মিথ্যা সাক্ষ্য সম্পর্কে আল্লাহর সতর্কবাণী

শফিউল আহমাদ

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা সত্য সাক্ষ্য দেয়ার ব্যাপারে অটল থাকো, যদিও সে সাক্ষ্য তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধে, পিতামাতা অথবা নিকট-আত্মীয়ের বিরুদ্ধে হয়, অথবা ধনী বা গরিবের বিরুদ্ধে হয়। তাদের অপেক্ষা আল্লাহই বেশি কল্যাণকামী। সুতরাং তোমরা ন্যায়বিচার করো। সুতরাং প্রবৃত্তির অনুসরণ কোরো না। আর যদি পেঁচালো কথা বলো অথবা মুখ ফিরিয়ে নাও নিশ্চয়ই জেনে রেখো আল্লাহ তোমাদের সব কিছুরই খবর রাখেন।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৩৫)।
মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া মারাত্মক কবিরা গুনাহ। মিথ্যা সাক্ষ্যের পরিণাম কত ভয়াবহ হতে পারে, এ ব্যাপারে সহিহ বুখারির একটি হাদিসের ঘটনা নিচে তুলে ধরা হলো : ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, সর্বপ্রথম কাসামা হত্যাকারী গোত্রের লোকের (শপথ গ্রহণ) জাহেলি যুগে অনুষ্ঠিত হয় আমাদের হাশেম গোত্রে।
(এ সম্পর্কীয় ঘটনা হলো এই) কুরাইশের কোনো একটি শাখা গোত্রের একজন লোক বনু হাশিমের একজন মানুষকে (উমর ইবন আলকামা) মজুর হিসেবে নিয়োগ করল। ওই মজুর তার সাথে তার উটগুলোর কাছে গমন করল। ঘটনাক্রমে বনু হাশিমের অপর এক ব্যক্তি তাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তাদের নিকটবর্তী হওয়ার পর খাদ্যভর্তি বস্তার বাঁধন ছিঁড়ে গেল। তখন সে মজুর ব্যক্তিটিকে বলল, আমাকে একটি রশি দিয়ে সাহায্য করো, যেন তা দিয়ে আমার বস্তার মুখ বাঁধতে পারি এবং উটটিও যেন পালিয়ে যেতে না পারে। মজুর তাকে একটি রশি দিলো। ওই ব্যক্তি তার বস্তার মুখ বেঁধে নিল। যখন তারা অবতরণ করল তখন বলল, সব উট বাঁধা হলো; কিন্তু একটি উট বাদ রইল কেন? মজুর উত্তরে বলল, এ উটটি বাঁধার কোনো রশি নেই। তখন সে বলল, এই উটটির রশি কোথায়? রাবি বলেন, উত্তর শুনে মালিক মজুরকে লাঠি দিয়ে এমনভাবে আঘাত করল যে শেষ পর্যন্ত এক আঘাতেই তার মৃত্যু হলো।
আহত মজুরটি যখন মুমূর্ষু অবস্থায় মৃত্যুর প্রহর গুনছিল, তখন ইয়ামেনের একজন লোক তার কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। আহত মজুর তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি এবার হজে যাবেন? সে বলল, না, তবে অনেকবার গিয়েছি। আহত মজুর বলল, আপনি কি আমার সংবাদটি আপনার জীবনের যেকোনো সময় পৌঁছে দিতে পারেন? ইয়ামেনি লোকটি উত্তরে বলল, হ্যাঁ, তা পারব। তারপর মজুরটি বলল, আপনি যখন হজ উপলক্ষে মক্কায় উপস্থিত হবেন তখন ‘হে কুরাইশের লোকজন’ বলে ঘোষণা দেবেন। যখন তারা আপনার ডাকে সাড়া দেবে, তখন আপনি বনু হাশিম গোত্রকে ডাক দেবেন, যদি তারা আপনার ডাকে সাড়া দেয়, তবে আাপনি তাদেরকে আবু তালিব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন এবং তাকে পেলে জানিয়ে দেবেন যে, অমুক ব্যক্তি (উটের মালিক) একটি রশির কারণে আমাকে হত্যা করেছে।
কিছুক্ষণ পর আহত মজুরটি মৃত্যুবরণ করল। মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তিটি যখন মক্কায় ফিরে এলো, তখন আবু তালিব তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন আমাদের ভাইটি কোথায়? তার কী হয়েছে? এখনো ফিরছে না কেন? সে বলল, আপনার ভাই হঠাৎ ভীষণ রোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত মারা গেছে। আমি যথাসাধ্য সেবা-শুশ্রƒষা করেছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে মারাই গেল। মারা যাওয়ার পর আমি তাকে যথারীতি সমাহিত করেছি।
আবু তালিব বললেন, তুমি এরূপ করবে আমরা এ আশাই পোষণ করি। এভাবে কিছু দিন কেটে গেল। তারপর ওই ইয়ামেনি ব্যক্তি যাকে সংবাদ পৌঁছে দেয়ার জন্য মজুর ব্যক্তিটি অসিয়ত করেছিল, হজব্রত পালনে মক্কায় উপস্থিত হলো এবং (পূর্ব অঙ্গীকার অনুযায়ী) ‘হে কুরাইশগণ’ বলে ডাক দিলো। সে জিজ্ঞেস করল, আবু তালিব কোথায়? লোকজন আবু তালিবকে দেখিয়ে দিলো। তখন ইয়ামেনি লোকটি বলল, আপনাদের অমুক ব্যক্তি আপনার কাছে এ সংবাদ পৌঁছে দেয়ার জন্য আমাকে অসিয়ত করেছিল যে, অমুক ব্যক্তি মাত্র একটি রশির কারণে তাকে হত্যা করেছে। (সে ঘটনাটিও সবিস্তারে বর্ণনা করল।)
এ কথা শুনে আবু তালিব মজুর নিয়োগকারী ব্যক্তির কাছে গমন করে বলল : তুমি আমাদের ভাইকে হত্যা করেছ, কাজেই আমাদের তিনটি প্রস্তাবের যেকোনো একটি তোমাকে মেনে নিতে হবে। তুমি হয় হত্যার বিনিময়স্বরূপ এক শ’ উট দেবে অথবা তোমার গোত্রের বিশ্বাসযেগ্যা পঞ্চাশজন লোক হলফ করে বলবে যে, তুমি তাকে হত্যা করোনি। যদি তুমি এসব করতে অস্বীকার করো, তবে আমরা তোমাকে হত্যার বিনিময়ে হত্যা করব। তখন হত্যাকারী ব্যক্তিটি স্বগোত্রীয়দের কাছে গমন করে ঘটনা বর্ণনা করল।
ঘটনা শুনে তারা বলল, আমরা হলফ করে বলব। তখন বনু হাশিম গোত্রের এক মহিলা যার বিবাহ হত্যাকারীর গোত্রে হয়েছিল এবং তার একটি সন্তানও হয়েছিল, আবু তালিবের কাছে এসে বলল, হে আবু তালিব, আমি এ আশা নিয়ে এসেছি যে, আপনি পঞ্চাশজন হলফকারী থেকে আমার এ সন্তানটিকে রেহাই দেবেন এবং ওই স্থানে তার হলফ নেবেন না, যে স্থানে হলফ নেয়া হয়। (অর্থাৎ রুকনে ইয়ামেনি ও মাকামে ইবরাহিমের মধ্যবর্তী স্থান) আবু তালিব তার আবদারটি মনজুর করলেন।
তারপর হত্যাকারীর গোত্রের এক পুরুষ আবু তালিবের কাছে এসে বললÑ হে আবু তলিব, আপনি এক শ’ উটের পরিবর্তে পঞ্চাশ জনের হলফ নিতে চাচ্ছেন, এ হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি হলফকারীর ওপর দু’টি উট পড়ে। আমার দু’টি উট গ্রহণ করুন এবং আমাকে যেখানে হলফ করার জন্য দাঁড় করানো হবে, সেখানে দাঁড় করানো থেকে আমাকে অব্যাহতি দিন। অপর আটচল্লিশ জন এসে যথাস্থানে হলফ করল। ইবন আব্বাস রা: বলেন, আল্লাহর কসম, হলফ করার পর একটি বছর অতিবাহিত হওয়ার আগেই ওই আটচল্লিশ জনের একজনও বেঁচে ছিল না।
যারা অবলীলায় মিথ্যা সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাদের সতর্ক হওয়া উচিত। তাদের সংশোধন হওয়া উচিত। মনে রাখবেন, মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে পরকালে নয়, বরং দুনিয়াতেও এর পরিণাম বুঝতে পারবেন যা ওপরের ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারলাম। যারা বিভিন্ন মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছেন তাদের মনে রাখা উচিত, আপনার একটি সাক্ষ্যের ওপর একজন মানুষের জীবনমরণ নির্ভর করছে। এটা কোনো ছেলে খেলা নয়। এটা কোনো তামাসা নয়। এটা কোনো গুরুত্বহীন বিষয় নয়। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক সাহাবীকে ডেকে বললেন, “তুমি কি সূর্য দেখতে পাচ্ছ? সাহাবী বললেন, জি হ্যাঁ। আবার বললেন, তোমার দেখতে কোনো সমস্যা হচ্ছে? সাহাবী বললেন, না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যদি তুমি এ রকম সুস্পষ্ট কোনো বিষয় দেখতে পাও তাহলে সাক্ষ্য দেবে, নইলে নয়।”

SHARE

Leave a Reply