যে শিক্ষা ব্যর্থ হচ্ছে শিক্ষিত করতে -ফিরোজ মাহবুব কামাল

উপেক্ষিত হচ্ছে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য

শিক্ষার মূল লক্ষ্যটি স্রেফ সাক্ষর-জ্ঞান, ভাষাজ্ঞান বা পড়ালেখার সামর্থ্য বৃদ্ধি নয়। নিছক তথ্য ও তত্ত্ব জানানোও নয়। এমনকি বিজ্ঞান বা কারিগরি জ্ঞানে দক্ষ করাও নয়। বরং সে মূল উদ্দেশ্যটি হলো ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করা। তাকে মানবিক গুণে প্রকৃত মানুষ রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। তখন ব্যক্তির বিশ্বাস, দর্শন ও রুচিবোধই শুধু পাল্টে যায় না, পাল্টে যায় তার কর্মকাণ্ড, আচার-আচরণ ও চিরায়ত অভ্যাস। তখন বাড়ে সত্যকে মিথ্যা থেকে আলাদা করার সামর্থ্য। অসভ্য ও অসুন্দর মানুষ থেকে শিক্ষিত মানুষ তখন ভিন্নতর মানুষে পরিণত হয়। শিক্ষার মাধ্যমে জাতি এভাবেই পায় পরিশীলিত, সভ্য ও সুন্দর চরিত্রের মানুষ। কিন্তু বাংলাদেশ তা পায়নি। বাংলাদেশের এ বিশাল ব্যর্থতাটি স্রেফ মিথ্যাপূর্ণ গলাবাজি করে ঢাকা যায় না। সে ব্যর্থতার প্রমাণ তো হলো, দেশজুড়ে সন্ত্রাস, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি, অরাজকতা, স্বৈরাচারীদের দখলদারি ও দুর্নীতিতে বিশ্বে বারবার প্রথম স্থান অর্জন। এসব ব্যর্থতার কারণ অনেক। তবে মূল ব্যর্থতাটি শিক্ষাব্যবস্থার। গরু-ছাগল বেড়ে ওঠে গোয়ালে এবং মানবশিশু মানবিক গুণে বেড়ে ওঠে বিদ্যালয়ে। বাংলাদেশের ব্যর্থতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে শিক্ষিত করতে এবং ছাত্রদের প্রকৃত মানব রূপে গড়ে তুলতে চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। এ শিক্ষা শুধু দুর্নীতি, সন্ত্রাস, স্বৈরাচারই বাড়ায়নি, বাড়িয়েছে পরনির্ভরতাও। মেরুদণ্ড গড়ার বদলে সেটিকে বরং চূর্ণ বা পঙ্গু করছে। ব্যক্তির নিজেকে ও তার প্রভুকে জানতেও এটি তেমন সাহায্য করছে না।
শিক্ষার মূল লক্ষ্য, কোনটি সত্য ও কোনটি মিথ্যা এবং কোনটি জান্নাতের পথ আর কোনটি জাহান্নামের পথ- সেটি জানায় ছাত্রের সামর্থ্য বাড়ানো। সেটি না হলে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শয়তানের শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়। তখন ছাত্রগণ কর্মজীবনে ডাক্তার, রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, প্রকৌশলী, প্রশাসক বা বিচারক হয়েও মিথ্যার জোয়ারে ভাসতে থাকে ও শয়তানের সেপাহিতে পরিণত হয়। এমন দেশে ভিনদেশী শত্রুগণও তাদের পক্ষে বিপুল সংখ্যক ভাড়াটে সৈনিক পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ডিগ্রি নিয়েও এমন ব্যক্তি নিরেট জাহেল, ইসলামের শত্রু ও জাহান্নামের যাত্রীতে পরিণত হয়। ইসলামের বিজয় রুখতে তারা আন্তর্জাতিক কাফির শক্তির সাথেও কোয়ালিশন গড়ে। ইসলামে জাহেল থাকাটিই এ জন্যই কবিরা গুনাহ। সকল গুনাহর এটিই হলো জননী। তাই অজ্ঞতা নিয়ে অসম্ভব হয় সত্যিকার মুসলিম হওয়া। তাই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী কোন ব্যক্তি যখন সেক্যুলারিস্ট, জাতীয়তাবাদী বা সমাজবাদী রাজনীতির ক্যাডার বা সমর্থক হয় তখন কি বুঝতে বাকি যে ব্যর্থতাটি এখানে শিক্ষালাভে?
গাড়ির গায়ে রঙ লাগানোর চেয়ে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো ইঞ্জিনকে ঠিক করা। নইলে সে গাড়ি চলে না। ইসলামের সে ইঞ্জিনটি হলো ঈমান। এবং সেটি নির্মিত হয় পবিত্র কোরআন-হাদিসের জ্ঞানে। তাই ইসলামে ফরজকৃত প্রথম ইবাদতটি নামায-রোযা বা হজ-জাকাত নয়। সেটি হলো জ্ঞানার্জন। সঠিক ও শক্তিশালী ইঞ্জিনের সাথে যেটি আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক পথের তথা সিরাতুল মুস্তাকিমের রোডম্যাপ। পবিত্র কোরআন হলো সে রোডম্যাপ। পবিত্র কোরআনের জ্ঞান ছাড়া কোন ব্যক্তির নিজের বুদ্ধিতে তা সে যত বড় বুদ্ধিমানই হোক না কেন, জান্নাতের সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। সেটি এমনকি নবীজী (সা)-এর পক্ষে সম্ভব ছিল না। “ইকরা বিসমি রাব্বিকাল্লাযি খালাক”-অর্থ “পড় যিনি সৃষ্টি করেছেন সে মহান প্রভুর নামে,” পবিত্র কোরআনে ঘোষিত মহান আল্লাহর এ প্রথম আয়াতটি এবং প্রথম এ হুকুমটি মূলত সে অপরিহার্য বিষয়টিই সুস্পষ্ট করে এবং সে নির্দেশটি স্রেফ নবীজী (সা)-এর প্রতি নয়, বরং প্রতিটি মানুষের ওপর। যার মাঝে সে জ্ঞানার্জনের হুকুম পালনে আগ্রহ নাই সে ব্যক্তি নামাযী, রোজাদার বা হাজী হতে পারে; কিন্তু যেরূপ জ্ঞানবান মুসলিম মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দীয় সে পর্যায় পৌঁছা কি তার পক্ষে সম্ভব?
যে ব্যক্তি পবিত্র কোরআনের সে জ্ঞান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলো, সে ব্যক্তি তো নিরেট জাহেল। এমন জাহেলগণ মুসলিম হওয়ার পরিবর্তে কাফের, মুনাফিক ও জালেম হয়; এবং পরকালে এরাই অনন্ত কালের জন্য জাহান্নামের বাসিন্দা হয়। জ্ঞানার্জন ছাড়া ঈমান-আকিদা যেমন ঠিক হয় না, তেমনি অন্য ইবাদতও সঠিক হয় না। কোরআনি ইলমে সত্যিকার জ্ঞানবান ব্যক্তিকে ইসলামে আলেম বলা হয় এবং সে জন্য মাদরাসার ডিগ্রি জরুরি নয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে আজ অবধি মুসলিম ইতিহাসে যারা শ্রেষ্ঠ আলেম রূপে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন তাদের কারোরই এমন ডিগ্রি ছিল না। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা ঘোষণা দিয়েছেন, “ইন্নামা ইয়াখশাল্লাহ মিন ইবাদিহিল উলামা”। আয়াতটির অর্থ হলো : মানবসৃষ্টির মাঝে একমাত্র আলেমগণই আল্লাহকে ভয় করে। এর অর্থ দাঁড়ায়, প্রকৃত মুসলিম হওয়ার জন্য জ্ঞানার্জন অপরিহার্য। আর জ্ঞানের সবচেয়ে বিস্ময়কর ও সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডারটি হলো পবিত্র কোরআন। এটিই মানবজাতির জন্য শ্রেষ্ঠ দান; তেল, গ্যাস বা সোনা-রূপা নয়। তাই কোরআনের জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত জ্ঞানী হওয়া যায় না। বাংলাদেশে সেটি না হওয়ায় স্রেফ ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বেড়েছে, প্রকৃত জ্ঞানী বা আলেম বাড়েনি।

পালিত হচ্ছে না জ্ঞানার্জনের ফরজ

খাওয়ার অর্থ কোন কিছু শুধু মুখে পুরা নয়, বরং সেটি চর্বণ করা, গলাধঃকরণ করা এবং হজম করা। নইলে সেটি খাওয়া হয় না, এবং তাতে দেহের পুষ্টিও বাড়ে না। বরং তাতে খাদ্যের অপচয় হয়। খাওয়ার টেবিলে বসে কোন শিশু সেটি করলে সে শিশুর পিতা তাতে খুশি হয় না। তেমনি পড়ার অর্থ শুধু তেলাওয়াত নয়, বরং যা পড়া হয় তার অর্থ পুরাপুরি বুঝা। অথচ বাংলাদেশে কোরআন পড়ার নামে স্রেফ তেলাওয়াত হয়, কোরআন বুঝা হয় না। কোরআনি জ্ঞানার্জনের ফরজও এতে আদায় হয় না। অথচ পবিত্র কোরআনে “আ’ফালা ইয়াতাদাব্বারুন” (অর্থ: তোমরা কেন গভীরভাবে মনোনিবেশ করো না?) এবং “আ’ফালা তা’ক্বলুন” (অর্থ: তোমরা কেন নিজের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগাও না?) এরূপ প্রশ্ন রেখে মহান আল্লাহতায়ালা মূলত পবিত্র কোরআন বুঝার ওপর অপরিসীম গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীর যুগে সাহাবাগণ সেটি বুঝেছিলেন। তাই সে সময় যারা নিরক্ষর ছিলেন বা ভেড়া চরাতে তারাও দ্রুততার সাথে অতি উচ্চমানের জ্ঞানী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। অথচ বিস্ময়ের বিষয় হলো, বাংলাদেশের আলেমগণ এরূপ অর্থ না বুঝে যারা স্রেফ তেলাওয়াত করে তাদের কাজকে নিন্দা করেন না। বরং সেটিকে সওয়াবের কাজ বলে প্রশংসা করেন। ফরজে আইন পালনের বদলে স্রেফ সওয়াব হাসিলই তাদের কাছে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
অথচ না বুঝে নিছক তেলাওয়াতের যে নফল সওয়াব- সেটি হাসিল না করলে কারো গুনাহ হয় না। তা ছাড়া মাথা টানলে যেমন কান এমনিতেই আসে, বুঝে কোরআন পাঠ করলে তেলাওয়াতের সওয়াব তো সে সাথে জুটতোই। কিন্তু কোরআন না বুঝলে মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের যে চরম অবাধ্যতা হয় এবং তাতে সিরাতুল মুস্তাকিমে চলা যে সম্ভব হয় না -সে হুঁশ কি তাদের আছে? মহান আল্লাহতায়ালার হুকুমের প্রতিটি অবাধ্যতাই তো কুফরি। পবিত্র কোরআনের সাথে এমন আচরণই বাঙালি মুসলিমদের ইসলাম থেকে দূরে থাকার মূল কারণ। অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ায় পবিত্র কোরআনের বার বার খতম তেলাওয়াত সত্ত্বেও তাদের জ্ঞানের ভুবনে কোনো বৃদ্ধি ঘটছে না। লক্ষ লক্ষ ঘণ্টা এভাবে ব্যয় হলেও তাতে আলেম সৃষ্টি হচ্ছে না। আলেম সৃষ্টি হলে তা ইসলামের বিজয়ে মুজাহিদও সৃষ্টি হতো। আলেম সৃষ্টি না হওয়ার কারণে আল্লাহভীরু প্রকৃত মুসলিমও সৃষ্টি হচ্ছে না। শিক্ষার ময়দানে বাঙালি মুসলিমদের জীবনে এটিই সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। সে ব্যর্থতার কারণে দ্রুত বাড়ছে জাহেলদের সংখ্যা। ফলে বাড়ছে ১৬ কোটি মুসলিমের দেশে ইসলামের পরাজয়।
শিক্ষার মাধ্যমেই ছাত্রছাত্রীদের জীবনে প্রতিদিন ভ্যালু অ্যাড বা মূল্য সংযোজন হয়। মানবজীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ হলো এরূপ লাগাতর মূল্য সংযোজন। রাষ্ট্রের এবং মানবজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো এটি। ভূমি, কৃষিপণ্য, খনিজসম্পদের গায়ে মূল্য সংযোজনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মহান আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির গায়ে মূল্য সংযোজন। তবে মানবজীবনে সবচেয়ে বড় মূল্য-সংযোজনটি হলো হিদায়েত বা সিরাতুল মুস্তাকিম-প্রাপ্তি। মানবজীবনের সাথে সেটি যুক্ত না হলে ব্যক্তি ও সমষ্টির সকল খাত ব্যর্থ হতে বাধ্য। তখন ব্যর্থ হয় প্রশাসন, রাজনীতি, প্রতিরক্ষা, আইন-আদালত, শিল্প, কৃষি, বিজ্ঞানসহ রাষ্ট্রের অন্যান্য খাত। মূল্য সংযোজনের অর্থ, ব্যক্তির জীবনে লাগাতর জ্ঞান, প্রজ্ঞা, চারিত্রিক পরিশুদ্ধি ও কর্মকুশলতা বৃদ্ধি।
মুমিনের জীবনে শিক্ষাকালটি স্কুল-কলেজের শিক্ষা শেষ হওয়ায় শেষ হয় না। বরং আজীবন সে ছাত্র; এবং তার জ্ঞানার্জন চলে কবরে যাওয়ার পূর্ব-মুহূর্ত পর্যন্ত। তাই নবীজী (সা) বলেছেন, তার জন্য ধ্বংস যার জীবনে পর পর দু’টি দিন এলো অথচ তার জ্ঞানে বৃদ্ধি ঘটলো না। ঈমানদার ব্যক্তিকে তাই রাতে বিছানায় যাওয়ার আগে ভাবতে হয়, তার জ্ঞানের ভুবনে সে দিনে কতটুকু অর্জন হলো তা নিয়ে। পাটের আঁশে মূল্য সংযোজন না হলে সেটি স্রেফ আঁশই থেকে যায়। বাজারে তার মূল্য সামান্যই। মূল্য সংযোজন হলে সে পাটের আঁশই মূল্যবান কার্পেটে পরিণত হয়। মূল্য সংযোজনের ফলে খনির স্বর্ণ পরিণত হয় অতি মূল্যবান গহনাতে। মানবজীবনে মূল্য সংযোজনের সে ইন্ডাস্ট্রিগুলো হলো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদ-মাদরাসা। কিন্তু বাংলাদেশে সবচেয়ে ব্যর্থ খাত হলো এগুলো। এ প্রতিষ্ঠানগুলোতে হচ্ছে এর উল্টোটি।

শিক্ষাঙ্গন যেখানে ক্রাইম ইন্ডাস্ট্রি

বাংলাদেশকে যারা সন্ত্রাসী, স্বৈরাচারী, ও দুর্নীতিবাজদের দেশে পরিণত করেছে তারা কোন ডাকাত পাড়ায় বেড়ে ওঠেনি। তারা শিক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয়। নবীজী (সা)-এর বিখ্যাত হাদিস, “প্রতিটি শিশুর জন্ম হয় মুসলিম রূপে”। তাই মুসলিম দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত কাজ হলো, প্রতিটি শিশুর জীবনে কোরআনি জ্ঞানের সাহায্যে যথাযথ মূল্য সংযোজন ঘটিয়ে মুসলিম রূপে বেড়ে উঠতে সাহায্য করা। এভাবেই মুসলিম দেশের ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রদের সাহায্য করে জান্নাতে পৌঁছতে। কিন্তু অমুসলিম দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এজেন্ডাটি হয় উল্টোটি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তখন ব্যবহৃত হয় ছাত্রদের ইসলাম থেকে দূরে সরানো ও ইসলামের শত্রু তৈরির কাজে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী ছাত্ররা যখন সন্ত্রাসী, খুনি, ঘুষখোর, ধর্ষক, মাদকাসক্ত এবং রাজনীতিতে নাস্তিক, জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী ও সেক্যুলারিস্ট রাজনীতির ক্যাডার ও ইসলামের শত্রু রূপে খাড়া হয়, তখন কি বুঝতে বাকি থাকে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কিসের ইন্ডাস্ট্রি। এগুলোর কারণে মুসলিম শিশু ডিগ্রি পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এসব ডিগ্রিধারীই বাংলাদেশকে বারবার পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ রূপে।
প্রতিটি ব্যক্তির গভীরে যে সম্পদ লুকিয়ে আছে তা সোনার খনির বা তেলের খনির চেয়েও হাজারো গুণ সমৃদ্ধ। শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় এবং উন্নততর সভ্যতার নির্মাণে বস্তুত এ মানবিক সম্পদই মূল। অন্যসব সম্পদের প্রাচুর্য আসে এ সম্পদের ভিত্তিতেই। তাই উন্নত জাতিসমূহ শুধু মাটি বা সাগরের তলাতেই অনুসন্ধান করে না, বরং মানুষের গভীরেও আবিষ্কারে হাত দেয়। মানুষের নিজ শক্তি আবিষ্কৃত না হলে প্রাকৃতিক শক্তিতে তেমন কল্যাণ আসে না। তাই আফ্রিকার সোনার খনি বা আরবদের তেলের খনি সে এলাকার মানুষকে উপহার দিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও মানবেতর স্বৈরাচার। অথচ নবী পাক (সা) মানুষকে সভ্যতার কাজে ও সভ্যতার নির্মাণে ব্যক্তির সুপ্ত শক্তির আবিষ্কারে হাত দিয়েছিলেন। ফলে মানব-ইতিহাসের বিস্ময়কর মানুষে পরিণত হয়েছিলেন সাহাবায়ে কেরাম। ফেরেশতাদের চেয়েও তারা উঁচুতে উঠতে পেরেছিলেন। তবে বীজ থেকে অঙ্কুরোদগমের জন্য চাই উপযুক্ত মাটি, পানি ও জলবায়ু। নইলে তা থেকে চারা গজায় না, বৃক্ষও বেড়ে ওঠে না। তেমনি ব্যক্তির সুপ্তশক্তি ও সামর্থ্যরে বেড়ে ওঠার জন্যও চাই উপযুক্ত পরিবেশ। সেরূপ একটি পরিবেশ দিয়ে সাহায্য করাই বিদ্যালয়ের মূল কাজ। তখন জেগে ওঠে ব্যক্তির ঘুমন্ত বিবেক। বেড়ে ওঠে তার ব্যক্তিত্ব। বিদ্যালয়ে এ কাজ না হলে তখন দেহ হত্যা না হলেও নিহত হয় শিশুর সুপ্ত সৃষ্টিশীল সামর্থ্য। তখন বিদ্যালয় পরিণত হয় বিবেকের বধ্যশালায়। তখন মানুষ পরিণত হয় নিজেই নিজের বিবেক ও প্রতিভার কবরস্থানে।
বাংলাদেশের বিদ্যালয়ে এভাবেই খুন হচ্ছে বহু খালেদ, তারেক, ইবনে সিনা, ফারাবি, তাবারির ন্যায় প্রতিভা। তবে বিপদ শুধু প্রতিভার হত্যাকান্ডতেই সীমাবদ্ধ নয়। জমিতে ফসল না ফলালে যেমন বিপদ বাড়ে আগাছার তান্ডবে, তেমনি সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বের আবাদ না বাড়ালে সেখানে বেড়ে ওঠে দুর্বৃত্তরা। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে অতি ব্যাপকভাবে। দেশটির আজকের বিপদের মূল হেতু এখানেই। এরা যে শুধু পতিতাপল্লী, জোয়ার আসর ও ড্রাগের ব্যবসা দখলে নিয়েছে তাই নয়, রাজনীতি, অফিস আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর ওপরও আধিপত্য জমিয়েছে। নিছক রাস্তার চোর-ডাকাত বা সন্ত্রাসীদের কারণে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হয়নি। বরং সে উপাধিটি জুটেছে দেশের সর্বস্তরে দুর্বৃত্তদের দখলদারি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণে।
পশু থেকে মানুষ পৃথক তার চেতনার কারণে। এ চেতনা দেয় চিন্তা-ভাবনার সামর্থ্য। এবং এ চিন্তা-ভাবনা থেকেই ব্যক্তি পায় সত্য-মিথ্যা, ন্যায়-অন্যায় এবং ধর্ম-অধর্ম বেছে চলার যোগ্যতা। মহৎ মানুষ রূপে বেড়ে ওঠার জন্য এটি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে পবিত্র কোরআনে বার বার বলা হয়েছে, ‘আফালাতাকিলুন’, ‘আফালাতাদাব্বারুন’ ‘আফালাতাফাক্কারুন’ বলে। অর্থ ‘তোমরা কেন চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগাও না?’ ‘তোমরা কেন ধ্যানমগ্ন হও না?’ ‘তোমরা কেন ভাবনা?’ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবিক গুণ তাই দৈহিক বল নয়, বরং তার চিন্তাভাবনার সামর্থ্য। চিন্তার সামর্থ্য অর্জিত হলে নিজেকে শিক্ষিত করার কাজে সে শুধু সুশীলছাত্র রূপেই বেড়ে ওঠে না, নিজেই নিজের শিক্ষকে পরিণত হয়। এমন ব্যক্তির জীবনে শেখা এবং শেখানো এ দুটোই তখন সমানে এগোয়। ঈমানদার তাই সর্বাবস্থাতেই যেমন ছাত্র, তেমনি শিক্ষকও। ফুলে ফুলে ঘুরে মধুসংগ্রহ যেমন মৌমাছির ফিতরাত, তেমনি সর্বমুহূর্তে ও সর্বস্থলে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান-দানের ফিতরাত হলো প্রকৃত জ্ঞানীর। তখন জ্ঞানের সন্ধানে সাগর, মরুভূমি, পাহাড়-পর্বত অতিক্রমেও সে পিছপা হয় না। বিদ্যালয়ের কাজ সে ফিতরাতকে জাগ্রত করা। একমাত্র তখনই নর-নারীগণ জ্ঞানার্জনের মেশিনে পরিণত হয়। তখন দেশে জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রবল জোয়ার আসে।
শিক্ষকের দায়িত্ব জ্ঞানার্জনের সে ধারাকে শুধু বিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি কোণে পৌঁছে দেয়া। তখন সমগ্র দেশ পরিণত হয় পাঠশালায়। নবীজীর আমলে সেটিই হয়েছিল। ফলে সে সময় কোন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না থাকলেও যে হারে ও যে মাপে জ্ঞানী ব্যক্তি সৃষ্টি হয়েছিলেন মুসলিম বিশ্বের শত শত বিশ্ববিদ্যালয় আজ তা পারছে না। সে আমলে জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব একজন গৃহবধূ যতটুকু বুঝতেন এ আমলের প্রফেসরও তা বুঝেন না। এবং সে প্রমাণ ইতিহাসে প্রচুর। শিশু আবদুল কাদের জিলানী (রহ)-এর মাতা জীবনের সকল সঞ্চয় শিশুপুত্রের জামার আস্তিনে বেঁধে ইরানের গিলান প্রদেশ ছেড়ে হাজার মাইল দূরের বাগদাদে পাঠিছিলেন। অথচ সে সময় আধুনিক যানবাহন ছিল না। পথে ছিল ডাকাতের ভয়, যার কবলে তিনি পড়েছিলেনও। মুসলমানগণ তাদের গৌরব কালে জ্ঞানার্জনকে কতটা গুরুত্ব দিতেন এটি হলো তারই নমুনা। অথচ আজ বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর জ্ঞানদানের কাজে ফাঁকি দিয়ে বিদেশী সংস্থায় কাজ করেন। মেডিক্যাল কলেজের প্রফেসর ভবিষ্যৎ ডাক্তার তৈরির কাজে ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে বসে অর্থ কামাই করেন। তারা নিজ সন্তানের ধর্মজ্ঞান দানে এতই উদাসীন যে, সে লক্ষ্যে হাজার মাইল দূরে দূরে থাক, পাশের অবৈতনিক মাদরাসাতেও পাঠাতে রাজি নন।

সকল ব্যর্থতার মূল জন্মভূমি

দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই দেশের প্রতিটি মানুষ জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবৃদ্ধির বিরামহীন মেশিনে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে ইসলামের অর্জনটি সমগ্র মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব। পবিত্র কোরআনের পূর্বে আরবি ভাষায় কোনো গ্রন্থ ছিল না। ছিল শুধু কিছু কবিতা ও কাসিদা। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা জ্ঞানার্জনকে ফরজে আইন তথা প্রত্যেকর ওপর বাধ্যতামূলক ঘোষণা করে। ফলে সে ফরজ পালনের তুমুল আগ্রহে অতি অল্প সময়ের মধ্যে জ্ঞানের ভুবনে মুসলিম বিশ্বে বিশাল সমৃদ্ধি আসে। ঘরে ঘরে তখন লাইব্রেরি গড়ে ওঠে। মিসর, সুদান, মরক্কো, তিউনিসিয়া, লিবিয়া, আলজেরিয়ার ন্যায় বহু দেশের মানুষের মাতৃভাষা আরবি ছিল না। কিন্তু জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়ার প্রয়োজনে নিজেদের মাতৃভাষা দাফন করে আরবি ভাষাকে নিজেদের ভাষা রূপে গ্রহণ করেছেন। ফলে তারা ইসলামী সভ্যতার নির্মাণে বিশাল ভূমিকা রাখতে সমর্থ হন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা বিশাল। দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা যেমন জ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাণ্ডার পবিত্র কোরআনের সাথে সম্পর্ক গড়তে ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি শিক্ষককে আদর্শ শিক্ষক রূপেও গড়ে তুলতে পারেনি। তেমনি ছাত্রকেও গড়ে তুলতে পারেনি প্রকৃত ছাত্র রূপে। তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝাতে। এটিই হলো বাংলাদেশের সকল ব্যর্থতার জন্মভূমি। নিছক পড়ন, লিখন বা হিসাব-নিকাশ শিখিয়ে সেরূপ গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়? এ জন্য তো জরুরি হলো, ব্যক্তির বিশ্বাস ও দর্শনে হাত দেয়া। নবীজীর (সা) আগমনে আরবের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসেনি। পরিবর্তন আসেনি তাদের দৈহিক বল বা খনিজসম্পদে। বরং বিপ্লব এসেছিল তাদের জীবনদর্শনে। সে দর্শন পাল্টে দিয়েছিল বাঁচার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও রুচিবোধ। ফলে বিপ্লব এসেছিল শিক্ষা খাতে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় লিখন, পড়ন বা হিসাব-নিকাশ গুরুত্ব পেলেও গুরুত্ব পায়নি দর্শন। ফলে জীবন পাচ্ছে না সঠিক দিকনির্দেশনা। পুষ্টি পাচ্ছে না শিক্ষার্থীর বিবেক ও চেতনা। ফলে ছাত্র পাচ্ছে না সুষ্ঠু চিন্তার সামর্থ্য। অথচ জাতি আদর্শ নেতা, বুদ্ধিজীবী, সংস্কারকের সরবরাহ পায় দর্শনসমৃদ্ধ সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের থেকে; পেশাজীবী, কর্মজীবী বা টেকনোক্র্যাটদের থেকে নয়। দর্শনের প্রতি অবহেলায় মানুষ নিছক নকলনবিসে পরণিত হয়। বাংলাদেশে উন্নত বিবেকবোধ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বেড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ হলো এটি। তা ছাড়া জ্ঞান শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে আছে আসমান-জমিনের ছত্রে ছত্রে। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রই শুধু নয়, গাছপালা, জীবজন্তু, নদী-নালা, অণু-পরমাণু তথা দৃশ্য-অদৃশ্য প্রতিটি সৃষ্টির মধ্যে লুকিয়ে আছে জ্ঞানের উপকরণ। কোরআনের ভাষায় এগুলো হলো আল্লাহর আয়াত, যা পড়তে হয় শুধু চোখের আলাতে নয়, মনের আলোতেও। ইসলাম তাই আলোকিত মনের মানুষ গড়তে চায়। তখন সমগ্র বিশ্বটাই পাঠশালা মনে হয়। এ পাঠশালারই শিক্ষক ছিলেন নবীপাক (সা)। জ্ঞান বিতরণে ও মানুষকে চিন্তাশীল করার কাজে আল্লাহর এ আয়াতগুলোকে তিনি কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছেন। সেখান থেকেই গড়ে উঠেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধকগণ। জীবনের মূল পরীক্ষায় তথা মহান আল্লাহকে খুশি করার কাজে তাঁরাই মানব-ইতিহাসে সর্বাধিক সফল হয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনে তাঁদের নিয়ে তিনি গর্বও করেছেন। এমনকি সক্রেটিস যে পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন সেটিও আজকের মতো কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। সেটিও ছিল এথেন্সের উন্মুক্ত অলিগলি ও মাঠঘাট। অথচ জ্ঞানচর্চায় তিনিও অবিস্মরণীয় ইতিহাস গড়েছেন। জ্ঞানবিতরণে জ্ঞানকেন্দ্রের চেয়ে শিক্ষকই যে মূল সেটি তিনিও প্রমাণ করে গেছেন। অথচ আমরা বিদ্যালয় গড়ে চলেছি যোগ্য শিক্ষক না গড়েই। যা ডাক্তার না গড়ে হাসপাতাল চালানোর মতো। সমাজের অযোগ্য মানুষগুলোর ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে এরিস্টটল বলতেন, “এটি ঐখানে তথা বিদ্যালয়ে, যেখানে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।” অথচ বাংলাদেশে সকল ব্যর্থতার কারণ খোঁজা হচ্ছে অন্যত্র। শিক্ষার বিস্তারে শিক্ষককে প্রথমে শিক্ষিত করতে হয়। শুধু জ্ঞানদাতা হলেই চলে না, প্রতিটি শিক্ষককে ছাত্রদের সামনে অনুকরণীয় মডেলও হতে হয়। এটি নিছক বাড়তি দায়িত্ব নয়, এটিই শিক্ষকের মৌলিক দায়িত্ব। ফলে যে চরিত্র নিয়ে প্রশাসনের কর্মচারী, বিচারক বা ব্যবসায়ী হওয়া যায়, শিক্ষককে তার চেয়েও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে সে কাজটি যথার্থ ভাবে হয়নি। দেশে নিদারুণ কমতি হলো উপযুক্ত শিক্ষকের। শিক্ষকের যে স্থানটিতে বসেছিলেন নবীপাক (সা) স্বয়ং নিজে, সেখানে প্রবেশ করেছে বহু নাস্তিক, পাপাচারী ও চরিত্রহীনেরা। ফলে ছাত্ররা শুধু জ্ঞানের স্বল্পতা নিয়েই বেরুচ্ছে না, বেরুচ্ছে দুর্বল চরিত্র নিয়েও।

ব্যর্থতা শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বের মডেল খাড়া করায়

ইতিহাস ঘেঁটে ছাত্রের সামনে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ তুলে ধরা শিক্ষানীতি ও শিক্ষকের অন্যতম বিশাল দায়িত্ব। মডেলকে সামনে রেখে শিল্পী যেমন ছবি আঁকে, ছাত্রও তেমনি তার শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে সচেষ্ট হয় নিজেকে গড়ার। এরূপ মডেল নির্বাচনে প্রতি দেশেই নিজ নিজ ধর্মীয় চেতনা ও জাতীয় ধ্যানধারণা গুরুত্ব পায়। গরুকে দেখে যেমন ভেড়ার ছবি আঁকা যায় না, তেমনি অমুসলিম রাজনীতি বা কবি-সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবীকে সামনে রেখে ছাত্রও নিজেকে মুসলিম রূপে গড়ে তুলতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশে এ জন্যই নিজ নিজ ইতিহাস থেকে খ্যাতিনামা বীর, ধর্মীয় নেতা, সমাজসংস্কারক, বৈজ্ঞানিক, রাজনীতিবিদ, কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের তুলে ধরে, মুসলিম ইতিহাস থেকে নয়। কিন্তু এদিক দিয়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সে সাথে অপরাধ কম না।
দেশটির ভাষাভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদের ব্যর্থতা শুধু এ নয় যে, জাতীয় জীবনে উন্নয়ন উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং জাতিকে প্রচণ্ডভাবে অহঙ্কারীও করেছে। আহত ও দুর্বল করেছে প্যান-ইসলামি চেতনাকে। ফলে জাতীয় জীবনে গুরুত্ব হারিয়েছেন ইসলামের মহান ব্যক্তি ও বীরপুরুষগণ। ফলে ছাত্ররা হারিয়েছে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বা ‘ফিগার অব হাইনেস’ এর মডেল। নিছক বাঙালি হওয়ার কারণে অতিশয় দুর্বল ও সামান্য চরিত্রগুলোকে বড় করে দেখানো হয়েছে। নিছক রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কোন কোন ব্যক্তিকে হাজার বছরের সেরা বাঙালি রূপেও চিত্রিত করা হয়েছে। অথচ তাদের অনেকে যেমন ছিলেন মিথ্যাচারী ও খুনি, তেমনি ছিলেন নিষ্ঠুর স্বৈরাচারীও। গণতন্ত্রের নামে ভোট নিয়ে তারা চরম স্বৈরাচার উপহার দিয়েছেন। ফলে চরিত্র গঠনের টার্গেট রূপে জাতি কোন উন্নত মডেলই পায়নি। ফলে ছাত্ররা কাদের অনুসরণ করবে? শূন্যস্থান কখনই শূন্য থাকে না, ফলে সে শূন্যতা পূরণ করেছে কিছু দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, সন্ত্রাসী ও ব্যভিচারী ব্যক্তি। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পরিণত হয়েছে সন্ত্রাস, ছিনতাই ও ব্যভিচারীর অভয়ারণ্যে। এ ব্যর্থতারই বড় প্রমাণ, সেখানে ধর্ষণে সেঞ্চুরি-উৎসবও হয়েছে।

ইবাদত গণ্য হয়নি শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদান

শিক্ষা-সংস্কারের লক্ষ্যে বাংলাদেশে অতীতে বহু পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। বহু শিক্ষা-কমিশন রিপোর্টও রচিত হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজে কিছুই হয়নি। ব্যর্থতার জন্য দায়ী স্রেফ সরকারি বা বেসরকারি দল নয়, সবাই। কারণ, কারো পক্ষ থেকেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালিত হয়নি। এ ব্যর্থতার কারণ, শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ও দর্শন শিখাতেই আমরা ব্যর্থ হয়েছি। মুসলমান নামধারীরাও এটিকে ইবাদত ভাবেনি। তারাও জ্ঞানার্জনকে ফরজ জ্ঞান করেনি। শিক্ষকরা এটিকে যেমন উপার্জনের মাধ্যমে ভেবেছেন, তেমনি ছাত্রদের কাছে এটি পরিণত হয়েছে কোনরূপে সার্টিফিকেট লাভের উপায় রূপে। ফলে ফাঁকিবাজি হয়েছে উভয় দিক থেকেই। চিকিৎসায় ফাঁকিবাজি হলে যেমন রোগী বাঁচে না, তেমনি শিক্ষায় ফাঁকিবাজি হলে জাতি বাঁচে না। শিক্ষাক্ষেত্রের এ ব্যর্থতা থানা-পুলিশ বা আইন-আদালত দিয়ে দূর করা যায় না। তাই বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা এখন শিক্ষা সমস্যা। ভুল চিকিৎসায় কোনো রোগী মারা গেলে তা নিয়ে আন্দোলন হয়। অথচ বিস্ময়ের বিষয়, ভুল শিক্ষায় সমগ্র জাতি যেখানে বিপদগ্রস্ত তা নিয়ে আন্দোলন দূরে থাক উচ্চবাচ্যও নেই। মুমূর্ষু ব্যক্তির যেমন সে সামর্থ্য থাকে না তেমনি অবস্থা যেন জাতিরও। আর এটি হলো নৈতিক মুমূর্ষুতা।
এরূপ নাজুক অবস্থায় শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়লে চলে না। হাত দিতে হয় আরো গভীরে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে শিক্ষালাভ ও শিক্ষাদানের বিষয়ে একটি পরিপূর্ণ আন্দোলনে রূপ দিতে হয়। শিক্ষা নিজেই কোনো উদ্দেশ্য নয়। বরং এটি হলো একটি উদ্দেশ্যকে সফল করার মাধ্যম মাত্র। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে জানমালের বিনিয়োগের এটি হলো পবিত্র অঙ্গন। তাই স্রেফ শিক্ষার খাতিরে শিক্ষা নয়, নিছক উপার্জন বাড়ানোর লক্ষ্যেও নয়। বরং এটি হলো, জীবনের মূল পরীক্ষায় পাসের মাধ্যম। তাই মুসলমানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো শিক্ষাদান ও শিক্ষালাভ। শিক্ষালাভের মাধ্যমেই মানুষ হিদায়েত পায়। তাই শিক্ষা হিদায়েত লাভের মাধ্যমও। অমুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে মুসলিমদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল পার্থক্যটি হলো বস্তুত এখানে। অথচ শিক্ষার এ মূল দর্শনটিই বাংলাদেশে আলোচিত হয়নি। গুরুত্বও পায়নি। বরং প্রভাব বিস্তার করে আছে সেক্যুলার দর্শন ও চেতনা। তাই শিক্ষা সংস্কারে কাজ শুরু করতে হবে শিক্ষার এ মূল দর্শন থেকে। কেন শিখবো, কেন শেখাবো এবং কেন এটিকে আমৃত্যু সাধনা রূপে বেছে নেবো- এসব প্রশ্নের উত্তর অতি সুস্পষ্ট ও বলিষ্ঠভাবে দিতে হবে। এটি যে পেশা নয়, নেশাও নয় বরং ফরজ ইবাদত সেটিও ছাত্র ও শিক্ষকের মনে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হতে হবে। এবং সেটি বুঝাতে হবে মানবসৃষ্টির মূল-রহস্য ও দর্শনকে বোঝানোর মধ্যে দিয়ে। আলোকিত করতে হবে ব্যক্তির বিবেককে। জ্ঞান অর্জনের এ অঙ্গনে ব্যর্থ হলে ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনের কোন অঙ্গনেই যে বিজয় সম্ভব নয়- সে ধারণাটিও স্পষ্টতর করতে হবে।

জীবনে মূল যুদ্ধ ও জয়-পরাজয়ের ভাবনা

মুমিনের জীবনে যুদ্ধ সর্বত্র। তবে দ্বীনের বিজয়ের মূল যুদ্ধটি হয় শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানেই, অন্য যুদ্ধগুলো আসে পরে। বরং সত্যতো এটাই, সে লড়াইটি বাংলাদেশে ইতোমধ্যে শুরুও হয়ে গেছে। আরো বিপদের কারণ, এ লড়াইয়ে ইসলামের পক্ষের শক্তি লাগাতর হেরেই চলেছে। আজ থেকে ৭০ বছর আগে বাঙালি মুসলিমের জীবনে যে ইসলামি চেতনা, প্যান-ইসলামিক ভ্রাতৃত্ব ও সততা ছিল, আজ সেটি নেই। ছিল না দেশের অভ্যন্তরে চিহ্নিত বিদেশী শত্রুর এত দালাল। ফলে আজ বিধ্বস্ত হতে চলেছে বাঙালি মুসলিমদের মনোবলও। দেশের সরকার সাহস হারিয়েছে এমনকি মিয়ানমারের মত দেশের বিরুদ্ধে সত্য কথার বলার। ফলে দেশের ভিতরে ও বাইরে গুঞ্জন উঠেছে স্বাধীন দেশরূপে বাংলাদেশের টিকে থাকার সামর্থ্য নিয়ে। তাই এখন চলছে নিছক টিকে থাকার লড়াই। এ লড়াইয়ে হেরে গেলে হারিয়ে যেতে হবে ইতিহাস থেকে। বাঁচতে হলে এবং এ যুদ্ধে জিতলে হলে হাত দিতে হবে শিক্ষার আশু সংস্কারে। কারণ শিক্ষাঙ্গনেই নির্মিত হয় জাতির মেরুদণ্ড ও সাহসী নেতৃত্ব। সেটি শুধু সরকারিভাবে নয়, বেসরকারি ভাবেও। শিক্ষাঙ্গনের এ যুদ্ধে সৈনিক হতে হবে প্রতিটি ঈমানদারকে।
শিক্ষার সংস্কারে প্রথমে যেটি সুস্পষ্ট করতে হবে তা হলো, আমরা কোন পরিচয়ে বেড়ে উঠতে চাই সেটি। ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি না মুসলিম রূপে। এটি আমাদের বাঙালি মুসলিমের জীবনে মূল প্রশ্ন। কারণ, শিক্ষার মূল দর্শন ও দিকনির্দেশনা আসবে সে বিবেচনা থেকেই। এ যাবৎ যে চেষ্টা হয়েছে সেটি হলো, সেক্যুলার বাঙালি রূপে বেড়ে ওঠার চেষ্টা। আমরা আজ যেখানে পৌঁছেছি সেটি সেই সেক্যুলার বাঙালি হওয়ার নিরলস চেষ্টাতেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বাঙালির সাহিত্য-সংস্কৃতি, পত্রপত্রিকা, রেডিও- টেলিভিশন বস্তুত এ যাবৎ সে লক্ষ্যেই কাজ করেছে। কিন্তু সেটি কোন মহৎ লক্ষ্যে আমাদের পৌঁছায়নি। তা ছাড়া বাঙালি রূপে বিরাট কিছু হতে পারলেও আমাদের জীবনের মূল পরীক্ষায় তাতে পাস জুটতো না। এভাবে অর্জিত হতো না, মহান আল্লাহ পাক আমাদের যে জন্য সৃষ্টি করেছেন সেটিও। বিচার দিনে যে হিসাব আমাদের দিতে হবে সেটি হলো মুসলিম রূপে আমাদের সফলতা কতটুকু সেটি। বাঙালি-অবাঙালির পরিচয় সেখানে অর্থহীন। মুসলমানের শিক্ষার মূল লক্ষ্য, পরকালের সে সফলতাকে নিশ্চিত করা। এটুকু নিশ্চিত না হলে নিছক ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানী, শিক্ষক বা অন্য কোন পেশায় সফলভাবে বেড়ে ওঠায় কল্যাণ নেই। নিছক পেশাদারি সাফল্যে হয়তো সচ্ছলভাবে বাঁচা যায়, কিন্তু তাতে মূল পরীক্ষায় সফলতা জুটে না। আমাদের হারাম-হালাল ও আচার-আচরণ যে অন্যদের থেকে ভিন্ন সেটি তো এই ইসলামি চেতনার কারণেই। সেক্যুলার বাঙালি রূপে বেড়ে ওঠার মধ্যে যে কোন কল্যাণ নেই সেটি বলিষ্ঠ প্রত্যয়ে পরিণত করতে হবে। এ লক্ষ্যে অর্থব্যয় যে হারাম ও অতি বিপজ্জনক- সেটি জনমনে বদ্ধমূল করতে হবে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে আমাদের জন্য কল্যাণকর করতে হলে সেটি হতে হবে পরিপূর্ণ ইসলামের আলোকে। হালাল-হারামের ক্ষেত্রে যেমন আপস চলে না তেমনি আপস চলে না ইসলামি শিক্ষা লাভের ফরজ আদায়ে। নইলে অনর্থক হবে শিক্ষার নামে হাজার হাজার কোটি টাকার সমুদয় অর্থব্যয় ও শ্রমব্যয়। এর সাথে সংশ্লিষ্টতা শুধু দুনিয়াবি অকল্যাণই বাড়াবে না, বরং পরকালে জাহান্নামের অনন্ত আজাবে নিয়েও হাজির করবে।

SHARE

Leave a Reply