মাহে রমজান খোদাভীতি অর্জনের শ্রেষ্ঠ সময়

মুহাম্মদ মনজুর  হোসেন খান

মুসলিম আকেল-বালেগ নর-নারীগণ সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদতের নিয়্যতে পানাহার এবং যৌন সঙ্গম থেকে বিরত থাকাই রোজা। নারীদের বেলায় এ সময় হায়েজ ও নেফাস থেকে পবিত্র থাকা পূর্বশর্ত। (আলমগিরী)
রমজানের রোজা রাখা মুসলমান বালেগ, বিবেকবান ও সুস্থ নর এবং একই ধরনের হায়েজ ও নেফাস থেকে মুক্ত নারীদের ওপর ফরজে আইন। অস্বীকার বা ঠাট্টা করলে কাফির হবে আর বিনা অজুহাতে অবহেলা বশত আদায় না করলে কবীরা গুনাহগার ও ফাসিক্ব হয়ে যাবে। (রদ্দুল মুহতাব ও আলমগিরী)
রমজানের এক মাস রোজা পালন করা ফরজ। হাদীস শরীফে বর্ণিত যে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, মাস ঊনত্রিশ দিনেও হয়, ত্রিশ দিনেও হয় বিধায় চাঁদ দেখে রোজা শুরু কর এবং চাঁদ দেখেই (রোজা) রাখা বন্ধ কর। যদি ঊনত্রিশে রমজান চাঁদ দেখা না যায় তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ করবে। (খাযাইনুল ইরফান)
রোজার নিয়্যত : রোজার জন্য নিয়্যত করাও অত্যাবশ্যকীয়। প্রত্যেক রোজার জন্য অন্তরে ইচ্ছা থাকার মাধ্যমে নিয়্যতের শর্ত পূরণ হবে। তবে তা মুখে উচ্চারণ করা মুস্তাহাব। এ নিয়্যত পূর্ব দিনের সূর্যাস্তের পর থেকে রোজার দিনের দুপুরের আগ পর্যন্ত করা যাবে। এর আগে বা পরে করলে রোজা হবে না।
রোজার নিয়্যতে সেহেরি খাওয়াও নিয়্যত হিসেবে গণ্য হবে। সোবহে সাদিকের পূর্বে নিয়্যত করলে বলবেন- নাওয়াইতু আন আসুমা গাদাম মিন শাহরি রামাদ্বা-নাল মুবারাকি ফারদ্বাল্ লাকা ইয়া আল্লাহু! ফাতাক্বাব্বাল মিন্নি ইন্নাকা আনতাস সামি’উল আলিম। অর্থাৎ আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আগামীকাল রমজানের ফরজ রোজা রাখার নিয়্যত করলাম।
আর ফজরের পর নিয়্যত করলে বলবেন-নাওয়াইতুআন আসুমা হাযাল ইয়াওমা লিল্লাহি তায়ালা মিন ফারদ্বি রমাদ্বানা। অর্থাৎ আল্লাহর সšুÍষ্টির জন্য আমি আজকের রমজানের ফরজ রোজা রাখার নিয়্যত করলাম।
রোজার নিয়্যত রাতে বা ফজরের আগে করাই মুস্তাহাব। রোজার নিয়্যত কার্যকর হয় সুবহে সাদেক থেকে। অতএব, কারো দিনের বেলার (মধ্যাহ্নের পূর্ব পর্যন্ত) নিয়্যত ঐ সময় শুদ্ধ হতে পারে যদি নিয়্যতকারী সুবহে সাদিক থেকে রোজা ভঙ্গের কোন কাজ না করে। (রদ্দুল মুহতার)
সেহেরি খাওয়ার সময় বা সুবহে সাদেক্বের পূর্বে যদি মনস্থ করে যে, সকালে রোজা রাখবে না, তখন নতুন নিয়্যত না করলে রোজা হবে না। যদিও সে সারাদিন পানাহার ও যৌন সঙ্গম পরিহার করে। (দুরবে মুখতার ও রদ্দুল মুহতার)
সেহেরি খাওয়া রোজার নিয়্যত রূপে গণ্য হয়। কিন্তু সে সময় যদি এই ইচ্ছা থাকে যে, সকালে রোজা রাখবে না তাহলে সেহেরি খাওয়া নিয়্যত বলে গণ্য হবে না। (জাওহারাহ ও দুররে মুখতার)
মুসাফির ও পীড়িত লোক ব্যতীত অন্য কেউ রমজানের রোজার সময় যদি নফল কিংবা ওয়াজিব কিংবা পূর্ববর্তী কোন কাজার নিয়্যত করে তবুও তার রমজানের রোজাই আদায় হবে। পক্ষান্তরে মুসাফির ও পীড়িত লোক যদি রমজান ব্যতীত অন্য কোন রোজার নিয়্যত করে তবে যা নিয়্যত করে তাই আদায় হবে- রমজানের নয়। (তানভীরুল আবসার) যদি কোন নারী হায়েয বা নেফাস অবস্থায় রাতে রোজার নিয়্যত করে থাকে এবং সুবহে সাদেকের পূর্বেই পবিত্র হয়ে যায়, তবে তার রোজা শুদ্ধ হবে। (জাওহারাহ)
রমজানের রোজা যাদের জন্য পরে আদায়ের অবকাশ রয়েছেÑ সফর, গর্ভধারণ, সন্তানকে দুগ্ধ পান করানো, পীড়া, বার্ধক্য, শারীরিক ও মানসিক কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা এবং জেহাদ এসব অজুহাতে এ মাসে রোজা না রেখে তা কাজা করলে গুনাহগার হবে না। (আলমগিরী)
বিনা ওজরে এ মাসে রোজা না রাখা বড় গুনাহ। পীড়িত লোক নিজ অনুমান বশত রোজা ছেড়ে দিতে পারবে না। যতক্ষণ পর্যন্ত সে ব্যক্তি কোন দ্বীনদার চিকিৎসকের মতামত কিংবা নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা অথবা কোন প্রমাণ দ্বারা দৃঢ় ধারণায় উপনীত না হয় যে, রোজার কারণে তার রোগ বৃদ্ধি পাবে। অন্যথায় তাকে রোজার কাজা ও কাফ্ফারা উভয়ই আদায় করতে হবে। কোন লোক সুস্থ কিন্তু দ্বীনদার চিকিৎসক যদি রোজার কারণে পীড়িত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন তবে সে ব্যক্তিও পীড়িতদের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। (খাযাইনুল ইরফান ও দূররে মুখতার)
গর্ভবতী বা স্তন্যদাত্রী রমণী যদি রোজার কারণে স্বীয় কিংবা দুগ্ধ পোষ্য সন্তানের জীবনহানি অথবা অসুস্থতার আশঙ্কা বোধ করে তবে তার জন্য পরবর্তীতে রোজা রাখার অবকাশ রয়েছে। এমনকি এ ক্ষেত্রে পেশাদার স্তন্যদানকারিণীর জন্যও একই হুকুম। (দুরবে মুখতার ও খাযাইনুল ইরফানÑ
বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা হেতু রোজা রাখতে অসমর্থ হলে তার জন্য কাজা করার অনুমতি রয়েছে। আর যদি সে ব্যক্তির সুস্থতা ও সামর্থ্য ফিরে আসার সম্ভাবনা না থাকে তবে সে ক্ষেত্রে সে ব্যক্তি প্রতি রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে আহার করাবে, অথবা অর্ধ সা’ (২ কেজি ৫০ গ্রাম) গম বা গমের আটা কিংবা তার দ্বিগুণ যব কিংবা যবের সমমূল্য ফিদয়া হিসেবে প্রদান করবে।
যদি ফিদ্য়া প্রদানের পর পুনরায় রোজা রাখার মত সামর্থ্য ফিরে আসে তবে তাকে তখন রোজার কাজাও আদায় করতে হবে।
মরণোন্মুখ বৃদ্ধ বা শায়খে ফানী (যার সুস্থতা ও সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার আশা নেই) রোজা রাখতে অসমর্থ হলে বা ফিদয়া প্রদানেও যদি সক্ষম না হয় তবে সে যেন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং নিজের অক্ষমতার জন্য মার্জনা চাইতে থাকে। (খাযাইনুল ইরফান ও রদ্দুল মুখতার)
হায়েয ও নেফাস অবস্থায় রমণীদের জন্য রোজা রাখা নিষেধ। তারা পরে কাজা করবে। (হিন্দিয়া)
কোন নারীর হায়েয ও নিফাসজনিত রক্তস্রাব শুরু হওয়া মাত্র তার রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। অতএব এ থেকে পবিত্র হওয়ার পর রোজা পালন করবে।
কোন রমণীর যদি রাতেই হায়েয বন্ধ হয় তবে সুবহে সাদিক থেকে সে রোজা পালন করবে।
কোন রমণীর দশ দিনের ভেতরে হায়েয বন্ধ হলে তার জন্য গোসলের সময়ও হায়যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। তাই রাতের এমন সময় যদি সে পবিত্র হয় যে, গোসল সমাপন করতে ফজর হয়ে যায় তবে তার জন্য সেদিনের রোজা শুদ্ধ হবে না। এমনভাবে ভোর হওয়ার পরে রক্ত বন্ধ হলেও তার জন্য ওই দিনের রোজা শুদ্ধ হবে না। ক্ষুধা ও পিপাসা যদি এতই তীব্র ও প্রকট আকার ধারণ করে যে, রোজা ভঙ্গ না করলে মৃত্যুর আশঙ্কা বা মানসিক ভারসাম্য বিনষ্ট হওয়ার সংশয় হয় তবে রোজা ভঙ্গ করতে পারে। (্আলমগিরী) সাপ বা বিষাক্ত কোন কিছুর দংশনে প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিলেও রোজা ভঙ্গ করতে পারে। (রদ্দুল মুহতার)
মুসাফিরের জন্য সফরকালে রোজা রাখা নিজের জন্য এবং সফর সঙ্গীদের জন্য কোনো প্রকার বিঘেœর কারণ না হলে রোজা পালন করা উত্তম। বিঘœ বা অসুবিধা হলে রোজা না রাখাই উত্তম। পরবর্তীতে তা কাজা করবে। (দুরবে মুখতার)
রোজা না রাখার অবকাশ প্রাপ্তরা অর্থাৎ রোজার কাজা পরবর্তী বছরের রমজানের আগেই কাজা আদায় করার চেষ্টা করবে। কেননা হাদীস শরীফে এ জন্য জোর তাকিদ দিয়ে বলা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী রমজানের রোজা আদায় না করলে তার রোজা কবুলের অযোগ্য হয়ে যায়। (দুররে মুখতার)
যদি অবকাশ প্রাপ্তগণ তাদের অবকাশকালীন সময়ে মৃত্যুবরণ করে এবং কাজা আদায়ের সময়ই না পায় তাহলে এর বিনিময় স্বরূপ ফিদিয়া দেয়া ওয়াজিব নয়। এতদসত্ত্বেও তারা ওসিয়ত করলে তাদের সম্পদের এক- তৃতীয়াংশ হতে এ ওসিয়ত পূর্ণ করা হবে। পক্ষান্তরে যদি অবকাশ এরপর মৃত্যুর পূর্বে সময় পাওয়া যায় যাতে সে কাজা করতে পারত তাহলে তার জন্য মৃত্যুকালে এ ফিদিয়া দান করার ওসিয়ত করা ওয়াজিব। মৃত ব্যক্তি ওসিয়ত না করলেও ওয়ারিশগণ তাদের পক্ষ থেকে তার ফিদিয়া আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে।
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না : ভুলবশত পানাহার ও বা যৌন সম্ভোগ সংঘটিত হলে। কিন্তু রোজার কথা স্মরণ হওয়া মাত্রই সেগুলো থেকে বিরত হতে হবে। যদি স্মরণ হওয়া মাত্র বিরত না হয়ে সে কাজে রত থাকে তবে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে। (দুররে মুখতার ও মুখতার ও রদ্দুল মুহতার)
কোন রোজাদারকে ভুলবশত পানাহার করতে দেখলে স্মরণ করিয়ে দেয়া ওয়াজিব। কিন্তু যখন উক্ত রোজাদার অতিশয় দুর্বল হয় এবং স্মরণ করানোর ফলে সে ব্যক্তি পানাহার বন্ধ করবে এবং রোজা রাখাও তার জন্য অসাধ্য হবে তবে স্মরণ করানো হতে বিরত থাকাই উত্তম। (রদ্দুল মুহতার)
মাছি বা এ জাতীয় প্রাণী, ধোঁয়া ও ধুলো-বালি গলায় চলে গেলে তাতে রোজা নষ্ট হবে না। যদি উড়ন্ত আটার কণাও অনিচ্ছাকৃতভাবে গলায় ঢুকে যায় তবুও রোজা নষ্ট হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে গিললে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। রোজা রেখে সুরমা বা তেল লাগানো অথবা আতর ব্যবহার করতে অসুবিধা নেই। চোখে সুরমা ব্যবহারের ফলে যদি থুথুতে তার রঙ দেখা যায় এবং কণ্ঠনালীতে তার স্বাদও অনুভব হয় তবুও রোজার কোন ক্ষতি হবে না। অনিচ্ছাকৃতভাবে গলায় ধোঁয়া প্রবেশ করলে রোজা ভঙ্গ হবে না। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে নাকে বা মুখে ধোঁয়া টেনে নিলে রোজা ভঙ্গ হবে না। (জাওহারাহ ও দুররে মুখতার) রোজা অবস্থায় স্বপ্নদোষ হলে কিংবা স্বপ্নে কোন পানাহার করলে রোজার কোন ক্ষতি হবে না।
রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন করলে, এতে স্বামীর বীর্যপাত না হলে রোজা ভঙ্গ হবে না। স্ত্রীর লজ্জাস্থানের দিকে তাকালো কিন্তু স্পর্শ করলো না কিংবা বারবার সেদিকে দৃষ্টিপাত করল এরই ফলে অথবা দীর্ঘক্ষণ যৌনকল্পনার ফলশ্রুতিতে আপনা-আপনি বীর্যপাত হলো, সেক্ষেত্রে রোজা ভঙ্গ হবে না। জাওহারাহ ও দুররে মুখতার) কাঁচা বা শুকনা মিসওয়াক দ্বারা দাঁত মাজা দূষণীয় নয়। যদি মিসওয়াকের তেঁতো রস বা স্বাদ মুখে অনুভূত হয় তবুও রোজার কোনরূপ ক্ষতি হবে না।
গোসল করার সময় পানির শীতলতা শরীরে অনুভূত হলেও রোজা ভঙ্গ হবে না। অনুরূপ কুলি করে মুখ থেকে পানি ফেলে দিল কিন্তু এরপর যেটুকু আর্দ্রতা রইল তা থুথুর সাথে গিলে ফেললেও রোজার ক্ষতি হবে না। দাঁতে ঔষধ চূর্ণ করতে গিয়ে গলায় তার স্বাদ অনুভূত হল অথবা হাড় চোষণ পূর্বক থুথু গিলল কিন্তু হাড়ের কোন অংশ কণ্ঠনালীতে প্রবেশ করল না, কানে পানি ঢুকল বা খড়কুটো দিয়ে কান পরিষ্কার করতে গিয়ে এবং গায়ে লেগে আসা কানের ময়লা রেখেই  কয়েকবার তা কানে প্রবেশ করালো, দাঁতের ফাঁকে বা মুখে অতি ক্ষুদ্র কোনো দ্রব্য নিজের অজান্তে থেকে গেল যা থুথুর সাথে বেরিয়ে আসার মত তা বের হয়ে গেল অথবা দাঁত থেকে রক্ত বের হয়ে তা কণ্ঠনালী পর্যন্ত পৌঁছল এবং এর নিচে গেল না, এসব অবস্থায় রোজা নষ্ট হবে না। (দুররে মুখতার ও ফতহুল ক্বাদীর)
­    কথা বলতে গিয়ে থুথুতে মুখ ভরে উঠলো সেগুলো গিলে ফেলল অথবা মুখের গড়িয়ে পড়া লালা মুখ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগেই টান গিলে ফেলল, নাকের শ্লেষ্মা বা পানি অথবা গলার কফ গিলে ফেলল, এ সবের কারণেও রোজা ভঙ্গ হবে না। তবে এসব থেকে সতর্ক থাকাই শ্রেয়। (আলমগিরী, দুররে মুখতার ও রদ্দুল মুহতার)
­ জিহ্বা দ্বারা লবণের স্বাদ গ্রহণ করে থুথু ফেলে দিল এবং মুখ পরিষ্কার করে নিল, এ অবস্থায় রোজা ভঙ্গ হবে না।
­    তিল বা তিল পরিমাণ কোনো বস্তু চিবিয়ে থুথুর সাথে গিলে ফেলল এবং তাতে যদি এর স্বাদ অনুভূত হয় তাহলে রোজা ভঙ্গ হবে অন্যথায় রোজা ঠিক থাকবে। (ফতহুল কাদীর)
­    রোজা অবস্থায় গ্লুকোজ জাতীয় স্যালাইন বা ইনজেকশন গ্রহণ করলে তাতে রোজা ভঙ্গ হবে।
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হবে এবং কাজা আদায় করতে হবে :
­সুবহে সাদিক হয়নি ভেবে পানাহার বা স্ত্রী সম্ভোগ করেছে কিন্তু পরে জানতে পারলো, তখন সুবহে সাদিক হয়েছিল এ অবস্থায় রোজা রাখবে, তবে ঐ রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­সূর্যাস্ত হয়েছে মনে করে সময়ের পূর্বে ইফতার করে ফেললে।
­সুবহে সাদেকের পূর্বে পানাহার বা স্ত্রী সম্ভোগে রত কিন্তু সবুহে সাদেক হওয়া মাত্রই মুখের খাদ্য বা পানীয় ফেলে দিল না বা স্ত্রী সম্ভোগ হতে আলাদা হল না এ অবস্থায় রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­ভুলবশত স্ত্রী সম্ভোগ বা পানাহার করল এবং এতে রোজা বিনষ্ট হয়েছে মনে করে স্বেচ্ছায় পানাহার করলো এতেও কাজা আদায় করতে হবে।
­নাকে নস্যি টানলে, কানে বা নাকে তেল বা ওষুধ দেয়ায় তা ভেতরে ঢুকলে, মলদ্বার বা স্ত্রী যৌনাঙ্গ দিয়ে পানি, ওষুধ বা তেল প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হবে।
­রোজাদারের দাঁত উপড়ানোর পর রক্ত কন্ঠনালীর নিচে পৌঁছালে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­ইচ্ছাকৃতভাবে মুখভর্তি বমি করলে রোজা নষ্ট হয়। অনুরূপ অনিচ্ছাকৃতভাবে বমি হওয়ার পর সামান্য পরিমাণও গিলে ফেললে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
­কুলি বা গোসলের সময় রোজার কথা স্মরণ থাকা সত্ত্বেও কোনোভাবে পানি নাক-কান দিয়ে কন্ঠনালী কিংবা মগজে প্রবেশ করে তবে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­সেহেরির পর পান মুখে ঘুমিয়ে পড়ে এবং এ অবস্থায় ফজর হয়ে গেলে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­চিনি বা এ জাতীয় খাদ্য দ্রব্য যা মুখে দিলে গলে যায়, যদি মুখে রাখে এবং থুথু গিলে ফেললে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
­দাঁতের ফাঁকে চানা পরিমাণ বা তার চেয়েও বড় কোনো খাদ্যবস্তু লেগেছিল, তা খেয়ে ফেললে অথবা এর চাইতে ছোট কণা মুখ হতে বাইরে এনে আবার তা খেয়ে ফেললে রোজা নষ্ট হয়ে যাবে।
­অপরের থুথু খেলেও রোজা নষ্ট হবে। অনুরূপ নিজের থুথু হাতে নিয়ে পুনরায় তা গিলে ফেললে রোজার কাজা আদায় করতে হবে।
রোজার কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হওয়ার কারণসমূহ
­ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা অবস্থায় পানাহার বা যৌনমিলন সংঘটিত করলে তার ওপর কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় বাধ্যতামূলক।
­এমনিভাবে রোজা অবস্থায় বিড়ি, সিগারেট, গাঁজা বা নেশা জাতীয় দ্রব্য ব্যবহারের কারণে রোজার কাজা ও কাফফারা দেয়া আবশ্যক।
­রোজা অবস্থায় কাঁচা গোশত খেলে কাজা ও কাফ্ফারা দিতে হবে। এমনকি যদি তা মৃতের মাংসও হয়।
­যে ব্যক্তির মাটি খাওয়ার অভ্যাস রয়েছে সে যদি রোজা অবস্থায় মাটি খায় তবে কাজা কাফফারা দিতে হবে কিন্তু অভ্যাস বশত না হলে কাজা আদায় করতে চলবে। (জাওহারা ও আলমগিরী)
­ঘুমন্ত রোজাদার স্ত্রীর সঙ্গে রোজাদার স্বামী রোজা অবস্থায় যৌন মিলন করলে উভয়ের রোজাই নষ্ট হবে কিন্তু কাজা ও কাফফারা বাধ্যতামূলক হবে কেবল স্বামীর ওপর, স্ত্রী শুধু কাজা আদায় করবে।
রোজার কাফ্ফারা : এক নাগাড়ে ৬০টি রোজা রাখা। শারীরিক সামর্থ্য না থাকলে ৬০ জন মিসকিন বা অভাবীকে দুই বেলা পেট ভরে আহার করানো বা তৎপরিবর্তে সমপরিমাণ অর্থ পরিশোধ করতে হবে।
যেসব কারণে রোজা মাকরূহ হয়
­রোজা অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে কোনো কিছুর স্বাদ পরীক্ষা করা বা কোনো কিছু চিবানো মাকরূহ।
­মিথ্যা বলা, গিবত (অন্যের দোষ চর্চা), চোগলখোরি, অশ্লীল বাক্য উচ্চারণ করা, গালি দেয়া, বেহুদা কথা বলা, কাউকে কষ্ট দেয়া এমনিতেই হারাম ও নাজায়েয। রোজাদারের জন্য এ সমস্ত কাজ কোন মতেই উচিত নয়। এসব কাজ রোজাকে মাকরূহ করে ফেলে।
­রোজা অবস্থায় স্ত্রীকে চুম্বন দেয়া, গলাগলি করা বা শরীর স্পর্শ করা মাকরূহ যদি এর ফলে বীর্যপাত কিংবা যৌন মিলনের আশঙ্কা হয়। আর স্ত্রীর ওষ্ঠ চোষা রোজাদারের জন্য সর্বাবস্থায় মাকরূহ। (রদ্দুল মুহতার)।
­পবিত্রতা হাসিলে অধিক পরিমাণ পানি ব্যবহার করা কিংবা অধিকমাত্রায় কুলি করা ও নাকে বেশি করে পানি দেয়া মাকরূহ। ওযু ও গোলস ব্যতীত অন্য সময় অনাবশ্যক কুলি করা বা নাকে পানি দেয়াও মাকরূহ।
­পানি বায়ু ত্যাগ করা, মুখে থুথু জমা করে গিলে ফেলা প্রভৃতি কাজ রোজাকে মাকরূহ করে ফেলে। (আলগিরী)
সেহেরি ও ইফতার : সূর্যাস্তের পর পানাহারের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করাকে ইফতার বলে এবং শেষ রাতে সুবহে সাদেকের আগে রোজার শক্তি জোগানোর জন্য আহার্য গ্রহণ করাকে সেহেরি বলে। ইফতার ও সেহেরি উভয়টাই সুন্নাত ও বরকতময়।
রোজাদার নিজেও ইফতার ও সেহেরি গ্রহণ করবে এবং সম্ভব হলে অন্যকেও এতে শরিক করাবে। এতে বিশেষ সওয়াব ও বরকত নিহিত রয়েছে।
ইফতার : ইফতার করা সুন্নাত। সূর্যাস্তের পর পরই খোরমা বা মিষ্টিজাতীয় দ্রব্য দ্বারা ইফতার করা সুন্নাত। অহেতুক বিলম্বে ইফতার করা মাকরূহ। হুযুর পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইফতার বিলম্ব করতে নিষেধ করেছেন। ইফতারের সময় এ দোয়াটি পাঠ করা উত্তম ও বরকতময়।
ইফতারের দু’আ : আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়া ‘আলা রিযক্বিকা আফতারতু বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।
তারাবিহ : তারাবিহের ২০ রাকাত নামাজ প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। জামাতসহকারে মসজিদে আদায় করা (উত্তম) সুন্নাতে মোয়াক্কাদাহ আলাল কেফায়া। নামাজে পূর্ণ এক খতম কুরআন পড়া সুন্নাত। বেশি পাড়া ভালো। ক্বদর রাত্রিতে এক খতম করা মুস্তাহাব।
কুরআন খতম করলে জামাতের লোকের কষ্ট হলে বা জামাতের লোক কমে গেলে ছোট ক্বিরআত দ্বারা পড়া ভালো। কিন্তু অলসতার জন্য খতম-এ কুরআন ছেড়ে দেয়াও অনুচিত।
অধিকাংশ হাফেয আজকাল খতমে কুরআন আদায়ের সময় এত দ্রুত তিলাওয়াত করেন যে, শুধুমাত্র আয়াতের শেষাংশ টুকুই বোধগম্য হয়। বর্ণ ও শব্দের উচ্চারণ, ওয়াজিব সুন্নাহ ও মদ্দে ওয়াজিব সঠিকভাবে আদায় না করে এ ধরনের নামমাত্র খতমে কুরআন দ্বারা কুরআন খতম তো দূরের কথা নামাজও হবে না।
তারাবিহের প্রতি চার রাকাত অন্তর বসে তাসবিহ, দরূদ এবং এ দোয়া পড়া উত্তম-
সুবহানা যিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি সুবহানা যিল ইযযাতি ওয়াল হাযমাতি ওয়াল হাইবাতি ওয়াল কুদরাতি ওয়াল কিবরিয়া-ই ওয়াল জাবারূত। সুবহানাল মালিকিল হাইয়্যিল লাযী লা-ইয়ানামু ওয়ালা-ইয়ামৃতু আবাদান আবাদা। সুব্বূহুন, কুদ্দঊসুন রাব্বুনা ওয়া রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু নাস্তাগফিরুল্লাহা না-সআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান নার।
এ দোয়াটি পড়ে মুনাজাত করা ভালো ও মঙ্গলময় : আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউযুবিকা মিনান্নার। ইয়া-খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান্ না-র, বিরাহমাতিকা ইয়া আযী-যু ইযা গাফ্ফা-রু ইয়া খা-লিকু ইয়া বা-র। আল্লাহুম্মা! আজিরনা ওয়া খাল্লিসনা মিনান্নারি ইয়া-মুজী-রু ইয়া-মুজী-রু ইয়া-মুজীরু বিরাহমাতিকা ইয়া-আরহামার রাহিমীন।
না-বালেগের পেছনে বালেগের তারাবিহ শুদ্ধ হবে না। অর্থাৎ তারাবিহ নামাজে অপ্রাপ্তবয়স্ক ইমামের পেছনে প্রাপ্ত বয়স্কের ইক্বতিদা করা শুদ্ধ নয়, বরং মাকরূহ এটাই সহীহ।
যদি কোন কারণে তারাবিহ নামাজ ফাসেদ হয়ে যায় তবে যতটুকু কুরআন মাজিদ ঐ নামাজে পড়া হয়েছে তা ফিরিয়ে পড়তে হবে, যাতে খতমে কুরআন পরিপূর্ণ হয়। (আলমগিরী)
যদি কোন কারণে কুরআন খতম না হয়, তবে সূরা তারাবিহ পড়বে। এজন্য কেউ কেউ নিয়ম ধার্য করেছেন যে- সূরা ফিল (্আলাম তারা) থেকে সূরা নাস (কুল আউযু বিরাব্বিন নাস) পর্যন্ত দুইবার পড়লে ২০ রাকাত হয়ে যাবে।
অথবা প্রথম রাকাতে সূরা ফাতিহার পর সূরা কাওসার থেকে সূরা নাস পর্যন্ত একেকটি সূরা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস (কুলহুওয়াল্লাহু আহাদ) পড়বে। অথবা অন্য কোন সূরা দিয়েও নামাজে তারাবিহ পড়া যায়।

ই’তিকাফ
ইবাদতের উদ্দেশ্যে নিয়্যতসহকারে মসজিদে অবস্থান করাকে ইসলামী পরিভাষায় ই’তিকাফ বলে।
ই’তিকাফকারী নারী-পুরুষের অবশ্যই মুসলমান ও বিবেকবান হওয়া পূর্বশর্ত। পুরুষকে স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি থেকে এবং নারীকে হায়েয-নিফাসের অপবিত্রতা হতে পবিত্র হতে হবে।
ই’তিকাফের জন্য মসজিদ : ই’তিকাফের জন্য জামে মসজিদ হওয়া শর্ত নয়, বরঞ্চ যে মসজিদে ইমাম ও মোয়াযযিন নিয়োজিত আছেন এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাআত সহকারে আদায় হয়, সে সব মসজিদে ই’তিকাফ করা জায়েয। (বাহারে শরিয়ত ও তাহতাবী)
তবে মসজিদুল হারাম, মসজিদে নববী সাল্লাল্লাহু তা’আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস, অতঃপর যেখানে জামাত বড় হয় সেখানে ইতিকাফ করা ভালো। মেয়েদের জন্য মসজিদে ই’তিকাফ করা মাকরূহ্ তারা ঘরে একটা নির্দিষ্ট কক্ষে ই’তিকাফ করবে। (বাহারে শরিয়ত ও তাহতাবী শরিফ)
পবিত্র রমজান শরীফের শেষের দশ দিন ই’তিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ আলাল কেফায়া অর্থাৎ মহল্লাবাসীর কেউ যদি ই’তিকাফ করে তাহলে সবার পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। কিন্তু যদি কেউ ই’তিকাফ না করে, তাহলে সকলেই সমানভাবে গুনাহগার হবে। (আলমগিরী, দুররে মুখতার)
ই’তিকাফ আদায়ের জন্য ২০ রমজান সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে ই’তিকাফের নিয়্যতে প্রবেশ করে ঈদের চাঁদ উদয় হওয়ার পর বের হবেন। কেউ যদি ২০ রমজান সূর্যাস্তের পর মসজিদে প্রবেশ করে তবে কিছু সময় কম হওয়ার দরুন তার ই’তিকাফ সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ হিসেবে আদায় হবে না।
ই’তিকাফ অবস্থায় যা মাকরূহ : ১. ই’তিকাফকারী চুপ থাকা। ইবাদত মনে করে চুপ থাকা মাকরূহে তাহরিমি (গুনাহ) তবে স্বাভাবিক কারণে চুপ থাকা মাকরূহে তাহরিমি নয়। ২. বেহুদা বা অযথা কথাবার্তা বা অনর্থক কোন কাজ করা। মসজিদে দুনিয়াবি কথাবার্তা বলা পুণ্যসমূহকে নষ্ট করে দেয়, যেমনিভাবে আগুন কাঠকে ভস্মীভূত করে দেয়। (তাফসীরাতে আহমদি)
ই’তিকাফ অবস্থায় কী কী করা ভালো : ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাআতসহকারে আদায় করা। জামাআত অকারণে ছেড়ে দিলে গুনাহগার হবে। কেননা জামাআত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। ২. ইশরাক, দ্বোহা, আউওয়াবিন, শাফিউল বিতর ও তাহাজ্জুদ ইত্যাদি নামাজ আদায় করা। ৩. কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করা। ৪. হাদীস শরিফ অধ্যয়ন করা। ৫. কুরআন হাদীসের বিশুদ্ধ তাফসীর ও ব্যাখ্যাগ্রন্থাবলি অধ্যয়ন করা। ৬. নবী ও ওলীগণের জীবনী পাঠ করা।  ৭. ধর্মীয় পুস্তিকা পাঠ করা। ৮. অধিক পরিমাণে দুরূদ শরিফ পাঠ করা। ৯। তাসবিহ-তাহলিল ইত্যাদি পাঠ করা। অর্থাৎ সর্বদা ইবাদতে মগ্ন থাকা। (তাহতাবী ও দুররে মুখতার)
কেউ মান্নতের ই’তিকাফ পালনকালে মৃত্যুবরণ করলো, কিংবা মৃত্যুকালে তার দায়িত্বে মান্নাতের ই’তিকাফ থেকে যায়, তবে প্রতিদিনের পরিবর্তে একজনের ফিতরা পরিমাণ অর্থ বা আহার্য্য কোন ফকির-মিসকিনকে প্রদান করতে হবে যদি মান্নতকারী ওসিয়ত করে যায় মান্নতকারীর জন্য ওসিয়ত করে যাওযা কর্তব্যও বটে। ওসিয়ত না করলেও ওয়ারিশগণের কেউ তা আদায় করা জায়েয ও উত্তম।
ই’তিকাফকারী ভুলবশত দিনের বেলায় কিছু খেয়ে ফেললে ই’তিকাফ নষ্ট হবে না। (আলমগিরী)
ইতিকাফকারী প্রস্রাব-পায়খানা করতে মসজিদ হতে বের হওয়া অবস্থায় কর্জদাতা তাকে আটকে ফেললে তার ই’তিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।
ই’তিকাফ নষ্ট হওয়ার কারণসমূহ : ১. শরিয়ত অনুমোদিত প্রয়োজন ছাড়া ই’তিকাফকারী মসজিদ বা ঘর থেকে বের হলে ২. স্বামী-স্ত্রী পরস্পর যৌনসঙ্গমে লিপ্ত হলে ৩. স্বামী-স্ত্রী পরস্পর চুম্বন করলে বা কামভাব নিয়ে স্পর্শ করলে ৪. জানাজার নামাজ পড়তে বের হলে ৫. রোগী দেখতে বের হলে ৬. পাগল হয়ে গেলে বা বেহুঁশ থাকা অবস্থায় রোজা রাখা সম্ভব না হলে ৭. খাবার মসজিদে নেয়া সত্ত্বেও বাইরে এসে খেলে ৮. ওজু ও গোসলের জন্য ভেতরে ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও বাইরে বের হলে ই’তিকাফ ভঙ্গ হবে।
যেসব প্রয়োজনে ই’তিকাফের স্থান হতে বের হওয়া বৈধ : ১. ভেতরে পায়খানা প্রস্রাবের ব্যবস্থা না থাকলে ২. পুরুষের জন্য ই’তিকাফ কৃত মসজিদে জুমআর ব্যবস্থা না থাকা অবস্থায় জুমার নামাজ আদায়ের জন্য যাওয়া ৩. অপবিত্র হলে গোসলের জন্য (ভেতরে ব্যবস্থা না থাকলে) অবশ্য, পায়খানা-প্রস্রাব করতে গিয়ে মুস্তাহাব গোসল করে ফেললে ক্ষতি নেই ৪. খাবার আনার ব্যবস্থা না থাকলে ঘরে গিয়ে আহার করা ৫. আযান দিতে মিনার পর্যন্ত যাওয়া ৬. মসজিদ ভেঙে পড়লে যালিমদের অত্যাচারের আশঙ্কায় নিরাপত্তার জন্য অন্য মসজিদে গিয়ে ই’তিকাফ সম্পন্ন করা জায়েয এবং সে উপলক্ষে বের হওয়াও জায়েয।
সদক্বা-এ ফিতর
নিসাব পরিমাণ অর্থ সম্পদের অধিকারী নারী বা পুরুষের সদক্ব্-াএ ফিতর আদায় করা ওযাজিব। নিসাব হচ্ছে সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্না তোলা রৌপ্য বা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ।
কর্জমুক্ত ও প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়া নিসাব (সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা এর সমপরিমাণ নগদ অর্থ) এর মালিকগণ নিজের ও নিজের পোষ্য নাবালেগ সন্তানদের পক্ষ হতে এ সদক্বা প্রদান করবেন। ফিতরার ন্যূনতম পরিমাণ হল- অর্ধ সা’ (২ কেজি ৫০ গ্রাম) পরিমাণ গম বা আটা বা এর সমমূল্য।
যার ওপর সদক্বা-এ ফিতর ওয়াজিব তাকে অবশ্যই এটা আদায় করতে হবে। এমনকি অনাদায়ী থাকাবস্থায় দরিদ্র হলেও এটা ক্ষমা করা হবে না।
একজনের ফিতরা একজন গরিবকে দেয়া জায়েয। তেমনিভাবে কয়েকজন মিসকিনকে বণ্টন করে দেয়াও জায়েয়।
ঈদুল ফিতরের নামাজ : ঈদুল ফিতরের ৬ তাকবিরবিশিষ্ট দুই রাকআত নামাজ আদায় করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক (নাবালেগ) ক্রীতদাস ও অন্ধ ব্যক্তির ওপর ঈদুল ফিতরের নামাজ ওয়াজিব নয়। বিনা কারণে এ নামাজ পরিত্যাগ করা গোমরাহি ও বিদআত।
ঈদের নামাজের পর খোৎবা প্রদান করা সুন্নাত, কিন্তু শ্রবণ করা ওয়াজিব। এ সময় কথা বলা সম্পূর্ণ নিষেধ, এমনকি তাসবিহ-তাহলিল ও কুরআন শরিফ তেলাওয়াত করাও নিষেধ।
খতিব ঈদের খোতবা প্রদানের পূর্বে মিম্বরে না বসা সুন্নাত এবং প্রথমে খোৎবার পূর্বে ৯ বার, দ্বিতীয় খোতবার পূর্বে ৭ বার উচ্চস্বরে  এবং মিম্বর থেকে অবতরণের পূর্বে ১৪ বার আল্লাহু আকবার চুপে চুপে পাঠ করা সুন্নাত।
ঈদুল ফিতরের নামাজের নিয়্যত  : নাওয়াইতুন আল উলাল্লিয়া লিল্লাহি তা’আলা রাকাতাই সালাতি ঈদুল ফিতরি মা’আ সিত্তি তাকরীরাতিন ওয়াজিবিল্লাহি তা’আলা ইক্বতিদায়তু বিহাজাল ইমাম মুতাওয়াজ্জিহান ইলা জিহাতিল কাবাতিশ শরীফাতি, আল্লাহু আকবার।
নিয়্যতের পর ইমামের সাথে তাকবিরে তাহরিমা- ‘আল্লাহু আকবর’ বলে কানের গোড়া পর্যন্ত হাত উঠিয়ে নামাজ শুরু করবেন। তারপর চুপে চুপে সানা পাঠ শেষ করে ৩ বার তাকবিরে যায়েদা- ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ইমাম সাহেবের সাথে কান পর্যন্ত হাত উঠাতে হবে এবং প্রথম দুই বার হাত ছেড়ে দিয়ে তৃতীয় বারের পর হাত বেঁধে নেবেন। তারপর ইমামের ক্বিরআত পাঠের পর রুকু ও সাজদা দ্বারা প্রথম রাকআত সমাপন করা হবে।
অতঃপর দাঁড়িয়ে  দ্বিতীয় রাকআতের শুরুতে সূরা ফাতিহা ও ক্বিরআতের পর রুকুর পূর্বে ৩ বার তাকবিরে যায়েদা- ‘আল্লাহু  আকবার’ আদায় করে রুকু ও সাজদা দ্বারা নামাজ শেষ করবে। তারপর ইমাম সাহেব খোতবা প্রদান করবেন।
ঈদের নামাজে পূর্বে নখ কাটা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা হওয়া, নতুন ও ভালো পোশাক-পরিচ্ছেদ পরিধান করা, সুগন্ধী ব্যবহার করা, ফিতরা আদায় করা, হেঁটে এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাওয়া ও অপর রাস্তা দিয়ে আসা, কিছু খোরমা কিংবা মিষ্টিজাতীয় খাওয়া, নির্দোষ পন্থায় আনন্দ এবং দান-খয়রাত দ্বারা খোদার শুকরিয়া আদায় করা, নামাজের পর কবর জিয়ারত ও মানুষের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করা সুন্নাত ও মুস্তাহাব।
ঈদের রাত ইবাদত-বন্দেগিতে অতিবাহিত করা, খোদার করুণা প্রার্থনা করা অত্যন্ত মঙ্গলজনক এবং সাওয়াবদায়ক।

জাকাত
‘জাকাত’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ- ১. পবিত্রতা বা পরিচ্ছন্নতা এবং ২. বৃদ্ধি। এ গুণ দু’টির পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী পরিভাষায় জাকাত এমন একটি ইবাদতকে বলা হয়, যা প্রত্যেক নিসাবের অধিকারী মুসলমানের ওপর ফরজ।
এটা এ উদ্দেশ্যে ফরজ করা হয়েছে, যেন বান্দা খোদা ও বান্দার হক্ব আদায় করে। জাকাত আদায়কারী অর্থ-সম্পদ পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন হলে তার মধ্যকার কার্পণ্য, স্বার্থান্ধতা, হিংসা-বিদ্বেষ প্রভৃতি কুপ্রবৃত্তি দূর হবে। অন্যদিকে তার মধ্যে প্রেম, ভালোবাসা, উদারতা, কল্যাণ কামনা, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতার গুণাবলি বৃদ্ধি পাবে।
ফক্বীহগণ জাকাতের সংজ্ঞায় উল্লেখ করেছেন, অর্থ সম্পদের মধ্য থেকে গরিবের এ প্রাপ্য আদায় করা ফরয। জাকাতের নিসাব ও পরিমাণ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। যে কোন সময় ও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাতে হ্রাস-বৃদ্ধি করার অধিকার কারো নেই।
আধুনিক রাষ্ট্রসমূহ যেরূপ করে নির্ধারণ ও আদায় করে থাকে জাকাত তদ্রƒপ কর নয় বরং এটি একটি ইবাদত ও সাদক্বা, যা মানুষকে পাপ-পঙ্কিলতা, অর্থনৈতিক দুর্দশা ও সামাজিক অসমতা মুক্ত করার উদ্দেশ্যে এই ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছে। জাকাত আদায় করলে ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বিবিধ মঙ্গল সাধিত হয়। প্রথমত: জাকাত আদায়কারী ধনী ব্যক্তি ধন লিপ্সা ও ধনের প্রতি আসক্তি হতে উদ্ভূত বিভিন্ন চারিত্রিক দোষ ও পাপ থেকে মুক্ত থাকে। দ্বিতীয়ত দরিদ্র, ইয়াতিম, বিধবা নারী, বিকলাঙ্গ, উপার্জনে অক্ষম নর-নারী নিঃস্ব ও অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিগণ জাকাত দ্বারা লালিত-পালিত বা উপকৃত হয়ে থাকে; এটি তাদের প্রতি দয়া নয়, এটি তাদের প্রাপ্য।
কার ওপর জাকাত ফরজ : বিবেকসম্পন্ন ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমান নারী-পুরুষ যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ওপর জাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক এবং এটা আদায়ের ব্যাপারে তারা নিজেরাই দায়িত্বশীল। নিসাবের অধিকারী ইয়াতিমের সম্পদের ওপর জাকাত আদায় করা ফরয এবং তা আদায় করার দায়িত্ব তার অভিভাবকের। নিসাবের অধিকারী যে কোন প্রতিবন্ধীর অর্থ সম্পদের ওপরও জাকাত আদায় করা ফরয। এটি আদায় করার দায়িত্বও তার অভিভাবকের। নিসাবের অধিকারী যে কোন প্রতিবন্ধীর অর্থ সম্পদের ওপরও জাকাত আদায় করা ফরজ। এটি আদায় করার দায়িত্বও তার অভিভাবকের ওপর। অনুরূপ কয়েদির ওপরেও, যে ব্যক্তি তার অবর্তমানে ব্যবসা বা অর্থ সম্পদের অভিভাবক হবে, সে ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে জাকাত আদায় করবে।
বাংলাদেশের কোন মুসলমান যদি বিদেশে থাকে এবং বাংলাদেশের তার সম্পত্তি বা ব্যবসায়ে নিয়েজিত অর্থ নিসাব পরিমাণ মজুদ থাকে তাহলে তার ওপর জাকাত আদায় করা বাধ্যতামূলক। উৎপাদন বৃদ্ধিতে সক্ষম ধন-সম্পদের নির্ধারিত ন্যূনতম পরিমাণ (নিসাব) এক বছরকাল কারো মালিকানা বা অধিকারে থাকলে এর জাকাত তার ওপর ফরজ হয়ে থাকে। নিছক ধনই জাকাতের কারণ নয়; বরং ধন বৃদ্ধির (উৎস) ক্ষমতাই জাকাতের মূল কারণ। ধন বৃদ্ধি করার ক্ষমতা থাকলেই পূর্ণ নিসাবের ওপর জাকাত ফরয হয়ে থাকে।
নিসাব : নিসাব হলো সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ কিংবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য কিংবা সমপরিমাণ মালামাল বা অর্থ সঞ্চিত থাকা। কারো নিকট নিসাবের কম স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকলে উভয়ের মূল্য একত্রে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের মূল্যের সমান হয়, তবে মোট মূল্যের ওপর জাকাত ফরজ হবে। স্বর্ণ ও রৌপ্য উভয় বস্তু নিসাব পরিমাণ থাকলে এগুলোর মূল্য একত্রে হিসাব করার দরকার নেই, বরং উভয়ের জাকাত পৃথক পৃথকভাবে আদায় করতে হবে।
নগদ মুদ্রার জাকাত : ফক্বীহগণের সর্বসম্মতিতে, নগদ মুদ্রার জাকাত ফরজ। যদিও মুদ্রাগুলো খাদ্য মিশ্রিত হয়। কারণ তা দেশে প্রচলিত মূল্য স্বরূপ এবং লেনদেনের উদ্দেশ্যেই এর উদ্ভব হয়েছে। সুতরাং কারো নিকট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্য বা সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণের মূল্যের সমান নগদ টাকা থাকলে স্বর্ণ ও রৌপ্য কিছুই না থাকলেও তার ওপর জাকাত ফরজ হবে। (ফতোয়ায়ে শামী)
উদাহরণস্বরূপ, এক তোলা রৌপ্যের মূল্য যদি ২৫০ টাকা হয় তবে কারো নিকট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের হিসাবে ১৩,১২৫ টাকা থাকলে এর জাকাত ফরজ। কেননা তা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রৌপ্যের সমান। নগদ টাকার জাকাতও ৪০ ভাগের এক ভাগ। ব্যাংকে যে সমস্ত টাকা রক্ষিত আছে সেগুলির ওপরও জাকাত ওয়াজিব।
বন্ধকী সম্পত্তি যার আয়ত্তাধীনে থাকবে তার নিকট থেকে তার জাকাত আদায় করা হবে। বন্ধকী জমি যদি মহাজনের আয়ত্তাধীনে থাকে তাহলে মহাজনের নিকট থেকেই তার উৎপন্ন দ্রব্যের ওশর বা দশমাংশ আদায় করতে হবে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জমির খাজনা দিতে হয়, তার কোন ওশর বা দশমাংশ দিতে হবে না। কারখানার যন্ত্রপাতির ওপর জাকাত বাধ্যতামূলক নয়। কেবল বছরের শেষভাগে যে কাঁচামাল বা শিল্পদ্রব্য কারখানায় থাকবে তার দামও নগদ অর্থের দামের ওপর জাকাত দিতে হবে। অনুরূপভাবে ব্যবসায়ীদের আসবাবপত্র, স্টেশনারি দোকান বা গৃহ এবং এ ধরনের অন্যান্য বস্তুর ওপর জাকাত দিতে হবে না। কেবল বছরের শেষে তাদের দোকানে যে মালপত্র থাকবে তার দামও তাদের তহবিলে সঞ্চিত নগদ অর্থের ওপর জাকাত ফরজ হবে।
যে সমস্ত বস্তু ও যন্ত্রপাতিতে উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয় সেগুলোর ওপর জাকাত ফরয নয়। মণি-মুক্তা বা মূল্যবান পাথর, অলঙ্কারের গায়ে বসানো থাকুক বা পৃথক থাকুক তার ওপর কোন জাকাত নেই, তবে যদি কেউ মূল্যবান পাথরের ব্যবসা করে তখন অন্যান্য পণ্যদ্রব্যের ন্যায় তার ওপরও জাকাত ওয়াজিব হবে। অর্থাৎ নিসাব পরিমাণ থাকলে তার মূল্যের শতকরা আড়াই ভাগের হিসাবে জাকাত ওয়াজিব হবে।
খনিজদ্রব্য, গুপ্তধন ও কৃষি উৎপাদন ছাড়া বাকি যাবতীয় দ্রব্যের জাকাতের জন্য পূর্বশর্ত হচ্ছে নিসাব পরিমাণ বা তার চাইতে অধিক দ্রব্যের ওপর একটি বছর অতিবাহিত হতে হবে। কিন্তু খনিজদ্রব্য, গুপ্তধন ও কৃষি উৎপাদনের এক বছর অতিবাহিত হওয়া পূর্বশর্ত নয়।
অন্যদিকে ফসল কাটার সাথে সাথেই কৃষি উৎপাদনের ওপর ওশর বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। বছরের দু’বার বা তার চেয়েও অধিকবার ফসল হলেও প্রতিবারেই ফসল কাটার পর প্রাপ্ত ফসলের ওপর ওশর বা এক দশমাংশ দিতে হবে, যদি ওই জমির খাজনা দিতে না হয়।
হাদীস শরীফের বর্ণনা মতে, যেসব বস্তুর ওপর জাকাত ফরয সেগুলোর হার নিম্নরূপ:
বৃষ্টির পানিতে চাষাবাদ হলে শতকরা ১০ ভাগ এবং কৃত্রিম সেচব্যবস্থায় চাষাবাদ হলে শতকরা ৫ ভাগ। নগদ টাকা ও সোনা-রূপা শতকরা আড়াই ভাগ। কারখানার উৎপাদিত দ্রব্যাদির ওপর শতকরা আড়াই ভাগ।
জাকাতের খাত : কুরআন-হাদীসের আলোকে নিম্নোক্ত শ্রেণীর মানুষকে জাকাত দেয়া বিধেয়। যথা- গরিব, মিসকিন, জাকাত আদায়কারী কর্মচারীগণ, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর রাস্তায় জেহাদকারী ও মুসাফির। গরিবের অর্থ হচ্ছে নিজের জীবন ধারণের জন্য যে ব্যক্তি অন্যের মুখাপেক্ষী। যেমন- বার্ধক্য বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ত্রুটির কারণে যারা সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয় এবং কিছু সাহায্য লাভ করে আত্মনির্ভরশীল হতে পারে এমন শ্রেণীর লোক এর অন্তর্ভুক্ত যেমন-ইয়াতিম ছেলেমেয়ে, বিধবা মহিলা, বেকার ও উপার্জনে অক্ষম এবং দুর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তিবর্গ। ‘মিসকিন’ শব্দের ব্যাখ্যা হাদীস শরীফে এমনভাবে দেয়া হয়েছে- যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন পরিমাণ সামগ্রী লাভ বা উপার্জন কর না। মানুষ তাছাড়া যাকে সাহায্য করে বলে বুঝা যায় না এবং তিনি মানুষের সামনে হাতও পাতেন না। এ প্রেক্ষিতে মিসকিন এমন ভদ্র ও শরীফ ব্যক্তিকে বলা হয় যে নিজের প্রয়োজন পরিমাণ রুজি অর্জনে সক্ষম নয়। উপার্জনরত দেখে লোকেরা তাকে সাহায্য করেন না। অন্যদিকে নিজের শরাফতের কারণে তিনি কারো কাছে হাত পাততেও পারেন না। যদি তাদেরকে জাকাত উসুল করার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষে নিযুক্ত করা হয়।
জাকাত আদায়কারী কর্মচারী বলতে বুঝায়, যারা জাকাত উসুল, বণ্টন ও তার হিসাব-নিকাশে রত থাকে। তারা নিসাবের মালিক হোক বা না হোক সর্বাবস্থায় জাকাতের অর্থ থেকে তারা পারিশ্রমিক লাভ করবে।
জাকাতের টাকা উল্লেখিত ব্যয় ক্ষেত্রের প্রত্যেকটিতে একই সঙ্গে ব্যয় অপরিহার্য নয়। প্রয়োজন ও পরিস্থিতি অনুযায়ী যে যে ব্যয় যে পরিমাণ সঙ্গত মনে করবে সে পরিমাণ ব্যয় করতে পারবে। এমনকি প্রয়োজন দেখা দিলে একই ব্যয়ক্ষেত্রে সমস্ত জাকাতের টাকাও ব্যয় করা যেতে পারে।
জাকাতের স্বত্বদান : জাকাত প্রদানকারী ব্যক্তি জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তিকে স্বীয় স্বত্বত্যাগ করে জাকাত প্রদান করতে হবে। অন্যথায় জাকাত আদায় হবে না। মালিকানা স্বত্বে দখল না নিয়ে জাকাত গ্রহীতার মঙ্গলজনক কাজে ব্যয় করলে জাকাত আদায় হবে না। তাই মসজিদ, মাদ্রাসা, হাসপাতাল ও এতিমখানা নির্মাণ, পুল নির্মাণ, নদী-নালা, কূপ ও খাল খনন, সড়ক ও রাস্তাঘাট নির্মাণ বা মেরামত, মৃত ব্যক্তির কাফন দান, অতিথি ভোজন ইত্যাদি কাজে জাকাতের মাল ব্যয় করা দুরস্ত নাই।
জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত ব্যক্তি যদি এ সমস্ত হতে উপকার গ্রহণ করে থাকে তবুও দুরস্ত হবে না। এ গুলির ওপর তাদের মালিকানা স্বার্থ না থাকার কারণেই জাকাত আদায় হয় না। কিন্তু এতিমখানায় যদি এতিমদেরকে মালিকানা স্বত্বে আহার, বস্ত্র ও মাদ্রাসার মিসকিন ফান্ড থাকে এবং ঐ ফান্ড থেকে গরিব ছাত্রদের খরচ নির্বাহ হয়ে থাকে তাহলে দুরস্ত হবে।
তদ্রƒপ উত্তরাধিকারীবিহীন মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যয় নির্বাহে জাকাতের অর্থ ব্যয় করা দুরস্ত নয়। কারণ মৃত ব্যক্তির মালিক হওয়ার যোগ্যতা নেই। কিন্তু জাকাত পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিকে জাকাত দিলে, সে যদি স্বেচ্ছায় ও তুষ্টচিত্তে উক্ত মৃত ব্যক্তির কফিনে তা ব্যয় করে তবে দুরস্ত হবে। সেরূপ মৃত ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত থাকলে জাকাতের অর্থ দ্বারা সোজাসুজি এটা পরিশোধ করা দুরস্ত নহে। কিন্তু মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকার জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত হলে তাকে মালিকানা স্বত্বে জাকাত দেয়া যেতে পারে সে তার মালিকানা হতে স্বীয় সন্তুষ্টিতে মৃত ব্যক্তির পক্ষে ঋণ পরিশোধ করলে দুরস্ত হবে।
জাকাতের নিয়্যত : জাকাত আদায়ের সময় এর নিয়্যত করা ফরজ। জাকাত আদায়ের নিয়্যত ব্যতীত শুধু দান করলে জাকাত আদায় হবে না। নিয়্যত মনে মনে করলে চলবে, মুখ বলা জরুরি নয়। উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলে জাকাত দেয়া হবে এ উদ্দেশ্যে জাকাতের মাল পৃথক করে রাখা ভালো। জাকাতের মাল পৃথক করার সময় অথবা উপযুক্ত পাত্রকে দেয়ার সময় জাকাতের নিয়্যত করতে চলবে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই নিয়্যত না করলে জাকাত আদায় হবে না। (হেদায়া) জাকাত দেয়ার সময় জাকাতগ্রহীতাকে জাকাতের মাল দেয়া হচ্ছে এ বিষয় জানানোর প্রয়োজন নেই; যদি সে জাকাত গ্রহণের উপযোগী হয়।
লেখক : শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply