মুসলিম দেশে সরকারের অমুসলিমসুলভ আচরণ!

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

সাধারণত ইসলামকে পুঁজি করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যায়। মুখে কলেমা, হাতে তাসবিহ, ইসলামের প্রতিনিধিত্বের ফুলঝুরি, আরো কত কীর্তিকর্ম! শুধু আলেম-ওলামারা ইসলামের কথা বললেই ধর্ম ব্যবসায়! আমাদের সরকারপ্রধান ইসলামী জলসা ও আলেম-ওলামাদের মিটিং-সিটিংয়ে দ্বীনের জন্য তার পিতা মরহুম শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার কথা বলেন। নিজেও দ্বীনের জন্য ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখছেন বলে দাবি করেন। কিন্তু সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস উঠিয়ে দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রতিস্থাপন করলেন। সরকারিভাবে ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত আলেমদের অনুষ্ঠানে ব্যালে ড্যান্স পরিবেশন করা হয়। এতে আলেম-ওলামারা এই অনৈসলামিক কার্যকলাপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানালেন এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি শামীম আফজালের অপসারণ দাবি করলেন। সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস উঠিয়ে দেয়া, নারীর তথাকথিত ক্ষমতায়ন, পর্দার উপর শর্তারোপ এবং ইফা ডিজি শামীম আফজালের অপসারণের দাবিতে সকল আলেম মাঠে নামেন।
আলেমদের আন্দোলন থামানোর জন্য সে সময় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামকে দিয়ে সরকারের তরফ থেকে আশ্বস্ত করা হয় যে সরকার বিষয়টি দ্রুত সুরাহা করবে। কিন্তু সরকার এর কোন ধরনের সমাধান না করলে আলেমরা আশ্বস্ত বিষয়ে পুনরায় দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সরকারের পক্ষ থেকে উল্লিখিত বিষয়ে আলেমদের সাথে কোনো প্রকার আশ্বস্তির কথা বলা হয়নি বলে বক্তব্য পাওয়া যায়। এতে সরকারের আচরণে আলেমরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তারা ছোট ছোট ইসলামী দলগুলো নিয়ে ইসলামী ও সমমনা ১২ দল গঠন করেন। এতে এ দেশের আলেমরা এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সারা দেশে কমিটি গঠন করে তোলেন, যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন সর্বজন শ্রদ্বেয় আলেমে দ্বীন, মুসলমানদের জনপ্রিয় পত্রিকা মাসিক মদীনার সম্পাদক মাওলানা মুহিউদ্দীন খান।
সম্প্রতি ইসলামী ও সমমনা ১২ দল রাসূল (সা)কে ব্যঙ্গ করে আমেরিকাতে নাকুলা বাসিলে কর্তৃক ‘ইননোসেন্স অব মুসলিমস’ ফিল্ম তৈরির প্রতিবাদে এবং সংবিধানে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস প্রতিস্থাপনের দাবিতে মহাসমাবেশের ডাক দেয়। অনেক ধরনা দিয়েও সরকারের পক্ষ থেকে সমাবেশের কোনো প্রকার অনুমতি মিলেনি। যেসব স্থানে সমাবেশ করার অনুমতি চাওয়া হয়েছে উল্টো সেসব স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। প্রশাসনের কাছে বারবার অনুমতি প্রার্থনা করলেও অনুমতি মিলেনি। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে ‘ইননোসেন্স অব মুসলিমস’ ফিল্মের ব্যাপারে সরকারের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ জানানো হয়েছে এবং ণড়ঁঃঁনব-এর সম্প্রচার বন্ধ করা হয়েছে।
আলেমসমাজের পক্ষ থেকে এখন প্রশ্ন উঠেছে সরকার লোক দেখানো প্রতিবাদ করেছে। যদি সত্যিকার প্রতিবাদ করত, তাহলে কেন আলেমদের আহূত মহাসমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি? আলেমরা অনুমতি না পেয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সর্বশেষ সম্বল হিসেবে ২২ সেপ্টেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঘোষণা করেন। হরতালের সমর্থনে মিছিল বের করার চেষ্টা করলে শুরু হয় বেধড়ক লাঠিপেটা। আহত হয় শতাধিক। প্রেস ক্লাব থেকে বের হওয়ার পথে হাফেজ্জী হুজুরের ছেলে বয়োবৃদ্ধ আলেমে দ্বীন অধ্যক্ষ মাওলানা আহমাদুল্লাহ আশরাফ (৭৩), ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী (৬৫)সহ আগত ইসলামপ্রেমিক অনেকেই গ্রেফতার হন। হরতালের দিন সারা দেশ থেকে দুই শতাধিক ইসলামপ্রিয় জনতাকে গ্রেফতার করা হয়। এর মধ্যে মীরহাজিরবাগের তা’মীরুল মিল্লাত মাদরাসার ৩৫ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যার অধিকাংশ ছাত্রই নাবালক।
এই বিক্ষোভ ও হরতালের পেছনে বিরোধী দলের ভূমিকা আছে বলে দাবি করেন নবনিযুক্ত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ম খা আলমগীর। আর স্বররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বরাবরের মতো বললেনÑ যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য এই হরতাল। অবশ্য পুলিশ এর পেছনে জামায়াত-শিবিরের ইন্ধন আছে বলে দাবি করে।
সরকার এখন আমেরিকার পলিসি নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে এই বিতর্কিত ফিল্ম বন্ধ করার আহবান জানালে তিনি বলেনÑ এই ফিল্ম বন্ধ করা হলে অপরের মত প্রকাশের উপর হস্তক্ষেপ করা হবে। অথচ এই ফিল্মের অভিনেত্রী ভিন্নভাবে ডাবিং করে মুসলমানদের নবী মুহাম্মদ (সা)কে অসম্মান করেছে বলে অভিযোগ করে ফিল্ম পরিচালকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন। মুসলমানদের কলিজায় আঘাত করে কোন ধরনের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা!
মুসলমানেরা উত্তেজিত হয়ে লিবিয়ার বেনগাজিতে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতসহ তিনজনকে হত্যা করে। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত নিহত হওয়ার পর বেনগাজিতে আমেরিকার সৈন্য প্রেরণ শুরু হয়েছে। এসব কিসের লক্ষণ! গুগল কর্তৃপক্ষকে এই ছবি সরানোর জন্য বলা হলেও তারা তা সরাবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। এ সবই সিরিজ পরিকল্পনার অংশ, ইহুদিদের চক্রান্ত। এই ফিল্ম প্রকাশের পর যখন বিশ্ব মুসলমানেরা ফুঁসে উঠেছে ঠিক তখন ফ্রান্সের একটি দৈনিক রাসূল (সা)কে মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে কার্টুন ছাপায়। মূলত এসব সাম্রাজ্যবাদের নয়া পরিকল্পনা।
আমাদের দেশেও এসবের প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। তাই তাসলিমা নাসরীনের মতো তথাকথিত প্রগতিবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে দ্বীন ইসলাম নিয়ে কটাক্ষ করার দুঃসাহস পায়। এখানে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কায়েমের চক্রান্ত চলছে। হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরা অনায়াসে তাদের ধর্ম পালন করে। সমস্যা শুধু মুসলমানদের অনুষ্ঠানাদি পালনে। এখানে ইসলামী মাহফিলগুলোতে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। মুসলিম দেশের সরকার হয়েও ইসলামের ভেতর জঙ্গিপনা খুঁজে পায়। সরকারকে এহেন নীতি থেকে ফিরে আসা উচিত। মুসলমানদেরকে দলন পীড়ন থেকে সরকারকে ফিরে আসতেই হবে। অন্যায়ভাবে গ্রেফতারকৃত সকল মুসলমানকে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে। ইসলামবিরোধী সকল কার্যক্রমকে শক্ত হাতে দমন করতে হবে। মুসলিম দেশে অমুসলিম নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামের ভেতরেই প্রকৃত শান্তি ও নিরাপত্তা।

লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
zabbarics@gmail.com

SHARE

Leave a Reply