মোমিনের মৃত্যুভাবনা -তোহুর আহমদ হিলালী

মৃত্যু অনিবার্য। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলেই স্বীকার করে। সবারই কথা যেহেতু পৃথিবীতে এসেছি তাই একদিন এখান থেকে চলে যেতে হবে। অবিশ্বাসীর কাছে এই আসা-যাওয়া স্রেফ একটি দুর্ঘটনা এবং মৃত্যুর মাধ্যমে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটা। পক্ষান্তরে একজন বিশ্বাসী মনে করে যে সে তার মহান রবের পরিকল্পনানুসারে এ পৃথিবীতে এসেছে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়কাল এখানে অবস্থান করে আবারো তাঁর কাছে ফিরে যাবে। তার এটাও বিশ্বাস যে, দুনিয়ার এই সময়কালে তার দ্বারা সাধিত ভালো-মন্দের চুলচেরা বিচার হয়ে সেখানে তাকে পুরস্কার বা তিরস্কারের মুখোমুখি হতে হবে। ফলে উভয়ের জীবনধারায় সৃষ্টি হয় বেশ পার্থক্য। কাফির এ দুনিয়ায় তার নিজের খেয়াল-খুশিমত বল্গাহীন জীবন যাপন করে পক্ষান্তরে মোমিন তার রবের দেয়া নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করে।
এ দুনিয়ায় মানুষের বাঁচার আকুতি প্রকৃতিজাত। কাফির-মোমিন সবাই বাঁচতে চায়। কবি গোলাম মোস্তফার ভাষায়-‘মরিতে চাহিনা আমি এ সুন্দর ভুবনে’। অশীতিপর বৃদ্ধও বাঁচার আশায় সিঙ্গাপুর ও ইউরোপ-আমেরিকা দৌড়াদৌড়ি করে এবং ওঈট-তে তাকে কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়।
একজন মুমিনের জন্য মৃত্যু কি আদৌ কোন ভয়ের। কারণ মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং একটি নির্দিষ্ট সময়েই কেবল মৃত্যু আসবে। মৃত্যু এড়িয়ে চলার সাধ্য কারো নেই। আল্লাহর ভাষায়- ‘মৃত্যু তোমাকে ধরবেই ধরবে সুরক্ষিত দালানে থাকলেও।’ শুধু কি মৃত্যু; বিপদাপদও নিজ থেকে আসে না বা কেউ চাপিয়ে দিতে পারে না যদি না আল্লাহতায়ালার ইচ্ছা না থাকে। তাঁর ভাষায়- ‘কোন বিপদ কখনই আসে না আল্লাহর অনুমতি ছাড়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ঈমান রাখে আল্লাহ তার দিলকে হেদায়েত দান করেন’। মোমিন হয় সাহসী। সে তার রবের ওপর ভরসা করে সম্মুখ পানে এগিয়ে চলে। সে সতর্ক ও কৌশলী হয় কিন্তু থেমে থাকে না। বিচিত্র মুমিনের অবস্থা। হাদিসের ভাষায়- ‘সব অবস্থা তার জন্য কল্যাণকর। ভালো থাকলে সে তার রবের শোকর আদায় করে এবং আবার বিপদগ্রস্ত হলে ধৈর্য অবলম্বন করে’। এ দুনিয়া একটা পরীক্ষাগার। আল্লাহপাক তাঁর ইলমের ভিত্তিতে কাউকে পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন না, বরং তিনি দেবেন তাঁর বান্দাহর আমলের ভিত্তিতে। এখানে জালেম ও মজলুম উভয়েরই পরীক্ষা চলছে। জালেমের পরীক্ষা হলো, সে কতখানি সীমালঙ্ঘন করে; আর মজলুমের পরীক্ষা সে ঈমানের দাবিতে কতখানি অবিচল থাকতে পারে। আবার পরীক্ষা আসতে পারে রোগ-শোক, ব্যথা-বেদনা, ফসল ও ব্যবসা-বাণিজ্যের হানি দ্বারা, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা বা কোন জালেমের পক্ষ থেকে। আল্লাহপাক ঈমানদারের মনে এ প্রত্যয় দান করেন যে আল্লাহই তাকে এ বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন। জীবনদানের প্রশ্নেও  মোমিন থাকে অবিচল। কারণ সে জানে এ জীবন আল্লাহরই দেয়া এবং মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে আল্লাহরই কাছে ফিরে যাবে। আল্লাহর শেখানো উক্তিই তার মুখ থেকে উচ্চারিত হয়- ‘নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই জন্য এবং তাঁরই কাছে ফিরে যাবো। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।’ সন্তানের যেমন তার মায়ের কাছে ফিরে যেতে আপত্তি থাকে না; ঠিক মুমিনেরও তার পরম বন্ধু ও অভিভাবক মহান আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে কোন আপত্তি নেই। আল্লাহ তাঁর এ সব বান্দাহর মৃত্যুর সময় অভিবাদন জানানোর জন্য একদল ফেরেশতা নিয়োগ করেন। যারা বলেন, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, এ দুনিয়ার জীবনে আমরা তোমাদের সাথী এবং আখিরাতেও’। আর আল্লাহপাক তাঁর পথে জীবন দানকারীদের মৃত বলতে নিষেধ করেছেন। তাঁর ভাষায়- ‘যারা আল্লাহর পথে নিহত হন তাদেরকে মৃত বলো না, তারা জীবন্ত, তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোন চেতনা নেই’। আবার কোথাও বলা হয়েছে যে তারা রিজিকপ্রাপ্ত। কতই না ভাগ্যবান আল্লাহর পথে আহ্বানকারী এসব বান্দাহ। মোমিন তার এ দুনিয়ার জীবনটা পরিচালনা করে তার রবেরই নির্দেশনানুযায়ী। উদ্দেশ্য আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি ও আখিরাতে অনন্ত সুখের স্থান জান্নাতপ্রাপ্তি। এ জান্নাত পাওয়া যাবে অবশ্যই মৃত্যুর পর। দুনিয়ার জীবনটা নানা দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, রোগ-শোক ও জ্বালা-যন্ত্রণায় ভরা। মৃত্যু এসব কষ্ট থেকে মুক্তি দান করে ও আখিরাতে জান্নাতে যাওয়ার পথ খুলে দেয়।
আমি একজন মোমিন ও মুসলিম। এ জন্য আমার মধ্যে রয়েছে প্রচন্ড গর্ববোধ। আমার আল্লাহর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা যে, তিনি ঈমানের মত শ্রেষ্ঠ নেয়ামত আমাকে দান করেছেন। আমার মধ্যে আমার রবের কোনো নাফরমানি নেই। তাঁর দেয়া ফরজ-ওয়াজিব পালনেও আমার মাঝে কোনো শৈথিল্য নেই। এ সবই আমার রবের মেহেরবানি। আমার বয়স উম্মতে মুহাম্মদির স্বাভাবিক বয়স ছুঁই ছুঁই করছে। আমার রাসূল (সা) ইন্তেকাল করেন ৬৩ বছর বয়সে এবং তাঁর চার খলিফাও এমনি বয়সেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল (সা) অতি বার্ধক্য থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতেন। অতি বার্ধক্য বড় বিড়ম্বনার নিজের ও পরিবারের জন্য। তাই আল্লাহর কাছে নিবেদন করি, ‘হে পরোয়ারদিগার-পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হওয়ার আগ পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখ’। আমার মৃত্যু কিভাবে, কখন ও কোথায় তা আমার জানা নেই। এই না জানাটাও বান্দাহর জন্য আল্লাহপাকের মেহেরবানি। মানুষ বুঝতে পারলে তার চলার গতি থেমে যেত। আমার মৃত্যু গুম, খুন, দুর্ঘটনা না রোগব্যাধিতে তা আমি জানি না বা এ ব্যাপারে আমার কোন পেরেশানিও নেই। কারণ আমার এ প্রিয় দেশটি তার নাগরিকদের শান্তি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে আর পারছে না। প্রতিনিয়তই গুম, খুন ও দুর্ঘটনার খবর আসে। আল্লাহর বান্দাহ ও প্রতিনিধি হিসেবে যোগ্যতা ও ক্ষমতানুসারে আমি সর্বোচ্চ সতর্ক জীবনযাপন করবো এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেবো। কিন্তু নির্ভরশীল হবো আমার রবের ওপর। এটাই আমাকে আমার রাসূল (সা) শিখিয়েছেন। অসুস্থ হলে আমি সাধারণ মানের চিকিৎসা চাই; বিদেশে নেয়া বা ওঈট-তে রাখাতো নয়ই। কারণ আমি জানি আরোগ্য দানের ক্ষমতা আমার আল্লাহর। তিনি আমার জন্য যথেষ্ট। আমি আশা করি না তারপরও যদি গুম-খুনের শিকার হই তাহলে আমার স্বজনদের বলি পেরেশান না হয়ে আল্লাহর ওপর আমাকে সোপর্দ করতে।
আল্লাহপাক মোমিনদেরকে বারবার আহবান জানিয়েছেন যে, তারা যেন কেবল তাঁরই ওপর ভরসা করে। আর ভরসা করার মতো প্রকৃত সত্তাই হলেন তিনি। আমি আল্লাহপাকের প্রতিনিধি। আল্লাহর বিধানের বাইরে যদি আমাকে কেউ আঘাত করে তাহলে আমি মনে করি সে আঘাত আমার আল্লাহকেই করা হয়। আমি জানি আল্লাহর বান্দাদের সাথে সদাচরণ বা তার সেবাযত্ন করা হলে তা আল্লাহকেই করা হয় (হাশরের দিন বিচারে বসিয়া শুধাবে জগৎস্বামী, তুমি মোরে কর নাই সেবা যবে রুগ্ণ যে ছিলাম আমি। এটা শুধু কবিতার অংশই নয়, এটা রাসূল (সা)-এর বাণীও); তেমনি আল্লাহর বান্দাহদের সাথে অসদাচরণ বা জুলুম করা হলে তা আল্লাহরই সাথে করা হয়। পুলিশ বাহিনীর কোন সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হলে আমাদের ওএচ মহোদয় বলেন, এ আঘাত তো আমারই ওপর, আমি অবশ্যই বদলা নেবো।
একজন মোমিন হিসেবে আমি বলবো আমার ওপর জুলুমের বদলা নেয়ার দায়িত্বও আমার আল্লাহর। ফলে আমার কোন পেরেশানি নেই। হ্যাঁ, বদলা নেয়ার ঘোষণাও তিনি অগ্রিম দিয়ে দিয়েছেন-‘যারা ঈমানদার নর ও নারীকে কষ্ট দেয়, অতঃপর তওবা করে না, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আজাব, আছে ভস্ম হওয়ার শাস্তি’। মানুষ আল্লাহতায়ালার বড় আদরের সৃষ্টি, সৃষ্টির সেরা, তাঁর খলিফা (প্রতিনিধি)। তাঁর বান্দাহদের প্রতি সামান্য গালমন্দও তাঁর কাছে অসহ্য। যারা মানুষকে কষ্ট দেয় ও সম্মান হানি করে তাদের প্রতি আল্লাহর চরম ক্রোধ প্রকাশ পেয়েছে এভাবে-‘নিশ্চিত ধ্বংস তাদের জন্য যারা মানুষকে সামনা-সামনি গালাগাল করে ও পেছনে দোষ প্রচার করে’। ঐসব হতভাগার জন্যই রয়েছে হুতামা (চূর্ণ-বিচূর্ণকারী স্থান) যা সম্পর্কে বলা হয়েছে আল্লাহর আগুন প্রচন্ডভাবে উত্তপ্ত-উৎক্ষিপ্ত।
মৃত্যু-পরবর্তী অনন্তকালের জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিয়েই আমার চিন্তা। আমার ভরসা এই যে, আমি আমার আল্লাহর অবাধ্য বান্দাহ নই, একজন অনুগত বান্দাহ। আমার বিশ্বাসে কোনো দুর্বলতা নেই। আল্লাহ আমার রব (প্রভু), রাসূল (সা) আমার নেতা ও পথপ্রদর্শক, কুরআন আমার জীবনবিধান-এ বিশ্বাসে কোন খাদ নেই। হালাল রুজির ব্যাপারে আমি আপসহীন, কবিরা গুনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করি। সর্বোপরি যে কারণে আমি আমার রবের রহমতের বেশি প্রত্যাশী তা হলো এই যে, আমি তাঁর বান্দাহদের সাথে সদাচরণের চেষ্টা করি-তা হোক আমার বাবা-মা ও স্ত্রী-পুত্র-পরিজন, চলার পথে সাথী, অধীনস্থ বা যে কোন আল্লাহর বান্দাহ। আমি আমার রাসূল (সা)-এর এ বাণী খুব করে অনুভব করি-‘জমিনে যারা আছে তাদের সাথে সদাচরণ করো, তাহলে আসমানে যিনি আছেন তিনিও তোমাদের সাথে সদাচরণ করবেন’। আমি বড় কাতরভাবে আমার আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি- ‘পরোয়ারদিগার, তুমি আমার ও আমার সকল প্রিয়জনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দাও, আমাদেরকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ঈমানের ওপর অবিচল রাখ, এমন বিপদ দিও না যা আমরা সহ্য করতে না পারি। আমাদের এ প্রিয় জন্মভূমিকে আমাদের জন্য নিরাপদ করে দাও। সকল প্রকার জুলুম থেকে আমাদেরকে হেফাজত করো’। আমিন। হ
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply