মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে শিক্ষা ব্যর্থ কেন? -ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম

মা-বাবা। অক্ষরের মানে মাত্র তিনটি। প্রেম-প্রীতি, স্নেহ ভালোবাসা, বড়ত্ব, গভীরতা, সব বিচারেই তাঁরা সেরা। আমাদের পরম শ্রদ্ধার, স্মরণীয়-বরণীয়, আমাদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, কল্যাণকামী শাসক, একান্ত প্রিয় বন্ধু আর সবচেয়ে আপনজন মা-বাবা। তিন অক্ষরের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র আমরা সকলেই। পৃথিবীতে কেউ বলতে পারবে না, এদের ছাড়াই পৃথিবীতে তার আগমন!। বাবা ব্যতীত একমাত্র হযরত ঈসা (আ) হযরত মারইয়াম (আ)-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেছেন। পৃথিবীর প্রথম মানুষ, প্রথম নবী হযরত আদম (আ) পিতা-মাতা ছাড়াই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টি করেছেন। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা প্রমাণ করলেন পিতা ছাড়াও তিনি সৃষ্টি করতে সক্ষম, আবার পিতা-মাতা উভয়কে ছাড়াও সৃষ্টি করতে সক্ষম।
আমাদের প্রত্যেকেই মা-বাবার মধ্য দিয়েই এই দুনিয়ায় আগমন। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের প্রথম শিক্ষক হলেন আমাদের মা। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আমাদের জীবনে প্রথম বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আমাদের মা। বাবা অনেকটাই সহকারী শিক্ষকের ভূমিকায় থাকেন। এই প্রতিষ্ঠান আমাদের প্রত্যেকের জীবনে পৃথিবীর সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও অনেক উঁচু স্থান দখল করে আছে। এ জন্যই একজন দার্শনিক বলেছিলেন, “Give me a good mother, I will give you good nation”
আমাদের প্রত্যেকের জীবনে আদর্শ শিক্ষার হাতে খড়ি আমাদের পরিবার। এটিই মূল্যবোধ শেখার প্রথম পাঠশালা। সদা সত্য কথা বলা, বড়দের সম্মান করা, ছোটদের ¯েœহ করা, খারাপ কথা না বলার পাঠ আমরা প্রত্যেকেই এখান থেকেই পেয়েছি। রোজা ফরজ হয়নি তা-ও সেহরি খেয়ে সবার সাথে রোজা রাখার অভ্যাস এখান থেকেই গড়া। মনে আছে আমরা কতদিন যে মায়ের সাথে অভিমান করেছি, সেহরিতে কেন আমাকে ঘুম থেকে জাগাওনি? মিথ্যা কথা, কান মলা, অথবা কানে ধরে উঠ-বস করার শাসন এখানেই শুরু। নামাজ কী তা-ও আমরা বুঝিনি, কিন্তু বাবার জামা ধরে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার শিক্ষা এই জায়গা থেকেই পাওয়া। কে আছে মসজিদে নিয়ে না যাওয়ার কারণে কান্নাকাটি করিনি? তখন তো আমরা কেউই আল্লাহ-রাসূল সম্পর্কে কিছুই জানতাম না? তাহলে কিভাবে এমন অনুভূতি জন্মালো আমাদের জীবনে? সত্যি বিস্ময়কর!! এটাই আসল শিক্ষা। এটাই মূল্যবোধ। এটাই জীবনের আসল ভিত্তি। ফাউন্ডেশন যত মজবুত ইমারত যেমনি তত লম্বা হয়, ছোটবেলার এই ফাউন্ডেশনের ইমারতের ওপর দাঁডায় আমাদের জীবনের ভিত্তি।
আমাদের শিক্ষাজীবনের ফাউন্ডেশন আমাদের পরিবার। এই শিক্ষার ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠে আমাদের জীবনাদর্শ। প্রথমত, শিশুদেরকে বাল্যবয়সেই পরিশোধন-পরিমার্জন করে শিষ্টাচারী, শক্তিশালী ও যোগ্যতাসম্পন্ন করে গড়ে তুলতে পারে। কারণ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর আকিদা, বিশ্বাস, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও চিন্তাধারার সঠিক সংস্কার ও পরিশোধন ততক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত একটি মানবশিশুর অন্তরে বাল্যবয়সেই সে বীজ বপন করা না হবে। আর সে বীজ বপন করতে পারে একমাত্র শিক্ষা ও তালিম-তারবিয়াত। এ ধরনের তালিম তারবিয়াতের মাধ্যমে যে বীজ বপন করে সংস্কার ও পরিশোধন করা হবে, তা হবে শিলালিপির মতো স্থায়ী। তাই বলা ভালো, মুসলিম উম্মাহর পরিবর্তন, পরিশোধন ও সংস্কার সাধন, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ এবং তালিম-তারবিয়াতের পদ্ধতিতেই সম্ভব। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-বেদনা ও চ্যালেঞ্জগুলো সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা সহকারে যদি বুঝিয়ে দেয়া না হয়, তাহলে তা জাতির ভাগ্য পরিবর্তনে এবং ব্যক্তি ও সমাজ গঠনে কোনো কাজে আসবে না।
দ্বিতীয়ত, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি ও বাবা-মায়ের মধ্যে, দয়া-অনুগ্রহ, ভালোবাসা, নিরাপত্তা, সহমর্মিতা ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, সঠিকভাবে পরিবার গঠন করা এবং শিশুকে সঠিকভাবে সার্বিক দিক দিয়ে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যথাযথ তালিম-তারবিয়াতের ব্যবস্থা করা।
তৃতীয়ত, বাবা-মা ও অভিভাবকদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা ও তালিম-তারবিয়াত বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা, যাতে একটি পরিবার ইতিবাচক ও কার্যকর তালিম তারবিয়াতের ভিত্তিতে শান্তি, নিরাপত্তা ও ভালোবাসার মধ্য দিয়ে শিশুকে গড়ে তোলার ব্যবস্থা করতে পারে এবং শিশুকে আত্মিক, মানসিক, জৈবিক ও সামাজিকভাবে গঠন ও তার মেধা-যোগ্যতার বিকাশের জন্য হাতে-নাতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
তাই জ্ঞান-বিজ্ঞানের যেকোনো শাখা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং মানবসভ্যতার যেকোনো জাতি গোষ্ঠী থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হলে সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে আদর্শ শিশু তৈরির টার্গেট নিয়ে আমাদের এমন একটি পূর্ণাঙ্গ কারিকুলাম ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে কোন বিজ্ঞানের সাথে কী ধরনের পদ্ধতি এবং কোন জাতির জন্য কী ধরনের ব্যবহার ও পদ্ধতি গ্রহণের মাধ্যমে মুসলিম জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও হেফাজত করা যাবে, তা সঠিকভাবে অনুধাবন করা যাবে। এ জন্য মুসলিম চিন্তাবিদ, সংস্কৃতিবিদ, গবেষকদেরকে অবশ্যই ধৈর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও অবিচলতার গুণে গুণান্বিত হয়ে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তাদের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
তাহলে মুসলিম উম্মাহ ও জাতির পুনর্গঠনের জন্য অদূর ভবিষ্যতে, সার্বিক দিক দিয়ে যোগ্য এমন একটি দল বেরিয়ে আসবে, যারা নিজেদেরকে বীরত্বের পরিচয় দিয়ে, রেসালাতের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সাহসিকতার সাথে এগিয়ে যাবে। তারাই জাতির নেতৃত্ব দেবে এবং মুসলিম উম্মাহর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলবে। যারা জাতির ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখবে। জাতি খুঁজে পাবে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক একদল নাগরিক।
শিশু-শিক্ষা ও শিশু-পরিচর্যা : মুসলিম সংস্কৃতি, সভ্যতা ও চিন্তাধারার পরিশোধন ও প্রশস্তকরণের মাধ্যমে জাতিকে কিছু উপহার দিতে হলে যেমনিভাবে সভ্যতা, সংস্কৃতি ও জ্ঞান-শিক্ষার ইসলামীকরণের ভিত মজবুত করতে হবে, তেমনিভাবে মুসলিম উম্মাহকে শিশু শিক্ষা ও তালিম-তারবিয়াতের প্রতি সক্রিয় করতে হবে। এবং শিক্ষক, অভিভাবক, নেতা, দায়িত্বশীল চিন্তাবিদ ও গবেষকগণকে তাদের লেখনী, গবেষণা ও সাহিত্য, কর্মে নতুন কিছু তৈরি করার মাধ্যমে জাতিকে অগ্রগতির প্রতি উদ্ধুদ্ধ করতে হবে।
মুসলিম উম্মাহর পরিশোধন ও সংস্কার সাধনের সফলতা অর্জনের জন্য শিশু-শিক্ষা, তালিম-তারবিয়াত এবং শিক্ষা-বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক গবেষণার একান্ত প্রয়োজন। কারণ, তালিম-তারবিয়াত এবং শিক্ষার উপকরণ সিলেবাস ও মাধ্যম ইত্যাদিও উন্নয়ন ব্যতীত যোগ্যতাসম্পন্ন ভারসাম্য জাতি গঠনের ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
জাতীয় জীবনে আজ সামাজিক মূল্যবোধ সম্পূর্ণ ভূলুণ্ঠিত। একটি উচ্ছৃঙ্খল জাতির যতগুলো বৈশিষ্ট্য এক এক করে আমরাও যেন তা আজ সেগুলোর সাথে সম্পৃক্ত হতে চলছি। মানুষ যত আধুনিক ধারায় শিক্ষিত হচ্ছে ততই যেন ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশে আজ সামাজিক ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে যে ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী আত্মিক এবং ধর্মীয় সদাচারের অবক্ষয় ঘটানো হচ্ছে তার ফলে কী হচ্ছে? আজ ছাত্ররা শিক্ষককে পেটাচ্ছে। শিক্ষক তার নারী ছাত্রীকে যৌন নির্যাতন করছেন! অথচ সে মেয়েতুল্য। ছাত্ররা সহপাঠী ছাত্রীদের উৎসব করে ইজ্জতহানি ঘটাচ্ছে! অথচ সে তার বোনের মতো। পিতা পুত্রকে; মা ছেলেকে; ছেলে মাকে; ভাই বোনকে; এরকম অসংখ্য রকম নির্যাতন, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও দুঃশাসন সমাজকে গোটা সমাজকে আজ অক্টোপাসের মতো ঘিরে ফেলেছে। প্রতিদিন গড়ে ১১ জন করে খুন হচ্ছে। এই সরকারের সময় সবচেয়ে সস্তা হলো মানুয়ের জীবন। বিশেষ করে নারীনির্যাতন বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। ইভটিজিং এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে। সাথে যোগ হয়েছে শিশুহত্যার মতো জঘন্য নিষ্ঠুর ও অমানবিক অপরাধ।
সরকার বিরোধী দলের নেতাদের ফাঁসি, জাতিবিধ্বংসী সকল প্রশ্নপত্র ফাঁস করা নিয়েই যেন ব্যস্ত!! মনে হচ্ছে যার যত ক্ষতি করার ক্ষমতা তার প্রভাব-প্রতিপত্তি তত বেশি। আজ এমন এমন জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে যা পশু থেকে আরো নিম্নপর্যায়ে আমাদের মর্যাদাকে নামিয়ে দিয়েছে। হার মানাচ্ছে আইয়্যামে জাহিলিয়াতকেও। অথচ সমাজে কেউই অপরাধী হিসেবে জন্মগ্রহণ করে না। সমাজই তাদের অপরাধী করে তোলে। সামাজিক ব্যবস্থাই এর জন্য দায়ী। ব্যক্তি ও সমাজের ঠিক লক্ষ্যে পরিচালনার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কিন্তু সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আজ ব্যর্থ।
মানুষকে আল্লাহ তায়ালা একদিকে কর্মের স্বাধীনতা দিয়েছেন, অন্যদিকে পরীক্ষার জন্য তার দেহে দিয়েছেন দু’টি সত্তা, ১) Humanity(মানবতাবোধ) ২) Animality (পশুত্ব)। Humanity যখন Animality-এর ওপরে বিজয়ী হয় তখনই মানুষ নামক আসল ব্যক্তিটি মানুষের চোখে পরিগ্রহ হয়। তার কাছে মানবতাবোধ ও কল্যাণ ছাড়া কিছুই আশা করা যায় না। Animality বা পশুত্ব যখনই Humanity বা মানবতাবোধের ওপরে বিজয়ী হয় তখন মানুষের দেহ নামক খোলসটি হয়ে পড়ে অন্তঃসারশূন্য, হারিয়ে ফেলে তার মনুষ্যত্ব। আজকের সমাজে যেন সে পশুত্বেরই জয়জয়কার। মানবতা যেন ডুকরে কাঁদছে।
শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে শত শত বছরব্যাপী গড়ে তোলা একটা গৌরবময় শ্রেষ্ঠ জাতির সাইকোলজিক্যাল মেকআপ ভেঙে দেয়ার ফলেই যে আজ গোটা সমাজ বন্ধনহীন, উচ্ছৃঙ্খল ও অসভ্য হয়ে উঠেছে তা অস্বীকার করা যায় না। আর এ অসভ্যতা, উচ্ছৃঙ্খলতা ও বন্ধহীনতার এই সরকারের দুই বছরের দিকে তাকালেই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কেমন মানুষ তৈরি করছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্রটি ফুটে উঠবে।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে Charles Booth, ÔLife and Labour of the People of London’ শীর্ষক যে গ্রন্থ রচনা করেন তাতে অপরাধ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা স্থান পায়। শিল্পায়নের ফলে প্রগতির সাথে সাথে যে নতুন ধরনের সামাজিক সমস্যা বিশেষ করে অপরাধ সৃষ্টি হয় সে সম্পর্কে Booth অবগত ছিলেন। তিনি এসব সামাজিক সমস্যা দূরীকরণের জন্য সমস্যার গভীরে প্রবেশ করে অপরাধ সম্পর্কে বিজ্ঞানভিত্তিক পন্থায় তথ্যাবলি সংগ্রহ করেন।
আমেরিকাবাসীরা মনে করত যে, অপরাধ, পাপাচার, দারিদ্র্য এবং নীতিবর্জিত কাজ সবই মূলত একইভাবে সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দোষণীয়। কিন্তু তারা অপরাধ নির্মূলের জন্য বিশেষ কোন পন্থা গ্রহণ করতে পারেনি। কারণ এটি মূল্যবোধ বিকাশ ছাড়া কি সম্ভব?
অপরাধ এবং অপরাধীর আচরণ সমাজের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাই যুগ যুগ ধরেই অপরাধ তথা অপরাধী সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে দেখা যায়। হোমারের কাব্যে প্রতিফলিত হয়েছে অপরাধের কাহিনী। শেকসপিয়রের হেমলেট, মার্চেন্ট অব ভেনিসের শায়লক এবং এনটোনিও কাহিনী মূলত অপরাধ এবং মানবীয় আচরণের এক বিশেষ চিত্র। অপরাধ সম্পর্কে কাব্য, প্রবন্ধ, নাটক, উপন্যাস, চলচ্চিত্র ইত্যাদি তৈরি হয়েছে। কিন্তু অপরাধ রোধের কোনই কূলকিনারা করা যাচ্ছে না।
আজকের সময়ে জীবন, সম্পত্তি এবং স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অপরাধী এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। রাষ্ট্রকে নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি এবং স্বাধীনতা রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এটি নাগরিকের প্রতি কারো করুণা নয় বরং দায়িত্ব। কেউ নাগরিক অধিকার ক্ষুণ্য করলে রাষ্ট্রই আইনের প্রয়োগ করে অপরাধীকে চিহ্নিত করে তার শাস্তি বিধান করে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করবে। কিন্তু বর্তমানে দেশের নাগরিক, রাষ্ট্রের নিকট আশ্রয় তো দূরের কথা বরং নিগৃহীত হচ্ছে। বাংলাদেশ এখন সেই নিপীড়ক রাষ্ট্রের নাম। যেখানে মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত। আইনের শাসন বিরোধী মতের জন্য এক, শাসকগোষ্ঠীর জন্য ভিন্ন।
গায়েব ইযিজিওফোর মৌলিক অধিকারের সংজ্ঞা এভাবে দিয়েছেন, “মানবীয় অথবা মৌলিক অধিকার হলো সেইসব অধিকারের আধুনিক নাম যাকে ঐতিহ্যগতভাবে অধিকার বলা হয় এবং তার সংজ্ঞা এই হতে পারে যে, সেইসব নৈতিক অধিকার যা প্রত্যেক ব্যক্তি প্রতিটি স্থানে এবং সার্বক্ষণিকভাবে এই কারণে পেয়ে থাকে যে, সে অন্যান্য সকল সৃষ্টির তুলনায় বোধশক্তিসম্পন্ন ও নৈতিক গুণাবলির অধিকারী হওয়ায় উত্তম ও উন্নত। ন্যায়বিচারকে পদদলিত করা ব্যতিরেকে কোন ব্যক্তিকে এসব অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না।”
রাষ্ট্র নাগরিককে শাসন করবে। কিন্তু এই কাজটি করবার জন্য তার সমর্থন প্রয়োজন। সে সমর্থন যদি না থাকে তাহলে মানুষকে শাসন করার নৈতিক শক্তি সে সরকারের থাকে না। ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকার সে নৈতিক শক্তি হারিয়েছে। তাই নাগরিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতদের আর মানতে চাচ্ছে না। কারণ জোর করে মানুষকে বেশি দিন শাসন করা যায় না। এই অবৈধ সরকারের শাসন যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, অপরাধ তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৯৭২-৭৪-এর মতো হঠাৎ করেই যেন প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অপরাধ। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, খুন, ছিনতাই, ধর্ষণ আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও ঘটছে খুনের ঘটনা। ঘরে বাইরে কোথাও নিরাপত্তা নেই। মায়ের পেটেও ঘাতকের বুলেটের নির্মম আঘাতের শিকার নবজাতক। সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে। নৃশংসভাবে হত্যা করা হচ্ছে ছোট্ট শিশুদেরও। রাজধানীতে সুটকেসের ভেতর থেকে এক শিশুর লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক এক সংস্থার তথ্য মতে, শীর্ষ ১০ অপহরণের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণেই সমাজে অপরাধ বেড়ে যায়। বেপরোয়া হয়ে ওঠে অপরাধীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গোয়েন্দা নজরদারিতে ব্যর্থ হচ্ছে। কারণ পুলিশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন রাজনৈতিক বিরোধী মত দমনেই ব্যস্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে অপরাধে। একটি অংশ হিমশিম খাচ্ছে ভিআইপি পাহারায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন নিজেদেরকে সরকারের ভাবতে শুরু করেছে। এ কারণে খুন-ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলো বাড়ছে বেশি। হাত বাড়ালেই মিলছে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। সন্ত্রাসী থেকে শুরু করে দলীয় ক্যাডারদের হাতে হাতে শোভা পাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। তুচ্ছ ঘটনার জেরে একে অপরের দিকে অস্ত্র তাক করতে কুণ্ঠাবোধ করছে না। শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই শুধু নয়, পাড়ার ছিঁচকে সন্ত্রাসীর হাতেও রয়েছে অস্ত্র।
পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত প্রথম ৬ মাসে সারা দেশে ২ হাজার ৮০ জন খুন হয়েছেন। এই হিসেবে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২ থেকে ১৩ জন খুন হচ্ছেন। তবে প্রকৃত খুনের সংখ্যা আরও বেশি। অপহরণের শিকার হয়েছেন ৪ শতাধিক ব্যক্তি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ৩২৫টি। এ ছাড়া প্রথম ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারা দেশে ১০ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছে ১৫৩ জন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন অন্তত সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি মানুষ। মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার প্রবণতাও বেড়ে গেছে আগের চাইতে অনেক বেশি। অধিকার বলছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭৭ জন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। (৭.৮.১৫, সূত্র : মানবজমিন)
বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের হিসাবে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে দেশে মোট ৩ হাজার ৬৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই মাসে দেশে ১১১ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া একই সময় রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৫৩ জন নিহত ও ৪ হাজার ৫৭৮ জন আহত হয়েছেন। যৌতুক সহিংসতায় ১১০, ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩৬৬ জন। এ ছাড়া গণপিটুনিতে নিহতের সংখ্যা ৭৭ জন।
(চলবে)
লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
সহকারী সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা

SHARE

Leave a Reply