মুসলিমসমাজে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে জায়েজীকরণ – দেলোয়ার হোসেন ফাহিম

পাশ্চাত্যের চক্ষু দ্বারা সুন্দর-অসুন্দর, উন্নতি ও অবনতির হিসাব করা কতিপয় মুসলিম নামি পন্ডিতও অমুসলিমদের সাথে তাল মিলিয়ে ইসলাম ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মধ্যে সামঞ্জস্যতা প্রদর্শনের জন্য বেশ কষ্টসাধ্য প্রয়াস চালিয়েছেন। এদের অনেকেই কুরআন ও সুন্নাহর ব্যাখ্যা এমনভাবে করেন যেন মানুষ বুঝে ইসলাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে সম্পূর্ণভাবে সমর্থন করে অথবা ন্যূনতম পক্ষে এটা বুঝতে সক্ষম হয় যে, ইসলামের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের খুব একটা বিরোধ নেই। মুসলিমবিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে জায়েজীকরণে মিশরের আবদ আল রাজিক ইসলামের অকার্জকারিতা প্রসঙ্গে যা বলেন, কাব্যিক রূপে বলতে গেলে দাঁড়ায়- ইসলাম দিয়ে আর চলে না, ধর্মনিরপেক্ষতাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একমাত্র ঠিকানা। এর জবাবে ড. ইউসুফ আল কারজাবি বলেন : ‘প্রশ্ন জাগে, যদি ইসলাম সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি থেকে সম্পূর্ণ দূরের এক ভিন্ন বস্তু হয়ে থাকে, তাহলে ইসলাম কী? ইসলাম কি আবেগ-অনুভূতিশূন্য কয়েক রাকাত নামাজ, গতানুগতিক কিছু প্রার্থনা, কতিপয় আচার-অনুষ্ঠান! অথচ কুরআনের দাবি হচ্ছে, ‘সকল বর্ণনা সংবলিত আল কুরআন যা মুসলমানদের জন্য হেদায়েত, রহমত ও সুসংবাদ স্বরূপ। তাই একজন মুসলমানের কাছে ইসলামের দাবি হচ্ছে সে তার জাতির সব বিষয়ে সক্রিয় অংশীদারের ভূমিকা পালন করবে। আর আলেম-উলামাদের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক হচ্ছে : অন্যান্য শ্রেণী যেমন দার্শনিক, চিকিৎসক, আইনবিদদের মতো তারাও সরকারকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেবে যা ইসলাম তাদের ওপর অত্যাবশ্যকীয় করেছে, যাতে রাষ্ট্র বা সরকার ইসলামের সঠিক পথে, সত্যকে সত্য, মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে সক্ষম হয়। এমনকি ইসলামের মৌলিক বিধান হচ্ছে মুজতাহিদ পর্যায়ের গবেষক আলেমদের মধ্যে থেকেই রাষ্ট্রপ্রধান হবেন। যেমন ছিলেন খোলাফায়ে রাশেদিনসহ তাদের পথ ধরে আসা পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধানগণ। আর এ বিষয়ে ইসলামী আইনবিদদের ঐকমত্য হচ্ছে, রাষ্ট্রপ্রধান ও বিচারপতিদেরকে অবশ্যই ইজতিহাদের যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। তবে প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিতে বাস্তবতার নিরিখে উপস্থিতিদের মধ্যে সার্বিক বিবেচনায় যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনীত করা যাবে। আর এভাবেই কুরআন ও শাসন ব্যবস্থার সহ-অবস্থান নিশ্চিত হবে। যার ফলে বিগত সময়ের মতো দু’টির মাঝে বিস্তর ফারাক সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না, যেখানে আলেম-উলামাদের এক ময়দানে এবং শাসকগোষ্ঠী অপর ময়দানে অবস্থান করত এবং কবি-সাহিত্যিক ও চাটুকারের দল ছাড়া অন্য কেউ শাসকগোষ্ঠীর কাছে ভিড়তে পারত না। আর ইসলামের সম্মানিত পূর্ব-পুরুষগণ ইসলাম দিয়েই দেশ শাসন করেছেন, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যই জিহাদ বা চেষ্টা করেছেন এবং ইসলামের আলোকেই পার্থিব ও আধ্যাত্মিক লেনদেন করেছেন। ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর তাই বলেছেন : “উটের একটি রশিও যদি আমার থেকে হারিয়ে যায়, আমি আল্লাহর কিতাবে তার হুকুম খুঁজে পাই’। সুতরাং যে মুসলমান হয়েও তার জাতির সমস্যাবলি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে না, সে সত্যিকারভাবে মুসলমানদের দলভুক্ত নয়।”
আল রাজিকের প্রচেষ্টায় কিছু দিকভ্রান্ত মুসলিম তার দেখানো পথে হাটতে শিখেন। ১৯২৫ সালে আল-রাজিকের বিতর্কিত গ্রন্থ ‘ইসলাম ও সরকারের নীতি’ প্রকাশিত হওয়ার পাঁচ বছরের মাথায় মুহাম্মদ রশিদ রিদা নামক আরেক পন্ডিত তার ‘আল-মানার’ ম্যাগাজিনে লিখেন :
‘শরিয়া কখনই রাষ্ট্রীয় আইনের মর্যাদা পেতে পারে না’।
রশিদ রিদা পরবর্তীতে ইসলাম সম্পর্কে কতিপয় উৎকট ধারণার জন্ম দেন। এই যেমন-
– কিছু ক্ষেত্রে ঘুষ আদান-প্রদানকে জায়েজ বলে গণ্য করেন তিনি।
– অপব্যবহার বা ক্ষতির আশঙ্কা না থাকলে মূর্তি নির্মাণকে ইসলামী শরিয়তে জায়েজ বলে মতামত দেন।
-অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ আক্রমণকে মনে প্রাণে সমর্থন করেন তিনি। মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা ঔপনিবেশবাদের শিকড় মজবুত হওয়ার পেছনে কিছু বিষয়কে দায়ী করেন তিনি। তার মধ্যে সুফিবাদের বাড়াবাড়ি, অতীতের অন্ধ অনুসরণ (তাকলিদ), ওলামাদের জ্ঞানের স্বল্পতা এবং তথ্য-প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া অন্যতম। এর থেকে উত্তরণের জন্য ইসলামকে বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
– অণুবীক্ষণ যন্ত্রকে দিয়ে দেখা ক্ষুদ্রাতি-ক্ষুদ্র প্রাণীকে তিনি জিন জাতির প্রজাতি বলে দাবি করেন।
সুদানের আবদুল্লাহি আহমেদ আন-নাইম (যিনি এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন আইনের অধ্যাপক) ‘কেন মুসলিমদের ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের প্রয়োজন’ এই শিরোনামে লিখেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষ সরকারই শরিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য শ্রেষ্ঠ পন্থা; ‘বলপ্রয়োগের মাধ্যমে শরিয়ার প্রয়োগ হলো শরিয়ার ধর্মীয় প্রকৃতি বিরোধী, কারণ তখন মুসলিমদেরকে রাষ্ট্রীয় নিয়মের অধীনে ধর্মীয় কর্ম পালন করতে হবে, এবং তারা স্বাধীন মুসলিম হিসেবে ধর্ম পালনে সক্ষম হবে না।’
অধিকন্তু, কিছু পন্ডিত মদিনা সনদকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করে এই মত দেন যে-রাসূল (সা)-এর জামানা থেকেই মুসলিম বিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল। এদের যুক্তি হচ্ছে-‘ধর্মনিরপেক্ষতা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সার্বজনীন কল্যাণভিত্তিক সমাজগঠনের লক্ষ্যে উন্নত চিন্তাসমৃদ্ধ পদ্ধতির মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। আর ইসলাম যেহেতু এ ধরনের উদ্বুদ্ধকরণে বিশ্বাসী তাই এ সুযোগে ইসলামকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে সামঞ্জস্যশীল বলে অভিহিত করা যায়।’ অথচ প্রকৃত প্রস্তাবে ইসলাম ন্যায়বিচার এবং সার্বজনীন কল্যাণভিত্তিক সমাজগঠনে মানবগোষ্ঠীকে উদ্বুদ্ধ করে তবে তা অবশ্যই পরকালে বিশ্বাস ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে।
অনেকে আবার ইসলামকে সমাজতন্ত্রের বাবা বলেও মজা লুটেছেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ড. আহমদ শরীফ এ দাবির পক্ষে লিখেন : ‘মুসলমানরা সমাজবাদ বা সাম্যবাদ নাম শুনেই শঙ্কিত হয়ে ওঠে। অথচ কুরআনের মূলসূত্র অনুসরণে মুসলিম সমাজেই আধুনিক সমাজতন্ত্রের উদ্ভব হওয়ার কথা ছিল। হিজরত-পরবর্তী মদিনার সাহাবীদের ত্যাগের উদাহরণ টেনে ইসলামকে কমিউনিজমের বাবা বলে সম্মোধন করেন তিনি। তাই সমাজতন্ত্রের নাম শুনে কোন মুসলিমের আঁতকে ওঠার পরিবর্তে আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে জাকাতব্যবস্থার স্থলে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আন্তরিক হওয়ার আহ্বান জানান।
আহমদ শরীফের সমগোত্রীয় উইলফ্রেড কান্টওয়ের স্মিথ তার ‘ইসলাম ইন মডার্ন হিস্ট্রি’ বইয়ের ছত্রে ছত্রে মুসলিম সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োগকে অপরিহার্য দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কামালপন্থী তুরস্ককে মডেল ধরে তিনি মুসলমানদের অতীন্দ্রিয় বিশ্বাসের মরীচিকা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দেন। পশ্চিমা মডেলে খ্রিষ্টীয় সমাজ অনুকরণে তুরস্কে যে সংস্কার প্রচেষ্টা চালানো হয় তাকে আকণ্ঠ প্রশংসায় ভিজিয়ে তিনি বলছেন, ‘সব সংস্কারের উদ্দেশ্য খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের প্রশ্নের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়; বরং মধ্যযুগের পরিবর্তে আধুনিক যুগে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রশ্ন। তিনি বলেন, ‘আধুনিক বিশ্ব গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার মধ্য দিয়ে সকলকে নিয়ে কিভাবে বাস করা যায় তা দেখিয়ে দিচ্ছে। অতএব মুসলমানদেরকেও ইসলামকে অন্য ধর্মের মত সৃষ্টিশীল হিসেবে প্রমাণ দিতে হবে। কেননা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক যুগ বা ভৌগোলিক এলাকার প্রয়োজন পূরণের পর ইসলামের আদি উপযুক্ততা এখন আর অবশিষ্ট নেই।”
প্রশ্ন হচ্ছে-যাবতীয় ধর্ম ও দার্শনিক ব্যবস্থা যদি একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর অনুপযোগী হয়ে যায় তাহলে যুক্তির দিক দিয়ে পশ্চিমা সভ্যতার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার সত্য হবে। আজ আমরা যাকে ‘আধুনিকতা’ বলছি তা-ও অবশ্যই কালের স্রোতে বিলীন হয়ে যাবে। কিন্তু পশ্চিমা ছাঁচ বা আদর্শকে কি অবিনাশী বা অপরাজেয় বলা হয়! আর এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারও সাহস কেউ করে না। অভিজ্ঞতার নতুন দিগন্ত প্রসারিত হওয়ার সাথে সাথে পুরনো ধ্যান-ধারণা ছুড়ে ফেলে নতুনকে গ্রহণ করতে হবে-এটাই আধুনিকতাবাদের মূল কথা। এই আধুনিকতা যেহেতু পারলৌকিক যাবতীয় প্রসঙ্গকে অপ্রাসঙ্গিক ও অর্থহীন বিধায় বাতিল করে দেয়; তাই ইসলাম যদি নিজেকে পরিবর্তন করতে না পারে তবে আধুনিকতার দৃষ্টিতে ইসলামকেও একই ভাগ্য বরণ করতে হবে।
লেখক প্রফেসর এইচ এ আর গিব তার তার ‘মডার্ন ট্রেন্ডস ইন ইসলাম’ বইতে আধুনিকতার সাথে ইসলামের সংঘাতের বিষয়টি যথার্থতার সাথে তুলে ধরলেও অন্য প্রাচ্যবিদদের মতোই মুসলিমসমাজকে পুনর্গঠনের প্রয়োজনে বারবার খোদ ইসলামের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার রব তোলা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। তিনি যুক্তি দেন এই বলে যে,“খ্রিস্টধর্ম যেমন ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে আপস করে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে, ইসলামও কি পারে না, যুগের সাথে তাল মেলানোর স্বার্থে কিছুটা ছাড় দিতে?
এসকল বুদ্ধিজীবী এটা বুঝতে অক্ষম যে পাশ্চাত্যের খ্রিস্ট সমাজে ধর্মনিরপেক্ষতা বিকাশের অনেক উপযোগিতা থাকলেও মুসলিমসমাজে এর যৌক্তিক কারণ নেই। কেননা কোনো খ্রিস্টানকে যখন মানবরচিত আইন দিয়ে শাসন করা হয় তখন সে অল্প বা বিস্তর বিরক্ত হয় না। কিন্তু মুসলিমের জন্য ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবনাদর্শ গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে ড. ইউসুফ আল কারজাবি লিখেনÑ
‘ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের এই সহজ বিষয়টি বুঝাতে অনেকখানি বেগ পেতে হয়। আর তা বুঝাতে ইসলামিক স্কলার ও নেতৃবৃন্দের কথা উল্লেখ করলে খুব বেশি লাভ হয় না। ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা এদের কথায় সন্তুষ্ট হয়ে সঠিক বুঝ লাভ করতে রাজি নয়। এ ছাড়া ইতিহাসের বাস্তবতাকেও তারা গ্রহণ করতে নারাজ। তাই এ পর্যায়ে পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের কতিপয় বক্তব্য পেশ করা হলো যারা খোলাখুলিভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এর ফলে সেক্যুলাররা এ দাবি করতে পারবেন না যে তারা বর্তমান যুগের বিষয়ে তাদের চেয়েও বেশি খবর রাখেন কিংবা এ দাবিও করতে পারবেন না যে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিভিন্ন তথ্যাদি সংগ্রহের কলাকৌশল তাদের চেয়ে বেশি রপ্ত করতে পেরেছেন। তাদের কতিপয় বক্তব্য নিম্নরূপ:
১.    ড.ভি পিটজেরাল্ড (ঠ. ঋরঃুবৎধষফ) বলেন : ‘ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিও বটে। যদিও সমসাময়িক যুগের কতিপয় প্রগতিবাদী মুসলিমের মতে উভয়ের মাঝে সীমারেখা জড়িত, কিন্তু বাস্তবে একটিকে অপরটির থেকে পৃথক করার কোনো সুযোগ নেই।’
২.    অধ্যাপক সি.এ ন্যালিয়ন (ঈ.অ. ঘধষষরড়হ) বলেন : ‘মুহাম্মদ (সা) একই সময়ে একটি ধর্ম ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা জীবনের প্রতিটি দিককে বেষ্টন করে আছে।’
৩.    অধ্যাপক আর. স্ট্রথম্যান (জ. ঝঃৎড়ঃযসধহহ) বলেন : ‘ইসলাম ধর্ম ও রাজনীতির সমষ্টি; কারণ এর প্রতিষ্ঠাতা একজন নবী ছিলেন, সাথে সাথে একজন বিজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন।’
৪.    ড. শ্যাচট (উৎ. ঝপযধপযঃ) বলেন : ‘ইসলাম শুধু অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়; বরং এটি ধর্ম থেকেও অতিরিক্ত কিছু; এটি শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক চিন্তাধারারও প্রতিনিধিত্ব করে। সংক্ষেপে এটি পরিপূর্ণ একটি জীবনব্যবস্থা যা ধর্ম ও রাষ্ট্র উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে।’
৫.    স্যার টি. আরনল্ড (ঝরৎ ঞ অৎহড়ষফ) বলেন : ‘ইসলামের নবী একই সময়ে ধর্মপ্রধান ও রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।’
৬.    অধ্যাপক জেব (ঔবন) বলেন : ‘তখনি স্পষ্ট হলো যে ইসলাম শুধু ব্যক্তিগত ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের নাম নয়: বরং এটি একটি স্বতন্ত্র সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি রাখে। ইসলামে রয়েছে স্বতন্ত্র শাসনপদ্ধতি, রয়েছে নিজস্ব আইন-কানুন ও বিশেষ রাষ্ট্রব্যবস্থা। ’
৭.    অধ্যাপক ডি.বি ম্যাকডোনাল্ড (উ.ই. গধপযফড়হধষফ) বলেন : ‘এখানে (মদিনাতে) সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং ইসলামী আইনের মূলনীতি প্রণয়ন করা হয়।’
যারা পশ্চিমাদের বক্তব্য ব্যতীত সন্তুষ্ট হয় না উল্লেখিত মতামতগুলো তাদের সকল অহংবোধকে নির্বাক করতে বাধ্য। তবে মনে রাখতে হবে, ইসলামী রাষ্ট্র যেমন অতীত ইতিহাসের খ্রিস্ট ধর্মীয় পুরোহিত রাষ্ট্রতুল্য নয়, তেমনি এটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রও নয়। তাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যদি কমিউনিজম রাষ্ট্রের আকৃতি ধারণ করে যেখানে ধর্মকে পুরোপুরি অস্বীকার করে এর সাথে শত্রুতামূলক আচরণ করা হয় এবং যাকে জাতির জন্য ‘আাফিমতুল্য ও কুসংস্কারের মিলনমেলা’ বলে গণ্য করা হয় এটি যেমন ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। তেমনি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ যদি পাশ্চাত্যে ব্লকের রাষ্ট্রের আকৃতি ধারণ করে যারা নিজেদেরকে মুক্তবিশ্ব বলে নামকরণ করেছে, যেখানে ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে এবং যেখানে সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও চারিত্রিক মূল্যবোধ ইত্যাদিকে ধর্মের প্রভাব থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখা হয়েছে, সেটিও ইসলাম সমর্থন করে না। কারণ এটি এমন বিশ্ব যেখানে স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয় না বটে; কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা তাঁর প্রদত্ত জীবন-বিধানের কোনো স্থান এবং এর কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করা হয় না।
অবশ্য যে প্রতিশ্রুতির বুলি নিয়ে মুসলিমবিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতার আগমন ঘটে, একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসে তা অনেকখানি নেতিয়ে পড়েছে, ধসে গেছে তার দার্শনিক ভিত্তি। ইউরোপের ধর্মান্ধদের মতো ধর্মনিরপেক্ষ মতান্ধরাও অপরের বিশ্বাসকে সহযোগিতা করার বিপরীতে বিদ্বেষপূর্ণ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। মুসলিমবিশ্বের ওপর একরকম চাপিয়ে দেয়ার ফলে বর্তমান মুসলিম উম্মাহও ধর্মনিরপেক্ষতার রকমারি যুক্তি থেকে পালাক্রমে মোহমুক্ত হতে শুরু করেছে। কালক্রমে মুসলিম উম্মাহ আজ এটাও বুঝতে সক্ষম হয়েছে যে, পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষ সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ দৈহিক বিচ্ছিন্নতাই নয় বরং পূর্ণ নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা।

লেখক : শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply