মুসলিম উম্মাহ : সমস্যা ও আমাদের করণীয় । প্রফেসর ড. মেহমেদ গরমেজ

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস-সালাতু ওয়াস-সালামু আ’লা মুহাম্মাদিন ওয়া আ’লা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন। আমাদেরকে শূন্য থেকে অস্তিত্ব দানকারী, আমাদেরকে আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিতকারী, আমাদেরকে মুসলিম উম্মাহর একজন গর্বিত সদস্য হিসেবে সৌভাগ্যদানকারী, ইসলামী পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তওফিক দানকারী মহান প্রভু আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের দরবারে লাখো-কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি।

সম্মানিত উপস্থিতি এবং সামনে উপবিষ্ট সুপ্রিয় শিক্ষকমন্ডলী
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে কেবলমাত্র তার সন্তুষ্টির জন্য ইখলাস ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করার তওফিক দান করুন। আমাদেরকে সকল প্রকার প্রদর্শনেচ্ছা, প্রপাগান্ডা থেকে দূরে থাকার তওফিক দান করুন। নবী করীম (সা) ইরশাদ করেছেন- “যে তার কোন মুসলমান ভাইয়ের বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ায় না, সে তাদের দলভুক্ত নয়।” মুসলিম উম্মাহর সমস্যায় ও তাদের দুঃখ কষ্টে আপনারা শরিক হয়েছেন বলে এবং মুসলিম উম্মাহর প্রবাহিত রক্ত বন্ধ করার জন্য আপনারা প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন বলে আপনাদের সকলের প্রতি শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে একজন মুসলমানও যদি নির্যাতিত ও নিপীড়িত হয়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যেন আমাদেরকে তাদের পাশে থাকার তওফিক দান করেন।
আজকে আমরা মুসলিম বিশ্ব বুঝাতে- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভৌগোলিক কোন পরিচয়কে ধর্তব্যের মধ্যে নিয়ে আসব না। আজকে আমার এই আলোচনায় মুসলিম বিশ্ব বলতে- কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা কোন ভৌগোলিক অঞ্চল কিংবা কোন দেশ সম্পর্কে কথা বলব না। মুসলিম পরিচয় ধারণকারী সকল মু’মিন ভাইকে নিয়ে আজকে কথা বলব।

‘ইসলামী বিশ্ব’ এই পরিভাষাটি আমাদের সভ্যতার তৈরিকৃত কোন পরিভাষা নয়। ‘ইসলামী দুনিয়া’ বা ‘মুসলিম বিশ্ব’ এই পরিভাষাটি এই শতাব্দীর শুরুতে তৈরিকৃত একটি পরিভাষা। তারা (পাশ্চাত্য) এই পারিভাষিক শব্দের মাধ্যমে আমাদেরকে নির্দিষ্ট একটি ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায়। অথচ আল্লাহর কিতাব অনুসারে, পবিত্র কোরআনের মতে, “সমগ্র দুনিয়াই হলো ইসলামের।” ইসলাম একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখার মত কোন দ্বীন নয়। আমাদের রব বিশ্বজাহানের রব। আমাদের প্রিয় নবীকে সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরণ করা হয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে সমগ্র বিশ্বজাহানই হলো ইসলামের। সমগ্র দুনিয়াই ইসলামের। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন,
“এখন কি এরা আল্লাহর আনুগত্যের পথ (আল্লাহর দীন) ত্যাগ করে অন্য কোন পথের সন্ধান করছে? অথচ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছুই স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আল্লাহর হুকুমের কাছে সমর্পণ করেছে।”
এই সমর্পণকে আমরা কেবলমাত্র দুইভাগে ভাগ করতে পারি। একটা হল স্বেচ্ছায় সমর্পণ আর অপরটি হলো অনিচ্ছায় সমর্পণ। আয়াতের শাব্দিক অর্থ করলে আমরা দেখতে পাই, সমগ্র মহাবিশ্বই মুসলমান। সমগ্র মহাবিশ্বই ইসলামের। ইসলামকে কেবলমাত্র ছোট একটি ভৌগোলিক অঞ্চলের মধ্যে, ছোট্ট একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ করে রাখা এবং শুধুমাত্র সে অঞ্চলকে মুসলিম বিশ্ব বলে আখ্যায়িত করা সম্ভব নয়। প্রসিদ্ধ ভুল হিসেবেও যদি আমরা কোন একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের জন্য, কোন এক ভৌগোলিক অঞ্চলের জন্যও যদি ব্যবহার করি তাহলে আমরা মুসলিম বিশ্ব বলতে কোন অঞ্চলটিকে বুঝাচ্ছি?
হিজাজ অঞ্চলকে কি বুঝাচ্ছি?
নাকি বিলাদি শাম (শাম অঞ্চল) বা বিলাদি ইরাক (ইরাক অঞ্চল) কে বুঝাচ্ছি?
শুধু কি মধ্যপ্রাচ্যই ইসলামী বিশ্ব?
ঙওঈ’র ৫৭টি সদস্যরাষ্ট্র রয়েছে। শুধু কি এই ৫৭টি রাষ্ট্র ইসলামী বিশ্ব?
ল্যাটিন অ্যামেরিকাতে বসবাসকারী ৭০ লক্ষ মুসলমানকে আমরা কোথায় রাখব?
রাশিয়াতে বসবাসকারী ৫ কোটি মুসলমানকে আমরা কোথায় রাখব?
চীনে ও চীনের উইঘুর অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলমানদেরকে কোন বিশ্বের সাথে সম্পৃক্ত করব?
কেবল মাত্র উইঘুর মুসলমানগণ যে ভূমিতে বসবাস করেন, তার পরিমাণ পাঁচটি ফ্রান্সের সমান! তাদেরকে আমরা কোথায় রাখব? তা ছাড়া হাইতি থেকে ডমিনিক প্রজাতন্ত্র পর্যন্ত, কিউবা থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত, ভিয়েতনাম থেকে জাপান পর্যন্ত, দুনিয়ার সকল প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এবং অন্তরে ইসলামের আলোকে সম্মানের সাথে ধারণকারী মু’মিন ভাইদেরকে কি আমরা ইসলামী বিশ্বের বাহিরে বলে বিবেচনা করব? আসলে মুসলিম বিশ্ব কোথায়?

বর্তমান সময়ে চারটি পরিভাষাকে এক সাথে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।
১. মুসলিম দেশসমূহ, ২. ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ, ৩. ইসলামী অঞ্চল,
৪. মুসলিম বিশ্ব
এই প্রতিটি পরিভাষাতেই সমস্যা রয়েছে। যে সকল রাষ্ট্র ইসলামী আইন ও কানুন অনুসারে পরিচালিত হয় সে সকল রাষ্ট্রকে কেউ কেউ ইসলামী রাষ্ট্র বলে থাকেন। শুধুমাত্র সংবিধানে লেখাটাই কি যথেষ্ট? আমি মনে করি- মুসলিম দেশ, মুসলিম অঞ্চল, মুসলিম বিশ্ব এই শব্দসমূহ মহাগ্রন্থ আল কোরআন আমাদের মুসলমানদের জন্য যে সীমারেখা অঙ্কন করে দিয়েছে তার সাথে যথাযথভাবে খাপ খায় না। যে পরিভাষাটি আমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করে তা হলো ‘মুসলিম উম্মাহ’। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন,
“তোমাদের এ উম্মত আসলে একই উম্মত? আর আমি তোমাদের রব? কাজেই তোমরা আমার ইবাদত করো।”
মহান আল্লাহ অন্য একটি আয়াতে বলেন,
“আর তোমাদের এ উম্মত হচ্ছে একই উম্মত এবং আমি তোমাদের রব, কাজেই আমাকেই তোমরা ভয় করো।”
আরবিতে ‘উম্মাতুন’ শব্দটি ‘উম্ম’ শব্দের সাথে একই উৎস (মাসদার) থেকে উদগত। উম্মুন অর্থ হলো ‘মা’। আমরা একই মায়ের সন্তান। উম্মাহ হওয়ার অর্থ হলো, একই মায়ের সন্তান হওয়া। রক্ত এবং দুধের সম্পর্কের ভাইয়ের চেয়ে ‘ইসলামী ভ্রাতৃত্ব’ কে উপরে স্থান দেয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই উম্মাহকে একই সাথে ‘কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ’ হওয়ার দায়িত্বও প্রদান করেছেন। কোরআনের পরিভাষায় ইস্তিখলাফের দায়িত্ব দিয়েছে।
‘কেন্দ্রীয় উম্মাহ’ হওয়ার অর্থ হলো দুনিয়ার গতিপথকে নিয়ন্ত্রণকারী উম্মাহ হওয়া। একপাশে ও কিনারায় দাঁড়িয়ে দুনিয়ার ঘটনা-প্রবাহসমূহের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকার নাম কেন্দ্রীয় উম্মাহ নয়।
কেন্দ্রীয় উম্মাহ হলো,
“ওয়া কাযালিকা জা‘আলনাকুম উম্মাতাও ওয়াসাতা”
এখানে ব্যবহৃত ওয়াসাত শব্দটিকে ‘মধ্যপন্থা’ বলে অনুবাদ করতে পারি না। ওয়াসাত হলো জগতের অক্ষ, বিশ্ব জাহানের কেন্দ্র, এমন একটি উম্মাহ যাদের চতুর্দিকে বিশ্বমানবতা ঘূর্ণায়মান হবে, অর্থাৎ আদিল (ন্যায়পরায়ণ একটি উম্মাহ)। মুসলিম উম্মাহ এমন উম্মাহ, যে উম্মাহ আদালতকে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করে রাখবে। এই আয়াতের ‘ওয়াসাত’ কালিমার ওপর ভিত্তি করে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে “মারকাজুল ওয়াসাতিয়্যা সমূহ’’ প্রতিষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়েছে। বিভিন্ন চরমপন্থীদের মোকাবেলার নামে ‘লিবারেল ইসলাম সেন্টার’ নামক বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে এই আয়াতের ওপর ভিত্তি করে।
অথচ আয়াতের পরবর্তী অংশে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ‘ওয়াসাত’ শব্দের উদ্দেশ্য (মাকসাদ) কি সেটা আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন।
“উম্মাতাও ওয়াসাতাল লিতাকুনু শুহাদায়া আলান নাস”
ইসলামের আদালতকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করে সমগ্র মানবতার কাছে সাক্ষ্যদাতা হওয়ার জন্য। শহীদ এবং শাহীদ একই সাথে উদাহরণ অর্থেও ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
এই আয়াতের শব্দটি এবং পূর্ববর্তী আয়াতের শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সমগ্র পৃথিবীতে আদালত (ন্যায়বিচার) প্রতিষ্ঠার জন্য, নিজেদের জীবনে আদালতকে বাস্তবায়ন করে আদালতের প্রতীক হয়ে সমগ্র মানবতার সামনে নিজেদেরকে উপস্থাপন করবে এই উম্মাহ। এভাবে তারা খিলাফাত এবং ইসতিখলাফের দায়িত্ব পালন করবে এবং এভাবেই তারা কেন্দ্রীয় একটি উম্মাহ হবে। এর পাশাপাশি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই উম্মাহকে অন্য একটি দায়িত্ব দিয়ে বলেন;
“এখন তোমরাই দুনিয়ায় সর্বোত্তম দল? তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের হিদায়াত ও সংস্কার সাধনের জন্য? তোমরা নেকির হুকুম দিয়ে থাকো, দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখো।”
এই আয়াতের অর্থ এটা নয় যে, তোমরা নিজেরা ঘরের মধ্যে বসে থেকে অন্যকে ভালো কাজের আদেশ দিবে। ‘তা’মুরুনা বিল মা’রূফ-এ আমর শব্দটি ক্রিয়াবাচক অর্থে, যা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ হলো, তোমরা মারুফের আলোকে জীবন যাপন করবে। “ওয়ামা উমিরু ফিরআওনা বিরশাদ” এই আয়াতে আমর শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয় উপরোক্ত আয়াতে আমর শব্দটিও একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। “ওয়ামা উমিরু ফিরআওনা বিরশাদ” এই আয়াতে আমর শব্দটি আচরণ, কর্ম, এই সকল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
“তোমরা অন্যদের সৎকর্মশীলতার পথ অবলম্বন করতে বলো কিন্তু নিজেদের কথা ভুলে যাও।”
এ সকল আয়াতের মূল কথা হলো- তোমরা নিজেদের জীবনে মারুফকে বাস্তবায়ন করবে আর পৃথিবী থেকে অন্যায়, অত্যাচার, অবিচার নির্মূল করবে ও দূর করার চেষ্টা করবে।

প্রিয় ভাইয়েরা,
এ জন্য আমরা যখন মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই, মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের কোথাও মুসলিম বিশ্ব, ইসলামী বিশ্ব, ইসলামী রাষ্ট্র, ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ এই সকল শব্দ ব্যবহার করেনি। এই সকল শব্দের পরিবর্তে মহাগ্রন্থ আল-কোরআন আমাদেরকে মুসলিম উম্মাহ বলে সম্বোধন করেছে। এসকল দিকের বিবেচনায় ফিকাহশাস্ত্রের ‘দারুল ইসলাম’ শব্দের ক্ষেত্রে আমি নিজে একজন হানাফি মাজহাবের অনুসারী হওয়ার পরও ইমাম শাফেয়ির ইজতিহাদকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। তার মতে-“একটি জমিনে বা একটি ভূখণ্ডে ইসলামী অনুশাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে কিয়ামত পর্যন্ত সেই অঞ্চল দারুল ইসলাম।” তাই আমি মনে করি আন্দালুসিয়া এখনো দারুল ইসলাম হিসেবেই আমাদের অন্তরে স্থান দখল করে আছে। সকল মুসলমান যেন কিয়ামত পর্যন্ত এই চিন্তা ও চেতনার আলোকে নিজেদেরকে গড়ে তুলে। কোরআন আমাদের জন্য যে পরিভাষাটি ব্যবহার করেছে বা নির্বাচন করেছে তা হলো ‘মুসলিম উম্মাহ’। আজকের ভূগোলবিদরা, স্ট্র্যাটেজিস্টরা পশ্চিমে মরক্কো, মৌরতানিয়া সেনেগাল থেকে শুরু হয়ে পূর্বে চীন-তুর্কিস্তান সীমান্ত পর্যন্ত অঞ্চলকে মুসলিম বিশ্ব বলে আখ্যায়িত করে থাকে। এর মধ্যে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশসমূহ রয়েছে। যদি আমরা কেবলমাত্র এই অঞ্চলকেই মুসলিম বিশ্ব হিসেবে মনে করে থাকি তাহলে আমাদেরকে এই কথাটি বলতে হবে যে, এই অঞ্চলেই সর্বপ্রথম মানুষ বিশ্বের বুকে পা রেখে তার অস্তিত্বের জানান দেয়। অর্থাৎ পৃথিবীতে মানুষের বংশধারা এখান থেকেই শুরু হয়েছে। হযরত আদম (আ) থেকে শুরু করে মুহাম্মাদ (সা) সকল নবী-রাসূলগণ মহান আল্লাহর বাণী নিয়ে সর্বপ্রথম এই অঞ্চলেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। সকল বড় বড় সভ্যতার জন্ম এই অঞ্চলেই হয়েছে। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার সবচেয়ে বড় বড় নিয়মতসমূহও এই অঞ্চলে দান করেছেন। এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক সম্পদ মজুদ রয়েছে। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক রাস্তাসমূহও এই অঞ্চল দিয়েই বিশ্বের বুকে ছড়িয়ে পড়েছিল। এ অঞ্চলটি হলো সমগ্র দুনিয়ার কালব বা অন্তর। এ অঞ্চল না হলে দুনিয়া তার জীবনপ্রবাহকে অব্যাহত রাখতে পারবে না। তাদের কাছ থেকে ধার নিয়ে বলতেছি, এই দুনিয়াই (অঞ্চলটিই) যদি কেবলমাত্র মুসলিম বিশ্ব হয়, তাহলে এই অঞ্চল হল সমগ্র বড় বড় সভ্যতার উৎসমূল। এত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হওয়ার কারণে কিয়ামত পর্যন্ত এই অঞ্চলের ওপর সকলের সতর্ক দৃষ্টি থাকবে। যদি মুসলমানগণ ঐক্যবদ্ধ না হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিদের খেলার পুতুল হওয়া থেকে নিজেদেরকে মুক্ত করতে না পারে, এই অঞ্চলকে যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির শক্তি প্রদর্শনের অসুস্থ খেলা থেকে বের করে না আনতে পারে, তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত এই অঞ্চলে দ্বন্দ্ব সংঘাত লেগেই থাকবে।
এই অঞ্চলে আজ রক্তাক্ত ভূমিসমূহ রয়েছে। আবার কোন ক্রমে একটু হলেই ব্যান্ডেজ করে হাসপাতালের বেডে শুইয়ে রাখা রয়েছে এমন অঞ্চলসমূহও রয়েছে। ইয়েমেন আজ রক্ত-গঙ্গায় ভাসছে, সিরিয়াতে রক্তপাত এখনো বন্ধ হয়নি, ইরাক তার যখমকে এখনো শুকাতে সক্ষম হয়নি, লিবিয়াতে গৃহযুদ্ধ এখনো বিদ্যমান, মিসর আপাতদৃষ্টিতে তার কিছু যখম শুকাতে সক্ষম হয়েছে, এক কথায় বলতে গেলে পাশ্চাত্যের পরিভাষায় মুসলিম অঞ্চল এখনো বড় বড় সংকটে নিমজ্জিত।
উত্তর দিকে মালাবি-মোজাম্বিক, দক্ষিণে আলবেনিয়া, কাজাকিস্তান, ওজবেকিস্তান এসকল অঞ্চলসহ বিশেষ করে শেষ শতাব্দীতে এই অঞ্চলসমূহ থেকে অন্যান্য অঞ্চলসমূহে অনেক মানুষ অভিবাসিত হয়েছে। এই অঞ্চল থেকে (মুসলিম বিশ্ব নামক এই অঞ্চল থেকে) অনেক মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন প্র্রান্তে অভিবাসিত হয়েছে। যুদ্ধ, দরিদ্রতা এবং শিক্ষা গ্রহণের জন্য অনেক মানুষ এই অঞ্চল থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে অভিবাসিত হয়েছে। শুধুমাত্র নিজেদের বাসভূমি থেকে নির্বাসিত হয়ে অনেক মানুষ বিভিন্ন দেশে বসবাস করা শুরু করেছে। ফিলিস্তিনিগণ, বসনিয়াবাসীগণ, চেচেনিয়াবাসীগণ, ক্রাইমিয়ান তাতারগণ, আহস্কি তারকিশগণ এবং আফ্রিকা থেকে বিশেষ করে পৃথিবীর সকল প্রান্তে শোষিত মুহাজির নামক একটি বড় জনগোষ্ঠী গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সের শোষণের পরে আলজেরিয়া এবং মরক্কো থেকে বিশাল এক জনগোষ্ঠী ফ্রান্সে অভিবাসিত হয়েছে, হিন্দুস্তান এবং পাকিস্তান থেকে ইংল্যান্ড অভিমুখী অভিবাসিত এক বিশাল জনগোষ্ঠী, ইন্দোনেশিয়া থেকে হল্যান্ড অভিমুখী অভিবাসীগণ, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইউরোপ অভিমুখে যাত্রাকারী জনগোষ্ঠী বিভিন্ন মুসলিম দেশ এবং অঞ্চল থেকে অ্যামেরিকা, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া অভিমুখে যাত্রাকারী অভিবাসীগণকেও সামনে রেখে এই সকল পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

প্রিয় ভাইয়েরা,
আমি আমার সরকারি দায়িত্ব পালনকালে সমগ্র পথিবীতে বসবাসকারী সমগ্র মুসলিম উম্মাহ সম্পর্কে আপনাদের সামনে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আমি যে সকল মানুষকে একদম কাছ থেকে দেখেছি এবং কাছ থেকে চিনেছি তাদের সম্পর্কে কিছু কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরব।
আমি ৯টি পয়েন্টে সমগ্র পৃথিবীতে বসবাসকারী মুসলমানদের সম্পর্কে আপনাদেরকে সংক্ষিপ্তভাবে অবগত করার চেষ্টা করব। এই বিষয়টি অনেক বড় হওয়ার দরুন অতি সংক্ষিপ্তভাবে সারা পৃথিবীতে বসবাসকারী আপনাদের মুসলিম ভাইদের সম্পর্কে ৯টি পয়েন্টে আপনাদের সামনে মুসলিম উম্মাহর অবস্থানকে তুলে ধরার চেষ্টা করব যেন তা আপনাদের মাথায় এবং অন্তরে একটি চিত্র অঙ্কিত করে দেয়।
এক. রাশিয়া, মধ্য এশিয়া, ককেশিয়া এবং বাল্টিক প্র্রজাতান্ত্রিক দেশসমূহে বসবাসকারী মুসলমানগণ সম্পর্কে।
সরকারি হিসাব মতে রাশিয়াতে প্রায় ৩০ মিলিয়িন (৩ কোটি) মুসলমান রয়েছে। বেসরকারি হিসাব মতে সেখানে মুসলমানদের সংখ্যা আরও অনেক বেশি (কারও মতে ৫ কোটি)। অতীতের পুরাতন ছোট ছোট রিপাবলিকান দেশসমূহ রয়েছে। যদিও অর্থের দিক থেকে অনেক বড়। তাতারিস্তান কাজান যেটার রাজধানী, চুবাশিস্তান, বাশ কুর্দিস্তান শুধুমাত্র কয়েকটি। আসলে এই অঞ্চলসমূহে ইসলামের প্রচার ও প্রসার এক প্রকারের মুজিযা।
প্রিয় ভাইয়েরা, এই উপলক্ষকে কেদ্র করে আপনাদের একজন ভাই হিসেবে, খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি উপদেশ দিতে চাই। যদিও আপনাদেরকে উপদেশ দেয়ার ক্ষমতা আমার নেই। রাসূলে আকরাম (সা) এরপরে বিশেষ করে মক্কা এবং মদিনায় ইসলাম একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার পর সমগ্র পৃথিবীতে ইসলাম কিভাবে ছড়িয়ে পড়ল এই সম্পর্কে আমাদের সন্তানদেরকে জানানো এবং আমাদের নিজেদের খুব ভালোভাবে জানা উচিত। এটি জ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ইনতিশারি ইসলাম (ইসলাম প্রচারের ইতিহাস) ওরিয়েন্টালিস্টরা লিখেছে, আমরা এখনো লিখতে পারি নাই। প্রতিটি অঞ্চলে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ইসলামের এক একটি মুজিযা। চীনের পেকিন শহরের একটি মসজিদে আমার খুতবা দেয়ার সুযোগ হয়েছিল সে মসজিদটি আজ থেকে ১১০০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। আমি এটা দেখে আশ্চর্যান্বিত হলে সেখানে অবস্থানরত মুসলমানগণ আমাকে বলেন যে, চীনের অন্য একটি অঞ্চলে ১৩০০ বছরের প্রাচীন মসজিদ রয়েছে।
এই কাজান অঞ্চলে আমরা যে অঞ্চলকে তাতারিস্তান নামে অভিহিত করে থাকি, এই ইদিল-ভলগা নদীর পাদদেশে প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম ইসলামী রাষ্ট্রের নাম হলো ‘বুলগার ইসলামী রাষ্ট্র’। এই রাষ্ট্রটি ১১৪০ বছর পূর্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১১৪০ বছর পূর্বে সেখানে শানশৌকতে পূর্ণ একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরে কাজান হানলি, ওরদু রাষ্ট্রসহ আরও অনেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তাদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা সম্পর্কে আমাদের গবেষণা করা প্রয়োজন। আফ্রিকাতে ইসলাম কিভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে? একটু পরে ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে আলোচনা করব। ইন্দোনেশিয়াকে আমরা বাহিরে ফেলে রেখে দিয়েছি। কারণ পাশ্চাত্যের ভূগোলবিদদের নামাঙ্কিত মুসলিম বিশ্বের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিকের অঞ্চলসমূহ একটুও স্থান পায়নি। অথচ ২৫০ মিলিয়ন মুসলমান নিয়ে ইন্দোনেশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মুসলিম রাষ্ট্র। ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়াসহ এদের আশপাশে ২৬টির বেশি দ্বীপ-উপদ্বীপ রয়েছে। এই সকল দ্বীপের প্রত্যেকটিতেই মুসলমানগণ রয়েছে।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply