মিসরে ইসলামী আন্দোলন ও ইখওয়ানুল মুসলিমুন

ড. মুহাম্মাদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)
তখন মিসরে চলছিল ফেরাউনি সভ্যতা পুনরুজ্জীবনের জঘন্য অপপ্রয়াস। ইসলামের চিহ্ন মুছে ফেলার আয়োজন চলছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে। এমনি এক সঙ্কটময় মুহূর্তে মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের আত্মপ্রকাশ ঘটে ১৯২৮ সালে। আন্দোলনের পতাকা হাতে ছুটে আসেন শতাব্দীর শ্রেষ্ঠত্ব আহবায়ক ইমাম শায়খ হাসানুল বান্না। শায়খ হাসানুল বান্না আল ইখওয়ানুল মুসলিমুনের শুধু প্রতিষ্ঠাতাই নন তিনি অমৃত্যু আন্দোলনের মূল পরিকল্পক, মুর্শিদে আম, প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান তাত্ত্বিক ছিলেন।
ইখওয়ানুল মুসলিমুন প্রতিষ্ঠার পূর্বাবস্থা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) অবসানের পর পরই মিসরে কঠিন রাজনৈতিক সঙ্কটে নিপতিত হয়। দেশের অভ্যন্তরে নানা ধরনের গোত্রীয় ও জাতীয় সমস্যা মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে নানা ভ্রান্ত মতবাদ আর চিন্তাধারা। তুরস্কের জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহী তুর্কিরা যখন উসমানীয় খিলাফতব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করে সে সময় তাদের এই সংস্কারকাজে মিসরীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদ এবং স্বাদেশিকতাবাদের অনুরাগ প্রবল হয়ে ওঠে। স্বীয় ইতিহাস, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং ঐতিহ্যবাহী আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয় অবস্থান ছাড়াও অপরাপর নানান কারণে মিসর আর বিশ্বের নেতৃত্ব লাভ করেছিল। এ কারণে মিসরে জাতীয়তাবাদ (ঘধঃরড়হধষরংস) ও স্বাদেশিকতাবাদের শ্লোগান যখন উত্থিত হয় তখন সাথে সাথে সমগ্র আরব দেশগুলোতে এর প্রতিধ্বনি শোনা যায়। বিভিন্ন স্বদেশী আন্দোলন ডানা মেলতে শুরু করে। স্বদেশী আন্দোলন স্বদেশ পূজার অন্তরালে এবং মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের উসমানীয় খিলাফত বিলোপ সাধনকে বাহানা বানিয়ে নাস্তিকতা, সমাজতন্ত্র, অশ্লীল চিন্তা এবং পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুসরণকে লালন করে। যার ফলে ইসলাম এবং সংস্কারের (অথবা সহজ কথায় অন্ধ পাশ্চাত্য প্রীতির) দীর্ঘ ও সুদূরপ্রাসারী ফল হিসেবে আর্থিক দ্বন্দ্বের সূচনা হয়।
সংস্কারবাদীদের অবস্থান ছিল বেশ মজবুত। কারণ ক্ষমতা এবং মিডিয়া তথা প্রচারমাধ্যমগুলো ছিল তাদের দখলে। এ সবের মোকাবেলায় ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহীরা শুধু কমজোরই ছিলেন না বরং যতোটুকু ছিলেন তাও আত্মনির্ভরশীলতা থেকে বঞ্চিত। অধিকন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-বিদ্বেষও মিসরের পরিবেশকে কলুষিত করে তোলে। ওয়াফদ পার্টি ক্ষমতাসীন হলে দাস্তুর পার্টির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করার প্রচেষ্টায় লেগে যায়। পক্ষান্তরে দাস্তুর পার্টি ক্ষমতায় এলে দেশকে ওয়াফদ পার্টির হাত থেকে পবিত্র করার ইস্যু তৈরি করে।
সে সময় আলী আবদুর রাজ্জাকের বিভ্রান্তিকর গ্রন্থ ‘আল ইসলাম ওয়াল উসুলুল হুকুম’ (ইসলাম ও শাসনব্যবস্থার মূলনীতি) প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থের কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু ছিল ‘রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সাথে ধর্মের তথা ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই। ত্বাহা হোসাইনের গ্রন্থ ‘ফিস সিবিল জাহিলী’ও এ সময়েই রচিত হয়। এ গ্রন্থে কুরআন সম্পর্র্কেই সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি করা হয়। কাসিম আমীনের ‘তাহরীরুল মারাআ’তে এমন নারী স্বাধীনতা দাবি করা হয় যা পাশ্চাত্যের নারীরা অবাধে ভোগ করে। চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার নামে ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি সবচাইতে বেশি হামলা চালানো হয়। সাপ্তাহিক আস সিয়াসতে, সংস্কারপন্থীদের মুখপত্র ছিল। এটি বেপরোয়াভাবে সংস্কার, ফেরাউনি সভ্যতার পুনরুজ্জীবন এবং পাশ্চাত্যের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার পক্ষে যুক্তি প্রচার করতো। দু’টি মাত্র পত্রিকা আমিন রাফেয়ীর আল আখবার মুহেবউদ্দিন আল খতিবের সাপ্তাহিক আল ফাতাই ইসলামী মূল্যবোধসমূহের পৃষ্ঠপোষকতা করতো। ইতিবাচক কাজ যে একেবারেই ছিল না তা কিন্তু বলা যায় না। তবে দীন ইসলামের অবস্থান মিসরে ছিল দুর্বল ও নেতিবাচক। এমতাবস্থায় সাইয়েদ জামাল উদ্দিন আফগানীর (১৮৩৯-১৮৯৭) পর মুহাম্মদ আবদুহু তাঁর মিশন সুসংসত করেছিলেন। কিন্তু শেখ মুহাম্মদ আবদুহু (১৮৪৯-১৯০৫) রাজনৈতিক ময়দানে তৎপর ছিলেন না। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে সাইয়েদ রশীদ রেজা ছাড়া আর কোনো মুজাহিদ পুরুষ বেরিয়ে আসেনি। সাইয়দ রশীদ রেজার কর্মক্ষেত্রে যদিও সীমাবদ্ধতা ছিল এবং তিনি তুর্কি ও আরব দ্বন্দ্বে আরব জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিলেন। কিন্তু তার পরে প্রয়োজনীয় আওয়াজও নিস্তব্ধ হয়ে যায় এবং মোস্তফা সাদেক রাফেয়ী ছাড়া ভোগবাদ, ইহজাগতিকতা ও ভ্রষ্টামির এ ঝড়ের মোকাবেলায় আত্মনির্ভরশীলতার সাথে এগিয়ে আসার মত আর কেউ ছিল না। অবস্থা এতটাই শোচনীয় হয়ে পড়ে যে, শুধু মিসর নয় বরং অধিকাংশ আরব দেশগুলোতে ফেরাউনি ও নমরুদীয় স্টাইলে চলা শুরু হয়। ফয়সল বিন হোসাইন এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘আরব হয়ে পড়েছিল হযরত মূসা (আ) ও মুহাম্মদ (সা)-এর পূর্বের আরবে পরিণত।’
দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে খোদার জানাজা পড়ানো হয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে নির্বিঘেœ ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি ঠাট্টা-বিদ্রƒপ চলতে থাকে। রাজনৈতিক সম্মেলনে ও জনসভায় ইসলাম প্রসঙ্গে আলোচনা করা অপমানিত হওয়ার শামিলে পরিণত হয়। পার্ক ও উদ্যানগুলোতে নিষ্ঠাবান মুসলমানরা নামাজ আদায় করতেও লজ্জাবোধ করে। এ পর্যন্ত অবস্থা গড়ানোর পর একসময় সত্যের মর্যাদা বোধ স্বমহিমায় দুলে ওঠে এবং মাহমুদিয়ার এক নওজোয়ানের দ্বারা আল্লাহ যে কাজ করান যা বড় বড় উলামা মাশায়েখ দ্বারাও সম্ভব হতো না। আর তিনি হলেন ইখওয়ানুল মুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতা শায়খ ইমাম হানানুল বান্না।১
ইখওয়ানুল মুসলিমুনের জন্ম
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে মিসরের শাসক আব্বাস হিলমী পাশা (১৮৯২-১৯১৪) শায়খ হাসানুল বান্না (১৯০৬-১৯৪৯) মাহমুদিয়া নামক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শায়খ আহমদ আবদুর রহমান আল বান্না২ ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেমে দীন। তিনি ফিকহ ও হাদিসশাস্ত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী এবং হাফেজে কুরআনও ছিলেন। আবদুর রহমান আল বান্না তাঁর মেধাবী সম্ভাবনাময় পুত্রকে শৈশবেই কুরআন হিফজ করান এবং দ্বীনি ইলম চর্চার প্রতি তাকে আকৃষ্ট করেন। ১৯২৭ সালে হাসানুল বান্না দারুল উলুম (বর্তমান কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। হাসানুল বান্না লক্ষ করেন যে ইউরোপীয় চিন্তাধারা মুসলিমদের চিন্তা চেতনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। তিনি মুসলিমদেরকে ইসলামী জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।
তিনি ইসলাইমিয়াতে কর্মরত ছিলেন। ১৯২৮ সালের মার্চ মাসে তিনি ছয়জন ইসলামী ব্যক্তিত্বকে তাঁর বাসায় দাওয়াত দেন। দ্বীনি বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। শায়খ হাসানুল বান্না তাঁদের সামনে তাঁর ভাবনা চিন্তা পেশ করেন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলামের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বক্তব্য রাখেন। উপস্থিত ব্যক্তিগণ তাঁর সাথে একমত হন। তারা সাতজন মিলে একটি সংগঠন কায়েম করেন। নাম রাখেন আল ইখওয়ানুল মুসলিমুন (গঁংষরস নৎড়ঃযবৎযড়ড়ফ)।
ইখওয়ানুল মুুসলিমুনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যগণ ছিলেনÑ
১. শায়খ হাসানুল বান্না
২. হাফেজ আবদুল হামিদ
৩. আহমাদ আল হামরী
৪. ফুয়াদ ইব্রাহীম
৫. আবদুর রহমান হাসবুল্লাহ
৬. ইসমাইল ইযয
৭. যাকী আল মাগরেবী।
মাহমুদিয়ার কৃতী সন্তান ইসমাইলিয়ার স্কুলশিক্ষক শায়খ হাসানুল বান্না নতুন সংগঠনের নেতা ‘মুর্শেদে আম’ নির্বাচিত হন। খলিল আহমদ হামেদী ইখওয়ানুল মুসলিমুনের সূচনা মূল্যায়ন করতে গিয়ে লিখিছেন, ‘হাসানুল বান্না বিদ্বানের চেয়েও বড় দায়ী ছিলেন। আল্লাহ তাঁর দ্বারা যে খিদমত গ্রহণ করতে চেয়েছেন পারিবারিক পরিবেশ এবং শিক্ষা-দীক্ষা তাকে সেভাবেই গড়ে উঠতে সহায়তা করে। আযহারের শিক্ষা ছাড়াই দারুল উলুমের শিক্ষাব্যবস্থা তাঁর দায়ীসুলভ বৈশিষ্ট্যকে আলোকময় করে তুলতে বিশেষভাবে সহায়ক হয়। বিকৃত পরিবেশ, নাস্তিক্যবাদের ঝড় এবং আযহারী বুদ্ধিজীবীদের ব্যর্থ প্রচেষ্টা তাঁর মাঝে প্রবল উৎকণ্ঠা ও দুশ্চিন্তার ঢেউ সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাঁকে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ও নির্ভীক ব্যক্তিত্ব দান করেছিলেন। কঠিন দুঃসময়েও যিনি স্বাভাবিক থাকেন। রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিচক্ষণতার ক্ষেত্রেই তিনি ঐশ্বর্যমণ্ডিত ছিলেন না, বরং তাঁর মাঝে একজন দায়ীর পরিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ও যোগ্যতা বিদ্যমান ছিল। যদিও তিনি একাকী যাত্রা শুরু করেন কিন্তু একটি জাতির জীবনীশক্তি হয়ে ইসলামের পত্রপল্লবহীন উদ্যানকে অল্প সময়ের ব্যবধানে শস্য-শ্যামল করে তোলেন। এই উদ্যান পানি সেচে উর্বর করার পরিবর্তে রক্ত সিঞ্চনের সুন্নাতকে উজ্জীবিত করেন। এ ছাড়া পূত-পবিত্র স্বভাবের অনুসারী ব্যক্তিদের নিয়ে এমন একটি জামায়াত প্রতিষ্ঠিত করেন যা তাঁর প্রস্তাবিত ‘রাহে জুনুন’ এর উপর পুর্নোদ্যামে গতিশীল ছিল।’
‘আল্লাহ হাসানুল বান্নাকে দাওয়াত ও সংস্কার এবং জিহাদ ও কল্যাণের যে অনুপ্রেরণায় ধন্য করেছেন তা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতীয়মান হয়েছিল। ইখওয়ানুল মুসলিমুনের (গঁংষরস নৎড়ঃযবৎযড়ড়ফ) নামে নিয়মতান্ত্রিকভাবে একটি সংগঠনের কাঠামো মার্চ ১৯২৮ সালে ইসমাইলিয়ায় নির্মিত হয়। কিন্তু এর পূর্বে হাসানুল বান্নার জীবন প্রমাণ করেছিল যে, এ ব্যক্তিত্ব কেবল মিসরেই নয়, বরং সমগ্র আরব বিশ্বের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী।’৩
হাসানুল বান্না ভালো করেই জানতেন ইসলামী সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত আল জিহাদের প্রধান কাজ হচ্ছে ‘আদ দাওয়াতু ইলাল্লাহ’। তিনি দাওয়াতী কাজে নেমে পড়েন। ইখওয়ানের অন্যান্য নেতবৃন্দকেও এই কাজে নিয়োজিত করেন। হাসানুল বান্না ইসমাইলিয়া শহরের বাসায় বাসায় গিয়ে মানুষদের দাওয়াত দিতেন এবং ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য ব্যাখ্যা করে বক্তব্য পেশ করতেন। এভাবে তিনি তিন বছর কাজ করেন। অনেক মানুষ তাদের আহবানে সাড়া দেয়। ইখওয়ানের সদস্যগণ বিভিন্ন ব্যক্তির বাড়িতে যেতেন, মসজিদে গিয়ে বক্তব্য রাখতেন, শিল্প কারখানায় গিয়ে শ্রমিকদের বুঝাতেন, কফিখানায় গিয়ে সেখানে সমবেতদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতেন। এভাবে দেশের বিভিন স্থানে ইখওয়ানের শাখা প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। গড়ে উঠতে থাকে নিজস্ব মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।৪
১৯৩২ সালে হাসানুল বান্না রাজধানী কায়রোয় বদলি হন। ইসমাইলিয়া থেকে ইখওয়ানের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও কায়রোতে স্থানান্তরিত হয়। ইখওয়ানের মহিলা শাখাও গঠিত হয়। এর নাম রাখা হয় ‘আল আখাওয়াত আল মুসলিমাত’।
এখানে উল্লেখ্য যে, প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে ইখওয়ানুল মুসলিমুনের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটে। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে শাখা গঠিত হয়। ছাত্র-শিক্ষক-যুবক- বৃদ্ধ-আলেম, ইংরেজি শিক্ষিত সর্ব শ্রেণীর মানুষ ইখওয়ানে যোগ দেয় দলে দলে। একটি শক্তিশালী জনপ্রিয় সংগঠন হিসেবে দেশে বিদেশে পরিচিতি লাভ করে ইখওয়ানুল মুসলিমুন।
টাইমস অব লন্ডন পত্রিকার মতে, ১৯৪৮ সালে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা লাভের ২০ বছরের মধ্যে ইখওয়ানের সদস্যসংখ্যা দাঁড়ায় ন্যূনতম পাঁচ লাখ। ইখওয়ানের দ্রুত অগ্রগতি আর বিস্তৃতি দেখে গায়ে জ্বালা ধরে ইসলামের দুশমনদের। ইখওয়ানের এ অগ্রযাত্রা রোধ করার জন্য অবলম্বন করা হয় নানা কূটকৌশল। শক্তির জোরে ইখওয়ানকে ধরাপৃষ্ঠ থেকে মুছে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়। ১৯৩৯ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ব্রিটেন চাচ্ছিলো তাদের কলোনি হিসেবে মিসর ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে নামুক। অথচ ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে নামার অর্থ হচ্ছে তুরস্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা। অর্থাৎ রণাঙ্গনে মুসলিম সৈন্যরা মুসলিম সৈন্যদেরই হত্যা করতে হবে। শায়খ হাসানুল বান্ন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। অবশ্য তখনকার প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশা এবং প্রধান সেনাপতি আযীয আল মিসরীও ইংরেজদের আবদার রক্ষা করার পক্ষে ছিলেন না।
ইংরেজরা প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। রাজা ফারুক (১৯৩৫-১৯৫২) ইংরেজদের চাপের নিকট নতি স্বীকার করেন।
তিনি প্রধান সেনাপতি আযীয আল মিসরীকে দীর্ঘ ছুটিতে পাঠিয়ে দেন। কিছুকাল পর প্রধানমন্ত্রী আলী মাহির পাশাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন। ১৯৪০ সালে মিসর ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। শায়খ হাসানুল বান্না এবং ইখওয়ানের সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল হাকিম আবেদিনকে গ্রেফতার করা হয়। আল ইখওয়ানের পরিচালনাধীন পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়। অন্য সব পত্রিকায়ও ইখওয়ানের খবর ছাপা যাবে না বলে নির্দেশ জারি করা হয়। জনসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করা হয়। কিছুকাল পর শায়খ হাসানুল বান্না ও আবদুল হাকিম আবেদিনকে মুক্তি দেয়া হয়। ১৯৪৩ সালের গোড়ার দিকে ইখওয়ানুল মুসলিমুন থেকে বিচ্যুত হয়ে কতিপয় সদস্য একটি গুপ্ত সশস্ত্র বাহিনী গঠন করে। এ বাহিনীর প্রধান হন সালিহ আল মাওয়ি। পরববর্তীকালে এ বাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন আবদুর রহমানুস সানাদী। এ গুপ্ত বাহিনী সশস্ত্রপন্থায় বিপ্লব সাধনে বিশ্বাসী। এ বাহিনী বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আর সরকার সব দোষ চাপায় ইখওয়ানের ওপর। এদের সম্পর্কে শায়খ হাসানুল বান্না একটি সার্কুলার লেটারে বলেন, ‘এরা ইখওয়ানও নয়, আল মুসলিমুনও নয়।’ মিথ্যা অজুহাতে মিসরের নিয়মতান্ত্রিক ইসলামী আন্দোলন ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ওপর রাজা ফারুকের শাসনামলে নির্যাতন বেড়েই চলে।
তবে এ সময়কালে এসে মিসরবাসীর সামনে এটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে, ইখওয়ানুল মুসলিমুন শুধু একটি রাজনৈতকি কিংবা একটি সংস্কারবাদী সংগঠন নয়, বরং ব্যাপক অর্থে একটি ইসলামী আদর্শবাদী দল। এ দল মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই কেবল ইসলামের লক্ষ্য নয়, মানবজীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশিত বিপ্লব সৃষ্টি করাই এর উদ্দেশ্য। আল্লাহ এ কারণেই তাঁর নবীগণকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য আস্বিয়ায়ে কেরামের নেতৃত্বে ‘উম্মতে মুসলিম’ নামে একটি দল গড়ে উঠেছিল। মিসরে এ দলেরই উত্তরসূরি হচ্ছে ইখওয়ানুল মুসলিমুন। পৃথিবীর অন্যতম প্রধান মুসলিম প্রধান দেশ মিসরে ইখওয়ান ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জন্মলগ্ন থেকেই নিরন্তর আন্দোলন পরিচালনা করছে।    (চলবে)
তথ্য সূত্র :
১.    খলিল আহমদ হামেদী, ইসলামের পুনর্জাগরণ ইখওয়ানুল মুসলিমুনের ভূমিকা, আল হেরা প্রকাশনী, ঢাকা, নভেম্বর ১৯৯৫, পৃ. ৯।
২.    শায়খ আহমদ আবুদর রহমান আল বান্না হাদীসের ব্যাখ্যাসম্বলিত বহু গ্রন্থ রচনা করেন। প্রাচীন অনেক গ্রন্থকে তিনি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কার ও সংশোধন করে প্রকাশ করেন। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (রহ) এর মুসলাদকে ফিকহি অধ্যায়ের আলোকে সম্পাদনা করেন। ১৯৬০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
৩.    খলিল আহমদ হামেদী, পূর্বোক্ত, পৃ. ১১।
৪.    এ কে এম নাজির আহমদ, যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ ইসলামকি সেন্টার, ঢাকা, জুলাই ২০১২, পৃ ৩৫।

লেখক : বিশিষ্ট ব্যাংকার ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply