মাহে রমজান আত্মগঠনের অনন্য এক মাস । ড. মোবারক হোসাইন

মাহে রমজান আত্মগঠনের অনন্য এক মাস । ড. মোবারক হোসাইনমাহে রমজান মুসলিম জাতির প্রতি মহান আল্লাহর সীমাহীন অনুকম্পা ও অনুদান। দীর্ঘ এক বছর পর পবিত্র মাহে রমজান আমাদের নিকট সমাগত। রাসূলুল্লাহ (সা) এ মাসকে ‘শাহরুন মোবারক’ তথা ‘বরকতময় মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। এ মাসে আল্লাহ তা’য়ালা মানবজাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উন্নতি ও কল্যাণের মূলভিত্তি তাকওয়াপূর্ণ জীবনগঠনের অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সূরা আল-বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে সে ধ্বনিই অনুরণিত হয়েছে, যা আন্দোলিত করে আমাদের হৃদয়তন্ত্রীকে। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” সাওম যেমন ক্ষুধায় কাতর দুঃখী মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে, তেমনই শিক্ষা দেয় ধৈর্য, একনিষ্ঠতা, ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির। প্রেরণা জোগায় শোষণ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত একটি আদর্শিক সমাজ গড়ার। আর দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসে সংঘটিত বদর যুদ্ধে কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের ইতিহাস আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে ইসলামবিরোধী সকল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।
মাহে রমজান ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আত্মগঠনের জন্য এক অনন্য প্রশিক্ষণের মাস। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আলোকে মাহে রমজানকে ‘কুরআন শিক্ষার মাস’ হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে। জ্ঞান অর্জন, আত্মগঠন ও আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের দীপ্তশপথে উজ্জীবিত হয়ে এ মাসে নিম্নোক্ত নসিহতসমূহ পালন করার ব্যাপারে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
পূর্ণ দ্বীনি অনুভূতি সহকারে রমজানের সিয়াম পালন করুন।
জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, তারাবিহ এবং নফল ইবাদতসমূহ অধিক পরিমাণে আদায় করুন।
এই মাসে সম্পূর্ণ কুরআন মাজিদ কমপক্ষে একবার অর্থসহ তিলাওয়াত করুন।
অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ কমপক্ষে নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অধ্যয়ন ও মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। সূরা আল-বাকারা : ১৫৩-১৫৭, ১৮৩-১৮৬, ২৮৬, সূরা আলে-ইমরান: ১৯০-২০০, সূরা আত-তাওবা : ২০-২৭, ৩৮-৪২, ১১১, সূরা আল-মুমিনুন: ১-১১, সূরা আল-হাক্কাহ : ১৯-২৯, সূরা-ইয়াসিন, সূরা আর রহমান, সূরা আল-হুজুরাত, সূরা আস-সফ, সূরা আল-মুলকসহ বিষয়ভিত্তিক সূরা ও আয়াতসমূহ।
অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ নিম্নোক্ত হাদিসসমূহ অধ্যয়ন ও মুখস্থ করার চেষ্টা করুন। রোজাসংক্রান্ত: মুসলিম- ২৩৬৩, ২৫৭০, বুখারি- ১৭৬১, ১৭৬৬; ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ সংক্রান্ত: বুখারি- ২৬০১, ২৬০৭, তিরমিজি- ১৫৬৮, ১৫৮৬, ১৬০৪; তাকওয়া সংক্রান্ত: রিয়াদুস সালেহীন- প্রথম খণ্ড (হাদিস নং-৪১, ৬৯, ৩৮৬-৩৮৭) সালাত, আল্লাহর রাহে অর্থদান ও পর্দাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিসসমূহ।
১-১০ রমজানের মধ্যে প্রত্যেক জনশক্তি ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে পাঁচজন ছাত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে নতুন করে দুইজন সমর্থক বৃদ্ধির চেষ্টা করুন।
স্ব-স্ব মসজিদে নামাজের আগে ও পরে কুরআন-হাদিস ও মাসয়ালা-মাসায়েল থেকে বিভিন্ন অংশ পেশ করার চেষ্টা করুন।
শেষ দশকে লাইলাতুল কদরের মহিমান্বিত রাতের কল্যাণপ্রাপ্তির আশায় সময় সুযোগের আলোকে ইতেকাফ এবং সর্বোচ্চ ইবাদত করার চেষ্টা করুন।
রমজান মাসে অনৈতিকতা, নগ্নতা, অশ্লীলতাসহ ইসলামবিরোধী যাবতীয় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলুন।
জুলুম নির্যাতনের মোকাবেলায় জাগতিক চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তির উপযুক্ত হিসাবে নিজেকে তৈরি করুন।
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের ওপর জুলুম-নির্যাতন এবং গুম-খুন বন্ধে সোচ্চার হোন ও জঙ্গিবাদের নামে ইসলামের অগ্রযাত্রা নস্যাতের চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান।
সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন।
রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তা’য়ালার কাছে মিশক আম্বরের চেয়েও অধিক প্রিয়। আর জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে যা শুধুমাত্র রোজাদারদের জন্য নির্দিষ্ট। এ মাসে শয়তানকে করা হয় শৃঙ্খলিত, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাসমূহ। এ মাসে একটি নফল ইবাদত অন্য মাসের একটি ফরজ ইবাদতের সমমর্যাদার, আর একটি ফরজ ইবাদত অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ ইবাদতের সমমর্যাদার। “একটি রোজার বিনিময়ে রোজাদারের চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় সত্তর বছরের দূরত্বে।” (বুখারি ও মুসলিম) কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি কেন রোজার এতো মর্যাদা? কেনইবা এ মাস এতো শ্রেষ্ঠ! কারণ একটাইÑ এ মাসে নাজিল হয়েছে আল-কুরআন, যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। এ মাসের একটি বিশেষ রাত হচ্ছে ‘লাইলাতুল কদর’। যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও বেশি। আল্লাহ বলেন, “শবেকদর হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।” (সূরা আল-কদর: ৩) আমরা যদি ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এ কুরআনকে ধারণ করতে পারি, নিশ্চয়ই আমাদের মর্যাদা বাড়বে বহুগুণ। তাই কুরআনের আলোকে সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টাই হোক মাহে রমজানের মূল ভিশন। কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে গিয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)সহ সাহাবিগণ (রা) বন্দী ছিলেন শিয়াবে আবি তালিবে, শহীদ হয়েছিলেন আমীর হামজা, খোবায়েব, খাব্বাব (রা)সহ অসংখ্য সাহাবি। তাদের পথ অনুসরণ করার কারণে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নির্বিচারে শহীদ করা হচ্ছে কুরআনপ্রেমী মুসলিমদের। শুধু তা-ই নয়, নব্বই ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশে কুরআনের পথে চলার অপরাধে (!) বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে শত শত নারী-পুরুষকে। অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে হাত-পা ভেঙে বিনা চিকিৎসায় কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে অসংখ্য ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীকে। এ ছাড়াও নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে শত শত ছাত্র-যুবক, নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের। শহীদের রক্তভেজা এই জমিনে আমরা যারা কুরআনের সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে চলছি, আমাদের অবশ্যই ত্যাগ-কোরবানি ও তাকওয়ার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয়ে আঞ্জাম দিতে হবে শহীদদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ। দীপ্তশপথ নিয়ে ভূমিকা রাখতে হবে কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এবং প্রস্তুতি নিতে হবে ইসলামের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করার। আর ব্যক্তিগত জীবনে ধারণ করতে হবে ধৈর্য, তাকওয়া ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তাহলেই ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কুরআনের বাণী- “আর যদি তোমরা সবর কর, তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে তাদের কোনো চক্রান্তই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।” (সূরা আলে ইমরান : ১২০)
রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে ঈমান ও ইহতিসাবের (আত্মসমালোচনার) সাথে সাওম পালন করবে আল্লাহ তা’য়ালা তার বিগত দিনের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।” তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল কিন্তু তার জীবনের গুনাহ মাফ করে নিতে পারল না তার জন্য ধ্বংস।” (বুখারি ও মুসলিম) সুতরাং জীবন বিনির্মাণের সৌভাগ্যের সোপান হিসেবে গ্রহণ করতে হবে মাহে রমজানকে।
তাই আসুন যথাযথভাবে রমজানের সিয়াম পালন, কুরআন হাদিস অধ্যয়ন ও বেশি বেশি নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করি। একই সাথে কুরআনের আলোকে ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের মাধ্যমে কাক্সিক্ষত ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজ আরও বেগবান করি। আল্লাহ আমাদের সকল প্রচেষ্টা কবুল করুন। আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply