মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

অনেকের মতে মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের মানব সেবার বহুবিধ কর্মকাণ্ড মিসরীয় ইতিহাসে একটি নীরব বিপ্লব সাধন করেছে যা হয়তো কোনো সময়ে ভোটের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা লাভে সহায়ক হবে। নব্বইয়ের দশক এবং বর্তমান শতাব্দীর সুছনালগ্নেপেশাজীবী প্রতিষ্ঠানসমূহে নির্বাচনের ফলাফল তা প্রতীয়মান করছে।
ক্ষমতার কর্তৃত্বায়ন ও বর্ধিতায়নে হোসনী মোবারক (জন্ম ১৯২৮) গণতন্ত্রের ছত্রছায়ায় প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনেই দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করেছেন বলে নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতামতে প্রকাশিত হয়। হোসনী মোবারকের শাসনামলে (৭ অক্টোবর ১৯৮১-১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১) নির্বাচন দু’প্রকারে হতে থাকে : প্রথম প্রকারে পার্লামেন্ট নির্বাচন দলীয় গণতন্ত্রের আওতায় এবং দ্বিতীয় প্রকারে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গণভোটের মাধ্যমে। গণতান্ত্রিক পার্লামেন্ট নির্বাচন ১৯৮৪ সনে, ১৯৮৭ সনে, ১৯৯৫ সনে, ২০০০ সনে, ২০০৫ সনে অনুষ্ঠিত হয় যার প্রত্যেকটিতেই বুথের ভেতরে এবং বাইরে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। শেষোক্ত নির্বাচন যদিও দুর্নীাতর অভিযোগ খণ্ডনের মানসে হোসনী মোবারকের নির্দেশে বাহ্যত বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধানে হয়েছে, তবু ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডস-এর একজন পর্যবেক্ষকের অভিমতে তার বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। তিনি মন্তব্য করেছেন, ‘বিচার বিভাগ ভোট কেন্দ্রের ভেতরে নির্বাচন তদারকি করেছে। কিন্তু কেন্দ্রের বাইরেত করেনি। ভোটকেন্দ্রের বাইরে ভোটারদেরকে নিরাপত্তারক্ষীরা বিভিন্ন অজুহাতে বাধা দিয়েছে যাতে তারা কেন্দ্রে ভোট দিতে প্রবেশ করতে না পারে। এতদসত্ত্বেও ২০০০ এবং ২০০৫ সনের সাধারণ নির্বাচনে হোসনী মোবারকের দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) ভরাডুবি লক্ষ্য করে ক্রয়ের মাধ্যমে স্বতন্ত্রদের সরকারি দলে আনয়ন করার অভিযোগ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ১৯৯৩, ১৯৯৯ এবং ২০০৫ সালের নির্বাচনেও তথা গণভোটেও একই ধরনের কারচুপির অভিযোগ করা হয়েছে। এক রক্তাক্ত প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় আসার পর রুটিন করেই হোসনী মোবারক দেশে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতেন। এ নির্বাচনে তার তার কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী থাকত না। একটি মাত্র নাম থাকতো ব্যালট পেপারে এবং ‘সব ভোটার তাকে ভোট দিত’। তবে চতুর্থবারের নির্বাচনে (২০০৫) তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেনে নেন। এ নির্বাচনে মিসরের বিরোধী দল আল গাদ পার্টির নেতা ড. আয়মন নূর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। যদিও প্রেসিডেন্ট হোসনী মোবারকের সাথে তার ভোটের ব্যবধান ছিল অনেক বেশি। এই নির্বাচনের পর ড. আয়মন নূরকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। হোসনী মোবারককে চ্যালেঞ্জ করার জন্যই তাকে ওই সাজা দেয়া হয়েছে। আরো কয়েকজন প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ৮৮ শতাংশ ভোট পেয়ে হোসনী মোবারকের জয়ী হতে কোনো সমস্যা হয়নি। তিনি সব ক্ষমতা কুক্ষিগত রেখেছিলেন। তিন দশক আগে দায়িত্ব গ্রহণের সময় তিনি ছিলেন দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট। কিন্তু নিজের শাসনামলে এ পদে কাউকে নিয়োগ দেননি। তার শাসনের শেষের দিকে জনমনে ধারণা হয়, পুত্র জামাল মোবারককে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব অর্পন করা হবে। জামাল ক্রমে ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এনডিপি) সর্বময় ক্ষমতা হাতে নেয়ায় এ ধারণা জোরালো হতে থাকে। হোসনী মোবারক বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, আজীবন তিনি দেশের সেবা করতে চান। জনসাধারণ এটাকে আমৃত্যু প্রেসিডেন্ট থাকার বা ক্ষমতায় থাকার অভিলাষ হিসেবেই দেখত। তিনি ১০০ ভাগ ভোটে বারবার নির্বাচিত হয়েছেন কিন্তু তার প্রতি জনগণের সমর্থন যে আদৌ ছিল না, তার প্রমাণ ছিল ২০১১ সালে মিসর জুড়ে বিক্ষোভের ঘটনা। হোসনী মোবারক মিসর ও ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। কিন্তু এ সম্পর্ক তাকে গণতান্ত্রিক গণঅভ্যুত্থান থেকে রক্ষা করতে পারেনি।
হোসনী মোবারকের শাসনামলে মিসরে ইসলামী আন্দোলনের প্রভাব গভীরভাবে সূচিত হয়। ক্ষমতাসীন এলিটরা এটা স্পষ্ট বুঝতে পারে যে, মিসরের যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে যেভাবে ইসলামকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় বাস্তবায়নের জযবা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হয় তারা ইসলাম ও ইসলাম বিরোধী শক্তির মধ্যে কোনো রকম আপস চায় না। মিসরের যুব সম্প্রদায় ইখওয়ানুল মুসলিমুনের নেতৃত্বে এ সময়কালে তাদের চারিত্রিক পুনর্গঠনের দিকে জোর দিয়েছে।
হোসনী মোবারক জরুরি অবস্থা চালিয়ে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা চালিয়েছেন। ২০০৮ সালে এসে মিসরের পার্লামেন্ট সে দেশে জরুরি আইন আরো দুই বছর বাড়ানোর পক্ষে মত দেয়। সেখানকার পিপলস অ্যাসেম্বলি এ সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অতীতে বহুবার মোবারক সরকারের পক্ষ থেকে জরুরি আইন সন্ত্রাস বিরোধী আইন দ্বারা পরিবর্তন করা হবে বলে বলা হয়েছে। মিসরে ১৯৮১ সাল থেকে জরুরি আইন বলবৎ করা হয়। এর মাধ্যমে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে ব্যাপক ক্ষমতা দেয়া হয়। মিসরের নাগরিকদের কোনো প্রকার চার্জ ছাড়াই ধরার ক্ষমতা দেয়া হয় তাদেরকে। পার্লামেন্টে ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আহমদ নাজিফ বলেছেন, দুই বছরের মধ্যে সন্ত্রাস বিরোধী আইন করা খুবই কঠিন। দুই বছর আগে পার্লামেন্টে বলেছিলাম, আমি আশা করছি সরকার দুই বছরের মধ্যে এ ধরনের একটি আইন তৈরি করতে পারবে। কিন্তু অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পর্যাপ্ত সময় না নিয়ে এ ধরনের একটি আইন তৈরি করা হলে তা বিপর্যয় ডেকে আনবে। তার মতে, জনগণের স্বাধীনতা এবং দেশের নিরাপত্তাÑ এই দু’টি বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জরুরি আইন কেবল সন্ত্রাস দমন ও মাদক বিরোধী অভিযানে ব্যবহৃত হবে, রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরনের জন্য নয় বলে মন্ত্রী প্রতীজ্ঞা করেছেন।
ইখওয়ানুল মুসলিমুনের এমপিদের প্রতিবাদের মুখে আহমদ নাজিফ অন্যান্য এমপিদের এই আবেদন জানান যে, তারা যেন দেশের স্তায়ীত্বকে সন্ত্রাসী ও দুষ্কৃতিকারীদের হাত থেকে রক্ষা করেন। এ সময় মিসরের জনপ্রিয় সাপ্তাহিক আল-আহরাম পত্রিকা জানিয়েছে, সেখানকার সিভিল সোসাইটি বিরোধী দলের সাথে যুক্ত হয়ে জরুরি আইনের মেয়াদ বাড়ানোর নিন্দা করেছে। ২৭ বছরের পুরনো জরুরি আইনকে জনগণের বাক-স্বাধীনতা হরন এবং বিক্ষোভ দমনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার জন্য ক্ষমতাসীন দলকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। বিরোধী দলীয় ১০৩ জন এমপি’র এক বিবৃতিতে বলা হয়, থানায়, কারাগারে রিমান্ডে বন্দীদেরকে শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে ২৭ বছর ধরে জরুরি আইন ব্যবহার করা হচ্ছিল। বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেন, জরুরি আইন চালু রাখার মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানোর মাধ্যমে হোসনী মোবারক সরকার সবাইকে জানিে দিল যে, মিসরের স্থিতি নির্ভর করছে এ ধরনের আইনের উপর যা দেশে বিনিয়োগ আসার জন্য মোটেই সহায়ক নয়। মিসরের মানবাধিকার সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল হাফিজ আবু সাঈদ বলেন, জরুরি আইনের অধীনে দেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। এতে প্রতীয়মান হয়, মিসরের সব সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা না করে সামরিক কায়দায় সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। আল আহরামের পলিটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রাজনৈতিক বিশ্লেষক দিয়া ওশওয়ান বিশ্বাস করেন, জরুরি আইনেন মেয়াদ বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার বেছে নিয়েছে; কেননা এটা উঠিয়ে দিলে তার অর্থ হবে জরুরি আদালত উঠে যাওয়া। হোসনী মোবারক সরকারের এ পর্যায়ে এসে সমস্যা হলো, জরুরি আইন বাতিল করলে তা তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের এমপিরা অভিযোগ করেন, ১৯৮৭ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তাদের ৫০ হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থককে জরুরি আইনের আওতায় আটক রাখা হয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই তাদের অধিকাংশ বারবার গ্রেফতার হয়েছেন। অন্যদের জরুরি এবং সামরিক ট্রাইব্যুনালে দেয়া হয়। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের এমপি মোহাম্মদ আলবেল তাগুই এ কথা বলেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জরুরি অবস্থা এভাবে দীর্ঘায়িত করা মিসরের জন্য ক্ষতিকর এবং গণতন্ত্র বিরোধী পদক্ষেপ। এ রকম জরুরি অবস্থার মাধ্যমে শুধু শাসক শ্রেণীই উপকৃত হয়।
(চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply