মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় একটি অনিবার্য বাস্তবতা

জালাল উদ্দিন ওমর

অবশেষে সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে মিসরের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ফারুক সুলতান গত ২৪ জুন মুসলিম ব্রাদারহুড প্রার্থী ড. মোহাম্মদ মুরসিকে মিসরের প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন। তিনি ঘোষণা করেন ড. মুরসি প্রায় ৫২ শতাংশ ভোট পেয়েছেন আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারকের সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী আহমদ শফিক ৪৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। মুরসি মোট ১ কোটি ৩২ লাখ ভোট পেয়েছেন আর শফিক পেয়েছেন ১ কোটি ২৩ লাখ ভোট। নির্বাচন কমিশনার কর্তৃক ড. মুরসিকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করায় এ সংক্রান্ত সকল অনিশ্চয়তার অবসান ঘটল। ড. মুরসিকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণার সাথে সাথে মিসরজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। মুসলিম ব্রাদারহুডের লাখো সমর্থক কায়রোর ঐতিহাসিক তাহরির স্কয়ারে সমবেত হয় এবং নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে আনন্দ প্রকাশ করে। প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কেউই ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় গত ১৬ এবং ১৭ জুন দ্বিতীয় দফা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আগে থেকেই ২১ জুন নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার কথা থাকলেও কর্তৃপক্ষ তা করেনি। বরং গত ১৪ জুন মিসরের সাংবিধানিক আদালত মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বাধীন সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং শফিকের নির্বাচন বৈধ ঘোষণা করে। সামরিক কর্তৃপক্ষ আদালতের রায়ের সূত্র ধরে নির্বাচিত সংসদ বাতিল করে দেয় এবং নিজেদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য নতুন নতুন ডিক্রি জারি করে । এ অবস্থায় বেসরকারিভাবে ড. মুরসির নির্বাচিত হবার খবর প্রকাশিত হলেও সরকারিভাবে তাকে বিজয়ী ঘোষণা হচ্ছে কি না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। ফলে জনগণ আবারো আন্দোলনে নামে এবং মিসরজুড়ে গণবিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। লাখ লাখ জনতা আবারো তাহরির স্কয়ারে সমবেত হয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে শ্লোগান দেয়। এ অবস্থায় ২৪ জুন ফলাফল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. মুরসিকে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী ঘোষণা করেন। মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের এই বিজয় বিশ্বরাজনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিজয় ধর্মনিরপেক্ষ মিসরসহ মুসলিম বিশ্বে ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। আর সেই পরিবর্তন একদিকে যেমন ইসলামের উত্থান ও ইসলামের পুনর্জাগরণের দিকে অপর দিকে তেমনি পাশ্চাত্যও তাদের ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রত্যাখ্যানের দিকে। মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় এ কথাই সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে সকল বাধা বিপত্তি পেরিয়ে, সকল প্রকার ষড়যন্ত্র ও দমন নির্যাতন মোকাবেলা করে ইসলাম আবারো পৃথিবীতে ফিরে আসছে তার আপন আদর্শ ও আসল ঐতিহ্য নিয়ে এবং ইসলামই পৃথিবীতে আবারো নেতৃত্ব দেবে। ইসলামপন্থীদের বিজয় সেই পথে অগ্রযাত্রারই একটি ধাপ। এই বিজয়ে মিসরের সামগ্রিক রাজনীতিতে আনবে সম্পূর্ণ নতুন এক গতি। পাশাপাশি এই বিজয় সারা বিশ্বের অনুন্নত এবং নির্যাতিত মুসলমানদের মনে জাগাবে নতুন এক আশা এবং প্রেরণা। বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণবাদী আন্দোলনসমূহকে দেবে নতুন এক উর্বরতা। অপর দিকে ইসলাম ও মুসলমানদের চিরশত্রু পাশ্চাত্যকে গভীর হতাশা এবং আতঙ্কে নিমজ্জিত করবে। মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় সেখানকার ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি এবং তার প্রভু যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং ইসরাইলসহ পশ্চিমাদের গালে একটি চপেটাঘাত।

মিসর একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম দেশ। কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যে এই দেশ সমৃদ্ধ। এক কথায় প্রাচীন সভ্যতার দেশ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বরাজনীতিতে মিসর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া মিসর মধ্যপ্রাচ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এই ভূখণ্ডে কয়েক শত নবী রাসূলের আবির্ভাব হয়েছিল। কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ এই মিসর দীর্ঘদিন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দ্বারা শাসিত হয়েছে। যারা সবসময় ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে এবং পশ্চিমাদের স্বার্থকে প্রতিষ্ঠা করেছে। এই মিসরই সর্বপ্রথম মুসলিম দেশ, যে মুসলমানদের জাতশত্রু ইসরাইলকে ১৯৭৯ সালে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তার সাথে শান্তিচুক্তি করেছে। কিন্তু মিসরের ইসলামপ্রিয় জনতা তা কখনো মেনে নেয়নি। আর তাই জনগণের ইচ্ছাকে ধ্বংস করার জন্য মিসরের ক্ষমতা নিয়ে সবসময় ষড়যন্ত্র হয়েছে। দেশটি ১৯৫২ সালে স্বাধীনতা অর্জন করে এবং তখন থেকেই সামরিক বাহিনীর ধর্মনিরপেক্ষ ব্যক্তিরা মিসরের ক্ষমতায় ছিল আর এদেরকে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা বিশ্ব সরাসরি সমর্থন এবং সহযোগিতা করেছে। স্বাধীনতা অর্জনের পরপরই বাদশাহ ফারুক সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। পরবর্তীতে মিসর শাসনকারী মোহাম্মদ নাজিব, জামাল আবদুল নাসের, আনোয়ার শাহাদাত এবং হোসনি মোবারকরা সবাই সামরিক বাহিনীর লোক। এমনকি এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী আহমদ শফিকও একজন সামরিক কর্মকর্তা। এই সব সামরিক নেতা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বরাবরই দেশটির ইসলামপন্থীদের ওপর দমন নিপীড়ন এবং নির্যাতন চালিয়েছে। মিসরের রাজনীতিতে মুসলিম ব্রাদারহুড একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ১৯২৮ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে মুসলিম ব্রাদারহুড ছিল নিষিদ্ধ একটি দল। ১৯৪৮ সালে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়। এই দলটির প্রতিষ্ঠাতা হাসানুল বান্নাকে ১৯৪৯ সালে গুপ্তঘাতকেরা হত্যা করে। পরবর্তীতে দলটির শীর্ষনেতা সাইয়েদ কুতুবসহ অসংখ্য নেতাকে ফাঁসি দেয়া হয়। ব্রাদারহুডের হাজার হাজার নেতাকর্মী বছরের পর বছর ধরে জেল খাটেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, সব কিছুরই একটি শেষ থাকে। মিসরেও তাই হয়েছে। অবশেষে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতিত জনগণ গণতন্ত্রের দাবিতে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক, যিনি ১৯৮১ সাল থেকে ৩০ বছর ধরে অগণতান্ত্রিকভাবে মিসরকে শাসন করেছেন। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন শাসন গ্রহণ করে। মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। ফলে তারা প্রকাশ্যে রাজনীতিতে চলে আসে। তারা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে। দলটি সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ৪৭ শতাংশ আসনে বিজয়ী হয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়। কিন্তু সাংবিধানিক আদালত সেই সংসদ বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে দলের প্রার্থী ড. মোহাম্মদ মুরসি জনগণের ভোটে প্রেসিডেন্ট পদে বিজয়ী হয়েছেন। অথচ হোসনী মোবারকের আমলে মুরসি অনেকদিন জেলে ছিলেন। সুতরাং মিসরের ৬০ বছরের ইতিহাসে ড. মুরসি হচ্ছেন গণতান্ত্রিক পন্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট। আর এর মাধ্যমে মিসরে সূচিত হল পরিবর্তনের নতুন এক অধ্যায়, যা রচিত করবে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা। সুতরাং মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় বিশ্বরাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। মিসরের সামরিক বাহিনীসহ সবার উচিত মুসলিম ব্রাদারহুডের এই বিজয়কে মেনে নেয়া এবং তার সাথে কাজ করা। আর মুসলিম ব্রাদারহুডের নেতৃত্বাধীন সংসদ বাতিল করলেও সেখানে ইসলামপন্থীদের যেভাবে রাজনৈতিক উত্থান হয়েছে, তাতে তারাই মিসরের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি। বছরের পর বছর ধরে যারা ছিল নিষিদ্ধ, তারাই আজ ক্ষমতার মালিক। দলটির রয়েছে দীর্ঘ ৮০ বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, যার অধিকাংশ সময়েই তারা মোকাবেলা করেছে সামরিক সরকারের দমন নির্যাতন। কিন্তু দলটি নির্মূল হয়নি বরং গতি লাভ করেছে। সুতরাং কারো রাজনীতি নিষিদ্ধ করে লাভ নেই।
মিসরের নির্বাচন ও তার ফলাফল থেকে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মুসলিম বিশ্ব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে আর সেই সাথে পরিবর্তন হচ্ছে বিশ্বব্যবস্থা। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিমবিশ্বে যেমন ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসছে, ঠিক তেমনি এর মাধ্যমে ইসলামপন্থীরাই হয়ে উঠছে বিশ্বরাজনীতির গতিনিয়ন্ত্রক। অপর দিকে এই পরিবর্তনের ফলে মুসলিম বিশ্বের ওপর থেকে পশ্চিমাদের প্রভাব যেমন কমে যাচ্ছে, ঠিক তেমনি পশ্চিমারা বিশ্বরাজনীতির নিয়ন্ত্রণও হারিয়ে ফেলছে। মুসলিম বিশ্বের সাম্প্রতিক পরিবর্তনকে একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলেই এই অনিবার্য সত্যটি প্রমাণিত হবে। সাম্প্রতিককালে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি মুসলিম দেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, আর তিনটি দেশেই ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হয়েছে। দেশ তিনটি হচ্ছেÑ তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসর। অথচ দেশ তিনটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজতন্ত্র এবং সামরিকতন্ত্র দ্বারা শাসিত হচ্ছিল এবং ইসলামপন্থীরা নিষিদ্ধ ছিল। গত ২২ নভেম্বর তিউনিসিয়ায় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং তাতে দীর্ঘদিন ধরে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী আন-নাহদা দল মোট ২১৭টি আসনের মধ্যে ৮৯টি আসনে বিজয়ী হয়ে দেশের বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর কয়েকদিন পর ২৬ নভেম্বর মরক্কোতে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং সেখানেও ইসলামপন্থী জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি সংসদের মোট ৩৯৫টি আসনের মধ্যে ১০৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে বৃহত্তম দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় মিসরে। তিন ধাপে অনুষ্ঠিত এই র্নিবাচনেও ইসলামপন্থীরা নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। যদিও গত ১৪ জুন মিসরের সাংবিধানিক আদালত ঠুনকো অজুহাতে এই সংসদ বাতিল করে দেয়। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও ইসলামপন্থীরাই বিজয়ী হয়েছে। এভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসরে ইসলামপন্থীদের উত্থান হয়েছে। এসব দেশে ইসলামপন্থী দলের বিজয় কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং অনিবার্য বাস্তবতা। কারণ মুসলিম দেশগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই গণতন্ত্র নেই। দু-একটি দেশ বাদে অধিকাংশ দেশেই হয় রাজতন্ত্র না হয় সামরিকতন্ত্র। এসব দেশে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এক ব্যক্তির শাসন, যারা সবসময় পাশ্চাত্যের লেজুড়বৃত্তি ও স্বার্থরক্ষা করেছে। আর মুসলিম দেশগুলোতে গণতন্ত্র বিকশিত হউক, তা পশ্চিমাবিশ্ব কখনোই চায়নি। কারণ গনতন্ত্র থাকলে সব সময় দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান হয়, যারা কখনো পরাশক্তির তাঁবেদারি করে না। এ জন্য পশ্চিমাবিশ্ব সবসময় মুসলিম দেশসমূহে গণতন্ত্রের বিকাশকে বন্ধ এবং স্বৈরশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। তিউনিসিয়ায় দুই যুগ ধরে চলেছে জয়নাল আবেদীন বিন আলীর শাসন। আলজেরিয়ায় ১৯৯১ সাল থেকেই চলছে সামরিক শাসন ও জরুরি অবস্থা। মিসরে ১৯৮১ সাল থেকেই চলেছে জরুরি অবস্থা এবং হোসনি মোবারকের শাসন। ইয়েমেনে ৩০ বছর ধরেই চলেছে আলী আবদুল্লাহ সালেহর শাসন। এসবের পাশাপাশি সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, জর্দান, মরক্কোসহ অনেক দেশেই কয়েক দশক ধরেই চলে আসছে রাজপরিবারের শাসন। অন্যান্য সব মুসলিম দেশের অবস্থাও একই। এসব দেশে প্রায় শতভাগ লোক মুসলমান হলেও ইসলামের আলোকে রাজনীতি এখানে নিষিদ্ধ। অধিকন্তু এসব দেশের শাসকেরা সবসময় ইসলামের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছে এবং পশ্চিমাবিশ্বের লেজুড়বৃত্তি ও স্বার্থরক্ষা করেছে। এরা নিজ ধর্ম এবং দেশের মুসলমানদেরকে বানিয়েছে শত্রু আর ভিন ধর্ম ও ভিন দেশের জনগণকে বানিয়েছে বন্ধু। তাই বছরের পর বছর ধরে পাশ্চাত্য এবং তাদের তল্পিবাহক মুসলিম নামধারী শাসকদের হাতে নিপীড়িত এবং নির্যাতিত এসব দেশের মুসলমানরা তাদের ভাগ্যকে পরিবর্তনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে। মুসলিম দেশসমূহে আজ যে গণবিস্ফোরণ, তা সেই পরিবর্তনের অংশ মাত্র। আর বাংলাদেশসহ কোন মুসলিম দেশই এর বাইরে নয়। মুসলমানদের গণজাগরণে তিউনিসিয়ার দুই যুগের স্বৈরশাসক জয়নাল আবেদীন বিন আলী ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি সৌদি আরবে পালিয়ে যায়। জনতার দাবির মুখে সেখানকার নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী আন-নাহদা দলের থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। একইভাবে জনতার বিক্ষোভে মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক বাধ্য হয়ে ২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পদত্যাগ করেন। সেখানেও অর্ধশতাব্দী ধরে নিষিদ্ধ ইসলামপন্থী মুসলিম ব্রাদারহুডের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়। পরিবর্তনের দাবিতে অনেক মুসলিম দেশে আন্দোলন শুরু হয়। পশ্চিমাদের হামলায় লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফী ক্ষমতাচ্যুত হন এবং নিহত হন। সেখানেও ইসলামপন্থীদের উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনে নিশ্চিতভাবে প্রতিফলিত হবে। অবস্থা বেগতিক দেখে মরক্কোর বাদশাহ মোহাম্মদ নিজের ক্ষমতাকে কমিয়ে সংস্কার কর্মসূচি ও নির্বাচন ঘোষণা করে আর সেই নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হয়েছে। গণ-আন্দোলনের মুখে ইতোমধ্যেই ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। মুসলিম দেশে দেশে যখন পরিবর্তনের আন্দোলন চলছে, তখন তিউনিসিয়া, মরক্কো এবং মিসরে নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় আসছে। মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের বিজয় তারই সর্বশেষ উদাহরণ। এদিকে ইসলামপন্থীদের এই উত্থানে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তার একনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইল। যুক্তরাষ্ট্রকে পেয়ে বসেছে সাম্রাজ্য আর আধিপত্য হারানোর ভয় আর ইসরাইলকে পেয়ে বসেছে অস্তিত্ব হারানোর ভয়। কারণ তারা ভালো করেই জানে এই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম দেশসমূহে যে নেতৃত্ব সৃষ্টি হচ্ছে তা কখনই যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য করবে না আর ইসরাইলের স্বার্থরক্ষাও করবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাবিশ্ব আজ মুসলিম দেশের পতনোন্মুখ স্বৈরশাসকদের রক্ষায় মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে। কিন্তু মুসলমানরা আজ তাদের আসল আদর্শ ও ঐহিত্য প্রতিষ্ঠার দৃপ্ত প্রত্যয়ে যেভাবে জেগে উঠেছে, তাতে এসব স্বৈরশাসকের শেষ রক্ষা হবে না। একই সাথে সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দোসর ইসরাইলের দাপটও আর বেশি দিন টিকবে না।
সুতরাং মুসলিমবিশ্ব পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে, আর এই পরিবর্তন বিশ্বরাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পরিবর্তন হবে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা এবং রচিত হবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা। মুসলিম দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে জাতীয়তাবাদী এবং ইসলামপন্থী শক্তি, যারা কখনই যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্বের আনুগত্য করবে না। বরং মুসলিম দেশসমূহ হয়ে যাবে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ। ইরান, তুরস্ক, সিরিয়া, সুদান দীর্ঘদিন থেকেই পাশ্চাত্যের বিরোধী শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এদের সাথে রয়েছে মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাসের ভালো সম্পর্ক। তিউনিসিয়া-মরক্কো-মিসরের নির্বাচিত সরকার কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য করবে না এবং ইসরাইলের স্বার্থরক্ষা করবে না। হোসনি মোবারকের আমলে মিসরের সাথে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও, মিসরের সাথে ইরানের এখন ভালো সম্পর্ক। মুসলিম বিশ্বের মধ্যে ইসরাইলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু মিসর এখন আর ইসরাইলের বন্ধু থাকবে না। বরং মিসর-মরক্কো-তিউনিসিয়ার সম্পর্ক গড়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের চিরশত্রু ইরানের সাথে। এসব দেশের মত আলজেরিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেন বা জর্ডান যেখানেই সরকার পরিবর্তন হউক না কেন, পরিবর্তিত সরকার আর যুক্তরাষ্ট্রের আনুগত্য করবে না। বরং তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষ হবে এবং ইরানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম জোটে যোগ দেবে। কারণ সব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্র বিরোধীরাই ক্ষমতায় আসবে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক এখন একেবারেই ভঙ্গুর। সেখান থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ের প্রস্তুতি চলছে। ফলে অচিরেই যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে অনেক বন্ধুকে হারাবে, যারা আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রু হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই সহজ এবং স্বাভাবিক। যেমন ইরানের শাহ ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। তখন ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বন্ধুরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতায় পরিবর্তন হওয়ায় সেই ইরানই হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রধান শত্রু। একইভাবে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের বন্ধুত্ব থাকলেও তুরস্কে ইসলামপন্থী দলের ক্ষমতারোহণের ফলে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব কমে গেছে বরং তুরস্ক হয়ে উঠছে ইসরাইলের প্রতিপক্ষ। সুতরাং মুসলিমবিশ্বে আজ যেই পরিবর্তনের ঢেউ, সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতার যে পালাবদল তা নিশ্চিতভাবেই ইসলামপন্থীদের উত্থান, যারা পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হবে। তার মানে মুসলিম দেশসমূহের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারাবে। এ দিকে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে অনেক মুসলিম দেশের উত্থানে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নেত্বত্বে পশ্চিমাবিশ্বের প্রভাব খুব দ্রুত হ্রাস পাবে। অপর দিকে মুসলিম দেশসমূহে ইসলামপন্থীদের উত্থানে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে দ্রুতগতিতে নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়বে। যার ফলে প্রায় সকল মুসলিম দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হবে এবং সেই স্থান ইসলামপন্থীরা দখল করবে। ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বই পাশ্চাত্যের হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হবে। আর মুসলিম দেশসমূহ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রকে নেতা মানবে না, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্র অটোমেটিক্যালি তার নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে। এদিকে মুসলমানদের হাতে তেল, গ্যাসসহ অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার কারণে মুসলমানরাই হয়ে উঠবে বিশ্বরাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। সুতরাং বিশ্বরাজনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় অত্যাসন্ন। তার মানে নতুন একটি বিশ্বব্যবস্থা রচিত হচ্ছে আর মুসলমানরাই এর নেতৃত্ব দেবে। তিউনিসিয়া এবং মরক্কোর পর মিসরে ইসলামপন্থীদের বিজয় তারই সুস্পষ্ট বার্তা ঘোষণা করছে।
মিসরের প্রেসিডেন্ট পদে ইসলামপন্থীদের বিজয় মূলতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্বকে প্রত্যাখ্যান। বছরের পর বছর ধরে মুসলমানদের ওপর পরিচালিত নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মুসলমানদের নিয়ে দ্বিমুখী নীতি আজ পশ্চিমাদের জন্য বুমেরাং হয়ে ফিরে এসেছে। গণভোটের মাধ্যমে খ্রিষ্টানপ্রধান দক্ষিণ সুদান এবং পূর্বতীমুরকে স্বাধীন করলেও পশ্চিমারা কাশ্মির, ফিলিস্তিন, চেচনিয়া আর মিন্দানাওয়ের জনগণের স্বাধীনতার আন্দোলনকে কোন সমর্থন জানায়নি। নিজেরা হাজারো পারমাণবিক বোমা বানালেও, এমনকি পারমাণবিক বোমা হামলা করে কয়েক লক্ষ মানুষকে হত্যা করলেও ইরানের বিরুদ্ধে এদের অভিযোগের অন্ত নেই। সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমাবিশ্ব আগ্রাসন চালিয়ে দখল করেছে ইরাক এবং আফগানিস্তান। আর পশ্চিমাবিশ্ব গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের শ্লোগান দিলেও, এসব শ্লোগানের কোন প্রয়োগ এবং কার্যকারিতা মুসলমানদের বেলায় নেই। এক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৯১ সালে আলজেরিয়ার নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলেও তাদেরকে ক্ষমতায় আসতে দেয়া হয়নি। ফিলিস্তিনের নির্বাচনে হামাস বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় এলেও পশ্চিমারা তাদেরকে স্বাগত জানায়নি বরং তাদেরকে সাহায্য বন্ধ করে দিয়েছে এবং ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মুসলিম দেশগুলোতে বছরের পর বছর ধরে ক্ষমতাসীন স্বৈরশাসকদেরকে এই পশ্চিমারাই ক্ষমতায় বসিয়েছে এবং সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে। আর পশ্চিমাদের এইসব অপকর্মের বিরুদ্ধে আজ জনগণ জেগে উঠেছে। সুতরাং পশ্চিমাদের উচিত মুসলিম বিশ্বের এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানানো এবং একই সাথে নিজেদের পরাজয়কে হাসিমুখে মেনে নেয়া। কারণ মানুষকে জোর করে যেমন কোন মূল্যবোধ গ্রহণ করানো যায় না, ঠিক তেমনি জোর করে তাকে তার ঐতিহ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখাও যায় না। জনগণ যদি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে পরাজয়কে হাসিমুখে বরণ করাটাই কিন্তু গণতন্ত্রের মূল কথা। আর যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাবিশ্ব যদি মুসলিম বিশ্বের এই পরিবর্তনকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ না করে কোন অগণতান্ত্রিক পথকে গ্রহণ করে তাহলে তা হবে মারাত্মক ভুল এবং তা পশ্চিমাদের জন্য আরো বেশি বিপর্যয় নিয়ে আসবে। কারণ নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে যে কোন ধরনের প্রতিবন্ধকতা নদীর প্রবাহকে সাময়িকভাবে বন্ধ রাখে মাত্র, কিন্তু পরবর্তীতে সেই নদীর প্রবাহ শুধু প্রতিবন্ধকতাকেই উৎখাত করে না বরং পুরো জনপদকেই ডুবিয়ে ধ্বংস করে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের উচিত মুসলিম দেশে দেশে ইসলামপন্থীদের এই উত্থানকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা এবং তাদের সাথে কাজ করা। আর ইসলামপন্থীদেরকে গালি দেয়া এবং তাদেরকে অবজ্ঞা করার সময় কিন্তু শেষ হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী ইসলামের অনিবার্য উত্থান, বিশ্বক্ষমতায় ইসলামের ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব এবং একই সাথে নিজেদের পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করাটাই হচ্ছে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকারের মূল কথা। ইতিহাসের এই অনিবার্য বাস্তবতাকে মেনে চলাই ভালো। আর এতেই বিশ্বমানবতার জন্য কল্যাণ নিহিত আছে।

SHARE

Leave a Reply