মুহাম্মাদ সা. দয়া ও সহমর্মিতার অনন্য এক প্রতিচ্ছবি । আলী আহমাদ মাবরুর

মুহাম্মাদ সা. দয়া ও সহমর্মিতার অনন্য এক প্রতিচ্ছবি । আলী আহমাদ মাবরুরহযরত মুহাম্মাদ সা. তার সঙ্গী-সাথী, সাহাবী, পরিবার ও আপনজনদেরকে সবসময় ভালোবাসা, করুণা এবং সহানুভূতি প্রদর্শন করার তাগিদ দিয়েছেন। রাসূল সা. তার নিজের জীবনেও এই মানসিকতার চর্চা করতেন। তাই সাধারণভাবে অন্য সব মানুষও তাকে সেই যুগের সবচেয়ে দরদি ও সহানুভূতিশীল হিসেবেই বিবেচনা করতেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন। পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয়ের মানুষ হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করুন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওয়াক্কুলকারীদের ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)
এরকম অসংখ্য ঘটনাই রাসূলের সা. জীবন থেকে পাওয়া যায় যেগুলো থেকে আমরা দয়া, করুণা এবং নম্রতার শিক্ষা পাই। বিশেষ করে, সমাজের যারা দরিদ্র ও অসহায়, তাদের প্রতি তিনি বেশি দরদি ছিলেন। রাসূলের সা. সাথে সবসময় ছায়ার মতো থেকে তাকে সেবা যত্ন করেছেন হযরত আনাস (রা)। তিনি বলেন, “আমি রাসূলুল্লাহকে সা. ১০ বছরেরও বেশি সময় সেবা করার সুযোগ পেয়েছি। এই দীর্ঘ সময়ে একটি বারের জন্যও তিনি আমাকে অপমান করেননি, কেনো আমি কোন কাজটি করেছি বা কোন কাজটি করতে পারিনি সেই মর্মে তিনি আমাকে একবারের জন্যও ধমক দেননি।” (সহীহ আল বুখারী: ২০৩৮)
উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশাকে (রা) উদ্দেশ্য করে রাসূল সা. বলেছিলেন, “হে আয়েশা, কোনো অভাবী লোক যেন তোমার দরজা থেকে খালি হাতে ফিরে না যায়। সবসময় দরিদ্র ও অভাবী ব্যক্তিদেরকে ভালোবাসবে। তাদেরকে তোমার সান্নিধ্যে রাখবে তাহলে শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তায়ালাও তোমাকে তাঁর সান্নিধ্যে রাখবেন। আর তোমাদের মধ্যে কেউ যদি আমাকে পেতে চাও, তাহলে মজলুম ও অভাবী লোকদের মাঝেই আমাকে সন্ধান করো।” (তথ্যসূত্র : রাহমান: এনসাইক্লোপিডিয়া অব সিরাত: ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫১)
আল্লাহ তায়ালা নিজে রাহমান ও রাহিম। অর্থাৎ তিনি পরম করুণাময় ও দয়ালু। আর রাসূল সা. নিজেও প্রতিটি মানুষ এমনকি পশুপাখির সাথেও প্রতিনিয়ত দয়া ও সহানুভূতিশীল আচরণের চর্চা করে গেছেন। দয়ালু হওয়ার ক্ষেত্রে রাসূল সা. কখনো মানুষের ধর্ম, বর্ণ বা গোত্রকে বিবেচনায় নেননি। তিনি সকলের সাথেই একই ধরনের দরদি আচরণ করতেন ও সহমর্মিতা প্রদর্শন করতেন। রাসূল সা. বলেছেন, “আল্লাহ নিজে দয়ালু আর তিনি সবকিছুতেই দয়ার অনুশীলন দেখতে পছন্দ করেন।” (সহিহ আল বুখারী: ৬৬০১)
জন্মভূমি মক্কার মানুষগুলোর অসদাচরণ ও অমানবিক কার্যক্রম রাসূলকে সা. বরাবরই ব্যথিত করতো। কুরাইশরা এক আল্লাহকে এবং তাঁর হুকুমকে স্বীকার না করায় রাসূল সা. নিজেই অনেক বেশি কষ্ট পেতেন। আল কুরআন নিজেই রাসূলের সা. কষ্ট পাওয়ার এই অনুভূতি সম্পর্কে আমাদেরকে অবহিত করেছে।
“তারা বিশ্বাস করে না বলে আপনি হয়তো মর্মব্যথায় আত্মঘাতী হবেন।” (সূরা আস শুআরা: আয়াত ৩)
“যদি তারা ঈমান না আনে তাহলে হয়তো আপনি তাদের অজান্তেই তাদের জন্য আফসোস করতে করতে নিঃশেষ হয়ে যাবেন।” (সূরা আল কাহফ: ৬)
“সুতরাং আপনি তাদের জন্য অনুতাপ করে নিজেকে ধ্বংস করবেন না।” (সূরা আল ফাতির : আয়াত ৮)
রাসূল সা. নবুওয়াত লাভের আগে থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করতে আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে, যে মানুষগুলো নানা ধরনের যন্ত্রণা ও কষ্টকর পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে তিনি নানাভাবে সাহায্য করার চেষ্টা করতেন। রাসূল সা. আল্লাহর যাবতীয় গুণগুলোকে অনুসরণ করতেন এবং একজন মানুষ হিসেবে নিজের জীবনে সেই গুণাবলিগুলোকে বাস্তবায়ন করার জন্য তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন। দয়া বা রহম হলো আল্লাহ তায়ালার এমন একটি গুণ- যার কোনো সীমানা নেই। আল্লাহর অফুরন্ত এবং অসীম দয়া প্রতিমুহূর্তে বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টিকে ঘেরাও করে আছে। ঈমানদার কিংবা নাফরমান, আল্লাহর হুকুম মান্যকারী কিংবা অমান্যকারী- সকলেই আল্লাহর সেই রহমতের দেখা পান। আমাদের রাসূলও সা. সেভাবেই এই দরদ ও সহানুভূতির গুণটি ব্যক্তিজীবনে অনুশীলন করে গেছেন। জীবিত সকল কিছুর প্রতিই তিনি দরদি ছিলেন, দয়ালু ছিলেন। সহানুভূতি ও কোমলতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তিনি কোনো কার্পণ্য করতেন না, বাছ বিচারও করতেন না। এই কারণে, মহাগ্রন্থ আল কুরআনও বার বার রাসূলের সা. দয়া ও সহানুভূতির প্রশংসা করেছে। আল কুরআনে আল্লাহ তায়ালা নবীজিকে সা. ‘রাউফুর রাহিম বা দয়াময়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আল্লাহ বলেন,
“তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল। তোমাদের দুঃখ-কষ্ট তিনি সহ্য করতে পারেন না। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি স্নেহশীল, দয়াময়।” (সূরা আত তাওবাহ : ১২৮)
এই রাউফুর রাহিম শব্দটি খুবই স্পর্শকাতর এবং এর অর্থও অনেক ব্যাপক। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, রাসূল সা. মানুষের জন্য কতটা দরদি ছিলেন। রাসূল সা. বলেন, “একজন মানুষের দয়া প্রদর্শনের একটি উপায় হলো তার পিতার মৃত্যুর পরও তার সঙ্গীদের সাথে সদ্বব্যবহার করে যাওয়া।” (আবু দাউদ : ৫১২৩)
নির্দিষ্ট কোনো সম্পর্ক নয়, সকল সম্পর্কের মানুষের সাথেই সুন্দরভাবে আচরণ করা উচিত। রাসূল সা. বলেছেন, “যে লোক তার জীবিকা প্রশস্ত করতে এবং আয়ু বৃদ্ধি করতে চায়, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। (বুখারী : আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৪৬)
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন : রক্ত সম্পর্কের মূল হলো রাহমান। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, যে তোমার সাথে সুসম্পর্ক রাখবে, আমি তার সাথে সুসম্পর্ক রাখব। আর যে তোমার হতে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও সে লোক হতে সম্পর্ক ছিন্ন করব। (বুখারী : আধুনিক প্রকাশনী- ৫৫৫৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৪৪৯)
রাসূল সা. আরো বলেছেন, যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না। (মুসলিম ৪৩/১৫, হা: ২৩১৮, আহমাদ ৭২৯৩)
বাহয ইবনু হাকীম (রা) হতে তার পিতা এবং তার দাদা থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, একদিন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার কে? তিনি বললেন, তোমার মা, তারপর তোমার মা, তারপর তোমার মা, অতঃপর তোমার বাবা, এরপর পর্যায়ক্রমে আত্মীয়তার নৈকট্য অনুসারে হবে। (আবু দাউদ : ৫১৩৯)
রাসূল সা. ইয়াতিমদের সাথেও উত্তম ব্যবহার করার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “মুসলমানদের মধ্যে তার বাড়িই উত্তম যার বাসায় ইয়াতিমের সাথে সদাচরণ করা হয়। আর তার বাসা হলো সবচেয়ে নিকৃষ্ট যার বাসায় ইয়াতিমের সাথে দুর্ব্যবহার করা হয়। (ইবনে মাজাহ : ৩৬৭৯)
উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে বোঝা যায়, রাসূল সা. ধর্ম, বর্ণ, বা গোত্র কিংবা সামাজিক মর্যাদা নির্বিশেষে কারও সাথে দুর্ব্যবহার না করার জন্য আমাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন। আমাদের যারা বন্ধু আছেন, কিংবা প্রতিবেশী বা আত্মীয়স্বজন- সকলের সাথেই আমাদেরকে উত্তম ব্যবহার করতে হবে। রাসূল সা. আরো বলেন, “সকল সৃষ্টিই আল্লাহর উপর নির্ভরশীল আর আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তি বেশি প্রিয় যে তার অধীনস্থদের সাথে সুন্দর আচরণ করে। (তথ্যসূত্র : রাহমান: এনসাইক্লোপিডিয়া অব সিরাত: ৮ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫৪)
নারীদের সাথেও উত্তম আচরণ করার জন্য রাসূল সা. আমাদেরকে তাগিদ দিয়েছেন। বিদায় হজের ভাষণে রাসূল সা. বলেন, “তোমরা মহিলাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো কেননা তারা তোমাদের সহায়ক। স্ত্রীর উপর স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে ঠিক তেমনি স্ত্রীরও তার স্বামীর উপর অধিকার রয়েছে। স্বামীদের অধিকার হলো এই যে, স্ত্রীরা স্বামীর অমতে কাউকে বাসায় প্রবেশ করতে দেবে না আর স্ত্রীর হক হলো স্বামীর কাছ থেকে উত্তম ব্যবহার পাওয়া।”
একবার বেশ কয়েকজন মহিলা নবীজির সা. কাছে গেলো এবং তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগ তুললো। এই অভিযোগ শুনে রাসূল সা. বললেন, তোমাদের মধ্যে যারা তাদের স্ত্রীদের সাথে অসদাচরণ করে তারা মানুষ হিসেবে ভালো নয়। (আবু দাউদ, ১৮৩৪)
এই হাদীসটি দিয়ে প্রমাণ হয়, যারা মহিলাদের সাথে খারাপ আচরণ করে তারা দুনিয়াতেও পছন্দনীয় হবে না, আবার আল্লাহও তাদেরকে প্রশ্রয় দেবেন না।
আবু হুরাইরাহ্ (রা) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমার আত্মীয়-স্বজন আছেন। আমি তাদের সাথে সদাচরণ করি; কিন্তু তারা আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। আমি তাদের উপকার করে থাকি; কিন্তু তারা আমার অপকার করে। আমি তাদের সহনশীলতা প্রদর্শন করে থাকি আর তারা আমার সঙ্গে মূর্খসুলভ আচরণ করে। তখন তিনি বললেন, তুমি যা বললে, তাহলে যদি প্রকৃত অবস্থা তাই হয় তুমি যেন তাদের উপর জ্বলন্ত অঙ্গার নিক্ষেপ করছ। আর যতক্ষণ তুমি এ রকম আচরণ অব্যাহত রাখবে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমার সঙ্গে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের বিপক্ষে একজন সাহায্যকারী ফেরেশতাও থাকবে। (ই. ফা. ৬২৯৪, ই. সে. ৬৩৪৩)
অনেক সময় দেখা যায় যারা ভালো আচরণ করে তারা পর্যাপ্ত মূল্যায়ন পায় না। ফলে তাদের মন খারাপ হয়। নিজের ভিতর এক ধরনের হতাশাও চলে আসতে পারে। কিন্তু রাসূল সা. এর উপরোক্ত হাদীসটি তাদের জন্য অনেক বেশি স্বস্তির। কেননা, এই হাদীসটির মাধ্যমে বান্দাকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, উত্তম ব্যবহার করলে স্বয়ং আল্লাহ তাকে রহমতের ফেরেশতা পাঠিয়ে নিরাপত্তা বিধান করবেন।
রাসূলের সা. চরিত্রের আরেকটি উত্তম দিক হলো, যারা মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তেন, রাসূল সা. তাদেরকে সান্ত¡না দিতেন। আজকের দিনে আমরা প্রায়শই সাইকোলোজিক্যাল কাউন্সিলর বা মোটিভেশনাল স্পিকারের কথা শুনতে পাই, রাসূল সা. তার গোটা জীবন জুড়েই এই কাউন্সেলিং করে গেছেন। মানুষকে ইতিবাচকভাবে মোটিভেট করারই চেষ্টা করেছেন। তার কাছে যেই আসতো, ধর্ম, বর্ণ, বয়স, লিঙ্গভেদে রাসূল সা. তাদের সবাইকে সুপরামর্শ দিতেন।
একবার হযরত আসমা বিনতে আবু বকরের (রা) মা মদীনায় নিজের মেয়েকে দেখতে এলেন। হযরত আসমার (রা) মা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেননি। মুশরিক মায়ের আগমনে হযরত আসমা (রা) বেশ বিব্রত হয়ে গেলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে, তিনি কি করবেন। তাই তিনি পরামর্শ নেয়ার জন্য নবীজির সা. কাছে গেলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, হে রাসূল, আমার মা আমাকে দেখতে মদীনায় এসেছেন। তিনি আমার কাছে কিছু প্রত্যাশাও করেন। আমি কী তার আনুগত্য করবো? রাসূল সা. উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই তুমি তোমার মায়ের সাথে উত্তম আচরণ করবে। (মুসলিম, ২১৯৫)
রাসূলের সা. একই ধরনের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির বিবরণী আমরা আরো বেশ কিছু হাদীস থেকে পাই। একবার প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদের (রা) স্ত্রী জয়নাব (রা) রাসূলের সা. কাছে গিয়ে জানতে চান যে, যদি ঘরের মহিলারা তাদের স্বামী ও অধীনস্থ ইয়াতিমদের পেছনে ব্যয় করে তাহলে তা সাদাকা হিসেবে গণ্য হয় কিনা? রাসূল সা. উত্তর দেন: তাদের জন্য দু’টি সওয়াব রয়েছে, আত্মীয়কে দেয়ার সওয়াব আর সদকা দেয়ার সওয়াব। (সহীহ আল বুখারী : ১৪৬৬)
এমন অসংখ্য হাদীসও পাওয়া যায়, যার মাধ্যমে আমরা দেখি যে রাসূল সা. শুধু মানুষ নয় বরং পশুপাখি এবং অন্যন্য প্রাণীর প্রতিও ভীষণ দরদি ছিলেন। তিনি বলেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে প্রতিটি জিনিসের প্রতি দরদি হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই যখন তোমরা কোনো প্রাণীকে জবাই করবে, তখন উত্তম রূপে জবাই করো। যে অস্ত্র দিয়ে জবাই করবে তা ভালোমতো ধারালো করে নিবে, যাতে জবাইয়ের কাজটি সহজেই হয়ে যায় এবং প্রাণীটি বেশি কষ্ট না পায়।” (মুসলিম ৫০৫৫) রাসূলের সা. এই হাদীসের মাধ্যমে প্রাণীদের প্রতি তার অদম্য দয়া ও ভালোবাসাই প্রকাশ পায়।
আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে, রাসূল সা. এমন একটি সময় আরব ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেছিলেন যখন মানবাধিকার নামক কোনো কিছুর অস্তিত্ব সেখানে ছিল না। যার ক্ষমতা বেশি, কেবলমাত্র তার অধিকারই সমাজে সুরক্ষিত হতো। পৌত্তলিকতায় আর অনাচারে বিপর্যস্ত একটি সমাজে রাসূল সা. মানুষকে এক আল্লাহর পথে আসার আহবান জানান। ন্যায়বিচার, শান্তি, মানবাধিকার, পশুপাখির অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণসহ নানা বিষয়ে মানুষকে শিক্ষা দিতে শুরু করেন।
এই কাজগুলো মোটেও সহজ নয়। তবে, আল্লাহ এই কাজগুলো করার জন্য এমন একজন মানুষকে বাছাই করেছিলেন, যার চারিত্রিক উৎকর্ষতা ছিলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানের। বন্ধুবৎসল মানুষ হিসেবে রাসূল সা. ছিলেন একজন অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, নারী, পুরুষ, যুবক ও বৃদ্ধসহ সকলের সাথে দরদ ও সম্মানের সাথে আচরণ করতেন।
খুব স্বাভাবিকভাবেই মূর্তিপূজারি আর অগ্নিপূজারি আরব সমাজ রাসূলের সা. এই সব ইতিবাচক কথাবার্তাকে ভালোভাবে নেয়নি। তারা আশঙ্কা করেছিল, মুহাম্মাদের সা. কথা অনুসরণ করলে তাদের যাবতীয় ক্ষমতা খর্ব হয়ে যাবে। তাই তারা প্রচণ্ড ঘৃণা, বর্বরতা আর অমানবিক আচরণ করার মাধ্যমেই নিজেদের প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেছিল। অথচ কুরাইশদের এই বর্বর আচরণের জবাব রাসূল সা. দিয়েছিলেন ভালোবাসা আর দয়ার মধ্য দিয়ে।
নিম্নে বেশ কতগুলো উদাহরণ দেয়া হলো, যার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, রাসূল সা. ঘৃণার বিপরীতে কিভাবে দয়া, করুণা ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতেন।
আমরা সবাই সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা জানি, যিনি রাসূলকে সা. কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে তার যাত্রাপথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতেন। ঐ বৃদ্ধা মহিলা নবীজিকে সা. বিরক্ত করার জন্য, কষ্ট দেয়ার জন্য তার পথে কাঁটা বিছিয়ে দিতেন, আবর্জনা ফেলে রাখতেন। একদিন নবীজি সা. বের হয়ে দেখলেন তার চলার পথে কোনো আবর্জনা বা কাঁটা কিছুই নেই। তখন খোঁজ নিয়ে দয়ার সাগর নবীজি সা. জানতে পারলেন যে, বৃদ্ধা মহিলা অসুস্থ হয়ে নিজ ঘরে পড়ে আছেন। রাসূল সা. সাথে সাথেই ঐ মহিলার বাসায় চলে যান এবং যেকোনো ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। রাসূলের সা. মহানুভবতায় উক্ত মহিলা ভীষণ অবাক হন। তিনি নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত ও লজ্জিত হন। রাসূলের সা. সহানুভূতিশীল আচরণ দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে, ইসলাম হলো সত্যিকারের ধর্ম ও জীবনবিধান। ফলে তিনি ইসলাম গ্রহণে সম্মত হন।
আরেকটি ঘটনার কথা জানা যায়, যখন রাসূল সা. দাওয়াতি কাজের অংশ হিসেবে মক্কার পার্শ্ববর্তী তায়েফ শহরে গমন করেন। রাসূল সা. আশা করেছিলেন যে, তায়েফের মানুষজন আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের প্রতি সম্মান ও সমর্থন জানাবে। কিন্তু হলো তার বিপরীত। তায়েফের অধিবাসীরাও মক্কার কুরাইশদের মতোই তার সাথে ঘৃণা ও বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করতে লাগলো। শহরের যারা নেতৃস্থানীয় লোকজন ছিলেন, তারা রাসূলের সা. বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার ও নোংরা ব্যবহার শুরু করলো। তারা নানাভাবে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলো যাতে রাসূল সা. জনগণের মাঝে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দিতে না পারেন। সেই সাথে, তারা শহরের একদল ভবঘুরে ছেলেকেও নবীজির সা. পেছনে লেলিয়ে দিলো। এই সব কিশোরেরা রাসূলের সা. শরীর মোবারক উদ্দেশ্য করে পাথর ছুড়তে শুরু করলো। আহত, রক্তাক্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় রাসূল সা. অবশেষে একটি বাগানে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন।
রাসূল সা. যখন বাগানে প্রবেশ করে একটি গাছের নিচে বসলেন, তখন বাগানের মালিকও সেখানে উপস্থিত ছিল। রাসূল সা. আহত হলেও অত্যন্ত বিনয়চিত্তে আকাশের দিকে তাকিয়ে দোয়া করছিলেন, “হে আল্লাহ, আমি আপনার দরবারে হাত তুলেছি। আমি আমার দুর্বলতা, আমার অসহায়ত্বকে স্বীকার করে নিচ্ছি। হে সর্বশক্তিমান, আপনি সকল মজলুমের একমাত্র অধিপতি। আজ যে মানুষগুলো আমায় অপমান করলো, অপদস্থ করলো, তাদের মাঝে কাজ করার জন্যই কি আপনি আমায় দায়িত্ব দিয়েছেন? তাহলে বলি, আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন না। যদি আমার এই অপমান ও রক্তাক্ত হওয়ার পেছনে আপনার কোনো অসন্তোষ কাজ না করে তাহলে ওরা যাই করুক, আমি তাতে ভয় পাই না। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি, আপনার উপর ভরসা করি। আপনার রহমত ও নিরাপত্তা আমার জন্য যথেষ্ট। আমি সব ধরনের অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই। আমি সেই নূরের সন্ধান চাই যা দুনিয়া এবং আখেরাতের সমস্ত অন্ধকারকে দূর করে দেয়। আপনার অসন্তোষ ও ক্রোধ থেকে আমি পানাহ চাই। আপনার সন্তুষ্টির পাওয়ার জন্য আমি আপনার পক্ষ থেকে যেকোনো ফয়সালা মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত। কারণ, আমি জানি, আপনার অনুমোদন ছাড়া কিছুই হয় না।”
বাগান মালিক খুব কাছ থেকেই সব দৃশ্য দেখছিল। তারা আদাস নামক একজন ক্রীতদাসকে দিয়ে রাসূলের সা. জন্য প্লেটভর্তি আঙ্গুর পাঠালো। ক্রীতদাস যখন সেই আঙ্গুরগুলো দিলো, রাসূল সা. বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে খেতে শুরু করলেন। আদাস এই ধরনের কথা এমনকি আল্লাহর নামটাও আগে কখনো শুনেনি। তাই এই কথাটি শুনে আদাস চমকিত হলো। সে রাসূলের সা. আচরণেও বিস্মিত হলো। কেননা, এত মার খেয়েও, নির্যাতিত হয়েও রাসূল সা. সহানুভূতিশীল আচরণ করছিলেন। কোনো ধরনের অভিশাপ বা কটূক্তি করেননি।
আদাস নবীজিকে সা. প্রশ্ন করলো, আপনি কে?
রাসূল সা. উত্তর দিলেন: আমি মুহাম্মাদ। আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। তুমি কোথা থেকে এসেছো?
আদাস: আমার নাম আদাস। আমি একজন খ্রিষ্টান। আমি নাইনেভা থেকে এসেছি।
রাসূল সা. বললেন, নাইনেভা!! আমার পূর্বসূরি নবী হযরত ইউনুস বিন মাতি আ. তো সেখানেই থাকতেন।
আদাস রাসূলের সা. মুখে হযরত ইউনুসের আ. নাম শুনে বিস্মিত হয়ে পড়লো। সে রাসূলকে সা. প্রশ্ন করলো, “আপনি কিভাবে ইউনুসের নাম জানেন? এখানে আর কেউ তো তার নাম জানে না। এমনকি নাইনেভাতেও খুব অল্প সংখ্যক লোক তার কিংবা তার পিতার নাম জানে।
রাসূল সা. বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি তাকে জানি, কেননা তিনিও আমার মতোই একজন নবী ছিলেন।’ এই কথা শুনার পরই আদাস মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো এবং রাসূলের সা. হাতটি নিয়ে চুমু খেতে লাগলো। এই ছিল রাসূলে কারীমের সা. চরিত্র।
ইসলামের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূল সা. তায়েফে নিক্ষিপ্ত পাথরের মুখে বাগানে আশ্রয় নেয়ার পর ফেরেশতা জিবরাইল আ. নবীজির সা. কাছে আসেন এবং রাসূলের সা. কাছে তায়েফকে প্রয়োজনে ধ্বংস করার অনুমতি চান। তিনি বলেন, হে রাসূল, আপনি অনুমতি দিলে আমি দুই পাশের দুই পাহাড়ের চাপে পিষ্ট করে তায়েফকে ধ্বংস করে দিতে পারি।” যদিও তায়েফের মানুষ নানাভাবে রাসূলকে সা. কষ্ট দিয়েছিলো তথাপি তিনি কখনোই তায়েফের ধ্বংস চাননি। বরং তিনি তায়েফকে হেফাজত করার কথা বলেছিলেন কেননা এমনও হতে পারে যে, এদেরই পরবর্তী বংশধরেরা ইসলামের ছায়াতলে আসবে। বাস্তবেও তাই হয়েছে।
বিভিন্ন হাদীসে রাসূলের সা. দয়া, সহানুভূতিশীল আচরণ, সহমর্মিতা এবং শিষ্টাচার প্রসঙ্গে যে বর্ণনাগুলো এসেছে তার সবগুলোকে মূল্যায়ন করে প্রখ্যাত মুসলিম দার্শনিক ইমাম গাজ্জালি (রহ) তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইয়াহিয়া উলুমুদ্দীনের দ্বিতীয় খণ্ডে এই মর্মে মন্তব্য করেন যে,
“আমরা রাগ বলতে যা বুঝি রাসূল সা. তার ত্রিসীমানাতেও ছিলেন না। তিনি প্রতিটি জিনিসের প্রতি দরদ দেখাতেন। তিনি মানুষকে যেভাবে ভালোবাসতেন আর কেউ সেভাবে ভালোবাসতে পারে না। তাই তিনি মানুষের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছিলেন তেমনটাও আর কেউ পায়নি। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ মানব। তিনি মানবতার জন্য উৎকৃষ্ট সব কাজ করে গেছেন। তার মত মানবিক, কল্যাণকর ও উপকারী কাজ বিশ্ব ইতিহাসে আর কোনো মানুষ করে যেতে পারেনি।”
আল কুরআন বলছে যে, আল্লাহ হযরত মুহাম্মাদ সা. কে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমত অর্থাৎ রহমাতুল্লিল আলামিন হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাই আমরা যদি সত্যিকারার্থে রাসূলের সা. প্রতি সম্মান জানাতে চাই, তাহলে আমাদেরকেও তার চরিত্রের উৎকৃষ্টতম বৈশিষ্ট্য, তথা দয়া ও সহানুভূতির চর্চা করতে হবে। রাগ, হিংসা, ঘৃণা, অহঙ্কার ও ক্রোধের মত নেতিবাচক মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে চিরতরে বর্জন করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে নবীজির সা. আদর্শ অনুযায়ী উত্তম চরিত্র ধারণ করার তাওফিক দিন। আমিন।

SHARE

Leave a Reply