যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কিন্তু বরাবরই অপরিবর্তনীয় -জালাল উদ্দিন ওমর

প্রতি চার বছর পরপর যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেই বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বছর, সেই বছরের নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী মঙ্গলবার এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই হিসাবে নভেম্বরের ২ তারিখ হতে ৮ তারিখের মধ্যে যেকোনো তারিখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বারই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে বিশ্বব্যাপী মানুষের মাঝে আলোচনা পর্যালোচনা চলে। প্রেসিডেন্ট পদে কে বিজয়ী হলে পররাষ্ট্রনীতি কেমন হবে তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বিশ্লেষণ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে যেই ব্যক্তিই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই অপরিবর্তনীয় থাকে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে যে দলই শাসন করুক না কেন পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে না।

মূলতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বরাবরই এক এবং অভিন্ন। আর কখনো যদি কোন নীতি পরিবর্তন হয়, তাহলে তা প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে স্বতঃস্ফূর্ত কোনো পরিবর্তন নয় বরং সেটা হচ্ছে বিশ্বপরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বাধ্য হয়ে নীতি পরিবর্তন করা। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের জয় পরাজয়ের ফলে মার্কিন নীতিতে উল্লেখযোগ্য এমন কোন পরিবর্তন আসে না, যার ফলে বিশ্ববাসীর জীবন পরিবর্তন হয়। মূলতপক্ষে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্রাটদের ক্ষমতার পালাবদলের কারণে মার্কিন বিদেশ নীতিতে যা পরিবর্তন হয় তা এতই নগণ্য যে, এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কোনো উপকার হয় না। সুতরাং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল পরিবর্তনের কারণে বিশ্ববাসীর ফলাফল পরিবর্তন হবে এমনটি ভেবে আত্মতৃপ্তি লাভের কোন প্রয়োজন নেই। এটা হচ্ছে মিছামিছি একটা প্রত্যাশা যা আপনার স্বপ্নকে কেবল প্রতারিত করবে। আর ভুল পথে অভিযাত্রা কেবলই একটি মরীচিকা যাতে কেবল পথভ্রষ্ট ও বিপদগ্রস্ত হয়। আর নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরকেই পরিবর্তন করতে হবে। এটাই অপ্রিয় সত্য এবং বাস্তবতা।

যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর একক পরাশক্তি। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি। বিশ্বব্যাপী শান্তি এবং অশান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা তাই সবচেয়ে বেশি। সুতরাং তাকে নিয়ে বিশ্ববাসীর কৌতূহলের যেমন শেষ নেই, ঠিক তেমনি তার কাছ থেকে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশাও অনেক বেশি। কিন্তু বাস্তবতাটা একটু ভিন্ন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী মার্কিন আগ্রাসন বন্ধ হবে না এবং ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারও হবে না। ফিলিস্তিন, লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসনও বন্ধ হবে না আবার ফিলিস্তিন স্বাধীনও হবে না। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের বিপক্ষে এবং ইসরাইলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রদানও বন্ধ হবে না। ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে ধ্বংসের জন্য মার্কিন চেষ্টাও বন্ধ হবে না, রাশিয়া এবং চীনকে প্রতিহত করার জন্য তাদের তৎপরতাও বন্ধ হবে না। চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধ আগের মতোই চলবে।

একইভাবে কিউবা এবং ল্যাটিন আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে ধ্বংসের জন্য মার্কিন তৎপরতাও বন্ধ হবে না। উত্তর কোরিয়া এবং ভেনিজুয়েলার প্রতি বৈরিতা আগের মতোই অব্যাহত থাকবে। মিয়ানমারের নির্যাতিত নিপীড়িত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভাগ্যেরও কোনো পরিবর্তন হবে না এবং নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত এসব মুসলমান নিজ দেশে ফিরতেও পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র আজ বাগদাদে প্রতিষ্ঠা করেছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ দূতাবাস, যার মাধ্যমে ইরাকের রাজনীতি মার্কিনিরা নিয়ন্ত্রণ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনী লিবিয়ায় আগ্রাসন চালিয়ে লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মদ গাদ্দাফিসহ অসংখ্য মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ইরাকের মতোই লিবিয়ার সবকিছুই এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণে। ওরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে লিবিয়ার সবকিছুকে ধ্বংস করেছে। সত্যিই কথা হচ্ছে এক কালের স্বাধীন সার্বভৌম লিবিয়া এখন বহুদা বিভক্ত একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্ব দীর্ঘদিন ধরে তাদের এবং ইসরাইলের দীর্ঘদিনের শত্রু সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধে লিপ্ত। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তনে বিশ্বে তেমন কোনো পরিবর্তন আসে না এবং বিশ্বের সবকিছু আগের মতোই চলে।

ইতোমধ্যেই আমি বেশ কিছু কড়া মন্তব্য করেছি, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য নাও হতে পারে। এবার এসব মন্তব্যের পেছনের যুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসকে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটরা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং কোনো কালেই দল এবং ব্যক্তির কেউ একটানা তিন টার্ম ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে পারেনি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া গড়ে প্রায় দুই টার্ম বা আট বছর পরপর ক্ষমতায় পরিবর্তন এসেছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকানরা পর্যায়ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রকে শাসন করেছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় যেই থাকুক না কেন তাদের বিদেশ নীতি অপরিবর্তিত থাকে এবং তেমন কোন পরিবর্তন আসে না। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্তি হয়েছে। কিন্তু সেই ১৯৪৫ সালে জাপান, জার্মানি ও ইতালির পরাজয়ের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত সেই সব দেশ পুনর্গঠন ও নিরাপত্তার নামে মার্কিনিরা সেখানে যে সৈন্য মোতায়েন এবং ঘাঁটি করেছিল–তা কিন্তু এখনো রয়ে গেছে এবং সেই সৈন্য প্রত্যাহারের আদৌ কোনো সম্ভাবনা নেই।

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের আগে সমগ্র আরব জাহানে, এমনকি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের কোন দেশেই একজন মার্কিন সৈন্যও ছিল না। কিন্তু আজ অনেক মুসলিম দেশে মার্কিন সৈন্যদের ঘাঁটি রয়েছে। এসব দেশ হচ্ছে বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, কাতার, সৌদি আরব, ওমান, আরব আমিরাত, ইয়েমেন, জিবুতি, মিসর, তুরস্ক, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, তাজিকিস্তান, ইরাক ও সিরিয়া। ১৯৯১ সালে কুয়েত মুক্তির নামে এবং সাদ্দামের হাত থেকে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আমিরাত প্রভৃতি দেশকে তথাকথিত রক্ষার নামে সেই সব দেশে মার্কিনিরা তখন যে সৈন্য মোতায়েন ও সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, কুয়েত মুক্তির এতটা বছর পেরিয়ে গেলেও এমনকি তথাকথিত তাদের সেই ভয়ের উৎস সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে ফাঁসি দিলেও মার্কিনিরা কিন্তু সেই সব দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না। অথচ আজ তো সাদ্দামের পক্ষ থেকে বিন্দুমাত্র হুমকি নেই। তাহলে এসব দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করা হচ্ছে না কেন? তাহলে এসব দেশ থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের কি কোনো সম্ভাবনা নেই? এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে এসব দেশ থেকে মার্কিন সৈন্য অবশ্যই প্রত্যাহার হবে আর সেটা নির্ভর করছে এসব দেশের জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রামের ওপর।

যদি এসব দেশের জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলনের কাছে মার্কিনিরা পরাস্ত হয় এবং তারা যদি সৈন্য প্রত্যাহারে যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য করতে পারে তাহলে এবং তখনই কেবল যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করবে। এর আগে নয় এবং কখনো নয়। যেমন আফগান মুজাহিদের প্রতিরোধ সংগ্রামের কাছে পরাজিত হয়েছিল বলেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছিল। ঠিক একই ভাবে ভিয়েতনামিদের প্রতিরোধ যুদ্ধের কাছে পরাজিত হয়েছিল বলেই যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছিল। ভিয়েতনামে যুক্তরাষ্ট্র কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী উল্লেখ করছি। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনাম যুদ্ধে পেন্টাগনের হিসাব মতে ৫৮১৮৩ জন মার্কিন সৈন্য নিহত হয় এবং ৩৬৮৯টি বিমান এবং ৪৮৫৭টি হেলিকপ্টার খোয়া গেছে। আমেরিকা ভিয়েতনামে এক কোটি ৫০ লাখ টন বোমা ফেলেছে। ভিয়েতনামে নিহত হয়েছে সৈন্য এবং গেরিলা মিলে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ ভিয়েতনামের জনগণ। প্রায় ৪০ লাখ বেসামরিক জনগণ ক্ষয় ক্ষতির শিকার হয়েছে। নিখোঁজ হয়েছে তিন লাখ ভিয়েতনামি এবং ২২০০ আমেরিকান। এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি ব্যয় হয়েছে তৎকালীন হিসাবে প্রায় ১৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুতরাং প্রাণহানি, সম্পদহানি এবং আর্থিক বিপর্যয়ের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়ে ভিয়েতনাম থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছিল আর ভিয়েতনামিদের প্রতিরোধ সংগ্রামের তীব্রতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তার নীতি পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছিল। এটা হচ্ছে বাস্তবতা।

যে সমস্ত মানুষ মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে ব্যক্তির পরিবর্তনে বিশ্বে শান্তির পক্ষে পরিবর্তন হবে, তাদের সেই আশা পূরণ হবে না। যুক্তির খাতিরে ধরে নিলাম প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিটি একজন অত্যন্ত যোগ্য এবং ভালো মানুষ। অতএব তিনি বিশ্বে আগ্রাসন এবং যুদ্ধ বন্ধ করবেন। তিনি বিশ্বে হানাহানি বন্ধ করবেন এবং শান্তির সুবাতাস প্রবাহিত করবেন। কিন্তু বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে এর কোনোটাই হবে না এবং তিনি চাইলেও সেটা করতে পারবেন না। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে ঐ প্রেসিডেন্ট একটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি এবং তাকে পুরো একটি টিম নিয়েই কাজ করতে হয় যাদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের অতীত ঐতিহ্য এবং চলমান নীতিতে বিশ্বাসী। যাদেব চিন্তা, চেতনা, সংস্কৃতি, আদর্শ ও রীতিনীতি আবহমান কাল ধরেই চলে আসা যুক্তরাষ্ট্রের মূলনীতিরই অংশ। ভাইস প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রিপরিষদ, কংগ্রেসম্যান, সিনেটর, প্রতিরক্ষাবাহিনী ও গোয়েন্দাবাহিনীসহ সকলেই যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান নীতি এবং সংস্কৃতিরই ধারক বাহক।

এদের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে এবং এদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রেসিডেন্টের পক্ষে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কখনোই সম্ভব হয় না। সুতরাং প্রেসিডেন্টের পক্ষে ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ করা কখনোই সম্ভব নয়। একটি গাড়ির সকল যাত্রীদের মতামতকে উপেক্ষা করে একজন ড্রাইভারের পক্ষে গাড়ি চালানো যেমন সম্ভব নয়, ঠিক তেমনিভাবে সরকারের সকল সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করে, ঐ প্রেসিডেন্টের পক্ষে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সম্ভব নয়। আর যদি প্রেসিডেন্ট সকলের মতামতের বিপরীতে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করতে চায় তাহলে কিন্তু তার ক্ষমতাই নড়বড় হবে এবং তাকে ইমপিচমেন্ট করা হবে। আর এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার পালাবদলে বিশ্বে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে না। কারণ তার হাত পা চারিদিকে বাঁধা। আর কোন প্রেসিডেন্ট দ্বারা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন পরিবর্তন হলে, সেটাতে বিশ্ববাসীর তেমন কিছু আসে যায় না।

পরিশেষে বলতে চাই যুক্তরাষ্টের রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মূলতপক্ষে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। তাই তাদের ক্ষমতারোহণ এবং ক্ষমতা থেকে বিদায়ে বিশ্বের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়ে না। ১৭৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতা লাভ করে এবং স্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের এই দীর্ঘ ইতিহাসকে যদি পর্যালোচনা করি তাহলে দেখা যাবে এর প্রায় অর্ধেক সময় শাসন করেছে রিপাবলিকানরা এবং বাকি অর্ধেক সময় শাসন করেছে ডেমোক্র্যাটরা। কিন্তু উভয়ের শাসনামলেই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি একই ছিল। সা¤্রাজ্য ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে উভয়ের পলিসি একই। আর মুসলমানদের বেলায় তো একেবারেই অভিন্ন। ১৯৪৭ সাল থেকেই ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এই নির্যাতনের মাত্রা ডেমোক্র্যাট আর রিপাবলিকান- উভয়ের শাসনামলেই সমান। ফিলিস্তিনিদের প্রতি মার্কিন আচরণ বরাবরই এক এবং ফিলিস্তিনের বিপক্ষে ও ইসরাইলের পক্ষে জাতিসংঘে সবসময় ভেটো প্রয়োগ করে আসছে।

বসনিয়ার মুসলমানদের বিরুদ্ধে ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালে সার্বদের পরিচালিত ভয়াবহ নির্যাতন এবং হত্যাযজ্ঞে কয়েক লক্ষ নিরপরাধ মুসলমান মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যুবরণ করেছিল। সেদিন কিন্তু নিরপরাধ মুসলমানদেরকে বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ কেউই এগিয়ে আসেনি। কুয়েত উদ্ধারের নামে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং সেই সময় কুয়েত এবং সৌদি আরবসহ আরো কয়েকটি উপসাগরীয় মুসলিম দেশে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ঘাঁটি গাড়ে। পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টরা কিন্তু কুয়েতসহ এসব উপসাগরীয় দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেনি, ঘাঁটিও বন্ধ করেনি। বরং সেই ঘাঁটিসমূহকে মজবুত করেছে। কাশ্মির এবং চেচনিয়ার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কিন্তু একই। পাকিস্তান এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান একই। ইসরাইলকে সমর্থনের ব্যাপারে অবস্থানও একই। তাহলে রিপাবলিকান এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে কোনোই পার্থক্য নেই। সুতরাং রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তন হয় না। আর এটাই হচ্ছে বাস্তবতা এবং সত্যকথা। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় কে এসেছে তা নিয়ে গবেষণায় ব্যস্ত না থেকে আমাদের উচিত হবে নিজেদেরকে পরিবর্তন করা এবং আগামীতে পৃথিবীর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নিজেদেরকে তৈরি করা। তাহলেই কেবল পরিবর্তন হবে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি এবং পরিবর্তন হবে বিশ্ব। আর আপনার ভাগ্য কিন্তু আপনাকেই পরিববর্তন করতে হবে।
লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply