মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম
(গত সংখ্যার পর)
জরুরি অবস্থায় শুধু হোসনি মোবারক সরকারই উপকৃত হয়েছে। মিসরের জনগণ ছিল এক ঘৃণ্য ডিক্টেটরের অধীনে, দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিসরের জনগণের ক্ষমতার নয়া যুগের সূচনা হয়েছে বলেই মনে করা হয়
২০১১ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি শুক্রবারের মধ্যে পদত্যাগের আলটিমেটাম দেয়া হয় স্বৈরশাসক হোসনি মোবারককে। এ দিনও হোসনি মোবারকের লেলিয়ে দেয়া সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা গুলি ও বোমা হামলায় দু’জন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে। এ দিন আটক করা হয় মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিনিধিকে। যারা হোসনি মোবারকের নিরাপদ মিসর ত্যাগের পক্ষে ছিলেন, তারাও মোবারকপন্থীদের বর্বরোচিত আক্রমণের পর এই দিন স্বয়ং হোসনি মোবারকের বিচার দাবি করেন। এসব হামলার নিন্দা জানান ইখওয়ানুল মুসলিমুনের মুর্শিদে আম ড. মোহাম্মদ বদি, বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. আল্লামা ইউসুফ আল কারজাভি, মোহাম্মদ এল বারাদি প্রমুখ। ২০১১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মিসরের রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কয়ারে ২০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম হয় এবং এ স্কয়ারে তাদের জুমার নামাজ আদায়ের অনন্য দৃশ্য আল জাজিরা, সিএনএন প্রভৃতি চ্যানেলের মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেন। এ দিন বিক্ষোভ কর্মসূচিতে মিসরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরবর্তীতে আরব লিগের মহাসচিব আমর মুসা যোগদান করেন। মিসরীয় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রায় পুরোটাই হোসনি মোবারকের উৎখাতের আন্দোলনের পক্ষে চলে আসে। মোবারকের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তানতাভি তাহরির স্কয়ারে বিক্ষোভকারী এবং সেনা কমান্ডারদের সাথে কথা বলেন। ওই দিকে আগের দুই দিনের সহিংসতার দায় মোবারক চাপালেন ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ওপর। এ দিন ইরানের শীর্ষনেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনী মিসরের গণ-আন্দোলন ও স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানান।
২০১১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এনডিপি) দলীয় প্রধানের পদ ছাড়লেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট সোলেইমান সামরিক অধিনায়কদের সাথে আলোচনা করেন প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের সম্মানজনক বিদায় নেয়া প্রসঙ্গে।
২০১১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মিসরের সংবিধান সংস্কারে কমিটি গঠনের বিষয়ে সরকারের সাথে বিরোধী দলের অস্পষ্ট সমঝোতা হয়। তবে ইখওয়ানুল মুসলিমুন এ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে। ওই সমঝোতা হয় যে বৈঠকে তাতে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি এবং বিরোধী দল ওয়াফদ পাটি, ইখওয়ানুল মুসলিমুন, জিল পার্টি ও আল ওয়াসাত পার্টি অংশ নেয়। এ দিন স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে সারা মিসরের শহীদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ দিন আল আহরামের সাবেক সম্পাদক হাসনাইন হাইকেন (৮৮) পার্লামেন্ট বাতিল করে কেয়ারটেকার সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এ দিন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বলেন, মিসরের মানুষ রাজপথে নামার পর মিসর সরকার স্থিতিশীল এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার উপায় খুঁজছে। ইখওয়ান নেতৃবৃন্দ প্রশ্ন উত্থাপন করেন, কত মূল্যের বিনিময়ে এই স্থিতিশীলতা? এটা কি ৩০ বছরের জরুরি আইন, স¤্রাটসুলভ প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের তিন দশকের শাসন, প্রহসনমূলক পার্লামেন্ট, পরাধীন বিচারব্যবস্থার স্থিতিলশীলতা? … প্রকৃত স্থিতিশীলতা অর্জন করা যায় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমেই।’
হিলারি ক্লিনটন যখন তার মিত্র হোসনি মোবারকের মাধ্যমে মিসরে স্থিতিশীলতা চাচ্ছেন, তখন সময় শেষ হয়ে এসেছে মোবারকের। মিসরের গণমানুষ জেগে উঠেছে। নিজ শক্তিতে একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছে। কিন্তু মিসরীয়দের সেই বিপ্লবকে ধ্বংস করার জন্য কিংবা ওই বিপ্লব থেকে আসল চেতনাটা কেড়ে নেয়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব কম চেষ্টা করেনি। ৩০ বছর ধরে চলছিল প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের একনায়কত্ববাদী দুঃশাসন। মিসরের সবচাইতে জনপ্রিয় দল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ওপর দীর্ঘস্থায়ী নির্যাতন চালিয়ে নেতাদের কারারুদ্ধ করে, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন হোসনি মোবারক। মৌলবাদী দমনের অজুহাতে পাশ্চাত্য অন্যায়ভাবে হোসনি মোবারককে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সাহায্য করেছে।
মিসরে সরকারবিরোধী গণবিক্ষোভের মুখে ১৮ দিনের মাথায় ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের পতন হয়। স্বর্ণের সুতোয় গায়ে পরার সুটে নাম লেখাতেন মোবারক। তিনি ১৯৮১ সালের ১৪ অক্টোবর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ পর্যন্ত ক্ষমতা ছিলেন। মোবারককে গৃহবন্দী করা হয়। পদত্যাগের পর পর্যটন নগরী শারম আল শেখের একটি অবকাশ কেন্দ্রে তাকে রাখা হয়। মিসরে সেনাবাহিনীর নিউক্লিয়াস সেনা পরিষদ সামরিক সুপ্রিম কাউন্সিল অন্তর্বর্তী সরকার নাম দিয়ে ক্ষমতা হাতে নেয়। ক্ষমতা হাতে নেন সুপ্রিম কাউন্সিলের প্রধান ফিল্ড মার্শাল হোসাইন তানতাভি। কিন্তু তারা ক্ষমতা নিয়েছে এ শর্তে যে, তারা কিছু দিনের মধ্যে মিসরে সাধারণ নির্বাচনের আয়োজন করবেন। সংবিধানের কিছু ধারা সংশোধনের লক্ষ্যে গণভোটের অবস্থা করবেন। সামরিক বাহিনী থেকে কেউ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। এ দিকে বিপ্লবোত্তরকালে হোসনি মোবারকের বিচারের দাবি উত্থাপিত হতে থাকে। ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি ও ২০১১ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়ার অভিযোগে মোবারক ও তাঁর সহযোগীদের বিচারের আওতায় আনা হয়। ৮২ বছর বয়স্ক হোসনি মোবারক এবং তার দুই ছেলে আলা এবং গামালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। বিক্ষোভকালে প্রায় ৮০০ মানুষ শাহাদাত বরণ করেন। প্রেসিডেন্ট মোবারকের নির্দেশেই বিক্ষোভে গুলি চালানো হয়।
সুপ্রিম কাউন্সিল ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মিসরে পার্লামেন্ট নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা করে। সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য মামদু শাহিন পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হবে বলেও জানান। এখানে উল্লেখ্য যে, এ রকম জরুরি অবস্থায় শুধু হোসনি মোবারক সরকারই উপকৃত হয়েছে। মিসরের জনগণ ছিল এক ঘৃণ্য ডিক্টেটরের অধীনে, দীর্ঘ সংগ্রামের পথ বেয়ে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মিসরের জনগণের ক্ষমতার নয়া যুগের সূচনা হয়েছে বলেই মনে করা হয়।    (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply