যে কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিতর্কিত

জাকারিয়া মোমেন

একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ সমর্থন করেছিলেন তাদের মধ্য থেকে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর তাদের কেউই বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেননি। এমনকি বিভিন্ন সময় তাদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে কথা উঠেছে। তথাপি তারা এ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অস্বীকার অথবা বাধাগ্রস্ত করেননি। এমনকি স্বাধীনতাবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ড করেননি অথবা এর সাথে সম্পৃক্ত কোনো কাজ করেননি। তারা কোনো সভা-সমাবেশে এমন কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি দেননি যা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে গণ্য করা যায়। তথাপি স্বদেশের সন্তানদেরকে ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত করে যে বিচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে তা বহুলাংশে বিতর্কিত বলে বিভিন্ন মহলে নিন্দিত-ধিকৃত হয়েছে। যে সমস্ত কারণে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বিতর্কিত তা নিয়ে বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে।
প্রথমত, এটা দলীয় বিচার। কারণ ১. ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার কর্তৃক। এতে বিরোধী জোটের সমর্থন ছিল না। যদিও তারা বিভিন্ন সময় বলেছে এই বিচার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে। তবু তাদের প্রত্যক্ষ সাহায্য সহযোগিতা ও সমর্থন এতে নেই। পৃথিবীর যত যুদ্ধাপরাধ ট্রায়াল হয়েছে তার কোনোটিতেই দলীয় বিবেচনায় যুদ্ধাপরাধ বিচার হয়নি। উদাহরণস্বরূপ-
ক. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অক্ষশক্তির পরাজয়ের পর যে নুরেমবার্গ ট্রায়াল হয় তাতে হাতেগোনা কয়েকটি দেশ (পরাজিত দেশসমূহ) ছাড়া সকলেই সেই বিচারের দাবিতে সোচ্চার ছিল। এমনকি মিত্র শক্তির চারটি দেশ (আমেরিকা, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স) থেকে সর্বমোট দশজন বিচারক দ্বারা সে বিচারকার্য সংঘটিত হয়। ফলে সে বিচারে বিশ্বজনমত ও সংহতি তৈরি হয়। কিন্তু বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারে একমাত্র ভারত ব্যতীত অন্য কোনো দেশ বা জাতির সমর্থন নেই। বিচারকাজে কোনো দেশ, জাতিসঙ্ঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা বা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষ বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়নি।
খ. টোকিও ট্রায়ালে এগারটি দেশ থেকে মোট এগার জন বিচারক বিচার করেন। তন্মধ্যে ভারতের পক্ষ থেকে বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল ছিলেন। এই রায়ে আটজন বিচারপতি অভিন্ন মত প্রকাশ করেন। বাকি তিনজন বিচারপতি তাতে মতপার্থক্য করেন। বিচারপতি পাল তাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি তার রায়ে দৃঢ়তার সাথে ব্যক্ত করেন যে, বিচারের সময় আইনের অস্তিত্বহীনতা দণ্ডদানের জন্য অবৈধ। তিনি বলেন, ‘আইনের লজ্জাজনক প্রয়োগ ও প্রতিহিংসার তৃষ্ণা নিবারণ’ (Wet for a thirst for revenge) এর জন্য এই বিচারের আয়োজন। যেহেতু ১৯৪৫ সালের আগে এই বিচারের আইনের অস্তিত্ব ছিল না। বিশেষ করে ‘উপরের আদেশে করেছি’ (Superior’s Order) এই অজুহাত দেখানোর আইনি সুযোগ থেকে এতে বঞ্চিত করা হয়। এতে জাপানের নেতৃবৃন্দের বিচার হলেও মিত্রশক্তিগুলো হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা বিস্ফোরণ করে যে লক্ষ লক্ষ জাপানিকে নৃশংস হত্যা করা হয় তার বিচারের দাবিও ওঠেনি। কারণ সে হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল মিত্রশক্তির দ্বারা। তাই এটি বিজয়ীর বিচার (Victor’s Justice) মাত্র।
গ. যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনালে এশিয়া থেকে তিনজন, ইউরোপ থেকে দুইজন, উত্তর আমেরিকা থেকে দুইজন, ল্যাটিন আমেরিকা থেকে একজন, আফ্রিকা থেকে দুইজন ও অস্ট্রেলিয়া থেকে একজন- এ নিয়ে ছয়টি দেশ থেকে এগারজন বিচারক বিচারকার্যে অংশগ্রহণ করেন। এ বিচার জাতিসঙ্ঘের নেতৃত্বে সংঘটিত হয়, যা বিশ্ববিবেকের তাড়নায় করা হয়।
ঘ. ঐতিহাসিক রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল জাতিসংঘের অধীনে বাংলাদেশ, সুইডেন, রাশিয়া ও সেনেগাল এই চারটি দেশের বিচারপতিরা অংশগ্রহণ করেন। বিশ্বে এই প্রথম বিচারিক দেশের প্রেসিডেন্ট জাতিসংঘের নিকট তার দেশের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়। ইতঃপূর্বে নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও টোকিও ট্রায়ালে জার্মান, ইতালি ও জাপান বিচারের দাবি ও সমর্থন জানায়নি। এদিক থেকে রুয়ান্ডা ট্রায়াল স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে।
ঙ. সিয়েরা লিয়ন ট্রায়াল রাজধানী ফ্রিটাওনে আদালত বসে। যাতে বিশ্বজনমত প্রতিফলিত হয়। অপরাধীদের দ্বারা আইনশৃঙ্খলা বিঘœ ঘটার আশঙ্কায় তা জাতিসংঘের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে আন্তর্জাতিক আদালত হেগে স্থানান্তরিত করা হয়।
চ. কম্বোডিয়ায় ১৯৭০ সালে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ২৭ বছর পর ১৯৯৮ সালে ট্রায়াল গঠন করা হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে ১৩ জন বিচারক নিয়োগ দেয়া হয়। ২০ লক্ষ খেমাররুজকে নৃশংস হত্যা ও ১০ লক্ষ কম্বোডিয়ান অনাহারে মৃত্যুবরণের মতো ইতিহাসের বীভৎসতম নৃশংস ঘটনার অপরাধীদের বিচার করা হয়।
উল্লিখিত ৬টি ট্রাইব্যুনালের বিচার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কারণ তাতে বিশ্বসম্প্রদায়ের সংহতি ও অংশগ্রহণ ছিল। তাতে বিচারকগণের ওপর কোনো নির্দিষ্ট আদর্শের, ভৌগোলিক সীমানা, রাষ্ট্রীয় সীমানা, জাতিগত সাদৃশ্য, ব্যক্তি ও জাতিগত ক্ষোভ-আক্রোশ চরিতার্থ করার মতো অভিযোগ আসেনি। অন্তত দলীয় বিচার হবার সামান্যতম অভিযোগ উত্থাপনের সুযোগ তৈরি হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে যে আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে বিচার হচ্ছে তা দ্বিধাহীনচিত্তে বলা যায় এটা দলীয় রাজনৈতিক নিরিখের বিচার। যা আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতির অংশ। শুরু থেকেই এতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট কিছুটা লুকোচুরি খেলার আশ্রয় নিয়েছিল সরকার। চলমান বিচারপ্রক্রিয়া ও বিচারক নিয়োগে আদর্শগত ক্ষোভ-আক্রোশ চরিতার্থ করার অভিযোগ নিশ্চিত সত্য। এতে মহাজোট সরকারের দলীয় মনোনয়নবিহীন কোনো বিচারক নেই। দেশের বাইরের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন কোনো বিচারকও এখানে নিয়োগ দেয়া হয়নি। ডিফেন্স টিম যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কৌঁসুলি আনার চেষ্টা করেছে বারবার। সরকার কোনো কৌঁসুলিকে ট্রাইব্যুনালে আসতে দেবে দূরের কথা, বিমান থেকে নামতে পর্যন্ত দেয়নি। এ ক্ষেত্রে টবি ক্যাডম্যানের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এ বিচার আইসিসি এর মান বা আদলে গঠিত নয়। নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিচার করার অঙ্গীকার ছাড়া আওয়ামী লীগ এর পেছনে অন্যকোনো যুক্তি বা জনমতের প্রমাণ আনতে পারবে না। এই বিচারের পেছনে জাতীয় জনমত আছে কি না তার যাচাই-বাছাই করা হয়নি। বরং এতে যে জনগণের আদৌ আগ্রহ নেই- এ বিষয়টি বহুলাংশে প্রমাণিত। বিশেষ করে বর্তমান পাঁচ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে মহাজোট প্রার্থীদের ভরাডুবির পর তাদের জনপ্রিয়তা তলানিতে পড়ে গেছে। একটি বিষয় ভাববার মতো। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর তার প্রতিবাদে এদেশে কারো জীবন দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু যুদ্ধাপরাধের ইস্যুতে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির আদেশ দেয়ার ফলে শুধু ফেব্রুয়ারিতেই ১০৭ জন সাঈদী ভক্ত প্রতিবাদ-প্রতিরোধে জীবন দেন। আরো বহুজন আহত হন। কারাবরণ করেন অসংখ্য। এতেই বোঝা যায়, এই ট্রাইব্যুনাল কতটুকু অজনপ্রিয়-অপাঙ্ক্তেয় ও বিতর্কিত। আর যাদেরকে যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে দিনের পর দিন জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকিয়ে রাখা হয়েছে তারা এ জাতির নিকট কতটুকু জনপ্রিয়, কত ¯েœহাস্পদ, কত ভালোবাসার পাত্র তা একবার ছেড়ে দিয়ে দেখা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, মূল অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে সহযোগীদের বিচার প্রহসন। যুদ্ধাপরাধ করেছিল পাকিস্তানি সেনারা। তাদের বিচার হয়েছে। ক্ষমাও করে দেয়া হয়েছে। সিমলা চুক্তির মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে। দেশীয় যারা যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিল তাদেরও বিচার করা হয়েছে এবং ক্ষমা করা হয়েছে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে একজন গেস্টাপোর শাস্তি দেয়া হয়। যিনি হলেন, গেস্টাপো বাহিনীর সিনিয়র অফিসার আর্নস্ট কালটেন ব্রুনার। যার ফাঁসির রায় হয়েছিল। টোকিও ট্রায়ালে কোন সহযোগী শক্তি বা ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধের আওতায় আনা হয়নি। এতে প্রধান অভিযুক্ত জাপানের স¤্রাট হিরোহিতোকে বিচারের তালিকা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। এতে সমালোচনার ঝড় ওঠে। নুরেমবার্গ ট্রায়ালে মূল অপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে অথবা ক্ষমা করা হয়নি। বরং একই সাথে বিচার করা হয়। ঢাকা ট্রায়ালে মূল আসামি বা অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী পাকিস্তানি ১৯৫ অভিযুক্তকে ক্ষমা করে তার ৩৫ বছর পর সহযোগীদের ওপর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ এনে বিচার করা প্রহসনে পরিণত হয়েছে। টোকিও ট্রায়ালে সম্রাট হিরোহিতোকে প্রধান অভিযুক্ত তালিকা হতে বাদ দেয়া হলেও সেখানে কোন মূল আসামিকে ক্ষমা অথবা মুক্তি দিয়ে সহযোগী অপরাধীর বিচার আমলে আনা হয়নি। এই বিষয়টি ঢাকা ট্রায়ালকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মূল আসামিদের ছেড়ে দেয়ার দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর যুদ্ধাপরাধের ইস্যু চাপানো বিচারিক বাতুলতায় পরিণত হচ্ছে।
চতুর্থত, এটা আদর্শিক দ্বন্দ্বজনিত বিচার। ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের হাতে রচিত মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপত্র (Proclamation of independence) ১৯৭০ সালে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা তৎকালীন কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল অস্থায়ী গণপরিষদ বসিয়ে অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি তাজউদ্দীন ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল একই স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সেই ইশতেহার ঘোষণা করেন। ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের ব্যাপারে ঘোষণা করা হয়- We the elected representatives of the people of Bangladesh as honor bound by the mandate given to us by the people of Bangladesh whose will is supreme, duly constituted ourselves into a Constituent Assembly, and Having held mutual consultations, and In order to ensure for the people of Bangladesh equality, human dignity and social justice,
[Source: (History of Bangladesh War of Independence: Documents, Vol. 3, Ministry of Information, Government of the Peoples’ Republic of Bangladesh, Dhaka, 1982, pp. 4-6)]

অনুবাদ : ‘আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে, নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করিলাম, এবং পারস্পরিক আলোচনা করিয়া, এবং বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে (সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রীরূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম)।’
সুতরাং একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার। মুক্তিযুদ্ধের এই চেতনা হঠাৎ আকাশ থেকে নাজিল হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে একটি গোষ্ঠী প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শের আড়ালে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আদর্শ হিসেবে চালিয়ে দেন। এর ফলে জাতিগতভাবে আদর্শিক বিভাজনের কবলে পড়ে বাংলাদেশ। একই নিরিখে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ ধারণার উদ্ভব হয়। মুক্তিযুদ্ধের পর অদ্যাবধি স্বাধীনতাবিরোধী কোন শক্তির অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও কতিপয় ব্যক্তি ও দলকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে স্বাধীনতাবিরোধী সাব্যস্ত করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হয়। একপেশে বিচারের প্রহসন জাতির সামনে মঞ্চস্থ হয়। এটা আদর্শিক সংঘাতের বিচার। এর মাধ্যমে ভিন্নমতাবলম্বী খতম করার কৌশল করা হয়েছে। আজ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ভেতরে বাইরে যারা আছেন তারা হয়ত সেক্যুলারপন্থী অথবা বামপন্থী। অন্য দিকে যাদেরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হয়ত ইসলামপন্থী অথবা জাতীয়তাবাদী। ফলে ভিন্ন মতাবলম্বী খতম ও দ্বান্দ্বিক আদর্শ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সরকার পক্ষের ছায়া জাগরণ মঞ্চ তথা গণজাগরণ মঞ্চের যারা আয়োজক ছিলেন তারা তো মূলত সরকারেরই প্রতিবিম্বিত রূপ। কে জানত ফুলানো-ফাঁপানো বেলুনটা এবার ফেটে যাবে? মোমের আলোতে শাহবাগ আলোকিত হলেও শাহবাগীদের অন্তরে আলো জ্বালাতে পারেনি। ব্লগারদের বাহ্যিক শুভ্রতার ভেতরে যে অন্ধকার জগৎ তারা তৈরি করে রেখেছে তা ফাঁস হয়ে পড়লে জাতি ধর্মীয়ভাবে প্রচণ্ড আঘাত পায়। হতাশ্চর্য হয়ে পড়ে জাতি। এর ফলে তৈরি হলো হেফাজতের সমাবেশ। শাহবাগে লোক এল হাজারে হাজার। আর মতিঝিলে হেফাজতের লোক এলো লাখে লাখে। ভুল করলেন হাসিনা সরকার। পূর্বাহ্নেই একটি প্রভাবশালী পত্রিকা আমার দেশ বন্ধ করে রেখেছে। বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী মাহমুদুর রহমানকে আটক করে রিমান্ডের নামে নির্যাতন করে পুলিশ। দু’টি ইলেকট্রনিক মিডিয়া নয়া দিগন্ত ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে। গভীর রাতে রাস্তার লাইট বন্ধ করে দশ হাজার পুলিশ, বিডিআর, র‌্যাবের যৌথ অভিযানে ঘুমন্ত কতজন হেফাজতি প্রাণ দিলো জাতিকে তাও জানতে দেয়া হয়নি। মাসাধিককাল শাহবাগে তথাকথিত ব্লগারদের নেতৃত্বে গণজাগরণ মঞ্চকে সরকার সকল প্রকার রসদ সরবরাহ করে অবস্থান করতে দিলো। অথচ আদর্শিক দ্বন্দ্বের কারণে মাত্র একটি রাত হেফাজতিদের সহ্য করেনি সরকার। সুতরাং সরকার সৃষ্ট ট্রাইব্যুনাল হয়ে পড়েছে ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও বামপন্থী সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যে ঠা-া লড়াইয়ের হাতিয়ার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ইসলামপন্থীরা। তাই তারা বিভিন্ন নামে জেগে ওঠে।
পঞ্চমত, নুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল বিতর্কিত হয়েছিল যে সব কারণে তার অন্যতম হলো ‘অপরাধ সংঘটনের সময় আইনের অস্তিত্ব না থাকা’ (Ex Post Facto Law)। ঢাকা ট্রাইব্যুনালে একই অভিযোগ এসে যায়। এতে অধিকতর জোরালো অভিযোগ হলো আব্দুল কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার জন্য আইনে সংযোজনী আনা হয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে ফাঁসির দাবির প্রেক্ষিতে আইনে পরিবর্তন আনা হয়। অতি স্বতঃসিদ্ধ কথা ‘সাধারণের মতামত চপল’ (Public Opinion is Fickle)। চপলতা বিচারকার্যক্রমের অন্তরায়। অথচ ট্রাইব্যুনালের আইন পরিবর্তন হয় সাধারণের দাবি (Public Opinion) এর ভিত্তিতে। ইতঃপূর্বে বিশ্বের অন্যকোনো ট্রাইব্যুনালে এরূপ করা হয়নি। এটি শুধু ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করেনি বরং পুরো বিচারিক আইনি ভিত্তিকে কলঙ্কিত করে দিয়েছে। এতে বোঝা যায়, কতিপয় ব্যক্তির আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য ট্রাইব্যুনালের জন্ম হয়েছে। যার সর্বপ্রথম বলির পাঁঠা হলেন আব্দুল কাদের মোল্লা।
ষষ্ঠত, (Tu Quoqe) যে অপরাধে অপরাধীর বিচার করা হয় একই অপরাধে বিচারকারীও অপরাধী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নুরেমবার্গ ট্রায়ালে অক্ষশক্তির বিচার হয়। কিন্তু মিত্রশক্তির অপরাধের কোনো বিচার হয়নি। এমনকি জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার মত ধ্বংসাত্মক অপরাধেরও বিচার হয়নি। এর প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত অভিযোগের উৎপত্তি হয়। একইভাবে একাত্তরে পাকিস্তানপন্থী বিশেষ করে বিহারি নারী-পুরুষের ওপর যে অকথ্য হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন হয়েছিল ঢাকা ট্রায়ালে তার বিচার আমলে আনা হয়নি। শুধু একটি চিহ্নিহ্নত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ওপর আক্রোশ চরিতার্থ করাই এর উদ্দেশ্যে।

আওয়ামী লীগ এ দেশ পরিচালনার জন্য নিজেদেরকে একমাত্র যোগ্য মনে করে থাকে। এরূপ বিশ্বাসে তাদেরকে মারমুখী করে ফেলেছে। জার্মান বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত ভাষার অধ্যাপক ছিলেন ম্যাক্স মুলার। যিনি ১৮৭৫ সালে ‘ঋকবেদ’ এর অনুবাদ করেন ইংরেজি ভাষায়। তিনি দর্শন ইঙ্গিত প্রদান করেন-একমাত্র আর্যরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি। তাদেরই অধিকার রয়েছে বিশ্ব শাসন করার ও আরো উন্নত সভ্যতা গড়বার। এর কারণে জার্মানে হিটলারের জন্ম হয়। তাদের মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে প্রভু জাতির (Herrenvolk) ধারণা সৃষ্টি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানের পতন হয়। বিশ্ব হারায় অনেক কৃতী সন্তানকে। আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে স্বাধীনতার একমাত্র পক্ষশক্তি ধারণা করে সে রকম একটা বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে এ দেশ ও জাতিকে। যারা মানবতাবাদী, শান্তিকামী তাদের উচিত এ ধরনের ধ্বংসাত্মক নীতি থেকে তাদেরকে বিরত রাখা। স্বদেশের সন্তানদের হত্যা করে কোন দেশের উন্নতি করা সম্ভব নয়।

SHARE

Leave a Reply