মুহাম্মদ মুরসি : ইতিহাসের মহানায়ক -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় অনন্য নাম মুহাম্মদ মুরসি। মিশরের প্রথম গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি তিনি। রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি ভবন থেকেই কারাবরণ করেছেন। একাকী সেলে বন্দী থেকে প্রতারক বিচারকদের সামনেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও মাথা নত করেননি। পৃথিবীর মানুষের কাছে সততার নজির পেশ করে গেছেন। ড. মুরসির জীবনচিত্রকে কবি ফররুখ আহমদের ভাষায় বলা যায় ‘জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদি রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী।’ জন্ম থেকে শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের উদ্দীপ্ত সময়ের প্রতিটি বাঁকে তিনি একজন খাঁটি মুসলিম হিসেবে ইকামতে দ্বীনের দায়িত্ব পালন করে গেছেন। মিথ্যার মায়াজাল কখনোই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত না করে জীবন বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তাইতো তিনি মৃত্যুবরণ করেও বিশ্বের মুসলমানদের কাছে ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে সমাদৃত।

জীবন ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত কথা
প্রকৃত নাম মুহাম্মদ মুরসি ইসা আইয়াত। জন্ম ১৯৫১ সালের ৮ আগস্ট। উত্তর মিশরের শারকিয়া জেলার আদওয়া গ্রামেই হিফজসহ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তিনি। মিশরের কায়রো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭৫ সালে প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ও ১৯৭৮ সালে একই বিষয়ে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। এ বছরই তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। ১৯৮২ সালে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রকৌশল বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। একাডেমিক লেখাপড়া শেষ করেই তিনি কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮২ সালে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৫ সালে শারকিয়া প্রদেশের যাকাযিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার উদ্দেশ্যে ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপনার চাকরি ছেড়ে মিশরে চলে আসেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই তিনি ২০১০ পর্যন্ত অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া লিবিয়ান ফাতেহ বিশ্ববিদ্যালয়েও তিনি অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

ছাত্রজীবন থেকেই মুহাম্মদ মুরসি ইসলামি আদর্শের রাজনীতির সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। ১৯৭৭ সালে ইখওয়ানুল মুসলিমিনে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে ইখওয়ান রাজনৈতিক শাখা গঠন করলে তার সদস্য হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে সর্বোচ্চ কমিটির সদস্য হিসেবে নিযুক্ত হন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি সবসময় সামাজিক ও সেবামূলক কাজে জড়িত ছিলেন। ২০০০ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং ২০০৫ সাল পর্যন্ত মিশরের সংসদে বহাল ছিলেন। এ সময়ে তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। সংসদীয় মেয়াদে তিনি তাঁর ধারার নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। এ সময় বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হন। ২০০৬ সালে বিচারক নিয়োগে অনিয়মের প্রতিবাদে ডাকা বিক্ষোভ থেকে তাঁকে আটক করা হয় এবং প্রায় সাত মাসের মতো তিনি বন্দী ছিলেন। ২০১১ সালের ২৮ জানুয়ারি ইখওয়ানের ২৪ জন নেতা গ্রেফতার হন। মুহাম্মদ মুরসি ছিলেন তাদের অন্যতম। দুই দিন পর তিনি কায়রোয় জেল থেকে পালিয়ে যান। ২০১১ সালে মুসলিম ব্রাদারহুড ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস পার্টি (এফজেপি) নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করলে মুরসি তার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। মূলত দলীয় উপনেতা ও রাজনৈতিক প্রধান খাইরাত এল-শাতেরই ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের মূল রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী। মুরসি ছিলেন মনোনয়নে দ্বিতীয় ব্যক্তি। প্রচারণা শুরুর আগেই আদালত থেকে শাতের-সহ একাধিক প্রার্থীকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করলে ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখার পক্ষ থেকে প্রার্থী হিসেবে মুহাম্মদ মুরসির নাম উঠে আসে। পরে ইখওয়ানের রাজনৈতিক শাখা ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিজ পার্টি মুরসিকে তাদের প্রার্থী হিসেবে চূড়ান্ত করে। ২০১২ সালের মে ও জুন মাসে মিশরের দুইপর্বের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে মুরসি এফজেপির মনোনীত প্রার্থী ছিলেন এবং উভয় পর্বেই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। কমিশন কর্তৃক প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী মুরসি ৫১.৭ শতাংশ এবং আহমেদ শফিক ৪৮.৩ শতাংশ ভোট লাভ করেন। নির্বাচন কমিশন এই ফলাফল ঘোষণা করার পর মুহূর্তেই মুসলিম ব্রাদারহুড ও এফজেপি আনুষ্ঠানিকভাবে মুহাম্মদ মুরসিকে তাদের সকল সাংগঠনিক পদ থেকে অব্যাহতি দেয় এবং তাকে ‘মিশরের সর্বস্তরের মানুষের রাষ্ট্রপতি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

মুহাম্মদ মুরসি তার বিজয় ভাষণে বলেন, সরকার পরিবর্তন হচ্ছে। আমি আশা করি জনগণ আমাকে ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের ইসলামি প্রার্থী হিসাবে বেছে নেবেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় সিস্টেমটি স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হবে। তিনি মিশরের বর্তমান আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন, প্রত্যক্ষ ভাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলবেন এবং ভূ-রাজনীতিকভাবে ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগী হবেন। তিনি সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ও বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্য বিশ্ববাসীকে আহ্বান করেন। ধারণা করা হয়, মূলত ইসরাইল বিষয়ে মিশরের বৈদেশিক নীতির কোন আমূল পরিবর্তন হবে না, ব্রাদারহুডের সাথে মিশরের সশস্ত্র বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এমন বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই মুরসির মাধ্যমে তাদের হাতে মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতার হস্তান্তর সম্ভব হয়েছে।

মুরসির ক্ষমতাগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি
মিশরে আরব বসন্তের উদ্দেশ্য ছিলো দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা রুশব্লকের শাসক হোসনি মুবারককে সরিয়ে নতুন কাউকে ক্ষমতায় আনা। এক্ষেত্রে কাজ করে ইখওয়ানুল মুসলিমিন বা মুসলিম ব্রাদার হুড এবং তাদের সমর্থন দেয় মার্কিন ডেমোক্র্যাট ব্লক। যেহেতু রুশপন্থী শাসকের বিরুদ্ধে তাই রিপাবলিকান ব্লকের সদস্যরাও তাতে বাধা দেয়নি। ২০১১ তে আরব বসন্তের মাধ্যমে হোসনি মুবারক ক্ষমতা থেকে নেমে যায় এবং ২০১২ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম ব্রাদারহুডের মুহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসেন। ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন ড. মুহাম্মদ মুরসি। সেটাই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মুরসি ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সহযোগী মার্কিন ডেমোক্র্যাট ব্লকের ‘ইসরাইল সংক্রান্ত’ পলিসির বিরুদ্ধে কাজ করতে থাকেন। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে যায় এবং ডেমো-রিপাবলিক এক হয়ে তাকে ক্ষমতা থেকে নামানোর জন্য উঠে পড়ে লাগে।

মুরসির পতনে ডেমোক্র্যাট ব্লকরা ‘ইসরাইল সংক্রান্ত’ পলিসিকে কাজে লাগায়। এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় যে, ইসরাইল-ফিলিস্তিন নিয়ে তিন ধরনের পলিসি চোখে পড়ে। প্রথমত, টু স্টেট সলুশন- অর্থাৎ ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার পক্ষে প্রচারণা চালানো। এটা মূলত ডেমোক্র্যাট ব্লকের পলিসি। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ শাসক, জনগণ, জাতিসংঘ ডেমোক্র্যাটদের এই পলিসির পক্ষে। দ্বিতীয়ত, পুরো এলাকা ইসরাইলের হবে। ফিলিস্তিনিদের তাড়িয়ে দেয়া হবে। এটা মূলত রিপাবলিকান ব্লকের পলিসি। যদিও এটা মার্কিন রিপাবলিকান ব্লকের শাসকরা সরাসরি এ কথা বলে না, কিন্তু তাদের আচার আচরণে সে বক্তব্য ফুটে উঠে। তৃতীয়ত, ইসরাইল যেহেতু মুসলমানদের জমি দখল করে তৈরি করা, তাই পুরো এলাকার মালিক মুসলমানরা। এখানে কথিত স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের নাম দিয়ে বড় এলাকা ইহুদিদের এবং ছোট এলাকা মুসলমানদের দেয়া হচ্ছে। এটা মেনে নেয়া যায় না। মুসলমানদের জমির পুরো মালিকানা মুসলমানদের ফিরিয়ে দিতে হবে। এটা মূলত ইসলামপন্থীদের বক্তব্য ও দাবি।

২০১২ সালে মুরসি ক্ষমতায় আসার পর ইসরাইলিরা অভিযোগ করতে থাকে, মুরসি হচ্ছে হাসানুল বান্নাহর হুবুহু অনুসারী। হাসানুল বান্না যেমন ছিলেন ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরোধী, ঠিক তেমনি মুরসিও হলো ইসরাইলের অস্তিত্বের বিরোধী। এমনকি যে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন নিয়ে সে সে ক্ষমতায় এসেছে, সেই ডেমোক্র্যাট ব্লকের টু-স্টেট সলুশনেরও ঘোর বিরোধী হলো মুরসি। তার কাছে টু স্টেট সলুশন হলো একটা ধোঁকাবাজি ছাড়া কিছু নয়। এর প্রমাণ হিসেবে ২০১০ সালে মুরসির কিছু ভিডিও প্রকাশ করা হয়। যেখানে মুরসির ইহুদি ও ইসরাইল এবং টু-স্টেট সলুশনের বিরুদ্ধে শক্ত বক্তব্য পাওয়া যায়। ইসরাইল-ফিলিস্তিন বিষয়ে মুরসির অবস্থান পরিষ্কার। তিনি তার বক্তব্যে বলেছিলেন- ইসরাইল-ফিলস্তিন সমঝোতা কখন সম্ভব নয়। এটা সময় ও সুযোগের অপচয়। ইহুদিবাদীরা সময় অতিবাহিত করে এবং আরো সুযোগ নেয়। মুসলমানরা সময় ও সুযোগ হারায়, কিন্তু সেখান থেকে কিছুই পায় না। তাদের স্বপ্ন দেখানো আসলে একটা ধোঁকা। এখনও অনেক ফিলিস্তিনি ভাবে তারা তাদের শত্রু থেকে কিছু পাবে। প্যালেস্টাইন স্বশাসন কর্তৃপক্ষ (মাহমুদ আব্বাস) আমেরিকা ও ইহুদিবাদীদের তৈরি।

তারা ফিলিস্তিনিদের মূল লক্ষ্য ও স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করে। ইসরাইলি, ইহুদি ও ইহুদিবাদী হলো, যুদ্ধবাজ, বানর ও শূকরের বংশধর ও ক্রিমিনাল। স্বাধীন প্যালেস্টাইনের জন্য মিলিটারি যুদ্ধ করতে হবে। এছাড়া তাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও অর্থনৈতিক বয়কট করতে হবে। ইহুদি ও ইহুদিবাদীদের কোন প্রকার সুযোগ দেয়া যাবে না। ইহুদিদের মুসলমানদের ভূমি থেকে বিতাড়িত করতে হবে। ইহুদিবাদীদের প্যালেস্টাইনে কোনো ভূমি নেই। ফিলিস্তিনের ভূমি ফিলিস্তিনিদের, ইহুদিবাদীদের নয়। দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান (টু স্টেট সলুশন) বা শাস্তি প্রতিষ্ঠা ধোঁকা ছাড়া কিছু নয়। ইহুদিরা প্রকৃতগতভাবে শত্রুভাবাপন্ন, ইতিহাসেও তাই দেখা যায়। ইহুদিবাদীরা জবরদস্তি ছাড়া কোনো ভাষা জানে না। হে মুসলমান ভাইয়েরা, আমরা যেন কখন ভুলে না যাই, আমাদের সন্তান ও নাতিদের ইহুদি, ইহুদিবাদী ও তাদের সমর্থনকারীদের ঘৃণা করতে। তাদের অবশ্যই শিক্ষা দিতে হবে ওদের ঘৃণা করার জন্য। এবং এই শিক্ষা বংশ পরম্পরা চালাতে হবে।

ইসরাইলে সীমান্ত ঘেঁষে বিশাল রাষ্ট্র মিশরের প্রেসিডেন্ট যদি এত কঠিন ইসলামিস্ট ও ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্বের ঘোরবিরোধী হয়, তবে ইসরাইলের ধ্বংস হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তাই ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান ব্লক এক হয়ে তার পতন ঘটাতে উঠে পড়ে লাগে। দৃশ্যত্ব দেখা যায়, ডেমোক্র্যাটপন্থী মিডিয়া মুরসির বিরুদ্ধে কঠিন অপপ্রচার শুরু করে এবং তাদের অনুসারীদের মুরসির বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়ে দেয়। অপরদিকে রিপাবলিকান ব্লকের সেনাপ্রধান সিসি অস্ত্রের শক্তিতে মুরসিকে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ক্ষমতা দখল করে। এ ক্ষেত্রে আরব বিশ্বের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান ব্লক মেইনটেইন করা বিভিন্ন শাসকরাও মুরসির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, যার কারণে মুরসির পতন ত্বরান্বিত হয়।
মিডিয়াও মুরসির বিপক্ষে কাজ করেছে। মিশরীয় টেলিভিশন উপস্থাপক তাওফিক ওকাশা ২৭ মে তারিখে প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী টেলিভিশন বক্তব্যে মিশরে ইসলামপন্থীদের হাতে খ্রিষ্টানদের হত্যাকাণ্ডের বিষয় তুলে ধরেন। সত্যমিথ্য মিশ্রিত এ বক্তব্যে তিনি প্রশ্ন করেন, হত্যাকারীরা কিভাবে দেশ চালাবে। ওকাশা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য উপস্থাপন করে মুরসি ও তার রাজনৈতিক দলের সম্মানহানি করে। সেই প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালের ৩০ মে মুহাম্মদ মুরসি ওকাশার বিরুদ্ধে একটি মানহানি মামলা করেন। এতে বিরোধী সাংবাদিক মহলের আক্রোশ আরো বেড়ে যায়। তারাও মুরসির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ক্ষমতাচ্যুত মুরসি এবং ইতিহাসের নির্মমতা
এক বছর যেতে না যেতেই মুরসি সরকারের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুল ফাত্তাহ সিসি মুরসির বিরুদ্ধে অনাস্থা জানান এবং সাময়িকভাবে সংবিধান স্থগিত করা হয়। বিচারপতি আদলি মনসুর অন্তর্র্বর্তীকালীন প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। মুরসিকে ক্ষতাচ্যুত করার পেছনে অন্যান্য কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ২০১২ সালের জুন থেকে ২০১৩ সালের জুলাই পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকাকালে মুরসি মিশরে ইসলামীকরণের চেষ্টা করেছেন। মুরসি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ নিতে চেয়েছেন যা পছন্দ হয়নি ক্ষমতাধর যুক্তরাষ্ট্রের। হোসনি মোবারক আমলের সেনা অফিসারদেরকে বিচারের মুখোমুখি করতে চেষ্টা করেছেন তিনি। এতে সেনাবাহিনীও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে তার ওপর। ২০১৩ সালে মুরসির বিরুদ্ধে তাহরির স্কয়ারে জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা। আর এই সুযোগে মুরসিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। ক্ষমতায় বসেন মিশরের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। মুরসিকে আটক করে অজানা স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। কয়েক মাস পর তাঁকে আদালতে হাজির করে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ করা হয়। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননা, সন্ত্রাসে মদদদান, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা লঙ্ঘনসহ ছয়টি মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়। কাতারের কাছে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য ফাঁস করার দায়ে তিনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন। বিভিন্ন অভিযোগে তাঁকে ২০১৫ সালে যথাক্রমে ফাঁসি ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। সেই বন্দি অবস্থায় ছয় বছর পর তার মৃত্যু হয়। ২০১৯ সালের ১৭ জুন সোমবার তাঁকে আদালতের সামনে হাজির করা হয়। তিনি আদালতের কাছে বক্তব্য দানের অনুমতি চান। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে গোপন কিছু তথ্য আছে, মিশরের নিরাপত্তার কথা ভেবে তা আমি প্রকাশ করছি না।’ বক্তব্য দানের মাঝপথে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বিরতিতে চলে যাওয়া হয়। বিরতির সময়েই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ঢলে পড়েন। আসামি সেলে তিনি একাই ছিলেন। পাশের সেল থেকে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করা হয়। আধা ঘণ্টা পর উদ্ধার করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবেই একজন মহামানবের জীবনের সমাপ্তি ঘটে। ড. মুরসি তার দেশকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি দেশকে ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন- ‘আমি আমার দেশে আমার পরিবার নিয়ে কষ্টে আছি, তারপরও আমি আমার দেশকে ভালোবাসি, সম্মান করি। আমার দেশ আমাকে নিয়ে যদিও তামাশায় লিপ্ত থাকে, তারপরও আমি আমার দেশকে নিয়ে গর্ব করি।’

মুহাম্মদ মুরসির পাঁচ সন্তানের মধ্যে দুইজন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করেন এবং জন্মসূত্রে তারা মার্কিন নাগরিক। পরিবারের সদস্যদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছে সিসি সরকার। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিসহ মুসলিম ব্রাদারহুডের আরো ৮৮ সদস্যের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ দিয়েছে দেশটির আদালত। মিশরের আদালত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তা কোষাগারে জমাদানের নির্দেশ দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট মুরসির মৃত্যুর পরেও তাঁর থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত পরিবারের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। ব্রাদারহুডের কেন্দ্রীয় নেতা মুহাম্মদ বাদি, উপপ্রধান নেতা খায়রাত আল শাতেরসহ অন্যান্য নেতা ও কর্মীদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদী দলের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা নিয়ে একটি আইন পাস করে মিশরের আদালত। ব্রাদারহুড দলকে সন্ত্রাসী দল আখ্যায়িত করে এর অগণিত নেতাকর্মীদের আটক করে ফাঁসিতে ঝুলানোসহ বিভিন্ন ধরনের সাজা প্রদান করছে মিশর সরকার।

মুরসির মৃত্যুতে প্রতিক্রিয়া
ড. মুরসির মৃত্যু বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এই মৃত্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি উঠেছে। মিশরের সামরিক শাসক আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গেছে। তিনিই গত ছয়টি বছর মুরসিকে নির্জন কারাবাসে বন্দি করে রেখেছিলেন। মুরসির মৃত্যুর পর তার স্ত্রী লাগলা মাহমুদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস লিখেছেন। এতে স্বামীকে শহীদ হিসেবে আখ্যায়িত করে মুরসির সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। ফেসবুকে মুরসির স্ত্রীর লেখা স্ট্যাটাসটি হুবহু অনুবাদ হচ্ছে- ‘মিসর প্রজাতন্ত্রের বৈধ প্রেসিডেন্ট ড. মোহাম্মদ মুরসি আল্লাহর জন্য শহীদ হয়েছেন। কারাকক্ষে তিনি বিজয়ী হিসেবে শিরদাঁড়া সোজা রেখে মর্যাদার সঙ্গে জুলুমের প্রতিবাদ করে তিনি বেছে নিয়েছেন শাহাদাতকে। বহুলোক তার বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও দেশকে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। সত্য প্রচারের জন্য সামনে এগিয়ে গেছেন, কখনো পিছু হটেননি, যে জন্য তার মৃত্যু হয়েছে। কোনো রকম বিরক্তি, ক্লান্তি, আত্মসমর্পণ ও বশ্যতা স্বীকার ছাড়াই তিনি সত্যের তরবারি খাপখোলা রেখেছেন। কাজেই আল্লাহ তাকে নিজের কাছে নিয়ে গেছেন। ভীরুতা, বিশ্বাসঘাতকতা ও মোনাফেকির যুগ থেকে আল্লাহ তাকে দূরে নিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাকে নিজের কাছে নিয়েছেন, যাতে তিনি ইয়াহইয়া, ঈসা; আসহাবে উখদুদ ও হাবিব আল নাজ্জারদের মতোই একই পরিস্থিতিতে যোগ দিতে পারেন। তার বাণী প্রচার ও দায়িত্ব বণ্টনের পর জান্নাতুল ফিরদাউস, উচ্চমর্যাদা ও সাহচর্যের জন্য আল্লাহ তাকে উঠিয়ে নিয়ে গেছেন। অপেক্ষা কর, বিশ্বাসঘাতকদের বিজেতারা, অসীম অন্ধকার তোমাদের ঢেকে ফেলবে এবং নেমে আসবে কঠিন শাস্তি। আগামীতে বহু প্রজন্মের জন্য তোমরা শিক্ষা হয়ে থাকবে। জান্নাতে, হে শহীদ। কী লাভজনক লেনদেন, হে শহীদ।’

মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ মুরসিকে শহীদ আখ্যা দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তায়্যিব এরদোগান। একই সঙ্গে মিশরের বর্তমান অবৈধ প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করেছেন তিনি। ইস্তাম্বুলের হ্যালিক সেন্টারে দেয়া এক বক্তৃতায় এরদোগান বলেছেন, শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত মিসরীয়দের মুক্তির জন্য কাজ করেছেন মুরসি। এ কারণে তিনি মুসলমানদের কাছে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি বলেন, আমাদের কাছে মুহাম্মদ মুরসি শহীদ। ইতিহাস সেই সিসি একনায়ককে ক্ষমা করবে না যে কিনা জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে জেল দিয়েছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নির্যাতন করেছে এবং তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের শহীদ ভাইদের জন্য দোয়া করছি, আল্লাহ যেন শহীদদের ওপর রহম করেন। আদালতের এজলাসেই তার মৃত্যু হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি আল্লাহর কাছেই রহমত কামনা করি।’ বিশ্ববিখ্যাত দাঈ ও ইসলামিক স্কলার মুফতি ত্বকি ওসমানি এক টুইট বার্তায় এভাবে দোয়া করেছেন- ‘জোরপূর্বক অন্যায়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসিকে কয়েক বছর জেল জুলুম ভোগ করার পর মানুষের আদালতে তোলা হলো, আর আল্লাহ তাকে নিয়ে গেলেন নিজের আদালতে, যেখানে শুধু ইনসাফ আর ইনসাফ, জুলুমের গন্ধও নেই। আল্লাহ তাকে পূর্ণ মাগফিরাত করুন এবং তাকে রহমতের চাদরে ঢেকে নিন।’ আমিন।

মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক মুরসি
ড. মুহাম্মদ মুরসি ইসা আল-আইয়াত ছিলেন সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত প্রেসিডেন্ট। তিনি ছিলেন মানবিক ও নির্লোভী। প্রেসিডেন্ট হওয়া সত্ত্বেও মুরসি ছিলেন সাধারণ জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। ছোট্ট একটি অ্যাপার্টমেন্টে তিনি পরিবার নিয়ে থাকতেন। ড. মুহাম্মদ মুরসি ছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে কম বেতন-ভাতা ভোগ করা প্রেসিডেন্ট। বিশ্বজুড়ে অনেকে দেশের প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রী অঢেল সম্পদ ও টাকার মালিক হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ড. মুরসি পুরো বছরের জন্য মাত্র ১০ হাজার ডলার বেতন নিয়েছেন। শুধু রাষ্ট্রীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি সরকারি মালিকানাধীন ভবন ব্যবহার করতেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার বোন গুরুতর অসুস্থ হয়ে যান। চিকিৎসকরা তাকে চিকিৎসার জন্য আমেরিকা কিংবা ইউরোপে পাঠানোর পরামর্শ দেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কখনো আমার নিজের পরিবারের জন্য চিকিৎসায় বিলাসিতা করতে চাই না। মিসরের সাধারণ হাসপাতালেই তাদের চিকিৎসা হবে।’ গৃহহীন ও অসহায়দের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন ড. মুরসি। গৃহহীন বিধবা নারীর প্রতি তার সহযোগিতা ছিল তুলনাহীন। রাস্তার পাশে ঘুমিয়ে থাকা গৃহহীন নারীকে তিনি তুলে নিয়েছিলেন নিজ গাড়িতে। আবাসন ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মিসরে কোনো মায়েরই কষ্ট পাওয়া উচিত নয়। নিজ দেশের গরিব অসহায়দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন ড. মুরসি। তিনি সুনামির পর তাহবিল গঠন করে ইন্দোনেশিয়া ও সিরিয়ায় অনেক সাহায্য ও সহায়তা করেছিলেন।

ড. মুহাম্মদ মুরসি ছিলেন পবিত্র কুরআনুল কারিমের হাফেজ। কারাগারে মুরসি পবিত্র কুরআন চেয়েছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে কুরআন সরবরাহ করেনি। তখন তিনি বলেছিলেন- ‘আমি কারাগারে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে কুরআনের একটি কপি চেয়েছিলাম। ওরা আমাকে কুরআন দেয়নি। কিন্তু ওরা তো জানে না, আমি তো ৪০ বছর আগেই পবিত্র কুরআন মুখস্থ করেছিলাম। আমি তো কুরআনকে একটু ছুঁতে চেয়েছিলাম। এরচেয়ে বেশি কিছু তো নয়।’ তিনি কখনোই ফজরের নামাজের জামাআত ছাড়তেন না বরং নিয়মিত ফজরের নামাজের জামাআতে অংশগ্রহণ করতেন। ফজরের জামাআতে অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিতই তাকে ফজরের জামাআতে উপস্থিত হতে দেখতেন। তিনি ছিলেন অনেক মেধাবী ও বুদ্ধিমান। প্রকৌশল নিয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী মুরসি সবসময় গবেষণা ও অধ্যয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখতেন। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকৌশল বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালির্ফোনিয়ায় জাগাজিগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আদালত প্রাঙ্গণে মুরসির শেষ কথা
মামলার শুনানি চলাকালীন আদালতে প্রসিকিউশন টিম ও বিচারকদের উদ্দেশ্যে ২০ মিনিটের দীর্ঘ বক্তব্য রাখতে রাখতে প্রেসিডেন্ট মুরসি শাহাদাত অঙ্গুলি আকাশের দিকে উত্থিত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান। অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মুহাম্মদ মুরসির ছেলে আহমেদ মুরসি তার ফেসবুক পেজে উল্লেখ করেন, মুরসির লাশ তার জন্মশহর সারকানায় নিতে চাইলে সরকার অনুমতি দেয়নি। পরে কায়রোর নাসায় মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রাক্তন নেতাদের পাশে গোপনেই দাফন করা হয় মুরসিকে।
প্রেসিডেন্ট মুরসির শেষ বক্তব্যটি শিহরিত করে প্রতিটি মুসলমানকে। কথাগুলো দুনিয়াব্যাপী মুসলিম উম্মাহর প্রেরণা। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনের হামাসের সাথে কথা বলার অপরাধে তোমরা আমাকে অভিযুক্ত করেছ, কিন্তু কি আশ্চর্য সেই তোমরাই এখন হামাসের সাথে ডিল করছো! আমার সময়ে সিনাই উপত্যকায় জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতার কারণে তোমরা আমাকে এসবের পেছনের ইন্ধনদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেছ! অথচ সিনাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর সেখানে আমি তাদের বিরুদ্ধে সফল সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলাম! আজতো আমি জেলে বন্দি। তাহলে এখনো কেন সিনাইতে জঙ্গি গোষ্ঠীর ব্যাপক তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে? তোমরা আমাকে মিশরের অভ্যন্তরে সহিংস ঘটনার জন্য অভিযুক্ত করেছো! অথচ আজ দেখ মসজিদ, গির্জাসহ এমন কোনো জায়গা বাকি নেই, যেখানে সহিংস ঘটনা ঘটছে না! ভয়াবহতার কারণে মিশরের বহু শহর ও গ্রাম থেকে মানুষেরা অন্যত্র চলে গিয়েছে! আজতো আমি জেলে বন্দি। তাহলে এখনো কেন ঘটে চলেছে এসব?

তিনি আরো বলেন- প্রশাসন আমাকে কেবল কারারুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হয় নাই! আমার উপরে প্রতিদিন নির্যাতন চালানো হয়েছে। তোমরা নানান উপায়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা করছো। আমার দেশের লোকজন ও সারাবিশ্ব যাতে মনে করে আমি অসুখে আক্রান্ত হয়ে সাধারণভাবে মরে গিয়েছি, যাতে মানুষের কম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তোমরা সেই প্রক্রিয়াই আজ আমার উপর প্রয়োগ করছো। আল্লাহ ছাড়া কেউই জানে না এই বর্বর জুলুমের শেষ কোথায়। আমার আল্লাহ সবকিছু সম্পর্কে অবহিত আছেন। সকল পাপিষ্ঠ, জালিম, অন্যায়কারী, বিশ্বাসঘাতক, সরকারি সন্ত্রাসী ও খেয়ানতকারীদের উদ্দেশ্যে আমি বলবো ‘হাসবুনাল্লাহ, নি’মাল ওয়াকিল। আমি আল্লাহর সামনে উপনীত হবো। তাঁর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান পেতে, তাই আজ ধৈর্যের চরম মুহূর্তগুলো পার করে চলেছি। আমি নিশ্চিত, অবশ্যই আমি অপরাধীদেরকে সেদিন আল্লাহর সম্মুখে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো, যখন আল্লাহ সমস্ত অপরাধীদের বিচার শুরু করবেন!

আমার স্ত্রী ও সন্তানদের প্রতি আমার বার্তা হচ্ছে- আল্লাহ সাক্ষী, আমি তোমাদেরকে অনেক ভালোবাসি! এই ভালোবাসার গভীরতার পরিমাপ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ করতে পারবে না! জেলের অভ্যন্তরে প্রতিদিন অমানুষিক অত্যাচারে আমাকে জর্জরিত করা হয়েছে। চিকিৎসাবিহীনভাবে আমাকে কষ্ট দেয়া হয়েছে! এতো কিছুর পরও দিনে ও রাতে আমি তোমাদেরকে নিয়ে ভাবতাম। জানি না কখন তোমাদের সাথে একত্রিত হতে পারবো! সম্ভবত এই দুনিয়ায় আর নয়, জান্নাতেই আমাদের পুনর্মিলন ঘটবে!
আমি মিশরের মহান মুক্তিকামী জনতার উদ্দেশে বলতে চাই, আমি আবারো বলছি- আমি মিশরের মহান মুক্তিকামী জনতার উদ্দেশে বলতে চাই! মিশরে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা আপনাদের রয়েছে। আমি আমার যুবক ভাইদেরকে বলবো, তোমাদের শহীদ ভাইদের মায়েদেরকে হতাশ করোনা! তাদের স্বপ্নকে ভেঙে দিও না! তোমাদের মজলুম ভাইদেরকে হতাশ করো না! জুলুম এবং জালিম কোনোটাই স্থায়ী হয় না, আল্লাহই হচ্ছেন স্থায়ী। জালিমদেরকে আল্লাহ কখনোই কবুল করেন না। মজলুমেরা জালিমদের সামনে এসে দাঁড়াবে, যেদিন আল্লাহই হবেন সর্বেসর্বা। অপরাধের শাস্তি থেকে পালানোর ক্ষমতা কারোই থাকবে না।

আমার প্রেসিডেন্সিতে মিশর এক বছরও পূর্ণ করতে পারেনি! ইহুদিবাদীদের ঘনিষ্ঠ মিত্র কিছু আরব দেশের ক্ষমতাসীনরা মিশরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে এবং সরকারি অনেক কর্মচারীকে ক্রয় করে নিয়েছে তাদেরকে দিয়ে দেশের পরিস্থিতি খারাপ করার জন্য। আজ মিশর ভালো নেই। একটার পর একটা খারাপ ঘটেই চলেছে। কিন্তু জালিমের পতন ও মজলুমদের বিজয় নিশ্চিত না করে মুক্তিকামী জনগণ কখনোই ক্ষান্ত হবে না। আমি এখন কেবলমাত্র আমার আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার অপেক্ষা করছি। হে বিচারকগণ! আকাশের বিচারপতির অভিসম্পাত বর্ষিত হউক তোমাদের মতো নিকৃষ্ট জমিনের বিচারকদের উপর!

পরিশেষে বলা যায়, মিসরের প্রেসিডেন্ট সিসি জনগণের ভোটে নির্বাচিত মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জোরপূর্বক ক্ষমতা দখল, গণতন্ত্রকে পদদলিত এবং ক্ষমতায় এসে ৫০ জনকে ফাঁসি দিয়েছেন। মুরসি গণতান্ত্রিক উপায়ে ৫২ শতাংশ ভোট পেয়ে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন; কিন্তু দেশটির সামরিক বাহিনী এ বাস্তবতা মেনে নেয়নি এবং তারা মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সব ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছিল। মুরসিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যার সব ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। তিনি আদালতে গিয়েও তার ওপর জুলুমের প্রতিবাদ করেছেন। মিসরের জনগণ ও নিজের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিবাদী মুরসির এ মৃত্যু জুলুমের সাক্ষী হয়ে থাকবে। সিসি ক্ষমতায় আসার পর মিসরীয়দের ফাঁসি দিলেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ বিষয়ে নীরব থেকেছে। এমনকি মিশরে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলো অংশ নিয়েছে যখন সেখানে ফাঁসির ঘটনা ঘটছিল। মিশরের নিপীড়ক শাসক গণতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে গ্রেফতার হওয়া নেতাদের জুলুম করে হয়তো সাময়িক বিজয় অর্জন করেছে। কিন্তু তাদের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস মিশরীয়দের মন থেকে মুছে দিতে পারবে না। বিজয়ের সূর্য একদিন উঠবেই ইনশাআল্লাহ।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক; প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply