মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম


স্বৈরাচারী হোসনি মোবারক সন্ত্রাসী বাহিনী, পুলিশ ও অনুগত সেনাবাহিনী নামিয়েও গদি ঠেকাতে পারেননি। মিসরে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা, হতাহতের খতিয়ান, পোটোয়াদের সন্ত্রাস ও সহিংসতা সবদিক থেকে মিসরীয়গণ বিদ্রোহে সারাবিশ্বের নজর কেড়েছে অনেক বেশি

(গত সংখ্যার পর)
তিন দশকের স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল ২০১০ সালের ২৫ জানুয়ারি। প্রচণ্ড গণআন্দোলনের মুখে তার পতন ঘটে ১০ ফেব্রুয়ারি। হোসনি মোবারক ক্ষমতায় এসেছিলেন ১৯৮১ সালে ১০ অক্টোবর। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত নিহত হওয়ার আটদিন পর ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা হিসেবে হোসনি মোবারক চারবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেগুলো এমন নির্বাচন ছিল যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীরা পাত্তাই পেতেন না। শেষ বার ২০০৫ সালের নির্বাচনে হোসনি মোবারক কোনো প্রতিদ্বন্দীকেই দাঁড়াতে দেননি।
সময়ে সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও মিসর আসলে ছিল অঘোষিত সামরিক শাসনের অধীনে। এর শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে রাজা ফারুককে উৎখাত করার পরে থেকে। প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন জামাল আবদুল নাসের। জামাল আবদুল নাসেরের আমলে ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইলোর সঙ্গে মিসরের যুদ্ধ হয়েছিল। সে যুদ্ধে গোটা বিশ্ব দাঁড়িয়েছিল মিসরের পক্ষে। প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের সে সময় জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। এমন অবস্থান সম্মানজনক হলেও মিসরের ইসলামী আন্দোল মুসলিম ব্রাদারহুডের উপর তিনি নির্মম নির্যাতন চালিয়ে ছিলেন, মিসরেকে তিনি গণতন্ত্রের পথে এগুতে দেননি।
১৯৭০ সালে জামাল আবদুল নাসেরে মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসেছিলেন আরেক জেনারেল আনোয়ার সাদাত। সেনাবাহিনীর এক সদস্যের গুলিতে আনোয়ার সাদাত নিহত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন হোসনি মোবারক। তিনি ছিলেন বিমান বাহিনীর প্রধান।
এভাবে মিসরে বছরের পর বছর চলেছে সমরিক শাসন। হোসনি মোবারকের ৩০ বছরই মিসর ছিল জরুরি অবস্থার অধীনে। তিন দশকে মিসরে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ায় যুব-জনতার গণতান্ত্রিক বিস্ফোরণের বাতাবরণে তাকে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে সরে যেতে হয়। তিউনিসিয়া থেকে মিসরে গণজাগরনের কাঁপন দৃৃশ্যমান হয়।
তিউনিসিয়ার গণবিস্ফোরণে দৃশ্যমান নান্দনিকতা মিসরবাসীকে উদ্দীপ্ত করেছে। হোসনি মোবারকের একনায়কত্ব ও কুশাসনের অবসানের লক্ষ্যে মিসরীয় জনগণ সাহসের সাথে রাজপথে নেমে সোচ্চার হয়ে ওঠে। কারফিউ উপেক্ষা করে কায়রোর রাজপথে নেমে আসে অসংখ্য অকুতোভয় মানুষ। পিরামিডের দেশে নীল বিপ্লব। মিসরের আন্দোলনের কেন্দ্রস্থর তাহরির স্কোয়ারে জনতার ঢল নামে। জনগণ প্রশাসনের পরিবর্তন চায়।
পরিবর্তন দেখার দীর্ঘ লালিত আকাক্সক্ষা পূরণের লক্ষ্যে সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে মিসরবাসী আন্দোলনে  নেমেছেন। মিসরের রাজপথে দিনের পর দিন অনড় অবস্থানে থাকা লাখ লাখ মানুষের মধ্যে একটা বড় অংশই নারী। সবাই সেখানে খাচ্ছেন, রাতে কম্বল গায়ে ঘুমাচ্ছেন, জামাতে নামাজ পড়ছেন। আর মুহুর্মুহু স্লোগানের সাথে বজ্রধ্বনি ‘আল্লাহু আকবর’ দোয়া পাঠ উল্লাস উৎসাহ ছিলই। এই অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভে সমাজের সব শ্রেণী ও পেশার মানুষ শামিল। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়য়ের শিক্ষকরা, বিচারকরা পর্যন্ত নেমেছিলেন। যে ক’টি প্রধান দাবিতে এই গণজাগরণের জোয়ার, সেগুলো হলো ক. স্বৈরাচারী হোসনি মোবারকের পদত্যাগ; খ. প্রহসনের নির্বাচনে গঠিত পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়া; গ. প্রায় ৩০ বছর চাপিয়ে রাখা জরুরি অবস্থার অবসান; ঘ. সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন পার্লামেন্ট গঠনের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন; ঙ. একনায়ক হোসনি মোবারকের স্বার্থরক্ষায় বিদ্যমান সংবিধানের সংশোধন এবং চ. রাষ্ট্র পরিচালনায় সুবিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা।
মিসরে হোসনি মোবারক টের পেয়েছিলেন যে, তার দিন ফুরিয়ে এসেছে। তবু তিনি ক্ষমতালোভীদের মতো করে স্বভাব মাফিক যে ক’দিন পারা যায় টিকে থাকার জন্য নানা কায়দা কৌশল করেছেন ক. জগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংস্কার আনবেন বলে ঘোষণা দিলেন; খ. বিগত ছয় বছরের ধারাবাহিকতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে সেনাবাহিনীর প্রভাব বজায় রেখে তাদের সহায়তা পেতে জেনারেল ওমর সোলাইমানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বানালেন; গ. পরবর্তী মেয়াদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী না হওয়ার কথা ঘোষণা করলেন; ঘ. নিজের দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির (শুধু নামেই ডেমোক্রেটিক বা গণতান্ত্রিক) প্রধানের পদ ছেড়ে দিলেন।
কিন্তু জনগণ কি এতই বোকা যে একজন চরম ক্ষমতালোলুপ স্বৈরতান্ত্রিককে আরো এক বছর বরদাশত করে যাবে? টিকতে পারলে এতদিনে যে হোসনি মোবারক গণতান্ত্রিক শক্তিকে নস্যাৎ এবং তার পরিবার বা গোষ্ঠীর শাসন কর্তৃত্বের পাকা ব্যবস্থা করার যাবতীয় উদ্যোগ নিতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জনগণ কোনো সাংবিধানিক বা প্রশাসনিক ‘সংস্কারে’ মলম নয়, স্বৈরাচার সরকারের অপসারণ চায়। স্বৈরাচারীরা সাধারণত একই সাথে সরকার, রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের এক সময়েই প্রধান পদে অধিষ্ঠিত থাকে। সেক্ষেত্রে হোসনি মোবারকের শুধু দলীয় প্রধানের পদ দৃশ্যত ছেড়ে দেয়া লোক দেখানো ফন্দি ছিল মাত্র। তার পুরো ক্ষমতা ত্যাগ না করা পর্যন্ত জনগণ সংগ্রামে ক্ষান্ত হয়নি।
হোসনি মোবারক চেয়েছেন ছলে বলে কৌশলে টিকে যেতে। তিনি যত রকম ষড়যন্ত্র করা যায় গণঅভ্যুত্থান রোধে তার সবই করেছিলেন। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের বিরুদ্ধে প্রচারণা, গণতান্ত্রিক শক্তির মাঝে বিভাজন সৃষ্টি, আন্দোলনের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থায় ফাটল ধরানো ইত্যাদি সবই করেছেন হোসনি মোবারকের সরকার। এত কিছুর পরও মিসরের একনায়ক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। পয়লা ফেব্রুয়ারি মিলিয়ন মার্চ শামিল, লাখ লাখ মানুষের বজ্রনির্ঘোষের পর হোসনি মোবারক লেলিয়ে দিলেন পেটোয়া বাহিনী। এর ফলে দুই দিন ১০ জন শহীদ হন। এবং আরো কয়েক শ’ মানুষ আহত হন।
স্বৈরাচারী হোসনি মোবারক সন্ত্রাসী বাহিনী, পুলিশ ও অনুগত সেনাবাহিনী নামিয়েও গদি ঠেকাতে পারেননি। মিসরে বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা, হতাহতের খতিয়ান, পোটোয়াদের সন্ত্রাস ও সহিংসতা সবদিক থেকে মিসরীয়গণ বিদ্রোহে সারাবিশ্বের নজর কেড়েছে অনেক বেশি।
(চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply