মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল – ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

জাবরিয়া সম্প্রদায়
আরবি ‘জাবর’ শব্দ হতে ‘জাবরিয়া’ শব্দটি উদগত হয়েছে। ‘জাবর’ অর্থ হচ্ছে বাধ্যতা, নিয়তি, অদৃষ্ট, বাধ্যবাধকতা। অদৃষ্টে বা আল্লাহর স্বেচ্ছাচারে বিশ্বাস করার জন্য এ সম্প্রদায় ‘জাবরিয়া সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত। জাহম বিন সাফওয়ান (মৃত্যু ৭৪৫) এই সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা। এ সম্প্রদায় অদৃষ্টবাদ (Fatalism)-এ বিশ্বাস করে। জাবরিয়া সম্প্রদায়ের মতবাদ অনুসারে ঘটমান সববিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বেই বির্ধারিত এবং সে নির্ধারণ অনুযায়ী সবকিছু সংঘটিত হয়। এ ক্ষেত্রে মানুষের ইচ্ছার কোনো দখল নেই। যেহেতু সকল জিনিসই আল্লাহর হুকুমের অনুগত, সেহেতু কোনো জিনিসই মানুষের ইচ্ছায় পরিবর্তিত হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অবগত। তাই ভবিষ্যৎ ঘটনাবলি শুরু থেকেই আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে আছে। জাবরিয়াদের মতে বান্দাহ্র ক্রিয়াকলাপ তাদের নিজেদের ইচ্ছাধীন নয় বরং ইচ্ছা অনিচ্ছা সবই আল্লাহর ইচ্ছার সাথে যুক্ত। অন্যকথায়, বান্দাহর কৃত সব ক্রিয়াকলাপই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কর্ম। জাবরিয়া মতবাদ অনুসারে বান্দহকে তার নিজ ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রে পূর্ণ বাধ্যবাধকতার অধীন মনে করা হয়।

আরবদের অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস
প্রাক-নবুয়তি যুগে আরবদের অনেকেই অদৃষ্টবাদে বিশ্বাস করত। যারা ধারণা করতো যে, আল্লাহ সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী। তিনি সমস্ত ভালো-মন্দ জিনিসের আদেশ দেন এবং মানুষ তাঁর হাতে পুতুলস্বরূপ। তাদের পৌত্তলিক পূর্বপুরুষদের এই বিশ্বাস হতে প্রাথমিক যুগের আরবি মুসলমানদের একটা শ্রেণী অদৃষ্টবাদের সমর্থন করত। তাদের কার্যকে ন্যায়সঙ্গত করার জন্য তারা ধারণা পোষণ করত যে, মানুষ যেহেতু আল্লাহর হাতে সম্পূর্ণ অসহায়; সেহেতু সে তার কর্মের জন্য দায়ী হবে না।

জাবরিয়া মতবাদের উৎপত্তি
আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতায় বিশ্বাস ও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার অস্বীকৃতি হতে যে সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয় তা জাবরিয়া (অদৃষ্টবাদ) নামে পরিচিত। অদৃষ্টবাদ বা একদিনের সমর্থক সাধারণত জবরি নামে অভিহিত। জাবরিয়ারা একদিনের মতবাদে বিশ্বাসী এবং তারা ঘোষণা করে যে মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই, মন ও কর্মের কোনো স্বাধীনতা নেই; মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়; যন্ত্রের মতো কাজ করে যায়। তাদের মতে, মানুষ তার কর্মের জন্য দায়ী নয়।

কুরআনের কোন কোন আয়াতের ওপর গুরুত্ব প্রদান
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তাঁর সর্বময় কর্তৃত্ব ও ইচ্ছার কথা বলেছেন, যেন বিশ্বের যাবতীয় বাদ তাঁর (আল্লাহর) নিয়ন্ত্রণাধীন; সকল ক্ষেত্রেই তার ক্ষমতা একসূত্র তিনি সব কিছুর স্রষ্টা; আল্লাহ সার্বভৌম কর্তৃত্বের অধিকারী এবং মানুষকে ক্ষমা করা ও শাস্তি দেয়া তাঁর ইচ্ছাধীন। এ সকল আয়াতের ভিত্তিতে জাবরিয়া মতবাদ গড়ে উঠেছে। যে সকল আয়াতে আল্লাহ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার স্বীকৃতি দিয়েছেন এ সম্প্রদায় সে আয়াতগুলোর প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না।

জাবরিয়াদের মৌলিক আকিদাসমূহ
কারী মুহাম্মদ তাইয়াব-এর মতে, জাবরিয়াদের মৌলিক আকিদাসমূহ নিম্নরূপ:
» মানুষ পথের ও জড় পদার্থের মত নিষ্ক্রিয় বা বাধ্যবাধকতার আওতাধীন। তাদের নিজ কর্মে কোন ইচ্ছা বা স্বাধীন ক্ষমতা নেই। ফলে তাদের জবাবদিহিতা বা শাস্তি কোনো কিছু হবে না।
» সম্পদ আল্লাহর নিকট প্রিয় বস্তু।
» আল্লাহ কর্তৃক তওফিক বান্দাহর ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার পর হয়ে থাকে।
» তারা শারীরিক মিরাজকে অস্বীকার করে।
» তারা রুহানি জগতে আল্লাহ কর্তৃক অঙ্গীকার গ্রহণের বিষয়কে অস্বীকার করে।
» তারা জানাযা নামাজ ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করে।

জাবরিয়াদের আরো কিছু বিশ্বাস
» জাবরিয়াদের মতে, আল্লাহ স্বেচ্ছাচারী শাসক। ভালো-মন্দ, ন্যায় অন্যায় সবকিছু তার সৃষ্টি। মানুষ আল্লাহর হাতের ক্রীড়নক মাত্র। মানুষকে তিনি যা করতে বাধ্য করেন, মানুষ তাই সম্পন্ন করে।
» মানুষের নিজের কোনো ইচ্ছার স্বাধীনতা বা কর্মস্বাধীনতা নেই। মানুষের ইচ্ছাশক্তির কোনো মূল্য নেই। তারা সম্পূর্ণরূপে ইচ্ছার স্বাধীনতাকে অস্বীকার করেন।
» মানুষের ভাগ্যে যা ঘটবে তা পূর্ব থেকে নির্ধারিত।
» মানুষের কাজের জন্য মানুষকে দায়ী করা চলে না। কারণ মানুষ যা করে তা করতে গিয়ে মানুষ আল্লাহর ইচ্ছাযন্ত্রের ন্যায় কাজ করে।
» মানুষের কোন কার্য নির্বাচন করার ক্ষমতা নেই তার ইচ্ছার স্বতন্ত্র বা স্বাধীনতা নেই। অন্য কথায় তাদের আকিদা হচ্ছে মানুষের নিজের আমল ও কর্মের ওপর কোনো এখতিয়ার নেই। মানুষ জমাট বস্তু ও উদ্ভিদের ন্যায় ক্ষমতাহীন। জাবরিয়া সম্প্রদায় আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও সর্বময় কর্তৃত্বের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব আরোপ করেন।

জাবরিয়াদের মৌলিক শ্রেণী
জাবরিয়াদের মৌলিক দু’টি শ্রেণী। এগুলো হচ্ছে-
» আয জাবরিয়াতুল খালেসা: এ শ্রেণী একটি পরিপূর্ণ জাবর বা বাধ্যবাধকতার প্রবক্তা। এদেরকে বলা হয় খালেগ জাবরিয়া। এদের মতে মানুষ এবং জড়বস্তুর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এবং জাবরিয়াদের মধ্যে কট্টরপন্থী বলে পরিচিত।
» আয জাবরিয়াতুল মুতাওয়াসসিতা: জাবরিয়াদের মধ্যে অপর একটি শ্রেণী রয়েছে যাদেরকে জাবরিয়া মুতাওয়াসসিতা বা মধ্যপন্থী জাবরিয়া বলা হয়। এ দলটা একথা স্বীকার করে যে, বান্দাহর মধ্যে কাজ করার শক্তি সামর্থ্য আছে। কিন্তু একথা স্বীকার করে না যে, এই শক্তি কর্মের ওপর কোন প্রভাব ফেলতে পারে বা কর্মে ব্যয়িত হতে পারে। এ দলটি কাসব/কাজ করার শক্তি এর কথা স্বীকার করলেও জাবর এর আওতা থেকে বের হতে পারেনি। কারণ, এই কাসব-এর অর্থের মধ্যে ‘জাবর’ বিরুদ্ধ কোনও বিষয় নেই।

জাবরিয়াদের দল উপদল
কোন কোন গবেষকের মতে নিম্নোক্ত দলগুলো জাবরিয়াদের উপদল।
» নাজ্জারিয়া: এর হুসাইন ইবনে মুহম্মাদ আন নাজ্জার (মৃত্যু ২৩০) এর অনুসারী। হুসাইন এর অনুসারী হওয়ার কারণে কেউ কেউ এদের নাম হুসাইনিয়া বলে থাকেন।
» দিরারিয়াহ: এরা দিয়ার ইবনে আমর ও হাফস আল ফরদ এর অনুসারী।
» কুল্লাবিয়া।
কারী মুহাম্মদ তাইয়্যেব জাবরিয়াদের অনেকগুলো উপদলের কথা উল্লেখ করেছেন। এ উপদলগুলো হচ্ছে- 
» মুজতাররিয়্যাহ
» আফআলিয়্যাহ
» মাইয়্যাহ
» মাযুবিয়্যাহ
» মাজাযিয়্যাহ
» মুতমাইন্নাহ
» কাসলিয়্যাহ
» সাবিকিয়্যাহ
» হাবিবিয়্যাহ
» খাওফিয়্যাহ
» ফিকরিয়্যাহ
» হাসসাসিয়্যাহ
আল মিলাল ওয়ান নিহাল গ্রন্থের লেখকের মতে জামিয়া দলটি জাবরিয়াদেরই অন্তর্ভুক্ত। অধ্যাপক কে আলী লিখেছেন, জাবরিয়াগণ তিনটি শাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ে, যথা- জাহানিয়া, নাজারিয়া ও জিয়ারিয়া। ছোটখাটো ব্যাপারে তারা পরস্পর থেকে ভিন্নমত পোষণ করত। কিন্তু অদৃষ্টবাদের ব্যাপারে তারা সকলে এক মতাবলম্বী ছিল।

উমাইয়া শাসনামলে জাবরিয়া সম্প্রদায়ের জনপ্রিয়তা
জাবরিয়া সম্প্রদায় উমাইয়া বংশের শাসনামলে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। অন্য কথায় উমাইয়া শাসকগণ জাবরিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

উপসংহার
জাবরিয়া মতবাদ মূলত অদৃষ্টবাদেরই নামান্তর। যারা মনে করে মানুষের কর্মের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতাও নেই; মানুষ জড় পদার্থ বা পুতুলসম। তথা-
“ছায়াবাজি পুতুলরূপে গড়াইয়া মানুষ
যেমনে নাচায় তেমনে নাচে পুতুলের কি দোষ?”
এই কথা মোটেও ঠিক নয়। কারণ মানুষকে আল্লাহ তায়ালা কর্মের স্বাধীনতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। তার মধ্যে জন্মগতভাবেই বিবেক, জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তা সেটআপ করা আছে। যা দিয়ে মানুষ ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ণয় করে ভালকে ভাল হিসেবে গ্রহণ এবং মন্দকে মন্দ হিসেবে বর্জন করার ক্ষমতা রাখে। তার মাঝে এই স্বাধীনতা আছে বলেই চলার পথে ইসলামী জীবনবিধান দেওয়া হয়েছে এবং তার ভাল-মন্দ আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মানুষকে জড়পদার্থের মতো পুতুল ও অসহায় করে সৃষ্টি করা হয়নি। এজন্য আল্লাহ তায়ালা তার বান্দার প্রতি সামান্যতম অবিচারও করবেন না।
(চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply