মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে শিক্ষা ব্যর্থ কেন? -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

শিক্ষার হার দিন দিন বাড়ছে কিন্তু সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধও! নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কোমলমতি শিক্ষিত তরুণ-তরুণীরা। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা এর থেকে মুক্ত থাকতে পারছেন না। তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কি শিক্ষিত চতুর দুর্নীতিবাজ মানুষ তৈরি করছে? দেশ দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে। এ দেশের কৃষ-শ্রমিক-মজুর মেহনতি মানুষের কারণে নয়! দুর্নীতির শীর্ষস্থানে রয়েছে আমাদের দেশের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কারণে! তাহলে আমাদের শিক্ষা কি ব্যর্থ? শিক্ষাব্যবস্থা কি নৈতিক চরিত্রসম্পন্ন জাতি তৈরি করতে পারছে না? তাহলে শিক্ষার দুর্নীতির হারকে কেন বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার এ গলদ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।
মূলত শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে অন্যতম। অন্যসব মৌলিক অধিকার পূরণের বিকল্প মাধ্যম ও পদ্ধতি থাকলেও শিক্ষার বিকল্প শিক্ষাই। কোন মানুষ যদি খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তাহলে বড়জোর এই মানুষটি ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পাবে পুষ্টিহীনতায় দুর্বল হয়ে পড়বে। আহার পেলেই এটি নিবারণ হয়ে যাবে। কিন্তু কোন মানুষ যদি শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় অথবা প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে না পারে তাহলে সে মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাকে আমরা বলি অশিক্ষিত। কারণ শিক্ষার সাথে ব্যক্তির মৌলিক সত্তা জড়িত। সুতরাং এই দুই বঞ্চিতের মধ্যে ব্যবধান আকাশ-পাতালের চেয়েও বেশি। শিক্ষা কেবলমাত্র মানুষের জন্যই প্রয়োজন। অন্য কোন প্রাণীর শিক্ষার দরকার নেই। অন্য প্রাণীর নেই কোন স্বাধীনতা। মৃত্যুর পর নেই জবাবদিহিতা।
এই জন্য অজ্ঞতার ‘অ’-এর ব্যবহার অন্য কোন প্রাণীর সাথে কোনোভাবেই সুশ্রী হয় না। যেমন গরু ও ছাগল কোন নিয়ম ভঙ্গ করলে আমরা তাদেরকে অ-গরু অথবা অ-ছাগল বলে আখ্যায়িত করি না। কিন্তু কোন মানুষ অন্যায় করলেই আমরা তাকে অমানুষ, অভদ্র, অকৃতজ্ঞ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করে থাকি। কারণ শিক্ষা মানুষের জীবনের সাথে জড়িত অধিকার। জীবনকে যেমনি তুচ্ছ করা যায় না, শিক্ষাও তার ব্যতিক্রম নয়। আর শিক্ষার এই বিস্তৃত রূপকে সামনে রেখেই বলা হয় ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড।’ মেরুদন্ড ছাড়া যেমনি কোন প্রাণী দাঁড়াতে পারে না, তেমনি প্রকৃত শিক্ষা ছাড়াও জাতি অচল। কিন্তু কেন আজও জাতি হিসেবে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারলাম না এ প্রশ্নটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের। যে জাতি স্বাধীনতার ৪২ বছরেও ঐকমত্যের ভিত্তিতে তার পরিচয় নিয়ে দ্বিধান্বিত, এখনো নেই সম্মিলিত কোন শিক্ষানীতি সেই জাতির মুক্তির পথ অনেক অমানিশার ঘোর অন্ধকারে আবর্তিত কি না তা আজ আমাদেরকে আবার ভেবে দেখতে হবে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এক রক্তক্ষয়ী ঐতিহাসিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি। দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল এমন একটি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণীত হবে যা ব্যক্তিবিশেষের চিন্তা, বিশ্বাস এবং দলীয় দৃষ্টিভক্তির ঊর্ধ্বে ওঠে এ দেশের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, কৃষ্টি-সভ্যতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং যুগচাহিদার প্রতি লক্ষ্য রেখে তৈরি। যেহেতু শিক্ষানীতি একটি দেশের সুনাগরিক তৈরির দিকনির্দেশনা বিধায় এটা জাতির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের বিশ্বায়ন পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মতো নেতৃত্বদানকারী, যোগ্য কর্মমুখী, সুদক্ষ, সৎ, আদর্শবান ও প্রতিযোগী মনোভাবাপন্ন করে গড়ে তোলাই হবে এর মূল উদ্দেশ্য। আর জাতিকে কাক্সিক্ষত মানে উন্নীত করার জন্য শিক্ষানীতিতে সর্বাধিক গুরত্ব পাবে (ক) ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা (খ) কারিগরি শিক্ষা (গ) বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষা। কিন্তু আওয়ামী লীগ ব্যক্তিবিশেষের চিন্তা, বিশ্বাস এবং দলীয় দৃষ্টিভক্তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি সেদিন। ড. মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠন করা হয় বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন। জাতির অধঃপতন মূলত ঐ দিন থেকেই এই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ কলোনিয়াল চেতনাকে সংরক্ষণ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের তাঁবেদার নাগরিক তৈরি করাই ড. কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের মূল লক্ষ্য ছিল। জাতি হিসেবে আমরা কাগজে কলমে ব্রিটিশ বেনিয়ার কবল থেকে মুক্তি পেলেও তাদের চিন্তার কবল থেকে রেহাই পাইনি। এটি আবার প্রমাণিত হয়েছে। ব্রিটিশদের আনন্দের বর্ণনা তাই আজো এভাবে- ‘ÔWe must at present do our best from a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern; a class of persons Indians in blood and colour, but in English in tastes, in options in morals and intellect.’ অর্থাৎ, যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে তারা শাসন করছিল তাদের সাথে শাসক ইংরেজদের মধ্যে দূতের কাজ করা এবং রক্তে ও গায়ের রঙে ভারতীয় হলেও মেজাজে, চিন্তাভাবনায়, নৈতিকতায় ও বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজ হয়ে যাবে-এমন একটি গোষ্ঠী সৃষ্টি করাই তাদের উদ্দেশ্য। যারা ধ্যানে চিন্তা-চেতনায় নাস্তিকতাকেই লালন করে থাকেন তাদের পক্ষে কি সার্বজনীন কোন নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব? আর তাইতো ব্রিটিশদের কেনা গোলামরা এমন এক শিক্ষানীতি প্রণয়ন করল যা এদেশের মানুষের ঈমান-আকিদা, তাহজিব-তমদ্দুনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
আজকে এ দেশের নাগরিক হয়ে ভিন দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য কেউ কেউ প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালান। দেশের কৃষ্টি-কালচার, তাহজিব-তমদ্দুন এমনকি ৯০ ভাগ মানুষের সেন্টিমেন্টের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতেও তারা দ্বিধা করেন না। এটিই ব্রিটিশদের পরিচালিত শিক্ষারই ফল। সম্প্রতি রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিট আবেদনের ফলে সারা দেশে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। বিচারপতি নাঈমা হায়দারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ শুনানি গ্রহণ না করেই রিটটি খারিজের আদেশ দেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মো: আশরাফুল কামাল। আদেশে আদালত বলেন, ‘এ বিষয়ে আর শুনানির কোনো প্রয়োজন নেই। আমরা এ ব্যাপারে বিস্তারিত পড়ে এসেছি। রিটকারী সংগঠন (স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটি) সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রিট করার অধিকার রাখে না। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সুব্রত চৌধুরী ও জগলুল হায়দার আফ্রিক। সরকার পক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। ১৯৮৮ সালের ৫ জুন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীতে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। সংশোধনীতে ২(ক) অনুচ্ছেদ সংযুক্ত করে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সম-অধিকার নিশ্চিত করিবেন। আইনটি একই বছরের ৯ জুন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মধ্য দিয়ে আইনে পরিণত হয়।
স্বৈরাচার ও সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেনসহ দেশের ১৫ বিশিষ্ট নাগরিক এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনকারীদের মধ্যে ১০ জন মারা গেছেন। মৃত ১০ জন হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি কামাল উদ্দিন হোসেন, বিচারপতি দেবেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য, বিচারপতি কে এম সোবহান, কবি সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, অধ্যাপক কবীর চৌধুরী, শিল্পী কলিম শরাফী, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ। আবেদনকারীদের মধ্যে এখন জীবিত পাঁচজন হলেন- অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, মে. জে. (অব:) সি আর দত্ত, বদরুদ্দীন উমর, ড. বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। এদের মধ্যে আবার বদরুদ্দীন উমর গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে রিট আবেদন থেকে নিজের নাম প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন।
দীর্ঘদিন পর ২০১১ সালের ৮ জুন হাইকোর্টে একই বিষয়ে সম্পূরক একটি আবেদন করে রিটের শুনানির আবেদন করা হয়। পরে ওই আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ রুল জারি করেন। রুলে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা দেয়া কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে রুলের জবাব দিতে বলা হয়। গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রিট আবেদনকারীদের অপর একটি আবেদনে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি হাইকোর্টে বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করে দেন। পরে ওই রুল শুনানির জন্য আদালতে উপস্থাপন করা হলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্টের বৃহত্তর এই বেঞ্চ ২৭ মার্চ দিন ধার্য করেছিলেন। ২৭ মার্চ ২০১৬ সোমবার আদালতের আদেশে খারিজ করে দেয়া হলো।” এই রিটের সঙ্গে জড়িত নামধারী মুসলমানের সংখ্যাই বেশি।
যাক আমরা আলোচনা করছিলাম বিগত কমিশনগুলোর তুলনায় এই কমিশনের সাফল্য হলো বর্তমান শিক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান কবীর চৌধুরী, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এবং বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ লর্ড মেকলের যোগ্য উত্তরসূরি। যারা বাংলাদেশে বসবাস করে বটে কিন্তু প্রতিনিধিত্ব করেন অন্য দেশের। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নিরক্ষরমুক্ত জাতিগঠনের অঙ্গীকার বিবেচনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আর এ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন নূরুল ইসলাম নাহিদ। শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ কেবল ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গেই সম্পৃক্ত ছিলেন না, আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার আগের দিন পর্যন্ত তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেট-৬ আসন থেকে ‘নৌকা’ প্রতীক নিয়ে তিনি এবার এমপি নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতা লাভের দীর্ঘ ৪২ বছরে আমরা কমিটির বিশাল বিশাল রিপোর্ট পেয়েছি। এ সকল কমিশন/কমিটির রিপোর্টে প্রদত্ত সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সামগ্রিকভাবে এসব কমিশন/কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ব্রিটিশদের চাপিয়ে দেয়া শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন বাংলাদেশী জাতির শিক্ষার ভিত্তি নির্ধারণ তথা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষানীতি প্রণয়নের পরিবর্তে শিক্ষার কাঠামোগত বিন্যাস, গুণগত ও পরিমাণগত উন্নয়নের জন্য সুপারিশ প্রণয়নের ওপর তাদের পূর্ণ প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করেছে। অধিকন্তু এসব কমিশন/কমিটির সুপারিশমালার অধিকাংশই এখন পর্যন্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। আমরা ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি পেলেও আমাদের মনন ও মানসজগৎকে ঔপনিবেশিকতার যাঁতাকল ও নব্য সাম্রাজ্যবাদী/নব্য উপনিবেশবাদীদের কবল থেকে মুক্ত করতে পারিনি। এ শিক্ষানীতির এমন অনেক বিষয় যা অসঙ্গতিপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী। তা ছাড়া এ শিক্ষানীতি গতানুগতিক ও নৈতিক দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। ধর্মের দিকটা এখানে উপেক্ষিত কেন? আজ এই প্রশ্নটি খুব বড় করে দেখা দিয়েছে। এই শিক্ষা নীতি কি আদৌ আমাদের প্রয়োজনে করা হয়েছে?
‘জাতীয় শিক্ষানীতি’ হতে হয় ‘জাতীয় চেতনাভিত্তিক। কিন্তু আজ পর্যন্ত বর্তমান সরকারও সরকারি দল এ দেশের ‘রাষ্ট্রীয় জাতীয় পরিচয়’ (Nationhood) নির্ণয় করতে পারেনি। শিক্ষানীতি বা এডুকেশন পলিসি’ (Education Policy) দলভেদে জাতিভেদে, ধর্মভেদে, রাষ্ট্রভেদে ও সরকারি নীতি এবং দৃষ্টিভক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শিক্ষানীতি এবং ওই সময়ের যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘শিক্ষানীতি’ এক ছিল না। বর্তমান কিউবা ও কানাডার শিক্ষানীতিও এক নয়। এক নয়, পাশাপাশি অবস্থিত সমাজতান্ত্রিক চীন এবং গণতান্ত্রিক ভারতের শিক্ষানীতিও। একই গণতান্ত্রিক ও পাশাপাশি অবস্থিত দু’টি দেশ; ভারত এবং পাকিস্তানের শিক্ষানীতিও এক নয়। কারণ ভারত হিন্দুপ্রধান দেশ আর পাকিস্তান মুসলিমপ্রধান দেশ। তাই তাদের শিক্ষানীতিও আলাদা। বাংলাদেশও একটি ‘মুসলিমপ্রধান দেশ হওয়ায় তারও শিক্ষানীতি ভারত বা চীনের মতো হতে পারে না। প্রত্যেক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় জাতির (Nation)  নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অনুযায়ীই ‘শিক্ষানীতি’ প্রণীত হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রীয় জাতির বৈশিষ্ট্য কী; তা ‘শিক্ষানীতি’র তাই কোনো ‘দার্শনিক ভিত্তি’ নেই। জাতীয় (National)  চরিত্র নেই।
সরকার যে কমিটি গঠন করে, সে কমিটির সবাই একমত এক পথের চিন্তাবিদ-শিক্ষাবিদ কাজেই তাদের প্রণীত শিক্ষানীতি যে জাতীয় না হয়ে দলীয়ই হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এ জন্যই শিক্ষামন্ত্রী মহোদয় মন্ত্রিসভায় বর্তমানে লিপিবদ্ধ শিক্ষানীতি অনুমোদনের পর আত্মতৃপ্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ১৫ বছর আগে তিনি তার দলের শিক্ষাবিষয়ক কর্মকর্তার দায়িত্ব নিয়ে যা করতে চেয়েছিলেন তা করতে পেরে আনন্দিত। শিক্ষানীতিটি জাতীয় চেতনার বা সব দলে সব মতের আলোচকদের আলোচনা ও চিন্তাভাবনার ফসল নয়, এক ব্যক্তি ও এক দলে (বা বর্তমান মহাজোট সরকারে) বহু দিনের আকাক্সক্ষার ফসল, তা স্বীকার না করে উপায় নেই। (জাতীয় শিক্ষানীতির পর্যালোচনা, ডক্টর এস এম লুৎফুর রহমান)
এই শিক্ষানীতিতে পবিত্র সংবিধান, জাতিসত্তা, জাতীয় বিশ্বাস-মূল্যবোধ-ঐতিহ্য-চেতনার পুরোপুরি প্রতিফলন হয়নি। যেমন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের পরিবর্তে অসাম্প্রদায়িকতা, সহজীবন যাপনের মানসিকতা, সমমৌলিক চিন্তা-চেতনা গড়ে তোলা, উপজাতিদের আদিবাসী বলা, প্রাথমিক স্তর, মাধ্যমিক স্তর এবং উচ্চতর স্তরে কাঠামো ভেঙে দিয়ে হ-য-ব-র-ল করা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সকল ধারায় এক ও অভিন্ন শিক্ষাক্রম-পাঠ্যক্রম-পাঠ্যপুস্তক, প্রশ্নপত্র পরীক্ষা-মূল্যায়ন-ব্যবস্থা, শিক্ষকদের বদলি নীতি, ক্যাডেট ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা, অন্যান্য ক্ষেত্রে চরম বৈষম্যনীতি, ইংলিশ মিডিয়াম ও এনজিও শিক্ষার্থীদের অনিয়নিন্ত্রত রাখা, মাদরাসা শিক্ষার মৌলিক বিষয় কমিয়ে এনে স্কুলে পরিণত করার কৌশল গ্রহণ, কওমি মাদরাসার প্রতি ঔদাসীন্য, উচ্চাশিক্ষার ব্যাপক বৈষম্য ও সংকোচন নীতি এবং ব্যাপক গবেষণার পথ উন্মুক্ত না রাখা, প্রকৌশল চিকিৎসাসেবা ও স্বাস্থ্যশিক্ষা এবং বিজ্ঞান শিক্ষার সংকোচন, তথ্যপ্রযুক্তির নামে আকাশ সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণহীনতা, নারীদের যথাযথ মূল্যায়ন না করা, প্রজনন স্বাস্থ্যশিক্ষার নামে সংবেদনশীল বিষয় চালুকরণ, কারুকলার নামে নৃত্য-অঙ্গবিক্ষেপ যাত্রা সিনেমা ব্রতচারী শিক্ষা চালুকরণ, প্রতিরক্ষা ও সামরিক শিক্ষার ব্যাপারে কোন বক্তব্য না দেয়া এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও জনগোষ্ঠীর শিক্ষার ব্যাপারে ঔদাসীন্য, শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র-শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতি সম্পর্কে কোন কিছু না বলা, শিক্ষকদের সর্বোচ্চ স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রদানের ব্যাপারে কোন কিছু না বলা এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হতে কিছু বিষয়ের বিলুপ্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়সহ স্তরবিন্যাসের ফলে শিক্ষকদের চাকরি হারানোর আশঙ্কাসহ আরো অনেক ব্যাপারে এ শিক্ষানীতিতে অপূর্ণাঙ্গতার ছাপ রয়েছে।
আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মনে করেছেন কিছু চমৎকপ্রদ শব্দের ফুলঝুরি দিয়ে দেশের বোকা মানুষকে ধোঁকা দিয়ে সেক্যুলার শব্দ বাদ দিয়ে তরী পার করে ফেলবেন। কিন্তু এত সহজ নয়। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা অনেকেই দেশের জনগণকে বোকা মনে করেন। কিন্তু এটা যে সবচেয়ে বড় বোকামি এটাই তারা বুঝেন না। সচেতনতার বিচারে এ দেশের মানুষ এ উপমহাদেশের এখনো শীর্ষে রয়েছেন। সরকার শিক্ষানীতিতে সেক্যুলার শব্দ বাদ দিয়ে দেশের জনগণকে ধোঁকা দিয়েছে আর শিক্ষানীতি সংশোধনের কথা বলে উলামা-মাশায়েখদের ডাকা হরতাল প্রত্যাহার করে এখন আরেক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। এটাও এক ধরনের ধোঁকাবাজি। অবশ্য এই শিক্ষানীতি এ রকম ধোঁকাবাজ, প্রতারক, আর জাতীয় বাজিকর-ই তৈরি করবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের মনে রাখা দরকার এ দেশের উলামা-মাশায়েখ আর তৌহিদি জনতার সাথে বেঈমানী করে কেউই ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেনি। এ দেশের উলামা-মাশায়েখরাই সমাজের মানুষের নেতা। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং অন্তত সপ্তাহে একবার আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো মাইকিং আর পোস্টারিং ছাড়াই তাদের নেতৃত্বে একসাথ হয়ে নামাজ আদায় করেন। সুতরাং সেই আলেম-উলামাদের সরকার উপেক্ষা করে একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন অনেকটা দুঃস্বপ্নেই পরিণত হবে। শুধু তাই নয়, এটি আওয়ামী লীগের জন্য হিতে বিপরীতও হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন এ কথা খুব ভালোভাবেই জানে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি ধর্মবিমুখ রাজনৈতিক দর্শন। দেশের মানুষ রাতে আজানের আওয়াজ শুনে ঘুমাতে যায় আর মুয়াজ্জিনের ফজরের আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙে সেই জাতিকে এত সহজেই কি ধর্মবিমুখ বানানো সম্ভব? ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উৎপত্তির সংঘাত তো ইসলাম অথবা মুসলমান কারো সাথেই নয়। অথচ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সবচেয়ে বড় আঘাতের লক্ষ্য ইসলাম ও মুসলমানরা।
‘র‌্যানডম হাউজ অব দ্য ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ’-এ Secular বা ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, “যা ধর্ম সম্পর্কিত নয় (Not pertaining toor connceted with religious order)। আর ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় বলা হয়েছে এটি একটি রাজনৈতিক বা সামাজিক দর্শন যা সকল ধর্মবিশ্বাসকে নাকচ করে দেয় (Rejects all forms of religious faith)| Encyclopedia of Britanica–র সংজ্ঞাও অনুরূপ। অর্থাৎ যারা কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন, কোনো ধর্মের অনুসারী নন, কোনো ধর্মে বিশ্বাসী নন এবং আধ্যাত্মিকতা ও পবিত্রতার বিরোধী তাদেরকেই বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষ। চেম্বারস ডিকশনারির মতে, Education should be independent of religion” অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ হচ্ছে এমন এক বিশ্বাস যার রাষ্ট্রনৈতিক শিক্ষা ইত্যাদি ধর্মমুক্ত থাকবে।
চার্চ ও রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব-সংঘাতের মাধ্যমে ইউরোপে প্রথম Secular রাষ্ট্র দর্শনের প্রসার ঘটে। কয়েক শতাব্দীব্যাপী বিভিন্ন দার্শনিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় কার্যকলাপের ফলশ্রুতিতে ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝিতে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ পূর্ণতা লাভ করে। এর বিকাশে সহায়তা করছে ইউরোপীয় রেনেসাঁ, শিল্প বিপ্লব, জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব, ফরাসি বিপ্লব এবং বিভিন্ন দার্শনিকের (যেমন- ম্যাকিয়াভেলি, থমাস, হবস, জর্জ জের, মার্ক্স এঙ্গেলস, ভলটেয়ার প্রমুখ) নাস্তিক্য, বস্তুবাদী, সমাজতান্ত্রিক ইত্যাদি চিন্তাধারা।
Oxford Dictionary-‡Z Secularism means the doctrine that morality should by besed sotely of regard to the wellbeing of mankind in the present life be exclusion of all consideration draw from belief in good or in future state.
অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতা এমন এক মতবাদ যা মনে করে আল্লাহ বিশ্বাস, পরকাল বিশ্বাস বিবেচনা থেকে মুক্ত থেকে মানবজাতির বর্তমান কল্যাণ চিন্তার ওপর ভিত্তি করে নৈতিকতা গড়ে উঠবে।
প্রাচ্যবিদ ড. স্মিথের মতে “ÒThe secular state is a state which guarantees of religion, deals with individuals as citizen irrest active of his religion is not constitutionally corrected to a particular religion nor does it seek either to promote or intyer fere with religion”
অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলতে বোঝায় এমন এক রাষ্ট্র যা ধর্মীয় স্বাধীনতা দান করে ব্যক্তিকে ধর্ম নির্বিশেষে নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে এবং শাসনতান্ত্রিকভাবে রাষ্ট্রে কোনো ধর্মের সাথে সংযুক্ত থাকে না- ধর্মের উন্নতিও চায় না, হস্তক্ষেপও করে না। বস্তুত Secularism  বলতে বোঝায় এমন মতবাদ, যা পারলৌকিক ধ্যান-ধারণা ও ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীনভাবে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার কথা বলে। রাষ্ট্রের নীতি ও পরিচালনায় কোনোভাবেই ধর্মকে বিবেচনা করে না মুসলিমবিশ্বে ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ইসলামমুক্ত শাসন। ইসলামকে ব্যক্তির জীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা। ইসলাম থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি সম্পূর্ণভাবে পৃথক করা।
মধ্যযুগ থেকে ইউরোপের আধুনিক যুগে উত্তরণকাল সেকুলার শব্দের অর্থ একটু একটু করে সম্প্রসারিত হতে থাকে। সাহিত্য, শিল্প ইতিহাস, সঙ্গীত প্রভৃতি প্রসঙ্গে প্রয়োগ করা হলে সেক্যুলার অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় ধর্মের সেবায় নিযুক্ত নয় ও ধর্ম বিষয়ে প্রাসঙ্গিক নয়- এমন। ঠিক যেমন সেকুলার শিক্ষা মানে ধর্ম শিক্ষা নয়- এমন শিক্ষা।
সেকুলারিজম আদর্শ ইসলামের তৌহিদের কিংবা অন্যান্য ধর্মের মৌল চিন্তা-ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত। এ প্রেক্ষিতেই সেকুলারিজমে মানুষের জ্ঞানকেও ধর্মীয় অনুশাসনমুক্ত করার কথা বলা হয়। শেষ পর্যন্ত সেকুলারিজমের লক্ষ্য হলো ধর্ম বা প্রত্যাদিষ্ট জ্ঞান থেকে বুদ্ধি ও বিবেকের মুক্তি এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা। এখানে একজন পাশ্চাত্যের পন্ডিতের দেয়া সেকুলারিজমের সংজ্ঞার উদ্ধৃতি দিচ্ছি :
The deliverance of man first from religious and then from metaphysical control over his reason and his language.. The loosing of itself, the dispelling of all closed world views, the breaking of all troy, the discovery by man that he has been lift with the world on what be does with it…, (It is) man turning his at attention away from worlds beyond and toward this world and this time (The secular City Harvey Cox)
সেকুলারিজম মানে ধর্মনিরপেক্ষতা নয় একটি ধর্মহীনতা। কেউ কেউ এতদূর না গেলেও এটি মানে যে সেকুলারিজমে নাস্তিক্যের বীজ লুকিয়ে আছে। আর এটাতো সত্য রেনেসাঁর ভেতর দিয়ে ইউরোপীয় মানবতন্ত্রী দর্শনের বিকাশ ঘটেছে তা কিন্তু সেকুলারিজমের পথ ধরে কে একে নাস্তিক্যের কেন্দ্র এসে ঠেকেছে, যা আসলে ঈশ্বর ও ধর্মচিন্তার সম্পূর্ণ বিপরীত।
ইউরোপে সেকুলারিজম বিকশিত হয়েছিল তা মুসলিম দুনিয়ায় অনুপ্রবিষ্ট সেকুলারিজমের চেহারা থেকে মৌলিকভাবে পৃথক। আগেই বলেছি সেখানকার সেকুলারিজমের একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত আছে এবং বিশেষ সামাজিক প্রয়োজনে সেই সেকুলারিজমের উদ্ভব হয়েছিল। ইউরোপের নিপীড়ক চার্চকে রাষ্ট্র থেকে মুক্ত করার জন্য সেদিন সেকুলারিজমের দরকার ছিল। অন্যদিকে মুসলিম দুনিয়ায় এ চিন্তা-চেতনা ঔপনিবেশিক পাশ্চাত্যের আগ্রাসনবাদী সংস্কৃতি কর্তৃক এক আরোপিত ধারণা। মুসলিম দুনিয়ার ক্ষেত্রে তা তেমন কোন কাজে লাগেনি বা লাগসই উন্নয়নের মডেল হিসেবেও ব্যবহার করা যায়নি, এমনকি এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনেও সেকুলারিজম প্রাসঙ্গিক ধারণা নয়। অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম দুনিয়ায় সেকুলারিজম পাশ্চাত্য প্রভাবিত মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবীও এলিট শ্রেণীর সুযোগ সুবিধা হাতিয়ে নেয়ার বাহন হিসেবে কাজ করেছে। ইউরোপ খ্রিষ্ট ধর্মের চার্চের তুল্য কোন প্রতিষ্ঠান ইসলামের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। মুসলিম দুনিয়ায় চার্চের তুল্য কোন প্রতিষ্ঠানও নিপীড়কের ভূমিকায় কখনোই অবতীর্ণ হয়নি। চার্চ কর্তৃপক্ষ যেমন করে সেদিনকার ইউরোপে সব রকমের বৈজ্ঞানিক অনুশীলন ও ক্রিয়াকান্ডকে নিষিদ্ধ করেছিল এর তুলনীয় ঘটনাও ইসলামে নেই। উল্টো ইসলামে ধর্মীয় নেতৃত্ব যারা দিয়েছেন সেই আলেম-উলামা, মুফতি মুদাররেসরা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন সময় অত্যাচারী রাজা-বাদশাহদের বিরুদ্ধে খুতবা দিয়েছেন এরকম নজির ইসলামের ইতিহাসের ভূরি ভূরি। বাংলাদেশেও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ১০০% লালন আলেম-উলামারাই করে থাকেন। এটাই ইসলামের শিক্ষা। অন্যদিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় আলেমরা তো মুসলিমবিজ্ঞানীদের সাথে হাতে হাত ধরে কাজ করেছেন। সুতরাং ইউরোপে সেকুলারিজম বিকাশের প্রেক্ষাপট দিয়ে মুসলিম দুনিয়া সেকুলারিজমের আগমন ও প্রয়োজনকে বিশ্লেষণ করা অনর্থক। এই বড়ি বাংলাদেশের মানুষ গিলবে না। কারণ এ জমিনের সাথে ইসলামের নাড়ির সম্পর্ক। এটি উপড়ানোর চেষ্টা করলে অনেকে নিজেই উপড়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
পাশ্চাত্যের সেকুলারিজম ছিল এক ধরনের ধর্মের বিকল্প এবং ধার্মিক হওয়ার হয়তো বিকল্প রাস্তা। কিন্তু মুসলিম বিশ্বের সেকুলারিজম সাধারণ মানুষে ধর্ম ও ধামির্কতার ওপর কঠোর আক্রমণ চালিয়েছে মাত্র। সঙ্গত কারণে সাধারণ মানুষ তাই সেকুলারিজমকে তাদের প্রতিপক্ষ হিসেবে মনে করছে। বাংলাদেশে বর্তমান পরিস্থিতি তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
দ্য ওয়ার্ল্ড বুক অব এনসাইক্লোপেডিয়াতে বলা হয়েছে, This approach became Known as secularism because it is separated politics from religion.. অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্ম থেকে আলাদা একটি রাজনীতির নাম। পরিভাষাটি অর্থেই প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। এনসাইক্লোপেডিয়া অব রিলিজিয়ন অব ইথিকস সেকুলারিজম এ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এভাবে যে,Secularism may be described as a movement intentionally ethical negatively religious with political and philosophical antecedent. অর্থাৎ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ রাজনীতি ও অবরোহী দর্শনের ভিত্তিতে ধর্মের বিপরীত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এক আন্দোলনের নাম।
জাতীয় শিক্ষানীতি জনগণকে বিশেষ করে মুসলমানদের ইসলামচর্চা থেকে সরিয়ে নৈতিকতার চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা চালাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তারা ভাবছেন ইসলামচর্চা ও আচার আচরণের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়ে নৈতিকতার চর্চা ও নৈতিক আচার আচরণের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিলেই দেশ থেকে অন্যায়, অবিচার, দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি, সন্ত্রাস, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, মাদকাসক্তি, চোরাচালান, শিশুহত্যা, নারী নির্যাতন ইত্যাদি অসংখ্য জাতীয় রোগ দূর হয়ে যাবে। জেগে উঠবে নৈতিক মূল্যবোধ, সদাচার, সদ্ব্যবহার এবং সৃষ্টি হবে দুধে ধোয়া সমাজ, বিবেকবান নাগরিক পাবে।
কিন্তু ধর্মকে শিক্ষা থেকে বাদ দিয়ে বা কাটছাঁট করে তা যে কখনো হয় না, সে কথা ভারতীয় শিক্ষবিদরা জানেন। আর আমাদের একদেশে, একপেশে, একমুখো শিক্ষাবিদরা তা জানেনও না। অথবা জানলেও তা মানেন না। তাই তাদের জ্ঞাতার্থে পূর্বোক্ত ভারতীয় শিক্ষানীতিতে নৈতিক মূল্যবোধ, বিনয়, সদ্ব্যবহার, শিক্ষাক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের  (spiritual values) সাথে কতখানি যুক্ত তা নিচের কোটেশন থেকে বোঝা যাবে এ বিষয়ে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে :
We have to lay special stress on the teaching of moral and spiritual values. Moral values particularly refer to the conduct come together. It is essential that from the earliest childhood moral values should be inculcated in u. We have to influence home first. Habits, both of mind and body, formed in the early years at home, persist, sand influence our life afterwards, manners and a very important part of moral education;
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সর্বত্র বস্তুর প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। এটিকে মানুষের জন্য অশুভ হিসেবে গণ্য করেছেন। কারণ তাঁর মতে,  ‘Man is essentially a spiritual being. It is this spiritual element of man which is responsible for all the great achievements in this world. (Purkait) এ কারণে তিনি শিক্ষার মাধ্যমে আত্মিক শক্তিতে শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করার ওপর এতই জোর দিয়েছেন যে, বস্তুগত জগৎ যেন কখনই মানুষ, মানবতা ও বস্তুবহির্ভূত চিরায়ত বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ না করতে পারে সে জন্য শিক্ষায় আত্মিকতাবাদের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলা হয়েছে, Material progress is a good things; social and political reforms are even more valuable, both to the race and the individual; their final worth lies in the aid they afford to spiritual life.’ (Findlay : 1968:41)
(চলবে)
লেখক : সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply