মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল – ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল - ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

সাবায়ি সম্প্রদায়

৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর হযরত উমর ইবনুল খাত্তার (রা)-এর শাহাদাত বরণের পর ১০ নভেম্বর ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দে হযরত উসমান ইবনে আফফান (রা) (জীবনকাল ৫৭৬-৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে) মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন শাহাদাত বরণ করা পর্যন্ত তিনি বারো বছর কাল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন।

সাবায়িদের উদ্ভব
উসমান (রা)-এর শাসনকালে সাবায়ি নামে একটি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। সে ছিল ইয়েমেনের সাবার অধিবাসী একজন ধুরন্দর ইহুদি। সে ইসলামের ক্ষতি সাধনের জন্য মদীনায় এসে কপটভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ইসলামী ঐক্যকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয়া।
ইসলাম গ্রহণের পর আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শহর ও অঞ্চল ঘুরে বেড়ায়। যেমন- মদিনা, কুফা, বসরা, দামেশক, ইয়েমেন, মিসর প্রভৃতি শহর ও অঞ্চল ঘুরে ঘুরে সে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের দোষত্রুটিগুলো তুলে ধরলো এবং তাদেরকে বুঝালো যে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এসব দোষত্রুটিগুলো তুলে ধরা। তার এ সাংগঠনিক অভিযানের নাম ছিল- আমর বিন মারুফ ওয়া নেহি আনিল মুনকার- ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ-মুনকার কাজ থেকে নিষেধ।
তার এ অভিযানে অনেকেই সাড়া দিয়ে তার অনুসারী হলো। তার অনুসারীরা ‘সাবায়ি’ হিসেবে পরিচিত। উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা একটি গোপন দল গঠন করে।

সাবায়িদের ষড়যন্ত্র
এখানে উল্লেখ্য যে, হযরত উসমান (রা) অত্যন্ত দক্ষতার সাথে খিলাফতের দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। রাষ্ট্রশাসনের প্রথম পর্যায়ে তাঁর বিরুদ্ধে তেমন অভিযোগ শোনা যায়নি। মুফতি সাইয়েদ মুহাম্মদ আমিমুল ইহসান লিখেছেন, হযরত উসমান (রা) এর খিলাফতকালের ছয় বছর পর্যন্ত সরকারব্যবস্থা যথার্থ ছিল। উমাইয়া শাসকদের কারণে বিভিন্ন প্রদেশে অভিযোগ সৃষ্টি হতে থাকে। অভিযোগসমূহ খলিফার দরবারে পৌঁছানো হতো। হযরত উসমান (রা) তা নিরসনের চেষ্টা করতেন। কিন্তু মূল কারণ যথাস্থানেই থেকে যেতো। উমাইয়া প্রভাবের কারণে তা একেবারেই অসম্ভব ছিল। মোদ্দাকথা, সকল প্রদেশে বিশেষ করে মিসর, কুফা, বসরায় অসন্তোষ ও বিরোধিতার আগুন জ্বলে উঠলো। মিথ্যা অভিযোগ ও অহেতুক প্রচার প্রপাগান্ডার সাহায্যে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা বিদ্রোহের এই আগুনে আরো ইন্ধন জোগাতে থাকলো। অন্য কথায় সাবায়িরা প্রথমে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের দোষত্রুটিগুলো তুলে ধরে সাধারণ মানুষদেরকে তাদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলে। এ প্রচেষ্টায় তারা সফল হয়। গভর্নরদের নির্যাতনে অসংখ্য চিঠিপত্র মদিনায় আসতে থাকে।

বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ-দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা যেকোনো সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে চাইলো এবং সে জন্য আরেকটি পন্থা উদ্ভব করল যে, বনি উমাইয়া ও বনি হাশেমের মধ্যে ঘৃণা-বিদ্বেষ সৃষ্টি করে মুসলমানদের মধ্যে দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী সৃষ্টি করতে হবে।
জাহেলি যুগে কুরাইশ বংশের বনি হাশেম ও বনি উমাইয়া শাখা ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের পরস্পরের মধ্যে মতানৈক্যও বিদ্যমান ছিল। মহানবী সা. যেহেতু হাশেমী শাখার মানুষ ছিলেন। তাই নবুয়ত লাভের পর বনি উমাইয়া শাখার কতিপয় পবিত্র হৃদয় ব্যক্তি অর্থাৎ হযরত উসমান (রা) প্রমুখ ছাড়া বনি উমাইয়া অধিকাংশ লোক ইসলামবিরোধী ও ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা.-এর শত্রু থেকে যায়। কারণ ইসলামের অনুসারীদের অভ্যুদয় ও উন্নতিকে তারা বনি হাশেমের উন্নতি মনে করতো। বদর যুদ্ধের পর মক্কার মুশরিক কাফেরেরা মদিনার ওপর যত আক্রমণ পরিচালনা করেছে তার নেতৃত্ব দান করেছে হযরত মুয়াবিয়া (রা)-এর পিতা আবু সুফিয়ান।
উহুদ যুদ্ধের দিন আবু সুফিয়ানের স্ত্রী বিনতে উতবা উহুদের প্রান্তরে মহানবী সা.-এর চাচা সাইয়্যেদুস শুহাদা হযরত হামজা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রা)-এর নাক-কান কেটে অলঙ্কার বানিয়েছিল, বুক, পেট চিরে কলিজা বের করে চিবিয়ে থুথু নিক্ষেপ করেছিল। মহানবী সা. বিরোধ হ্রাসের লক্ষ্যে আবু সুফিয়ানের অন্য একটি স্ত্রী সাফিয়া বিনতে আবিল আস এর কন্যা উম্মে হাবিবা (রা) কে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করেন। শেষ পর্যন্ত ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজয়ের পর অর্থাৎ ইসলামের বিজয় যুগে বনি উমাইয়া শাখার সমস্ত লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। সে সময় থেকেই মতবিরোধ শেষ হয়ে যায় বলে মনে করা হয়। সাবেয়িরা সেই পুরনো বিরোধকে জাগিয়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করে। সাবায়ি দল বাহ্যত মহানবীর সা. এবং বনি হাশিম এর প্রতি ভালোবাসাকে তাদের দাওয়াত ও তাবলিগ এবং ঈমান আমলের মেহনতের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বানায়। কিন্তু এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করে বনি হাশেমের স্বপক্ষে বক্তৃতা এবং বনি উমাইয়াকে গালাগালি ও অভিশাপ দিতে শুরু করে।

উসমান (রা)-এর দোষত্রুটি সাধারণ মানুষের  সামনে তুলে ধরার ষড়যন্ত্র
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও তার দলের লোকেরা এ পর্যায়ে এসে আমিরুল মোমেনিন উসমান (রা)-এর দোষত্রুটি সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরতে থাকে। পর্যায়ক্রমে তারা উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে লোকদের উত্তেজিত করে তুললো। সিরিয়া ব্যতীত বাকি সকল এলাকা যেমন- কুফা, বসরা এবং মিসরে তাদের অনুসারীদের সংঘটিত করল এবং উসমান (রা) এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা করল।
তারা মদিনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলো। এ জন্য তারা হজের সময়টিকে বেছে নিলো। এর কারণ ছিল দুটি, কারণগুলো নিম্নরূপ: ১. সাধারণ মুসলমানরা মনে করবে এসব লোকেরা হজে যাচ্ছে। ২. হজের সময় মদিনায় অবস্থানকারী অধিকাংশ সাহাবী এবং তাদের সন্তানেরা মদীনা ছেড়ে মক্কায় চলে যান। তাই তারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হবে না।
মদীনায় পৌঁছার পর তারা উসমান ইবনে আফফান (রা)-এর সাথে দেখা করে ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরদের এবং তাঁর নিজের বিভিন্ন বিষয়ে অভিযোগ পেশ করলেন। উসমান (রা) তাদের অভিযোগের জবাব দিলেন। জবাবে তারা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলেন। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী মুসলিম ছদ্মবেশী ইহুদিদের এই ফিরে যাওয়া পছন্দ হয়নি। ফিরে যাওয়ার পথে তারা লক্ষ্য করল ঘোড়ায় চড়ে এক যুবক তাদের অনুসরণ করছে।
তারা তাকে ধরে তল্লাশি করল এবং তার কাছে উসমান (রা)-এর স্বাক্ষরিত এবং সিল দেয়া একটি চিঠি উদ্ধার করল।
এ চিঠি লেখা হয়েছিল মিসরের গভর্নরের কাছে। তাতে লেখা ছিল এসব বিদ্রোহীরা যখন মিসরে ফিরে আসবে তাদেরকে হত্যা করবে।
এ চিঠি উৎঘাটিত হওয়ার পর তারা ক্ষোভে ফেটে পড়ে মদীনায় ফিরে এসে আলী (রা)-এর সাথে দেখা করে বলল এই দেখুন উসমান (রা) আমাদের সাথে কি ধরনের বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। আমরা তাকে হত্যা করব।
আলী (রা) উসমান (রা)-এর সাথে এ বিষয়ে কথা বললেন। উসমান (রা) জানালেন এ চিঠির সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। এই চিঠি ছিল সবই জাল। আলী (রা) তাদেরকে বুঝালেন কিন্তু তারা মানলেন না।
অবশেষে তারা উসমান (রা) কে অবরোধ করলেন। মদীনায় অবস্থিত সাহাবী এবং তাদের সন্তানরা (ছেলেরা) প্রতিরোধ করতে চাইলেন এতে উসমান (রা) নিষেধ করলেন। উসমান (রা) চাইলেন যে তাঁর কারণে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক রক্তপাত যেন না হয়।
বিদ্রোহীরা উসমান (রা)-এর বাড়িতে খাবার ও পানি সরবরাহ বন্ধ করে দিল। উসমান (রা) আলী (রা)-এর মাধ্যমে তাদেরকে বললেন- অন্তত পানি সরবরাহ যেন বন্ধ না করে। তারা আলী (রা)-এর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস যিনি একদিন বিস্তর অর্থের বিনিময়ে ইহুদি মালিকানাধীন বীরে রুমা কূপটি খরিদ করে মদীনার মুসলমানদের জন্য ওয়াকফ করে পানির কষ্ট দূর করে দিয়েছিলেন। তার বাড়িতেই সেই কূপের পানি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল।
অবশেষে তারা উসমান (রা)-কে নির্মমভাবে হত্যা করল। তিনি সেদিন রোজা অবস্থায় ছিলেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করতে ছিলেন। লাশ দুদিন পর্যন্ত দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকে। এ সাবায়ি বিদ্রোহীরাই ছিল সে সময় দণ্ডমুণ্ডের অধিকারী। সুবাইর ইবনে মুতইম (রা) তাঁর জানাযার ইমামতি করেন। কাবুল থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিশাল রাষ্ট্রের কর্ণধারের জানাযায় মাত্র সত্তর জন লোক অংশগ্রহণ করেছিলেন। জান্নাতুল বাকীর ‘হাশশে কাওকাব’ নামক অংশে তাকে দাফন করা হয়।
উসমান (রা)-এর নির্মম শাহাদাৎ মুসলিম উম্মাহকে এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ঠেলে দেয়। এই ঘটনার পর সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি যা হয়েছিল তা হলো মুসলিম উম্মাহর বিভক্তি। সাহেবে আসবার হযরত হুযায়ফা (রা) মন্তব্য করেন, আফসোস উসমান (রা)-এর হত্যার কারণে মুসলমানদের মধ্যে এমন ফাটল সৃষ্টি হলো যা কিয়ামত পর্যন্ত আর বন্ধ হবে না।

সাবায়িদের নেতৃত্বে বিদ্রোহীদের হাতে উসমান (রা)-এর নির্মম শাহাদাতের পর পাঁচ দিন ইসলামী রাষ্ট্র খলিফাশূন্য ছিল। বিদ্রোহীদের তথা উসমান (রা)-এর হত্যাকারীদের একজন গাফেরি বিন হারব মসজিদে নববীতে ইমামতি করছিল। তারা ধরে নিয়েছে তাদের মধ্য থেকে কাউকে খলিফা নির্বাচিত করলে সাধারণ মুসলমানদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। তাই তারা কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাহাবীর কাছে গেল এবং খলিফা হওয়ার প্রস্তাব দিলো। যেমন- আলী ইবনে আবি তালিব (রা), তালহা ইবনে উবাদুল্লাহ (রা), যুবাইর ইবনে আওয়াম (রা), আবদুল্লাহ বিন ওমরা (রা)। এ পরিস্থিতিতে কেউ খলিফা হতে সম্মত হলেন না। বিদ্রোহীরা তাদেরকে হুমকি দিয়ে বলল, আপনারা কেউ যদি খলিফা হতে না চান, তাহলে আপনাদেরকেও উসমান (রা)-এর মতো হত্যা করা হবে। প্রবীণ সাহাবীগণ যেমন- যুবাইর (রা), তালহা (রা), আলী (রা)কে খলিফা হওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন।
বিদ্রোহীদের চাপে এবং বিশিষ্ট সাহাবীগণের অনুরোধে তিনি খলিফা হতে সম্মত হলেন। ৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে ১০ জুন, মদিনায় আলী (রা)-এর খিলাফতের বাইয়াত অনুষ্ঠিত হয়। উল্লেখ্য যে, তখনও মদীনা বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। আলী (রা) খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিলেন কিভাবে মদীনা বিদ্রোহীদের দখল থেকে মুক্ত করা যায়। বিদ্রোহীদের প্রধান দাবি ছিল সকল প্রদেশে উসমান (রা) কর্তৃক নিযুক্ত গভর্নরদেরকে অপসারণ করে নতুন গভর্নর নিয়োগ দিতে হবে। বিদ্রোহীদেরকে শান্ত করার জন্য তিনি তাদের এ দাবি মেনে নিলেন।
তিনি সকল প্রদেশের জন্য নতুন গভর্নরের নাম ঘোষণা করলেন এবং তাদেরকে নিজ নিজ প্রদেশে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের আদেশ দিলেন। তারা নিজ নিজ এলাকায় রওনা হলেন এবং তাদের সাথে বিদ্রোহীরাও মদীনা ত্যাগ করতে শুরু করলেন।
আলী (রা) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর প্রধানত যে সংকট দেখা দিল তা হলো- উসমান (রা) হত্যার বিচার দাবি। তালহা (রা) ও যুবাইর (রা) খেলাফতের প্রথম দিনেই আলী (রা)-এর সাথে দেখা করে উসমান (রা)-এর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করলেন। আলী (রা) তাদেরকে বললেন- বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনই বিচার করা কঠিন। কেননা এখনও মদীনা বিদ্রোহীদের দখলে। বাস্তবতাও তাই ছিল।
উসমান (রা) হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল তিনজন। ১. আল গাফেরি বিন হারব ২. সুদান বিন হামরান ৩. কিনান বিন বিশর। অথচ যখনই জিজ্ঞাসা করা হতো উসমান (রা)কে কে হত্যা করেছে? তখন বিদ্রোহীদের সবাই চিৎকার করে বলত আমরা সবাই তাকে হত্যা করেছি।
কোন হত্যাকাণ্ডে যখন বহুলোকের অংশগ্রহণ থাকে তখন এ হত্যাকাণ্ডের বিচার জটিল হয়ে যায়। আলী (রা) উসমান (রা) এর হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন করার ব্যাপারে কোন ধরনের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যথাসময়ে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু না করার কারণে ওসমান (রা)-এর পক্ষের লোকদের মধ্যে এ ধারণা সৃষ্টি হলো যে, তিনি উসমান (রা) হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। তাদের সাথে তাঁর সম্পর্ক রয়েছে। সাবায়ি সম্প্রদায় এটিকে একটি সুযোগ হিসেবে নিলো এবং তারাও এ বিষয়ে ইন্ধন দেয়া শুরু করল।

উষ্ট্রের যুদ্ধে সাবায়ি ষড়যন্ত্র
উম্মুল মুমেনিন আয়েশা (রা) হজের উদ্দেশে মক্কায় গিয়েছিলেন। তিনি মক্কা থেকেই উসমান (রা)-এর শাহাদাতের ঘটনা জেনেছিলেন। এই ঘটনায় তিনি খুবই ক্ষুব্ধ হলেন। এই হত্যার তিনি বিচার দাবি করলেন। আলী (রা)-এর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক এর বিচার শুরু না হওয়ায় তিনি আলী (রা)-এর প্রতি সন্দেহ পোষণ করলেন। তিনি যুদ্ধের ঘোষণা দিলেন। মদীনায় ফিরে না এসে তিনি বসরার উদ্দেশে রওনা হলেন। তালহা (রা) যুবায়ের (রা)সহ অনেক সাহাবীও তাঁদের সন্তানেরা হযরত আয়েশা (রা)-এর সাথে মিলিত হলেন। আলী (রা) লোক পাঠিয়ে তাদের সামনে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করলেন। কিন্তু তারা তাদের অবস্থান থেকে সরলেন না। অতঃপর আলী (রা) নিজে এসে আয়েশা (রা)-এর সাথে দেখা করে পরিস্থিতি তুলে ধরলেন। আয়েশা (রা) পরিস্থিতি বুঝলেন এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত জানালেন। উভয়পক্ষ এ ব্যাপারে সম্মত হলো যে, আগামীকাল সবাই এই স্থান ত্যাগ করে নিজ নিজ এলাকায় চলে যাবে। উভয় পক্ষে অবস্থানকারী সাবায়িদের এ বিষয়টি পছন্দ হয়নি। কারণ তাদের উদ্দেশ্য ছিল যেন যুদ্ধ হয়। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে রাতে তারা বিরোধী শিবিরে তীর ধনুক নিক্ষেপ করা শুরু করল। এই ঘটনায় এক পক্ষ অপর পক্ষকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করল। এর ফলশ্রুতিতে দুই পক্ষের যুদ্ধ শুরু হলো। এই যুদ্ধে আয়েশা (রা) উটের ওপর আসীন থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। এ জন্য এ যুদ্ধকে উষ্ট্রের যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধের পরিণতি ছিল খুবই করুণ। এই যুদ্ধে উভয় পক্ষে অনেক সাহাবী শহীদ হলেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন তালহা (রা) ও যুবায়ের (রা)। আর তাঁরা দু’জনই ছিলেন রাসূলের মুখে বেহেস্তের সুসংবাদপ্রাপ্ত।
উক্ত যুদ্ধের পরিণতি: ১) মুসলমানদের হাতে মুসলমান হত্যা। ২) মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিভক্তি। আর এ বিভক্তি মুসলিম উম্মাহকে দুর্বল করে দেয়। কুরআনে মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ এবং পারস্পরিক বিরোধ করা থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- “তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জুকে (কুরআনকে) শক্তভাবে আঁকড়িয়ে ধর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন ভাগ ভাগ হয়ে থেকো না।
আল্লাহ আরো বলেন- “তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে পড়ো না। তাহলে তোমরা ব্যর্থ হবে এবং তোমাদের শক্তি প্রতিপত্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে।”

বিভক্তির ধরন : ক) রাজনৈতিক খ) আদর্শিক
ক. রাজনৈতিকভাবে মুসলিম উম্মাহ দু’টি শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ল। একটির নেতৃত্বে ছিলেন আলী (রা) এবং অপরটির নেতৃত্বে ছিলেন মুয়াবিয়া (রা)। একটির কেন্দ্র কুফা আরেকটির কেন্দ্র দামেস্ক।
খ. মুসলিম উম্মাহ আদর্শিকভাবে তিন ভাগে বিভক্ত হলো। ১. আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ২. শিয়া ৩. খারেজি। এই তিন সম্প্রদায় থেকে পর্যায়ক্রমে আরো অনেক উপসম্প্রদায় সৃষ্টি হয়েছে। ৩. মদীনা ইসলামী রাষ্ট্রের রাজধানীর মর্যাদা চিরতরে হারিয়েছে। এর মাধ্যমে মদীনার রাজনৈতিক গুরুত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে।

রাজধানী মদীনা নিয়ে সাবায়িদের ষড়যন্ত্র
ছদ্মবেশী সাবায়িরা আলী (রা) কে বুঝাল মদীনা একটি পবিত্র স্থান। মুসলিম উম্মাহ এটিকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকে। এখন যে সংঘাত সংঘর্ষ এবং মুসলমানদের হাতে মুসলমানদের রক্তপাত হচ্ছে এর থেকে মদীনাকে মুক্ত রাখা প্রয়োজন। তদুপরি যথাসময়ে উসমান (রা) হত্যার বিচার সম্পন্ন না করার কারণে মদীনাবাসীর মধ্যে আপনার ব্যাপারে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে, তাই মদীনা আপনার জন্য নিরাপদ নয়। কুফাবাসী আপনার প্রতি অধিক আনুগত্যশীল। তাই আপনি কুফায় চলে যান। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাজধানী মদীনাকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বহীন করে দেয়া।

আলী (রা)-এর উলুহিয়াত প্রচারের ষড়যন্ত্র
খারেজি বিদ্রোহের সময় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আরো একটি ফিতনার জন্ম দেয় অর্থাৎ সে হযরত আলী. এর উলুহিয়াত বা হযরত আলী (রা)-এর খোদা হওয়ার আকিদা প্রচার করতে থাকে। আমিরুল মোমেনিন হযরত আলী (রা) এ কথা জানতে পেরে তাকে গ্রেফতার করিয়ে তওবা করাতে প্রয়াস পান। কিন্তু সে তওবা না করায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।১০ এই ইহুদি আব্দুল্লাহ বিন সাবাই ছিল ‘শিয়া’ মতবাদের মূল উদ্যোক্তা। তার নোংরা মস্তিষ্ক থেকে পরবর্তীতে এই নয়া ফিরকা তথা শিয়াদের উদ্ভব হয়। যেখানে নিজের পক্ষ থেকে ভ্রান্ত-গোমরাহি আকিদাগুলো নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়ে শিয়াদের কাছে হস্তান্তর করে। এ কারণেই যারা শিয়াদের বিরোধী তারা বলে থাকেন যে, শিয়া মতবাদ ইহুদিদের কাছ থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে।১১
রাসূল সা. মদীনায় আসার পর থেকে ইহুদিদের ইজ্জত ও সম্মান ধুলায় মিশতে থাকে। ফলে তারা মুসলমানদের সাথে নানা রকম দুশমনিতে লিপ্ত হয় এবং নানাবিধ ষড়যন্ত্র শুরু করে। তারা মুসলমানদেরকে নানা রকম ফিরকায় জড়িয়ে মুসলিম ঐক্য নষ্ট করে কিভাবে বিপদগ্রস্ত করা যায় এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

তথ্যসূত্র :
১. সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান, তারিখে ইসলাম,মুহাম্মদ মুজাম্মেল হক অনূদিত, আধুনিক প্রকাশনি, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ৭৮
২. সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান,তারিখে ইসলাম,মুহাম্মদ মুজাম্মেল হক অনূদিত, আধুনিক প্রকাশনি, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ৭৮
৩. আবু সুফিয়ানের আসল নাম ছিল সখর ইবন হারব। দেখুন আল ইসাবা-৪/৩০৫/ আবু সুফিয়ান ছিলেন একজন বড় ব্যবসায়ী।
৪. বিস্তারিত ড. মুহাম্মদ আব্দুল মাবুদ, আসহাবে রাসূলের জীবন কথা-১, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা, আগস্ট ২০০৫, পৃষ্ঠা: ১০৫
৫. উম্মু হাবীবা প্রথম স্বামী ছিলেন উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ। তিনিও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন ও হাবশায় হিজরত করেন। কিন্তু হাবশায় তিনি খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বিস্তারিত দেখুন আসহাবে রাসুলের জীবন কথা-৫, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা, ২০০৬, পৃষ্ঠা: ২৬০।
৬. ড. মুহাম্মদ আব্দুল মাবুদ, আসহাবে রাসূলের জীবন কথা-১, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ঢাকা, আগস্ট ২০০৫, পৃষ্ঠা: ৪৫
৭. সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান,তারিখে ইসলাম, মুহাম্মদ মুজাম্মেল হক অনূদিত, আধুনিক প্রকাশনি, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা: ৮৪
৮. সূরা আলে ইমরান: আয়াত ১০৩
৯. সূরা আনফাল : আয়াত ৪৬
১০. সাইয়েদ মুহাম্মদ আমীমুল ইহসান, তারিখে ইসলাম, মুহাম্মদ মুজাম্মেল হক অনূদিত, আধুনিক প্রকাশনি, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫, পৃষ্ঠা ১১৬
১১. রিজাল কাশী, আবু যাফর মুহাম্মদ বিন হাসান তুছীকৃত-১০৩ পৃষ্ঠা

SHARE

Leave a Reply