যে স্মৃতি আজো কাঁদায় -মোঃ হাবিবুর রহমান

বাংলাদেশের দক্ষিণের জনপদ সাতক্ষীরা। তৌহিদী জনতার আবেগ-অনুভূতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে এ জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামকে ভালোবাসে বলেই আশা-আকাক্সক্ষা আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই। তার প্রমাণ মেলে ২০১৪ সালে দায়িত্বশীল সমাবেশে  সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল জব্বার ভাই তার বক্তব্যে বলেছিলেন, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আর ইসলামী আন্দোলনের রাজধানী সাতক্ষীরা। আরো শুনেছি, সাতক্ষীরা হলো শহীদের জনপদ। সুন্দরবনের পাশ ঘেঁঁষে বয়ে চলা এ জনপদকে নিয়ে বাতিলের ষড়যন্ত্রও যেন নির্ভেদ্য। তথাকথিত প্রগতিশীল ও আওয়ামী হায়েনাদের নখরাঘাতে রক্তাক্ত হয়েছে বারবার। কালিগঞ্জে শহীদ আলী মোস্তফা ভাইয়ের শাহাদাতের মধ্য দিয়ে ১৯৯৯ সালের ২৫ নভেম্বর এ জনপদের শহীদি মিছিলের যাত্রা শুরু হয়। একে একে এ মিছিলে নাম লিখিয়েছেন শহীদ শেখ রহমত আলী, রফিকুল ইসলাম, আমানউল্লাহ আমান, শামসুজ্জামান খান রেজা, শেখ মোস্তফা আরিফুজ্জামান, হোসেন আলী, আরিজুল ইসলাম, আবুল কালাম, আলী মোস্তফা, ইকবাল হাসান তুহিন, আবু হানিফ ছোটন। বারো শহীদের মজবুত পিলারের ওপর ভর করে থাকা এই আন্দোলন বাতিলের সকল ষড়যন্ত্র ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে স্বপ্নপূরণের জন্য এগিয়ে যাচ্ছিল; ঠিক তখনই ঘটে গেল সাতক্ষীরার ইতিহাসে আরেকটি নির্মম ট্র্যাজেডি। ২৭ এপ্রিল ’১৪ আনুমানিক ৪টা ১০ মিনিটের সময় একটি ফোন পেলাম, কামালনগরে মুহুর্মুহু গুলি চলছে। পুরো এলাকা নাকি রণক্ষেত্রে রূপ নিয়েছে। তখন ভাবলাম আমাদের মেসে কিছু হলো নাতো! প্রথমে আমিনুর ভাইয়ের মোবাইলে কল দিলাম, এরপর আবু তালেব ভাই, পরে ফারাজি ভাইকেও কল দিলাম কিন্তু কেউই রিসিভ করলেন না। তখন সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। পরে স্থানীয়দের কাছে ফোনে জানতে পারলাম খুলনা মহানগর সভাপতি আজিজুল ইসলাম ফারাজি ও শহর সভাপতি আবু তালেব ভাইসহ সাতজন গুলিবিদ্ধ এবং শহীদের মিছিলে যোগ দিলেন প্রিয় আমিনুর রহমান। সংগঠনের প্রতিটি কর্মসূচি আন্তরিকতা, সাহসিকতা ও নিষ্ঠার সাথেই পালন করেছেন। ইসলামী আন্দোলনে এই সক্রিয় ভূমিকা পালনই কাল হয়ে দাঁড়ালো। হায়েনাদের নজরে পড়ে যান তিনি। তাকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকে তারা। অবশেষে তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে যায়।
শহীদ আমিনুর ভাই আমাদের মাঝে নেই ভাবতেই পারি না। চোখের সামনে যেন সব সময় তাকে দেখছি। সেই সুন্দর হাসি, সেই নিষ্পাপ চাহনি, সেই পবিত্র মুখাবয়বÑ কী প্রাণবন্ত, কী মায়াবী। সব সময় যেন বুকের ভেতর যন্ত্রণায় হাহাকার আর নেই, নেই শব্দের মিছিল। আমার হৃদয়পটে যে ক্ষত রেখে গেছে তা আমৃত্যু আমাকে তাড়া করে বেড়াবে। একজন চৌকস, দূরদর্শী, বুদ্ধিমান, অসাধারণ মেধাবী সেনাপতির নাম শহীদ আমিনুর রহমান। তিনি ছিলেন আমার দীর্ঘ সাংগঠনিক জীবনের সহপাঠী। আমিনুর ভাই শহর শাখার সেক্রেটারি তখন আমি জেলা শাখার সেক্রেটারি। কত পরিকল্পনা, কত স্বপ্নের কথা শুনেছিলাম তাঁর কাছ থেকে। সেই স্বপ্নের কথাগুলো আজও আমার কানে ধ্বনিত হয়। অপার সম্ভাবনাময় এই মেধাবী ছাত্রনেতা ছিলেন দেশ ও জাতির সম্পদ। ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের একজন দক্ষ কারিগর। অনেক বার আমি শহীদ আমিনুর ভাইকে নিয়ে লেখার চেষ্টা করেছি কিন্তু স্বাভাবিক থাকতে পারিনি। চোখের পানিতে বুক ভেসে  গেছে। অবশেষে বিবেকের তাড়নায় আজ লিখতে বসলাম। একজন ক্ষণজন্মা প্রবাদপুরুষ, স্মৃতির আকাশে সদা বিরাজমান ফুটন্ত গোলাপ শহীদ আমিনুর রহমান। একজন মানুষ একই সাথে এতগুলো গুণের অধিকারী হতে পারে এখনও আমার কাছে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়। আজ খুব বেশি মনে পড়ছে, সুন্দরবন বেড়াতে যাওয়ার সেই হিরণয় সব স্মৃতিগুলো। এক সাথে নৌকায় বৈঠা বেয়েছি, হেঁটেছি, গাছে উঠেছি। দুপুরবেলা সবাই মিলে সাঁতার কেটেছি সেই মধুময় ক্ষণ সত্যিই ভুলবার নয়। আমার জীবনের ভালো লাগা ভ্রমণগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি স্মৃতিময় হয়ে আছে। তার সাথে প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে সাথী শিক্ষা শিবিরে। এরপর এক সাথে থানা সেক্রেটারি, থানা সভাপতি থেকে শুরু করে শাখা সেক্রেটারি পর্যন্ত তাকে নিয়ে এত বেশি উল্লেখ করার মতো ঘটনা রয়েছে, যা ক্ষুদ্র পরিসরে লিখে শেষ করা যাবে না।
নেতৃবৃন্দের মুক্তি, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ইসলাম রক্ষার আন্দোলনে যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন তা পরবর্তী দায়িত্বশীলদের জন্য প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। ২৮ ফেব্র“য়ারি ’১৩ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী হুজুরকে ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির রায়ের পর সারা দেশের মতো সাতক্ষীরাতেও ইসলামপ্রিয় জনগণ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। আনুমানিক বেলা আড়াইটায় কদমতলা বাজারে হাজার হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। সেখানে কেন্দ্রীয় ক্রীড়া সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহেল ভাই উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমিনুর ভাই ও আমাকে বললেন, আপনারা দুই সেক্রেটারি পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেন। জনতার মাঝে গিয়েও তাদের স্বাভাবিক করতে পারলাম না। তারা যেন বিক্ষোভে পাগলপারা। এক পর্যায়ে আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই একের পর এক গুলিবিদ্ধ ভাইদের মিছিল। পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মুহুর্মুহু গুলির শব্দে পরস্পরের কথা শোনা যাচ্ছিল না। তখন আমরা দু’জন একটি উঁচু স্থানে উঠে সবাইকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলাম। সেই রণক্ষেত্রে তার সাহসী ভূমিকায় আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। আমার বলতে দ্বিধা নেই, সে সময় অনেকেই যখন কিছুটা হতবিহ্বল, বিমর্ষ তখন তার মনোবল, কর্মদীপ্ততা এবং ধৈর্যশীলতা আজো আমাদের অনুপ্রেরণা। আন্দোলন সংগ্রামে মিছিল-পরবর্তী পথসভায় বক্তব্য দেয়ার কারণে রক্তপিপাসুদের চোখের কাঁটা হয়ে দাঁড়ান। একদিন তথ্য পেলাম পুলিশ তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পরদিন তাকে সাবধান করার জন্য বললাম, ভাই পুলিশ আপনাকে খুঁজছে, আপনি একটু সাবধানে থাকবেন। আমাকে বললেন, হাবিবুর ভাই, জীবন- মৃত্যুর ফায়সালা আল্লাহর হাতে, তাছাড়া আমার সারা জীবনের কামনা-বাসনাই তো শহীদি মৃত্যু। অবশেষে মহান রাব্বুল আলামিন তার সে স্বপ্ন পূরণ করে প্রিয় বান্দাদের কাতারে তাকে শামিল করলেন। আমিনুর ভাইকে হত্যার মাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষীরা সাতক্ষীরার ইসলামী আন্দোলনকে স্তব্ধ করার যে ষড়যন্ত্র করেছিল তা কোনো দিন বাস্তবায়ন হবে না। বরং শহীদের সাথীরা বারবার উচ্চারণ করে “সেই সংগ্রামী মানুষের সারিতে আমাকেও রাখিও রহমান, যারা কুরআনের আহবানে নির্ভীক নির্ভয়ে সব করে দান।” আল্লামা আবুল আ’লা মওদূদী (রহ) বলেছেন- এ কাজের জন্য এমন একদল দুঃসাহসী যুবকের প্রয়োজন, যারা সত্যের প্রতি ঈমান এনে তার উপর পাহাড়ের মতো অটল হয়ে থাকবে। অন্য কোন দিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ হবে না। পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক না কেন তারা নিজেদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পথ থেকে এক ইঞ্চিও বিচ্যুত হবে না। সত্যিই আমিনুর রহমান ভাই তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সে ব্রত পালন করতে সক্ষম হয়েছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাকে যেন জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।

SHARE