মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

islami-andolonড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

হোসনী মোবারক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মিসরে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের নবযুগের সূচনা হয়। ইখওয়ানুল মুসলিমুন গণতন্ত্রকে এবং জনসমর্থকে পুঁজি করে একটি শক্তিশালী মিসর গঠনে এগিয়ে যায়। মিসরে বিপ্লবীরা ‘নীল বিপ্লব’ সম্পন্ন করলেও ক্ষমতার স্বাদ তারা পায়নি। মোবারকের পতনের পর মিসরে সেনাবাহিনীই সরাসরি ক্ষমতা পরিচালনা করে। মাত্র ১৮ দিনের গণবিপ্লবে মিসরের লৌহমানব হোসনী মোবারকের পতন হয়েছে। মিসরে প্রচণ্ডভাবে জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহের আগুন। মানুষ নেমে এসেছে রাস্তায়। মরণকে তুচ্ছ জ্ঞান করে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছে, অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছে, তারপরও মিসরের অকুতোভয় বীর জনতা ছিল মরিয়া। এবার এসপার না হয় ওসপার। দীর্ঘকালের স্বৈরশাসন, জুলুম, বঞ্চনা, অত্যাচার, নির্যাতন শোষণ, লুণ্ঠনের অবসান ঘটানোর জন্য ‘নীল বিপ্লব’ সফল করেছে।
কিন্তু নীল বিপ্লবের পর আরব বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেশটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করেছে। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ আরব বসন্তের এ বছরকে ধারণ করেছে। ২০১১ সালে মিসর অস্থির সময় পার করেছে। সে সময় ধারণা করা হয় ২০১২ সাল হবে মিসরের জন্য পরিবর্তনকে ফলপ্রসূ রূপ দেয়ার বছর কিংবা আরো রক্তপাত ও সঙ্ঘাতের বছর। মিসরে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ইসলমাপন্থী রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য এটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে গণজাগরণের যে ‘আরব বসন্ত’ শুরু হয়েছে তা মিসর বা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণে নির্মাণে কী ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা হচ্ছে। আরব বসন্তের প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি প্রতিফলিত হয়েছে মিসরে এবং এখানে ইসলামি পুনরুত্থানের ঝাণ্ডা বহনকারী রাজনৈতিক দল ভবিষ্যৎ জাতিরাষ্ট্রের নীতনির্ধারক নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করেছে যা অপ্রতিরোধ্য, অবশ্যম্ভাবী। মিসরে গণজারগণ সুশিক্ষিত নেতৃত্ব আর আবালবৃদ্ধবনিতা জনসাধারণের আবেগ অনুভূতিতে একাকার হয়ে শক্তশালী গণমঞ্চের জন্ম দিয়েছে। এর মূল চালিকাশক্তি দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের নির্দেশনায় লালিত এবং তারুণ্যের অভিযান পরিচালনার চেতনায় উজ্জীবিত। এ মঞ্চে ‘কেন্দ্র-প্রান্ত’ সম্পর্ক নির্ধারণের শোষণ বঞ্চনাময় সংস্কৃতি অনুপস্থিত এবং কেবল গণস্বার্থে গণচেতনার মুহ্যমান মুখচ্ছবিই গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিবিম্বিত হয়েছে সর্বত্র।
সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি ও ইহুদিবাদের দোসর ও শোষণ বঞ্চনার চারণকেন্দ্র মিসরের অত্যাচারী শাসক হোসনি মোবারকের পতন অনিবার্য হয়ে পড়ে কায়রোর আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্থিত আন্দোলনের ফলে, যা পরে ধূমায়িত আবেগে বিস্ফোরিত হয়ে কায়রোসহ সমগ্র মিসরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদী তরুণেরা তাহরির স্কয়ারে বিরতিহীন অবস্থান করে হোসনী মোবারকের দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটায়। এই প্রতিবাদী তরুণদের বেশির ভাগ মিসরে বহুকাল ধরে নিষিদ্ধ ঘোষিত ইখওয়ানুল মুসলিমুনের (মুসলিম ব্রাদারহুড) সদস্য ও সমর্থক। আর আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিক্ষা ও চেতনা, যা তাহরির স্কয়ারে বিমূর্ত বিপ্লবের বিস্ফোরণোম্মুখ হয়ে ওঠে তা অনাগত দিনে মিসরে আর্থসামাজিক কাঠামো নির্ধারণে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
নীল বিপ্লবের পর হোসনি মোবারক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলেও মিসরের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর প্রভাব পুরো মাত্রায় রয়েছে। ২০১১ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে মিসরের জটিল সাধারণ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মোট তিনটি পর্যায়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ হয়েছে ২০১২ সালের মার্চে। প্রথম দফায় ৫০৮ সদস্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষের নির্বাচন হয়েছে। শক্তিশালী শূরা কাউন্সিলের ২৭০ সদস্যের নির্বাচন হয়েছে ২০১২ সালের ২৯ জানুয়ারি থেকে ১১ মার্চ। নির্বাচনী জরিপে দেখা গেছে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের রাজনৈতিক সংগঠন ‘ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি’ পার্লামেন্টে সর্বাধিক আসন পাবে।01
এক বছর আগে অর্থাৎ ২০১০ সালে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত মিসরের মসজিদের ইমামরা ঈদের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সামরিক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনা করতেন। কিন্তু মোবারক গদি হারিয়েছেন, মিসর বিপ্লবের প্রায় ৯ মাস পর ২৮ নভেম্বর ২০১১ সংসদ নির্বাচন। সময় খুব কম। ফলে ঈদুল আজহা ও নির্বাচনী প্রচারাভিযান একই সাথে শুরু হয়েছে। মুস্তফা মাহমুদ মসজিদের পাশে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সদস্যরা একটি গরু ও তিনটি ভেড়া জবাই করেছে। গোশত রান্নার করে গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। ইখওয়ানের একজন কর্মীর বক্তব্য, উৎসবের এই দিনগুলিতে যাদের কিছুই নেই, তাদের আমরা খাবার দিচ্ছি। পরম করুণাময় আল্লাহ ও ইসলামী আদর্শ আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। নীল বিপ্লবের পর পরিস্থিতি সত্যিই বদলে যায়। বহু দশক পর ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সদস্যরা প্রকাশ্যে ঈদ পালন করতে পারছেন এবং দলের প্রচারও চালাতে পেরেছেন। এ দলের কর্মীরা পরিবর্তিত পরিস্থিতির ও সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন। এক বাটি গরম ভাত ও গোশত হাতে এক হতদরিদ্র নাগরিকের কণ্ঠে শোনা গেল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতি কৃতজ্ঞতার সুর। তিনি বললেন, আমি ইখওয়ানুল মুসলিমুনকেই ভোট দেবো। ইখওয়ানুলই মিসরে ন্যায় ও ইনসাফের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। তারা দুর্নীতি করবে না, তাদের হাত পরিষ্কার। এরাই মিসরের গণতান্ত্রিক ও ইসলামী ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করে তুলবে।
নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকেরা অনুমান করেছেন, সাধারণ নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমুন সবার থেকে এগিয়ে আছে। তবে নির্বাচনী প্রচারে তারা একক প্রাধান্যশীল নয়। সেনাসমর্থিত ক্ষমতাসীনরা এবং দেশের বড় বড় ব্যবসা বাণিজ্য কুক্ষিগতকারী সেনাবাহিনী তাদের সেক্যুলার অনুগামীদের নিয়ে জোরালো নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে। তারা রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে অবকাঠামো উন্নতির ঝুরিঝুরি প্রতিশ্রæতি দিয়েছে। গিজের গভর্নর আবদেল রহমানও তাদের মধ্যে রয়েছেন।
মিসরের সাধারণ নির্বাচনে ইসলামপন্থীদের পুনরুত্থানের আশঙ্কায় ভীত ইসরাইল ও পশ্চিমা সরকারগুলো মিসরের সামরিক স্বৈরশাসকের সাথে সম্পর্কের কারণে মিসরে গণতন্ত্র প্রবর্তন ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিষয়টিতে দোদুল্যমানতায় ভুগছে। ফলে বিশ্বের অনত্র গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ব্যাপারে সোচ্চার থাকলেও হোসনি মোবারকের মত স্বৈরশাসকের সঙ্গে তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। মোবারকের পতনের পর সেক্যুলার বামপন্থী ও মোবারকের অনুসারীরা নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসুক এটাই পাশ্চাত্য শক্তির কামনা। (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply