মৌসুমি ফলের পুষ্টিগুণ -ড. উম্মে নাজিয়া

ফল পুষ্টির ভান্ডার, ফল পছন্দ করে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। ফলের আকর্ষণীয় রঙ এবং গন্ধে এর পুষ্টির নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। ফলে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের ভিটামিন, মিনারেলস্ এবং ফাইবার যা মানুষের সুস্থ থাকার জন্য অতি জরুরি। ফল না খেয়ে দীর্ঘদিন সুস্থ থাকা সম্ভব নয়। যে সমস্ত মানুষ খাবারের সঙ্গে কোন না কোন ফল খেয়ে থাকে তাদের খাবার সুষম হয়ে থাকে এবং তাদের স্বাস্থ্য ভালো থাকে এবং যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ থেকে তারা মুক্ত থাকে। পুষ্টিবিদদের মতে প্রতিদিন যে ব্যক্তি  অর্ধেক প্লেট ফল এবং অর্ধেক প্লেট সবজি খেয়ে থাকে তাদের খাবার সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। ফলে রয়েছে প্রচুর পটাশিয়াম, ভিটামিন সি, ফলিয়েট (ফলিক এসিড) এবং ফাইটো  কেমিক্যালস্ যা রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলের পটাশিয়াম মানুষের হার্টকে সুরক্ষিত রাখে এবং শরীরের রক্তপ্রবাহ সঠিক রাখতে সাহায্য করে, ফলে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়। এই পটাশিয়াম কিডনিতে পাথর হওয়া রোধ করে। কলা এমন একটি ফল যেখানে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম রয়েছে। প্রতিদিন দু’টি করে কলা খেলে পটাশিয়ামের ঘাটতি সহজেই পূরণ হয়। উঠতি বয়সের বাচ্চাদের পটাশিয়াম খুবই জরুরি যা তাদের হাড় ও দাঁতের ক্ষয় রোধ করে। ফলে রয়েছে ফলিয়েট (ফলিক এসিড) যা রক্তের লোহিতকণিকা তৈরিতে সাহায্য করে। মায়ের শরীরে ফলিয়েটের ঘাটতি থাকলে শিশুর ব্রেনের বৃদ্ধি এবং গঠন বাধাগ্রস্ত হয় ফলে শিশুর বিভিন্ন বুদ্ধিগত সমস্যা যেমন : কম বুদ্ধি, হাবাগোবা, স্মরণশক্তি কম হওয়া ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে।
ফলে খুব কম পরিমাণ ক্যালরি ও চর্বি থাকে। এটি সাধারণ চিনির (ঝরসঢ়ষব ঝঁমধৎ) একটি চমৎকার উৎস।
ফলের আঁশ যেমন কিছু দেশী আম, জাম, কাঁঠাল, তরমুজ, খেজুর ইত্যাদিতে প্রচুর ফাইবার রয়েছে। এই সকল আঁশ শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।
ফলে প্রচুর অ্যান্টি অক্সিডেন্টস্ রয়েছে যেমন পলি ফেনলিক ফ্লেভানয়েড্স, ভিটামিন সি এবং অ্যান্থোকাইনস। এই সকল অ্যান্টি অক্সিডেন্টস্ প্রথমত, মানুষের শরীরকে বিভিন্ন অবসাদ থেকে রক্ষা করে, রোগের বিরুদ্ধে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি প্রতিহত করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের শরীরে রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।  ফল এবং সবজিতে প্রচুর পরিমাণ গ্রহণ করলে আমাদের শরীর সেই ক্ষমতা অর্জন করতে পারে।
জাম, বেগুনি জামরুল, খুদি জাম, তুত ফল, বেগুনি বেগুন, বেগুনি বীটে, প্রচুর ফাইটো কেমিক্যালস রয়েছে যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। জামে রয়েছে প্রচুর আয়োডিন যা রক্ত পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
ফলে আরো রয়েছে প্রচুর ভিটামিন এ, পাকা আম, পাকা কাঁঠাল, কমলা, মাল্টা, হলুদ তরমুজ, লাল পেয়ারাতে প্রচুর ভিটামিন এ রয়েছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিশু ভিটামিন-এ এর অভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যাচ্ছে অথচ ছোট থেকেই নিয়মিত ফল খেলে এই সমস্যাগুলো হতো না। কেউ যদি পুরো গ্রীষ্মকালে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম করে নিয়মিত পাকা কাঁঠাল খায় তাহলে ঐ বছরের জন্য তার ভিটামিন-এ চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ করে। আমরা জানি আমাদের শরীরের যকৃৎ ভিটামিন-এ কে সংরক্ষণ করে রাখে। ফল টাইপ-২ ডায়াবেটিস থেকে সুরক্ষা দেয়। নিয়মিত ফল খেলে শরীর ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
আমাদের দেশে প্রত্যেক মৌসুমে কম বেশি ফল পাওয়া যায়। এবং এই ফল গ্রীষ্মকালে বেশি পাওয়া যায়। এসব ফল প্রচুর ভিটামিন ও খাদ্যপ্রাণে ভরপুর। কিন্তু দুঃখের বিষয়ে হলো কিছু অসৎ ব্যবসায়ী এবং ফড়িয়ার কারণে আমাদের দেশের ফলে যে পুষ্টিমূল্য রয়েছে তা আমরা পাচ্ছি না। অসময়ে ফল পেড়ে শুধুমাত্র অধিক মুনাফার লোভে ব্যবসায়ীরা তা বিভিন্ন মারাত্মক কেমিক্যাল্স দিয়ে পাকাচ্ছে। এসব কেমিক্যাল্স মানুষের শরীর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। যেমন আমের গাছে থাকা অবস্থায় ফরমালিন স্প্রে করা হচ্ছে, ক্যালসিয়াম এবং ইথিলিন স্প্রে করে তাতে রঙ আসা এবং পাকানো হচ্ছে। তাই সকল ফলের  সাদ নিম্নমানের এবং পুষ্টিমূল্য নেই বললেই চলে।
উপরিউক্ত যেসব কেমিক্যাল্স দেয়া হচ্ছে তা মানুষের পেটের পীড়া, কিডনি অকেজো হওয়া, শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ মারাত্মক পাকস্থলীর ক্ষতি করে থাকে। আমরা প্রায়ই পত্রিকার পাতায় তাকালেই দেখি লিচু, তরমুজ খেয়ে মানুষ মারা যাচ্ছে অথবা তার জীবন সংশয়  দেখা দিচ্ছে। এটি খুবই দুঃখের বিষয়। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত আম উৎপাদনে পৃথিবীর মধ্যে শীর্ষ স্থানে রয়েছে। এর পর রয়েছে পাকিস্তান, ফিলিপাইন এবং বাংলাদেশ। মৌসুমের শুরুতেই ভারত থেকে মারাত্মক রাসায়নিকসমৃদ্ধ বিষসমতুল্য আম বাংলাদেশে আসছে। অবাক বিষয় হলো বাংলাদেশের উচ্চবিত্তের লোকেরা এসব আমের বড় ক্রেতা, তারা এগুলো খাচ্ছেন। আমরা যদি এসব না খেতাম তাহলে এগুলোর বাজার বন্ধ হয়ে যেত। সকলের উচিত বিষমুক্ত আম কেমন তা চিনে নেয়া। এই আম, লিচু, তরমুজ অতিরিক্ত রঙিন হয় না। আমের প্রাকৃতিক মিষ্টি ঘ্রাণ থাকবে। চামড়া-ত্বক মসৃণ থাকবে এবং টাইট থাকবে, খেলে তেতো ভাব থাকবে না। লিচু অসম্ভব লাল হবে না, নিচের দিকে হালকা সবুজ থাকবে। তরমুজের ভেতরে অসাধারণ লাল টকটকে থাকবে না, বোঁটা তাজা থাকবে। এ ছাড়া মৌসুমের আগে কখনোই তা পাওয়া সম্ভব নয়, এ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে জীবন বাঁচাতে ফল জীবন নষ্ট করতে নয়। ক্যালসিয়াম কার্বাইডযুক্ত আম খেলে ক্যান্সার হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
ভারতের বিজ্ঞানী ড. সাহা তার গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, রাসায়নিক এবং কীটনাশক সমৃদ্ধ ফলমূল এবং শাকসবজি খেলে মানুষের শরীরে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে। যেমন : হরমোনের তারতম্য হয়ে যেতে পারে, যেমন হাইপোথাইরয়েড, পলি সিসটিক ওভারি, ডায়াবেটিস এবং ক্যান্সার। মা যদি এগুলো খায় তাহলে তার দুগ্ধপোষ্য শিশু মায়ের দুধের মাধ্যমে এই বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হবে।
এখন ফলের মৌসুম। আমাদের সব ধরনের ফল খেতে হবে এবং তা আমরা অবশ্যই যাচাই করে খাবো। আমাদের আশপাশ গ্রাম, নিজেদের গাছ, গ্রামের ছোট বাজার কিংবা বাগান থেকে সংগ্রহ করা ফলই সবচেয়ে নিরাপদ হবে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। ফল আমাদের খেতেই হবে এবং তা অবশ্যই বিষমুক্ত নিরাপদ ফল। তাহলেই বুদ্ধি এবং শক্তিতে আমরা সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারব অন্যথায় সম্ভব নয়।

SHARE

Leave a Reply