মুমিনদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

Jabbar-Vaiব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সফলতার পূর্বশর্ত কঠোর পরিশ্রম, সাধনা ও পরিকল্পনা। কঠোর সাধনা, পরিশ্রম, বাধা অতিক্রম ব্যতীত সফলতার চামচ হাতের নাগালে পাওয়ার প্রত্যাশা দিবালোকে স্বপ্ন দেখা বা আরব্য উপন্যাসের আলাদিনের চেরাগ লাভের আলস্য আকাক্সক্ষা বৈ আর কী হতে পারে? পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই সত্য-মিথ্যার চিরন্তন দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল যা কখনো শেষ হওয়ার নয়। হাবিল ও কাবিলের দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়েছিল। মহান আল্লাহ তা’য়ালা পৃথিবীতে মানুষকে সাময়িকভাবে প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত করেছেন। প্রতিনিধিত্ব করার জন্য অ্যাসাইনমেন্টও দিয়েছেন। কেউ কেউ বলে পৃথিবীর সৃষ্টি আকস্মিক, সৃষ্টিকর্তা বলতে কেউ নেই, মানুষ বানর থেকে সৃষ্টি, পরকাল বলতে কিছু নেই; সুতরাং খাও দাও ফুর্তি কর, ভোগ কর, কারো কাছে জবাবদিহিতার প্রশ্নই ওঠে না ইত্যাদি, ইত্যাদি। আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানবজাতিকে প্রেরণের মহান উদ্দেশ্য নিখুঁতভাবে জানানোর জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী ও রাসূলদেরকে নির্ভুল দিকনির্দেশনা বা অহি দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে মানুষের প্রকৃত সফলতা ও সমৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে, পৃথিবীকে শান্তি ও সমৃদ্ধিময় হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রত্যেক নবী-রাসূল তাদের বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করেছেন যা তাদের অনুসারী মুমিনদের জন্য ছিল প্র্যাকটিক্যাল ইসলাম। পৃথিবীতে চলছে বর্তমানে হক ও বাতিলের চিরন্তন দ্বন্দ্ব। মুমিনদের মাঝে মধ্যে হতাশা কাজ করে। হতবিহবল হয়ে ইস্পাতকঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করে সম্মুখে এগিয়ে যেতে দুর্গম ও দুরূহ মনে হয়। মুমিনদের জীবনে দুনিয়ার জীবনে সফলতা আসতেও পারে আবার নাও আসতে পারে। তবে প্রকৃত সফলতা হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা ও তাঁর নির্দেশিত পথে এগিয়ে চলা। দুনিয়ার জীবনে অনেকে পৃথিবীতে ক্ষমতার মসনদে যেনতেন করে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য চেষ্টা চালায় যা ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলাম বলে ‘আকিমুদ্দিন’ অর্থাৎ দ্বীন কায়েম কর। রাষ্ট্রীয় জীবনে ইসলামকেই জীবনব্যবস্থা হিসেবে কায়েম কর। এ প্রচেষ্টা যদি সফল হয় তাতে আল্লাহর শুকরিয়া; যে রাষ্ট্রের অধিকাংশ মানুষ ইসলামের সুমহান সৌন্দর্যের আলোর বিচ্ছুরণের সংস্পর্শ পেল। আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে না পারলেও এ প্রচেষ্টা থেকে অব্যাহতি নেয়ার জো নেই। তাতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আল্লাহ বলেছেন, জিহাদ করতে অর্থাৎ সংগ্রাম, সাধনা বা অব্যাহত প্রচেষ্টার কথাই। কোনো কোনো ঈমানদার ব্যক্তি বলে থাকেন আমি আল্লাহর জন্য ভালো কাজ করেছি, জিহাদে অংশগ্রহণ করেছি অথচ আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নহেন। কেউ যদি আল্লাহর নির্দেশ পালন করে তাহলে ব্যক্তি নিজের সফলতার জন্যই করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যে চেষ্টা সাধনা করবে, সে তার ভালোর জন্যই করবে। নিশ্চয়ই গোটা সৃষ্টি জগতে কারো কাছে আল্লাহর কোনো ঠেকা নেই। (সূরা আনকাবুত : ৬)
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর যারা আমার খাতিরে চেষ্টা সাধনা করবে তাদেরকে আমি অবশ্য অবশ্যই আমার পথ দেখাব। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ নেককার লোকদের সাথেই আছেন।” (সূরা আনকাবুত ৬৯) বুখারী শরীফে জিহাদের উদ্দেশ্যের কথা বর্ণনা করা হয়েছে। হজরত আবু মুসা (রা) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি নবী করীম (সা)-এর নিকট এসে বলল, কোনো ব্যক্তি লড়াই করে গনিমতের জন্য, আর কেউ লড়াই করে খ্যাতির জন্য, আবার কেউ লড়াই করে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যÑ এদের মধ্যে কার লড়াই আল্লাহর পথে গণ্য হবে? রাসূল (সা) বললেন, যে ব্যক্তি শুধু আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য লড়াই করে সেই আল্লাহর পথে। উপরোক্ত কুরআন ও হাদিস থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে আল্লাহর পথে জিহাদ করা নিছক নিজের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্য। তবে এর পূর্বশর্ত হলো আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার আমৃত্যু প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে।
হজরত আদম (আ) থেকে শুরু করে মুহাম্মদ (সা) পর্যন্ত সকল নবী-রাসূল ও তার অনুসারীরা দ্বীনকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলার অক্লান্ত প্রয়াস চালিয়ে ছিলেন। আল্লাহ তায়ালা তার নবী ও উম্মতদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের অবস্থার ভিত্তিতে কাউকে সাময়িক বিজয় অথবা কাউকে পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছিলেন। এ প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব চিরন্তন হিসেবে আত্মপ্রকাশ লাভ করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে আর যারা কুফরি করেছে তারা তাগুদের পথে লড়াই করে। তাই শয়তানের সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাও। জেনে রাখ, শয়তানের চাল আসলে বড়ই দুর্বল। (সূরা নিসা : ৭৬)
ঈমানদারদের পথচলা যতই কাঠিন হোক না কেন আল্লাহর পথে দায়েম-কায়েম থাকতে হবে আমৃত্যু। ঈমান আনার পর আর তার গন্তব্য পানে চলা ছাড়া অন্য কোনো পথ ও মত খোলা নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারাই সত্যিকার মুমিন, যারা আল্লাহ ও রাসূলের ওপর ঈমান এনেছে, এরপর এতে কোনো সন্দেহ করেনি এবং আল্লাহর পথে তাদের জান ও মাল দিয়ে জিহাদ করেছে। তারাই সাচ্চা লোক।” (সূরা হুজুরাত : ১৫) বার বার আল্লাহ তা’য়ালা সকল মত ও পথের মধ্যে তার গোলামি করাকেই সর্বশ্রেষ্ঠ পথ হিসেবে নির্দেশ করেছেন। তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করবে জান ও মাল দিয়ে। এটি হবে তোমাদের জন্য উত্তম পদ্ধতি যদি তোমরা বুঝতে পার।” (সূরা সাফ্ : ১১)
যারা এ পথে চলতে গিয়ে সাময়িক বিজয় পেয়ে উল্লসিত হয় অথবা বিপদের সম্মুখীন হয়ে হতবিহবল হয় তাদেরকে আল্লাহ তা’য়ালা নির্দেশ করেছেন এভাবে, “আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন তাহলে কোন শক্তি বিজয়ী হতে পারবে না। আর তিনি যদি ত্যাগ করেন, তাহলে তার পরে আর কে আছে, যে তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে? কাজেই যারা সাচ্চা মুমিন তাদেরকে আল্লাহর ওপর ভরসা করা উচিত।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬০)
মুমিন মানে বিশ্বাসী। মুমিন যে পথে দায়েম-কায়েম আছেন, যে পথে তার অবিরত পথচলা; সে ব্যাপারে সন্দেহ সংশয় থাকার কোনো অবকাশ নেই। তাঁর দ্বীনের বিজয় একান্ত আল্লাহর হাতে তবে আল্লাহ দ্বীনের বিজয় অথবা সাময়িক পরাজয়ের মাধ্যমে মুমিনদের অবস্থা দেখতে চান যে তারা সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল কি না? সফলকাম মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “মুমিনদের কাজই হচ্ছে, যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসূল (সা) তাদের মোকদ্দমার ফয়সালা করেন, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম।” (সূরা নুর : ৫১) মুমিনজীবনের লক্ষ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ তায়ালা আগেই নির্ধারণ করে দিয়েছেন, “আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জান ও মাল বেহেস্তের বদলে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে (দুশমনকে) মারে ও (নিজেরাও) নিহত হয়। তাদেরকে (বেহেস্তে দেয়ার ওয়াদা) আল্লাহর দায়িত্বে একটি মজবুত ওয়াদা যা তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে (বলা হয়েছে)। ওয়াদা পালনে আল্লাহর চেয়ে যোগ্য আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সাথে যে বেচাকেনার কারবার করেছ, সে বিষয়ে খুশি হয়ে যাও। এটাই সবচেয়ে বড় সফলতা।” (সূরা তওবা : ১১১)
ঈমান আনার পর একজন ব্যক্তি মুমিন হয়ে যান। আর যিনি মুমিন হয়ে যান তিনি নতুন করে জীবনের পরিকল্পনা গ্রহণ করার প্রয়োজন নেই, কারণ আল্লাহ তায়ালা তার পরিকল্পনা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে জান্নাত দেবেন আর জান্নাতের বিনিময়ে জান-মাল তাঁর পথে ব্যয় করতে হবে এটি জান্নাত লাভের পূর্বশর্ত। কিন্তু পৃথিবীর সাময়িক প্রাপ্তি লোভ-লালসা, ক্ষমতার আকাক্সক্ষা ঈমানের দাবি থেকে বিচ্চ্যুত করে ফেলে। শয়তান ব্যক্তির ওপর সাওয়ার হয়। এ কারণে মহান আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে পরিপূূর্ণভাবে পালনের তাগিদ দিয়েছেন। “হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ কর। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কর না, আর শয়তান হচ্ছে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।” (আল কুরআন) সম্পদ, ক্ষমতা ও দুনিয়ার হাতছানি ঈমানদারকে তার গতিপথ থেকে কখনো টলাতে পারে না। তাই আল্লাহ তায়ালা সাবধানবাণীতে বলেন, “হে মানব সম্প্রদায়! কোন জিনিস তোমাকে তোমার রবের ব্যাপারে ধোঁকায় ফেলেছে? যিনি তোমোকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা ইন ফিতর) আবার চলমান বিশ্বে পৃথিবীর সাময়িক প্রাপ্তির জন্য মানুষের অনাকাক্সিক্ষত প্রতিযোগিতার কথাও আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ করেছেন, “সময়ের কসম! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মাঝে নিমজ্জিত! তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, সৎকাজের উপদেশ দিয়েছে এবং ধৈর্য ধারণ করার জন্য নসিহত করেছে।” (সূরা আল আসর)
পৃথিবীর বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এ কথা নির্দ্বিধায় বলতে হয় ইসলাম, মুসলিম মিল্লাত আজ মহা সঙ্কটাপন্ন অবস্থায়। এ অবস্থার জন্য আমরাই দায়ী। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করার পরিবর্তে দুনিয়ার সাময়িক ক্ষমতাধরদের কাছে মুসলিম মিল্লাতের নেতৃবৃন্দ মাথানত করে ক্ষমতার সাধ আস্বাধন করছেন। তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে বেমালুম ভুলে গিয়ে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করছেন প্রতিনিয়ত। যে কারণে ইসলামের স্বীয় স্বরূপ অমুসলিমদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাই ইসলামকে অন্যান্য ধর্মের মতো একটি ধর্ম বলেই তারা ধরে নিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী ইসলামের বিরুদ্ধে যে প্রপাগান্ডা চলছে তা বিশ্বাসযোগ্যতা লাভ করছে। এতে ইসলামের চিরন্তন শাশ্বত সৌন্দর্য থেকে বিশ্বমানবতা বঞ্চিত হচ্ছে। মৌলবাদী, জঙ্গি, পশ্চাৎপদ ইত্যাদি নামে ইসলামিস্টদের ট্রিট করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের মুখোশধারীরা সম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কখনো স্বৈরতন্ত্র, কখনো গণতন্ত্র ও কখনো এক নায়কতন্ত্রকে সমর্থন দিয়ে থাকে। সব সংজ্ঞা আবিষ্কারক যেন শুধু তারাই।
(চলবে)
zabbarics@gmail.com
লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply