মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

ইখওয়ানুল মুসলিমুন বা মুসলিম ব্রাদারহুড আনোয়ার সাদতের শাসনামলের মাঝামাঝি সময়ে (শাসনকাল ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭০-৬ অক্টোবর ১৯৮১) মিসরে ইসলামী আন্দোলনের কাজে নিউক্লিয়াসের ভূমিকা পালন করলেও তারা দৃশ্যমান কেন্দ্রীয় ভূমিকায় না এসে সাইডলাইনে অবস্থান নেয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা এবং সাদতবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে জনগণের কাছে কোনো ভুল বার্তা যেন না যায়, ইখওয়ানুল মুসলিমুন সে ব্যাপারে সতর্ক ছিল। শাসনক্ষমতায় ইখওয়ানুল মুসলিমুন চলে আসতে পারে, এমন আশঙ্কা তৈরির ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ সময় বিরূপ প্রচারণা শুরু হয়।
পাশ্চাত্যে এবং খোদ মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমুন নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ ও ইসলামী শরিয়ার ব্যাপারে নিরাপস হওয়ায় পশ্চিমারা ইখয়ানুলের ব্যাপারে ভীত। একই কারণে মিসরের সেনাবাহিনীও ইখওয়ানকে সহ্য করতে চায় না। মিসরীয় সেনাবাহিনী শুধু পশ্চিমা সামরিক প্রশিক্ষণ ও কালচারই ধারণ করেনি; সেনাবাহিনী বিপুল পরিমাণ মার্কিন সহায়তারও ভাগীদার। এ ছাড়া সেনাবাহিনী প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশের লাভজনক অনেক ব্যবসায়িক প্রকল্পেও যুক্ত ছিল। শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত মিসরকে ইসরাইলের বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করার পেছনে সেনাবাহিনী সবিশেষ ভূমিকা পালন করে। মার্কিন লেজুড়বৃত্তি থেকে সেনাবাহিনী বেরিয়ে না এলে তারা ইসরাইলের বিরুদ্ধে কখনোই জনমতের প্রতিধ্বনি করতে পারবে না।
১৯৭৩ সালের ৬ অক্টোবর থেকে মিসর-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু হয়। হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের জন্য মিসরের সেনাবাহিনী সুয়েজ খাল অতিক্রম করে। এতে ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধের সূচনা হয়। ১৮ দিন স্থায়ী এ যুদ্ধ ‘অক্টোবর যুদ্ধ’ বা ইয়াস কাপুরের যুদ্ধ নামেও প্রসিদ্ধ।
কারণ ইহুদিদের বার্ষিক ইয়াস কাপুর উৎসবের দিনে এ হামলা শুরু হয়। মিসর এ যুদ্ধে প্রথমে বেশ সাফল্য লাভ করে। সুয়েজের মতো কঠিন বাধা অতিক্রম করে মিসরীয় বাহিনী পৃথিবীর যুদ্ধ ইতিহাসের এক দুঃসাহসিক আক্রমণে ইসরাইলের দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যূহ বিখ্যাত বারলেভ লাইন সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত করে বিদ্যুৎগতিতে সামনে এগিয়ে চলে। বিপর্যস্ত ইসরাইলকে রক্ষার জন্য মস্কো ও ওয়াশিংটন দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে। পরে অচিরেই ইসরাইল ধাক্কা সামলে ওঠে। পরে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘটে।
১৯৭৪ ও ১৯৭৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের প্রচেষ্টায় ইসরাইল ও মিসরের মধ্যে যথাক্রমে সিনাই-১ এবং সিনাই-২ নামে দু’টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে একটি বাফার অঞ্চলের দ্বারা ইসরাইলি ও মিসরীয় সৈন্যরা বিচ্ছিন্ন হয়। মিসর তার কয়েকটি তেলক্ষেত্র ফিরে পায়। ১৯৭৫ সালে সুয়েজ খালও খুলে দেয়া হয়। সিনাই চুক্তির সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিসরে বর্ধিত সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও জড়িত ছিল। চুক্তি সম্পাদনের পর একদিকে মিসরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সাহায্য আসতে থাকে। অন্য দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া কিছুটা সফলতা লাভ করে ১৯৭৭ সালের ১৯ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট সাদাতের জেরুসালেম সফর এবং ইসরাইলি পার্লমেন্টে (নেসেটে) ভাষণ দেয়ার নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোত এর সাংঘাতিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। তারা এ সফরের নিন্দা করে এবং আরব ঐক্য বিনষ্ট করার দায়ে মিসরকে সরাসরি অভিযুক্ত করে।
১৯৭৮ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের পৃষ্ঠপোষকতায় মিসরের প্রেসিডেন্ট সাদত ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন এক আলোচনায় মিলিত হন। আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশ্রামনিবাস মাার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের অন্তর্গত ক্যাম্পডেভিড নামক স্থানে। তের দিন আলোচনার পর সাদত ও বেগিন দু’টি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর একটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিপ্রক্রিয়ার রূপরেখা। প্রথম চুক্তিমতে ইসরাইল অধিকৃত (জর্ডন নদীর) পশ্চিমতীর ও গাজা ভূখ-ের অধিবাসীদের ৫ বছরের মধ্যে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও নিজস্ব সরকার গঠনের সুযোগ এবং দ্বিতীয়টিতে ১৯৭৮ সালের ১৭ ডিসেম্বরের মধ্যে মিসর ও ইসরাইলের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের অঙ্গীকার করা হয়। শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত শান্তিচুক্তিটি সম্পাদিত হয় আবশ্য ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে। চুক্তির সারাংশ ছিল : ১. জাতিসংঘের ফিলিস্তিন সংক্রান্ত ম্যান্ডেটে উল্লিখিত সীমানাই হবে দুই দেশের স্বীকৃত রাষ্ট্রসীমা। তিন বছরের মধ্যে সিনাই থেকে ইসরাইলের সামরিক বেসামরিক উপস্থিতি প্রত্যাহার করা হবে। ২. সমগ্র সিনাই উপত্যাকা থেকে ইসরাইল সরে যাবার পর মিসর ও ইসরাইলের মধ্যে দূত বিনিময়সহ শান্তিপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা হবে। ৩. দুই দেশ পরস্পরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে মেনে চলবে ও শ্রদ্ধা করবে। ৪. চুক্তি স্বাক্ষরের এক মাসের মধ্যেই গাজা ও পশ্চিমতীরের ফিলিস্তিনিদের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে আলোচনা শুরু হবে এবং তা শেষ করতে হবে এক বছরের মধ্যেই। ক্যাম্পডেভিড চুক্তির ফলাফল হচ্ছে এর মাধ্যমে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং ১৯৪৮ সালের যুদ্ধে ফিলিস্তিনের যে বিরাট অঞ্চল ইসরাইল দখল করে নিয়েছিল তাকেও পুরোপুরি বৈধ করে দেয়া হয়। তা ছাড়া গাজা ও জর্ডন নদীর পশ্চিম তীরের ওপর ফিলিস্তিনি জনগণের সার্বভৌম অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বরং ফিলিস্তিনিদের জন্য এখানে স্বায়ত্তশাসনের কথা বলে এ অঞ্চলের সার্বভৌমত্বটা যেন ইসরাইলের হাতেই তুলে দেয়া হয়েছে। চুক্তির শর্তানুসারে ইসরাইল সিনাই থেকে পর্যায়ক্রমে তার উপস্থিতি প্রত্যাহার করলে ১৯৮২ সালে তেলসমৃদ্ধ ও সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূূর্ণ বিশাল সিনাই মিসরের পূর্ণ অধিকারে আসে। ৫. ইসরাইলের সাথে মিসরের একক চুক্তি স্বাক্ষর নতুন এক আরব অনৈক্যের জন্ম দেয়। ১৯৭৯ সালে মার্চে বাগদাদে আরব লিগ পরিষদের বৈঠকে মিসরকে লিগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এবং তার ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৭৯ সালের মে মাসে ওআইসি মিসরের সদস্যপদ সাময়িকভাবে বাতিল করে। এভাবে মিসর জাতি কিছুকালের জন্য আরব রাষ্ট্রগুলোসহ ইসলামী উম্মাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মিসরের অভ্যন্তরেও এর প্রতিক্রিয়া হয়। ইখওয়ানুল মুসলিমুন ক্যাম্পডেভিড চুক্তির সমালোচনা করে এবং তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
আনোয়ার সাদতের আমলেও মিসরে একদলীয় স্বৈরশাসন চালু থাকে। আনোয়ার সাদত ১৯৭৮ সালে ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এনডিপি প্রতিষ্ঠা করেন। এ দলের মাধ্যমেই তিনি স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু করেন। দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার দাবির মুখেও প্রেসিডেন্ট সাদত সে দাবি মেনে নেয়া দূরে থাক, উল্টো বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হয়রানি, জেল-জুলুম ও নির্যাতনের দিকে ঠেলে দেন। ১৯৮১ সালের প্রথম দিকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মিথ্যা অজুহাতে প্রায় দুই হাজার ইখওয়ান নেতাকর্মীকে জেলে নেয়া হয়। বিখ্যাত আদ দাওয়া পত্রিকার সম্পাদক ও ইখওয়ানের মুর্শিদে আম সাইয়েদ ওমর তিলমিসা নাকিকেও জেলে রাখা হয়। ১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর সামরিক বাহিনীর কয়েকজন সদস্যের হাতে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদত নিহত হন। হত্যাকা-ের ঘটনার পর মিসরে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। ভাইস প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাদতের স্থলাভিষিক্ত হন।
আনোয়ার সাদতের (শাসনকাল ১৯৭০-১৯৮১) অপ্রিয়তা ও পতনের অনেক কারণ চিহ্নিত করা যায়। ক্যাম্পডেভিড চুক্তি মিসরবাসী ও আরব জনগণকে হতাশ করে। সাদত মিসরবাসীদের নিকট নিন্দিত হন, আরব জনগণ তাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী বলে প্রত্যাখ্যান করে। ফলশ্রুতিতে মিসর আরব লিগ থেকে বহিষ্কৃত হয় এবং লিগের হেডকোয়ার্টার্স কায়রো থেকে তিউনিসে স্থানান্তরিত হয়। ওমান ও সুদান ব্যতীত সব আরব রাষ্ট্রই মিসরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। তেলসমৃদ্ধ আরব দেশসমূহ মিসরে তাদের অনুদান বন্ধ করে দেয়। এ পরিস্থিতিতে সাদত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরো নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। তার পতনের পথ সূচিত হয়। প্রকৃতপক্ষে ক্যাম্পডেভিড চুক্তি সাদতের মৃত্যুঘণ্টাকে ত্বরান্বিত করে।
সাদতের নিহত হওয়ার আরো যে কারণসমূহ চিহ্নিত করা হয়। তার মধ্যে সাদতের অর্থনৈতিক উদারীকরণ পলিসি অন্যতম। এই উদারীকরণের মাধ্যমে মিসরে দরকারী সেক্টরগুলোতে উন্নতি হয়নিÑ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়েনি। যা বেড়েছে তা হলো ক্ষমতাসীন এলিট শ্রেণীর বিলাসিতাÑ ভাগ্যের পরিবর্তন আর ব্যাপক জনগণের জন্য দুস্থতা। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য প্রাপ্ত সৌভাগ্যবানদের অনেকেই সাদতের ব্যক্তিগত বন্ধু ছিলেন। সাদত নিজেও এ বিলাসিতার অংশীদার হয়েছিলেন। তিনি কায়রোর উপকণ্ঠে নিজের জন্য ভিলা, প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ এবং এমনকি পুরনো রাজকীয় প্রাসাদে তার একটি অফিসও স্থাপন করেছিলেন যার জন্য মিসরবাসী তাকে দ্বিতীয় রাজা ফারুক বা দ্বিতীয় খেদিব ইসমাইল বলে সম্বোধন আরম্ভ করে। তার স্ত্রী জোহানও এই বিলাসিতার অংশীদার ছিলেন। তার ও জোহানের পশ্চিমা ধাঁচের চালচলন এবং ফেরাউনী স্টাইলের রাজকীয় আচরণ জনগণের নিকট দৃষ্টিকটু ঠেকতো।
মিসরের ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে সাদত শান্তিতে থাকতে দেয়নি। কিন্তু ইখওয়ান জনগণের মাঝে তাদের তৎপরতা জোরদার করে। ইসলামের প্রতি মিসরীয়দের গভীর আবেগানুভূতি ও আকর্ষণকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য সকল ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৮১ সালের ৬ অক্টোবর আনোয়ার সাদত যখন তার ‘সুয়েজ অতিক্রমের’ অষ্টম বার্ষিকীতে প্যারেড পরিদর্শন এবং সেনা অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন তখন সেনা লাইনের মার্কিন যুক্তারষ্ট্রে নির্মিত একটি গাড়ি থেকে হঠাৎ করেই তাকে তাক করে অবিশ্রান্ত গুলিবর্ষণ আরম্ভ হয়। সাদত মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। অবস্থার অপ্রত্যাশিত এ ঘটনায় বিদেশী কূটনীতিকসহ উপস্থিত সকলেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। প্যান্ডেলে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কিন্তু যা হবার তা হয়ে গেছে। সাদতের স্বৈরশাসনের যবনিকাপাত হয়। শেষ হয় ১১ বছরের অনিশ্চিত, বিতর্কিত এবং নিন্দিত শাসনের।
হোসনী মোবারক ক্ষমতাসীন হন। সাদতের মৃত্যুতে হোসনী মোবারক তার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৮১ সালের অক্টোবর মাসেই প্রেসিডেন্ট পদে শপথ গ্রহণ করেন। ক্ষমতার এই পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে সমাধা হলেও সাদতের আমলের অভ্যন্তরীণ টেনশনের অবসান হয়নি। হোসনী মোবারক জামাল আবদুন নাসের এবং আনোয়ার সাদতের ন্যায় সেনাবাহিনী থেকে এলেও তিনি তাদের বিপরীতে ধীরস্থির এবং কালক্ষেপণে একজন আমলার প্রতিভূ। মোবারক ছিলেন মিসরের বিমান বাহিনীর প্রধান। অবসরে যাবার পূর্বে সাদত তাকে ১৯৭৫ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করেন।
ক্ষমতায় এসে মোবারক কিছুটা ভিন্ন নীতি ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ক্ষমতায় এসেই তিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার অঙ্গীকার করেন। ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে (এনডিপি) পুনর্গঠন করে কিছুটা গণমুখী করে তোলেন। ১৯৮৩ সালের ১৯ জুলাই মিসরীয় পার্লামেন্ট একটি বিতর্কিত নয়া নির্বাচনী আইন অনুমোদন করে। এ আইন অনুযায়ী কোনো দল নির্বাচনে ১০ শতাংশের কম ভোট পেলে এক কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টে আসন লাভে অযোগ্য বিবেচিত হয়। নয়া আইনে স্বতন্ত্র মনোনীত প্রার্থীদের স্থলে শুধু দলীয় মনোনীত প্রার্থীরাই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে। সংসদের আসনে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। ১৯৮৪ সালের ২৭ মে দীর্ঘ ৩০ বছর পর বহুদলীয় অংশগ্রহণের ভিত্তিতে মিসরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে বিরোধী ওয়াকদ পার্টি-ইখওয়ানুল মুসলিমুন জোট ৫৮টি আসন লাভ করে। শতকরা ১০ ভাগ ভোট পেতে ব্যর্থ হওয়ায় কোনো বামপন্থী দল এ নির্বাচনে কোনো আসন লাভ করেনি। ওয়াকদ পার্টির টিকেটে এ সংসদে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ১০ জন সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৮২ সালে ক্যাম্পডেভিড চুক্তির ফলাফল গৌণ হয়ে যায়। ১৯৮২ সালের জুনে ইসরাইলের লেবানন আক্রমণের প্রতিবাদে মিসর ইসরাইল থেকে রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে। এ সময়ে উভয় দেশ আবার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের পুরনো অবস্থানে ফিরে আসে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী আইজাক শামীর মিসরের বিরুদ্ধে চুক্তি অমান্যের অভিযোগ আনেন। মিসরের সংবাদপত্রেও ইসরাইল বিরোধী প্রচার জোরদার হয়। ইসরাইল মিসরের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক ও পর্যটক বিনিময় বন্ধ রাখার অভিযোগ আনে। ইসরাইলিরা মিসর ভ্রমণে আগ্রহী হলেও মিসরীয়রা ইসরাইলে যেতে উৎসাহী নয়।
সাদতের আমলের পররাষ্ট্রনীতি অক্ষুণœ রাখলেও প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক অন্যান্য আরব দেশ ও ইসলামী উম্মাহর সাথে মিসরের বিচ্ছিন্নতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। ১৯৮৫ সালে মরক্কোর কাসাব্লাঙ্কায় অনুষ্ঠিত চতুর্থ ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে মিসর ওআইসি’র সদস্যপদ ফেরত পেয়েছে।
হোসনী মোবারক সরকারের আমলে ব্যাপক মিসরীয়দের পক্ষ থেকে ইসলামী আইন-কানুন চালু করার দাবি উত্থাপিত হয়। এ প্রেক্ষিতে মোবারক সরকার কায়রো হাইকোর্টের বিচারপতির নেতৃত্বে একটি ইসলামী আইন প্রণয়ন কমিটি গঠন করেন।
১৯৮৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারক ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী শিমন পেরেজ ২৪ ঘণ্টার এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়ে ১৯৮৭ সালকে মধ্যপ্রাচ্য শানিত আলোচনার বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেন। শীর্ষ বৈঠকে ফিলিস্তিনিদের প্রসঙ্গে আলোচনায় তেমন অগ্রগতি না হলেও মিসর ইসরাইলে আবার রাষ্ট্রদূত পাঠাবে মিসরের প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসে।
১৯৮৭ সালের ৬ এপ্রিল মিসরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় তারা সোসালিস্ট লেবার পার্টির নামে নির্বাচনে অংশ নেয়। সোসালিস্ট লিবারেল পার্টিও এতে যোগ দেয়ায় এটি মূলত ত্রিদলীয় ঐক্যজোটে পরিণত হয়। এ নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমুন ৪২টি আসন লাভ করে সংসদে শক্তিশালী গ্রুপ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
ইখওয়ানুল মুসলিমুন নব্বইয়ের দশকে এসে মানব সেবার সুন্নাহকে জোরালোভাবে পুনরুজ্জীবন করে। নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় ইসলামকে বিজয়ী করার সংগ্রামে যত রকম কাজ করা সম্ভব তারা সব কাজেই তৎপর থাকে। সমাজ উন্নয়নে ব্রতী হয়ে ইখওয়ান বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সাথে নিজেদের সম্পৃক্ত করে সমাজে আকর্ষণীয় স্থান করে নেয়। তারা দাতব্য চিকিৎসালয়, হাসপাতাল, কর্মরত নারীদের সাহায্যার্থে শিশুদের দেখাশোনার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার এবং দরিদ্রদের আইনি সহায়তার জন্য প্রতিষ্ঠান গঠন করে জনসাধারণের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ইখওয়ান ইসলামী আন্দোলনকে পরিব্যাপ্ত করে।    (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply