মালদ্বীপ ছোট দেশে বড় ঘটনা

মীযানুল করীম

মালদ্বীপ বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অতি পরিচিত নাম। মাত্র ২৯৮ বর্গ কিলোমিটারের দেশটিতে ১১৯০টি ক্ষুদ্র প্রবালদ্বীপ রয়েছে। মহাসাগর বেষ্টিত ভূখণ্ডে ৩ লাখ ১৪ হাজার মানুষের বাস। শান্ত, সুন্দর, নৈসর্গিক প্রকৃতির মালদ্বীপের রাজনৈতিক প্রকৃতি অনেক দিন ধরে অশান্ত। সম্প্রতি উত্তপ্ত পরিস্থিতির এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে যে, কোনো কোনো ভাষ্যকার রূপকার্থে বলেছেন, ‘মালদ্বীপের চারদিকে আগুন, মাঝখানে জমিন।’ ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভে বহু প্রত্যাশার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটিতে সঙ্কট অব্যাহত থাকায় জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে।
বিশেষত মধ্য জানুয়ারি থেকে মালদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে শুধু বিরোধী দলগুলোর নয়, জনগণের বিরাট অংশেরও অভিযোগ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংবিধান লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার। দেশের অবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ায় মালদ্বীপের অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ মোহাম্মদের অন্যায় গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে। একনিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে তিনি মানুষের আস্থাভাজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। নাশিদ সরকারের একজন তীব্র সমালোচককে বন্দী করে রাখা হয়েছিল। বিচারক আবদুল্লাহ এটাকে বেআইনি বলে গণ্য করে তার মুক্তির নির্দেশ দেন। এ কারণে বিচারক পড়েন নাশিদের ক্ষোভের কবলে। প্রেসিডেন্টের চাটুকার উপদেষ্টারা তাঁকে বোঝালেন, ‘বিচারপতি আবদুল্লাহ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট গাইয়ুমের লোকজনের বিচারের পথে। তথা ওই লোকগুলো যত গণ্ডগোলের গোড়া।’ নাশিদ তাঁকে গ্রেফতার করান, তা-ও পুলিশ নয়, সেনাবাহিনীকে দিয়ে। ক্ষমতার এই অভূতপূর্ব অপব্যবহারে শুধু বিরোধী দল যে বিক্ষুব্ধ হয়েছিল, তা নয়। বিচার বিভাগীয় কমিশন, এমনকি সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, বিচারক মোহাম্মদের আটকাদেশ বেআইনি। পরে নয়া প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ হাসান তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। বিরোধী দলকে বেপরোয়া দমন পীড়ন এবং বিশেষ করে বিচারক গ্রেফতারের পরিপ্রেক্ষিতে সার্ক মহাসচিব দিয়ানা সাঈদ চুপ করে থাকতে পারেননি। মালদ্বীপের এই প্রাক্তন অ্যাটর্নি জেনারেল উদ্ভূত অবস্থায় নাশিদের তীব্র সমালোচনা করেন। গণতন্ত্রের প্রতি দরদ দেখাতে গিয়ে দিয়ানা সার্কের প্রধান নির্বাহী পদে থাকার অধিকার হারিয়েছেন বলে নাশিদ সরকার দাবি করে। ‘সার্ক মহাসচিব এই জোটের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ঘরোয়া ব্যাপারে বক্তব্য দিতে পারে না’Ñ এই ‘টেকনিক্যাল’ কারণে দিয়ানাকে পদত্যাগ করতে হলো। সার্ক এর প্রথম মহিলা মহাসচিব হওয়ার কৃতিত্বের অধিকারী দিয়ানা সাঈদ মাত্র গত বছর এই দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
গণ-আন্দোলনের চরম পর্যায়ে ৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশের একটি অংশ বিদ্রোহী হয়ে জনতার বিক্ষোভে শামিল হয়। তারা সম্মিলিতভাবে অবরোধ করে প্রতিরক্ষা সদর দফতর। নাশিদ তখন সেখানেই ছিলেন। রাতভর ঘেরাওয়ের সময়ে জনতার সাথে সরকারি বাহিনীর তুমুল সংঘর্ষ চলে। রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাসে আহত হয় অনেকে। পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না দেখে নাশিদ সকালে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি গ্রেফতারি এড়িয়ে দেশেই আছেন। তবে পরিবার পালিয়ে যায় শ্রীলঙ্কায়।
নিয়মমাফিক ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ হাসান (৫৮) প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি মালদ্বীপের প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। ইংরেজি সাহিত্যে লেবাননে এবং পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর অধ্যয়ন করেছেন তিনি। জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনকে ওয়াহিদ বেশ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নাশিদের লোকজনকে পাইকারি গ্রেফতারের অভিযোগে তার সমর্থকরা অন্তত ১৮টি থানা জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং বহু আদালত ভবন ও সরকারি কার্যালয় ধ্বংস করেছে। অনেক যানবাহন হয়েছে ভাঙচুর। গণতন্ত্রের প্রবক্তা নাশিদের কর্মীদের এহেন চরম অগণতান্ত্রিক সহিংসতার খবর প্রকাশিত হয় ১৫ ফেব্রুয়ারি। এএফপি উল্লেখ করে যে, এসব তৎপরতা মালদ্বীপের অস্থিতিশীলতা এবং দেশটির ক্ষতি বৃদ্ধি করবে। নাশিদ চাচ্ছেন ওয়াহিদকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে টেনে নামাতে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে ওয়াহিদকে স্বীকৃতি দিয়ে পরে দোদুল্যমান ভূমিকা নেয়ায় নাশিদের একগুঁয়েমি প্রশ্রয় পেয়েছে। বিশেষত তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ নাশিদ। তাঁর ক্ষমতায় আরোহণ একাধিক কারণে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ক) মালদ্বীপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী হন রাষ্ট্রপতি পদে। খ) তিনি হারিয়েছিলেন মামুন আবদুল গাইয়ুমের মতো প্রবীণ নেতাকে, যিনি একটানা ৩০ বছর প্রতাপের সাথে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। গ) নাশিদকে মনে করা হতো ‘পরিবর্তনের দিশারি,’ যিনি এই দ্বীপপুঞ্জে গণতন্ত্রের পূর্ণতা প্রদান করবেন।
বাংলাদেশের সাথে মালদ্বীপের মিল আছে বেশ কিছু। তাই দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা আমাদের জন্য গুরুত্ববহ ও শিক্ষণীয়। দেশটি আমাদের মতোই মুসলিম অধ্যুষিত। দৈহিক গঠন ও আয়তনেও বেশ মিল রয়েছে। বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ, উভয়ই দক্ষিণ এশীয় রাষ্ট্ররূপে সার্কের সদস্য। দুই দেশই আগে ছিল ইউরোপীয় শক্তির উপনিবেশ এবং তা-ও একই রাষ্ট্র, ব্রিটেনের অধীনে। মালদ্বীপেও বাংলাদেশের মতো ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়, যাতে ‘ব্যালট বিপ্লবে’ প্রেসিডেন্ট হন মোহাম্মদ নাশিদ। সে দেশে প্রেসিডেন্ট যুগপৎ রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান, অর্থাৎ অনেক ক্ষমতাবান। নাশিদ পরিবর্তনের প্রবক্তা হিসেবে বিশেষ ইমেজের অধিকারী ছিলেন। জনগণের সঙ্গত প্রত্যাশা ছিল, তিনি গণতন্ত্রকে বিকশিত এবং সুশাসন কায়েম করবেন। বাস্তবে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়ন, সংবিধান লঙ্ঘন প্রভৃতি কারণে জনগণ শুধু হতাশ নয়, প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ। সরকারের আর্থিক অব্যবস্থাপনায় বাজেট ঘাটতির পরিণামে দ্রব্যমূল্য অনেক বেড়ে গেছে। নাশিদ আধুনিক ও প্রগতিশীল মালদ্বীপ গড়তে গিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হয়ে জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবাধে আঘাত হেনেছেন। মালদ্বীপের এবারের ঘটনা আকস্মিক নয়। অনেক দিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ জমা হয়েছিল। একটার পর একটা কারণ যোগ হয়ে মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনা।
এক্ষেত্রে ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মালদ্বীপের শত ভাগ মানুষ মুসলিম। সুদূর অতীতে আরব বণিকদের মাধ্যমে এখানে ইসলামের বিস্তার। এর প্রভাব কত গভীরে প্রোথিত, তা মালদ্বীপের ভাষার আরবিলিপি এবং দ্বীপগুলোর আরবি বর্ণ দিয়ে নামকরণ থেকেও স্পষ্ট। এ দিকে বছরে আসছেন ৯ লাখ বিদেশী পর্যটক। তাদের আরো আকৃষ্ট করতে ঊীপষঁংরাব ুড়হব তৈরি হয়েছে। সেখানে মালদ্বীপের ইসলামী বিধানের প্রয়োগ নেই। যদিও এ দেশের নাগরিকদের ওসব এলাকা থেকে দূরে রাখা হয়, তবু পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতি ও উচ্ছৃঙ্খলতার প্রভাব কিছুটা তো পড়বেই। ইতোমধ্যেই তরুণদের মাঝে ব্যাপক মাদকাসক্তিসহ অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির বিষয় মালদ্বীপের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অপর দিকে বিগত প্রেসিডেন্ট নাশিদ নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ দেখিয়ে পশ্চিমা জগতের আস্থা কুড়াতে ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন বলে নাগরিকদের অভিমত। দেশের ১০০ ভাগ মানুষ মুসলমান। তবুও তিনি গির্জা ও মন্দির নির্মাণ করতে দিয়েছেন। মালদ্বীপে অনেক ক্ষেত্রে শরীয়াহ আইন প্রচলিত। যেমন, বিবাহিতা নারীর ব্যভিচারের শাস্তি বেত্রাঘাত। সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনপ্রধান নাভি পিল্লই সফরে এসে অহেতুক এর সমালোচনা করলেন। ফলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং নাশিদবিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে ওঠে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, মালদ্বীপের রাষ্ট্রধর্ম ইসলামতো বটেই, যে ক’টি দেশের জাতীয় পতাকা ইসলামের প্রতীক নতুন চাঁদ শোভিত, মালদ্বীপ তাদের একটি। যা হোক, সার্ক শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে ভাস্কর্য স্থাপনকেও ধর্মভীরু মানুষ মেনে নেয়নি। তারা এটাকে ইসলামবিরোধী পৌত্তলিকতার নিদর্শন বলেই মনে করে। তদুপরি, মুসলিম বিশ্বের মনোভাবের বিরুদ্ধে গিয়ে নাশিদ ইহুদিবাদী ইসরাইলের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এতে জনমত আরো প্রবল হয় তাঁর বিরুদ্ধে। এসব কারণ ও উপাদান মিলে পরিস্থিতিকে গণ-অভ্যুৎত্থানের পর্যায়ে নিয়ে যায়। এর ধাক্কায় নাশিদের পতন ঘটেছে ক্ষমতার মসনদ থেকে। মালদ্বীপের পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল রূপ নিচ্ছে। পদত্যাগী প্রেসিডেন্ট নাশিদের ভূমিকার সাথে বাইরের কোনো কোনো মহলের মনোভাব যোগ হয়ে দেশটির সঙ্কট নিরসনকে কঠিন করে তুলছে। নাশিদ স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে ভালো কথা শুনালেন। টিভি ভাষণে জাতিকে বললেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আমার পদত্যাগ দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। আমি রক্তপাত দেখতে চাই না। দেশ চালাতে চাই না লৌহমানবের ন্যায় কঠিন হস্তে। তাই আমি প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করছি।’ নাশিদের এই প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত বেশ প্রশংসিত হয়। নতুন প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ এবং বিরোধী দল এ জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানায়। ওয়াহিদ বলেন, ‘নাশিদ সঠিক কাজই করেছেন। কারণ তিনি দেশকে বাঁচিয়েছেন রক্তপাত থেকে।’
কিন্তু পরদিনই নাশিদের কণ্ঠে একেবারে উল্টো সুর বেজে ওঠে। রাতারাতি ভোল পাল্টে ফেলেন তিনি। পরিবর্তনের কাণ্ডারি হিসেবে অতীতে গণরায়ধন্য এই নেতা নিজ বক্তব্য পুরো পরিবর্তন করে দোষ চাপালেন সেনাবাহিনী ও নতুন প্রেসিডেন্টের ঘাড়ে। নাশিদের অভিযোগ, ‘স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। আমাকে বন্দুকের নলের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে।’ কিন্তু সেনাবাহিনী জানিয়ে দিয়েছে, দেশে কোনো ক্যু বা অভ্যুত্থান হয়নি। আমরা ক্ষমতা দখল করিনি। আমরা নাশিদকে শুধু পরামর্শ দিয়েছি পদত্যাগের জন্য। তা ছাড়া সেনাবাহিনীর ওপর নাশিদের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলেই প্রতীয়মান হয়েছিল। সাধারণত অগণতান্ত্রিক সামরিক শাসকরাই সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু মালদ্বীপের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট হয়েও নাশিদ সম্প্রতি সৈন্যদেরকে দিয়ে অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতিকে গ্রেফতার করালেন। এটা ছিল সংবিধানপরিপন্থী এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধপ্রসূত। নাশিদের বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ চরমে ওঠার এটা বড় কারণ।
উত্তরসূরি ওয়াহিদকে গালমন্দ করতেও নাশিদ দেরি করেননি। ওয়াহিদ তাঁকে গ্রেফতার করেননি পরোয়ানা জারি হওয়া সত্ত্বেও। অথচ নাশিদ বলেছেন, ‘ওয়াহিদ আগে থেকেই চাচ্ছিলেন প্রেসিডেন্ট হতে। তাই প্রথম সুযোগেই সে পদটি দখল করেছেন।’ ওয়াহিদ কিন্তু সংবিধানমাফিক প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েছেন। অথচ নাশিদ বিচারক গ্রেফতার করিয়েছেন সংবিধান লঙ্ঘন করেন। ক্ষমতা ছাড়ার পর তিনি ওয়াহিদকে পদত্যাগ করা এবং এখনি নতুন নির্বাচন দেয়ার জন্য বললেন। এটাও সংবিধানসম্মত নয়। বিরোধী দলের অন্যতম নেতা হাসান সাঈদ নাশিদকে গ্রেফতার করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘তিনি প্রায় সময়ে সংবিধান লঙ্ঘন করতেন। এটা থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হলেও তিনি শোনেননি। তিনি সংবিধান রক্ষার শপথ ভঙ্গ করেছেন।’
এমন একজন সংবিধান লঙ্ঘনকারী তথা জনগণের আস্থার অবমাননাকারীর উত্থাপিত কথিত ক্যুর অভিযোগকে কমনওয়েলথ কেন গুরুত্ব দিচ্ছে, তা এক বিরাট প্রশ্ন। তার দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ থাকলেও কমনওয়েলথ বা আর কোনো সংস্থা বা ফোরাম তদন্তের গরজ দেখায়নি।
১২ ফেব্রুয়ারি কমনওয়েলথ মিনিস্টারিয়াল অ্যাকশন গ্রুপ ঘোষণা দিয়েছে, তারা মালদ্বীপের ক্যু বিষয়ে তদন্তে নামবে। ৫৪ সদস্য দেশের কমনওয়েলথে ৯ সদস্যের এই অ্যাকশন গ্রুপ প্রভাবশালী হিসেবে গণ্য। তারা সদস্য দেশগুলোর গুরুতর রাজনৈতিক সঙ্কট নিয়ে কাজ করে থাকে। প্রেসিডেন্ট ওয়াহিদ এই তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, ‘তারা এসে যেন আসল ঘটনা দেখে যান। আমরা চাই, অন্যরাও আসুন মালদ্বীপে।’
যুক্তরাষ্ট্র তার দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট ব্রেককে মালেতে পাঠিয়েছে। একই রকম গুরুত্বপূর্ণ মিশনে ভারতের বিশেষ দূতও গেছেন সেখানে। অর্থাৎ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৃহৎ শক্তিরা মালদ্বীপ নিয়ে খেলতে আগ্রহী। কূটনৈতিক এবং ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বের কারণে তারা মালদ্বীপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন নিজ নিজ স্বার্থেই।
মালদ্বীপের ব্যাপারে ভারতের বিশেষ নজর রয়েছে, যেমন আছে শ্রীলঙ্কা, নেপালÑ এমনকি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। ১৯৮৮ সালে একটি অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সূত্রে ভারত ‘ত্রাতার’ ভূমিকা পালনের সুযোগ পেয়েছিল এই মালদ্বীপে। এখন রাজনৈতিক সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে দিল্লি মালদ্বীপের কাছে নিজের অপরিহার্যতা প্রমাণ করতে চাওয়াই স্বাভাবিক। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, সেই ‘নেহরু ডকট্রিন’ প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করে থাকে এখনো ভারতের অনেকে। এই ডকট্রিনই দিল্লির আধিপত্যবাদী মানসের প্রেরণা। এর দিকনির্দেশনায় ভারত নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুরব্বি এবং পুরো উপমহাদেশের একক মহারাষ্ট্র হিসেবে মনে করে। মালদ্বীপে ডিসেম্বরের শেষভাগে এবারের রাজনৈতিক সঙ্কটের সূচনা। সেখানে গণবিক্ষোভ জমে না উঠতেই জানুয়ারি মাসে একজন ভারতীয় এমপি মালদ্বীপের মতো একটি স্বাধীন দেশকে ভারতের অধীনে আনতে বললেন। এটা মূলত কোনো হঠকারী লোকের বিচ্ছিন্ন ভাবনা নয়। ঐতিহাসিক-ভাবেই ভারতের বর্ণবাদী ও আর্য-অধ্যুষিত শাসকগোষ্ঠীসহ প্রভাবশালীদের একটা বড় অংশ মনে করে, উপমহাদেশে উপগ্রহতুল্য অন্যান্য দেশের ওপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের সহজাত অধিকার রাখে গ্রহরূপী ভারত। এমনকি ভারত মহাসাগর এবং এর বুকে অবস্থিত ভূখণ্ডগুলোতেও ভারতীয় প্রাধান্যকে স্বাভাবিক ও সমীচীন বলে গণ্য করা হয়।
ভারতের পূর্বোক্ত পার্লামেন্ট সদস্যের নাম অনিল কুমার, যিনি আগে সশস্ত্রবাহিনীর অফিসার ছিলেন। ১২ জানুয়ারি তারিখে জবফরভভ ঘবংি পত্রিকায় তিনি লিখেছেন ‘মালদ্বীপের উচিত ভারতের সাথে মিশে যাওয়া। আমাদের জাতীয় স্বার্থেই ভারত তাকে এ জন্য প্রস্তাব দেয়া প্রয়োজন।’ কেন এখন বিশেষ করে এই দ্বীপপুঞ্জের ভারতভুক্তির আবদার, তার কারণও অনিল উল্লেখ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘ভারত মহাসাগরে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থায় মালদ্বীপ হবে নিউক্লিয়াস বা প্রাণকেন্ত্র। আর (সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে গিয়ে) সলিলসমাধি লাভের আগেই মালদ্বীপের মানুষকে দেশান্তরী হতে হবে।’ উল্লেখ্য মালদ্বীপের আয়ের প্রধান খাত পর্যটনশিল্পে ভারতের ব্যবসায়ীদের প্রায় একচেটিয়া দাপট। মালদ্বীপের ঘটনাবলির ব্যাপারে একটা বিষয় লক্ষণীয়। তা হলো, সেখানকার বিরোধী দল যেমন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এর সুফল পেতে চায়, তেমনি দেশটির ভেতর বাইরের কথিত উদার ও ধর্মনিরপেক্ষরা নাশিদকে অসাম্প্রদায়িক মহান ব্যক্তিত্ব এবং আধুনিক মালদ্বীপের জনক হিসেবে প্রতিপন্ন করতে তৎপর। তারা নাশিদের ক্ষমতাচ্যুতির জন্য ইসলামপন্থীদের দায়ী করে মৌলবাদের জুজুকে প্রধান সমস্যা বলে তুলে ধরতে চাচ্ছেন। এটা আসলে নাশিদের অন্যায় অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ এবং ব্যর্থতা- অযোগ্যতা ঢাকার সুচতুর প্রয়াস।
রাজনৈতিক মতভেদ ও বিতর্ক থাকবে; বিভিন্ন দলের মাঝে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে মালদ্বীপকে। নেতার চেয়ে দল এবং দলের চেয়ে দেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। কোনো মহলের অদূরদর্শিতা ও সঙ্কীর্ণতার দরুন এমন সঙ্কট যেন তৈরি না হয় যে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ভারত, আমেরিকা কিংবা আর কোনো বহিঃশক্তি বা বাইরের ফোরাম নাক গলিয়ে অন্যায় প্রভাব ফেলার যাতে সুযোগ না পায়, সে দিকে সবিশেষ সতর্কতা আবশ্যক। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ চায়, মালদ্বীপে শান্তি-সম্প্রীতি বিরাজ করুক। তাদের প্রত্যাশা, সে দেশে গণতন্ত্র বিকশিত হবে এবং মালদ্বীপের জনগণ উত্তরোত্তর উন্নতি, সমৃদ্ধি ও সার্বিক কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবেন। উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশ সরকার সাংবিধানিক পন্থায় মালদ্বীপ সঙ্কটের নিরসন কামনা করেছে। ১০ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশ আশা করছে, মালদ্বীপে সংশ্লিষ্ট সবাই সংযম অবলম্বন ও সহিংসতা পরিহার করবেন এবং আইনের শাসন সমুন্নত রাখবেন।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply