মুহাম্মাদ (সা)-এর সময় মূল্যায়ন নীতি । মাওলানা আবুল কাসেম সিকদার

সময় নেবেন অধ্যয়নে- এটি জ্ঞানের ভিত্তি। সময় নেবেন কাজ করতে- এটি জীবনের ক্যারিয়ার। সময় নেবেন নামাজ আদায়ে- এটি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় নেবেন আল্লাহর জিকিরে- এটি রুহের আক্সিজেন। সময় নেবেন আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে- এটি জাহান্নামের আগুন নিভিয়ে দেবে। সময় নেবেন সময়ের মূল্য দিতে-এটি জীবনের সাফল্য। সময় নেবেন সমাজকল্যাণে; এটি নিজের জীবনের প্রশান্তি। কিন্তু সময় ক্ষেপণের জন্য কখনও সময় নেবেন নামানবতার বন্ধু হযরত মুহাম্মাদ (সা)-এর মূল্যবান আয়ুষ্কালের সময় ও জীবন বিশ্ববাসীর জন্য রহমত। আল্লাহ প্রদত্ত নেয়ামতের মধ্যে সময় এক অতুলনীয় শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। আল্লাহ তায়ালা সময় নামক একটি সূরা ‘আসর’ নাজিল করেছেন। তিনি সময়ের কসম করে গোটা মানবজাতির ইতিহাস তুলে ধরেছেন, যাতে মানুষ নিমেষেই জানতে পারে কিসে সাফল্য আর কিসে ধ্বংস। মানুষের পরিচিত সময় জ্ঞাপক শব্দে তিনি কসম করেছেন। ‘ফালাক’- সকালবেলা, দোহা- প্রখর রোদের দুপুর বেলা, ‘আসর’ পড়ন্ত বেলা, সন্ধ্যা বেলা, গভীর রজনী, সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত, চাঁদনি রাত, সূর্যের কিরণ এবং দিন ও রাতের কসম করে তিনি সময়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। কারণ সময়ের সমষ্টিই জীবন। সময়ের প্রকৃতি সম্পর্কে আল্লামা ইবনে কাইয়্যুম (রহ.) বলেছেন, জীবনের যে সময়টুকু অতীত তা শুধুই স্বপ্ন, যা অবশিষ্ট আছে তা আশা- আকাক্সক্ষা, আর সময় উভয়ের মাঝ দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে। সময়ের অগ্রাধিকার সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন, আল্লাহ ক্রয় করে নিয়েছেন মুমিনদের থেকে তাদের জীবন ও সম্পদ- এই মূল্যে যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত। (সূরা তওবা : ১১১)
এ আয়াতে ধনসম্পদের আগে স্থান পেয়েছে সময় ও জীবন। সম্পদের মত সময়কে একই সমীকরণে গ্রহণ না করলে কেউ ব্যবসায় সফল হতে পারে না। এ ধারণা নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা শুরু করে থাকেন। আমরা কাউকে অর্থ-সম্পদ চুরি করতে দিই না; কিন্তু আমরা সময়ে চুরি বা ক্ষেপণ হতে দিই। এ পৃথিবীতে মানুষের সময় ও জীবন হচ্ছে পরম পাওয়া আল্লাহর অনুগ্রহ। সময়ের মালিক আল্লাহ তায়ালা নিজেই ‘হুয়াল আউয়ালু ওয়াল আখিরু’ বলেছেন, মালিকের দেয়া সময় ও জীবন দুনিয়ার কোনো ফিতা দিয়ে মাপা যায় না- যার নাম- আখিরাত। এ আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে-‘হুয়াল আউয়ালু বিলা ইবতিদা ওয়াল আখিরু বিলা ইনতিহা’ অর্থ -তিনি শুরু ছাড়া প্রথম এবং সমাপ্তি ছাড়া শেষ। (সূরা হাদিদ : ৩) এতে সময়ের ব্যাপকতা ও বিশালতা সহজে বোঝা যায়। দুনিয়ার জীবন সংক্ষিপ্ত বলেই আখিরাতের অনন্ত জীবনের গুরুত্ব দিতে হয়। আমরা নির্দিষ্ট বয়সের সময় থেকে এক ঘণ্টা বা এক মিনিট চলে যাওয়া মানে প্রকৃত পক্ষে জীবনে একটা মূল্যবান অংশ কমে যাওয়া। সময় ওই জিনিস যা সবচেয়ে বেশি দীর্ঘস্থায়ী, যদিও তা সবচেয়ে বেশি শ্লথ। আমরা সবাই তা অবজ্ঞা করি, যদিও পরে সবাই অনুশোচনা করি।

সময়ের যত্ন ও মূল্যায়ন
রাসূলে কারীম (সা) এর অসংখ্য হাদিসে রয়েছে সময়ের মূল্য ও জীবনের গুরুত্ব প্রদানের তাগিদ। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন দু’টি নিয়ামতের ক্ষেত্রে অনেক মানুষকে খেসারত দিতে হয়- সুস্থতা ও অবসর সময়ের। তাই সময় নষ্ট মানে চরম মূল্য দেয়া। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা) এক লোককে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, পাঁচটি বিষয়ের আগে পাঁচটি বিষয়ের প্রতি (সময় থাকতেই) গুরুত্ব প্রদান করো- বার্ধক্য আসার আগে যৌবনের। রোগাক্রান্ত হওয়ার আগে সুস্থ্যতার, দারিদ্র্য আসার আগে সচ্ছলতার, ব্যস্ত হয়ে যাবার আগে অবসর সময়ের, মৃত্যু আসার আগে জীবনের। (তিরমিজি, মিশকাত) তাই সকল মানবজাতির মধ্যে রাসূলে আকরাম (সা) সবচেয়ে বেশি সময়ের গুরুত্ব প্রদান করেন। সময়ের মূল্য রাসূলুল্লাহ (সা) কী পরিমাণ দিতেন তা তার ইবাদাত ও আমল থেকে বোঝা যায় সারাজীবন তিনি আল্লাহর ইবাদাত ও তার অনুগত্যে ব্যয় করতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়শা (রা) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দীর্ঘ সময় ধরে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতেন যে, তখন তার পা দুটো ফুলে যেত। তখন আয়শা (রা) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল। আপনি এত কষ্ট করেন কেন? আল্লাহ তো আপনার পূর্বের ও পরের সব ত্রুটি মোচন করে দিয়েছেন। তখন রাসূল (সা) বললেন, আমি কি আল্লাহর কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না? তেমনিভাবে রাসূল (সা) তার উম্মতদেরকে জীবনের প্রতিটি সময় নেকআমল করার তাকিদ দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, যারা অনুসন্ধানপ্রিয় অথবা যারা কৃতজ্ঞতাপ্রিয়, তাদের জন্য তিনি রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন পরিবর্তনশীল রূপে (সূরা ফুরকান : ৬৪)


সময় নেবেন অধ্যয়নে- এটি জ্ঞানের ভিত্তি। সময় নেবেন কাজ করতে- এটি জীবনের ক্যারিয়ার। সময় নেবেন নামাজ আদায়ে- এটি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় নেবেন আল্লাহর জিকিরে- এটি রুহের আক্সিজেন। সময় নেবেন আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে- এটি জাহান্নামের আগুন নিভিয়ে দেবে। সময় নেবেন সময়ের মূল্য দিতে-এটি জীবনের সাফল্য। সময় নেবেন সমাজকল্যাণে; এটি নিজের জীবনের প্রশান্তি। কিন্তু সময় ক্ষেপণের জন্য কখনও সময় নেবেন না।


কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে জীবনের মূল্যবান সময় বরবাদ করতে বারবার নিষেধ করছেন। তিনি বলেন এই পার্থিব জীবন ক্রীড়া- কৌতুক বৈ কিছুই নয়, পরকালের গৃহই প্রকৃত জীবন, যদি তারা জানত (সূরা আনকাবুত: ৬৪)
অন্যত্র বলেন, হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর ওয়াদা সত্য। সুতরাং পার্থিবজীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় ফেলে না দেয় এবং প্রবঞ্চক (শয়তান) যেন কিছুতেই তোমাদের আল্লাহ সম্পর্কে প্রবঞ্চিত না করে। (সূরা ফাতির : ৫)
সময়ের গুরুত্বদানে অজুর আগেই তায়ম্মুম : রাসূলে কারীম (সা) একবার প্রাকৃতিক কাজে বাইরে গেলেন এক সাহাবী অজুর পানি নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন, আল্লাহর রাসূল সার্বক্ষণিক অজু অবস্থায় থাকতেন, যখন প্রাকৃতিক কাজ শেষ করে বের হলেন তিনি প্রথমেই মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নিলেন। এ দেখে যে সাহাবী তাঁর জন্য পানি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন তিনি বললেন, তায়াম্মুম করার প্রয়োজন নেই, আমার কাছে পানি আছে পানি দিয়ে অযু করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, জানি না তোমার পানির কাছে পৌঁছার আগে যদি ডাক এসে যায় বিনা অজুতে চলে যেতে হবে। এটা আমি চাই না তায়াম্মুম করে নিলাম তোমার পানির কাছে পৌঁছলে আবার অজু করে নেবো। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) সব চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন সময়কে। রাসূল (সা) বলেছেন ‘মান ইসতাওয়া ইয়াওমাহু ফা হুয়া মাবুন’ অর্থ যার দু’টি দিন সমান যায় সে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই গত কালের চেয়ে আজকের দিনটি আরো অর্থবহ করে গড়ে তোলা উচিত। ক্ষতিগ্রস্ত ও ব্যর্থ লোকেরা যা করতে অনিচ্ছুক তা করে সফল লোকেরা- নিজেদের সময়ের সদ্ব্যবহার করে। সফলতার জন্য প্রয়োজনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে সময় ব্যয় করার চেয়ে ব্যর্থতার গ্লানির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়াকে সাধারণ মানুষ সহজতর মনে করে। তবে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ তায়ালা আমাদের জীবন ও সম্পদ দান করেছেন, যারা এটা দ্বীনের পথে ব্যয় করে তাদের তিনি জান্নাত দানের ওয়াদা দিয়েছেন, আর তিনি সময় ও শক্তির হিসাব নেবেন। মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত- প্রথমত. ওইসব দুর্ভাগ্যবান মোহাবিষ্ট দলের লোক, যারা সব সময়ই আগামীকাল কোন কাজ শুরু করতে চায়। দ্বিতীয়ত. ওইসব বিস্ময়কর ব্যক্তি, যারা এখনই কাজ শুরু করতে প্রস্তুত। তাদের জন্য কোন আগামীকাল নেই। ঈসা (আ) বলেছেন, জীবন তিন দিনের, গতকাল চলে গেছে, আগামী কাল বাঁচব কি না জানি না, বাকি আছে আজ। অতএব দৈনিক জীবন যাপন করো। রাসূলুল্লাহ (সা) একটি দিনকে ভাগ করে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সমাপ্তি করেছেন, তাই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জীবনের একদিন এক একটি শতাব্দীর মতো মূল্যবান। লিলিয়ান ডিক্সন বলেছিলেন, জীবন হচ্ছে একটা মুদ্রার মতো, আপনি যেভাবে ইচ্ছা এটাকে খরচ করতে পারেন তবে মনে রাখবেন এ সুযোগ আপনি মাত্র একবারই পাবেন। তাই গর্ববোধক কিছু করে প্রতিদিন অতিবাহিত করা উচিত। জীবনে একবারই একটি দিন আসে। প্রতিদিন সকালে যখন আমরা ঘুম থেকে উঠি তখন আমাদের নোটবুক ২৪ ঘণ্টায় সমৃদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, দু’জন ফেরেশতার আহ্বান ব্যতীত একটি প্রভাতও আসে না, হে আদম সন্তান, আমি একটি নতুন দিন আমি তোমার কর্মের সাক্ষী। আমার থেকে পাথেয় অর্জন করো। কেননা কেয়ামতের আগে আর কখনও ফিরে আসব না। (মুসনাদে আহমাদ) তাই জীবনের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সময়ভিত্তিক কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন। পবিত্র কুরআনের সূরা মুমিনুনের ৩ নম্বর আয়াতে অর্থহীন কথা ও কাজ থেকে বিমুখ থাকতে বলা হয়েছে। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে যারা অনর্থক কথামালা বাজার থেকে ক্রয় করে (যেমন- গান বাজনা, নাটক, গল্প, ছায়াছবি, কৌতুক ইত্যাদি), তাদের জন্য পীড়াদায়ক শাস্তির হুঁশিয়ার করা হয়েছে। (সূরা লুকমান : ৬) আল্লাহর আনুগত্যে, দ্বীনি কাজে অলসতা, বিলম্ব, গাফিলতি করা, অপেক্ষা করা- এতে জীবনের অধিকাংশ সময় হারিয়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায় মহা মূল্যবান সময়। সময নষ্ট করা শুধু অপরাধ বা অন্যায় নয়, বরং তা হচ্ছে আত্মহত্যার শামিল। আল্লাহপাক বলেন, ‘তোমরা নিজেদের হাতেই নিজেদের ধ্বংসের দিকে (অতলে) নিক্ষেপ করো না।’ (সূরা বাকারা ১৯৫)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আগাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, ‘তোমাদের এমন যেন বলতে না হয় যে, হায় আফসোস! আল্লাহ তায়ালার প্রতি কর্তব্য পালনে আমি দারুণ শৈথিল্য প্রদর্শন করেছি, আমি ছিলাম ঠাট্টা-বিদ্রƒপকারীদেরই একজন।’ (সূরা যুমার : ৫৬) তারপর সে তার অবশিষ্ট মূল্যবান জীবনে, গত জীবনের ক্ষতিপূরণে এমনভাবে অগ্রসর হয় যাতে আখিরাতের যে জযবা ও প্রেরণাকে এরই মধ্যে মেরে ফেলা হয়েছে তা পুনরুজ্জীবিত করতে পারে। চোখের পানি ভাসিয়ে হলেও নিজের ভুলভ্রান্তি সংশোধন করতে পারে এবং জীবনের বাকি সময়কে বহু মূল্যবান মনে করে যতটুকু সম্ভব চেষ্টা করতে পারে, আল্লাহ না করুন যদি এ সময়টুকুও হাতছাড়া হয়ে যায় তাহলে শুধু আফসোস করা ছাড়া আর কোনো পথই সামনে খোলা থাকার নয়। মুমিনরা ঈমানের নূরে অনুধাবন করতে পারে সময়ের মূল্য ও গুরুত্ব। সে বুঝতে পারে যে, এটাই তার সফলতার পুঁজি বা মূলধন। কারণ শাস্তির দিনগুলোর ‘একদিন হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান’। (সূরা মায়ারিজ : ৪) তাই সে আপন সময়ের এক সেকেন্ডও নষ্ট করে না। অতএব, আপনি যখনই বলছেন আমার হাতে সময় নেই, আসলে আপনি বলেছেন যে, আমার হাতে আরও অধিক গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ আছে।

সময় থাকতেই মৃত্যুর প্রস্তুতি
মানুষের রুহুই আসল জীবন। রুহু চলে গেলে আমাদের এ ক্ষণস্থায়ী জীবন শেষ হয়ে যাবে। শুরু হবে আখিরাতের অনন্ত জীবন। যারা মরণকে ভুলে লাগামহীন জীবন যাপন করে বেড়ায় তাদের কুরআন বলে দিয়েছে, ‘মরণভোলা মানুষের কাছে যখন মৃত্যু এসে পড়বে তখন সে বলবে, ‘হে আল্লাহ মৃত্যুকে আমার থেকে ফিরিয়ে নিন। আমাকে আবার জীবন-সময় ফিরিয়ে দিন। যাতে বেশি বেশি ভালো কাজ করে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে পারি।’ (সূরা মুমিনুন : ৯৯) তাই এভাবে আফসোস না করে বরং এখন থেকেই মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে হবে। এবং আখেরাতমুখী জীবন গড়তে হবে। আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমি তোমাদের যা কিছু অর্থসম্পদ দিয়েছি তা থেকে তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো তোমাদের কারো মৃত্যু আসার আগেই-মৃত্যু এসে গেলে সে বলবে হে আমার রব, তুমি যদি আমাকে আরো কিছু কালের অবকাশ দিতে তাহলে আমি তোমার পথে দান করতাম এবং এভাবেই আমি তোমার নেক বান্দাদের দলে শামিল হয়ে যেতাম। কিন্তু কারো নির্ধারিত ‘সময়’ যখন এসে যাবে তখন আল্লাহ তায়ালা কখনোই তাকে এক মুহূর্ত অবকাশ দেবেন না; তোমরা দুনিয়ার জীবনে যা কিছু করছো, আল্লাহ তায়ালা সে সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত রয়েছেন। (সূরা মুনাফিকুন : ১০-১১)

অবসর সময়
অব্যবহৃত বা হাতে থেকে যাওয়া সময় দিয়ে আপনি কী করেন? আপনি কি জানেন এ অতিরিক্ত সময়ের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করা যেতে পারে! কুরআন ও হাদিস মুখস্থ করা যেতে পারে। বাসে, ট্রেনে, বিমানে ভ্রমণকালীন বা এর জন্য অপেক্ষাকালীন কয়েক মিনিট সময়ই এরূপ অতিরিক্ত, একে কি আপনি অতিরিক্ত বা সৃজনশীল সময় বলবেন? প্রতিদিনের ১৫ মিনিট মানে বছরের পূর্ণ ২২ দিন। কিভাবে সময় অতিবাহিত হয়। তাই ব্যস্ত হয়ে যাওয়া আগে অবসরকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতঃপর আল্লাহ তাদের জিজ্ঞেস করবেন, বলো দুনিয়ায় তোমরা কতদিন ছিলে? তারা বলবে- একদিন বা একদিনের কিছু অংশ, হিসাবকারীদের কাছে (চার্টার্ড অ্যাকউনট্যান্ট) জিজ্ঞাসা করে দেখুন, বলা হবে, অল্পকালই তোমরা ছিলে, হায় এ কথা যদি তোমরা সেই সময় (দুনিয়ায় থাকার সময়) জানতে (কত ভালো হতো)। (সূরা মুমিনুন : ১১২-১১৪) আল্লাহপাক বলেন, হে ঈমানদাররা, তোমরা আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর রাসূলের আহবানে সাড়া দাও, যা তোমাদের সত্যিকার অর্থে জীবনদান করবে। (সূরা আনফাল : ২৪) যখন আপনি অবসর পান, পরিশ্রম করুন এবং আপনার রবের প্রতি মনোনিবেশ করুন। (সূরা ইনশিরাহ : ৭-৮) তোমার রবের ক্ষমা পাওয়ার জন্য দ্রুত ছুটে যাও। (সূরা : আলে ইমরান : ১৩৪) আল্লাহর দিকে যে আহবান জানাচ্ছে, তাঁর ডাকে সাড়া দাও। (সূরা আহকাফ : ৩১) ‘তোমরা রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করো, তার অনুগত হও, তোমাদের ওপর আজাব আসার আগেই। অতঃপর কোন সাহায্যকারী পাবে না।’ (সূরা যুমার : ৫৪) ‘কেয়ামতের ময়দানে আল্লাহ তায়ালা সকল মানুষের কাছে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর চাইবেন ১. তোমার (বয়স) ও জীবন কিভাবে শেষ করে ফেলেছ? ২. তোমার যৌবনের সময়টা কিভাবে কাটিয়েছো? ৩. তোমার ধনসম্পদ কিভাবে উপার্জন করেছ? ৪. এই সম্পদ কিভাবে ব্যয় করেছ? ৫. যতটুকু ইলেম শিক্ষা করেছ তা থেকে কী আমল করেছ? (তিরমিজি) তাই আখেরাতের অনন্ত জীবনের জন্য এই মৌখিক পরীক্ষার উত্তর দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘যাদ্দিদু ঈমানাকুম’। অর্থ তোমাদের ঈমানকে নতুন করো। অধিক হারে আল্লাহর স্মরণ ও আনুগত্যে ঈমানকে তাজা করতে হয়। তরতাজা ঈমান সময়ের খুব বেশি প্রয়োজন। আমাদের চোখের সামনে আছে উন্মুক্ত মহাগ্রন্থ- ঘর-বাড়ি, গাছপালা, নদী, সাগর- মহাসাগর, পাহাড় পর্বত শহর-বন্দর, আকাশ বাতাস, চন্দ্র-সূর্য- এসবই উন্মুক্ত গ্রন্থের সোনালি-রুপালি অক্ষর, শব্দ ও বাক্যাবলি থেকে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকেরা শিক্ষা নিয়ে থাকে। তাই আপনি সময় নেবেন এগুলো নিয়ে চিন্তা করতে- এটি ক্ষমতার উৎস। সময় নেবেন অধ্যয়নে- এটি জ্ঞানের ভিত্তি। সময় নেবেন কাজ করতে- এটি জীবনের ক্যারিয়ার। সময় নেবেন নামাজ আদায়ে- এটি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। সময় নেবেন আল্লাহর জিকিরে- এটি রুহের অক্সিজেন। সময় নেবেন আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে- এটি জাহান্নামের আগুন নিভিয়ে দেবে। সময় নেবেন সময়ের মূল্য দিতে-এটি জীবনের সাফল্য। সময় নেবেন সমাজকল্যাণে; এটি নিজের জীবনের প্রশান্তি। কিন্তু সময় ক্ষেপণের জন্য কখনও সময় নেবেন না। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) এর জীবন ও সময়ের সঠিক মূল্যায়নের আনুগত্যে আল্লাহ আমাদের জীবন সফল করুন। আমিন

লেখক : ইসলামী গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply