মাৎস্যন্যায় এবং বৌদ্ধ রাজাদের উত্থান-পতন আহমেদ আফগানী

যখন আরবে আল্লাহর রাসূল সা. দাওয়াতি কাজ করছেন তখন আমাদের বাংলায় শাসক ছিলেন শশাঙ্ক। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শেষ দিকে এই সা¤্রাজ্যের শক্তি দিন দিন ক্ষয় হতে থাকে। একের পর এক এলাকা তাদের হাতছাড়া হতে থাকে। গুপ্ত রাজাদের একজন সামন্ত রাজা ছিলেন শশাঙ্ক। ততদিনে এই অঞ্চলে দ্রাবিড়দের ভাষা থেকে নানারূপ পরিবর্তিত হয়ে বাংলা ভাষা সৃষ্টি হয়। শশাঙ্ক বাংলা ভাষার একজন রাজা। ধারণা করা হয় তিনিই প্রথম বাঙালি শাসক।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের দুর্বলতার প্রেক্ষিতে তিনি বাংলার বিভিন্ন ক্ষুদ্র রাজ্যকে একত্র করে গৌড় নামের জনপদ গড়ে তোলেন। তিনি ৫৯০ হতে ৬২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রাজত্ব করেন। তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ বা কানসোনা। কর্ণসুবর্ণ নগরী অবস্থান বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় রাজবাড়িডাঙ্গার সন্নিকটে চিরুটি রেল স্টেশনের কাছে। এটা বহরমপুর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। এটাই ছিলো গৌড় রাজার রাজধানী। গৌড় অঞ্চল বলতে যা বুঝানো হয় তা হলো বর্তমানে ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, মুর্শিদাবাদ ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত।
শশাঙ্ক সিংহাসনে আরোহণ করে বঙ্গাব্দ চালু করেন। কিন্তু গৌড়ের রাজার শক্তিশালী শাসনের অভাবে এই ক্যালেন্ডার হারিয়ে যায়। বর্তমানে যে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন আমরা ব্যবহার করি তা তৈরি হয়েছে মুঘল স¤্রাট আকবরের শাসনামলে। ইরানি গবেষক আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী চান্দ্র হিজরি সনকে বাংলা সনে রূপান্তরিত করেন। এখানে উল্লেখযোগ্য যে বিশাল হিন্দুস্থানের জন্য তৈরিকৃত ক্যালেন্ডারের নাম বঙ্গাব্দ কেন হলো। ঐতিহাসিকরা যা বলতে চান তা হলো আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী আগের প্রচলিত বঙ্গাব্দকে ঘষে মেজে ঠিক করেছেন ভারতবর্ষের জন্য। রাজা শশাঙ্কের তৈরি ক্যালেন্ডারকে আকবরের আগেও ব্যবহার করেছেন বাংলা বিখ্যাত সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহ। তিনিও কিছু সংস্কার করেছেন সেই ক্যালেন্ডারকে।
আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন এই ক্যালেন্ডারকে সঠিক অবস্থানে আনতে। তার ক্যালেন্ডার প্রায় নির্ভুল ছিলো। আকবরের নির্দেশে এই ক্যালেন্ডার তৈরির মূল কারণ ছিলো ফসলের হিসাবগুলো ঠিক করার জন্য। এটা চাষিদের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় ছিলো। আমীর ফতুল্লাহ শিরাজী কোন ফসল কবে রোপণ করতে হবে কবে উত্তোলন করতে হবে সবই ঠিক করে দেন। এর ফলে শাসক ও প্রজা উভয়েরই উপকার হয়। ক্যালেন্ডার অনুসারে শাসকরা এমন সময়ে খাজনা আদায় করতেন যখন চাষিরা খাজনা দিতে সক্ষম। আমরা বাংলাদেশে এখন যে ক্যালেন্ডার ব্যবহার করি তা আরেক দফা সংশোধিত হয় ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান আমলে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে। শিরাজীর ক্যালেন্ডার এখনো হুবহু ব্যবহার করেন ভারতের বাঙালিরা।১
মাৎস্যন্যায়
শশাঙ্ক থানেসোরের রাজা হর্ষবর্ধনের কাছে পরাজিত হন ও মৃত্যবরণ করেন। থানেসোর মানে হলো উত্তর ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের কুরুক্ষেত্র জেলার একটি শহর। হর্ষবর্ধন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি নালন্দায় বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করেন। যা নালন্দা মহাবিহার নামে পরিচিত। বানভট্ট এবং হিউয়েন সাং থেকে জানা যায় হর্ষবর্ধন এই অঞ্চলের ব্রাহ্মণদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন।
হর্ষবর্ধনের পর পাল আমল পর্যন্ত আর কোনো শক্তিশালী শাসক পায়নি বাংলা। ফলে এই অঞ্চলে একটি অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থাকে মাৎস্যন্যায়। মাৎস্যন্যায় মানে মাছের ন্যায়। মাছ যেভাবে একটি আরেকটিকে গিলে ফেলে এভাবে এই অঞ্চলে একে অপরকে ঘায়েল করার নেশা চেপে বসেছে। বাংলাপিডিয়ায় এই অরাজক পরিস্থিতি নিয়ে যা জানা যায় তা হলো, ৬৪৭ সালে হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর নৈরাজ্য ও সংশয় দেখা দিলে মন্ত্রীরা বলপূর্বক রাজ্য দখল করে নেয়। আনুমানিক ৬৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এক শতক কালেরও বেশি সময় ধরে গৌড়ের ইতিহাস অস্পষ্ট ছিলো।
অষ্টম শতকের শুরুর দিকে বারবার বৈদেশিক আক্রমণে বাংলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল কনৌজ রাজ যশোবর্মণের (৭২৫-৭৫২ খ্রি.) আক্রমণ। কাশ্মীরের ললিতাদিত্য যশোবর্মণের গৌরবকে ম্লান করে দেন। গৌড়ের পাঁচজন রাজা ললিতাদিত্য কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন বলে কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কলহন উল্লেখ করেন। এ থেকে গৌড়ের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে স্থানীয় প্রধানগণ স্বাধীন হয়ে ওঠেন এবং নিজেদের মধ্যে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লড়াই-এ লিপ্ত হন।
সংস্কৃত শব্দ মাৎস্যন্যায়ম বিশেষ অর্থবহ। যখন দণ্ডদানের আইন স্থগিত বা অকার্যকর থাকে তখন এমন অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয় যা মাছের রাজ্য সম্পর্কে প্রচলিত প্রবচনের মধ্যে পরিস্ফুট। অর্থাৎ অপেক্ষাকৃত বড় মাছ ছোটটিকে গ্রাস করে, কারণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অবর্তমানে সবল দুর্বলকে গ্রাস করবেই। সমসাময়িক পাল লিপিতে এ অর্থবহ শব্দটির প্রয়োগ করে বাংলার তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার মতো শক্তিশালী শাসন ক্ষমতার অভাবে সম্পূর্ণ অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল।২
পাল রাজাদের উত্থান
গোপাল ছিলেন পাল সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তার উত্থানের মাধ্যমেই অরাজক পরিস্থিতির অবসান হয়। তিনি ৭৫০ থেকে ৭৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রাজত্ব করেন। পাল রাজাদের নামের শেষে ‘পাল’ শব্দাংশটির অর্থ ‘রক্ষাকর্তা’। তাদের সঠিক জাতি-পরিচয় জানা যায়নি। গোপাল কিভাবে ক্ষমতায় আসেন তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, জনগণই গোপালকে রাজা নির্বাচিত করেন। তিনি কিছু সংখ্যক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা নেতার সমর্থন লাভ করেই রাজা হন ও মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে জনসমর্থন লাভ করেন। পাল লিপিতে দাবি করা হয়েছে যে, গোপাল ‘বেপরোয়া ও স্বেচ্ছাচারী লোকদের পরাভূত করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন’।
অন্য কথায় বলা যায়, যারা বাংলায় মাৎস্যন্যায় অবস্থার সৃষ্টি করেছিল তাদের তিনি সমূলে উৎপাটন করেন। মাৎস্যন্যায় সময়ে আসলে কী ধরনের সামাজিক অবস্থা বিরাজ করেছিলো তার প্রত্যক্ষ কোনো সাক্ষ্য ইতিহাসে পাওয়া যায় না। আমরা এ কথা বলতে পারি গোপালের উত্থানের মাধ্যমে এই অঞ্চল শাসক পেয়েছিলো। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে প্রায় সাড়ে চারশত বছরের পাল সাম্রাজ্য। পাল সা¤্রাজ্যের রাজারা যখন বাংলা শাসন করে তখন পৃথিবীতে সবচেয়ে ক্ষমতাবান গোষ্ঠী ছিলো মুসলিমরা।
দীর্ঘ এক শতাব্দীর মাৎস্যন্যায় যুগের অবসান ঘটিয়ে আট শতকের মধ্যভাগে গৌড়, বঙ্গ ও বিহারে বৌদ্ধ মতাবলম্বী পাল শাসনের সূচনা হয়। পাল শাসনের চারশ বছর ছিল এদেশের মানুষের গৌরব পুনরুদ্ধার, আত্ম-আবিষ্কার ও আত্মপ্রতিষ্ঠার যুগ। এ আমলে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহার ও সংঘারাম ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষার কেন্দ্র। কয়েকটি ছাড়া সকল মহাবিহারই ছিলো বাংলাদেশে।
রাজ কুমার লিখেছেন, পাল স¤্রাটরা ছিলেন ভালো যোদ্ধা। তাদের সেনাবাহিনীর বৈশিষ্ট্য ছিল একটি বিশাল হাতি বাহিনী। তাদের নৌবাহিনী বঙ্গোপসাগরে বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করতো। পাল স¤্রাটরা ছিলেন ধ্রুপদী ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পের বিশিষ্ট পৃষ্ঠপোষক। তারা বহু বড় মন্দির ও মঠ নির্মাণ করিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সোমপুর মহাবিহার। তাঁরা নালন্দা ও বিক্রমশিলা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন।
তাদের রাজত্বকালেই বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে। শ্রীবিজয় সা¤্রাজ্য, তিব্বতি সা¤্রাজ্য ও আরব আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে পাল সাম্রাজ্যের সুসম্পর্ক বজায় ছিল। বাংলা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পাল যুগেই বাংলায় প্রথম ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। পাল আমলের স্থাপনাগুলোতে আব্বাসীয় মুদ্রা পাওয়া গিয়েছে। তাছাড়া আরব ইতিহাসবিদদের রচিত নথিপত্রেও পাল সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাঁদের দেশের বাণিজ্যিক ও বৌদ্ধিক যোগাযোগের উল্লেখ পাওয়া যায়। বাগদাদের বাইতুল হিকমাহ এই যুগেই ভারতীয় সভ্যতার গাণিতিক ও জ্যোতির্বিজ্ঞান-সংক্রান্ত কীর্তিগুলির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিল।৩
আব্দুল মান্নান তার জাতিসত্তার বিকাশধারা বইতে উল্লেখ করেন, বাংলার পাল-রাজত্ব চারশ’ বছর স্থায়ী হয়। গৌড়-বঙ্গে পাল শাসন চলাকালে ভারতের পশ্চিম সীমান্তে সমসাময়িক আর্য-ব্রাহ্মণ্য শক্তিপুঞ্জ সুলতান মাহমুদের হামলায় বিব্রত ও বিপর্যস্ত ছিল। ফলে পাল শাসন তার ভৌগোলিক সীমান্তে দীর্ঘদিন নিরুপদ্রব থাকে। আট শতক থেকে এগারো শতক পর্যন্ত পাল শাসনে বাংলায় বৌদ্ধধর্মের প্রসার ঘটে। বাংলা ও বিহার ছাড়িয়ে এ ধর্ম এ সময় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠা ও মর্যাদা অর্জন করে। পূর্ব ভারত ভারতীয় বৌদ্ধধর্মের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। ফলে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের বয়স আরো চার-পাঁচশ বছর বৃদ্ধি পায়।৪
খ্রিস্টীয় ৯ম শতাব্দীর প্রথম ভাগে পাল সা¤্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি লাভ করেছিল। এই সময় পাল সাম্রাজ্যই ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। সেই যুগে এই সাম্রাজ্য আধুনিক পূর্ব-পাকিস্তান, উত্তর ও উত্তরপূর্ব ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে প্রসারিত হয়। পাল সাম্রাজ্য সর্বাধিক সমৃদ্ধি ঘটেছিল সম্রাট ধর্মপাল ও দেবপালের রাজত্বকালে। তিব্বতে অতীশের মাধ্যমে পাল সা¤্রাজ্য প্রভূত সাংস্কৃতিক প্রভাব বিস্তার করেছিল। পাল সা¤্রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রভাব পড়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও। উত্তর ভারতে পাল শাসন ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ কনৌজের আধিপত্য অর্জনের জন্য গুর্জর-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূটদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে পাল স¤্রাটরা পরাজিত হন।
পাল আমলে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা বৌদ্ধ-ধর্ম-সংস্কৃতির সাথে বৈদিক ধর্ম-সংস্কৃতির মিল-সমন্বয়ের স্লোগান দেয়। বহিঃসীমান্তে তাদের মিত্ররা সামরিকভাবে সুবিধা করতে না পারলেও ব্রাহ্মণদের এই চতুর কৌশল বিশেষ ফলদায়ক হয়েছিল। ড. নীহাররঞ্জন রায় তারই বিবরণ দিয়ে জানাচ্ছেন, “পাল রাজাদের অনেকেই ব্রাহ্মণ রাজ-পরিবারের মেয়ে বিয়ে করছিলেন। ফলে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একটা পারস্পরিক সম্বন্ধ গড়ে উঠেছিল।”৫
এ সময় পাল রাজারা অনেকেই ব্রাহ্মণ, ব্রাহ্মণ্য মূর্তি আর তাদের মন্দিরের পৃষ্ঠপোষক হয়ে উঠেছিলেন। তাদের চিন্তা-চেতনা ও ক্রিয়াকর্মে নিজ সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য মুছে গিয়ে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছিল। বিশেষত দশ শতক থেকে বৌদ্ধ ধর্মে পূজাচারের প্রভাব দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয় হলো, পাল-পূর্ব যুগের বৌদ্ধ মূর্তি বিশেষ পাওয়া যায় না। যা কিছু পাওয়া যায় নয় শতক থেকে এগারো শতকের মধ্যকার। এই সমন্বয় ছিল এক তরফা। আর্য-ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ছাঁচেই গড়ে উঠেছিল সবকিছু। নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায়, “এই মিল-সমন্বয় সত্ত্বেও বৌদ্ধ ধর্ম তার দেবায়তন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কুক্ষিগত হয়ে পড়ছিল। বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মের বাহ্য ব্যবধান ঘুচে যাওয়ায় লোকের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকর্ষণ কমে এসেছিল।”৬
আব্দুল মান্নান বলেন, তথাকথিত এই মিল-সমন্বয়ের আদর্শ বাংলাদেশের জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনের খোল-নলচে পাল্টে দিচ্ছিল, তাদের জাতিসত্তাকে করে তুলেছিল অন্তঃসারশূন্য, আর রাষ্ট্রসত্তাকে করে তুলেছিল বিপন্ন। রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমানা পাহারা দেওয়ার পাশাপাশি সাংস্কৃতির সীমানা হেফাযত করতে না পারলে সে জাতির ভবিষ্যৎ পরিণতি কত মারাত্মক হতে পারে, তার প্রমাণ পাল শাসকেরা রেখে গেছেন।
পাল রাজা তথা বৌদ্ধদের পতন
খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দীতে হিন্দু সেন রাজবংশের পুনরুত্থানের ফলে পাল সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। সেই সঙ্গে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বশেষ প্রধান বৌদ্ধ সা¤্রাজ্যের অবসান ঘটে। বাংলার ইতিহাসে পাল যুগকে অন্যতম সুবর্ণযুগ মনে করা হয়। বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে কয়েক শতাব্দীব্যাপী গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে পাল স¤্রাটরা বাংলায় স্থিতাবস্থা ও সমৃদ্ধি আনয়ন করেছিলেন। পূর্বতন বঙ্গীয় সভ্যতাকে তাঁরা উন্নত করে তোলেন। সেই সঙ্গে শিল্পকলা ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রে অসামান্য কীর্তি রেখে যান। তাঁরা বাংলা ভাষার ভিত্তি রচনা করেছিলেন। বাংলার প্রথম সাহিত্যকীর্তি চর্যাপদ পাল যুগেই রচিত হয়েছিল।
পাল-রাজত্বের অবসানের পর কর্ণাটদেশীয় চন্দ্র-বংশীয় ক্ষত্রিয় বর্ণের সেনরা বাংলাদেশ শাসন করে। দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে সামন্ত বিদ্রোহ ও ভ্রাতৃবিরোধের সুযোগ নিয়ে সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেন বারো শতকের শুরুতে রাঢ়-এর একটি ক্ষুদ্র অঞ্চল দখল করে সামন্তরূপে জেঁকে বসেন। পাল বংশের শেষ রাজা রামপালের মৃত্যুর পর পাল-রাজ্যের গোলযোগ দেখা দেয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভগ্নাদশার এই সুযোগে হেমন্ত সেনের পুত্র বিজয় সেন এখানে প্রভুত্ব কায়েমের চেষ্টা করেন। তার রাজধানী ছিল বিজয়পুর। বঙ্গের বিক্রমপুরে ছিল তার দ্বিতীয় রাজধানী। শিবের পূজারি বিজয় সেন ও তার পুত্র বল্লাল সেন বাংলাদেশে ব্রাহ্মণ্যধারায় কুলীন প্রথাভিত্তিক বর্ণশ্রমবাদী সমাজের ভিত রচনা করেন।
তখনকার অবস্থা সম্পর্কে ড. নীহাররঞ্জন রায় বলেন, “সেন শাসনামলে দেখতে দেখতে যাগযজ্ঞের ধুম পড়ে গেল। নদ-নদীর ঘাটে-ঘাটে শোনা গেল বিচিত্র পুণ্য-¯œানার্থীর মন্ত্র-গুঞ্জরণ, ব্রাহ্মণ্য দেবদেবীর পূজা, বিভিন্ন পৌরাণিক ব্রতের অনুষ্ঠান, জনগণের দৈনন্দিন কাজর্ম, বিবাহ, জন্ম, মৃত্যু, শ্রাদ্ধ, আহার-বিহার, বিভিন্ন বর্ণের নানা স্তর-উপস্তর বিভাগের সীমা-উপসীমা- এক কথায় সমস্ত রকম সমাজ-কর্মের রীতি-পদ্ধতি ব্রাহ্মণ্য নিয়ম অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া হলো। এক বর্ণ, এক ধর্ম ও এক সমাজাদর্শের একাধিপত্যই সেন-বর্মন যুগের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল।
সে সমাজাদর্শ পৌরণিক ব্রাহ্মণ্য সমাজের আদর্শ। সে আদর্শই হলো সমাজের মাপকাঠি। রাষ্ট্রের মাথায় রাজা, তার প্রধান খুঁটি ব্রাহ্মণেরা। কাজেই মূর্তিতে, মন্দিরে, রাজকীয় লিপিমালায়, স্মৃতি-ব্যবহারে ও ধর্মশাস্ত্রে সমস্ত রকম উপায়ে এই আদর্শ ও মাপকাঠির ঢাক পিটানো হতে লাগলো। রাষ্ট্রের ইচ্ছায় ও নির্দেশে সর্বময় ব্রাহ্মণ্য একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠিত হলো।”৭
সেন আমলে বর্ণাশ্রম প্রথা পুরোপুরি চালু হলো। উৎপত্তি হলো ছত্রিশ জাতের। যারা উৎপাদনের সাথে যত বেশি সম্পর্কযুক্ত, তাদের স্থান হলো সমাজে ততো নীচুস্তরে। যারা যতো বেশি উৎপাদন-বিমুখ, অন্যের শ্রমের ওপর যত বেশি নির্ভরশীল, যত বেশি পরভোজী ও পরাশ্রয়ী, সমাজে তাদের মর্যাদা হলো তত উপরে। ব্রাহ্মণ্য বর্ণবিন্যাসের এই ছিল বৈশিষ্ট্য। এভাবে সেন-বর্মন শাসিত বাংলাদেশে একটি সর্বভুক পরগাছাশ্রেণীর স্বৈরাচার কায়েম হয়।৮
পাল আমলে সাংস্কৃতিক আধিপত্য কায়েমের ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ব্রাহ্মণেরা তথাকথিত মিল-সমন্বয়ের কৌশল গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সেন-বর্মন পর্বে ব্রাহ্মণ্য সমাজ তথাকথিত সমন্বয়ের মুখোশ আর রাখলো না। তারা স্বমূর্তিতে উন্মোচিত হলো, নিজেদের আসল রূপ জনগণের সামনে প্রকাশ করলো। পাল আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি যে উদারতা দেখান হয়েছিল, তার বদলা হিসেবে ব্রাহ্মণবাদী সেনরা বৌদ্ধ ধর্ম, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার বিরুদ্ধে পরিচালনা করল নিষ্ঠুর নির্মূল অভিযান। সে নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে ড. দীনেশচন্দ্র সেন বলেন, “যে জনপদে (পূর্ববঙ্গ) এক কোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১৫৫০ ঘর ভিক্ষু বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ ত্রিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই। যে পূর্ব ভারত বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান লীলাকেন্দ্র ছিল, তথায় বৌদ্ধ ধর্মের যে অস্তিত্ব ছিল, তাহাও ইউরোপীয় প্রত্নতাত্ত্বিক চেষ্টায় অধুনা আবিষ্কৃত হইতেছে।”৯
ব্রাহ্মণ্যবাদী সেনদের অত্যাচারের কারণে বাংলা সাহিত্যেরও ক্ষতি হয় ব্যাপক। এই নিয়ে অধ্যাপক দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ লিখেছেন, “পাল বংশের পরে এতদ্দেশে সেন বংশের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের চিন্তা অতিশয় ব্যাপক হইয়া ওঠে ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রবাহ বিশুষ্ক হইয়া পড়ে। সেন বংশের রাজারা সবাই ব্রাহ্মণ্যধর্মী, তাহাদের রাজত্বকালে বহু ব্রাহ্মণ বঙ্গদেশে আসিয়া বসতি স্থাপন করে ও অধিকাংশ প্রজাবৃন্দ তাহাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিতে বাধ্য হয়। এভাবে রাজ ও রাষ্ট্র উভয়ই বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিরূপ হইলে বাংলার বৌদ্ধরা স্বদেশ ছাড়িয়া নেপাল, তিব্বত প্রভৃতি পার্বত্য প্রদেশে গিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। বাংগালার বৌদ্ধ সাধক কবিদের দ্বারা সদ্যোজাত বাংগালা ভাষায় রচিত গ্রন্থগুলিও তাহাদের সঙ্গে বাংগালার বাহিরে চলিয়া যায়। তাই আদি যুগের বাংগালা গ্রন্থ নিতান্ত দুষ্প্রাপ্য।”১০
সেনদের এই বর্বর শাসন থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে মুসলিমরা। তখন সারাবিশ্বে মুসলিমদের জয়জয়কার। এমনকি উত্তর ভারতের কিছু অংশ, মুলতানসহ পাকিস্তানের বেশ কিছু অংশ মুসলিমদের অধিকারে চলে আসে। ব্রাহ্মণ্যবাদী আর্যদের দ্বারা নির্যাতিত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং অর্থনৈতিক শোষণে দেশবাসীর জীবন যখন বিপন্ন, সে সময় মজলুম জনগণের পক্ষের শক্তির হিসেবে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান ইসলাম প্রচারক আলেম, সুফি ও মুজাহিদগণ। ইসলাম প্রচারকগণ নিপীড়িত জনগণকে সংগঠিত করে রুখে দাঁড়ান বিক্রমপুরে, বগুড়া বা পুন্ড্রবর্ধনে, রামপুর বোয়ালিয়া বা রাজশাহীতে, গৌড় বা চাঁপাইনবাবগঞ্জে।
আব্দুল মান্নান বলেন, দ্বাদশ শতকের শেষ নাগাদ বাংলার প্রায় প্রতিটি বিখ্যাত শহরে-বন্দরে এবং দেশের অভ্যন্তর ভাগে বিখ্যাত গ্রামে সত্য ও মিথ্যা, হক ও বাতিল এবং ইসলাম ও কুফরের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে যায়। এই দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্বে সাধারণ মানুষের কাছে সত্যের চেহারা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। গাঙ্গেয় উত্যকার অভ্যন্তরে এক নীরব বিপ্লবের ধারা এগিয়ে চলে। আর্যদের বৈদিক ও পৌরাণিক ধর্মের বিরুদ্ধে বাংলার অধিবাসীরা হাজার বছর ধরে যে প্রতিরোধ গড়ে আসছিল, ইসলামের দ্রোহাত্মক বাণী তাদের সে প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুললো।১১
একেকজন ইসলাম প্রচারক জনগণের কাছে আবির্ভূত হন তাদের মুক্তি সংগ্রামের মহানায়করূপে। প্রচারকদের গড়ে তোলা মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাগুলো নির্যাতিতের আশ্রয়স্থল, অভুক্তের লঙ্গরখানা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মতবিনিময় ও চাহিদা পূরণের কেন্দ্র এবং মুক্তি সংগ্রামের দুর্গ হিসেবে পরিচিত হয়।
তথ্যসূত্র :
১. বাংলা বর্ষপঞ্জি / বাংলাপিডিয়া // https://bit.ly/2jWsZsH / অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
২. মাৎস্যন্যায় / বাংলাপিডিয়া / https://bit.ly/2lKHKPG/ অ্যাকসেস ইন ২ সেপ্টেম্বর ২০১৯
৩. Essays on Ancient India / Raj kumar / P. 199
৪. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আবদুল মান্নান / পৃ. ২৯
৫. বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব / ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় / পৃ. ১৩৯
৬. বাঙালির ইতিহাস, আদি পর্ব / ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় / পৃ. ১৫১
৭. বাঙালির ইতিহাস / ডক্টর নীহাররঞ্জন রায় / পৃ. ৫৬-৫৭
৮. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আবদুল মান্নান / পৃ. ৩০
৯. প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানদের অবদান / ড. দীনেশচন্দ্র সেন / পৃ. ১১-১২
১০. প্রাচীন বাংগালা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস / দেবেন্দ্রকুমার ঘোষ / পৃ. ৯-১০
১১. আমাদের জাতিসত্তার বিকাশধারা / মোহাম্মদ আবদুল মান্নান / পৃ. ৩২

SHARE

Leave a Reply