মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

Deshনোয়াম চামস্কির ভাষায়, ‘মধ্যপ্রাচ্য বা প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ কোনো দেশে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল অক্ষশক্তি কখনও সত্যিকারের গণতন্ত্র চায় না, কারণ তখন জনগণের ইচ্ছায় শাসক নির্বাচিত হয়। ভোগ ও ক্ষমতার মোহ গেলে মুক্তির পথ থাকে না পশ্চিমারা তাই কৌশলে আরব শাসকদের ভোগ ও ক্ষমতার মোহের মধ্যে ডুবিয়ে রেখেছে। ফলে তারা জনগণের দুঃখ-কষ্ট ও দুর্দশা দেখতে পায়নি, তারা এ সমস্ত কিছু শুনতে অভ্যস্ত ছিল না। ক্ষমতাকেই তারা চিরস্থায়ী বলে মনে করেছে। নির্বাচন, গণতন্ত্র, জনগণের মতামত এ সমস্ত কিছুর তোয়াক্কাই তারা করেনি বিন্দুমাত্র। অন্য পশ্চিমা নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো প্রচার করেছে আরব মানেই মুসলমান, মুসলমান মাত্রই গণতন্ত্রের জন্য অনুপযুক্ত। কিন্তু আরব বসন্ত বা আরব গণজাগরণ তাদেরকে বিস্মিত করে। মিসরের গণজাগরণ হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনো অপ্রত্যাশিত বা আকস্মিক ঘটনা নয়। এ জন্য সংঘবদ্ধ ইসলামী রাজনৈতিক শক্তি দীর্ঘদিন থেকে তৎপর ছিল। হোসনি মোবারকের পতনে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পায় মিসরের জনগণ। তারা গণতন্ত্র চায়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে তারা তাদের অধিকার ফিরে পাবে। সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব আর স্বৈরতন্ত্র থেকে মুক্তি পাবে। সত্যিকার অর্থে মিসরের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামী দল জনকল্যাণমূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ও গণভিত্তি তৈরি করে রেখেছে। মিসরের সেনা নিয়ন্ত্রিত অন্তর্বর্তী সরকারের ভয় ছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইখওয়ানুল মুসলিমুন তাদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে ফেলবে। কার্যত ঘটলও তাই। রাজপথের গণতন্ত্রই মিসরের ইখওয়ানুল মুসলিমুনকে প্রধান গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। দলটি ঘোষণা করেছে, প্রেসিডেন্টের পদ থেকে হোসনি মোবারকের বিদায়ই যথেষ্ট নয়, মিসরে এমনভাবে ইসলামী শাসন কায়েম করতে হবে, জনগণ যাতে ভোট দিয়ে পার্লামেন্ট, নতুন সংবিধান ও সরকার গঠনের সুযোগ পায়।
২০১১ সালের ৮ মার্চ খবর ছড়িয়ে পড়ে যে গণ-আন্দোলনে উৎখাত হওয়া হোসনি মোবারকের সময়কার সব দলিল-কাগজপত্র নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। এ খবরে উত্তেজিত জনতা ঐদিনই দেশটির প্রেসিডেন্ট সচিবালয়ের বাইরে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বেধে যায়। বিক্ষোভকারীরা আগুনে পুড়িয়ে দেয়া অনেক কাগজপত্রের অবশিষ্টাংশ গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে তুলে ধরে। বিক্ষোভকারীরা জানায়, তাদের লক্ষ্য করে একটি ককটেল নিক্ষেপ করে নিরাপত্তারক্ষীরা। এ ছাড়া অনেককে পিটিয়ে আহত করা হয়েছে বলেও তারা জানায়। তারা অভিযোগ করে, হোসনি মোবারকের সময় যেসব নিরাপত্তারক্ষী আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় হামলা চালায়, তারাই ৮ মার্চ হামলা চালিয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর মিসরে পার্লামেন্ট নির্বাচন ও সংবিধান ইস্যুতে সঙ্কট সৃষ্টির চেষ্টা করছে বামপন্থী ও সেক্যুলাররা। তাদের মদদ দিচ্ছে সেনাবাহিনী। তাদের বিশ্বাস, নির্বাচন বিলম্বিত না হলে লাভবান হবে ইখওয়ানুল মুসলিমুন। অপর দিকে বহুল প্রত্যাশিত নির্বাচন ঠেকিয়ে রাখলে দল গোছানো এবং নির্বাচনী প্রচারণা প্রস্তুতির সময় মিলবে। ফলে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতি জনসমর্থন কমবে। কিন্তু ইখওয়ানুল মুসলিমুন মনে করে, এতো সংগ্রামের পর সুষ্ঠু নির্বাচনের বিলম্ব ঘটলে তা হাতছাড়া হয়ে রাজনৈতিক সঙ্কট বাড়াতে পারে।
তখন আবারো মিসর নিমজ্জিত হবে অনিশ্চতায়, যা বিপ্লবী জনগণের মোটেই কাম্য নয়।
গণ-আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক হোসনি মোবারকের বিচারকার্যও শুরু হয়েছে। তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও সরকারের কয়েকজনের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিচারও হচ্ছে মোবারকের পতন-উত্তর সময়ে। দিন যতই যাচ্ছে, স্বাভাবিকভাবেই নতুন নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে জাতীয় জীবনে। মোবারক-উত্তর সময়ে অনেক প্রত্যাশা মিসরের গণতন্ত্রকামী জনতার। তাই জনমনে ক্ষোভ জমছে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান ঠেকানোর সেক্যুলার ও বামপন্থী দলগুলোর পাঁয়তারায় জনগণের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ বাড়ছে। এ জন্য ২০১১ সালের মাঝামাঝি এসে এ দাবি জোরদার হচ্ছে মিসর যাতে এগিয়ে যেতে পারে সে জন্য সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন যথাসময়ে হতে হবে।
মোবারকের পতন-উত্তরকালে মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমুন সংগঠন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছে যার নাম ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি। তাদের ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্যানুযায়ী প্রথমে এ দলটির আত্মপ্রকাশের কথা জানা যায়। অচিরেই এই দলটি বিকল্প শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এ দলের উদ্যোক্তারা এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, মিসরের ব্যাপক জনগণের আশা- আকাক্সক্ষা এবং ২৫ জানুয়ারি গণবিপ্লবের লক্ষ্য সামনে রেখে দেশের সব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন করা হবে। গড়ে তোলা হবে সিভিল সোসাইটি, ট্রেড ইউনিয়ন এবং মানবাধিকার সংগঠন।
ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে, দ্রুত সংবিধান প্রণয়নে সহযোগিতা প্রদানের মাধ্যমে জাতির পরিচিতি ও প্রত্যাশা স্পষ্ট করে তোলা। সেই সাথে মিসরীয়দের মর্যাদা ও স্বাধীনতা সুরক্ষিত করা। সংবিধানে জনগণের সব অংশের অধিকার ও দায়িত্বের সমতা, সংগঠন গড়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশ্বাস ও ধর্ম পালনের অধিকার, সম্পদের ন্যায়ানুগ বণ্টন, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ দফা এ দলের নির্বাচন মেনিফেস্টুতে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইখওয়ানুল মুসলিমুন প্রতিষ্ঠিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টির ঘোষণাপত্রে বলা হয়, আমরা সব আন্তর্জাতিক চুক্তির মর্যাদা দেবো। আমরা মনে করি আরব, আফ্রিকান ও ইসলামী রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে মিসর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা বিশেষ গুরুত্ব দেবো জাতীয় নিরাপত্তা, যে জন্য জনগণের ঐক্য অপরিহার্য। দেশের মূল শিল্প খাত এমনভাবে গড়ে তোলা হবে যেন সামরিক চাহিদাও মোটানো যায়।
ঘোষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, ‘আল আজহারকে মুসলিম বিশ্বের জনগণের প্রধান পরিদর্শকরূপে থাকতে হবে। এ প্রতিষ্ঠান মুসলিম বিশ্বে মিসরের রাষ্ট্রদূতের মতো। নতুন গঠিত ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি প্রতিবেশী সুদানের সাথে বিশেষ সম্পর্ক, মিসরের প্রাণপ্রবাহ নীল নদের ওপর অধিকার, মতবিরোধের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থের প্রাধান্য, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন প্রভৃতি বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি ঘোষণা করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কপটিক খ্রিস্টানদের সাথে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সুসম্পর্ক রয়েছে। এ দল মনে করে, বিপ্লব হতে হবে জনগণের, বিশেষ কোনো দলের নয়। আমর মুসা এবং মোহাম্মদ এলবারাদি ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন।    (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply