মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম|

(গত সংখ্যার পর)

এটি সুস্পষ্ট যে স্বৈরশাসক হোসনি মোবারককে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য রাস্তায় ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের প্রয়োজন ছিল। রাস্তায় কী ঘিেটছল তা সঠিকভাবে বলা অসম্ভব। তবে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ শুধু কায়রোর তাহরির স্কোয়ারেই নয়, সারা মিসরেই সংঘটিত হয়েছিল। এটি নিশ্চিত যে, রাজধানীর বাইরের অধিকাংশ প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ইখওয়ানুল মুসলিমুনের এবং তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হয়েছিল। এ ছাড়াও তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুর জোগান দিয়েছে ইখওয়ানুল মুসলিমুন। এমনকি আন্দোলনের সময় পাবলিক টয়লেটও নির্মাণ করেছে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সমর্থক ও সদস্যরা। এটি অবশ্যই ধারণা করা যায় যে, একটি নির্দিষ্ট এলাকার দীর্ঘ সময়ব্যাপী হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে স্যানিটারি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা কত গুরুত্বপূর্ণ।
বিগত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার শক্তিমান শাসকেরা তাদের পশ্চিমা সমর্থকদের এই বলে আশ্বস্ত করে আসছিলেন, আরব বিশ্বে যে কোনো বিপ্লবের চেষ্টা তারা একযোগে প্রতিহত করবেন। বিপ্লবের নামে ইসলামী দলগুলোর কর্তৃত্ব গ্রহণের পথে তারা বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু তাদের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখা যায়নি। যেমন হোসনি মোবারকের একনায়কতন্ত্র বা স্বেচ্ছাচারী আচরণের কারণে মিসরীয় জনগণের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবোধের পথ রুদ্ধ হয়। ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে তিনি এবং তার পূর্বসুরীরা মিসরের জনগণ ও ইসলামী আন্দোলনের ওপর চালিয়েছেন অত্যাচারের স্টিম রোলার। ক্ষমতালোভী হোসনি মোবারকের কোনো কাজের প্রতিবাদ করার ক্ষমতা মিসরের সাধারণ নাগরিকরা হারিয়ে ফেলেছিল। আরব গণজাগরণের বা আরব বসন্তের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের মুখে মিসরে গণতন্ত্রের ঢেউ বয়ে যায় এবং স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতন ঘটে। মিসরে গণতন্ত্র ছিল না। নাগরিকগণ ছিল মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। বছরের পর বছর অধিকার হারা নির্যাতিত মানুষ যখন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক পায়, তখন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী মানুষ তাদের সে আন্দোলনকে সমর্থন না করে থাকতে পারে না। তেমনই এক পরিস্থিতির জন্ম হয়েছিল মিসরে। দীর্ঘ ৩০ বছর ক্ষমতায় থাকা হোসনি মোবারক জনগণের অধিকার খর্ব করে সেচ্ছাচারি শাসন চাপিয়ে দিয়েছিলেন এবং দেশে বাক স্বাধীনতা বলতে কিছু ছিল না। তিনি মিসরের জনগণকে শোষণ করেছিলেন দীর্ঘ তিন দশক ধরে আর গড়ে তুলেছিলেন সম্পদের পাহাড়। চরম বিক্ষোভের মাঝে অবশেষে লৌহমানব হোসনি মোবারকের বিদায় ঘণ্টা বেজেছে। আসলে জনগণ জেগে উঠলে স্বৈরাচার পালাবার পথ পায় না।
২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি হোসনি মোবারক সামরিক বাহিনীর সুপ্রিম কাউন্সিলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে পদত্যাগ করেন। এরপর মন্ত্রীসভায় কিছু পরিবর্তন হলেও তাতে মোবারকের আমলের লোকদেরই প্রাধান্য থেকে যায়। এই অন্তর্বর্তী সরকার ছিল পুরনো মুখে ভারাক্রান্ত। ফলে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক সরকার কায়েম হবে কি না তা নিয়ে অনেকের মধ্যেই সংশয় সৃষ্টি হয়। এ প্রেক্ষাপটেই আন্দোরনকারীরা ক্ষমতাসীন আন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১১ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এ লক্ষ্যে তাহরির স্কোয়ারে দাবি আদায়ের সংগ্রামে ১০ লক্ষ লোক সমবেত হয়। মিসর আবার উত্তাল হয়ে ওঠে।
মিসরের মোবারক ঘেঁষা প্রধানমন্ত্রী আহমেদ শফিক ৩ মার্চ ২০১১ পদত্যাগ করেন। মোবারকের পতনের কিছুদিন আগে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। নতুন তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হন এশাম শরফ। তিনি মোবারক সরকারের সাবেক পরিবহনমন্ত্রী। ৩ মার্চ ২০১১ তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলনে বিজয়ের লগ্নে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। সংবিধান সংস্কার ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে তিনি অন্তর্বর্তী মন্ত্রীসভা পুনর্গঠন করেন। এ মন্ত্রীসভার সদস্যগণ ছিলেন : সামির রাদওয়ান- অর্থমন্ত্রী, হাসান ইউনুস- বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী, ফায়জা আবুল নাসা- আন্তর্জাতিক যোগাযোগ মন্ত্রী, ফাতিহ আল বারাদি- গৃহায়ণ মন্ত্রী, ইবরাহিম মানা- বেসামরিক বিমান চলাচল মন্ত্রী, নাবিল আরাবী- পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সৈয়দ মাশার- সামরিক উৎপাদন বিষয়ক মন্ত্রী, মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ আল জাবিদ- আইনমন্ত্রী, আবদুল্লাহ মোবারক- তেলমন্ত্রী। মন্ত্রীসভা পুনর্গঠনের পরও সেখানে মোবারকের ঘনিষ্ট ব্যক্তিবর্গ রয়ে গেছেন। প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন মোবারকের আশীর্বাদপুষ্টরা। মোবারকের পুলিশ বাহিনী বিলুপ্ত করণের দাবি এ সময় জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়। এ পুলিশ বাহিনী ছিল ত্রিশ বছর ধরে মোবারকের ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার। প্রতিপক্ষকে ধরে নিয়ে গিয়ে ধারাবাহিক নির্যাতন করা হতো। মেয়েদের নগ্ন করে নির্যাতন করা হতো। উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা হতো। চাবুক দিয়ে পেটানো হতো। ঘুমোতে দেয়া হতো না।
হোসনি মোবারকের পতনের পরও ষড়যন্ত্র বন্ধ হয়নি। মিসরে গণবিপ্লব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের দোসর বর্ণবাদী ইসরাইলের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়। বস্তুতপক্ষে এদের দৃষ্টি তেলের খনির দিকে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দিকে নয়। বস্তুতপক্ষে আগাগোড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এ সত্য বেরিয়ে আসবে যে, তারা মধ্যপ্রচ্যে তথা মুসলিমবিশ্বে গণতন্ত্র চায় না, চায় একনায়কতন্ত্র। একনায়কদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কখনও সমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিল না।
একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্র কায়েম থাকলে তেলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়। পশ্চিমাবিশ্ব ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা মিসরে তথা আরববিশ্বে গলতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিরোধী অবস্থানে চলে যাবে। মিসরের পট পরিবর্তনে তারা ভীত হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে এসে মিসরের পটপরিবর্তন বা আরববিশ্বের সংস্কার প্রক্রিয়া যে পথে এগুচ্ছে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরাইলের জন্য বড় ধরনের হুমকি বলে মনে করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল একটি গোষ্ঠী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশনসের নেলসী গেলব এর মতে মুসলিম ব্রাদারহুড মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। নেলসীর মতে, সংগঠনটি হামাস সমর্থক। এসব ছাড়াও এই অঞ্চলে এবং সারাবিশ্বে সন্ত্রাসবাদবিরোধী প্রচেষ্টাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে মুসলিম ব্রাদারহুড।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল তিউনিসিয়া ও মিসরের  গণজাগরণে মুসলিম ব্রাদারহুডের ভূমিকায় ভয় পেয়েছে, তাই দেশ দু’টোতেই পর্দার অন্তরালে ষড়যন্ত্র চলছে জনগণের সকল আন্দোলনের ফলাফল ছিনতাই করে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার। তারা ছলেবলে কৌশলে তাদের তাঁবেদারদের হাতে ক্ষমতা আবারো ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টায় রত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কার্নোগী ফাউন্ডেশনের মরিয়া ওভাওয়ে অবশ্য উপরোক্ত মতামতের জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ক্ষমতায় আসতে পারে এবং এই পরিবর্তনের ফলে ইসরাইলের সাথে দেশটির সম্পর্কের অবনতি হতে পারে বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ রয়েছে তা অতিরঞ্জিত। প্রকৃত অর্থে পশ্চিমারা ইসলামের উত্থানকে ভয় পায়। তাই তারা আরববিশ্বে লালন করছে সামরিকতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র রাজতন্ত্রকে। তারাই তাদের স্বার্থে এ অঞ্চলে গণতন্ত্রের ছোঁয়া লাগতে দেয়নি। কারণ জনগণ গণতন্ত্রমুখী হলে তাদের পরাস্ত করা যাবে না। গোলাম বানানো যাবে না।    (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply