মিয়ানমারের আরাকানে রোহিঙ্গা নির্যাতন কালের পুনরাবৃত্তি -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

‘গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বঞ্চিত মানুষের মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেয়’- এমন আশায় দীর্ঘদিন যাবৎ হাজারো অন্যায়-অবিচারকে বুকে ধারণ করেই বেঁচে আছে মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশের মুসলমানরা। অবরুদ্ধ ও মিডিয়া-প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার দেশ হলেও আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের দুর্দশার কথা এখন আর কারো কাছে অস্পষ্ট নয়। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদসহ নানাবিধ অন্যায়-অত্যাচারের পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের নিজভূমি আরাকান থেকে পালিয়ে জীবন বাঁচানোর ইতিহাসও এখন সকলেরই জানা। শরণার্থী হিসেবে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নিয়ে বরাবরই সাফার করছে বাংলাদেশ। এখন বাংলাদেশেও তাদের আর ঠাঁই মিলছে না। এমন পরিস্থিতিতে মিয়ানমারে গণতন্ত্রের শীতল হাওয়া বইতে শুরু করেছে। এতে আরাকানের রোহিঙ্গারাও খানিকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিল, মুক্তির নিশানা খুঁজে পাবার স্বপ্ন দেখেছিল তারা। গণতন্ত্রের আপসহীন নোবেল বিজয়ী শান্তিকামী নেত্রী অং সান সুকির গণতান্ত্রিক বিজয়ে তাদের ভাগ্যাকাশে জমে থাকা কালো মেঘ দূরীভূত হবে- এমন প্রত্যাশা ছিল তাদের চোখে মুখে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে মনে হচ্ছে সত্যিকারার্থে আরাকানি রোহিঙ্গা মুসলমানদের মানবাধিকারের আশা করতে নেই। দুনিয়ায় তাদের পক্ষে কথা বলার কোনো লোকই নেই। তাদের যেন জন্মই হয়েছে বঞ্চনা আর হত্যাযজ্ঞের মুখোমুখি হবার। মিয়ানমারে সাম্প্রতিককালের গণতান্ত্রিক পোস্টারে আবৃত রাষ্ট্রশক্তির হাতে তারা আবারও নতুন করে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। পোড়া বাড়িঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে পোড়া মানুষের উৎকট গন্ধ। ঠিকানাহীন এ মানুষগুলো পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীদের কাছেও ঠাঁই পাচ্ছে না। বাংলাদেশ ইতঃপূর্বে সাহায্য-সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করলেও এবার পুরোপুরি কঠোর অবস্থানে। হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তাদের নিজেদের সঁপে দিতে হচ্ছে মৃত্যুর মুখে। হায়রে মানবতা! তাদের আহাজারি শোনার মতোও কেউ নেই পৃথিবীর কোনায় কোনায়।

গণতান্ত্রিক মিয়ানমার ও
রোহিঙ্গা নির্যাতন
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, গত ৯ অক্টোবর আরাকানের সীমান্ত ফাঁড়িতে আকস্মিক সন্ত্রাসী হামলায় ৯ জন পুলিশ নিহত হয়। কোন ধরনের তদন্ত ছাড়াই সন্দেহজনকভাবে এ ঘটনার দায় রোহিঙ্গাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়। সেই অজুহাতে সেখানকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর দমন-পীড়ন শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী। তারা গ্রামের পর গ্রামে আগুন জ্বালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে নারী, শিশু, বৃদ্ধসহ অসংখ্য রোহিঙ্গা মুসলমানকে। বাড়ি থেকে রোহিঙ্গা মহিলাদেরকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হচ্ছে। পোড়া বসতবাড়ির ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে পোড়া লাশের বীভৎস গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে বলেও খবর পাওয়া যাচ্ছে। অনেকে জীবন বাঁচানোর জন্য এখানে সেখানে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু তাতেও তারা নিরাপদ নয়। পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের দেখামাত্রই গুলি করে হত্যা করছে দেশটির সেনাবাহিনী। কোন ধরনের মিডিয়াকর্মীকে সে সব এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হচ্ছে না। ইতঃপূর্বের সামরিক শাসনের যে ইতিহাস তারই পুনরাবৃত্তি ঘটানো হচ্ছে সদ্য গণতন্ত্রে উত্তরণের পথের এ দেশটিতে। গত উনিশে নভেম্বরে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দেয়া তথ্যের আলোকে ওয়াশিংটন পোস্ট একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনে স্যাটেলাইটে তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, সে দেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শনাক্ত করে যে, গত তিন সপ্তাহে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের তিনটি গ্রাম সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে দিয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনী। এতে অসংখ্য বাড়িঘর একেবারে ভস্মীভূত করে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের বরাত দিয়ে কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে যে, গত তিন সপ্তাহে প্রায় সাড়ে তিন হাজার বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও ৬৯ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে বলে সেনাবাহিনী দাবি করেছে, কিন্তু রোহিঙ্গা নেতা নূরুল ইসলামের বরাত দিয়ে গণমাধ্যম প্রকাশ করেছে যে, সেখানে চার শতাধিক রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা উত্তর আরাকান ও মংডু টাউনশিপকে নরকে পরিণত করেছে বলেও রোহিঙ্গা নেতারা মন্তব্য করেছেন। সেনাসদস্যরা বিভিন্ন পাড়ায় ঢুকে বাড়িতে বাড়িতে তল্লাশি চালানোর নামে হত্যাযজ্ঞ, লুটতরাজ ও ধর্ষণের মতো জঘন্য কর্মকান্ড পরিচালনা করছে। ফলে রোহিঙ্গারা যেমন ঘরেও নিরাপত্তাহীন তেমনি বাইরে রাস্তাঘাটে কিংবা জঙ্গলেও সেনাসদস্যদের হামলার শিকার।
দেশী-বিদেশী সকল ধরনের গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার কারণে আরাকানের সঠিক চিত্র নির্ণয় করা কঠিন। তদুপরি হিউম্যান রাইটস ওয়াচ স্যাটেলাইট ছবি সংগ্রহ করে বিষয়টি সম্পর্কে কিছু তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্রাড এডামস এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, স্যাটেলাইটের সাহায্যে তোলা ছবিগুলো শুধু রোহিঙ্গাদের বিনাশ করার বিষয়টি প্রমাণ করে না। এটা তার চেয়েও অনেক বড় মানবাধিকার লঙ্ঘন। তিনি আরো বলেন, বিচার কিংবা ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দ্রুত জাতিসংঘের সহযোগিতায় এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত করা প্রয়োজন। এর আগে প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’ কিন্তু মিয়ানমারের তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার এসব বিষয়ে কোনো ধরনের ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী গণতন্ত্রের অগ্নিমশাল অং সান সুকিও এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো উদ্যোগ গ্রহণ তো দূরের কথা পজিটিভ কোনো মন্তব্যও করেননি তিনি। অথচ অর্ধশতকের সামরিক শাসনের পর এ গণতন্ত্রের শুভযাত্রায় সবাই তার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাকিয়ে ছিল। রোহিঙ্গারাও আশা করেছিল যে, অং সান সুকির দল এনএলডি ক্ষমতায় গেলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান সহজ হবে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের প্রতি এ ধরনের আস্থা এখন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালের নির্বাচনে রোহিঙ্গারা একবুক আশা নিয়ে অং সান সুকিকে একচেটিয়া ভোট প্রদান করেছিলো। তার প্রতিদানে ১৯৯১ সালে দেশ থেকে বিতাড়িতও হতে হয়েছিল। বর্তমানে ২০১৪ সাল থেকে তাদেরকে রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয় বাদ দিয়ে এদেরকে সরাসরি বাঙালি হিসেবে পরিচিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শুরু হলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে ইতিবাচক পদক্ষেপ আসবে বলে রোহিঙ্গারা আশা করলেও মিয়ানমারের সাম্প্রতিক আচরণে সে আশায় গুড়েবালি পড়েছে। পার্লামেন্টের এ আচরণ শুধু রোহিঙ্গাদেরই হতাশ করেনি বরং গোটা বিশ্বকেই হতবাক করেছে।
গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে যে ফলাফল উচ্চারিত হয়েছে তা থেকেই এ ধরনের পরিস্থিতির আঁচ করা যাচ্ছিল। তাদের মতামতে বিশ্বমিডিয়াও হতভম্ব হয়ে পড়েছে। গত ২১ মে মিয়ানমারের গণমাধ্যমে প্রচারিত হয় যে, মিয়ানমারের পার্লামেন্টে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নাগরিকত্বদানের একটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। উক্ত প্রস্তাবে রাখাইন রাজ্যের অনিবন্ধিত মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের নাগরিকত্বের যোগ্য ঘোষণা করার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু পার্লামেন্টের নিম্ন কক্ষে এমপিদের ভোটাভুটিতে ১৫৪-২২৮ ভোটে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নাকচ হয়ে যায়। এ থেকে আরাকানি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসী ও স্থানীয় মগ অধিবাসীরা আরো বেশি সুযোগসন্ধানী হয়ে ওঠে। নানা অজুহাতে তারা রোহিঙ্গাদের ওপর চড়াও হয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করার প্রয়াস চালায়। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কাছে সাহায্য পাওয়া তো দূরের কথা তারা আরো উসকানিমূলক আচরণে মগদের উদ্বুদ্ধ করে থাকে। ফলে নির্যাতিত রোহিঙ্গারা কখনো কখনো ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে তাদের ষড়যন্ত্রের জালে পা দিয়ে ফেলে। এবারের ঘটনাগুলো ঠিক তারই ফলশ্রুতি বলে কেউ কেউ মনে করেন। কিন্তু এ ধারণারও কোনো ভিত্তি নেই।

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ
মিয়ানমারের সামরিক সরকার বরাবরই রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসী বলে অভিহিত করে আসছে। গত জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সময় জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন নির্বাচনের আগেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত ২০১৫ সালের ২৪ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘের প্রধান কার্যালয়ে মিয়ানমারসহ এর বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সমন্বয়ে গঠিত পার্টনারশিপ গ্রুপ অন মিয়ানমারের সভায় তিনি এ আহ্বান জানান। সভায় বান কি মুন বলেন, মিয়ানমারে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে আলাদা রেখে দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়ন সম্ভব নয়। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জাতিগত ও ধর্মীয় বিভাজন অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু নির্বাচন অসম্ভব। দেশকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এ আহ্বানের প্রতি কর্ণপাতই করেনি।
ইতঃপূর্বে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও মিয়ানমার সফরে এসে রোহিঙ্গাদের মানবেতর জীবনের অবসান ঘটাতে তাদের নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে গিয়েছিলেন। বিশ্বগণতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত এ দেশের প্রেসিডেন্ট যখন কোন দেশ সফর করতে যান সেখানকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষ নানা রকম আশা-আকাক্সক্ষা পোষণ করে থাকেন। শাসকগোষ্ঠীও তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা গ্রহণে পিছপা থাকেন না। তাই উভয়পক্ষের মধ্যকার প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্রপক্ষই এগিয়ে থাকে সুবিধা আদায়ের ক্ষেত্রে। তবুও বিশ্বনেতৃত্ব প্রদানকারী একজন সচেতন প্রেসিডেন্টের কাছে সুবিধাবঞ্চিত নাগরিকরা তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ে খানিকটা আশবাদী হতেই পারেন। মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে চলমান সহিংসতা ও জাতিগত দাঙ্গা নিরসনে ওবামা সরকার কাজ করে যাচ্ছে উল্লেখ করে তিনি আশ্রয়প্রার্থী রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ফিরিয়ে না দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও আহ্বান জানিয়েছিলেন। মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি মারিয়া ওটেরোর নেতৃত্বাধীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা, মার্কিন সরকারের অভিবাসন, মানবাধিকার ও শরণার্থীবিষয়ক উপসহকারী সেক্রেটারি কেলি কেমেন্টস, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা পিটার ফ্রিকে এবং দূতাবাসের মিডিয়া কর্মকর্তা মহসীন সাঈদের সমন্বয়ে গঠিত এ পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের বক্তব্যে সংশ্লিষ্ট সকলেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে ব্যাপক আশাবাদী হয়েছিলেন।
সেইসাথে ইতঃপূর্বে ঢাকা সফরে এসে ওআইসি মহাসচিব ইয়াদ আমিন মাদানি বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দের সাথে আলাপকালে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানসহ রাখাইন স্টেটে তাদের ফিরে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) খানিকটা শক্ত অবস্থান গ্রহণ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে গেছেন। তিনি বলেছেন, নাগরিকত্বই রোহিঙ্গাদের মূল সমস্যা। মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেলে তাদের অন্যান্য অধিকারগুলো প্রতিষ্ঠা অনেকাংশেই সহজ হবে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে ইউরোপ ও আমেরিকাও মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে। এটাও ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়েছিল। ২০১২ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার নাভি পিল্লাইও ইন্দোনেশিয়ায় ডেমোক্র্যাসি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মিয়ানমার সরকারের প্রতি একই আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের শেষ প্রহরেও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ মিয়ানমারের প্রতি রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘুদের পূর্ণ নাগরিকত্ব এবং বিভিন্ন সেবা পাওয়ার সমান সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিল। ১৯৩ সদস্যের ঐ পরিষদের ঐকমত্যের ভিত্তিতেই এ প্রস্তাব পাস হয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বিষয়টি কোনভাবেই আমলে নেয়নি।
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শান্তিকামী নেত্রী অং সান সুকির কাছে রোহিঙ্গাদের অনেক বড় প্রত্যাশা থাকলেও তাঁর আচরণ সবাইকে হতাশ করেছে ইতঃপূর্বেও। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার প্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ২৬ মে অসলোর নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটে তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। রোহিঙ্গা ইস্যুতে নীরব ভূমিকা পালন করার কারণে অং সান সুকিকে এ সম্মেলনে আমন্ত্রণও জানানো হয়নি। সম্মেলনে আগত ইতঃপূর্বে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতা ডেসমন্ড টুটু, উত্তর আয়ারল্যান্ডের মেইরিড মেগুইর, যুক্তরাষ্ট্রের জোডি উইলিয়ামস, ইয়েমেনের তাওয়াক্কুল কারমাল, ইরানের শিরিন এবাদি, লাইবেরিয়ার বোউই এবং আর্জেন্টিনার এডোলফো পেরেজ এসকুইভেলসহ প্রত্যেক বক্তাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ইতিবাচক ভূমিকার দাবি করেছেন।

ভাগ্যাহত রোহিঙ্গাদের
ঐতিহাসিক ব্যর্থতা
রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বৈধ নাগরিক। এটা মিয়ানমার স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করলেও ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত এবং সারাবিশ্বে সর্বজন স্বীকৃত বিষয়। আরাকানের হাজার বছরেরও আগে থেকে মুসলমানদের বসবাস। মূলত আরব বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, গৌড়ীয় মুসলিম সৈন্য, ব্যবসায়ী-চাকুরে ও বাংলায় অপহৃত দাসগণসহ আরাকানের অধিকাংশ মুসলমানই রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। রোহিঙ্গারাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী আরব মুসলমান। বাংলায় ইসলামের আগমনের সময়কাল থেকেই আরাকানে ইসলামের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। চট্টগ্রাম অঞ্চল দীর্ঘকালব্যাপী আরাকানের অংশ হিসেবে শাসিত হবার কারণে চট্টগ্রাম থেকেই আরাকানের বিভিন্ন স্থানে ইসলামের সুমহান বাণী সম্প্রসারিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে মিঙসুয়ামুঙ বা নরমিখলা ওরফে মুহাম্মদ সোলায়মান শাহ কর্তৃক আরাকান পুনরুদ্ধারের পর থেকে আরাকানে মুসলমানদের সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। এমনকি আরাকানের রাজধানী লংগ্রেত থেকে ম্রোহংয়ে স্থানান্তর করা হলে সেখানকার প্রায় সকল অধিবাসীই মুসলিম ছিলেন এবং ম্রোহংয়ের অধিবাসীদেরকেই রোহিঙ্গা নামে আখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। বর্তমানে রোহিঙ্গা বলতে আরাকানের মুসলমানদেরকেই ধরে নেয়া হয়। কেননা রোহিঙ্গারাই ছিলেন আরাকানের প্রধান মুসলিম জনগোষ্ঠী। ম্রোহংয়ের অধিবাসী হওয়ার কারণে আরাকানের মুসলমানগণকে রোহিঙ্গা বলা হয়ে থাকে। রোহিঙ্গা শব্দটি আধুনিককালের মনে হলেও রোহিঙ্গাদের ইতিহাস হাজার বছরের চেয়েও পুরনো। এরা পরিচয়হীনভাবে বেড়ে ওঠা কোনো জনগোষ্ঠী নয়। মূলত রোহিঙ্গারাই আরাকানের স্থায়ী ও আদি মুসলমান।
নানা অজুহাতে তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়ে দেয়া হয়। বাহ্যিকভাবে রাষ্ট্রীয় শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার নামে ইতঃপূর্বেও অসংখ্য অপারেশন পরিচালনা করেছে মিয়ানমার প্রশাসন। পরিচালিত অপারেশনসমূহ রাষ্ট্রীয় শান্তি ও নিরাপত্তার নামে পরিচালনা করলেও এগুলো মূলত রোহিঙ্গা উৎখাতেরই নীলনক্শা। এ সকল অপারেশনের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল বিটিএফ, শিউ কাই, কাই গান, মেজর অং থান, সেব এবং ড্রাগন অপারেশন। এ অপারেশনসমূহ পরিচালনা করে সরকারি পরিকল্পনার ভিত্তিতে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় এবং লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে দেশ থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
গত দুই হাজার বারো সাল থেকে জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের নামে আবারো মানবতা ধ্বংসের চরম খেলা শুরু হয় আরাকানে। সেই থেকে প্রায়শই স্থানীয় মগজনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য সহায়তায় আরাকানের মংডু এবং আকিয়াব এলাকায় চলছে নির্বিচারে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ এবং লুটতরাজ। রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বিরানভূমিতে পরিণত করছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা যুবতী নারীদের অপহরণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। খাল, বিল এবং জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে প্রায়শই মহিলাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে। মুসলমানদেরকে হত্যা করে তাদের দাড়ি গোঁফ মুড়িয়ে গেরুয়া পোশাক পরিয়ে বৌদ্ধলাশ সাজিয়ে মিডিয়ার সামনে মুসলমানদেরকেই দাঙ্গা সৃষ্টিকারী এবং ঘাতক হিসেবে উপস্থাপন করা হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে। মানবিক বিপর্যয়ের এক জ্বলন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতভিটে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী, শিশু, ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটে খাওয়া অশিক্ষিত অর্ধশিক্ষিতসহ সমগ্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। সর্বস্ব হারিয়ে নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করে থাকে পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশ তাদেরকে আশ্রয় দিতে সক্ষম কিনা কিংবা আশ্রয় দিলেই এ সমস্যার সমাধান হবে কি না এসব বিতর্কের কারণে বাংলাদেশ সরকারও ভীষণভাবে কঠোরতা অবলম্বন করে তাদেরকে আশ্রয়ের কোনো সুযোগ দেয় না। এমনকি যারা ইতঃপূর্বে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, নদীর অথৈ জলে অসহায় মানুষদের খাবার পানীয় সরবরাহ করছিল তাদের দিকে জাতিগত দাঙ্গার মদদদাতার অভিযোগ তুলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ইতিহাসও রয়েছে। এ ধরনের আচরণ বিবেকবান মানুষকে হতবাক করেছে বৈকি। নির্যাতিত নিষ্পেষিত অসহায় রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু করা তো দূরের কথা বরং যারা কিছু করার চেষ্টা করছেন তাদের দিকেও অযাচিত ও অনাকাক্সিক্ষত সন্দেহের আঙুল উচ্চকিত করা হয়ে থাকে। ফলে আহত ও নির্যাতিত অসহায় মানুষগুলোকে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে নিজ বসতভিটে কিংবা নদী ও সাগর জলেই মৃত্যুমুখে গমন করতে হচ্ছে।
বিশ্বায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও মানবিক উৎকর্ষতার এ উন্নত যুগে সকলের চোখের সামনে এমন মানবিক বিপর্যয় ঘটে যাচ্ছে নির্বিঘœভাবে। কেউ যেন নেই দেখবার, সাহায্যের হাত বাড়াবার কিংবা ন্যূনতম সহানুভূতি প্রকাশ করবার। চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত আরাকান রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী। অথচ রোহিঙ্গারাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী মূল ধারার সুন্নি আরব মুসলমান। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তারা আরাকানেরই মূল জনগোষ্ঠী, জন্মগতভাবেই আরাকানের নাগরিক, তাদের হাতেই পরিপুষ্টি অর্জন করেছে আরাকানের ইতিহাস ঐতিহ্য। রোহিঙ্গাদের কেউ হাজার বছর, কেউ পাঁচ শতাধিক বছর আর কেউবা কয়েকশত বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে। শুধুমাত্র মুসলিম হওয়ার অপরাধেই তাদের ওপর চলছে এ অমানবিক নির্যাতন। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করার মধ্য দিয়ে আরাকান অঞ্চল থেকে মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলতে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে নিজ দেশে নাগরিকত্বহীন অবস্থায় পরবাসী হয়ে জীবনযাপন করছে। মূলত বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিশেষত ব্রিটিশ বিদায়ের শেষপর্বে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের বিষয়ে অমীমাংসিত ও প্রশ্নবোধক অধ্যায়ের সূচনা হয়; যার ফলে অদ্যাবধি রোহিঙ্গাদেরকে আরাকানের অভিবাসী আশ্রিত মানুষ হিসেবে জীবন যাপন করতে হচ্ছে এবং বারবার তাদেরকে স্বদেশভূমির ভিটেমাটি ত্যাগ করে বাংলাদেশে শরণার্থীর জীবন বেছে নিতে হয়েছে।

রোহিঙ্গা সঙ্কটের সম্যক বিশ্লেষণ
আরাকান এককালে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অধুনাকালে মিয়ানমারের একটি প্রদেশ। অনুরূপভাবে রোহিঙ্গারাও এক সময় স্বাধীন আরাকানের অমাত্যসভা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখলেও বর্তমানে তারা আরাকানের সবচেয়ে নিগৃহীত জাতিগোষ্ঠী। ১৭৮৪ সালে বর্মিরাজ বোধাপায়া কর্তৃক আরাকান দখলের মধ্য দিয়েই মূলত রোহিঙ্গাদের নিগৃহীত জীবনের সূচনা হয়। অতঃপর ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তিলগ্নে ব্রিটিশ কূটকৌশলের ফলে তাদের জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো অনিশ্চয়তা নেমে আসে। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মায় ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা নে উইন কর্তৃক ক্ষমতা দখলের পর হতে রোহিঙ্গারা ক্রমশ নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে থাকে। অবশেষে ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের নামে তাদেরকে বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে কল্লা বা বিদেশী আখ্যা দিয়ে দেশ থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে আরাকানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জীবনে এ দুর্ভোগের পেছনে নিম্নোক্ত কারণ উল্লেখ করা যায়-
প্রথমত, রোহিঙ্গারা দীর্ঘ হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় আরাকানের অমাত্যসভাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন থাকলেও তারা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র কোনো ধারা সৃষ্টি করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে বর্মিরাজ বোধাপায়া কর্তৃক ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে আরাকান দখলের পর আরাকানের সর্বময় ক্ষমতা বর্মিদের হাতে চলে যায়। তারা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাসহ আরাকানি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে হত্যা করে। অবশিষ্টদের অনেকেই প্রাণ ভয়ে বাংলায় পালিয়ে আসে এবং ১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধের মাধ্যমে আরাকান দখল পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে দেশের বাইরে অবস্থান করে। এ সময়ে সিন পিয়ানসহ অনেক আরাকানি নেতা স্বদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করলেও বিভিন্ন কারণে তারা ব্যর্থ হয়। ফলে বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা নেতৃত্বের দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ১৮২৬ সালে আরাকানে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তারা রোহিঙ্গাদেরকে বাহ্যিক কিছু সুযোগ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষমতার ভিত্তি মজবুত করে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনেই আরাকানের প্রশাসনের বিভিন্ন ক্ষেত্র ছাড়াও কৃষি, ব্যবসা প্রভৃতি কাজের জন্য বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানিদেরকে স্বদেশে বসবাসের সুযোগ প্রদান করে। এ সময় রোহিঙ্গাদের নেতৃস্থানীয় শিক্ষিত শ্রেণীর অনেকেই আরাকানে ফিরে না গিয়ে বাংলার কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত শ্রেণীসহ কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে গেলেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি। পক্ষান্তরে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানরা ব্রিটিশের কর্তৃত্বকে সহজে মেনে না নেয়ার কারণে বরাবরই তারা মুসলমানদেরকে শত্রু মনে করতো। ফলে বার্মায় পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রোহিঙ্গারা যাতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে সে জন্য তাদেরকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত না করে স্থানীয় মগদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এমনকি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বার্মাকে স্বাধীনতা প্রদানের পূর্বে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মগদের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা-উত্তর মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন বর্মি ও স্থানীয় মগরা সে ইস্যুকে ক্রমশ শক্তিশালী করে তোলে; যার সর্বশেষ পরিণতি হিসেবে রোহিঙ্গারা কল্লা বা ভিনদেশী চিহ্নিত হয়ে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়। ব্রিটিশ শাসিত বার্মাকে মুক্ত করার আন্দোলনে রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানকে সমর্থন দিয়ে বার্মাকে ব্রিটিশ শাসন মুক্ত করলেও তারা তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মার শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অজুহাতে তাদেরকে মিয়ানমার বা আরাকানের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করে শুধুমাত্র আরাকানের বাসিন্দা হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গারা আরাকানের স্বাধিকার আন্দোলন শুরু করলে রাজনৈতিক কৌশলে তাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। অতঃপর তাদের ওপর চালানো হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় তিন লক্ষ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বালাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের চাপ ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় বিষয়টির বাহ্যিক সমাধান নিশ্চিত হয়। তাই মিয়ানমার সাংবিধানিকভাবে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখার নিমিত্তে ১৯৮২ সালে বিতর্কিত বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনে নাগরিকদের সিটিজেন, অ্যাসোসিয়েট এবং ন্যাচারালাইজ শ্রেণীতে ভাগ করে ১৮২৩ সালের পরে আগত বলে অ্যাসোসিয়েট কিংবা ১৯৮২ সালে নতুনভাবে দরখাস্ত করে ন্যাচারালাইজড অধিবাসী ঘোষণা করার ব্যবস্থা করে। উক্ত আইনের ৪ নং প্রভিশনে আরো শর্ত দেয়া হয়, কোন জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কিনা তা নির্ধারণ করবে আইন-আদালত নয়; সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘কাউন্সিল অব স্টেট’। এ আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রোহিঙ্গাদের কাছে কালো আইন হিসেবে বিবেচিত এ আইন তাদের সহায়-সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সাভির্সে যোগদান, নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা সভা-সমিতির অধিকারসহ সার্বিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়।
চতুর্থত, ১৯৭৮ এবং ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদেরকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন অপারেশনের নামে আরাকানে এক অমানবিক নির্যাতন চালায়। তবে তাদের এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এ অপারেশনে তারা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং দুই পর্বে প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে তাদের পৈতৃক বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রতিবেশী বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ত্রাণ কার্যক্রমসহ আশ্রয়ণ ক্যাম্প তৈরি করে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতায় বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তথাপিও রোগ-শোক, অনাহার-অর্ধাহারে নাফ নদী পেরিয়ে আসা অসংখ্য লোক প্রাণ হারায়; যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও কৌশল অবলম্বন করে দ্বিপক্ষীয় ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান করেন।
যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার প্রেক্ষাপটে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকেও উদ্যোগ নিতে হবে। আরাকানি মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের সহস্র বছরের বন্ধন ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে; মানবতার জন্য বাংলাদেশেরই এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের নিকট গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে; এক্ষেত্রে বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করে ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো মিলে জাতিসংঘের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। সেই সাথে মিয়ানমার সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টাও করা উচিত। মূলত আরাকানে মুসলিম জাতিসত্তা বিনাশ করে এককভাবে মগ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়েই রোহিঙ্গাদেরকে বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে দেশের বিভন্ন স্থান থেকে মগদের এনে প্রত্যাবাসন করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে স্বাধীন আবাসভূমি ছাড়া রোহিঙ্গাদের মুক্তির বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু স্বাধিকার আন্দোলনের নিমিত্তে কিছু কিছু সংগঠন কাজ করলেও মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গানীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার মত সাংগঠনিক ও বৈপ্লবিক শক্তি কোনটিই তাদের নেই। এ প্রেক্ষিতে অসহনীয় নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহকে মানবাধিকারের মমত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে এসে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারেরই নাগরিক এ বিষয়ে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জাঁতাকলে তারা সকল মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে মৃত মানুষের মতোই বেঁচে আছে। তাইতো প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিয়ানমারে এসে মুসলমান ও বৌদ্ধদের মধ্যকার জাতিগত সহিংসতা বন্ধ করে রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নিয়ে একযোগে কাজ করে যাবার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক আহ্বানেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মিয়ানমারের স্বাস্থ্য-শিক্ষাসহ সকল চাকরির ক্ষেত্রে সমান সুযোগ লাভের অধিকার রোহিঙ্গাদের আছে। মিয়ানমার পার্লামেন্টের সাম্প্রতিক ভোটাভুটির ইস্যুকে কেন্দ্র করে আরাকান ন্যাশনাল পার্টির নেতা কাইন স’ ওয়াই সম্প্রতি ২১ মে আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছেন যে, পার্লামেন্ট ও সরকারের উচিত বিষয়টিকে একটি জাতীয় ইস্যু হিসেবে দেখা। রাখাইন রাজ্যের অনেকের মুসলমানের স্বীকৃত পরিচয় কিংবা নাগরিকত্ব নেই। তিনি আরো বলেন, কে স্বীকৃত নাগরিক আর কে অবৈধ অভিবাসী তা জানা না থাকলে সরকার কিভাবে জাতীয় নিরাপত্তা বিধান ও আইনের শাসন কায়েম করবে? তাই মিয়ানমারের প্রচলিত নাগরিকত্ব আইনে নয় বরং এ কালো আইনকে সংশোধনপূর্বক রোহিঙ্গাদেরকে পূর্ণাঙ্গরূপে নাগরিক অধিকার দিয়ে এ সমস্যা সমাধান করা জরুরি। দীর্ঘদিন সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মিয়ানমারের মানুষ সম্প্রতি গণতান্ত্রিক সুবাতাসের দেখা পেয়েছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের লৌহমানবী হিসেবে অং সান সুকি যে ধরনের ত্যাগ স্বীকারের নজির পেশ করেছেন তাও ইতিহাসের একটি অনন্য অধ্যায় বলে বিবেচিত। আমরা আশা করি কোনো আবেগ কিংবা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থের দিকে না তাকিয়ে, কোনো ধর্মীয় চশমায় না দেখে সত্যিকার বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের আলোকে মানবিক দিক বিবেচনা করে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন মিয়ানমার সরকার। ইতঃপূর্বের সকল ব্যর্থতা ও হতাশার ইতিহাস মোচন করে তাঁর সরকার মানবিক মূল্যবোধের যথার্থ মূল্যায়ন করে এ হতভাগা মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি ইনসাফপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।

লেখক : প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE