মাহে রমজান উপলক্ষে নসিহত

শহীদি কাফেলার প্রিয় ভাইয়েরা
আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
মাহে রমজান মুসলিম জাতির প্রতি মহান আল্লাহর সীমাহীন অনুকম্পা ও অনুদান। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে পবিত্র মাহে রমজান আমাদের নিকট সমাগত। রাসূলুল্লাহ (সা) এ মাসকে ‘শাহরুন মোবারক’ তথা ‘বরকতময় মাস’ বলে অভিহিত করেছেন। এ মাসে আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উন্নতি ও কল্যাণের মূল ভিত্তি-তাকওয়াপূর্ণ জীবনগঠনের অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন। সূরা আল বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে সে ধ্বনিই অনুরণিত হয়েছে, যা আন্দোলিত করে আমাদের হৃদয়তন্ত্রীকে। উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমাদের ওপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমনি ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” সাওম যেমন ক্ষুধায়-কাতর দুঃখী মানুষের প্রতি আমাদের মমত্ববোধ জাগিয়ে তোলে, তেমনই শিক্ষা দেয় ধৈর্য, একনিষ্ঠতা, ত্যাগ, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতির। প্রেরণা জোগায় শোষণ, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বৈষম্যমুক্ত একটি আদর্শিক সমাজ গড়ার। আর দ্বিতীয় হিজরির রমজান মাসে সংঘটিত বদরযুদ্ধে কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজয়ের ইতিহাস আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করে ইসলামবিরোধী সকল শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।

সুপ্রিয় দ্বীনি ভাইয়েরা
মাহে রমজান ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অনবদ্য প্রশিক্ষণের মাস। কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আলোকে মাহে রমজানকে ‘কুরআন শিক্ষার মাস’ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। জ্ঞান অর্জন, আত্মগঠন ও আদর্শিক সমাজ বিনির্মাণের দীপ্তশপথে উজ্জীবিত হয়ে এ মাসে নিম্নোক্ত নসিহতসমূহ পালন করার ব্যাপারে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ষ    পূর্ণ দ্বীনি অনুভূতির সাথে রমজানের সিয়াম পালন করা।
ষ    জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং তারাবিহসহ নফল ইবাদতসমূহ অধিক পরিমাণে আদায় করা।
ষ    এই মাসে কমপক্ষে সম্পূর্ণ কুরআন মজিদ একবার অর্থসহ তেলাওয়াত করা।
ষ    অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ নিম্নোক্ত আয়াতসমূহ অধ্যয়ন ও মুখস্থ করার চেষ্টা করা। সূরা আল বাকারা : ১৫৩-১৫৭, ১৮৩-১৮৬, ২৮৬, সূরা আলে ইমরান : ১৯০-২০০, সূরা আত তাওবা :  ২০-২৭, ৩৮-৪২, ১১১, সূরা আল মুমিনুন : ১-১১, সূরা আল হাক্কাহ : ১৯-২৯, সূরা ইয়াসিন, সূরা আর রহমান, সূরা আল হুজুরাত, সূরা আস সফসহ বিষয়ভিত্তিক সূরা ও আয়াতসমূহ।
ষ    অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ নিম্নোক্ত হাদিসসমূহ অধ্যয়ন ও মুখস্থ করার চেষ্টা করা। রোজা সংক্রান্ত : মুসলিম- ২৩৬৩, ২৫৭০, বুখারি- ১৭৬১, ১৭৬৬, ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ সংক্রান্ত :  বুখারি- ২৬০১, ২৬০৭, তিরমিজি- ১৫৬৮, ১৫৮৬, ১৬০৪, তাকওয়া সংক্রান্ত : রিয়াদুস সালেহীন- প্রথম খন্ড (হাদিস নং-৪১, ৬৯, ৩৮৬-৩৮৭, সালাত, আল্লাহর রাহে অর্থদান ও পর্দাসংক্রান্ত) সহ গুরুত্বপূর্ণ হাদিস গ্রন্থসমূহ।
#    ১-১০ রমজানের মধ্যে প্রত্যেক জনশক্তি ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে পাঁচজন ছাত্রের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছিয়ে নতুন করে দুইজন সমর্থক বৃদ্ধির চেষ্টা করা।
#    স্ব স্ব মসজিদে নামাজের আগে ও পরে কুরআন-হাদিস ও মাসয়ালা-মাসায়েল থেকে বিভিন্ন অংশ পেশ করার চেষ্টা করা।
#    শেষ দশকে লাইলাতুল কদরের মহিমান্বিত রাতের কল্যাণপ্রাপ্তির আশায় সর্বোচ্চ ইবাদত করার চেষ্টা করা।
#    রমজান মাসে অনৈতিকতা, অশ্লীলতাসহ ইসলামবিরোধী যাবতীয় কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলুন।
#    জুলুম নির্যাতনের মোকাবেলায় জাগতিক চেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্তির উপযুক্ত হিসেবে নিজেকে তৈরি করা।
#    বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী আলেম-ওলামা ও মুসলিম নির্যাতন এবং গুম-খুন বন্ধে সোচ্চার হওয়া।

সুপ্রিয় ভাইয়েরা
রাসূল (সা) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাসে ঈমান ও আত্মসমালোচনার সাথে সাওম পালন করবে আল্লাহ তায়ালা তার বিগত দিনের সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।” তিনি আরও বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল কিন্তু তার জীবনের গুনাহ মাফ করে নিতে পারল না তার জন্য ধ্বংস।” (বুখারি ও মুসলিম) সুতরাং জীবন বিনির্মাণের সৌভাগ্যের সোপান হিসেবে গ্রহণ করতে হবে মাহে রমজানকে।

প্রিয় ভাইয়েরা
রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহ তায়ালার কাছে মিশক আম্বরের চেয়েও প্রিয়। আর জান্নাতে রাইয়ান নামে একটি দরজা আছে যা শুধুমাত্র রোজাদারদের জন্য নির্দিষ্ট। এ মাসে শয়তানকে করা হয় শৃঙ্খলিত, জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয় জাহান্নামের দরজাসমূহ। এ মাসে একটি নফল ইবাদত অন্য মাসের একটি ফরজ সমমর্যাদার, আর একটি ফরজ অন্য মাসের সত্তরটি ফরজ সমমর্যাদার। “একটি রোজার বিনিময়ে রোজাদারের চেহারাকে জাহান্নামের আগুন থেকে সরিয়ে দেয়া হয় সত্তর বছরের দূরত্বে।” (বুখারি ও মুসলিম) কিন্তু আমরা কি ভেবে দেখেছি কেন রোজার এ মর্যাদা? কেনইবা এ মাস এত শ্রেষ্ঠ! কারণ একটাই- এ মাসে নাজিল হয়েছে আল কুরআন, যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী। এ কারণে লাইলাতুল কদরের মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। সুতরাং আমরা যদি ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে এ কুরআনকে ধারণ করতে পারি, নিশ্চয়ই আমাদের মর্যাদা বাড়বে অনেকখানি। তাই কুরআনের আলোকে সমাজ বিনির্মাণের প্রচেষ্টাই হোক মাহে রমজানের মূল ভিশন। কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের কারণে রাসূলুল্লাহ (সা)সহ  সাহাবীরা (রা) বন্দী ছিলেন শিয়াবে আবি তালিবে, শহীদ হয়েছিলেন আমীর হামযা, খোবায়েব, খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ শ্রেষ্ঠ সব সাহাবী। তাদের পথ অনুসরণ করার কারণে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নির্বিচারে শহীদ করা হচ্ছে কুরআনপ্রেমী জনতাকে। শুধু তাই নয়, নব্বই ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশে কুরআনের কথা বলার অপরাধে (!) বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হয়েছে শত শত প্রতিবাদী নারী-পুরুষের দেহকে। অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করে অমানবিক নির্যাতন চালিয়ে হাত-পা ভেঙে বিনা চিকিৎসায় কারান্তরীণ করে রাখা হয়েছে অসংখ্য কুরআনপ্রেমী নেতাকর্মীকে। কারান্তরীণ অবস্থায় ইতোমধ্যেই শহীদ করা হয়েছে আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ ইসলামী আন্দোলনের চার শীর্ষ নেতাকে এবং অবশিষ্ট নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আজও চলমান রয়েছে। এ ছাড়াও নির্মমভাবে শহীদ করা হয়েছে শত শত ছাত্র-যুবক, নারী, শিশু, বৃদ্ধাসহ ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের। শহীদের রক্তভেজা এই জমিনে আমরা যারা কুরআনের সমাজ বিনির্মাণের প্রত্যয়ে চলছি, আমাদের অবশ্যই ত্যাগ-কোরবানি ও তাকওয়ার মানদন্ডে উত্তীর্ণ হয়ে আঞ্জাম দিতে হবে শহীদদের রেখে যাওয়া কঠিন দায়িত্ব। দীপ্তশপথ নিতে হবে কুরআনের সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যথাযথ ভূমিকা পালনের এবং প্রস্তুতি নিতে হবে ইসলামের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করতে। আর ব্যক্তিগত জীবনে পরিস্ফুট করতে হবে ধৈর্য, তাকওয়া ও ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তাহলে ষড়যন্ত্রকারীদের সকল চক্রান্ত নস্যাৎ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
কুরআনের বাণী “আর যদি তোমরা সবর কর, তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে তাদের কোনো চক্রান্তই তোমাদের ক্ষতি করতে পারবে না।” (সূরা আলে ইমরান : ১২০)
আমরা প্রত্যাশা করছি আল্লাহ তায়ালা আমাদের দেবেন প্রকৃত রোজাদারের মর্যাদা, জান্নাতে রাখবেন শহীদদের সাথে আর আমরা হবো সবর ও তাকওয়ার পথের অগ্রপথিক। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কবুল করুন। আমিন।

মো: আতিকুর রহমান
কেন্দ্রীয় সভাপতি

SHARE

Leave a Reply