মুসলমানদের মধ্যে বিরাজমান দল-উপদল -ড. মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম

(গত সংখ্যার পর)

মুতাজিলা মতবাদের পতনের কারণসমূহ
আব্বাসীয় খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতা, রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহ এবং মুতাজিলা সম্প্রদায়ের বিদ্বান ব্যক্তিদের বিস্ময়কর কার‌্যাবলি মুতাজিলা মতবাদকে সে সময় ইসলামের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী ধর্মতাত্ত্বিক-দার্শনিকে পরিণত করেছিল। খলিফা আল মামুন (শাসনকাল ৮১৪-৮৩৩) মুতাজিলা মতবাদকে ইসলামে একমাত্র ধর্মীয়-দার্শনিক মতবাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর পরবর্তী উত্তরাধিকারীগণও তাঁর ধর্মীয় নীতি অনুসরণ করেছিলেন। এই রাষ্ট্রীয় অনুগ্রহ ও মুতাজিলা শিক্ষক-চিন্তাবিদদের উদ্যমশীল কার‌্যাবলির ফলে আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে মুতাজিলা মতবাদ খলিফার প্রাসাদ থেকে পণ্যকুটির পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। বাগদাদ ও বসরা থেকে এটি আরব উপদ্বীপ, সিরিয়া, মিসর, উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু মুতাজিলাদের প্রভাব প্রতিপত্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। খলিফা আল মুতাওয়াক্কিল ক্ষমতায় আরোহণের সাথে সাথে মুতাজিলারা পূর্বশক্তি হারিয়ে ফেলে এবং তাদের বিরুদ্ধে সঠিক চিন্তাধারা মুসলিমদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যুক্তিবাদ ও নিষ্ঠাবান মুসলিম সম্প্রদায়ের সংঘাতে মুতাজিলা মতবাদ টিকে থাকতে পারেনি। মুতাজিলা মতবাদের পতনের পেছনের অনেকগুলো কারণ বিদ্যমান ছিল। কারণগুলো নিম্নরূপ-

অমুতাজিলাদের ওপর খলিফা আল মামুন ও তাঁর উত্তরাধিকারীদের জুলুম
আব্বাসীয় খলিফা আল-মামুন ও তাঁর উত্তরাধিকারীগণ কর্তৃক ৮১৩-৮৪৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে জুলুম মুতাজিলা সম্প্রদায়ের পতনে যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। আল মামুন তাঁর মুতাজিলা মতবাদকে গ্রহণ করার জন্য কোন কোন সময় তরবারির সাহায্যে লোকদেরকে বাধ্য করতেন। তিনি অমুতাজিলাদের প্রতি অসহিষ্ণুই ছিলেন না; তাদের ওপর জুলুম নির্যাতন ও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছিলেন। মুতাজিলা মতবাদ চাপিয়ে দেয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করা হয়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে সংখ্যাগরিষ্ঠরা। অনেক দ্বীনদার বিদ্বান ব্যক্তি হয় নিহত, না হয় বন্দী হয়েছিলেন। মহান ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল নির্যাতিত ও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। খলিফা আল মামুনের দুই উত্তরাধিকারী আল মুতাসিম ও আল ওয়াসিক তাঁর নীতি অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু আব্বাসীয় আল মুতাসিম ও আল ওয়াসিক তাঁর নীতি অনুসরণ করেছিলেন। কিন্তু আব্বাসীয় তিনজন প্রভাবশালী শাসকের এই সমস্ত নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা আকাক্সিক্ষত ফল প্রদানের পরিবর্তে অমুতাজিলাদের মনে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছিলো। ফলে তারা সর্বদা মুতাজিলা সম্প্রদায়ের ধ্বংসের উপায় খুঁজতে থাকে।

দ্বীনদার সম্প্রদায়ের বিরোধিতা
মুতাজিলাগণকে দ্বীনদার সম্প্রদায়ের বিরোধিতার মোকাবিলা করতে হয়। মুতাজিলা মতবাদের প্রথম থেকে এক শ্রেণীর মুসলমান প্রধানত ইসলামের ধর্মবিদ ও ফকিহ বিদ্বান ব্যক্তিগণ এই আন্দোলনকে সুনজরে দেখেননি। তারা মনে করেন যে, সাধারণ মুসলমানরা মুতাজিলা সম্প্রদায়ের দার্শনিক আলোচনা বুঝতে পারবে না। ফলে ইসলামের প্রতি তাদের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যাবে এবং তারা ভুল পথে পরিচালিত হবে। সুতরাং এ সম্প্রদায় মুতাজিলা মতবাদের অগ্রগতিকে নানাভাবে বাধা দেয় এবং সাধারণ মুসলমানদের উপযোগী আন্দোলন আরম্ভ করে। মূলধারা ইসলামী চিন্তাবিদগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে ক্রমান্বয়ে ও মতের অনুসারী করতে থাকে। ক্রমান্বয়ে তা বিলুপ্ত হতে থাকে।
আল গাযালী তাহাফুত, ১৯৯৩, পৃ. ২১৩-২২০ উদ্ধৃত ড. এম উমর চাপড়া, মুসলিম সভ্যতা : অবক্ষয়ের কারণ ও সম্প্রদায়ের আবশ্যকতা, বিআই আইটি, ২০১৬; পৃ ১২৭

রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব
আল মুতাওয়াক্কিলের ক্ষমতায় আরোহণের সঙ্গে সঙ্গে মুতাজিলারা ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে এবং দ্বীনদার সম্প্রদায় পুনর্জীবিত হতে আরম্ভ করে। মুতাওয়াক্কিল ও তার উত্তরাধিকারী নিষ্ঠাবান মুসলিম ছিলেন। তারা ইসলামের সঠিক রূপকে পুনরুদ্ধারে সচেষ্ট হন। তাদের শাসনকালে মুতাজিলাগণ শুধু রাজকীয় অনুগ্রহই হারাননি, তারা খলিফাদের হস্তে সকল প্রকার জুলুম নির্যাতনের শিকারেও পরিণত হয়েছিলেন। মুতাজিলাপন্থীরা জনসাধারণ কর্তৃক বিতাড়িত হয়; মুতাজিলা মতবাদ নিষিদ্ধ করা হয় এবং স্কুল ও কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়। অনেক মুতাজিলা পণ্ডিত নিহত; অনেকে কারারুদ্ধ হন তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। মুতাজিলাগণ তাদের নিজস্ব মত ত্যাগ করে সাধারণ মুসলমানদের সাথে মিশে যেতে বাধ্য হয়। খলিফা কাদির (শাসনকাল ৯৯১-১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ) পৃথিবীর বুক থেকে মুতাজিলা মতবাদ মুছে ফেলার জন্য নিষ্ঠুর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নির্যাতন ও রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব মুতাজিলা মতবাদের পতনের জন্য বিশেষভাবে দায়ী ছিল।

শিয়াদের বিরোধিতা
মুতাজিলা মতাবলম্বীগণকে শিয়াদের হাতেও নির্যাতন ভোগ করতে হয়। শিয়াদের কোন কোন মতবাদের তীব্র বিরোধিতা করায় শিয়ারা মুতাজিলাদেরকে তাদের শত্রু বলে মনে করত। সুতরাং বুওয়াইয়া বংশের অধীেেন শিয়ারা ক্ষমতায় এসে মুতাজিলাদের নির্যাতন করতে শুরু করল। মুতাজিলা মতাবলম্বীগণ বাগদাদ থেকে বিতাড়িত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম আফ্রিকা ও স্পেনে আশ্রয় নিয়েছিল; কিন্তু সেখানে এটি দৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করতে পারেনি।

অনৈসলামী ধারণার প্রবর্তন
মুতাজিলাগণ তাদের মতবাদে কয়েকটি অনৈসলামিক ধারণার প্রবর্তন করে অধিকাংশ মুসলমানের (ক্রোধ সৃষ্টি করেছিল।) উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, তারা আহমদ বিন হায়াত ও ফজল আলহদাবির আত্মার দেহান্তর (পুনর্জন্ম) প্রাপ্তির মতবাদ গ্রহণ করেছিল। এইভাবে মুতাজিলাদের জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের বিরোধিতা
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতবাদ ছিল সহজ এবং সাধারণ মুসলমানগণ তা সহজে উপলব্ধি করতে পারত। সুতরাং জনগণ অধিক সংখ্যায় ইমাম ইবনে হাম্বলের চিন্তাধারাকে গ্রহণ করেছিল। ইসলামের চার ইমামের মধ্যে আহমদ ইবনে হাম্বল ছিলেন মুতাজিলাদের সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু। তিনি মুতাজিলা মতবাদকে প্রচণ্ডভাবে নিন্দা করেন এবং যুক্তিবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। অনেক মানুষই ইমাম আহমদের মুতাজিলা বিরোধী কার‌্যাবলি সমর্থন করে। শেষ পর্যন্ত ইমাম আহমদ বন্দি ও কারারুদ্ধ হন। কিন্তু মুতাজিলা মতবাদের বিরুদ্ধে তার অনুসারীদের জিহাদ চলতেই থাকে। সত্যিকারের মুসলিম ও মুতাজিলাদের মধ্যে যে সংগ্রাম চলতে থাকে, তাতে শেষ পর্যন্ত মুতাজিলারা এঁটে উঠতে পারেননি।

পবিত্র ভ্রাতৃসংঘের আবির্ভাব
বিখ্যাত ‘ইখাওয়ানইস সাফা’ বা পবিত্র ভ্রাতৃসংঘের আবির্ভাব মুতাজিলাদের পতনের একটি বিশেষ কারণ ছিল। এরা ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে আপস-মীমাংসার উদ্দেশ্যে নিয়ে এগিয়ে আসে। ইসলামে বিভেদ বন্ধ করার জন্য তারা একটি সমিতি স্থাপন করে। এ সমিতি আলোচিত ও বিতর্কিত বিষয়ের উপর অনেকগুলো প্রবন্ধ রচনা করে। এই সমিতি মুসলমানদের মধ্যে বন্ধুত্ব ও শুভেচ্ছার পরিবেশ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়। ভ্রাতৃসংঘের বিরোধ নিবারক মনোভাব অনেক শিক্ষিত মুসলমানকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করেছিল। তারা মুসলমানদের দৃষ্টিকে মুতাজিলা মতবাদ থেকে ফিরিয়ে এনেছিল। এই রূপে এই সমিতির উত্থান মুতাজিলা প্রভাবকে ভীষণভাবে ম্লান করে দিয়েছিল।

অনৈক্য
মুতাজিলাদের মধ্যে অনৈক্যও তাদের ধ্বংস ডেকে এনেছিল। বসরাতে মূল মুতাজিলা সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার একশত বছর পরে বাগদাদে বিশর আল মুতামির কর্তৃক প্রতিদ্বন্দ্বী মুতাজিলা সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য না থাকলেও এদের মধ্যে পারস্পরিক হিংসা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা দেয় এবং এটা শেষ পর্যন্ত তাদের পতনের পথকে প্রশস্ত করে।

আশয়ারিদের অভ্যুদয়
আবুল হাসান আল আশয়ারি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আশয়ারি সম্প্রদায়ের অভ্যুদয় হলো মুতাজিলা সম্প্রদায়ের পতনের সর্বশেষ কারণ। আবুল হাসান প্রথমে একজন মুতাজিলা মতাবলম্বী ছিলেন। পরে তিনি মুতাজিলা সম্প্রদায় থেকে বের হয়ে এসে মুতাজিলা মতবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করেন। আবুল হাসানের মতবাদের সাথে রক্ষণশীলদের মতবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করেন। আবুল হাসানের মতবাদের সাথে রক্ষণশীলদের মতবাদের ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য ছিল। সুতরাং তাঁর সম্প্রদায়ের প্রতি অনেক মুসলমান আকৃষ্ট হলো। এতে মুতাজিলা মতবাদের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এর অনুসারীরা দলে দলে আশয়ারি মতবাদে যোগদান করে।

মোঙ্গল আক্রমণ
মুতাজিলাদের পতনের আর একটি কারণ ছিল খাওয়ারিম ও বাগদাদে মোঙ্গল নেতা হালাকু খানের আক্রমণ। বাগদাদে মুতাজিলাদের সম্পদ ও প্রতিষ্ঠান ভস্মীভূত হয়ে যায়।
মুতাজিলাদের দল/উপদলসমূহ-
১. আল ওয়াসিলিয়্যা ২. আল হুযায়লিয়্যা
৩. আল নাযযামিয়্যা ৪. আল জাহিযিয্যা
৫. আল খাতামিয়্যা ৬. আল জুব্বাইয়্যা
৭. আল কারিয়্যা।
লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply