মুমিনের ব্যবহারিক জীবন শাশ্বত সুন্দরের অনুপম দৃষ্টান্ত -ড. মোবারক হোসাইন

মানবজীবনে সুন্দর ব্যবহারের গুরুত্ব অপরিসীম। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে সুন্দর ও উত্তম কথা বলার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘তোমরা মানুষের সঙ্গে উত্তম ও সুন্দর কথা বলো।’ (সূরা বাকারা : ৮৩) রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার আচার-ব্যবহার সুন্দর, সে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন সে আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি)
যুগে যুগে নবী-রাসূলগণ অন্ধকারে নিমজ্জিত, পথহারা, দিশেহারা মানুষদেরকে আলোর পথ দেখাতে সক্ষম হয়েছিলেন সুন্দর আচরণের মাধ্যমে। আজকের দিনে এসেও মানুষকে সত্য সুন্দর কল্যাণের পথে আনার ক্ষেত্রে উত্তম ব্যবহার একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসাবে ভূমিকা পালন করছে।

সুন্দর আচরণ কাকে বলে
সুন্দর ব্যবহার সুন্দরভাবে কথা বলা সুন্দর মনের পরিচয় বহন করে। সুন্দর আচরণ বলতে আমরা বুঝি কারও সাথে সুন্দর করে কথা বলা, দেখা হলে সালাম দেয়া, কুশলাদি জিজ্ঞেস করা, কর্কশ ভাষায় কথা না বলা, ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত না হওয়া, ধমক বা রাগের সুরে কথা না বলা, গিবত বা পরনিন্দা না করা, অপমান-অপদস্থ না করা, উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা, গম্ভীর বা কালো মুখে কথা না বলা, সর্বদা হাসিমুখে কথা বলা, অন্যের সুখে সুখী হওয়া এবং অন্যের দুঃখে দুঃখী হওয়া, বিপদে দেখা করে সহানুভূতি ও সহমর্মিতা প্রকাশ করা সুন্দর আচরণের অন্তর্ভুক্ত। প্রকৃতপক্ষে মানুষের ভালো-মন্দ পরিচয় নির্ভর করে সুন্দর আচরণের ওপর। সুন্দর আচরণের মাধ্যমে ভালো পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। কথায় আছে , “Courtesy pays a lot, but costs nothing”। সাধারণত মানুষ তার কার্যাবলি সম্পাদনের সময় যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করে তাকেই আমরা আচরণ বলে থাকি। ইংরেজি পরিভাষায় : “Do unto others as you wish to be done by”। কাজের দ্বারা মানুষের আচরণ প্রকাশ পায়। তাই বলা যায় Behavior is a way of action অর্থাৎ আচরণ হলো কার্যের একটি পন্থা বা উপায়। মানুষ মনে মনে যা চিন্তা করে এবং যেসব কাজের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয় তাকেই আচরণ বলা চলে।
সুন্দর আচরণের গুরুত্ব
ইসলামে সুন্দর আচরণের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। একজন মানুষের জীবনে সুন্দর আচরণ ও সৌজন্যবোধ শিক্ষা ও অনুসরণ করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সুন্দর আচরণ সম্পর্কে জনৈক ফ্রায়া স্টার্ক বলেন, ‘সু-আচার আচরণ অঙ্কশাস্ত্রের শূন্যের মতো, আপাতদৃষ্টিতে এর গুরুত্ব ততটা বোঝা যায় না, কিন্তু সবকিছুর সাথে এর সংমিশ্রণ বিরাট মূল্য পরিবর্ধন করে।’ মানব চরিত্রে ২টি দিক হলো ভালো ও মন্দ। এই গুণ দু’টির পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান এবং এর সাথে ব্যক্তির যোগাযোগ ও প্রভাব নির্ভর করে। যদি ব্যক্তির চরিত্রে ভালো গুণটি প্রকাশ পায় তাহলে তার অবস্থান একরকম, খারাপটি প্রকাশিত হলে অন্য রকম।

আল-কুরআনের দৃষ্টিতে সুন্দর আচরণ
পবিত্র আল-কুরআনে সুন্দর আচরণের ব্যাপারে অনেক আয়াত রয়েছে। আল্লাহর নবীও ছিলেন সুন্দর আচরণের মূর্তপ্রতীক। নিম্নে সুন্দর আচরণ সম্পের্কে কিছু আয়াত উল্লেখ করা হলো :
– আল্লাহ্ বলেন, আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। (সূরা আল-ইমরান : ১৫৯)
– আল্লাহ্ বলেন, মুমিনদের জন্য আপনি আপনার ডানা অবনমিত করুন অর্থাৎ কোমল আচরণ করুন। (সূরা হিজর : ৮৮)
– আল্লাহ্ বলেন, কেউ যখন তোমাকে সৌজন্যমূলক সম্ভাষণ জানাবে প্রতি-উত্তরে তুমি তাকে তার চাইতে সুন্দর ধরনের সম্ভাষণ জানাও, কিংবা অন্তত ততটুকুই জানাও। (সূরা নিসা ৮৬)
– আল্লাহ্ বলেন, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া কারও উপাসনা করবে না, পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম ও দরিদ্রদের সাথে সদ্ব্যবহার তথা সুন্দর আচরণ করবে এবং মানুষকে সুন্দর কথা বলবে। (সূরা বাকারা : ৮৩)
– মহান আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহ্বান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়। (সূরা নাহল : ১২৫)
– মহান আল্লাহ্ বলেন, তোমরা তোমাদের পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র, প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথিক এবং যারা তোমাদের অধিকারে এসেছে, সবার সাথে সুন্দর আচরণ কর। (সূরা নিসা : ৩৬)
– আল-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছ, পৃথিবীতে দম্ভভরে পদচারণা করো না। নিশ্চয় তুমি তো ভূপৃষ্ঠকে কখনোই বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি কখনোই পর্বত সমান হতে পারবে না। এসবের মধ্যে যেগুলো মন্দ কাজ সেগুলো তোমার পালনকর্তার কাছে অপছন্দনীয়। (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৭-৩৮)
– স্বয়ং রাসূল (সা:) ছিলেন উত্তম নৈতিক চরিত্রের সর্বোত্তম মডেল। আল্লাহ্ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘নিশ্চয়ই আপনি উত্তম নৈতিক চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’ (সূরা আল-কালাম : ৪)
– মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘রহমান-এর বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদের সাথে যখন মূর্খরা কথা বলতে থাকে, তখন তারা বলে, সালাম।’ (সূরা আল-ফুরকান : ৬৩)

হাদিসের দৃষ্টিতে সুন্দর আচরণ
পবিত্র কুরআনের পাশাপাশি হাদিসেও সবার সাথে সুন্দর আচরণ করতে এবং দয়া, সহানুভূতি ও কোমলভাবে কথা বলতে বলা হয়েছে।
– হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয়নবী (সা:) এরশাদ করেছেন, উত্তম কথা বা ভালো কথাও একটি সাদকা। (বুখারি ও মুসলিম)
– হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, প্রিয়নবী (সা:) এরশাদ করেছেন, মুমিন ব্যক্তি কখনও অভিশাপকারী, তিরস্কারকারী হতে পারে না। অশ্লীল বাক্যব্যয়ী ও অহেতুক বাক্যব্যয়ীও হয় না। (তিরমিজি)
– প্রিয়নবী (সা:) এরশাদ করেছেন, সদকা বা দান-খয়রাত মানুষকে শোচনীয় মৃত্যু হতে রক্ষা করে আর সুন্দর আচরণ আয়ুবর্ধক হয়। সুন্দর আচরণকারীকে আল্লাহ্ ভালোবাসেন।
– রাসূল (সা:) বলেন, আল্লাহ্ কোমল ব্যবহার করেন, তাই সব ব্যাপারে তিনি কোমল আচরণ পছন্দ করেন। (বুখারি ও মুসলিম)
– যে ব্যক্তি সুন্দর আচরণ থেকে বঞ্চিত সে কল্যাণ থেকেও সম্পূর্ণ রূপে বঞ্চিত। (মুসলিম)
– রাসূল (সা:) বলেন, মুমিন হয় উত্তম চরিত্রের অধিকারী। অর্থাৎ সে বদমেজাজি, বিদ্বেষভাবাপন্ন ও মানুষের সাথে রুক্ষ আচরণকারী হয় না। এটা মুমিনের শান নয়। মুসলমান তো অন্যের সাথে নম্র আচরণ করবে, রুক্ষ আচরণ করবে না।
– রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘সুন্দর আচরণই নেক আমল।’ (সহিহ মুসলিম)
– রাসূল (সা:) আরও বলেছেন, ‘যার আচার-ব্যবহার সুন্দর, আমি তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ির নিশ্চয়তা প্রদান করছি।’ (আবু দাউদ)
– নবী করীম (সা:) এরশাদ করেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের সাথে মুচকি হাসির বিনিময় করাও সদকার সওয়াব হয়ে যায়।’ (তিরমিজি)
– তিনি এরশাদ করেন, ‘সর্বোত্তম ঈমানদার হচ্ছে ঐ লোক যার চরিত্র সর্বোত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সে লোকগুলো সর্বোত্তম যারা তাদের স্ত্রী-পরিবারের প্রতি উত্তম আচরণে অভ্যস্ত।’ (আহমদ/তিরমিজি)
– রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘নেক আমল তো হচ্ছে উত্তম চরিত্র।’ (মুসলিম)
– রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, ‘উত্তম নৈতিক চরিত্র ও আচার-ব্যবহারের ন্যায় নেকির পাল্লা ভারী করতে আর দ্বিতীয় কোনো আমল নেই। আর আল্লাহ্ অশ্রাব্য গালমন্দ ও কটুকথা বলে এমন ব্যক্তিকে খুবই ঘৃণা করেন।’ (তিরমিজি/আবু দাউদ)
– আয়িশাহ (রা) হতে বর্ণিত, নবী (সা:) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ হলেন নম্র ও দয়ার্দ্র, তিনি প্রতিটি কাজে নম্রতা ও দয়ার্দ্রতা প্রদর্শন পছন্দ করেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৬৮৯)
– আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি সরল ও ভদ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে, কিন্তু পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ধোঁকাবাজ ও নির্লজ্জ হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৯০)

উত্তম আচরণ উন্নত ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। মানবজীবনের এমন কোন দিক নেই যা নিয়ে ইসলাম আলোচনা করেনি। ইসলামের সেই আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে মানুষের সাথে ভালো কথা বলা এবং সুন্দর আচরণ করা অন্যতম একটি। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, আপন পালনকর্তার পথের প্রতি আহবান করুন জ্ঞানের কথা বুঝিয়ে ও উপদেশ শুনিয়ে উত্তমরূপে এবং তাদের সাথে বিতর্ক করুন উত্তম পন্থায়। (সূরা নাহল : ১২৫)
ইসলামের পথে যে ব্যক্তি মানুষকে আহবান করে সেই ব্যক্তি ও তার কথাই হচ্ছে সর্বোত্তম। এরশাদ হচ্ছে, যে আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে আমি একজন আজ্ঞাবহ, তার কথা অপেক্ষা ভালো কথা বা উত্তম কথা কার? (সূরা হা-মিম সিজদাহ : ৩৩) ভালো কথা, ভালো ব্যবহার, সুন্দর আচরণ যাই বলি না কেন, এগুলো হচ্ছে একটি শিল্প। সুন্দর আচরণের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তির সার্বিক পরিচয় ফুটে ওঠে, তার উন্নত ব্যক্তিত্বের প্রমাণ মেলে। সুন্দর আচরণের মাধ্যমেই একজন ব্যক্তি কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হন। যারা সবসময় মানুষের সাথে ভালো কথা বলে, সুন্দর আচরণ করে তাদেরকে সমাজের, দেশের সবাই অত্যন্ত পছন্দ করে, ভালোবাসে, সম্মান ও শ্রদ্ধা করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও তাদেরকে অত্যন্ত পছন্দ করেন। একটি ভালো কথা, সুন্দর আচরণ একটি ভালো গাছের মতো। সুন্দর আচরণকারীর সামনে- পেছনে মানুষ তার প্রশংসা করে। তার জন্য মন খুলে দোয়া করে। ফলে আল্লাহ এবং আসমান-জমিনের ফেরেশতারাও তাকে অত্যন্ত পছন্দ করেন। অপর দিকে খারাপ ব্যবহারে সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। অপ্রীতিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। সমাজের মানুষ তাকে অবহেলা, অবজ্ঞা ও ঘৃণার চোখে দেখে। আমাদের নবী ছিলেন সদা-সত্যভাষী, হিতভাষী, শুদ্ধভাষী, সুভাষী এবং মানুষের সাথে সুন্দর আচরণকারী। তাই তিনি ছিলেন সব মানুষের সেরা।

সুন্দর আচরণ চারিত্রিক সৌন্দর্যের মাপকাঠি
সামাজিক পরিমণ্ডলে সবার মাঝে বেড়ে ওঠা মানুষের সহজাত প্রকৃতি। যাদের চরিত্রে উত্তম গুণাবলির সমাবেশ ঘটে সে হয় স্মরণীয় ও বরণীয়। আর যার চরিত্র মন্দ দোষে দুষ্ট হয় সে হয় ধিকৃত ও পরিত্যাজ্য। আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (সা:) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই আমার কাছে অধিক প্রিয়, যার চরিত্র ভাল।’ (বুখারি, মিশকাত-৫০৭৪) মানবতার শ্রেষ্ঠ আসনে আসীন হওয়া সত্ত্বেও তিনি তাঁর কথা, কাজ, ইশারা-ইঙ্গিত তথা আচরণের মাধ্যমে এমন কিছু প্রকাশ করেননি যাতে তাঁর বড়ত্ব প্রকাশ পায়। বরং নম্র, ভদ্র, মার্জিত, কোমল ও মায়াবী স্বভাবের দ্বারা তিনি সবার অন্তর জয় করে নেন। তাঁর সিরাত পর্যালোচনা করলে অসংখ্য ঘটনার দ্বারা এ কথার প্রমাণ মেলে। হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু দীর্ঘ ১০ বছর পর্যন্ত নবীজীর খাদেম ছিলেন। তাঁর মুখের ভাষ্য হচ্ছে, ‘এই সুদীর্ঘ সময়ে কোনো দিন তিনি আমাকে অনুযোগের স্বরে এ কথা বলেননি যে, হে আনাস! তুমি এ কাজটি কেন করেছ বা কেন করনি?’ সবচেয়ে কাছে থেকে দেখা খাদেমের কথা থেকেই তাঁর মহান চরিত্রের কোমলতার পরিধি কিছুটা নির্ণীত হয়। পরিবার থেকে সমাজ পর্যন্ত সবই তাঁর কোমল আচরণে ছিল সন্তুষ্ট। তাঁর কোমল আচরণের কারণেই কর্কশ, বর্বর, অসভ্য, মরুবাসী আরব জাতির পাথরের মতো শক্ত হৃদয় মোমের মতো গলে গিয়েছিল।

কোমল ব্যবহার মানবচরিত্রের অপরিহার্য গুণ
কোমল স্বভাবের দ্বারা মানবজীবনের অনেক কঠিক ধাপ সহজেই পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। কোমল স্বভাবের লোকদের সবাই আপন করে নেয়। তাদের শত্রু থাকে কম। ঘোরশত্রুও তার উদারতা ও কোমলতার কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। এ জন্য মানবমনের মুকুরে স্থান করে নেয়ার প্রধান উপায় হচ্ছে কোমল আচরণ। ভদ্র, মার্জিত ও কোমল আচরণ মানবতা বিকাশের অনুপম ভূষণ। একজন মুসলমান হিসেবে প্রত্যেকের উচিত ইসলামের দাবি অনুযায়ী তার চরিত্রে কোমলতা আনয়ন করা। আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, যে ব্যক্তি আমার জন্য নিচু হবে, লোকদের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করবে, তাকে আমি উঁচু করে দেব; শ্রেষ্ঠত্ব দান করবো।

সুন্দর আচার-ব্যবহারের পুরস্কার
সুন্দর আচরণ ও সুন্দর ব্যবহার মাধ্যমে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করে পরকালে জান্নাতে যাওয়া যাবে।
– রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন মুমিনের আমলনামায় সুন্দর আচরণের চেয়ে অধিক ভারী আমল আর কিছুই হবে না। যে ব্যক্তি অশ্লীল ও কটু কথা বলে বা অশোভন আচরণ করে, তাকে মহান আল্লাহ্ তায়ালা ঘৃণা করেন। আর যার ব্যবহার সুন্দর, সে তার ব্যবহারের কারণে নফল রোজা ও তাহাজ্জুদের সাওয়াব লাভ করবে।’ (সুনানে তিরমিজি)
– রাসূল (সা:) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যার আচার-ব্যবহার সুন্দর, সে আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং কিয়ামতের দিন সে আমার সবচেয়ে কাছে থাকবে।’ (সুনানে তিরমিজি)
– রাসূল (সা:) আরও বলেছেন, ‘যদি কেউ বিনম্রতা ও নম্র আচরণ লাভ করে, তাহলে সে দুনিয়া ও আখেরাতের পাওনা সব কল্যাণই লাভ করল। আর রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং সুন্দর আচরণ বাড়িঘর ও জনপদে বরকত দেয় এবং আয়ু বৃদ্ধি করে।’ (আহমদ)

সুন্দর আচরণ অনেক বড় নেক আমল
ইসলামের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষকে আল্লাহ্র খাঁটি বান্দাহ হিসেবে গড়ে তোলা। ইবাদত-বন্দেগি একমাত্র আল্লাহ্ও জন্য নিবেদিত করা এবং তার পাশাপাশি উন্নত নৈতিক চরিত্রগঠন ও উত্তম আচার-ব্যবহার অবলম্বনে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে ঈমানের উচ্চতর পর্যায়ে উপনীত করার জন্যই আমাদের মাঝে আল্লাহ্তায়ালা তাঁর প্রিয়নবীকে প্রেরণ করেছেন। আর যে ব্যক্তি অকল্যাণ থেকে বাঁচার জন্য সচেষ্ট থাকে, সে অমঙ্গল থেকে বেঁচে যায়।’ উত্তম চরিত্র ও আচার-আচরণ অর্জনের জন্য আল্লাহ্র কাছে দোয়া করতেও নবী করীম (সা:) আমাদের শিখিয়ে গেছেন। দোয়া করতে উৎসাহিত করে যাওয়াই প্রমাণ করে চরিত্র ও আচার-ব্যবহারকে ক্রমাগতভাবে উন্নত করার সুযোগ রয়েছে। তিনি যে দোয়া করেছেন তার মর্মার্থ হচ্ছে, ‘হে আমার প্রভু! আমাকে উত্তম চরিত্রের পথে ধাবিত করুন। আপনি ছাড়া আর কেউ সেদিকে ধাবিত করার নেই। আর আমাকে অসৎ চরিত্র ও আচরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখুন। আপনি ছাড়া তা থেকে দূরে সরানোর আর কেউ নেই।’

খারাপ আচরণ ও অশ্লীল কথাবার্তা সর্বদা বর্জনীয়
ইসলামী শরিয়াতে গালিগালাজ, মন্দ ও অশ্লীল কথাবার্তা বিনিময় সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ গালিগালাজ, মন্দ কথা ও অশ্লীল কথা বলার সময় সীমা লঙ্ঘন হয়। কুরআন হাদিস বিরোধী বাক্যবিনিময় হয়। একজন অন্য জনের দোষ বর্ণনা করে, বাবা-মা তুলে খারাপ কথা বলে। এমনকি পরস্পরে মারাত্মক কলহে জড়িয়ে পড়ে। অশালীন কথাবার্তার ফলে মানুষের মনে জেদ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এ কারণে রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘কোনো মুমিনকে গালি দেয়া ফাসেকি এবং তার সঙ্গে ঝগড়া বা লড়াই করা কুফরি। (বুখারি) মন্দ ও খারাপ কথার দ্বারা মানুষের চারিত্রিক অবক্ষয় হয়। বন্ধু-বান্ধব একত্রে বসে আড্ডায়, দোকানপাটের আড্ডায়, হাসি ও ঠাট্টার ছলে অশ্লীল কথা-বার্তায় মেতে ওঠে। অথচ অশ্লীল কথাবার্তায় মানুষ মারাত্মক অন্যায় ও গোনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে। বিশ্বনবী রাসূল (সা:) শত জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও কাউকে কখনো মন্দ কথা বলেননি, অভিশাপ দেননি। হজরত আনাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা:) গালিগালাজকারী, অশালীনভাষী এবং অভিশাপকারী ছিলেন না। আমাদের কারো প্রতি নারাজ হলে তিনি কেবল এটুকু বলতেন যে, ‘তার কী হলো! তার কপাল ধূলিময় হোক।’ (বুখারি) আবু হুরাইরাহ (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন, মুমিন ব্যক্তি সরল ও ভদ্র প্রকৃতির হয়ে থাকে, কিন্তু পাপিষ্ঠ ব্যক্তি ধোঁকাবাজ ও নির্লজ্জ হয়। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৭৯০)

উত্তম ব্যবহার ও আচরণ মানুষকে সম্মানিত করে
মানুষ তার উত্তম ব্যবহার ও চরিত্র দ্বারা পরিবারসহ সমাজকে অলোকিত করে থাকে। এমন নৈতিক শক্তির কার্যকারিতা সুদূর প্রসারী। মহানবী (সা:) এর জীবন চরিত্রে সেটির বাস্তব প্রমাণ মেলে। নবীজীবন কেমন ছিল- তার পরিচয় পাওয়া যায় এই হাদিসে- হজরত আতা ইবনে ইয়াসার (রা.) বলেন, আমি আবদুল্লাহ ইবনে আমর বিন আস (রা.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে বললাম, তাওরাতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর বিশেষণসমূহ সম্পর্কে আমাকে অবগত করুন। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ, (তাই হবে) নিঃসন্দেহে তাওরাতে রাসূলুল্লাহ (সা:)-কে এমন কতিপয় বিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে- যা দ্বারা কোরআন শরিফে তিনি বিশেষিত হয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘‘হে নবী! আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে পাঠিয়েছি।’’ (সূরা আল আহজাব : ৪৫) এবং নিরক্ষরদের স্মরণস্থল, আপনি আমার বান্দা ও আমার পয়গামবাহী রাসূল, আমি আপনার নামকরণ করেছি মুতাওয়াক্কিল (আল্লাহতে নিভর্রশীল)। আপনি রুক্ষ মেজাজ ও হাটবাজারে শোরগোলকারী নন, দুর্ব্যবহারের দ্বারা দুর্ব্যবহারের জবাব দেন না, বরং মার্জনা ও ক্ষমা করে দেন।’ (আল আদাবুল মুফরাদ)
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা:) ছিলেন জ্যোতিষ্মান প্রদীপ বিশেষ। তাঁর প্রশংসা করতে গিয়ে জনৈক আরব কবি বলেন, ‘হে জ্যোতির্ময়! হে মানব শ্রেষ্ঠ! তোমার পূত চেহারার দীপ্তি থেকেই চাঁদ আলোকপ্রাপ্ত হয়েছে।’
যার হৃদয় যত পবিত্র ও কলুষমুক্ত- তিনি তত কোমল ব্যবহারের অধিকারী হন, তিনি হন সদা হাস্যোজ্জ্বল চেহারার অধিকারী। পৃথিবীতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর চেয়ে পবিত্র মন, আকর্ষণীয় আচরণের অধিকারী আর কোনো ব্যক্তির আগমন ঘটেনি এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে না। নবী করীম (সা:) সব সময় হাসিমুখে থাকতেন। সঙ্গী-সাথীদের সাথে সাক্ষাৎ হওয়ামাত্র হাসিমুখে অভ্যর্থনা করতেন, কিন্তু জীবনে কেউ কোনো দিন তাঁকে অট্টহাসি হাসতে দেখেনি। প্রবল হাসির উদ্রেক হলে কখনও কখনও বিদ্যুৎচমকের মতো একফালি দাঁতের ঔজ্জ্বল্য ফুটে বের হতো। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, জীবনে যতবার আমি রাসূলে কারিম (সা:)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছি, প্রত্যেকবারই তিনি আমাকে হাসিমুখে সম্ভাষণ করেছেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আমার কথা শুনেছেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রা.) বলেন, নবী (সা:) মৃদুহাসি ব্যতীত কখনও উচ্চহাস্য করতেন না।
চারিত্রিক সৌন্দর্য দ্বারা মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান হাসিল করা যায়। গোমড়ামুখী হওয়া কোনো তাকওয়ার পরিচয় বহন করে না। ব্যক্তিগত জীবনে দেখা যায় অনেক সৎচরিত্রের অধিকারীদের চরিত্রে কোমলতা কম থাকে, মেজাজ থাকে কিছুটা কর্কশ। মুমিনের এমন চরিত্র হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কিয়ামতের দিন এমন লোককেও আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে- যার আমলনামার মধ্যে নামাজ, রোজা, জাকাত প্রভৃতি নেক আমল থাকবে। কিন্তু বিভিন্ন ব্যক্তি তার মন্দ আচরণের জন্য আল্লাহর কাছে নালিশ করবে। তাই মিষ্টি হাসি, মধুর আচরণ ও কোমল চিত্তের অধিকারী হওয়া পরিবারপ্রধান ও সমাজসংস্কারকদের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য।

ইসলামে সৎ আচরণ ও সততার গুরুত্ব
মানুষের সৎ আচরণের মধ্যে সততা অন্যতম গুণ। সততা রক্ষা করা এবং সততা অর্জন করা একজন মোমিনের জন্য শ্রেষ্ঠতম কাজ। মানুষের সৎ স্বভাব বা সৎ আচরণ কিংবা সত্যবাদিতার মধ্যেই সততা নিহিত। পবিত্র কুরঅনে বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা সত্যনিষ্ঠ ও বাস্তবপরায়ণ লোকদের সম্পর্কে তাদের সত্যনিষ্ঠা ও বাস্তবতা তথা সততা সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। সততার গুণে মানুষ বিভূষিত হন এবং সমাজের উচ্চস্থান লাভ করেন। সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো, আমাদের হজরত রাসূলে মকবুলের (সা:) কর্মবহুল জীবনে আমরা সততার অপূর্ব মহিমা দেখতে পাই। মক্কায় অবস্থানকালে, সেই যুবক বয়সে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলে তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মক্কার সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করেন এবং সততার যে পরিচয় দেন তা আমাদের সর্বকালের জন্য অনুসরণীয়। নবুওয়ত লাভের পর যখন মক্কার কোরাইশ গোষ্ঠী রাসূলুল্লাহর পরম শত্রু হয়ে ওঠে, তখনও তারা তাদের মূল্যবান জিনিসপত্র আমানত রাখত রাসূলুল্লাহর কাছে। কারণ তারা জানত, তারা তার ওপর জুলুম-অত্যাচার করলেও তিনি তাদের আমানত কখনও নষ্ট করবেন না। মক্কাবাসীদের জুলুমে অতিষ্ঠ হয়ে যখন তিনি মক্কা ত্যাগ করতে বাধ্য হন, তখনও অন্য ধর্মাবলম্বীদের কিছু জিনিসপত্র গচ্ছিত ছিল তার কাছে। যারা এসব জিনিস আমানত রেখেছিল তাদের কাছে সেগুলো ফেরত দেয়ার জন্য তিনি মক্কায় রেখে যান হজরত আলীকে। উপযুক্ত সময়ে আমানত খেয়ানত না করে নবী করিম (সা:) এসব অর্থকরী সম্পদ ফিরিয়ে দিয়ে যে সততার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা ইসলামের ইতিহাসে বিরল। নবী করিমের (সা:) এই সততার গুণে মুগ্ধ হয়ে আরবের বিপুল বিত্তশালী মহিলা হজরত খাদিজা (রা:) তার বিরাট বাণিজ্য পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। হজরত খাদিজা (রা:) হজরত মুহাম্মদের (সা:) সুষ্ঠু বাণিজ্য পরিচালনা ও সততার পরিচয় পেয়ে তাকে স্বামী হিসেবে বরণ করে নেন।
জীবনের সর্বক্ষেত্রে আমাদের সততা রক্ষা করে চলা উচিত। বুখারি শরীফে আছে, তোমাদের মধ্যে যে স্বভাব-চরিত্র ও সততায় উত্তম, সে আমার নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয়। হাদিসে আহমদে বর্ণিত আছে; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস, লোকের সঙ্গে সৎ আচরণ তথা সততার মাধ্যমেই একজন মুসলমানের প্রকৃত পরিচয় জানা যায়। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি ভেজালমিশ্রিত দ্রব্যের কথা প্রকাশ না করে ওই দ্রব্য বিক্রয় করবে সে ব্যক্তি চিরকাল আল্লাহর গজব ভোগ করবে এবং অনন্তকাল ধরে ফেরেশতারা তার ওপর লানত বর্ষণ করবে। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সর্বক্ষেত্রে সততা রক্ষা করা উত্তম কাজের পর্যায়ভুক্ত।

উত্তম আচরণ ও ব্যবহারের উপকারিতা
সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকা এবং সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা ঈমানের অংশ। আর যারা মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে তাদেরকে সবাই পছন্দ করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সদাচরণের গুরুত্ব অপরিসীম। মহানবী (সা:) বলেছেন, ‘মহৎ গুণাবলির পূর্ণতা দেয়ার জন্যই আমাকে পাঠানো হয়েছে।’ সদাচরণের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘যার (ব্যক্তি) হাত ও মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ তাকেই প্রকৃত মুসলমান বলা হয়।’ উত্তম আচরণ ও অমায়িক ব্যবহার কেবল মানসিক প্রশান্তিই দেয় না, এর মাধ্যমে জীবনে সাফল্যও লাভ করা যায়। এর কারণে মানুষ যেমন সফলতার মুখ দেখে, তেমনি তার মাধ্যমে বেহেশত লাভ করাও সহজ হয়। তাই সবার সঙ্গে সদাচরণ করতে হবে। পিতা-মাতা, পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, পাড়া-প্রতিবেশী, গরিব-মিসকিন, অসুস্থ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, বাসার দারোয়ান ও রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে প্রত্যেকের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এক মুসলমানের সঙ্গে আরেক মুসলমানের সম্পর্ক ভ্রাতৃত্বের। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই।’ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা:) এ সম্পর্কে আরো বলেছেন, ‘যে মহান সত্তার হাতে আমার প্রাণ তার কসম, কোনো বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুমিন হতে পারে না যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে তার ভাইয়ের জন্যও তাই পছন্দ করবে।’ বস্তুত একজন মুসলমানের সঙ্গে অপর মুসলমানের সম্পর্ক এমনই হতে হবে। যে সম্পর্কের কথা হজরত রাসূলুল্লাহ (সা:) হাদিসে ইরশাদ করেছেন। সেই সঙ্গে আরো কিছু বিষয় আছে সেগুলোও ত্যাগ করতে হবে। তবেই আমাদের ব্যক্তি ও সমাজজীবন সুন্দর হবে। যেমন- মিথ্যা, কপটতা, কারো নামে মিথ্যা অপবাদ, অন্যের ছিদ্রান্বেষণ, পরশ্রীকারতা ত্যাগ, অহমিকা বর্জন, জুলুম-নির্যাতন, শত্রুতা-ঘৃণা, ক্রোধ, গিবত, বিশ্বাসঘাতকতা ও ঝগড়া-বিবাদ ইত্যাদি গুণাবলি পরিত্যাগ করতে হবে। উল্লেখিত বদগুণ থেকে নিজেদের যেমন দূরে থাকার চেষ্টা করতে হবে, তেমনি যাদের মধ্যে এসব দুর্বলতা আছে তাদেরকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে ধৈর্য, প্রজ্ঞা, ক্ষমা ও অমায়িক ব্যবহার দিয়ে। অন্যের ভুল উপেক্ষা করে তাকে ক্ষমা করে দিতে হবে। তবেই সমাজ হয়ে উঠবে সুন্দর। ইসলাম এমন শান্তিপ্রিয় ধর্ম, যেখানে কারও কোনো ক্ষতির চিন্তা মাথায় আসতেই পারে না। অথচ আজ কতই না এমন ঘটনা অহরহ ঘটছে, ভাই ভাইকে হত্যা করছে, ছেলে পিতা-মাতাকে হত্যা করছে, নিষ্পাপ শিশুদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে। অথচ আল্লাহপাকের আদেশ হচ্ছে, তোমরা সবার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করো। আমরা যদি পবিত্র কুরআনের শিক্ষা অনুযায়ী নিজেদের জীবন পরিচালনা করতাম তাহলে সমাজ ও দেশে কোনো ধরনের অন্যায় কাজ হতো না। যত ধরনের অন্যায় কাজ হচ্ছে এর মূল কারণ হলো আমরা পবিত্র কুরআনের শিক্ষা ভুলে বসেছি।
সুতরাং সুন্দর আচরণ আর ভালো কথা এমন একটি শিল্প যার কোনো ক্ষয় নেই। এখন সময় এসেছে মুসলমানদের এই শিল্পকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার। মুসলমানদের আবার বিশ্বের বুকে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে সমাসীন হতে হলে, হৃত গৌরব ফিরে পেতে হলে সবারই উচিত ধনী-গরিব, জাতি, ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে সবার সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা। আল্লাহতায়ালা আমাদের তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply