মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাতি গঠনের, জাতীয় শক্তিক্ষয়ের নয়

প্রফেসর এমাজউদ্দিন আহমদ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৬ ডিসেম্বর উজ্জ্বলতম দিন। দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জয়যাত্রা শুরু হয়। তাই একটি আনন্দের দিন। জাতীয় পর্যায়ে উৎসবের দিন। জাতীয় জীবনের আকাশে চারদিক ঘিরে শ্রাবণের ঘনকালো মেঘ যে হিংস্র আস্ফালনে এতদিন নৃত্য করছিল তার অবসান ঘটে এই দিনে। এ দিনে সূর্যের নির্মল আলোর বন্যায় চারদিক ঝলমলিয়ে ওঠে। তাই এ দিন আমাদের বিজয় দিবসও। এ বিজয় যেমন শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়, তেমনি সকল প্রকার সঙ্কীর্ণতার বিরুদ্ধেও বিজয়। পরনির্ভরশীলতা ও মানবিক বৈকল্যের বিরুদ্ধে ও বিজয়। সবার ওপরে এ বিজয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সর্বগ্রাসী বিজয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে কোনো বিভ্রান্তির সুযোগ নেই, থাকার কথাও নয়। তথাপি কোনো কোনো মহল হীন স্বার্থবুদ্ধির প্রভাবে, শুধুমাত্র সঙ্গীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে সর্বজনগ্রাহ্য এ প্রত্যয়কে বিকৃত করতে উঠে পড়ে লেগেছ। গণ-অধিকারের ভিত্তিতে রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, বঞ্চিত জনগণের উন্নত জীবনের অঙ্গীকার, জাতি ধর্মবর্ণ সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকলের সমান অধিকারের নিশ্চয়তা এবং গণ-অধিকারের ভিত্তিতে সীমিত সরকার গঠন এ সবই হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। অন্য কথায়, দীর্ঘ ২৩ বছরের পাকিস্তান আমলে জনজীবন যে ত্রিবিধ নিষ্পেষণে প্রতিনিয়ত পীড়িত হয়েছে তা থেকে মুক্তি। অর্থাৎ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্বের অধিকার সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য থেকে মুক্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। তাছাড়া যুদ্ধকালীন তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে অর্জিত অনুভূতি ও চেতনার অংশ। ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগতভাবে মাথা উঁচু করে অবস্থান গ্রহণ, কারো কাছে অবনতমস্তক না হওয়া, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে, বিশেষ করে জাতীয় স্বার্থে, কারো ওপর নির্ভরশীল না হওয়া এর অন্তর্ভুক্ত। জাতীয় নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সম্পদের পূর্ণ সদ্ব্যবহার এবং তার মাধ্যমে জনগণের দারিদ্র্য, ব্যাধি ও অপুষ্টি থেকে মুক্তি, সমাজজীবনে সকল প্রকার বৈষম্য ও বঞ্চনা থেকে অব্যাহতি, বিশেষ করে জাতীয় অর্থনীতিকে জাতীয় কল্যাণে নিয়োগের লক্ষ্যে সকল প্রকার নিয়ন্ত্রণমুক্ত রেখে প্রতিযোগিতামূলক এক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অন্যতম উপাদান
এর দীর্ঘ প্রেক্ষাপটও রয়েছে। এ দেশের দীর্ঘ ইতিহাসের প্রতি বাঁকে দেশের জনগণ হয়েছে লুণ্ঠিত, প্রতারিত। ব্রিটিশ ভারতে ঔপনিবেশিক শাসকদের বৈষম্যমূলক নীতির শিকার হয়ে এ দেশের জনগণ একদিকে যেমন হয়েছে ব্রিটিশ শাসকদের হাতে নিগৃহীত, অন্য দিকে তেমনি ঔপনিবেশিক শাসকদের সৃষ্ট জমিদার এবং মহাজনী ব্যবসায়ে লিপ্ত শোষকদের দ্বারা হয়েছেন শোষিত এবং নিপীড়িত। তারই ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় বিশ শতকের তৃতীয় এবং চতুর্থ দশকে পূর্ব বাংলার সংগ্রামী জনগণের সংগ্রামী চেতনাই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকে অবশ্যম্ভাবী করে তুলে। এ সংগ্রামে পূর্ব বাংলার নিগৃহীত কৃষক শ্রমিক ও পেশাজীবীরা সম্মিলিত হয়েছিলেন মুসলিম লীগের পতাকাতলে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য, পূর্ব বাংলায়
কোনো ধর্ম রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়ে সে লক্ষ্য অর্জন সম্ভব না হওয়ায় এবং পাকিস্তানের স্বৈরতান্ত্রিক একদেশদর্শিতায় শান্ত হয়ে ছয় দফা আন্দোলনের প্রতি জনগণ আকৃষ্ট হন ভীষণভাবে। তারপরের কাহিনী সবার জানা। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি বাঁকে এক পর্যায়ে তাই দেখা যায় জনতার ইস্পাত কঠিন ঐক্য। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সকলেই এ মুক্তিযুদ্ধের অজেয় সৈনিক মত ও পথের পার্থক্য ভুলে গিয়ে, জাতিসত্তার শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ থেকে এবং শত্রু জয়ের দুর্বার আকর্ষণে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিজয় ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছেন এ জনপদের জনগণ। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে মিলিত হয়ে ১৯৭০ সালের অবাধ নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যে স্বাধীনতার সনদ ঘোষণা করেন তাতেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সুস্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছে। জনপ্রতিনিধিরা পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতার নিশ্চয়তা বিধানের জন্য বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রূপে ঘোষণা করা হয় ঐতিহাসকি সনদে। স্বতঃস্ফূর্ত এ ঘোষণায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের লক্ষ্য নির্ধারিত হয় অর্থাৎ জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা তার মধ্যেই নিহিত রযেছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।
ব্রিটিশ ইতিহাসের এক সুনির্দিষ্ট মাইলফলক গৌরবময় বিপ্লবের (১৬৮৮) যে বাণী অর্থাৎ সাম্য, স্বাধীনতা এবং অধিকার, ফরাসি বিপ্লবের মূল শ্লোগান সাম্য, স্বাধীনতা ও সৌভ্রাতৃত্ব, আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণার যে সমাহস্ত্র সাম্য, স্বাধীনতা ও সুখের অšে¦ষণ, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূল বাণী ঘোষিত হয়েছে স্বাধীনতা সনদে এবং তা হলো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা (Equality, Human dignity and Social justice)। সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার সহজ সরল রাজপথ হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। মানবিক মর্যাদা সুনিশ্চিত হয় সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে, ধর্মীয় স্বাধীনতায় এবং সর্বপ্রকার আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্ত পরিবেশে। সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা নিশ্চিত হয় দারিদ্র্য ও ক্ষুধা থেকে মুক্ত পরিবেশে, রোগ ব্যাধি ও অপুষ্টির হাত থেকে মুক্তিতে, রোগ মুক্তিতে, কর্মসংস্থানের ব্যাপকতায় এবং সকল কর্মকে সম্মানজনক হিসেবে চিহ্নিত করে সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজীয় যথেষ্ট পরিমাণ উপার্জনে।
বাংলাদেশের যে নিজস্ব সংস্কৃতি রয়েছে, নিজেদের ভাষা ও সাহিত্যে যে জীবনবোধের উন্মেষ ঘটেছে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে জনগণ তা সংরক্ষণ করেন। পাকিস্তান আমলেও জনগণ তা হাজারো প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আঁকড়ে রয়েছেন। হাজারো হাটে হরিয়ে না গিয়ে, অনুকরণীয় হীনম্মন্যতা জয় করে, আমাদের যা আছে তার সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে তাকে পূর্ণরূপে বিকশিত করার দৃঢ়সঙ্কল্প এ জনপদের জনগণের নিজস্ব সম্পদ, এক গৌরবময় ঐতিহ্য। এদিক থেকে বলা যায়। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্বের অধিকার সংরক্ষণ এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য থেকে মুক্ত হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের মূলবাণী ঘোষিত হয়েছে স্বাধীনতা সনদে এবং তা হলো সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়পরায়ণতা সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠার সহজ সরল রাজপথ হলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। মানবিক মর্যাদা সুনিশ্চিত হয় সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে ধর্মীয় স্বাধীতায় এবং সর্ব প্রকার আধিপত্যের নিগড় থেকে মুক্ত পরিবেশ বাংলাদেশের সংস্কৃতি এক দিকে পাকিস্তানিদের সংস্কৃতি থেকে যেমন ভিন্ন তেমনি ভিন্ন ভারতের উপনিষদভিত্তিক যৌগিক সংস্কৃতি থেকেও। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের। অবয়ব চিহ্নিতকরণে অনেকেই ভুল করে থাকেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষিত হতে পারে শুধুমাত্র একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মাধ্যমে, যে রাষ্ট্রে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে, যে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি কর্তৃক এবং যে রাষ্ট্র জনগণের আশা আকাক্সক্ষা ধারণ করে। মুক্তিযুদ্ধের এ চেতনা কোনো ব্যক্তি কর্র্তৃক সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি হয়নি কোনো দল কর্র্তৃক। এ চেতনা ধারণেও নেই কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর একচেটিয়া অধিকার। মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনগণের। মুক্তিযুদ্ধ ছিল সার্বজনীন। মুক্তিযুদ্ধ ছিল এদেশের মুক্তিপাগল জনতার, যারা মৃত্যুভয়কে জয় করে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সুর সার্বজনীনতার সুর। এ সুর জাতীয় চেতনার সুর। ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামী জনগণের মুক্তিকামী চেতনাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৭ এপ্রিলের স্বাধীনতা সনদে এর প্রকাশ ঘটেছে তারপরও বাংলাদেশের সংবিধান রচনায়, দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এবং দেশের সকল ধর্মের ও বর্ণের জনগণের স্বাধীন বাংলাদেশের চিৎশক্তির একাত্মতায়।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুঁজি করে কোনো কোনো মহল নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারে প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে জানা যায়। দেখা যায়, ক্ষমতাসীনরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আওয়ামী আবরণ ও আভরণে সজ্জিত করতে দৃঢ়সঙ্কল্পবদ্ধ। রাষ্ট্র সরকারের মধ্যে, এমনকি সরকার ও দলের মধ্যে পার্থক্য তা সযত্নে মুছে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চেতনাকে দলীয় চেতনায় পরিণত করতে দৃঢ়সঙ্কল্প। এ প্রচেষ্টা শুভ নয়, নয় সৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তা হলে সমাজে সৃষ্টি হবে বিভাজন। বিনষ্ট হবে জাতীয় ঐক্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রকৃত প্রস্তাবে ঐক্যের চেতনাকে, বিভক্তির নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাতি গঠনের, জাতীয় শক্তিক্ষয়ের নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সৃজনশীলতার, ঐক্য প্রতিষ্ঠার।
লেখক : সাবেক ভিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply