যেভাবে অগোচরেই থেকে যাচ্ছে বিদেশে অর্থ পাচারের মূল কারণ -মো: কামরুজ্জামান বাবলু

অর্থ জমানোর প্রবণতা মানুষের মধ্যে সেই আদিকাল থেকেই বিদ্যমান। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ এবং পরবর্তী প্রজন্মের সচ্ছলতা নিশ্চিত করাসহ নানা বিচিত্র কারণে মানুষের মধ্যে অর্থ জমানোর মানসিকতা গড়ে উঠেছে। আবার অর্থ জমানোই হলো অনেকের নেশা। স্বাভাবিক জীবনযাপন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দরিদ্র অবস্থায় না রেখে কিছুটা স্বাবলম্বী করার নিমিত্তে প্রয়োজনীয় অর্থ জমানোতে কোন দোষ নেই। সভ্যসমাজ ও ধর্মীয় বিধিবিধানেও এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু অন্যায় পথে অর্থ উপার্জন কিংবা অপরের অধিকার নষ্ট করে নিজে অর্থের পাহাড় গড়াকে পৃথিবীর সব যুগের সভ্যসমাজ ও সব ধর্মেই ঘৃণার চোখে দেখা হয়।
সময়ের ব্যবধানে মানুষের এই অর্থ উপার্জন ও তা জমানোর পদ্ধতিতে দেখা দিয়েছে পরিবর্তন। বিশেষ করে কাগুজে মুদ্রার প্রচলন, ইন্টারনেট তথা অনলাইনভিত্তিক অর্থের লেনদেন এবং বিশ্বায়নের বদৌলতে আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যাপক প্রসার ঘটায় অর্থ উপার্জন ও মজুদ করার ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আর এরই পথ ধরে “মানি লন্ডারিং (গড়হবু ষধঁহফবৎরহম)” তথা “বিদেশে অর্থ পাচার”-এর উদ্ভব যা বিগত কয়েক দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে কুরে খাচ্ছে।
সব মানুষই চায় তার কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে থাকুক। আর সে কারণেই এক সময় যখন কাগুজে মুদ্রা ছিল না, স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ছিল এবং বর্তমানের ন্যায় কোন ব্যাংকিং ব্যবস্থা ছিল না, তখন মানুষ কলসি ভরে স্বর্ণ ও রুপার মুদ্রা মাটির গভীরে প্রথিত করে রাখতেন- এমন হাজারো গল্প ও রূপকথার কাহিনী আমাদের সবারই জানা। আবার অনেকে নিজ তত্ত্বাবধানে গোডাউন বানিয়ে অর্থ-বিত্ত জমা করে রাখতেন।
সেই সুদূর অতীতকাল থেকেই অর্থ জমানোর নেশা ও তা মজুদ করার নানা বিচিত্র কায়দা-কানুন সম্পর্কে একটি চমৎকার ধারণা লাভ করা যেতে পারে পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনের এক বর্ণনায়। সেখানে কারুন নামে এক অর্থলোভী ও ধনকুবের ইহুদির কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। হযরত মূসা (আ)-এর সময়কার সেই বনি ইসরাইল গোত্রের সদস্য কারুনের অর্থ-সম্পদের পরিমাণ এত বেশি ছিল যে তা যেসব গোডাউনে মজুদ রাখা হতো তার চাবি বহন করতে বেশ কয়েকজন শক্তিশালী যুবকের দরকার হতো। কারুন যখন তার বিলাসবহুল ও চাকচিক্যময় পোশাক-আশাক ও শান-শওকত নিয়ে রাস্তায় বের হতো মানুষ আফসোস করে বলতো, হায় আমার যদি কারুনের মতো অবস্থা থাকতো। কিন্তু ওই ধনকুবেরকে যখন তার সীমাহীন পাপাচারের কারণে মহান আল্লাহর আজাবে পতিত হয়ে সমস্ত অর্থ-বিত্ত ও ধন-সম্পদসহ মাটি গ্রাস করে গিলে ফেলে তখন তাকে সাহায্য করার মতো কেউ ছিল না। চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যায় কারুনের সমস্ত দম্ভ-অহংকার ও অর্থ-বিত্তের প্রভাব।
পবিত্র কুরআনে ২৮তম সূরা আল কাছাছের ৭৬ থেকে ৮২ নম্বর আয়াতের মধ্যে মহান আল্লাহ কারুনের সেই কাহিনী অত্যন্ত প্রাঞ্জল ও আকর্ষণীয় ভাষায় বর্ণনা করেছেন। এখানে আমি কারুনের পরিণতি নিয়ে লেখা ৮১ ও ৮২তম আয়াতের অনুবাদ হুবহু তুলে ধরছি। “পরিশেষে আমি তাকে এবং তার (ঐশ্বর্য ভরা) প্রাসাদকে জমিনে গেড়ে দিলাম। তখন (যারা তার এ সম্পদের জন্য একটু আগেই আক্ষেপ করছিলো তাদের) এমন কোনো দলই (সেখানে মজুদ) ছিলো না, যারা আল্লাহ তায়ালার (গজবের) মোকাবেলায় তাকে (একটু) সাহায্য করতে পারলো, না সে নিজে নিজেকে (গজব থেকে) রক্ষা করতে পারলো! মাত্র গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত যারা তার জায়গায় পৌঁছার কামনা করছিলো, তারা আজ সকাল বেলায়ই বলতে লাগলো, (আসলে) আল্লাহ তায়ালা তাঁর বান্দাদের মাঝে যাকে চান (তার জন্য) তা সংকীর্ণ করে দেন, যদি আল্লাহ তায়ালা আমাদের ওপর তাঁর অনুগ্রহ না করতেন, তবে আমাদেরও তিনি (কারুনের মতোই আজ) জমিনের ভেতর পুঁতে দিতেন; (আসলেই) কাফেররা কখনোই সফলকাম হয় না।”
মানুষের মধ্যে অর্থ জমানোর সেই আদি নেশায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতির ব্যাপক সয়লাভ, মানুষের মধ্যে অসৎ প্রবণতার বিস্তারলাভ ও অবৈধ পথে অর্জিত ব্যাপক অর্থ-বিত্ত সংরক্ষণে মরিয়া অনেকেই বিদেশে পাচার করছেন বিপুল অর্থ। নিজ অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ ও ভোগ এবং স্বীয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাওয়ার আশাতেই হয়তো তারা এমনটি করেছেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসে অর্থ পাচারের সেই ভয়াবহ চিত্র।
গত ৩ মে (২০১৭) দৈনিক যুগান্তরে “জিএফআই প্রতিবেদন : এক বছরে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার”- এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে দু’টি সাব-হেডও ছিল। তাতে বলা হয় : “১০ বছরে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা” এবং “বেসরকারি বিনিয়োগ না হওয়া এবং দুর্নীতিই প্রধান কারণ- অভিমত অর্থনীতিবিদদের।” এবার প্রতিবেদনের খানিকটা হুবহু তুলে ধরছি:
“অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে টাকা পাচার। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার (প্রায় ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা, প্রতি ডলার ৮০ টাকা ধরে) পাচার হয়েছে। সোমবার (১ লা মে ২০১৭) প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। পাচার হওয়া এ অর্থের পরিমাণ দেশের মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) দুই-তৃতীয়াংশ। আর এই অর্থ দিয়ে ৩টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।
জিএফআইর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪টি প্রক্রিয়ায় এই অর্থ পাচার হয়েছে। এগুলো হলো: বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি মূল্য বেশি দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং), রফতানিতে মূল্য কম দেখানো (আন্ডার ইনভয়েসিং), হু-ি ও অন্য মাধ্যমে বিদেশে লেনদেন এবং ভিওআইপি ব্যবসা।
জিএফআইয়ের তথ্য মতে, গত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৬ লাখ ৬ হাজার ৮৬৮ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, যা দেশের মোট জাতীয় বাজেটের দ্বিগুণ। প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে ৬০ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। প্রতি বছরই পাচারের হার বাড়ছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালে পাচার হয়েছে ৭৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থ পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পরই বাংলাদেশের অবস্থান।”
এবারে একটু খতিয়ে দেখা যাক কেন এই অর্থ পাচার। গত ৩ মে (২০১৭) তারিখে চ্যানেল আই অনলাইন ভার্সনে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “যে কারণে বিদেশে পাচার হচ্ছে বাংলাদেশের টাকা”। প্রতিবেদনটির সাব-হেডে বলা হয় “এনবিআর, দুদক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস সমন্বয়ে তা প্রতিরোধ সম্ভব”। প্রতিবেদনের একেবারে শুরুতেই বলা হয়, “অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িতদের বিচার না হওয়া, নিরাপত্তার অভাব, কোন কোন ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা, মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি এবং বিদেশের উন্নত জীবনের লোভের কারণেই বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।”
চ্যানেল আইয়ের ওই প্রতিবেদনে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের মন্তব্য তুলে ধরা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বিষয়টি নিয়ে বলেন, আমার কাছে দু’টি ব্যাখ্যা আছে। একটি হচ্ছে, মানুষ অসৎ হলে ও খারাপ উদ্দেশ্য থাকলে অর্থ পাচারে লিপ্ত হয়। অন্যটি হচ্ছে, দেশে যখন মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় তখন তারা নিজেদের নিরাপদে রাখার উপায় খোঁজে। বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটলে যেন বিদেশে সহজে চলে যেতে পারে সে উদ্দেশে অর্থ পাচার করে।
নিরাপত্তাবোধের অভাবের কারণেও অর্থ পাচার হতে পারে মন্তব্য করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশে যখন নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয় ও ভাল কোনো সম্ভাবনা দেখে না তখন মানুষ হতাশায় ভোগে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় বিদেশি ব্যাংকে রিটার্ন বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও উন্নত দেশে বসবাসের লোভ তো আছেই। এসব কারণে বিত্তশালীরা অর্থ পাচার করছে।
অর্থপাচারের বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক উল্লেখ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটা উদ্বেগের বিষয়। তবে আমি এতে অবাক হইনি। কারণ অপরাধের বিচার না হলে অপরাধ বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক। যারা অর্থ পাচার করছে তারা কোনো না কোনো ভাবে ক্ষমতাসীনদের সাথে সম্পৃক্ত। এটা আরো আগে থেকে হয়ে আসছে। ক্ষমতাসীনদের ছায়াতলে থেকে তারা এটাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
একই দিনে অর্থাৎ ৩ মে (২০১৭) দৈনিক প্রথম আলোতে “অর্থ পাচার নিয়ে জিএফআইয়ের প্রতিবেদন : এক বছরে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার”- এই শিরোনামে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনেও কেন মানুষ অর্থ পাচার করছে তার কারণ জানতে চেয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া হয়। তাদের মধ্যে ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য শামসুল আলম। তিনি বলেন, দেশের বাইরে টাকা চলে যাচ্ছে, এটা ভালো সংবাদ নয়। হিসাব নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে কিছু টাকা যে চলে যাচ্ছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। যাঁরা বিদেশে টাকা নিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা হয়তো ভাবছেন, দেশে বিনিয়োগের যথেষ্ট সুযোগ নেই। আবার নিরাপত্তাও আরেকটি কারণ হতে পারে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদও কথা বলেন দৈনিক প্রথম আলোর সঙ্গে। তিনি বলেন, অর্থনীতি ও রাজনীতির ওপর আস্থা না থাকলে অর্থ পাচার হয়। পাচারকারীরা মনে করেন, বিদেশে অর্থ বিনিয়োগ অনেক বেশি নিরাপদ ও লাভজনক। তাই এ দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে হবে।
গত ১১ মে (২০১৭) তারিখে দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই অর্থ পাচারের মূল কারণ”। ওই প্রতিবেদনের খানিকটা হলো: “দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাই অর্থ পাচারের মূল কারণ বলে মনে করেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, দেশ থেকে অর্থ পাচারের কারণ দু-তিনটি হতে পারে। এর মধ্যে প্রধান হচ্ছে দুর্নীতি। এ ছাড়া কালো টাকা বেড়ে যাওয়া, বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণেও অর্থ পাচার বাড়ছে।”
অর্থ পাচার করতে গিয়ে মানুষ যে কতটা জঘন্য মিথ্যাচার ও প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারেন তারও খানিকটা তুলে ধরা হয় মানবজমিনের প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়, “মোটামুটি ৪-৫টি চ্যানেলে দেশ থেকে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। এর মধ্যে আমদানি-রফতানি ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য কম- বেশি দেখিয়ে অর্থ পাচার হয়ে থাকে। বেশি দামে পণ্যটি আমদানি দেখিয়ে কোনো কোম্পানি অর্থ পাচার করে থাকে। বিভিন্ন সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে শিল্পের যন্ত্রপাতি ভর্তি কনটেইনারে পাওয়া গেছে ছাই, ইট, বালু, পাথর ও সিমেন্টের ব্লক। শিল্পের কোনো যন্ত্রপাতি পাওয়া যায়নি। এর বাইরে নিয়মিতই অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে কখনো সরিষাবীজ আমদানির ঘোষণায় খালি কনটেইনার আনা হয়েছে এবং কখনো তেলের ঘোষণায় পানি। স্ক্র্যাপের ঘোষণায় ছাই আনার নজিরও রয়েছে।”
মানবজমিনের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “সম্প্রতি টাকা পাচারের আরো একটি বড় মাধ্যম হয়ে দেখা দিয়েছে রেমিট্যান্স। বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স একটি চক্র সংগ্রহ করে তা বিদেশেই রেখে দেয়। আর এ দেশে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা গ্রহণ করে তা পরিশোধ দেখায়। এখানে তারা কমিশন বাণিজ্য করে, যা হু-ি হিসেবে পরিচিত।”
গত ৩ মে (২০১৭) দৈনিক কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “৬ লাখ কোটি টাকা পাচার ১০ বছরে”। ওই প্রতিবেদনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলামের বক্তব্য তুলে ধরা হয়। তিনি বলেন, প্রতি বছর বাংলাদেশে যে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে, পাচার হচ্ছে প্রায় তারই সমান। দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসায়ীরা তা পাচার না করে দেশের ভেতরেই বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতো। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ছাড়াও রাজনৈতিক সংকট বড় বাধা। তা ছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগের অনুকূলে নয়। কিছুদিন পরপরই যেভাবে বিভিন্ন স্থানে সহিংস ঘটনা ঘটছে, তাতে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও আতঙ্ক আছে।
দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় গত ৬ মে (২০১৭) তারিখে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “আইসিএএফসির গভীর উদ্বেগ: হাজার কোটি টাকা পাচারে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি”। নিউ ইয়র্কভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস- এর ওই প্রতিবেদনের শুরুটা ছিল এমন, “বাংলাদেশে অব্যাহত আর্থিক দুর্নীতি, বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থ অবাধে লুটপাট এবং দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গতকাল গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে ‘ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস’ বা আইসিএএফসি। সংস্থাটি অর্থ পাচার বন্ধ ও অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট আবদুল হামিদের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।
আইসিএএফসির ওই বিবৃতিতে আরো বলা হয়, এ দেশে দুর্নীতিতেই ব্যাংকিং খাত শেষ হচ্ছে। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, বেসিকসহ ব্যাংকিং খাতে যতগুলো বড় কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে তাতে এসব ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার ইচ্ছে থাকলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ তা করতে পারেনি। নিজেদের দুর্নীতি সেই সাথে এই অর্থ লুটপাটে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীনদের যোগসাজশের ফলে কোনো ব্যবস্থাই নেয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতামতসহ উপরের আলোচনার সারমর্ম করলে দেখা যাবে, অর্থ-পাচারকারীদের একটি বড় অংশই এই বিপুল অর্থ অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন। তাই বিদেশে এটা পাচার করে একই সাথে এই অর্থ গোপন এবং নিরাপদে রাখতে চান যাতে তিনি ও তার পরিজনরা মিলে তা ভোগ করতে পারেন। আবার কেউ কেউ দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে স্বীয় অর্থ নিরাপদে বিদেশে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে চান। তারও লক্ষ্য একটাই তার অর্থ যাতে নিরাপদ থাকে এবং তিনি ও তার স্বজনরা যেন তা ভোগ করতে পারেন। অর্থাৎ সবারই লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো নিজের অর্থ নিরাপদে রাখা ও ভোগ করার নিশ্চয়তা লাভ।
এছাড়া, দুর্নীতি বন্ধ করা, রাজনৈতিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির উপর জোর দিয়েছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। কিন্তু বাস্তবতার দিকে একটু খেয়াল করুন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপি নেতা তারেক রহমান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে ও তার প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়- দু’জনের বিরুদ্ধেই বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সেদেশে জয়ের অ্যাকাউন্টে সন্দেহভাজন ৩শ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার সন্ধান পাওয়ার পর তা নিয়ে প্রকাশ্য জনসমাবেশে বক্তব্য দেন খালেদা জিয়া। ২০১৬ সালের ১লা মে দৈনিক প্রথম আলোতে “৩০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে আ. লীগ: খালেদা”Ñএই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে খালেদা জিয়ার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, “আদালত তার (সজীব ওয়াজেদ জয়) অ্যাকাউন্টে তিনশ মিলিয়ন ডলার, আড়াই হাজার কোটি টাকা নিয়ে সন্দেহ করেছে। এফবিআই এই টাকা তদন্ত করে পেয়েছে।”
অবশ্য খালেদা জিয়ার এই বক্তব্যের পর তাকে মিথ্যাবাদী বলে আখ্যায়িত করেছেন জয়। আর জয়ের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার জন্য খালেদা জিয়াকে আহবান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এভাবেই কয়েকদিন কাদা ছোড়াছুড়ির মধ্য দিয়েই ওই ঘটনার যবনিকাপাত ঘটে। আসল ঘটনা আড়ালেই থেকে যায়। হয়তো ক্ষমতার পালাবদলে চাপাপড়া অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে।
অপরদিকে, এরই মধ্যে মুদ্রা পাচার সংক্রান্ত এক মামলায় ৭ বছরের কারাদ- দেয়া হয়েছে লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা তারেক রহমানকে। গত ২২ জুলাই (২০১৬) দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকায় “তারেকের ৭ বছর জেল : অর্থ পাচার মামলায় হাইকোর্টের রায়”Ñ এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “অর্থ পাচারের মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সাত বছর কারাদ- প্রদান ও ২০ কোটি জরিমানা করেছে হাইকোর্ট।”
এবার যদি একটু র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকাই আমরা এক ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই। সারা দেশে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলায় হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে আটক করে কোটি কোটি টাকা ঘুষ নিচ্ছে এসব বাহিনীর সদস্যরা। ক্রসফায়ার ও জঙ্গি মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত এই ঘুষবাণিজ্য চলছে। এসব বাহিনীর বহু সদস্য এখন কোটিপতি। দেশে বিদেশে গড়ছেন অর্থের পাহাড়। অপরদিকে, বিদেশী ব্যাংকে বিশেষ করে সুইস ব্যাংকে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে বাংলাদেশীদের অর্থের পরিমাণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের হাজারো নজির রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৫ সালের ৯ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোতে “ঘুষের সঙ্গে বড় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে পুলিশ”- এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনের খানিকটা তুলে ধরছি: “পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যের বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া থামছে না। মামলা তদন্তে ঘুষ নেওয়া, গ্রেফতার বা ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করার পাশাপাশি ছিনতাই-ডাকাতি, মাদক কেনাবেচা, ধর্ষণসহ বড় ধরনের অপরাধে পুলিশের জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে পুলিশ প্রশাসন থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও তা খুব কাজে আসছে না।”
লেখার পরিসর আর না বাড়িয়ে সংক্ষেপে বলতে চাই, বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা, দুর্নীতি প্রতিরোধ ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহিতার অনুভূতিও জাগ্রত করতে হবে। কারণ এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য যে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদসহ কোন দর্শনই মানুষকে ভোগবাদিতা থেকে মুক্ত করতে পারেনি। একমাত্র পরকালীন জবাবদিহিতা ও ধর্মীয় অনুশাসনই মানুষকে ভোগবাদ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম করেছে। মানুষের সহজাত এই প্রবৃত্তি তার সৃষ্টিকর্তাই সবচেয়ে ভালো জানেন। আর সে কারণেই পবিত্র কুরআনের ১০২ নম্বর সূরা “আত তাকাসুর”-এ বলা হয়েছে:
“অধিক (সম্পদ) লাভের প্রতিযোগিতা তোমাদের গাফেল করে রেখেছে, এমনি করেই (ধীরে ধীরে) তোমরা কবরের কাছে গিয়ে হাজির হবে; এমনটি কখনো নয়, তোমরা অচিরেই জানতে পারবে, কখনো নয়, তোমরা অতি সত্বরই (এর পরিণাম) জানতে পারবে; (কতো ভালো হতো!) যদি তোমরা সঠিক জ্ঞান কি তা জানতে পারতে; অবশ্যই তোমরা (সেদিন) জাহান্নাম দেখবে, অতঃপর তোমরা অবশ্যই তোমাদের নিজ চোখে তা দেখতে পাবে, অতঃপর (আল্লাহ তায়ালার অগণিত) নেয়ামত সম্পর্কে তোমাদের সেদিন জিজ্ঞেস করা হবে।”
পরিশেষে সবার অনুসন্ধানী দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইÑ একটু খেয়াল করুন। ব্যবসায়ী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গণপ্রতিনিধি, মন্ত্রী-আমলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে শুরু করে সব সেক্টরেই বিভিন্ন সময়ে কিছু পরকালের প্রতি নিখাদ বিশ্বাসী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ পাওয়া যায় যারা কখনই অবৈধ পথে আয় করেন না এবং বিদেশে টাকাও পাচার করেন না। হালাল পথে অর্জিত সামান্য অর্থ দিয়েই পরম তৃপ্তির সাথে নিজেদের ছোট্ট সংসার নিয়ে জীবনযাপন করছেন তারা। তাদের কাছে পরকালের মুক্তিই মুখ্য, অবৈধ অর্থ দিয়ে বিলাসী জীবনের স্বপ্ন তারা কখনোই দেখেন না। অপরদিকে, ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তা, অসাধু ব্যবসায়ী, দুর্নীতিবাজ গণপ্রতিনিধি, অসৎ মন্ত্রী-আমলা ও শিল্পপতিরাই অবৈধ পথে বিপুল অর্থের মালিক হচ্ছে। বিদেশে অর্থ পাচারকারীদের প্রায় সবাই এই ধরনের। বাড়ি, গাড়ি, নারী ও নেশার জগতে এরা বুঁদ হয়ে থাকে। বিভিন্ন উপলক্ষে এরাই আবার নিজেদের কখনোবা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি, কখনোবা প্রগতিশীল আবার কখনোবা মুক্ত চিন্তার মানুষ বলে দাবি করে থাকে।
লেখক : সাংবাদিক
ইমেইল: mkzbablu@gmail.com

SHARE

Leave a Reply