যৌবন ও ধর্ম -আবুল খায়ের নাঈমুদ্দীন

যৌবন মানে শক্তি, যৌবন মানে মেধা। প্রাণের চাঞ্চল্যই প্রকৃত যৌবন। মানব জীবনের পূর্ণ অভিব্যক্তি দুর্দান্ত যৌবন, যৌবনই হচ্ছে অনন্ত অফুরন্ত প্রাণশক্তির উৎস। আরো বলতে গেলে জীবনের একটা সময়ই যৌবন, যা সকল প্রাণীর জীবনের মধ্যম সময়ের নাম। যৌবন যার জীবন তার। জীবনের সফলতা ব্যর্থতা নিহিত এই যৌবনের মধ্যেই। যৌবনের ধর্মই আবিষ্কার, সংস্কার বা ধ্বংস। মানুষের মধ্যম সময় যৌবন শুধু ভোগ বিলাসের জন্য নয় ত্যাগেরও। যৌবন একক ধর্ম বা আদর্শ, মানব জীবনে যৌবনের আদর্শ অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও আবশ্যকীয়।
মানুষের যৌবনে ইন্দ্রিয় সতেজ সজাগ ও সবল থাকে। মানুষ এ সময় সৃষ্টির মূল প্রেরণা অনুভব করে। সৃষ্টির সকল ক্ষেত্রে নতুন নতুন সৃষ্টির ভেতর দিয়ে জীবনকে সজীব, সচল ও সজাগ করে তোলাই যৌবনের ধর্ম। মানুষের বয়সের সাথে সাথে যৌবন ওঠানামা করে, সেই যৌবন দৈহিক। মনের শক্তিও এক ধরনের যৌবন, তা মানসিক যৌবন। মনে রাখতে হবে পৃথিবীতে মানবজাতি মানসিক যৌবনের পূজারি। তাতে স্যালুট পাওয়ার উপযুক্ত যোগ্যতার প্রকাশ ঘটে। এ ক্ষেত্রে শারীরিক যোগ্যতা গুরুত্বহীন। পৃথিবীতে যত যুবক আসবে তত বসন্তও আসবে। প্রেম রসে টইটম্বুর হবে জীবন। কিন্তু যিনি যেই বয়সেরই হোন না কেন সবাই পৃথিবীর রূপকে যৌবনের রূপ হিসেবে পাবেন। পৃথিবীর রূপ যৌবন স্থায়ী। পাতা পল্লব ছড়িয়ে বৃক্ষ লতা তার যৌবন প্রকাশ করবেই। পৃথিবীর মতো ধর্মকেও নতুনত্বেই পাবেন। যতই জানবেন ততই নতুন মনে হবে। সবার কাছেই পৃথিবী ও ধর্ম দুটোই থাকবে চির যৌবনের চির রহস্যময়।
যেকোনো প্রাণীর দৈহিক যৌবন আসে আর যায় তা স্বাভাবিক এবং ক্ষণস্থায়ী। সব যৌবন যুবসমাজে অবদান রাখে না। মানসিক যৌবন স্থির ও স্থায়ী এবং আদর্শের অনুসারী না হলে দৈহিক যৌবন গুরুত্বহীন। দৈহিক যৌবন একটি নির্দিষ্ট বয়স সীমার মধ্যে আবদ্ধ এবং অস্থায়ী কিন্তু মানসিক যৌবন অনন্ত ও অফুরন্ত, চির অম্লান ও স্থায়ী। মানসিক যৌবনকে প্রদীপের আলোর মতো এক প্রাণ থেকে লক্ষ প্রাণে কোটি প্রাণে সঞ্চারিত করা যায়। এ জন্যই বলা হয়েছে, যৌবনকে সব সময় বয়সের ফ্রেমে বেঁধে রাখা যায় না। সেই যৌবন বয়সের নয়, সেই যৌবন মানসিকতার চিন্তার ও বুদ্ধির।
মানসিক যৌবনের উপযুক্ত ব্যবহারে এর গতি প্রকৃতি নির্ভর করে। কোন সমাজের একাধিক ব্যক্তির মানসিক যৌবন যদি এক হয় এবং অটুট থাকে তাহলে সে সমাজ যৌবনপ্রাপ্ত সমাজ। আমাদের সমাজকে যৌবনপ্রাপ্ত সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে হলে সে সমাজের মানুষের মনকে যৌবনের মন হিসেবে বিনির্মাণ করতে হবে। মানসিক যৌবনের সমাজে চির বসন্ত বিরাজ করে। এমন যৌবনের কপালেই পড়ে রাজটিকা, প্রতিষ্ঠিত হয় সুখ সমৃদ্ধি ও শান্তি। পৃথিবীতে সকল মনীষী যিনি যত কিছু করেছেন তাঁরা যুবকদের নিয়েই করেছেন। তাদের মিশন ছিলো সমাজকে যৌবনপ্রাপ্ত সমাজে বিনির্মাণ করা।
আমাদের যুবসমাজ দৈহিক যৌবনকে প্রকৃত যৌবন মনে করে, প্রকৃত অর্থে তা কখনো প্রকৃত যৌবন নয়। দৈহিক যৌবন সব সময় ভোগ বিলাস নিয়ে ব্যস্ত থাকে আর তাই সেই সমাজব্যবস্থা হয় জরাজীর্ণ ও ঘুণেধরা সমাজ। দেহের যৌবন শেষের সাথে সাথে মৌলিক মানসিক যৌবনও শেষ হয়ে পড়ে। না নিজেকে যৌবনের কর্মী বানাতে পারে, না নিজে স্বাদ নিতে পারে, না সমাজকে কিছু দিতে পারে। এমন যৌবনে ভূমিকা আর উপসংহার ছাড়া কিছুই পাওয়া যায় না। কিন্তু মানসিক যৌবনপ্রাপ্ত যুবক তার মন মনন দিয়ে নিজেকে ও সমাজকে সাজিয়ে তোলে, ফলে সেই সমাজ সকলের কাছে সমাদৃত হয়, তা হয় স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য।
মনের যৌবনই প্রকৃত যৌবন। যৌবন শুধু ভোগের নয় ত্যাগেরও। ত্যাগই জীবন ভোগে নয়। ত্যাগ করতে পারা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়। যিনি ত্যাগ করেন তিনি মহৎ আর মহান আদর্শের হতে হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশের কিছু শিক্ষাবিদ আছেন যাঁরা আমাদের যুবকদেরকে আহবান করেন ভোগ বিলাসে মত্ত থাকার দিকে, যৌবনের অনৈতিক স্বাদ আস্বাদনে উন্মুখ থাকার জন্য। তাঁদের ভাষায় যৌবন মানে শুধু উপভোগের সময়, হাসি আনন্দ উল্লাসের মধ্যে দিয়ে জীবন উপভোগ করার মোক্ষম সময়। অথচ ইতিহাস বলে তার উল্টো কথা। মানুষ নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে শ্রম দেয়ার সময় যৌবন। এ জগতে যারাই স্মরণীয় বরণীয় তারা যৌবনেই নিজেদেরকে স্থায়ী করে নিয়েছেন, তারা ছিলেন ধ্যানী ও চিন্তাশীল আর আবিষ্কারক এবং সংস্কারক। ফলে পৃথিবীর রহস্যের মতো তাদের জীবনের রহস্য খোঁজার জন্য আজীবন মানুষ অনুসন্ধান করে যাবে। এখন তেমন মানুষ হওয়ার জন্য কেউ উৎসাহ দেয় না।
আমার মতে ধর্ম মানে যৌবন। কারণ ধর্ম চির যৌবনের। পৃথিবী যত কাল থাকবে ধর্মও তত কাল থাকবে বরং পৃথিবীর পরে পরকালেও ধর্মানুসারেই বিচার হবে। মানুষ ও মানুষের যৌবন আসবে যাবে কিন্তু ধর্মের আদর্শ নিয়মনীতি থেকেই যাবে। তাই ধর্ম যেখানে যৌবনও সেখানে। ধর্ম যখন কারো যৌবনকে পরিচালিত করে, তা হয় স্থায়ী ও সমাদৃত। আবার কারো যৌবনে ধর্মের লেশমাত্রও থাকে না, যৌবনই যুবককে পরিচালিত করে যা অপমানিতও করে, তা কাম্য নয়।
ধর্ম হচ্ছে বীজ বা বৃক্ষের মতো, আর যৌবন তার ডালপালা। এই বীজ কোন যুবকের যৌবনে একবার প্রবেশ করানো গেলে সেখান থেকে বৃক্ষ পাতা পল্লব বের হবেই, তারপর ফলও ধরবে। তাই আমি যৌবনের সময়কে কিশোর থেকে মনে করি। কেননা কোনো কিশোর বা যুবকের হৃদয়ে একবার যদি ইসলাম ধর্মের বীজ বপন করা যায় তাহলে আর চিন্তার কারণ নেই। তা বৃক্ষের মতো পাতা গজাবেই। পৃথিবীর সব ধর্মের চেয়ে ইসলামই শ্রেষ্ঠ ধর্ম এটা প্রমাণিত। এর পরশই আলাদা, এ পরশ শান্তির মহাপরশ। এটা কুরআনে হাফেজদের দিকে তাকালে স্পষ্ট বুঝা যায়। তাদেরকে কিশোর কালে না বুঝেই মুখস্থ করতে দেয়া হয় আর তা সারা জীবন হৃদয় গেঁথে থাকে। এটা অনেকটা মানুষের পারিবারিক শিক্ষার মতো। জন্মের পর তাকে যে ধর্মশিক্ষা দেয়া হয় সে সেই ধর্মের অনুসারী হয়। অথচ তার জন্ম ফিতরাত নিয়ে যাতে কোনো ধর্ম বর্ণ বা আদর্শ ছিলো না। মানুষ এমন এক জীব, প্রথম জীবনে যা কিছু মেধায় প্রবেশ করায় তা স্থির চিত্রে থেকে যায়। বুঝে হোক অবুঝে হোক, জীবনের প্রথম সব কিছু মনের স্পটে ভেসে থাকে। কিন্তু যৌবনে এসে তার অর্থ ও মর্ম উদঘাটনের পর একটা ব্যাকুলতা লক্ষ্য করা যায়। তাই যৌবনের প্রথম সময়টি হোক ইসলাম ধর্মে নিবেদিত।

বর্তমানে বহু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মানুষের অনুভূতিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিও বিনষ্ট করে এমন বহু জাহেল ও জালিম তৈরি হয়েছে। অথচ মহানবীর আনীত ধর্মে রয়েছে স্বাধীনতা, রয়েছে নিরাপত্তা ও জীবনের স্বাদ। ভ্রাতৃত্ববোধ, আমানতদারিতা, নারীর অধিকার, উদারনীতি, কৃত কর্মের জবাবদিহিতা ও ক্ষমার মহোত্তম দৃষ্টান্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমাজব্যবস্থা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি তিনি রচনা করে গেছেন।
এটি যৌবনের ধর্ম, এটি মানবতার ধর্ম। মানবতার ধর্মের কোনো উৎকৃষ্ট উদাহরণ যদি কেউ দেখতে চায় সে যেন ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে।
কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, “বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধক্যের কঙ্কাল মূর্তি। আবার বহু বৃদ্ধকে দেখিয়াছি- যাঁহাদের বার্ধক্যের জীর্ণাবরণের তলে মেঘলুপ্ত সূর্যের মতো প্রদীপ্ত যৌবন। যাহা পুরাতনকে, মিথ্যাকে, মৃত্যুকে আঁকড়াইয়া পড়িয়া থাকে তাহাই বার্ধক্য।”
দেহ ও মনের সম্বন্ধ ঘনিষ্ঠ ও অবিচ্ছেদ্য। মনের শক্তি যখন সুপ্রতিষ্ঠিত থাকে তখন দেহের শক্তি তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আর মনের শক্তির মধ্যে যদি ধর্ম ও আদর্শ স্থান করে নেয় তখন মনের যৌবনের ইচ্ছা তাকে টেনে নিয়ে যায় হেরা গুহায়। তৈরি করে ইসলামী সাম্রাজ্য, সুপ্রতিষ্ঠিত হয় সীসা ঢালা প্রাচীর। মনের ইচ্ছা ও যৌবনের শক্তি দিয়েই তৈরি হয়েছিলো পিরামিড, গ্রেটওয়াল, তাজমহলসহ বহু শিল্পকর্ম। যদিও ধর্মের বিষয়বস্তু মানুষ, চাহিদা কিন্তু দেহ ও মন। কারো যৌবন যখন শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসে নির্মিত হয় তখন তার মনের যৌবনে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়নীতি, সত্যবাদিতা ও সেবামূলক জীবন। সমাজে এই যৌবনের চাহিদা হয় স্থায়ী। তাই মহানবী (সা.) এর যৌবনকালের আল আমিন উপাধিই তাকে বিশ্বের সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ মহামানবে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর জীবন গঠিত হয়েছে তাৎপর্যমণ্ডিত ও চির যৌবনের।

মহানবী (সা.) যে ধর্ম নিয়ে এলেন তা পুরাতন অপরিপক্ব ঘুণেধরা সমাজকে ভেঙে নতুন আঙ্গিকে নতুন করে সুন্দর ও স্থায়ী যুবসমাজের রূপরেখা দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই ধর্মের যিনি সেবক তিনি আজীবন যুবক, তাতে কোনো বৃদ্ধতা নেই। এই ধর্মের অধীনে যিনি যতদিন সেবক থাকবেন তিনি ততদিন যৌবনের অধীনে থাকবেন। সামাজিক যৌবন হলো ইচ্ছা, সাহস আর শক্তি, যা ধর্মের আনুগত্যে ধর্মের সেবকদের হয়ে যায়। বিভিন্ন জন বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদর্শকে ধর্ম বলে আখ্যা দিয়েছেন, তাই বিভিন্ন গ্রন্থের অনুসারী হিসেবে ধর্মেরও বহু নাম রয়েছে। মহান ধর্ম আল কুরআনের ধর্ম, যার নাম ইসলাম। নতুন কিছু করা যুবকের ধর্ম যা যুবকরা করে থাকে। দেহ ও মনের যৌবন একত্র হয়ে গড়ে ওঠে তারুণ্য। তারুণ্যের জয়গান গাইতে গিয়ে কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন- আজ আমরা মুসলিম তরুণেরা যেন অকুণ্ঠিত চিত্তে মুক্ত কণ্ঠে বলিতে পারি ধর্ম আমাদের ইসলাম কিন্তু প্রাণের ধর্ম আমাদের তারুণ্য, আর আমরা যুবকেরাই হচ্ছি সকল ধর্মের, সকল দেশের, সকল জাতির সকল কালের।
ধর্মই ধৈর্য, ধৈর্যই ধর্ম। এই কথা সকল ধর্মীয় গ্রন্থের মূল কথা। ইসলামই একমাত্র সর্বোত্তম সংযম শিক্ষার পাঠশালা। ধৈর্যের মধ্য দিয়ে যৌবনকে পবিত্র রাখা সম্ভব, ধর্ম যখন যৌবনে এসে ধরা দেয় তখন সেই যৌবন হয় সৌন্দর্যময় ও শোভামণ্ডিত। ধর্মের মধ্যে রয়েছে সংযমের বীজ। তাই সংযমের ধর্মের সাথে যৌবনের সংযোগ করে যৌবন হয়ে ওঠে আরো গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসনীয়। তাই সভ্যতার যুগে সভ্য মানুষগুলো ধর্মকে আঁকড়িয়ে ধরে ধর্মের সীমারেখায় বিবাহের ভেতর দিয়ে যৌবনকে যেমনি ইন্দ্রিয় কাজে ব্যবহার করেছেন তেমনি সমাজ বিনির্মাণেও শ্রেষ্ঠ অবদান রেখেছেন। যারা বিবাহ করতে অক্ষম ধর্ম তাদেরকে রোযা পালনের মধ্য দিয়েও সংযম রক্ষা করা শিক্ষা দিয়েছে। শক্তির পূর্ণতা ধরে রাখার জন্য বছরের বারো ভাগে একাংশের বেশি রোযার মাধ্যমে সংযম শিক্ষা দেওয়া হয়েছে।
ধর্ম হলো কতগুলো বিধি নিষেধের সমষ্টি। ধর্মের একমাত্র লক্ষ্য হলো পাপ ও পতন থেকে ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করা। এখানে বড় সমস্যা হচ্ছে যারা ধর্মের ভিতর দিয়ে নিজেদের মতকে সমাজের জনগণের মাঝে চালানোর চিন্তা করেন তাদের জন্য, তারা ‘আমিই সব কিছু মর্মে দীক্ষিত।’ কারণ এখানে এই আমিত্বের স্থান নেই। এখানে কেউ রাজা নেই, সবাই প্রজা, সবাই ভিখারি। প্রথম মানব আদম থেকে সবাই মাটিতে মাথা নোয়াতে হয়। এখানে ধোঁকা, প্রতারণা, ফাঁদ, বা গোপন কিছু নেই। সব প্রকাশ্যে, সবাই সব দেখতে পায়। এখানে তাহজিব তমদ্দুন হলো রুকু আর সিজদা। এখানে কাঁধে কাঁধ রেখে, বৈষম্য ভুলে গিয়ে ধনী-গরিব একই কাতারে মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে সিজদা করা আর পরস্পরের সহযোগিতাই মূল ভিত্তি। এখানে ধর্মকে মানুষ বা যৌবন নিয়ন্ত্রণ করে না বরং ধর্ম মানুষকে এবং তার যৌবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। কারণ এখানে পরকালের প্রাধান্য রয়েছে।
যৌবন ও সময় বলতে গেলে একই। সময়ের ক্ষয় হয় আর যৌবনের পরিবর্তন ঘটে। এক মানুষের যৌবন বিগত হলে হাজার যৌবনের আগমন ঘটে, ফলে যৌবন স্থায়ী। প্রত্যেক মানুষের জন্য যৌবন ও সময় একেবারে মাপা মাপা। সময়ের ক্ষয় হয়েই চলেছে। যিনি যৌবনে সময়কে কাজে লাগাতে পারেন না তিনি ব্যর্থ। যৌবনের সদ্ব্যবহার করে সম্পদ অর্জন করা সম্ভব কিন্তু সম্পদ দিয়ে কখনো যৌবন অর্জন করা যায় না। পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান বস্তু সময়। তাই যৌবনই সময় সময়ই যৌবন। সময়ের অর্জন সময়ে কর অর্পণ।
প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, “জীবনকে তুমি যদি ভালোবাসো তবে সময়ের অপচয় করো না। কারণ জীবন হচ্ছে সময়ের সমষ্টি মাত্র।” ইংরেজিতে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে ঃরসব ধহফ ঃরফব ধিরঃ ভড়ৎ হড়হব. সময় এবং নদীর স্রােত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সময়ের সুন্দর ও সার্থক প্রচেষ্টায় জীবন ও যৌবনকে সফল করে তোলাই সময়ের দাবি।
যৌবনের ধর্ম হলো- যুগোপযোগী পদক্ষেপ নেয়া, যখন যিনি প্রভাব খাটাতে পারেন তখন তার যৌবন। এর সাথে যোগ হয় ক্ষমতার। ক্ষমতা থাকলে অবয়সেও যৌবন এসে ধরা দেয়। রাজনৈতিক কর্তাদের কথাই বলি, যাঁর হাতে ক্ষমতা ও প্রশাসন থাকে তখন তাঁর বয়স যতই হোক না কেন তার সময় কিন্তু যৌবনের। তিনি ইচ্ছা করলে অনেক ভালো দায়িত্ব পালন করতে পারেন। মানুষকে সৎ পথে পরিচালিতও করতে পারেন। আবার ইচ্ছা করলে সরকারি জায়গা দখল করে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ, সম্পদের পাহাড় গড়ে নিজেও উঁচু স্থান অর্জন করতে পারেন। যাকে ইচ্ছা তাকে শাসানো, মামলা মোকদ্দমা দিয়ে বছরের পর বছর আটকে রাখতে পারেন। এমনকি নিজের কাজের সামনে কাউকে বাধা মনে করলে তখন সময়ের কাজ সময়ে করে নেন, সেটাই হয়ে ওঠে সময়ের যৌবন। যৌবনটা নগর জীবনের মতো, নগর জীবনে মানুষ যখন কোলাহলে প্রবেশ করে তখন সেই শহরকে পরমাত্মীয় মনে হয়, যখন কোলাহল ভেঙে মার্কেটগুলো বন্ধ হয় তখন স্তব্ধ হয়ে পড়ে মানুষগুলোও। যৌবনের বিকেল বেলায়ও মানুষ স্তব্ধ নীরব হয়ে পড়ে। পাখির নীড়ের মতো কোলাহলমুক্ত আপন নিবাসে পৌঁছে। সত্যি অবাক; সময়ের যৌবন আর যৌবনের সময়। সময়ে কারো মনে যৌবনের জোয়ার বয়ে চলে, কারো মনে ভীতি আর কষ্টের পাহাড় জমে। কারো মনে ফুল ফল প্রস্ফুটিত হয়, কারো জীবন দুঃখে দুঃখে নিয়তির ক্ষয়।
মানুষের বয়সের যৌবনটাই শিক্ষা ক্ষেত্র। যৌবনে জ্ঞানার্জনের পিপাসা থাকে, কঠোর পরিশ্রমও করা যায়। যৌবনের সঠিক শিক্ষা মানুষকে কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে বের করে আনে। যৌবনের শিক্ষায় নীতিবান উদ্যোগী তৈরি করে। সে শিক্ষায় যুবসমাজের কাক্সিক্ষত অগ্রগতি ও সুসম উন্নয়ন সাধিত হয়। পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রে ব্যক্তির সম্পর্ক যেমন ঘনিষ্ঠ আজকের দিনে এক রাষ্ট্রের সাথে আরেক রাষ্ট্রের তেমনি যোগাযোগ, আত্মীয়তা ও সম্পর্ক রয়েছে। এখন যুবকরা শুধু ঘরের খবর রাখলেই চলবে না, নিখিল বিশ্বের প্রতিটি মানবের প্রত্যেকটি পদক্ষেপের সাথেই নিজের পরিচয় রাখতে হবে। নিজের স্বার্থে সকলের স্বার্থে থাকতে হবে সদা জাগ্রত ও সতর্ক। যুবকদের টার্গেট এখন কাগজের সনদ আর পুরস্কারের দিকে থাকলে হবে না, এখন আধুনিক মন-মানসিকতায় ধর্মীয় চেতনায় বিশ্ববিজয়ী হতে হবে। আমাদের অনেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে করতে জীবন শেষ করে দেন কিন্তু তারা ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও হন না, ডক্টর মুহম্মদ ইউনূসও হতে পারেন না। অথচ যুকার বার্ক আর বিলগেটসদের কোনো ডক্টরেট ডিগ্রি নেই। তাদের আছে উদ্ভাবনী ও বিশ্লেষণী শক্তি, কর্মের দৃঢ়তা, অনড় মনোবল, কর্মী চালানোর দক্ষতা, সদাচরণ ও চিন্তাশক্তি।
তাই ভালোভাবে যদি শুধু ধর্মীয় শিক্ষায় মনোনিবেশ করা যায় তাহলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহম্মদ (সা.)-এর সকল ক্ষেত্রে পরিচালিত রাষ্ট্রনীতিও শিখতে পারে। তাঁর অনুসারী হয়ে যুবসমাজের পথপ্রদর্শক হওয়াও সম্ভব। এই শিক্ষাটি সকল যুবকের থাকা উচিত। তাহলে মসজিদের মিম্বার থেকে সংসদের চেয়ারও তারা চালাতে পারে। তাদের বক্তব্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতো খৈ ফোটানো সম্ভব। এটাই হচ্ছে ইলম বা শিক্ষা। রাসূল (সা.) বলেছেন, জ্ঞানার্জনের জন্য সুদূর চীন দেশেও যাও। কী আশ্চর্যের বিষয় দেড় হাজার বছর আগে বলা কথাগুলো এখনো গবেষণার মতো। বর্তমানে চীন কিভাবে সারা পৃথিবীর কর্তৃত্ব নেতৃত্ব নিয়ে চিন্তা করে। কিভাবে সুকৌশলে সামান্য কর্মের মধ্য দিয়ে কোনো দেশে ঢুকে তারপর সেই দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখে, সম্প্রতি তাদের ব্যবসা বাণিজ্য বিভিন্ন দেশে মূলচালিকা শক্তি হিসেবে চালিয়ে যাচ্ছে। হাজার হাজার বছর আগে রাসূল (সা.) তাদের কর্মের গুরুত্ব দিয়ে গেলেন। যৌবনের শিক্ষা হলো গবেষণা করে তাৎপর্য উদঘাটন করা। যুবকদের কেমন শিক্ষা অর্জন করা উচিত।
যৌবনের কোরবানি আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কবুল করেন। দুনিয়ায় যতজন নবী রাসূল দায়িত্ব পেয়েছেন তারা সকলেই যৌবনের সময়েই পেয়েছেন। প্রত্যেক নবী-রাসূলকে আল্লাহ পরীক্ষা করেছেন তাও যৌবনেই। যুবকদের কোরবানি বা ত্যাগ আল্লাহ কবুল করেন। যুবক যখন সিজদায় যায় তখন আল্লাহ ফেরেস্তাদের বলেন, দেখেতো আমার এ বান্দা কী করে? তারা বলে- আপনার সিজদায় পড়েছে। আল্লাহ বলেন- পর্দা সরিয়ে দাও, সাক্ষী থেকো এরা আমার সঠিক বান্দা। কারণ বান্দা যখন সিজদা করে তখন রহমানের কুদরতি পায়ে সিজদা করে। বান্দা যখন একান্ত মনে সিজদায় গিয়ে বলে ‘সুবহানাল্লাহ’ আল্লাহ খুশি হয়ে বলেন তুমি ‘সাব্বাহনি’ আমাকে পবিত্র বললে? তোমাকে মাফ করে দিলাম, তুমিও আজ থেকে পবিত্র। তোমাকেও মহান মর্যাদা দিয়ে দিলাম। এভাবে আল্লাহ আরো খুশি হন এবং বলেন, ও বান্দা তুমি যদি না থাকতে আমি আকাশকে লোহার বানিয়ে দিতাম, আকাশ থেকে এক ফোঁটা পানিও বর্ষণ করতাম না। জমিন কবে তামার হয়ে যেতো, জমিন থেকে একটি শস্য দানাও বের হতো না। মাটিগুলোকে বালি বানিয়ে দিতাম কিন্তু বান্দা তোমার দিকে তাকিয়ে তা করি না।
এছাড়াও আল্লাহ বলেই দিয়েছেন পছন্দের বান্দাদেরকে পরীক্ষা করা ব্যতীত সফলতা দিবেন না। যেমন কুরআনের সূরা বাকারার ১৫৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন-
“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ কমিয়ে দিয়ে, জীবন এবং পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও।” তাই মোমিনরা ভয়ও পাবে না কষ্টও নিবে না। এভাবে তাদের কোরবানি পরীক্ষা করে আল্লাহ যুবকদেরকে পছন্দনীয় বান্দা তৈরি করবেন।
হে যৌবন পূজারি! শুনে রাখো- ধনীর শোষণে উদ্যত করে নির্ধনকে। রাজার অপশাসন বিদ্রোহী করে প্রজাকে। পিতা মাতা ও শিক্ষকের অতি শাসন পথ ভ্রষ্ট হয় শিশু বা যুবক। তৈরি হয় অসৌজন্য প্রতিক্রিয়া, পথ ভ্রষ্ট হয় যুবসমাজ। সততার অভাবে তৈরি হয় মিথ্যাচার আর চুরি, অপশাসনে তৈরি হয় ধাপ্পাবাজি ও দুর্নীতি, ভোগ বিলাস আর অর্থ লিপ্সা শুরু হয় বেপরোয়া। এর বিপরীতে সততা ও নীতির প্রচলনে তৈরি হয় শ্রমের মানসিকতা, তৈরি হয় আত্ম প্রতিষ্ঠার প্রেরণা, সমাজ নির্মিত হয় মর্যাদা ও বন্ধু সুলভে। ফলে তৈরি হয় সফলতা, সৌহার্দ্যতা ও আন্তরিকতা। ফলাফল হয় সুন্দর আর শান্তিপূর্ণ। তাই আধুনিক যুগের যুবকদের হতে হবে উচ্চতর তত্ত্বগত শিক্ষিত, মার্জিত, অনড় মনোবলের, সাহসী ও সংগ্রামী। তারা কর্মী হবে না কর্মীর কর্মের জোগান দিবে। তারা চাকরিজীবী নয় চাকরিদাতা হবে, হোক সেটা ছোটো কিছু। তবেই আলোর মুখ দেখবে ভবিষ্যতের যুবসমাজ, আর তা-ই হবে যৌবনের প্রকৃত ধর্ম।
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, গ্রন্থকার ও কলাম লেখক

SHARE

Leave a Reply