মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল – ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

মুরজিয়া সম্প্রদায়
মুরজিয়া সম্প্রদায় উমাইয়া শাসনের বিরোধী খারিজি ও শিয়া মতবাদের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ গড়ে ওঠে। সে সময়ের বিভিন্ন সহনশীল ব্যক্তির চিন্তাধারা থেকেই মুরজিয়া আন্দোলনের উৎপত্তি অন্যকথায় সহনশীলতার মূলনীতি নিয়েই এ সম্প্রদায়ের আবির্ভাব। সময়ের প্রয়োজন মুরজিয়া সম্প্রদায় আবির্ভূত হয়েছিল। খারিজি ও শিয়ারা উমাইয়া শাসনের তীব্র বিরোধিতা শুরু কবে উমাইয়া শাসকদের সমতাকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করার জন্য এ দলের সমর্থন কামনা করে। সময়ের এ ঐতিহাসিক প্রয়োজনে সহিষ্ণুতার নীতি নিয়ে মুরজিয়া সম্প্রদায়ের জন্ম হয়। এই সম্প্রদায় একদল উদারপন্থী চিন্তাবিদদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। মুরজিয়ারা সহিষ্ণুতা সহকারে উমাইয়া শাসনের যৌক্তিকতা প্রমাণে সচেষ্ট হন। খারিজি ও শিয়ারা উমাইয়াদেরকে বলপূর্বক ক্ষমতা দলখকারী বলে গণ্য করত। মুরজিয়াদের মতে, উমাইয়া বংশীয়গণ মুশরেক বা কাফের ছিলেন না, কারণ তারা আল্লাহর একত্ব এবং মহানবী সা.-এর নবুয়তে আস্থা প্রকাশ করতেন। ‘মুরজা’ বা স্থগিত রাখার মতবাদ দ্বারা তারা যুক্তি প্রদর্শন করে যে, রোজ কিয়ামতে চূড়ান্ত বিচার সাপেক্ষে উমাইয়াদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্বীকার করা মুসলিমদের কর্তব্য। তাদের মতে মানুষ পুণ্য বা পাপ করলেই আহলে জান্নাত বা আহলে জাহান্নাম হয়ে যায় না। অন্যকথায় তাকে মুমিন মনে করতে হবে। সুতরাং তার শাস্তি শেষ বিচারের দিন পর্যন্ত মুলতবি থাকবে।
মুরজিয়া পরিভাষার অর্থ
‘মুরজিয়া’ শব্দটি ইরজাউন ক্রিয়ামূল থেকে উদগত যার দু’টি অর্থ-
এক. অবকাশ দেয়া, মুলতবি রাখা, বিলম্বিত করা, পশ্চাৎবর্তী করা।১ যেমন: আল্লাহ তায়ালা বললেন তাকে এবং তার ভাইকে অবকাশ দিন আর এদিকে (ম্যাজেসিয়ানদের ডেকে আনতে) শহরগুলোতে লোক পাঠিয়ে দিন।২ এই অর্থের ভিত্তিতে তাদের মুরজিয়া নামকরণের হেতু হলে তারা আমলকে ঈমান থেকে পশ্চাৎবর্তী করে ফেলেছিল। কেউ কেউ বলেন, এর কারণ হলো তারা কবিরা গুনাহকারী জান্নাতি না জাহান্নামি এ বিষয়ের সিদ্ধান্তকে কিয়ামত পর্যন্ত বিলম্বিত করে দিয়েছে। দুনিয়াতে তারা এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রদান করেনি, কেউ কেউ বলেন, এ নামকরণের হেতু হল তারা আলী (রা)কে প্রথম স্তর থেকে নামিয়ে চতুর্থ স্তরে নিয়ে তাঁর মর্যাদাকে পশ্চাৎবর্তী করে দিয়েছে।৩
দুই. আশা প্রদান করা। দ্বিতীয় অর্থ হিসেবে তাদের মুরজিয়া নামকরণ হয়েছে এ কারণে যে, তারা বলে ঈমান থাকলে যেমন কোন গুনাহ দ্বারা ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না তদ্রুপ কুফর থাকলে কোন ইবাদত দ্বারাই কোনো লাভ হয় না। এভাবে পাপীদেরকে তারা আশা প্রদান করে থাকে।
আল্লামা শাহরাস্তানি বলেন, প্রথম অর্থের দিক থেকে বা ভিত্তিতে মুরজিয়া নামকরণই অধিক বিশুদ্ধ।

মুরজিয়া সম্প্রদায়ের আবির্ভাবের প্রেক্ষাপট
কোন অবস্থার প্রেক্ষাপটে মুরজিয়া সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছিল এ প্রসঙ্গে ইমাম আবু যুহরা মিসরি বলেন কবিরা গুনাহকারী মুমিন কি মুমিন না (?) এ প্রসঙ্গে যখন বিতর্ক চলছিল তখন খারিজি সম্প্রদায় বলেছিল, এরূপ ব্যক্তি কাফের। মুতাযিলারা বলেছিল, এরূপ ব্যক্তি মুমিন নয়, তারা মুনাফিক। কেননা, আমল হচ্ছে অন্তরের বিশ্বাসের দলিল, জবান অন্তরের দলিল নয়। জমহুরে উম্মত বলেছিল, এরূপ ব্যক্তি পাপী মুমিন। আল্লাহ চাইলে পাপ পরিমাণ তাকে শাস্তি দিবেন কিংবা চাইলে নিজ অনুগ্রহে ক্ষমা করে দিবেন। এই বিতর্কের মাঝে মুরজিয়া নামক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে এবং তারা বলে যে, ঈমান বলা হয় মুখের স্বীকৃতি এবং মনের বিশ্বাস ও পরিচিতিকে। অতএব পাপ দ্বারা ঈমানের কোনো ক্ষতি হয় না। কেননা পাপ দ্বারা স্বীকৃতি, বিশ্বাস ও পরিচিতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। আমল থেকে ঈমান পৃথক বিষয়।৪

মুরজিয়া সম্প্রদায়ের মৌলিক আকিদা বিশ্বাস ও মতাদর্শ
নাজাতের জন্য ঈমানই যথেষ্টে। ইবাদতের কোন উপকারিতা নেই, পাপেরও কোনো ক্ষতি নেই।
আরশ আল্লাহর থাকার স্থান।
মুসলমান এক ও একক; আল্লাহর একত্ব ও তাঁর রাসূল সা.-এর প্রতি বিশ্বাসী, যে যত গুনাহর কাজই করুক না কেন এবং আল্লাহর বিচারে তার যে শাস্তির বিধানই থাকুক না কেন তাকে কাফের বলা যাবে না।
আখেরাতের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য শুধু ঈমানই যথেষ্ট। ঈমান আনয়নের পর কেউ গোটা জীবন কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকালেও জাহান্নামে যাবে না।
দুনিয়ার প্রতিটি বস্তু এবং মানুষের যাবতীয় অবস্থা ও ক্রিয়াকর্ম আল্লাহর ফায়সালাও নিয়ন্ত্রণাধীন। মানুষ নিজের আমল ও ক্রিয়াকর্মে ইচ্ছাশক্তির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়।
পাপের জন্য একজন মুসলিম আর একজন মুসলিমকে ধর্মচ্যুত করতে পারে না। পাপ সম্পাদনকারী বিশ্বাসীদেরকে ধর্মচ্যুত ঘোষণা না করে তাদের সম্বন্ধে রায় মুলতবি রাখতে হবে।
যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি বিশ্বাস করে, তবে সে চিরকাল দোজখে থাকবে না।
ভীতি বা ভয়ের পরিবর্তে তারা আল্লাহর অনুরাগ, প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
উমাইয়াগণ পাপ করলে তার শাস্তি আল্লাহ দেবেন। তাই তাদের নাতি বিগত বলে নিন্দা করা যাবে না এবং কোন মুসলমানেরই তাদের শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করা উচিত নয়।
মুরজিয়া সম্প্রদায়ের সাধারণ প্রবণতা হচ্ছে সহনশীলতা এবং উগ্র ধর্মীয় উন্মাদনা থেকে মুক্ত হওয়া।

মুরজিয়ারা প্রথম চার খলিফাকে স্বীকার করে এবং খারিজদের মতো ওসমান (রা) ও আলী (রা)-এর নিন্দা করে না। তাদের মতে, ওসমান (রা) ও আলী (রা) ছিলেন আল্লাহর বান্দাহ এবং আল্লাহই তাদের বিচার করবেন।
মুরজিয়াদের মতানুসারে উমাইয়া শাসনকে স্বীকৃতি দান করা মুসলমানদের কর্তব্য এবং উমাইয়া শাসকগণ ইসলামের কোন বিধান অমান্য করলে তাদেরকে কাফের বলা উচিত নয়। তাদের গুনাহের বিচার কিয়ামত পর্যন্ত মুলতবি থাকবে।
মুরজিয়ারা গুনাহে কবিরা ও গুনাহে সগিরার পার্থক্য নির্ণয় করেছে। তারা শিরককে গুনাহে কবিরা বলে মনে করে এবং তাদের মতে কেবল তওবা ও অনুশোচনার দ্বারাই তার প্রতিকার হতে পারবে।
মুরাজিয়ারা ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা করে। বাইরের আনুষ্ঠানিক বিধিবিধান পালনের উপর তারা কম গুরুত্ব আরোপ করতো এবং আত্মিক বিকাশ ও আল্লাহর সাথে আত্মিক যোগাযোগের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের মতে কোন লোক বাইরে কাফেরের মতো আচরণ করেও অন্তরের দিক দিয়ে সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে কার্য করলে তাকে মুসলিম বলে গণ্য করা হবে। তাদের মতে ইসলাম শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অনুষ্ঠান পালনের চেয়ে এটা বরং অধিকভাবে অন্তরের ব্যাপার। কিন্তু মধ্যপন্থীদের মতে ঈমান মানুষের অন্তর ও কর্ম উভয়ের ওপরই নির্ভরশীল।

রাজনৈতিক সম্প্রদায় থেকে ধর্মতাত্ত্বিক সম্প্রদায়
মুরজিয়ারা উমাইয়া বংশের শাসনকে সমর্থন করত। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেই মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব; কিন্তু কালক্রমে এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বিলুপ্ত হয়। উমাইয়া শাসনামলে বহুলোক মুরজিয়া সম্প্রদায়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়। উমাইয়া শাসকদের সমর্থক হিসেবে মুরজিয়ারা রাজকীয় অনুগ্রহ লাভ করে এবং ইসলামে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মতাত্ত্বিক সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।
মুরজিয়াদের দল-উপদল
মৌলিকভাবে মুরজিয়া সম্প্রদায় চার দলে বিভক্ত। এগুলো হচ্ছে-
খারিজি মনোভাবাপন্ন মুরজিয়া
কাদেরিয়া মনোভাবাপন্ন মুরজিয়া (সায়লান দামেস্কি, মুহাম্মদ ইবনে শাবিব বসরী এ মনোভাবাপন্ন)
জাবরিয়া মনোভাবাপন্ন মুরজিয়া
খালেস মুরজিয়া
খালেস মুরজিয়ারা আবার ৫টি উপাদানে বিভক্ত। এগুলো হচ্ছেÑ
ইউনুসিয়া: এরা ইউনুস ইবনে আওন আন নামিরির অনুসারী।
গাসসানিয়া : এরা গাসসান কুফির অনুসারী।
সাওবানিয়া: এরা আবু সাওবানের অনুসারী।
তুমানিয়্যা: এরা আবু মুয়াজ আত তুবানির অনুসারী।
উবাইদিয়্যা: এরা উবাদ আল মুকতাইব-এর অনুসারী। এরা মনে করে আল্লাহ আদমকে নিজ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।
মুরজিয়াদের কোন কোন গবেষক দু’ভাগে ভাগ করেছেন। এগুলো হচ্ছেÑ
হকপন্থী মুরজিয়া: হকপন্থী মুরজিয়া বলতে বুঝানো হচ্ছে ঐসব লোকদেরকে, যারা বলেন, কেউ কবিরা গুনাহ করলে তার পাপ পরিমাণ তাকে শাস্তি দেয়া হবে। সে অনন্তকাল জাহান্নামবাসী হবে না। বরং এরূপ কারও কারও ক্ষেত্রে আল্লাহর শাস্তি প্রদান ব্যতীতও ক্ষমা করে দেবেন।
বিদয়াতি মুরজিয়া: এরা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বহির্ভূত ভ্রান্ত ফিরকা বলে গণ্য হয়ে থাকে।

খারিজি ও মুরজিয়াদের মধ্যে পার্থক্য
খারিজি আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মুরজিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব। দ্বীনের সকল ব্যাপারে খারিজিরা চরমপন্থায় বিশ্বাসী, আর সহনশীলতার মূলনীতি নিয়ে মুরজিয়াদের আবির্ভাব।
রাজনৈতিক আন্দোলন হিসেবে খারিজি সম্প্রদায়ের উদ্ভব। পরবর্তীকালে তারা ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। কিন্তু মুরজিয়ারা একটি ধর্মীয় মতবাদভিত্তিক সম্প্রদায়। প্রথমদিকে তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হলেও পরে তারা ধর্মীয় সম্প্রদায়ে পরিণত হয়।
খারিজিরা মনে করেন যে, কোন মুসলিম নিয়মিত দ্বীন পালন ও অন্যান্য কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হলে সে মুসলিমত্ব হারিয়ে ফেলে এবং পরকালে সে জাহান্নামবাসী হবে। কিন্তু মুরজিয়ারা আল্লাহর প্রেমের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়। তারা মনে যে, আল্লাহ ও তাঁর নবী সা.-এর প্রতি যারা বিশ্বাসী তারা কখনো জাহান্নামে যাবে না। আল্লাহ ইচ্ছে করলে পাপীকে ক্ষমা করতে পারেন। কারণ অনেক সময় অনেকেই ভ্রান্তিবশত পাপ কর্ম করে থাকে।
খারিজিরা ধর্মাচরণের বাহ্যিক দিককে গুরুত্ব দেয়; কিন্তু মুরজিয়ারা আধ্যাত্মিক বিষয়ের ওপর বেশি প্রাধান্য দেয়।
খারিজিরা উমাইয়া খিলাফতের বিরোধী এবং এবং উমাইয়াদের অবৈধ খিলাফত দখলকারী মনে করে। কিন্তু মুরজিয়ারা উমাইয়াদের সমর্থন জানায় এবং তাদের শাসনকালকে ন্যায়সঙ্গত প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে।
খারিজিরা মনে করে যে, কেউ অর্পিত দায়িত্ব পালনে হেরফের করলে তাকে শাস্তি দেয়া উচিত। কিন্তু মুরজিয়ারা বলে যে, শাস্তি ও পুরস্কার দেয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ, মানুষের বিচার মানুষের করা উচিত নয়।
খারিজিরা তাদের মতবাদবিরোধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রতিশোধ গ্রহণের পক্ষপাতী; কিন্তু মুরজিয়ারা মনে করে যে, একমাত্র আত্মরক্ষা ছাড়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের যুদ্ধ করা উচিত নয়। (চলবে)

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

তথ্যসূত্র:
আল ফিরকু বাইনাল ফিরকি, দারুল মায়ারিফ, বৈরুত, পৃ. ২০০২
সূরা আল আরাফ : আয়াত-১১১
আল মালালি ওয়ান নাহলি, খণ্ড-১, মিসর ১৯৮৬, পৃ. ১৩৯
তারিগুল মাখাহিবুল ইসলাময়্যিাহ, খণ্ড ১, দারুল ফিখরুল আরাবি ১৯৮৭, পৃ. ১১৯।

SHARE

Leave a Reply