যুগে যুগে রোজা -মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

১.
আদম (আ)-এর যুগে রোজা
কোনো কোনো সুফি বলেছেন, আদম (আ) যখন নিষিদ্ধ ফল খেয়েছিলেন এবং তারপর তওবা করেছিলেন তখন ৩০ দিন পর্যন্ত তার তওবা কবুল হয়নি যতক্ষণ তার দেহে ঐ ফলের কিছু অংশ ছিল। অতঃপর তাঁর দেহ যখন তা থেকে পাক পবিত্র হয়ে যায় তখন তাঁর তওবা কবুল হয়। তারপর তাঁর সন্তানদের ওপরে ৩০টি রোজা ফরজ করে দেয়া হয়। অবশ্য হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন, এ কথা প্রমাণের সনদ নেই। এর কোন দলিল পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড, ১০২-১০৩ পৃষ্ঠা)
বিশ্বের ইতিহাস সর্বপ্রথম রোজা কে রেখেছিলেন এ বিষয়ে সাধক শিরোমনি শায়েখ আবদুল কাদির জিলানী (রহ) বর্ণনা করেছেন, জির ইবনে হুবাইশ (রহ) বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)-কে আইয়্যামে বিজ (চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখকে আইয়্যামে বিজ বলে) সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম (আ)-কে একটি ফল খেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আদম (আ) সেই ফল খেয়ে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় নেমে আসতে বাধ্য হন। সে সময় তাঁর শরীরের রঙ কালো হয়ে যায়। ফলে তাঁর এ দুর্দশা দেখে ফেরেশতাগণ কেঁদে কেঁদে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আদম তোমার প্রিয় সৃষ্টি!! তুমি তাঁকে জান্নাতে স্থান দিয়েছিলে, আমাদের দ্বারা তাকে সিজদাও করালে, আর একটি মাত্র ভুলের জন্য তার দেহের রঙ কালো করে দিলে? এরপর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আদম (আ)-এর কাছে এ ওহি প্রেরণ করলেন, ‘তুমি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখ।’ আদম (আ) তাই করলেন। ফলে তার দেহের রঙ আবার উজ্জ্বল হলো। এ জন্যই এ তিনটি দিনকে আইয়্যামে বিজ বা উজ্জ্বল দিন বলে। (গুনইযাতুত-ত-লিবিন, বাংলা অনুবাদ, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৩০৭) আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) ঘরে ও সফরে আইয়্যামে বিজে কখনো সিয়াম না করে থাকতেন না। (নাসায়ি, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)

২.
নূহ (আ)-এর যুগে রোজা
আদম (আ)-এর পর নূহ (আ)-কে দ্বিতীয় আদম বলা হয়। এ যুগেও সিয়াম ছিল। কারণ, নবী করীম (সা) বলেন, নূহ (আ) ইয়াওমুল ফিতর ও ইয়াওমুল আজহা ছাড়া গোটা বছর রোজা রাখতেন। (ইবনে মাজাহ ১২৪ পৃষ্ঠা)
মুআয, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, ইবনে আব্বাস, আতা, কাতাদাহ ও যাহ্হাক (রা) থেকে বর্ণিত। নূহ (আ)-এর যুগ থেকে প্রত্যেক মাসে তিনটি করে রোজা ছিল। (তাফসির ইবনে কাসীর, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ২১৪)
ইবনে কাসীর (র)-এর বর্ণনা প্রমাণ করে যে, নূহ (আ)-এর যুগ থেকে মুহাম্মদ (সা)-এর যুগ পর্যন্ত রমজানের রোজা ফরজ হবার আগে কমপক্ষে তিনটি করে সিয়াম ফরজ ছিল।

৩.
ইবরাহিম (আ) ও বিভিন্ন জাতির রোজা
নূহ (আ)-এর পর বিশিষ্ট নবী ছিলেন ইবরাহিম (আ)। ইবরাহিম (আ)-এর যুগে ৩০টি সিয়াম ছিল বলে কেউ কেউ লিখেছেন, কিন্তু তারা কোনো প্রমাণ দেননি। ইবরাহিম (আ)-এর কিছু পরের যুগ বৈদিক যুগ। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, বেদের অনুসারী ভারতের হিন্দুদের মধ্যেও ব্রত অর্থাৎ, উপবাস ছিল। প্রত্যেক হিন্দি মাসের ১১ তারিখে ব্রাহ্মণদের ওপর ‘একাদশীর’ উপবাস রয়েছে। এ হিসেবে তাদের উপবাস ২৪টি হয়। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসে প্রত্যেক সোমবারে উপবাস করেন। কখনো কখনো হিন্দু যোগীরা ৪০ দিন পানাহার ছেড়ে চল্লিশে ব্রত পালন করেন। হিন্দুদের মতো জৈনরাও উপবাস থাকেন। তাদের মতে সুদীর্ঘ ৪০ দিন ধরে একটি করে উপবাস হয়। গুজরাট ও দাক্ষিণাত্যের জৈনরা কয়েক সপ্তাহ ধরে প্রতি বছরে একটি করে উপবাস রাখেন। প্রাচীন মিসরীয়রাও উপবাস করতো। গ্রিস দেশে কেবল মেয়েরা থিমসোফিয়ার ৩রা তারিখে উপবাস করতো। ফার্সিদের ধর্মগ্রন্থের একটি শ্লোক দ্বারা বোঝা যায় যে, তাদের ধর্মেও উপবাস ছিল। বিশেষ করে তাদের ধর্মগুরুদের জন্য পাঁচসালা উপবাস আবশ্যক ছিল।
(ইনসাইক্লোপেডিয়া অব ব্রিটানিকা ১০ম খন্ড, ১৯৩ পৃষ্ঠা, সিরাতুন নবী ৫ম খন্ড, ২৮৬ পৃষ্ঠা)

৪.
মুসা (আ)-এর যুগে রোজা
ইবরাহিম (আ)-এর পর নবী মুসা (আ), তাঁর যুগেও সিয়াম ছিল। আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা) মদিনায় (হিজরত করে) এসে ইহুদিদেরকে আশুরার দিনে (মুহররম চাঁদের ১০ তারিখ) রোজা অবস্থায় পেলেন। তাই তিনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, আজকে তোমরা কিসের রোজা করছো? তারা বলল, এটা সেই মহান দিন যেদিন মহান আল্লাহ মুসা (আ)-ও তাঁর কওমকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফিরআউন ও তার জাতিকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। ফলে শুকরিয়াস্বরূপ মুসা (আ) ঐদিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরা আজকে ঐ রোজা করছি। (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত ১৮০ পৃষ্ঠা)
ব্যাবিলনে বন্দীযুগে শোক ও মাতম প্রকাশের জন্য ইহুদিরা রোজা রাখতো। কেউ বিপদের আশঙ্কা দেখলে কিংবা কোনো গণকের ইলহাম ও নবুওয়াত প্রাপ্তির প্রস্তুতিকল্পেও রোজা রাখতো। যখন তারা মনে করত যে, আল্লাহ তাদের প্রতি নারাজ হয়ে গেছেন তখন তারা রোজা রাখতো। দেশের প্রতি যখন কোন মহামারী ও বিপদ আসতো কিংবা দুর্ভিক্ষ দেখা দিত অথবা বাদশাহ কোন বড় অভিযানে বের হতেন তখনও রোজা রাখতো। এসব সিয়ামের সংখ্যা ছিল পঁচিশ। বছরের ১ তারিখে অনেক ইহুদির মধ্যে রোজার প্রচলন আছে। ইহুদিদের রোজা সূর্যোদয়ের সময় থেকে আরম্ভ করে রাতে প্রথম তারকা উদয় পর্যন্ত চলতো। কাফফারা বা শরয়ি জরিমানার রোজার নিয়ম অবশ্য আলাদা। মে মাসের ৯ম তারিখে ইহুদিরা রোজা রাখে। এ রোজা সন্ধ্যা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। সাধারণ রোজার জন্য তাদের বিশেষ কোনো বিধিবিধান নেই। অর্থাৎ এদিনে গোশত ও মদ পান নিষিদ্ধ। (জিউশ ইনসাইক্লো-পেডিয়া দ্রষ্টব্য)
উপরের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হলো যে, মুসা (আ)-এর যুগে এবং তার আগে ও পরে ইহুদিদের মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল।

৫.
দাউদ (আ)-এর যুগে রোজা
মুসা (আ)-এর আসমানি কিতাবধারী বিখ্যাত নবী ছিলেন দাউদ (আ)। তাঁর যুগেও রোজার প্রচলন ছিল। আল্লাহর রাসূল (সা) বলেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিকট সবচেয়ে প্রিয় রোজা দাউদ (আ)-এর রোজা। তিনি একদিন রোজা রাখতেন এবং একদিন বিনা রোজায় থাকতেন। (নাসায়ি ১ম খন্ড, ২৫০ পৃষ্ঠা, বুখারি, মুসলিম, মিশকাত ১৭৯ পৃষ্ঠা)

৬.
ঈসা (আ)-এর যুগে রোজা
দাউদ (আ)-এর পর আসমানি কিতাবধারী বিশিষ্ট নবী হলেন ঈসা (আ)। তাঁর যুগে এবং তার জন্মের আগেও রোজার প্রমাণ পাওয়া যায়। কুরআনে আছে, ঈসা (আ)-এর যখন জন্ম হয় তখন জনগণ তাঁর মা মারইয়ামকে তাঁর জন্ম সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি বলেনÑ
আমি করুণাময়ের উদ্দেশে মানতের রোজা রেখেছি। আজকে আমি কোনো মানুষের সাথে মোটেই কথা বলব না। (সূরা মারইয়াম : আয়াত- ২৬)
এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আ) রোজা রাখতেন।
ঈসা (আ) জঙ্গলে বা বনে ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। একদা ঈসা (আ)-কে তাঁর অনুসারীরা জিজ্ঞেস করে যে, আমরা অপবিত্র আত্মাকে কী করে বের করব? জবাবে তিনি বলেন, তা দোয়া ও রোজা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে বের হতে পারে না। (সিরাতুন নবী ৫ম খন্ড, ২৮৭-২৮৮ পৃষ্ঠা)
সৈয়দ আবুল হাসান আলী নাদভী লিখেছেন, মুসা (আ)-এর যুগে যে রোজা ফরজের পর্যায়ে ছিল ঈসা (আ) নিজে রোজার কোন বিধিনিষেধ দিয়ে যাননি। তিনি শুধু সিয়ামের নীতি ও কিছু নিয়ম বর্ণনা করেন এবং তার ব্যাখ্যা ও সমন্বয়ের ভার গির্জাওয়ালাদের ওপর ছেড়ে দেন। খ্রিষ্টীয় ২য় শতক থেকে ৫ম শতকের মধ্যে খ্রিষ্টানদের রোজার নিয়মকানুন তৈরির অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়। ঐ সময়ে ইস্টার এর পূর্বে দু’টি দিন রোজার জন্য নির্দিষ্ট হয়। উক্ত দু’টি সিয়ামই অর্ধেক রাতে শেষ হতো। ঐ দিনে যারা অসুখে থাকতো তারা শনিবারে রোজা রাখতে পারতো।
খ্রিষ্টীয় ৩য় শতকে রোজার দিন নির্দিষ্ট করা হয়। তখন ইফতারের সময় নিয়ে মতভেদ ছিল। কেউ মোরগ ডাক দিলে ইফতার করতো, আবার কেউ অন্ধকার খুব ছেয়ে গেলে রোজা ভাঙতো। খ্রিষ্টীয় ৪র্থ শতক পর্যন্ত ৪০টা রোজার সন্ধান পাওয়া যায়। রোমকদের সিয়াম, আলেকজান্দ্রিয়া লাসানদের গির্জাগুলো রোজার দিন নির্দিষ্ট করে। কিন্তু রোজার নিয়মাবলি ও বিধিনিষেধ রোজাদার ব্যক্তির বিবেক ও দায়িত্বানুভূতির ওপর ছেড়ে দেয়া হয়। অবশ্য ষষ্ঠ এডওয়ার্ড, প্রথম এলিজাবেথের যুগে ইংল্যান্ডের পার্লামেন্ট রোজার দিনগুলোতে গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তারা এর কারণ সম্পর্কে বলেন যে, মাছ শিকার ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের বিষয়ে উপকৃত হওয়া একান্ত দরকার।

৭.
জাহিলি যুগে আরবদের রোজা
ঈসা (আ)-এর পর শেষ নবী মুহাম্মদ (সা)-এর যুগ। তাঁর নবী হবার আগে আরবের মুশরিকদের মধ্যেও রোজার প্রচলন ছিল।
যেমন আয়েশা (রা) বলেনÑ
আশুরার দিনে কুরাইশরা জাহিলি যুগে রোজা রাখতো এবং নবী করীম (সা) জাহিলি যুগে ঐ রোজা রাখতেন। অতঃপর যখন তিনি মদিনায় আসেন তখনও ঐ রোজা নিজে রাখেন এবং (সাহাবীদেরকে) রোজা রাখার আদেশ দেন। পরিশেষে রমজানের রোজা যখন ফরজ হয় তখন তিনি আশুরার রোজা ছেড়ে দেন। (মুসলিম ১১২৫, বুখারি ১৫৯২, তিরমিজি ৭৫৩)
এ হাদিস প্রমাণ করে যে, ইসলামের পূর্বে জাহিলি যুগেও আরবদের মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল। জাহিলি যুগে মক্কার কাফিরদের রোজা রাখা সম্বন্ধে দু’টি অভিমত পাওয়া যায়।
প্রথম মতে আশুরার দিনে কাবাগৃহে নতুন গিলাফ ছড়ানো হতো। তাই আরবরা ঐদিনে রোজা রাখতো। (মুসনাদ আহমাদ ৬ষ্ঠ খন্ড, ২৪৪ পৃষ্ঠা)
অন্য মতে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন, একদা এ রোজার বিষয়ে ইকরিমাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, জাহেলি যুগে কুরাইশরা একবার কোন গুনাহ করে। অতঃপর তাদের মনে ঐ পাপটা খুব বড় মনে হয়। তখন তাদেরকে বলা হয় যে, তোমরা আশুরার রোজা রাখ তাহলে ঐ পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়ে যাবে। (ফাতহুল বারী ৪র্থ খন্ড-২৪৬ পৃষ্ঠা)
উপরিউক্ত সমস্ত বর্ণনা দ্বারা বোঝা যায় যে, রমজানের এক মাস রোজা ফরজ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মক্কার কাফির, মদিনার ইহুদি, রোমের খ্রিষ্টান, ভারতের হিন্দু ও জৈন, গ্রিসের গ্রিকÑ পৃথিবীর অন্যান্য প্রায় সমস্ত জাতির মধ্যে রোজার প্রচলন ছিল। অতঃপর ঐসব সিয়াম সাধনাকারী জাতির প্রতি ইঙ্গিত করে উম্মতে মুহাম্মাদির ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হলো, যেমন তোমাদের পূর্বে এ আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পূর্বের লোকদের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। কিন্তু পূর্বেকার লোকদের ওপর কোন রোজা ফরজ ছিল সে সম্পর্কে কুরআনে কোনো উল্লেখ নেই। হাদিস বা ইতিহাস দ্বারাও জানা যায় না যে, আদম (আ), নূহ (আ), ইবরাহিম (আ) প্রমুখের ওপর কোন রোজাটি ফরজ ছিল। এ বিষয়ে হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহ) বলেন, সালাফরা এ বিষয়ে একমত নন যে, রমজানের সিয়াম ফরজ হবার পূর্বে লোকদের ওপর কোনো রোজা ফরজ ছিল কি না? জমহুর (অধিকাংশ আলেম) ও শাফিঈদের প্রসিদ্ধ মত এই যে, রমজানের পূর্বে কোনো সিয়ামই কখনো ওয়াজিব বা অপরিহার্য ছিল না। হানাফিদের মত, সর্বপ্রথম আশুরার রোজা ফরজ ছিল। অতঃপর রমজানের রোজা ফরজ হলে আশুরার রোজা রহিত হয়ে যায়। (ফাতহুল বারী, ৪র্থ খন্ড, ১০৩ পৃষ্ঠা)
এ বিষয়ে ১৩ শতকের মুজাদ্দিদ ইমাম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (র) বলেন, কেউ কেউ বলেছেন, ইসলামের প্রথম যুগে প্রত্যেক মাসে ৩টি সিয়াম এবং আশুরার রোজা ওয়াজিব ছিল। তারপর রমজানের রোজা ফরজ হবার কারণে ঐ সিয়াম রহিত হয়ে যায়। ইমাম বুখারি তদীয় তারিখে এবং তাবারানি বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা) বলেন, খ্রিষ্টানদের ওপর রমজানের এক মাস রোজা ফরজ ছিল। অতঃপর তাদের এক বাদশাহ অসুখে পড়ে। তখন তারা বলে যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি একে আরোগ্য দান করেন তাহলে আমরা আরো ১০টি রোজা অবশ্যই বাড়িয়ে দেবো। তারপর তাদের আরেক বাদশাহ গোশত খেলে তার মুখে খুব ব্যথা হয়। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন যদি আমাকে রোগমুক্ত করেন তাহলে আমি ৭টা রোজা নিশ্চয় বাড়িয়ে দেবো। এরপর এক বাদশাহ এসে বললেন, এ ৩টি রমজান ছাড়া হবে না। ৫০টি পুরো করে দেবো এবং আমরা আমাদের সিয়াম বসন্তকালে করব। অতঃপর তিনি তাই করেন। ফলে ৫০টি রোজা পূর্ণ হয়ে যায়। (ফাতহুল বারী- ১ম খন্ড, ২৩৪ পৃষ্ঠা)
আল্লামা আবু সাঈদ (র) বলেন, বর্ণিত আছে রমজানের সিয়াম ইহুদি ও নাসারা উভয়ের ওপরে ফরজ ছিল। কিন্তু ইহুদিরা সব রোজা বাদ দিয়ে গোটা বছরের যে কোন ১টি দিনে রোজা রাখতে থাকে। তারা মনে করে যে, এদিন ফিরাউন ডুবে মরেছিল। এ বিষয়ে তারা মিথ্যাবাদী। কারণ, ঐ দিনটি ছিল আশুরার দিন, বছরে যে কোন ১টি দিন নয়। আর খ্রিষ্টানরা রমজানে রোজা পালন করতে থাকে। অতঃপর তাদের একবার রমজানে প্রচন্ড ক্ষুধা পায়। ফলে তাদের আলেমরা গ্রীষ্ম ও শীতের মাঝখানে একটি ঋতুতে ঐ সিয়ামকে সীমাবদ্ধ করতে একমত হয়। অতঃপর তারা ওকে বসন্তকালে রেখে দেয় এবং সেই সাথে আরো ১০টি সিয়াম বাড়িয়ে দেয় তাদের ঐ মনগড়া কার্যকলাপের কাফফারা হিসেবে। তারপর তাদের এক বাদশাহ অসুখে পড়ে কিংবা তাদের মধ্যে দু’টি মৃত্যু সংঘটিত হয় তখন তারা আরো ১০টি রোজা বৃদ্ধি করে দেয়। ফলে ৫০টি সিয়াম হয়ে যায়। (তাফসির আবুস সঈদ-১ম-খন্ড, ৪৬৪ পৃষ্ঠা)
ইমাম রাযী (র) বলেন, তাদের এক বাদশাহ অসুস্থ হয়ে পড়ায় মানত করে ৭টি রোজা বাড়ান। তারপর এ বাদশাহ বলেন, এ ৩টির কী হয়। তাই ৫০টি পুরো করে দেন। এ বর্ণনাটি হাসান থেকে বর্ণিত।
(তাফসিরে কাবীর ২য় খন্ড, ১১৩ পৃষ্ঠা)

৮.
ইসলামে রোজা
ইবনে আবু হাতিম হতে ইবনে উমর (রা) মারফুভাবে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা উম্মতে মুহাম্মাদির পূর্বে অন্যান্য উম্মাতদের ওপরে রমজানের রোজা ফরজ করেছিলেন। (ইরশা-দুস সা-রী ৩য় খন্ড, ৩৩১ পৃষ্ঠা) সুতরাং বর্ণনাটি নির্ভরযোগ্য নয়।
হাসান বসরী (র) বলেন, আগের উম্মাতদের ওপরেও পুরো এক মাস রোজা ফরজ ছিল। (তাফসির ইবনে কাসীর ১ম খন্ড, ২১৪ পৃষ্ঠা)
অন্যান্য নবীর উম্মতের মত উম্মতে মুহাম্মাদির ওপরও রোজা ফরজ করা হয়েছে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ (রমজান) মাস পাবে সে যেন অবশ্যই সিয়াম সাধনা করে। (সূরা বাকারা : আয়াত-১৮৫)
ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তন্মধ্যে অন্যতম হলো রোজা। এ রোজার মাধ্যমেই মানুষ তাকওয়াবান হতে পারে। আল্লাহ বলেন, হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিলÑ যাতে করে তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (রোজা) নির্দিষ্ট কয়েক দিনের জন্য, তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ হলে অথবা সফরে থাকলে অন্য সময়ে সে সংখ্যা পূর্ণ করে নেবে। আর যারা রোজা রাখতে অক্ষম, তারা মিসকিন খাওয়ানোর মাধ্যমে ফিদইয়া দেবে। আর কেউ স্বেচ্ছায় ভালো কাজ করলে সেটা তার জন্য কল্যাণকর। আর যদি তোমরা রোজা রাখ তবে তোমাদের জন্য মঙ্গল হবে যদি তোমরা বুঝতে পার। (সূরা বাকারা : আয়াত- ১৮৩-১৮৪)
দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং তার পরের মাস রমজান থেকে উম্মতে মুহাম্মদিয়ার ফরজ সিয়াম চালু হয়। ইবনে জারীর বর্ণনা করেছেন, যখন রোজার নির্দেশ প্রথম চালু হয় তখন আমাদের সিয়ামের নির্দেশ খ্রিষ্টানদের মতোই ছিল। (তাফসিরে তাবারী, ২য় খন্ড, ৭৩ পৃষ্ঠা)

SHARE

Leave a Reply