আগে থেকেই সারাদেশের ন্যায় ঢাকা শহরেও যৌথ বাহিনীর অভিযানে সহস্রাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। রক্ষা পায়নি আমাদের মা-বোনেরাও। সেই সাথে বাড়িঘর ও মেসগুলোতে সরকারি বাহিনী ও আওয়ামী নেতাকর্মীরা লুটপাট চালিয়ে সবকিছু নিয়ে যায়। সরকারের হুঙ্কারে সকল রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দেশ ও ইসলামের কথা ভুলে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে পালিয়ে থাকলেও পথে পথে বিভিন্ন পয়েন্টে আওয়ামী বাহিনীর বাধা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি উপেক্ষা করে ২৯ তারিখ সকালে ঢাকার বিভিন্ন স্থানের ন্যায় রামপুরাতেও একত্রিত হয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর উত্তরের তৎকালীন সভাপতি আহমেদ সালমানের নেতৃত্বে মিছিল বের করে শিবিরকর্মীরা। কিন্তু শান্তিপ্রিয় জনতার এ মিছিলে অত্যন্ত পৈশাচিক কায়দায় পুলিশ ও আওয়ামী বাহিনী গুলিবর্ষণ পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকেও হার মানায়। পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই শাহাদতবরণ করেন মরহুম মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান ইসলামী ছাত্রশিবির ঢাকা মহানগর উত্তরের বিমানবন্দর থানার ওয়ার্ড সভাপতি ও সিটি ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের মেধাবী ছাত্র হাফেজ মনসুর আহমেদ। ঘটনায় আহত হয় অর্ধশতাধিক ভাই। উক্ত ঘটনার তিন দিন পর বাড্ডার আফতাবনগর থেকে আহত এবং অচেতন অবস্থায় উদ্ধার হয় গুলশান থানার ওয়ার্ড সভাপতি আতিকুর রহমানকে, যার শরীরের সর্বত্র সিগারেটের আগুনের সেঁকা দেয়া হয় এবং এতো বেশি নির্যাতন করা হয় যে এখনও তিনি স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারেন না।
শাহাদতের খবর টিভিতে শোনার পর শহীদের মা, ভাইবোনসহ সবাই ছুটে যায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় যখন পরিবারের সদস্যরা বারবার মূর্ছা যাচ্ছিল, সান্ত্বনা দেয়ার মতো যখন পাশে কেউ ছিল না ঠিক তখন পুলিশ আরেক নতুন খেলায় মেতে ওঠে। হাসপাতাল থেকে কোনো কারণ ছাড়াই শহীদের বড়ভাই ও ভগ্নিপতিকে গ্রেফতার করা হয়। শহীদের মা-বোনদের জন্য কিছু খাবার নিয়ে বিমানবন্দর এলাকা থেকে শহীদের সহপাঠী আনাস ও মেহেদীকে পাঠানো হয়েছিল কিন্তু অমানবিকভাবে হাসপাতালের গেট থেকে সেদিন তাদেরকেও গ্রেফতার করে হত্যা মামলার আসামি করে কারাগারে পাঠানো হয়। সেদিন গভীর রাতেই পুলিশি পাহারায় শহীদের লাশ চাঁদপুর সদর গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
মনসুর ভাই শাহাদতের মাত্র ছয় মাস আগে চাঁদপুর শহর শাখা থেকে টিসি নিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তরের জনশক্তি হিসেবে আসেন। বিমানবন্দর থানার তৎকালীন সভাপতি মনোয়ার ভাই জামিল মাহমুদ ভাইয়ের সাথে কথা বলে অক্টোবর মাসে প্রথম মনসুর ভাইকে আমার পাঠচক্রে পাঠান। বিষয়টি আমি ভুলে গেলেও শাহাদতের পর জামিল ভাই মনসুর ভাইয়ের বায়োডাটা দেখালে সেদিনের ঘটনাটি মনে পড়ে যায়। মনসুর ভাইয়ের শাহাদতের মাত্র ১৫ দিন আগে অবরোধের সমর্থনে বিমানবন্দর থানার হাজী ক্যাম্পের সামনে থেকে মিছিল বের করলে ছাত্রলীগের সাথে সংঘর্ষ বেধে গেলে আমাদের ১০ জন ভাই আহত হন। সেদিনের ঘটনায় অত্যন্ত সাহসী ভূমিকা পালন করেন শহীদ মনসুর ভাই। শাহাদতের কিছুদিন আগে বার্ষিক দায়িত্বশীল সমাবেশে তার সাথে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। তখনও বুঝিনি তার সাথে আর কখনই দেখা হবে না। শাহাদতের দিন সকালবেলা থানা সভাপতি মনোয়ার ভাইয়ের সাথে বসে নাস্তা করে ছিলেন। মনোয়ার ভাই বলেন, মনসুর ভাই সবসময় আমার কাছ থেকে খাবার চেয়ে খেতেন অথচ সেদিন একটা রুটি শেষ না হতেই বারবার বলতে ছিলেন; ভাই প্রোগ্রামে দ্রুত চলেন, দেরি হলে মিছিল পাওয়া যাবে না।
শহীদ মনসুর ভাই একটা অসাংগঠনিক পরিবারে বড় হয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবে তার শাহাদতের পর তার পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দেয়াটা আমাদের জন্য অনেক কঠিন ছিল। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, শাহাদতের পরপরই পুরো পরিবারকে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই আন্দোলনের পক্ষে কবুল করে নেন। মনসুর ভাইয়ের কফিনের সামনে কাঁদতে কাঁদতে মনসুর ভাইয়ের আম্মা বারবার বলতে ছিলেন; মনসুর সবসময় বলতো মা আমার জন্য দোয়া করিও আল্লাহ যেনো আমাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন, আল্লাহ আজ আমার ছেলের ইচ্ছা কবুল করেছে। ঈদুল ফিতরের পর চাঁদপুরে খালাম্মার সাথে দেখা করার জন্য গিয়েছিলাম। সেদিন চাঁদপুর শহর সেক্রেটারি ইসমাইল ভাই, শহর দফতর সম্পাদক ও শহীদের প্রিয় দায়িত্বশীল রাকিব ভাইসহ মহানগর উত্তরের সবাই গিয়েছিলাম। খালাম্মা সেদিন কাঁদতে কাঁদতে মনসুর ভাইয়ের বিভিন্ন ঘটনা আমাদের সাথে শেয়ার করেছিলেন।
২৯ ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ প্রোগ্রাম সফল না হলেও, শহীদ মনসুর ভাইয়ের রেখে যাওয়া আদর্শকে বাস্তবায়নের জন্য এ দেশের ইসলামপ্রিয় প্রতিটি জনতা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। সেই সাথে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ প্রোগ্রাম এ গণতন্ত্রের জন্য তার ত্যাগ এ জাতি আজীবন স্মরণ রাখবে ইনশাআল্লাহ। একজন মানুষকে হত্যা করে কখনই একটা আদর্শকে হত্যা করা যায় না। যারা মনসুর ভাইকে হত্যা করে এ ভূখন্ড থেকে ইসলামী শক্তিকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে, সময়ের ব্যবধানে তাদের সকল পরিকল্পনা ব্যর্থ করে এ দেশে একদিন কালিমার পতাকা উড়বে ইনশাআল্লাহ।
লেখক : সাবেক সভাপতি, ঢাকা মহানগর উত্তর

SHARE

Leave a Reply