মিসরে সেনা অভ্যুত্থানের অন্তরালে

মাসুমুর রহমান খলিলী
মিসরের ইতিহাসে সর্বজন স্বীকৃত প্রথম অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট মুরসিকে সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগ যৌথ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট মুরসিকে আটক করে রাখা হয়েছে অজ্ঞাতস্থানে। আর মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষ ৩০০ নেতার বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে গ্রেফতারি পরোয়ানা। তাদের অনেককে ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করা হয়েছে। মুসলিম ব্রাদারহুড সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে নির্বাচিত সরকার উৎখাতকে মেনে নেয়নি। এর বিরুদ্ধে সারা মিসরে বিক্ষোভ প্রতিবাদের ডাক দিয়েছে। বিক্ষোভে সেনাবাহিনীর গুলিতে এক দিনে ৩০ জনের বেশি মারা গেছে। হোসনি মোবারকের পতনের পর মিসর সবচেয়ে বড় সঙ্কটকাল অতিক্রম করছে এখন। সেনাবাহিনীকে অভ্যুত্থানের জন্য যারা প্ররোচিত করেছিল তাদের ধারণা ছিল ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চালানো হলে অতীতের মতো তারা সব কিছু মেনে নেবে। কিন্তু এবার নির্বাচিত সরকার উৎখাতের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ফলে মিসরের সঙ্কট বড় রকমের অনিশ্চয়তার দিকে যাওয়া শুরু করেছে। বহু দশকের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন গণবিপ্লবের পর নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতে আফ্রিকান ইউনিয়ন ও তুরস্ক ছাড়া আর কেউ সেভাবে প্রতিবাদ জানায়নি। সৌদি আরব ও সিরিয়া অভ্যুত্থানকে স্বাগত জানিয়ে ‘সেনাচার’ সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ব্রিটেন ও জার্মানির প্রতিক্রিয়ায় সেনা অভ্যুত্থানকে অভিনন্দন জানানো না হলেও দ্রুত নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানানোর মাধ্যমে তারা এই প্রক্রিয়াকে প্রকারান্তরে সমর্থন জানিয়েছে। মিসরে এবার ভেতর থেকে অভ্যুত্থানে সব ধরনের ইন্ধন দিলেও প্রকাশ্য স্বাগত জানানো থেকে বিরত থেকেছে ইসরাইল। মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থিত নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসির সরকার মিসরের সঙ্কট নিরসনে ব্যর্থ বলে উল্লেখ করে এই সরকারের বিরুদ্ধে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রতিবাদ বিক্ষোভ জানানো হচ্ছে। এসব প্রতিবাদের পেছনে অভ্যন্তরীণ কারণের চেয়েও আন্তর্জাতিক মহলের ইন্ধনটিই ছিল অনেক বড় বিষয়। ২৫ জানুয়ারির বিপ্লবের পর যে সংসদ নির্বাচন মিসরে অনুষ্ঠিত হয় তাতে ৪৭ শতাংশ আসন লাভ করেছিল ব্রাদারহুড। এর বাইরে সালাফিরা পেয়েছিল ২৪ শতাংশের মতো আসন। উদারপন্থী ও সেকুলারিস্টরা সম্মিলিতভাবে আসন পায় ২৫ শতাংশের চেয়ে কম। পরবর্তী সময়ে সংসদের যে উচ্চকক্ষ বা শূরা কাউন্সিল গঠন করা হয় তাতেও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল এ রকমই। এর সাথে কিছুটা ভারসাম্য এনে সংবিধান প্রণয়নের গণপরিষদ গঠন ও পুনর্গঠন করা হয়। মিসরে বিপ্লব-পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের পর পরই মুসলিম ব্রাদারহুড যাতে ক্ষমতায় যেতে বা থাকতে না পারে তার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। এর আগে মোবারকের পতনের পর নির্বাচন অনুষ্ঠানে বিলম্ব করা হয় যেন মানুষ আগের সরকারের স্বেচ্ছাচারী কর্মকাণ্ড ভুলে যায়। এ ক্ষেত্রে মোবারকোত্তর জেনারেল হোসেন তানতাবির নেতৃত্বে সেনা সরকার এক দিকে বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠায় বিলম্ব করে অন্য দিকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা তথা জনগণের মূল সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ না নিয়ে মানুষকে বিপ্লবের ব্যাপারে ক্ষুব্ধ করে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বিস্তারের চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। এরপরও শেষ পর্যন্ত যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তাতে ইসলামপন্থীরা নিরঙ্কুশভাবে জয়লাভ করে। নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের বিজয়ের পরপরই মোবারক আমলে নিযুক্ত বিচারকদের সংগঠন সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামিস্টদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য অবস্থান নেয়ার কথা জানায় এবং বলে তারা ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ থাকবে না। এর অংশ হিসেবে সাংবিধানিক আদালত মিসরে প্রথমবারের মতো স্বীকৃত অবাধ নির্বাচনে গঠিত সংসদকে বাতিল ঘোষণা করে। এটি করা হয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাত্র কয়েক দিন আগে। এরপর দুই পর্বের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টির প্রার্থী হিসেবে ড. মোহাম্মদ মুরসি বিজয়ী হলেও তার ক্ষমতা গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত তিনি ক্ষমতা নেন কিন্তু সেনা নেতৃত্বের সাথে এ জন্য একটি সমঝোতায় আসতে হয়। এ সমঝোতার অংশ হিসেবে তিনি যে সরকার গঠন করেন তাতে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছিল না তার। নতুন মন্ত্রিসভায় দুই-একজন ছাড়া প্রধানমন্ত্রীসহ বাকি সবাই ছিলেন ব্রাদারহুডের বাইরের ব্যক্তি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ছিল সরাসরি সেনাবাহিনী পরিচালিত। পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মুরসির সিদ্ধান্ত সেভাবে কার্যকর ছিল না। অর্থ মন্ত্রণালয়েও পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছিল না মুরসির। প্রসিকিউটর জেনারেল পদে পরিবর্তনকে বারবার বাধাগ্রস্ত করা হয়। এ ক্ষেত্রে এক হয়ে কাজ করে মিসরের উচ্চতর বিচার বিভাগ ও সেনা নেতৃত্ব। সাংবিধানিক আদালত সংসদের নিম্নকক্ষ বাতিলের পর উচ্চকক্ষ শূরা কাউন্সিল ও সংবিধান পরিষদ বাতিল করে। এরপর কার্যত মুরসির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকেই বাতিল করতে যাচ্ছিল। ঠিক সে সময় ড. মুরসি ডিক্রি জারি করে ক্ষমতাকে নিজের হাতে নিয়েছিলেন, যাতে বিচার বিভাগ সংবিধান পরিষদ ও শূরা কাউন্সিলকে বাতিল করতে না পারে। মুরসির এই ক্ষমতা গ্রহণকে স্বৈরাচারের কর্তৃত্ব গ্রহণ হিসেবে দেখিয়ে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করা হয়। শেষ পর্যন্ত শূরা কাউন্সিল ও সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার বিনিময়ে গৃহীত ক্ষমতা মুরসি পরিত্যাগ করেন আরেক ডিক্রি জারি করে। রেফারেন্ডামে সংবিধান অনুমোদন হওয়ার পর তা কার্যকর করার জন্য সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হলে আবার বাধার সৃষ্টি করা হয়। শেষ পর্যন্ত সংসদ নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। মুরসির নির্বাচনের এক বছরের মাথায় তাহরির স্কোয়ারে সমাবেশ করে সেনা অভ্যুত্থানের অজুহাত সৃষ্টি করা হয়। মিসরের পরিস্থিতিকে যারা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তারা জানেন সেখানে অভ্যন্তরীণ জনমত মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করেনি। ইসলামিস্টদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার বাইরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজটিই শুধু সম্পন্ন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শক্তি একসাথে কাজ করেছে। এতে ভূমিকা ছিল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী পশ্চিমা দেশগুলোর, ভূমিকা ছিল উপসাগরীয় আরব নেতৃবৃন্দের, প্রতিবেশী ইসরাইল ও সিরিয়ার। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে একমাত্র তুরস্ক ছাড়া আর কেউ মিসরে মুরসির নির্বাচিত সরকার টিকে থাকুক তা চায়নি। মুসলিম ব্রাদারহুডের মিসরের মতো দেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যাওয়ার ব্যাপারে পশ্চিমা ও আরব দেশগুলোর রিজার্ভেশনের বিষয়টি দলের নেতাদের অজানা ছিল না। এ কারণে তাহরির স্কয়ারের আন্দোলনে ব্রাদারহুড অংশ নিলেও নেতৃত্বে যাওয়ার চেষ্টা সচেতনভাবে করেনি। বিপ্লবোত্তর সংসদ নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থী না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল, এমনকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও প্রার্থী না দেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল মুসলিম ব্রাদারহুড। পরে সে ঘোষণা থেকে তারা সরে আসে। শেষ পর্যন্ত মিসরের অভ্যন্তরীণ জনমত নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশের এই রিজার্ভেশনই ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের আয়োজনকে চূড়ান্ত করতে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমের সামনে একটি নীতিগত প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দেয়। সেটি ছিল মধ্যপ্রাচ্য বা মুসলিম দেশগুলোর জন্য গণতন্ত্র না উদারনৈতিকতা বা সেকুলারিজম সহায়ক হবে সে বিবেচনা করা। এক সময় মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের বিকাশের পক্ষে পশ্চিমের নীতিনির্ধারণ পর্যায়ে মত ছিল জোরালো। তাদের হিসাবে ছিল মধ্যপ্রাচ্যে জনগণের মত প্রকাশের সুযোগকে রুদ্ধ করে রাখার কারণে আলকায়েদার মতো জঙ্গি ও চরমপন্থার বিকাশ ঘটছে। কিন্তু আরব জাগরণের পর অনুষ্ঠিত কয়েকটি নির্বাচনে ইসলামিক দলগুলো ভালো করলে বিপরীত ধারা শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর এ ক্ষেত্রে ইসরাইলি লবি জোরালো ভূমিকা পালন করে। মুরসির নির্বাচিত সরকার হটিয়ে আবার মোবারক মার্কা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নতুন উদ্যোগে পশ্চিমের সমর্থন সৃষ্টি হয়। মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছিল রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলোর জন্য। আলজেরিয়া, মিসর, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেনের পর বিক্ষোভ দেখা দেয় জর্দান, বাহরাইন ও মরক্কোর মতো দেশেও। এই প্রবণতা আরেকটু বিস্তৃত হলে তা সৌদি আরব, কুয়েত, আমিরাত ও কাতারের মতো স্থিতিশীল দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে আরব জাগরণের সাফল্যে ছেদ টানার প্রয়োজন অনুভব করেন উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর নেতারাও। তারা চেয়েছিলেন এসব দেশে ব্রাদারহুড ঘরানার সব সংগঠনের তৎপরতা ঘোষণা দিয়ে গুটিয়ে নেয়া হোক। সেটি বাস্তবে হয়েছে মর্মে দেখা যায়নি। এ কারণে বাইরে আরব জাগরণোত্তর সরকারের সাথে উপসাগরীয় সরকারগুলোর যতই সুসম্পর্ক দেখা যাক না কেন বাস্তবে এসব দেশের সরকার মিসর বা তিউনিসিয়ার সরকারকে ব্যর্থ করার জন্য ভূমিকা রেখেছে। মিসরে সেনা অভ্যুত্থানের পর সাংবিধানিক আদালতের যে প্রধান বিচারপতিকে অন্তর্বরতী সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বসানো হয়েছে তিনি সৌদি সরকারের আইন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন ১১ বছর। এ ছাড়া মুরসি ইরানের সাথে মিসরের সম্পর্ককে একেবারে স্বাভাবিক করার উদ্যোগ না নিলেও তিনি শীর্ষ মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে সঙ্ঘাত পরিহার ও সমঝোতার নীতির প্রতি আগ্রহী ছিলেন। এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির সাথে মিলেনি। এতে শেষ পর্যন্ত মিসরে মুরসির সরকারের পতন ঘটানোর ব্যাপারে আরব নেতারা অন্তরালে হয়ে পড়েন অনেকটা বেপরোয়া। ইসরাইল বরাবরই মুসলিম ব্রাদারহুডকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে। দেশটির সীমান্তের সাথে লাগোয়া একটি শক্তিশালী দেশের ক্ষমতায় ব্রাদারহুডের বসা ও টিকে থাকাকে সর্বাত্মকভাবে ঠেকাতে চেয়েছে দেশটি। পশ্চিমা লবিকে এ ব্যাপারে সম্মত করা এবং তার নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানোর কাজটি করেছে ইসরাইল। মিসরের অভ্যন্তরীণ উদারপন্থী দলগুলোর কাছে ব্রাদারহুডের সাফল্য তাদের জন্য ক্ষমতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছেদের নামান্তর। মোবারকপন্থী সেকুলারিস্ট যারা বহু দশক ধরে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছে তাদের জন্য মুরসির শাসন ছিল কুইনিন তুল্য। এ ছাড়া মিসরের পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়ের বিকাশের জন্য নতুন শাসনকে ইতিবাচক মনে করেননি। ফলে অভ্যন্তরীণ এসব শক্তির মধ্যে এক ধরনের স্বার্থের ঐক্য সৃষ্টি হয়, যা আন্তর্জাতিক পৃষ্ঠপোষকতার সাথে এক হয়ে সেনাবাহিনী-বিচার বিভাগের যৌথ অভ্যুত্থানের পথ সৃষ্টি করে। এই অভ্যুত্থানের পর মিসরের ভাগ্যে কী ঘটতে যাচ্ছেÑ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর সাথে জড়িত রয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও ভবিষ্যৎ।

মিসরের গণতন্ত্র ও পাশ্চাত্য মনোভঙ্গি
মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণের পর থেকে পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনেকে মুসলিম বিশ্বের জনগণকে তাদের নেতা বাছাইয়ের সুযোগ দানের বিপদ সম্পর্কে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে সতর্ক করেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল মুসলিম জনগণকে অবাধ ভোটের সুযোগ দিতে গেলে তারা ইসলামিস্টদের পক্ষে ভোট দেবে। তিউনিশিয়া, মিসর, মরক্কো, এমনকি লিবিয়ায়ও ইসলামী দলগুলো নির্বাচনে ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। তুরস্কে ‘মাইল্ড ইসলামিস্ট’ একে পার্টি বারবার জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসছে। এ সতর্কবাণী যে বারাক ওবামার মনে সত্যি সত্যি এতটা আছর করবে তা মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অবাধ ও মুক্ত নির্বাচনে বিজয়ী প্রেসিডেন্ট ড. মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে টেনে নামানোর ঘটনার আগে উপলব্ধি করা যায়নি। এ ঘটনার পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিবাদ বা নিন্দা তো আমেরিকা করেইনি বরং দ্রুত গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পরামর্শ দিয়ে তাদের কাজকে সমর্থন দিয়েছে। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানোর বাস্তবতাটিও মুখে আনেননি আমেরিকান মুখপাত্র। কিন্তু নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার প্রতিবাদ করায় সহিংসতার সুুস্পষ্ট উসকানিদাতা হিসেবে মুসলিম ব্রাদারহুডকে অভিযুক্ত করেছেন হোয়াইট হাউজ মুখপাত্র। গুলি করে সেনা ব্যারাকের অদূরে অবস্থানরত বিক্ষোভকারী অর্ধশতাধিক নারী পুরুষ শিশুকে হত্যার নিন্দাও তিনি করেননি। পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ইঙ্গ-আমেরিকান মনোভক্তি আরো খোলাসা করে বলেছেন, মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেনা অভ্যুত্থানকে প্রকারান্তরে জনবিক্ষোভের প্রতি সাড়া দেয়া হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর ব্যতিক্রম ছিল কেবল আফ্রিকান ইউনিয়ন (এইউ)। আফ্রিকান ইউনিয়ন মিসরে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাতের কারণে সংস্থার সব কার্যক্রমে মিসরের অংশগ্রহণ স্থগিত করেছে। দেশে দেশে বিক্ষোভ আরব বসন্তের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের পর ইউরোপ এশিয়া আমেরিকায় ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রদর্শন একটি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়। এর আগেও রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো কোনো সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনগণের ক্ষোভ বিক্ষোভ প্রকাশ হতে দেখা গেছে। কিন্তু গত কয়েকবছরে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সঙ্কট ও খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বেকারত্ব বেড়ে যাওয়ার মিলিত প্রভাবে মানুষের মধ্যে ভোগান্তি ও ক্ষোভ ব্যাপকতা পায়। এর প্রভাব দুই ধরনের দেশে দুইভাবে পড়ে। যেসব দেশে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রয়েছে এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয় না সেসব দেশে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শাসন পরিবর্তনের চূড়ান্ত কর্মসূচি পর্যন্ত গড়ায়। এ ধরনের বেশ কটি দেশে সরকার পরিবর্তন পর্যন্ত গিয়ে পরিণতি লাভ করে আন্দোলন। আবার ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন দেশ এবং এশিয়ার কিছু কিছু দেশে এ ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে তবে তা বড় জোর অগ্রিম নির্বাচন পর্যন্ত গেছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে ১ শতাংশের বিরুদ্ধে ৯৯ শতাংশের আন্দোলন, ব্রিটেনে ইরাক অভিযানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, গ্রিস ইতালি স্পেনসহ বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশে সরকারের ব্যয় ও সুবিধা সঙ্কোচনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাশিয়ায় পুতিনের বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে কারচুপির বিরুদ্ধে আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। ইসরাইলে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধেও এ ধরনের ক্ষোভ বিক্ষোভ একাধিক বার হয়েছে। গণতান্ত্রিক সমাজে জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতা স্বীকৃত। কোনো ইস্যুতে জনগণ বিক্ষুব্ধ হলে প্রতিবাদ বিক্ষোভের মাধ্যমে তার প্রকাশ ঘটাতে পারে। কিন্তু চার বা পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষে ভোটের মাধ্যমে যেখানে সরকার পরিবর্তনের মুক্ত সুযোগ থাকে সেখানে মাঝখানে বিক্ষোভ করে সরকারের পতন ঘটানোর আন্দোলন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অরাজকতার মধ্যে নিয়ে যায়। জনক্ষোভের মতলবি ব্যবহার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগুরুর মতের ভিত্তিতে দেশ চালিত হয়। তবে সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণের নিশ্চয়তা থাকে। এ ব্যবস্থায় আমেরিকার মানুষ চার বছর পর পর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করেন। সেখানে দ্বিদলীয় ব্যবস্থা কার্যকর থাকায় নির্বাচনী প্রচারণার সময় দেশ কার্যত দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। একই অবস্থা ফ্রান্স জার্মান বা ব্রিটেনেও হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর পর পর কংগ্রেস নির্বাচন হওয়ায় জনমতের পরিবর্তন দ্রুত উপলব্ধি করা যায়। ইউরোপের কোনো কোনো দেশে উপনির্বাচন বা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর প্রতিফলন ঘটে থাকে। এরপরও নানা ইস্যুতে বিক্ষুব্ধ মানুষ বিক্ষোভ করতে পারে। এই ক্ষোভ বিক্ষোভকে আন্তর্জাতিক কায়েমি শক্তি ব্যবহার শুরু করেছে। এটি করা হচ্ছে মুসলিম গণতান্ত্রিক দেশগুলোয় আর ক্যারিবীয় অঞ্চলের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার দল ক্ষমতায় রয়েছে এমন দেশগুলোতে। এর পেছনে ইউরো-মার্কিন ইন্ধনে সঙ্কটে পড়ছে গণতন্ত্র। ব্রাজিলে, তুরস্কে, তিউনিশিয়া এবং মিসরে এটি বারবার করা হয়েছে। মিসরে হোসনি মোবারকের ৩০ বছরের শাসনকালে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এর কোনোটাই অবাধ ও গ্রহণযোগ্য ছিল না। এ সময়ের পুরোটাতো জারি করা ছিল জরুরি অবস্থা। প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারক রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর একদিনের জন্যও প্রকাশ্যে জনসমক্ষে উপস্থিত হননি। তার বিরুদ্ধে তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলন ছিল সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন। এই আন্দোলনে হোসনি মোবারক পদত্যাগ করার পর সামরিক জান্তা ক্ষমতা নেয়। এরপর মিসরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মুক্ত অবাধ পরিবেশে সংসদ নির্বাচন হয়। সে নির্বাচনে মুসলিম ব্রাদারহুড ও সালাফিদের আন নূর পার্টি দুই তৃতীয়াংশ আসন লাভ করে। হোসনি মোবারক আমলের সাংবিধানিক আদালতের বিচারকেরা ঠুনকো অজুহাত এনে এ ধরনের অবাধ নির্বাচন বাতিল করে দেয়। নির্বাচিত সংসদ বাতিলের পর উচ্চ পরিষদ এবং সংবিধান পরিষদও বাতিলের উদ্যোগ নেয়া হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বাতিলের প্রক্রিয়াও চলতে থাকে অন্তরালে। হোসনি মোবারকের পতনের পর দেশটির ভেতর-বাইরের বিভিন্ন কায়েমি শক্তি যৌথভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেয়ার জন্য কাজ শুরু করে। এর মধ্যে দীর্ঘ পাঁচ দশকের একনায়কতান্ত্রিক শাসনে গড়ে ওঠা সেনা প্রতিষ্ঠান ও বিচার বিভাগ, ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র ও একনায়কতান্ত্রিক সরকার এবং মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থ একই সমীকরণে চলে আসে। হোসনি মোকারকের আমলে মিসরের সেনাবাহিনীকে শুধুমাত্র অস্ত্রশস্ত্র ও জনবলের দিক থেকে একটি বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি একই স্বাথে রাষ্ট্রের ব্যবসায়বাণিজ্যের একটি বড় অংশ তাদের হাতে তুলে দেয়া হয়। এক হিসাবে মিসরের মোট জাতীয় বাণিজ্যের ৮ শতাংশ রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। অন্য হিসাবে দেশটির ৪০ শতাংশ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রক হলো সেনাবাহিনী। মিসরকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে সাহায্য দিয়ে থাকে তা প্রধানত দেয় সেনাবাহিনীকে। সেনা পটভূমি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হওয়া জামাল আবদুল নাসের, আনোয়ার সাদাত অথবা হোসনি মোবারক প্রত্যেকেই সেনা প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ক্ষমতার মূল ভিত্তি বানিয়ে ক্ষমতাকে সুসংহত করতে চেয়েছেন। ফলে এক দিকে ক্ষমতা অন্য দিকে বাণিজ্য এ দুইয়ের নিয়ন্ত্রণ মিসরের সেনবাহিনী কখনো হারাতে চায়নি। এ জন্য হোসনি মোবারকের পতনের পর জেনারেল হোসেন তানতাবি রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্ব নেয়ার চেষ্টা করেছেন। রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে সেনাবাহিনী নিয়েছে। মুরসি শুধু জেনারেল তানতাবির পরিবর্তে জেনারেল আব্দুল ফাত্তাহ আল মিসিকে পরিবর্তন করতে পেরেছেন। কিন্তু সেনা প্রতিষ্ঠানকে কোন সময় নিজ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেননি। আর অন্য অনেক দেশের মতো সেনাবাহিনী তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য সহযোগী করে নেয় বিচার বিভাগকে। একনায়ক শাসকেরা বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন পদগুলোতে সব সময় এমন লোককে বসান যারা তাদের ইচ্ছানুসারে কাজ করবেন। হোসনি মোবারক এ ব্যাপারে ছিলেন বাড়তি সতর্ক। যার কারণে জনগণ ইসলামী দলগুলোর পক্ষে ভোট দিলেও বিচারকদের অ্যাসোসিয়েশন সাংবাদিক সম্মেলন করে ইসলামিস্টদের ব্যাপারে নিরপেক্ষ না থাকার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। উচ্চতর আদালত একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে অকার্যকর করে তোলে।

রহস্যজনক অর্থের জোগান
মিসরে গণতান্ত্রিক সরকারের উৎখাতের জন্য এক বছর ধরে অব্যাহতভাবে অর্থের জোগান দেয়া হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে। অথচ এইভাবে একটি দেশে রাজনৈতিক বিক্ষোভ ও অস্থিরতা সৃষ্টিতে অর্থের জোগান দেয়া আমেরিকা ও মিসর কোনো দেশের আইনেই অনুমোদন নেই। তবু তা করা হয়েছে মাসের পর মাস ধরে। কর্নেল ওমর আফিফি সোলায়মান নামে মোবারক আমলে নানা কুকর্মে সিদ্ধহস্ত এক মিসরীয় এলিট ইনভেস্টিগেটিভ পুলিস ইউনিটের কর্মকর্তা ছিলেন। ২০০৮ সাল থেকে পরবর্তী চার বছর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক আধা সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল এনডাউমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি (এনইডি) থেকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের তহবিল পেয়েছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে উদ্বাস্তুর মর্যাদায় বসবাসরত কর্নেল সোলায়মানকে ২০১১ সালে দুই মার্কিন মিত্র ইসরাইল ও সৌদি আরবের দূতাবাসে হামলার সাথে জড়িত থাকার জন্য তার অনুপস্থিতিতে পাঁচ বছরের জেল দেয়া হয়। আদালতের দলিলে উল্লেখ করা হয় এই লোক মিসরীয় সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তার ওপর আঘাত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করেছে। আমেরিকান ইন্টারন্যাল রেভিনিউ ডকুমেন্টে দেখা যায়, হুকুক আল নাস বা জন অধিকার নামে একটি প্রতিষ্ঠানে এনইডি থেকে লাখ লাখ ডলার দেয়া হয়েছে যে প্রতিষ্ঠানের একমাত্র কর্মচারী হলো সোলায়মান নিজে। এনইডির কাগজপত্রে বলা হয়েছে সোলায়মান ও তার গ্রুপ অহিংস প্রচারণার সাথে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু বাস্তবে মিসরীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকার, ইউটিউবের ভিডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টিং-এ দেখা গেছে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের সরকারকে উৎখাতের জন্য বিভিন্ন ধরনের সহিংসতাকে ছড়িয়ে দিতে উৎসাহিত করেছে এই ব্যক্তি। মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কর্মীদের দেয়া এক নির্দেশে সোলায়মান বলেছে, ‘কায়রোতে যাতায়াতকারী গাড়ি বন্ধ করার জন্য রাস্তায় পাম গাছ কেটে ফেলে রাখো। আর রাস্তার ওপর গ্যাস ও ডিজেল ছড়িয়ে দাও যাতে কোনো বাস এলেই তাতে আগুন ধরে যায় আর ভেতরে যাত্রীরা পুড়ে মরে…’ এর আগের মে মাসে এক নির্দেশনায় সোলায়মান বলেছে, ‘সব অচল করে দিতে বিদ্যুৎ গ্যাস ও পানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণকারীদের মাথা কেটে নাও।’ ৮৩ হাজার কর্মীর উদ্দেশে আরেক নির্দেশনায় সোলায়মান গাড়ি উড়িয়ে দিতে ২০ লিটার তেলের সাথে চার লিটার গ্যাস মিশিয়ে তা ছুড়ে মারতে পরামর্শ দিয়েছেন। মুরসি বিরোধী আন্দোলনে এসব ঘটনা বাস্তবে ঘটতে দেখাও গেছে। এনইডি ছাড়াও আরো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন এনজিওর নামে মুরসির বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী দ্য স্যালভেশন ফ্রন্টের নেতাদের অর্থের জোগান দেয়া হয়েছে। এ অর্থের পুরোটা কাজে লাগানো হয়েছে মুরসির বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এসরা আবদুল ফাত্তাহ নামে ৩৪ বছরের এক মিসরীয় মেয়ের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ সময় মিসরের প্রস্তাবিত সংবিধান গণভোটে যাওয়ার আগে এটাকে সমর্থনকারী মসজিদের ইমাম ও খতিবদের মসজিদ দখল করে বের করে দেয়ার জন্য এশরা তার সমর্থকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। এভাবে মসজিদ দখল ঠেকাতে বেশ কয়েকটি স্থানে সংঘর্ষ হয়েছে এবং তাতে বেশ কযেকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আমেরিকান ফেডারেল রেকর্ড অনুসারে এশরা আবদুল ফাত্তাহর এনজিও এনইডি, এনডিআই ও এমইপিআই থেকে প্রচুর আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। শুধু ২০১১ সালে এনইডি তাকে অনুদান দিয়েছে ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার। এশরা আবদুল ফাত্তাহ নোবেল বিজয়ী মোহাম্মদ আল বারাদির রাজনৈতিক দল আল দুস্তর পার্টি ও স্যালভেশন ফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। এভাবে দেখা যায় যারা গত এক বছরে মুরসি বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামকে সংগঠিত করেছেন তাদের বিভিন্নভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে আমেরিকান বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এসবের একবারে সুনির্দিষ্ট তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ ছিল তিনি অর্থনীতিতে গতি আনতে পারছেন না। বেকারত্ব বাড়ছে। জন আকাক্সক্ষা পূরণ করতে পারেননি। কিন্তু তিনি অর্থনীতির কোন অবস্থায় ক্ষমতায় আসেন এখন কী অবস্থা সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি। ড. মুরসি গত এক বছরে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারের পদে পরিবর্তন এনেছিলেন বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়ে। শক্ত হাতে উচ্চ পরিষদ ও সংবিধান প্রণয়নপ্রক্রিয়া বাতিল করার উদ্যোগ ব্যর্থ করে সংবিধান প্রণয়ন এবং গণভোটে তা পাস করতে পেরেছেন। তিনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থা চালু করার পক্ষে নানা প্রতিকূলতা মোকাবেলায় এগিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে আটকে দেয়া হয়। বিদেশী বিনিয়োগ যাতে না আসে তার জন্য প্রতি মাসেই নানা ইস্যুতে বিক্ষোভ সহিংসতা লাগিয়ে রাখা হয়। মুরসি যে সরকার গঠন করেন তার ওপর প্রেসিডেন্টর নিয়ন্ত্রণ কোনো সময় পুরোপুরি ছিল না। পররাষ্ট্র স্বরাষ্ট্র অর্থ প্রতিরক্ষা সুয়েজ খাল মন্ত্রণালয় পরিচালিত হয় আগের আমলের লোকদের দ্বারা। তার সরকারে প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা ব্রাদারহুডের সদস্য ছিল না। এরপরও তিনি রাজনৈতিক সব পক্ষকে সরকারে আনার জন্য আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু কোনো সময় তার প্রস্তাবে বিরোধীরা সেভাবে সাড়া দেয়নি। সর্বশেষ তাহরির স্কোয়ারে পদত্যাগের দাবিতে সমাবেশÑ সবই একই সূত্রে গাঁথা। সেনা নেতৃত্ব ও বিচার বিভাগের সাথে সেকুলার রাজনৈতিক শক্তি এক হয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণের গতিকে উল্টো দিকে নিয়ে গেছে। মোবারকের ক্ষমতার কিছু ভাগ এখন হয়ত আলবারাদি সামাদিন বা কিঞ্চিত পরিমাণ সৌদিপন্থী সালাফি আন্ নূর পার্টি পেতে পারে। কিন্তু মিসর যেটি হারালো সেটি হলো গত তিন বছরের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাফল্য যেটি অর্জিত হয়েছিল তা আবার বিপন্ন হয়ে পড়েছে।
মিসর ও পশ্চিম আফ্রিকার অর্থনীতির প্রাণ সঞ্চারকারী হলো নীল নদ। মিসরের ঘটনার সাথে এই নীলের পানি নিয়ন্ত্রণের এক উদ্যোগের রয়েছে বিশেষ সম্পৃক্ততা। সপ্তাহখানেক আগে নীল নদের উৎস দেশ ইথিওপিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে প্রতিরক্ষা ব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। মুরসির পতনের সাথে এই ধরনের ঘোষণার রহস্যটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ব্লু নীল নদের উৎপত্তি হলো তানা হ্রদ। ইথিওপিয়ার পাহাড় থেকে নেমে আসা পানির ধারা এই হ্রদ তৈরি করেছে। সুদানের রাজধানী খার্তুমে হোয়াইট নীলের সাথে মিলনের আগে মিসরাত গাজ্জামের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ সুদানের তৃণভূমি হয়ে প্রবাহিত হয়েছে ব্লু নীল। এর পর সাবিয়ান মরুভূমি লেক নাসের ও লোয়ার মিসর হয়ে ভূমধ্যসাগরে পড়েছে বিশ্বের এই অন্যতম বৃহৎ নদ। এই নদের পানির উৎস নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সেচের জন্য ইথিওপিয়া ইসরাইলের আর্থিক সহায়তায় নিয়েছে রেনেসাঁ বাধ প্রকল্প। ১৯২৯ ও ১৯৫৯ সালে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী নীলের পানির প্রবাহ সচল রাখতে এবং মিসরের ব্যবহারের জন্য ৯০ শতাংশ পানি ছেড়ে দিতে হবে। উজানের দেশগুলো পানির এই বণ্টনকে কোনো সময় ন্যায্য মনে করেনি। কিন্তু পানি পুনর্বণ্টনের আলোচনার প্রস্তাবে কোনো সময় মিসর সম্মত হয়নি। নীল নদের ওপর মিসরে অর্থনীতি কৃষি এতটাই নির্ভরশীল যে দেশটির বিশাল সামরিক বাহিনী রাখার একটি বড় কারণ হলো নীলের পানির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা রাখা। এ জন্য মিসর একধিকবার সামরিক অভিযানের হুমকিও দিয়েছে। প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াও ইথিওপীয় বিদ্রোহীদের সহায়তার মাধ্যমে এক ধরনের প্রক্সিযুদ্ধের অপসনও রেখেছে মিসর। প্রেসিডেন্ট মুরসি নীল নদের পানি নিয়ন্ত্রণের যেকোনো উদ্যোগকে কঠিনভাবে মোকাবেলার সঙ্কল্প ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের রক্ত ঝরিয়েই কেবল নীলের পানির প্রতিটি ফোঁটা থেকে মিসরকে বঞ্চিত করা যাবে। এর তিন সপ্তাহের মধ্যেই মুরসির পতন ঘটানো হয়েছে। মিসরের নির্বাচিত সরকার হটিয়ে সেনা অভ্যুত্থানের পর সঙ্গতভাবে রাষ্ট্রের ঐক্য ও সংহতি সঙ্কটে পড়েছে। এই সঙ্কট তৈরির জন্যই নির্বাচিত সরকারকে হটানোতে একটি ভূমিকা ইসরাইল আমেরিকার থাকলেও থাকতে পারে। মুরসির পতন ঘটানোর সাথে ইথিওপিয়ার বাঁধ নির্মাণের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষাব্যয় ১৫ শতাংশ বাড়ানোর ঘোষণা এবং ইসরাইলের এ ব্যাপারে গোপন সহায়তার বিষয় বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নীল নদের পানি বণ্টনের ইস্যুটি এমন একটি ইস্যু ক্ষেত্রে মিসরের সাথে নেই কোনো প্রতিবেশী দেশ। অথচ মিসরীয়দের জন্য নীল নদ বাঁচা-মরার প্রশ্ন। এ নিয়ে যেকোনো কিছু করা হলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধ বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট মুরসির সাফল্য ও ব্যর্থতা এখন শুধু তার ব্যক্তি বা দল মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সংশ্লিষ্ট নেই। এটি পৃথিবীতে গণতন্ত্রচর্চা কোন্ পথে এগোবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে পড়েছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতৃত্বের দাবিদার যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখানে গণতন্ত্রের চেতনাকে উচ্চকিত করল নাকি গণতন্ত্রচর্চাকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিলো সেটিই প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। আফ্রিকান ইউনিয়নের যেসব দেশ মিসরকে সেনা অভ্যুত্থানের জন্য সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলো তার মধ্যে দুয়েকটি ব্যতিক্রম মুসলিম ব্রাদারহুড ভাবধারার সরকার কোনো দেশে তো নেই অধিকন্তু এসব দেশের অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়। আফ্রিকানেরা নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। আফ্রিকান নেতৃবৃন্দ মনে করেছেন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের মুখে নির্বাচিত সরকারকে হটানোর বিষয়টি মেনে নিলে তা ক্যান্সারের মতো অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। ৫০ ও ৬০ দশকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমেরিকান গোপন সহায়তায় সামরিক অভ্যুত্থানের হিড়িক পড়ে। সে অবস্থা যদি আবার শুরু হয় তাহলে এশিয়া ও আফ্রিকার কোনো দেশেরই নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার নিরাপদ থাকবে না। এই উপলব্ধির কারণেই সম্ভবত আমেরিকার প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত থাইল্যান্ডের ইংলাক সিনাওয়াত্রার সরকার মুরসির নির্বাচিত সরকার হটিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা গ্রহণের আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানিয়েছে।
মিসরের ঘটনায় আমেরিকান ভূমিকা কতটুকু মধ্যপ্রাচ্যের কল্যাণ ও গণতন্ত্রের পক্ষে আর কতটুকু দেশটির কৌশলগত মিত্র ইসরাইল ও সৌদি আরবের জন্যÑ তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। পাশ্চাত্যের মধ্যপ্রাচ্য নীতি এই অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্র শাসিত সরকারগুলোর সাথে মধ্যপন্থী ইসলামী আন্দোলনকে মুখোমুখি করে দেয়া হলো। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে এক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে যার পথ ধরে আরব দেশগুলোকে খণ্ডবিখণ্ড করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারবে পাশ্চাত্য ও ইসরাইল। জনগণের ইচ্ছা তাদের স্বার্থে ক্ষমতার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে না বলেই হয়তো মিসরে সেনাবুটের নিচে গণতন্ত্রকে বিসর্জন দিতে পিছপা হয়নি ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইল-সৌদি বলয়। এই বলয়ের পরের টার্গেট হয়তো তিউনিসিয়া ও তুরস্ক। তবে এ মিশন সহজ হওয়ার নয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কালামিস্ট

SHARE

Leave a Reply