রক্তরঞ্জিত পথ

সাইয়েদ কুতুব শহীদ

সুদৃঢ় দুর্গময় আকাশমণ্ডলের শপথ এবং শপথ সেদিনের যার ওয়াদা করা হয়েছে। শপথ দর্শকের এবং দৃষ্ট বিষয়ের। ধ্বংস হয়েছে গর্ত খননকারীগণ, যাদের খনন করা গর্তে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। যখন তারা গর্তের মুখে বসেছিল এবং ঈমানদারদের সাথে যা কিছু করা হচ্ছিল, তারা তামাশা দেখছিল। ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা (ঈমানদারগণ) প্রবল পরাক্রান্ত ও সদা প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিল। যিনি আকাশ ও ভূমণ্ডলের অধিপতি এবং সে আল্লাহ সবকিছুই দেখেন। যেসব লোক ঈমানদার পুরুষ ও নারীদের প্রতি জুলুম নির্যাতন চালিয়েছে এবং তারপর ঐ কাজ থেকে তওবা করে নাইÑ নিঃসন্দেহে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আজাব এবং তাদের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে আছে ভস্মকারী আজাব। যারা ঈমান আনয়ন ও নেক আমল করেছে, তাদের জন্য সুনিশ্চিত পুরস্কার হিসেবে রয়েছে জান্নাতের বাগিচা যার নিচ দিয়ে ঝরনা প্রবাহিত। এটাই হচ্ছে সত্যিকার সাফল্য। মূলত তোমার আল্লাহর পাকড়াও খুবই শক্ত। তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেছেন এবং পুনরায় সৃষ্টি করবেন। আর তিনি ক্ষমাশীল, প্রেমময় আরশের অধিপতি ও মহান। তিনি নিজ ইচ্ছায় সকল কাজ সম্পন্নকারী। (আল বুরুজ : ১-১৬)
কুরআনে বর্ণিত গর্ত খননকারীদের কাহিনী সকল ঈমানদার ব্যক্তির জন্যই চিন্তা ভাবনার উদ্রেক করে যারা দুনিয়াতে দাওয়াতে দ্বীনের কাজ করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য এ সূরা (সূরায়ে বুরুজ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পবিত্র কুরআন কাহিনীর ভূমিকা, বিবরণ, মন্তব্য ও শিক্ষণীয় বিষয় যেভাবে পেশ করেছে, তার মধ্যে আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের যাত্রাপথ সম্পর্কে সুস্পষ্ট রূপরেখা ফুটে উঠেছে। দ্বীনি আন্দোলনের প্রকৃতি, মানবগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়া ও সুপ্রশস্ত পৃথিবীতে এ দাওয়াত প্রসারকালে যা যা ঘটতে পারে, সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দান করা হয়েছে। কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহতাআলা ঈমানদারদের চলার পথে সব বাধাবিপত্তি আসতে পারে তা উল্লেখ করেছেন এবং সম্ভাব্য সকল প্রকার বিপদ আপদ ও দুঃখ-কষ্টকে বরণ করে নেয়ার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন।
কাহিনীটি হচ্ছে একদল ঈমানদারের। তাঁরা তাঁদের পরওয়ারদিগারের প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিলেন এবং তাঁদের ঈমানের বিষয়বস্তু সম্পর্কে প্রকাশ্য ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সমাজের অত্যাচারী ও পরাক্রান্ত শত্রুগণ প্রশংসিত ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি ঐ ব্যক্তিদের ঈমান আনয়ন করার অধিকার দান করতে রাজি ছিল না। তাই ঈমানদারগণ চরম নির্যাতনের সম্মুখীন হন। শত্রুদল আল্লাহপ্রদত্ত মর্যাদা হরণ করে তাদের শাসকগোষ্ঠীর হাতের ক্রীড়নক বানানোর অপচেষ্টায় নিষ্ঠুর দৈহিক অত্যাচার চালিয়ে নিজেদের বিকৃত রুচিবোধের পরিচয় দেয়।
কিন্তু ঈমানের বলে বলীয়ান পবিত্র হৃদয় ব্যক্তিগণ তাঁদের ওপর আপতিত পরীক্ষায় পরিপূর্ণরূপে উত্তীর্ণ হন। তাঁদের ঈমান নশ্বর দেহের ওপর বিজয়ী হয়। তাই তাঁরা অত্যাচারীদের ভয়ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি বরং জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করেছেন তবু তাঁরা নিজেদের দ্বীন থেকে চুল পরিমাণ সরে যেতেও রাজি হননি। তাঁরা পার্থিব জীবনের মায়া ও আকর্ষণ থেকে মুক্ত ছিলেন। এ জন্য নির্মম পন্থায় তাঁদেরকে পশুর মতো হত্যার উদ্যোগ আয়োজন করা হলেও তা দেখে তাঁরা জীবনের বিনিময়ে আকিদা পরিত্যাগ করতে পারেননি। তাঁরা অস্থায়ী দুনিয়ার সুখ সম্পদের মায়া কাটিয়ে নির্ভীক চিত্তে ঊর্ধ্বজগতে চলে যান। স্বল্পস্থায়ী জীবনের ওপর ঈমানী শক্তির কী অপূর্ব প্রাধান্য।
পূর্ণ ঈমানদার, উন্নত চরিত্র, সৎকর্মশীল ও সদাচারী ব্যক্তিদের বিপক্ষে ছিল আল্লাহাদ্রোহী, হঠকারী, অসচ্চরিত্র ও অপরাধপ্রবণ হীন প্রকৃতির মানুষেরা। তারা জ্বলন্ত অগ্নিগহ্বরের কিনারায় বসে মুমিনদের যন্ত্রণাকাতর শোচনীয় মৃত্যুর দৃশ্য উপভোগ করছিল। জ্বলন্ত আগুনে কিভাবে জীবন্ত মানুষকে গ্রাস করে এবং জ্বালিয়ে ভস্মে পরিণত করে তা দেখার কৌতূহল নিয়ে তারা গর্তের পাশে জড়ো হয়েছিল।
যখন কোনো ঈমানদার যুবক, যুবতী, শিশু, বৃদ্ধা কিংবা বয়স্ক ব্যক্তিকে আগুনে নিক্ষেপ করা হতো, তখন তাদের আনন্দ উন্মত্ততায় রূপান্তরিত হতো। এবং রক্তের ফিনকি ও জ্বলন্ত মাংস খণ্ড দেখে তারা আনন্দে নৃত্য করতো। এ লোমহর্ষক কাহিনী থেকে বোঝা যায় যে, অত্যাচারী দল সম্পূর্ণরূপে বিবেক বুদ্ধি হারিয়ে পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট পর্যায়ে নেমে গিয়েছিল। কারণ হিংস্র জন্তু ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য শিকার করে থাকে। তারা আনন্দ উপভোগ করার উদ্দেশ্যে জীব হত্যা করে না।
একই ঘটনা থেকে ঈমানদারদের উচ্চ মর্যাদা সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা করা যায়। তাঁরা আধ্যাত্মিকতার শীর্ষস্থানে আরোহণ করেছিলেন। আল্লাহর প্রতি তাঁদের অটল নির্ভরশীলতা পূর্ণতা লাভ করেছিল। সকল যুগ ও সকল কালের মানুষের জন্যই ঈমানের এ স্তর পরম কাম্য হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।
স্থুলদৃষ্টিতে দেখা যায় যে, অত্যাচার নির্যাতন ঈমান আকিদার ওপর জয়যুক্ত হয়েছে। যদিও এ সচ্চরিত্র, ধৈর্যশীল ও আল্লাহভীরু ব্যক্তিদের ঈমানী শক্তি শীর্ষস্থানে পৌঁছে গিয়েছিল, তথাপি ঘটনার পরিণতি দৃষ্টে মনে হয় যেন বাতিলের সাথে শক্তি পরীক্ষায় তাদের ঈমানী শক্তি ব্যর্থতা অর্জন করেছে। এ জাতীয় জঘন্য অপরাধের দরুন নূহ (আ), হুদ (আ), সালেহ (আ), শুয়াইব (আ) ও লুত (আ)-এর জাতিগুলোকে যেভাবে শাস্তি দেয়া হয়েছিল, সেরূপ গর্ত খননকারীদেরকেও দেয়া হয়েছিল কি না, তা কুরআন পাক অথবা অন্য কোনো গ্রন্থ থেকে জানা যায় না। অথবা ফিরাউন ও তার লোক লস্করকে আল্লাহতায়ালা যে কঠোরতার সাথে পাকড়াও করেছিলেন, সেভাবে এদেরও দণ্ডবিধান করেছিলেন কি না তাও জানার কোনো উপায় নেই। ফলে বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির নিরিখে এ ঘটনায় ঈমানদারদের পরিণতি ছিল খুবই মর্মান্তিক। কিন্তু ব্যাপারটির পরিসমাপ্তি কি এখানে? ঈমানের উচ্চতম পর্যায়ে যারা পৌঁছে গিয়েছিলেন, সে আল্লাহভীরু ও সচ্চরিত্র দলটি কি অত্যাচার নির্যাতনের আবর্তে গর্তের আগুনে জ্বলে পুড়ে ভস্মে পরিণত হয়েই শেষ হয়ে গেলেন? আর অত্যাচারী পশুসদৃশ মানুষগুলো কি সম্পূর্ণরূপে শাস্তি এড়িয়ে গেল? পার্থিব দৃষ্টিতে এ বিষয়টি সম্পর্কে মনে নানাবিধ প্রশ্ন জাগে। কিন্তু কুরআন ঈমানদারদেরকে অন্য ধরনের শিক্ষা দান করে এবং তাদের সামনে অপর একটি রহস্যের দ্বার-উদঘাটন করে। কুরআন ভালো-মন্দ নির্ণয়ের এক নতুন মানদণ্ড পেশ করে, যে মানদণ্ড হক ও বাতিলে সংঘর্ষে মুমিনদের চলার পথ নিরূপণে সহায়ক হয়।
সত্য ও মিথ্যার (হক ও বাতিলের) এ লড়াই পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। আর শুধু পার্থিব জীবনেই পরিপূর্ণ মানবজীবন নয়। সংগ্রামে শুধু সমসাময়িক যুগের মানুষই অংশগ্রহণ করে না। বাতিলের বিরুদ্ধে হকের যুদ্ধে ফেরেশতাগণও শরিক হন, লড়াইয়ের গতিধারা, পর্যবেক্ষণ করেন এবং যা কিছু হয়, তা প্রত্যক্ষ করেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা ঘটনাবলিকে তুলাদণ্ডে ওজন করেন। এ তুলাদণ্ড সকল যুগ ও সকল ধরনের মানবীয় তুলাদণ্ড থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বরং সমগ্র মানবগোষ্ঠীর তুলাদণ্ড থেকেও ফেরেশতাদের তুলাদণ্ড স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। ফেরেশতাগণ আল্লাহর মহান সৃষ্টি। এক সময় সমগ্র দুনিয়ায় যত সংখ্যক মানুষ বাস করে, ফেরেশতাদের সংখ্যা তাদের চেয়েও কয়েকগণ বেশি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, হকপন্থীদের উদ্দেশ্যে ফেরেশতাদের প্রশংসা ও শ্রদ্ধা দুনিয়ার অধিবাসীদের শ্রদ্ধা ও প্রশংসার তুলনায় অনেক বেশি মূল্যবান।
এ সকল স্তরের পরে হচ্ছে আখেরাত। আর সেটিই হচ্ছে ফলাফল প্রকাশের প্রকৃত স্থান। দুনিয়ার এ মঞ্চটি আখেরাতের সাথে সংযুক্তÑ বিচ্ছিন্ন নয়। এটাই প্রকৃত সত্য এবং মুমিনদের অবিচল ঈমানও তাই। হক ও বাতিলের লড়াই দুনিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রেই সমাপ্ত হয়ে যায় না। প্রকৃত সমাপ্তির স্তর তো এখনো আসেনি। দুনিয়ার মঞ্চে লড়াইয়ের যে অংশটুকু সংঘটিত হয়েছে, সেটুকুর ওপর ভিত্তি করে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা সঠিক ও ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না। কারণ তাহলে এ সিদ্ধান্ত যুদ্ধের কয়েকটি সাধারণ ঘাত প্রতিঘাত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।
যারা পার্থিব জীবনকেই একমাত্র জীবন মনে করে, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সঙ্কীর্ণ ও সীমাবদ্ধ। চঞ্চলমনা ব্যক্তিগণই এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।
দ্বিতীয় ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি (অর্থাৎ আখেরাতের দৃষ্টিভঙ্গি) সুদূরপ্রসারী; বাস্তব ও ব্যাপক। কুরআন ঈমানদারদের মনে দ্বিতীয় ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তোলে আর এটিই হচ্ছে বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি। এ দৃষ্টিভঙ্গির ওপরই প্রতিষ্ঠিত হয় ঈমানভিত্তিক চিন্তাধারার বিশাল ইমারত। আল্লাহ তাআলা ঈমানদারদের জন্য ইমান ও আনুগত্যের দৃঢ় এবং ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় অটল ধৈর্যধারণের প্রতিদানে যে পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন তা হচ্ছে অন্তরের প্রশান্তি। এরশাদ হচ্ছে- যারা ঈমান আনয়ন করেছে তাদের অন্তর আল্লাহর জিকিরের ফলে প্রশান্তি অর্জন করেছে। জেনে রাখ, আল্লাহর জিকিরই অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়। (সূরা আর রাদ : ২৮)
আর এর সাথেই শামিল রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও প্রেম ভালোবাসার ওয়াদা। নিশ্চয়ই যারা ঈমান আনয়ন করেছে এবং নেক আমল করে জীবন কাটিয়েছে, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা (মানুষের) অন্তরে মুহব্বত পয়দা করে দেবেন। (সূরা মরিয়াম : ৯৬) তাছাড়া ঊর্ধ্বজগতে তাদের সম্পর্কে আলাপ আলোচনার ওয়াদাও রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, যখন আল্লাহর কোনো বান্দার সন্তান মারা যায়, তখন আল্লাহাতাআলা ফেরেশতাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা কি আমার অমুক বান্দার সন্তানের রূহ হরণ করেছ?
ফেরেশতাগণ বলেন ‘জি, হ্যাঁ।’
আল্লাহ তায়ালা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন, ‘‘তোমরা কি আমার বান্দার কলিজার টুকরো হরণ করেছো?”
তাঁরা বলেন, ‘‘জি হ্যাঁ, পরওয়ারদিগার।”
আল্লাহ বলেন, “আমার বান্দা সে সময় কী বলেছে?”
ফেরেশতা বলেন, ‘‘তিনি আপনার প্রশংসাকীর্তন করেছেন এবং “আমরা নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদেরকে ফিরে যেতে হবেÑ এ কথা বলেছে।”
আল্লাহ তাআলা তখন আদেশ দেন, “আমার এ বান্দার জন্য বেহেশতে একটি প্রাসাদ তৈরি কর এবং তার নাম দাও বায়তুল হামদ (প্রশংসার ঘর)।” (তিরমিযী)
হযরত নবী করীম (সা) থেকে আরও বর্ণিত আছে যে, আল্লাহতায়ালা বলেন, “আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেরূপ ধারণা পোষণ করে, আমি হুবহু সেরূপ। যে যখন মনে স্মরণ করে, তাহলে আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। যদি সে লোকের সামনে আমাকে স্মরণ করে, তাহলে আমি তাকে আরও বড় মজলিসে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, তাহলে আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে আসি, যদি সে আমার দিকে এক হাত এগিয়ে আসে, তাহলে আমি তার দিকে কয়েক হাত এগিয়ে যাই। যদি সে আমার দিকে হেঁটে আসে তাহলে আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” (বুখারী ও মুসলিম) আর ওয়াদা রয়েছে যে, ঊর্ধ্বজগতে ঈমানদারগণের জন্য দোয়া করা হয় এবং তাদের জন্য সেখানে গভীর প্রেম ও সহানুভূতি রয়েছে।
“যেসব ফেরেশতা আরশ বহন করে এবং যাঁরা আল্লাহর চার পার্শ্বে থাকেন, সকলেই নিজেদের রবের প্রশংসাসহ তাসবিহ পাঠ করেন এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান রাখেন। আর তাঁরা ঈমানদরদের জন্য আল্লাহর দরবারে মাগফিরাত কামনা করে বলেন, ‘প্রভু! পরওয়ারদিগার! তোমার রহমত ও জ্ঞান সর্বত্র পরিবেষ্টন করে আছে। সুতরাং যারা তওবা করে এবং তোমার প্রদর্শিত পথে জীবন যাপন করে, তাদের ত্রুটি মাফ করে দাও এবং তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রেহাই দাও।” (সূরা আল মুমিন : ৭)
শহীদানের জন্য আল্লাহ তায়ালা শাশ্বত জীবনের ওয়াদা করেছেনÑ “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে মৃত বলো না বরং তারা জীবিত এবং তাদেরকে তাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে রিজিক দেয়া হয়। আল্লাহতায়ালা অনুগ্রহ করে তাদেরকে যা কিছু দিয়েছেন, তা পেয়ে তারা খুবই প্রীত ও সন্তুষ্ট। এ বিষয়ে তাঁরা নিশ্চিত যে, ঈমানদারদের মধ্যে যারা এখনো দুনিয়ায় রয়েছেন এবং এখনো পরপারে পৌঁছেননি, তাদের জন্যও কোনো ভয় বা দুশ্চিন্তার কারণ নেই। আল্লাহর দেয়া পুরস্কার ও অনুগ্রহ লাভ করে তারা পরিতুষ্ট এবং তারা বুঝতে পেরেছে যে, আল্লাহ মুমিনদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না।” (সূরা আলে ইমরান : ১৬৯-১৭১)
অনুরূপভাবেই মিথ্যা প্রতিপন্নকারী, জালিম ও অপরাধীদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালার সতর্কবাণী রয়েছে। তিনি বলেন, যে পার্থিব জীবনের কিছুকাল তাদের রশি ঢিলা করে দিয়ে কিছুটা সুযোগ দান করেন এবং আখেরাতে তাদের বিচার হবে। অবশ্য কোনো কোনো সময় আল্লাহতায়ালা দুনিয়াতেও পাকড়াও করে থাকেন। তবু প্রকৃত শাস্তির জন্য আখোরাতই নির্দিষ্ট।
গর্ত খননকারীদের কাহিনী ও সূরায়ে বুরুজের আলোচনা থেকে দাওয়াতে দ্বীনের প্রকৃতি ও এ পথের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার মুখে আহ্বায়কদের ভূমিকা সম্পর্কে অপর একটি দিকেও আলোকপাত করা হয়েছে। দাওয়াতে দ্বীনের আন্দোলন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যান্য আন্দোলনের বিরুদ্ধে পরিচালিত সংগ্রামের পরিসমাপ্তি ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রত্যক্ষ করেছে।
এ আন্দোলন হযরত নূহ (আ), হযরত হুদ (আ), হযরত শুয়াইব (আ) এবং হযরত লুত (আ)-এর নিজ নিজ জাতির ধ্বংস এবং অল্পসংখ্যক ঈমানদারদের রক্ষাপ্রাপ্তির দৃশ্য দেখতে পেয়েছে। কিন্তু যারা ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন তারা পরবর্তীকালে কী ভূমিকা পালন করেছেন, তা কুরআন আমাদেরকে বলেনি। এসব দৃষ্টান্ত থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহদ্রোহীদের বাড়াবাড়ির প্রতিকারার্থে আল্লাহতাআয়ালা কোনো কোনো সময় দুনিয়ার জীবনেই তাদেরকে আংশিক আজাবের স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দেন। পরিপূর্ণ বিচার শেষে যথোপযুক্ত আজাব তো আখেরাতেই দেয়া হবে।
ইসলামী দাওয়াতের আন্দোলন, সৈন্য-সামন্ত সহকারে ফিরাউনের ধ্বংস, অনুচরসহ হযরত মূসা (আ)Ñ এর উদ্ধারপ্রাপ্তি এবং পরবর্তীকালে তাঁর রাজ্য লাভ প্রত্যক্ষ করেছে। সে যুগের ইতিহাসে বনি ইসরাইলরা ছিল উত্তম চরিত্রের অধিকারী। যদিও তারা কখনো পরিপূর্ণ দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি এবং দুনিয়াতে আল্লাহর দ্বীনকে তাঁরা পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে কখনো কায়েম করেননি, তবু পূর্ববর্তীদের তুলনায় তাঁদের দৃষ্টান্ত ছিল ভিন্ন ধরনের। যারা নবী মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন করেনি এবং তাঁর আনীত জীবনবিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, ইতিহাস সেসব মুশরিকদের লাশের স্তূপও দেখতে পেয়েছে। ইতিহাস আরও দেখতে পেয়েছে কিভাবে ঈমানদারদের অন্তরে পরিপূর্ণরূপে ঈমানের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আল্লাহর সাহায্য এসে তাদের গলায় সাফল্যের মালা পরিয়ে দিয়েছিল। আর দুনিয়া সর্বপ্রথম মানবজীবনে ওপর পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের নমুনা দেখতে পেল। এ সময়ের আগে বা পরে কখনোও রূপ দেখা যায়নি।
ইতিহাস গর্ত খননকারীদের ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে। তাও আমরা দেখেছি। এ ছাড়াও ইতিহাস অনেক প্রাচীন ও নতুন ঘটনা ঘটতে দেখেছে। অবশ্য এগুলো ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেনি। আর আজকাল ইতিহাস অসংখ্য ঘটনা দেখতে পাচ্ছে, যেগুলো ইসলামী ইতিহাসের শত শত বছরের প্রাচীন ঘটনাবলির সাথে কোনা না কোনো দিক থেকে সাদৃশ্যপূর্ণ।
অন্যান্য ঘটনাবিলর পর্যালোচনা করা অবশ্যই জরুরি। তবে গর্ত খননকারীদের ঘটনাটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কারণ এ ঘটনায় ঈমানের অগ্নিপরীক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। এ পরীক্ষায় হকপন্থীদের পক্ষে কোনো পার্থিব সাহায্য এগিয়ে আসেনি এবং বাতিলপন্থীদেরও পার্থিব জীবনে কোনো শাস্তি দেয়া হয়নি। ঈমানদার ও আল্লাহর পথে আহ্বানকারীদের মনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করার জন্য তাদের বাঞ্ছিত পথে এগিয়ে যাওয়ার ফলে এরূপ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। এ জাতীয় ঘটনায় তাদের পক্ষে কোন শক্তিই এগিয়ে আসবে না। তাদের এবং তাদের ঈমানের বিষয়াবলি সম্পূর্ণ আল্লাহর হাতে। এ অবস্থায় ঈমানদারদের দায়িত্ব হচ্ছে কর্তব্য কাজে অটল থেকে দুনিয়াতে বিদায় গ্রহণ করা। তাদের কর্তব্য হচ্ছে একমাত্র আল্লাহকেই পরম ও চরমকাম্য হিসেবে গ্রহণ করা, আকিদা বিশ্বাসকে জীবনের চেয়েও অধিক মূল্যবান মনে করা এবং অগ্নিপরীক্ষায় নিক্ষিপ্ত হলে ঈমানী শক্তিতে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া। ঈমানদারগণ এরূপ অবস্থায় অত্যন্ত, মুখ এবং আমলের দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের সত্যতার সাক্ষ্যদান করবে। আর দ্বীনের দুশমনদের পরিণাম কিরূপ এবং দাওয়াতে দ্বীনের কাজে কিভাবে অগ্রসর হবে, এসব বিষয় আল্লাহতাআলার ওপর ছেড়ে দেয়াই উত্তম। ইসলামের অতীত ইতিহাসে যেসব পরিণামের নজির রয়েছে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে সে ধরনের পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারেন অথবা দ্বীনে হকের পতাকাবাহী ও বাতিলপন্থীদের জন্য কোনো নতুন পরিণাম ও নির্ধারণ করতে পারেন।
হকপন্থীগণ আল্লাহর দ্বীনের কর্মী। আল্লাহ তাদেরকে দিয়ে যে ধরনের কাজ করতে চান, যখন যে স্থানে ও যে পদ্ধতিতে কাজ করিয়ে নেন, ঠিক সেভাবেই কর্তব্য সম্পন্ন করে নির্দিষ্ট পুরস্কার গ্রহণই মুমিনের দায়িত্ব। ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ তাদের নিজেদের হাতে নেই এবং এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতাও তাদের নেই। এটা একমাত্র প্রকৃত মালিক যিনি তাঁরই কাজ। কর্মীদের এ বিষয়ে মাথা ঘামানোর কোনোই প্রয়োজন নেই।
ঈমানদারগণ তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারের প্রথম কিস্তি তো দুনিয়াতেই হাসিল করেন। আর এ পুরস্কার হচ্ছে অন্তরের প্রশান্তির চিন্তা ও উপলব্ধির উচ্চমান, উৎকৃষ্ট ধ্যান-ধারণা, পার্থিব লোভ লালসা, ভয়ভীতি ও দুঃখ-কষ্টের অনুভূতি থেকে মুক্তি লাভ। দ্বিতীয় কিস্তিও তাঁরা এ পৃথিবী থেকেই আদায় করে নেন। সে পুরস্কার হচ্ছে, ফেরেশতা মহলে তাঁদের সম্মান বৃদ্ধি ও তাঁদের সম্পর্কে আলোচনা। পৃথিবীর গুণগ্রাহী লোকেরা তো তাদের প্রশংসা করেই থাকে। ফেরেশতা মহলে আলোচনা ঊর্ধ্বজগতে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধিরই পরিচয়। পুরস্কারের সবচেয়ে বড় কিস্তিটি আখেরাতেই দেয়া হবে। সেখানে তাঁদের সহজ ও মামুলি ধরনের হিসাব-নিকাশ হবে এবং তাঁরা অপরিমিত লাভ করবেন। আর এসব কিস্তির মাধ্যমে দেয় সকল পুরস্কারের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার হচ্ছে সকল কিস্তিতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। তাঁর অশেষ মেহেরবানিতে তিনি মু’মিনদেরকে তাঁর কাজের জন্য বাছাই করে নিয়েছেন এবং দুনিয়ায় আল্লাহ সৈনিক হিসেবে তাঁরই ইচ্ছানুসারে সকল কাজে ব্যবহার করার জন্য তাঁদেরকে মনোনীত করেছেন। এটাও পরম সৌভাগ্যের বিষয়।
কুরআনপ্রদত্ত শিক্ষার ফলে ইসলামী আন্দোলনের প্রথম মহান কাফেলাটির মধ্যে উল্লিখিত ধরনের চরিত্র উচ্চতম মান অর্জন করেছিল তাঁরা আল্লাহর সৈনিক হিসেবে কাজ করার প্রেরণায় নিজেদের সত্তা ও ব্যক্তিত্ব ভুলে গিয়েছিলেন এবং সকল অবস্থায় ও সকল সময়ই তাঁরা আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ছিলেন।
কুরআনের পাশাপাশি নবী করিম (সা)-এর প্রশিক্ষণের ফলে জান্নাতের দিকে তাঁদের সুদৃষ্টি নিবন্ধ হয় এবং আল্লাহতাআলার পক্ষ থেকে কোনো মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত অটল দৃঢ়তার সাথে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার মনোভাবও গড়ে ওঠে। আল্লাহর মীমাংসাই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য তাঁদের নিকট পরম ও চরম কাম্য ছিল। হযরত আম্মার (রা) ও তাঁর মাতা-পিতাকে যখন মক্কার জালিমরা চরম দৈহিক নির্যাতনের শিকারে পরিণত করেছিল তখন নবী (সা) স্বচক্ষে তাদের অবস্থা দেখেন এবং মাত্র এ কথা কয়টি উচ্চারণ করেন :
‘‘ইয়াসিরের লোকজন, তোমরা ধৈর্য ধারণ কর, তোমাদের জন্য জান্নাতের ওয়াদা পাকাপোক্ত হয়ে গেছে।”
খাত্তাব বিন আরাত (রা) বলেন, ‘‘আমরা নবী (সা)-এর খেদমতে অভিযোগ করেছিলাম, তিনি তখন কাবা ঘরের দেয়ালের ছায়ায় বিশ্রাম করছিলেন। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি কেন আল্লাহর দরবারে সাহায্যের আবেদন করছেন না? কেনই বা আমাদের জন্য দোয়া করছেন না? তিনি জবাবে বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তীদের সময় মানুষকে ধরে জীবন্ত প্রোথিত করা হতো। এ ছাড়াও করাত দিয়ে তাদেরকে জীবন্ত চিরে ফেলা হতো। লোহার চিরুনি দিয়ে হাড় থেকে গোশত ছিন্ন করে পৃথক করা হতো। কিন্তু তবু তাদেরকে দ্বীনে হক থেকে ফিরানো সম্ভব হয়নি। আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর দ্বীনকে পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এমন সময় আসবে, যখন একজন আরোহী সানয়া থেকে হাযরামাওত পর্যন্ত একাকী ভ্রমণ করবে এবং পথিমধ্যে তাকে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে হবে না। আর তার মেষপালের ওপর নেকড়ে বাঘের সম্ভাব্য আক্রমণ ছাড়া অন্য কোনো বিপদের আশঙ্কা থাকবে না। কিন্তু তোমরা খুবই অধৈর্য হয়ে পড়েছ।”
আল্লাহর প্রতিটি কাজেই কল্যাণকর উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। তিনি সমগ্র সৃষ্টি জগৎ পরিচালনা করেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গোটা সৃষ্টির খবরা-খবর সম্পর্কে তিনি সর্বদা অবহিত থাকেন। দুনিয়াতে যা কিছু ঘটে তাঁরই ব্যবস্থাপনায় তা ঘটে। অদৃশ্য জগতে যে কল্যাণকারিতা লুকিয়ে আছে তা শুধু তিনিই অবগত আছেন। লুকানো কল্যাণ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীনেই ইতিহাস রচনা করে এবং তাঁরই মর্জি মাফিক ঘটনাবলির রহস্য এক সময় প্রকাশিত হয়ে পড়ে।
যখন উল্লিখিত ধরনের অন্তর তৈরি হয়ে যায় এবং তা পার্থিব জীবনে প্রতিদানের আশা ব্যতীতই দ্বীনের দায়িত্ব পালন করে যেতে থাকে, আখেরাতকেই হক ও বাতিলের প্রকৃত মীমাংসার ক্ষেত্র বিবেচনা করে আর যখন আল্লাহ তাআলা তাদের আন্তরিকতা, দৃঢ়তা, ত্যাগ ও ঐকান্তিকতায় সন্তুষ্ট হন তখন তিনি দুনিয়াতেই তাদের সাহায্য করেন। পৃথিবীতে খেলাফত পরিচালনার পবিত্র আমানত তাদের হাতে সোপর্দ করেন। মু’মিনদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নয় এবং দ্বীনে হকের স্বার্থে তাদেরকেও আমানত অর্পণ করা হয়।
এ মহান দায়িত্ব বহনের যোগ্যতা ও অধিকার তারা সে দিনই অর্জন করেছে, সেদিন দুনিয়ার সম্ভাব্য প্রতিদানের কোনো প্রতিশ্রুতি ব্যতিরেকেই তারা এ পথে অগ্রসর হয়েছে এবং তাদের দৃষ্টি পার্থিব স্বার্থের পরবর্তে পরকালীন স্বার্থের দিকে নিবদ্ধ হয়েছে। তারা যেদিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অপর সকল প্রতিদানের আকাক্সক্ষা পরিত্যাগ করেছিল, সেদিন থেকেই তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহভাজন বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের যেসব আয়াতে মুমিনদের প্রতি আল্লাহর সাহায্যের ওয়াদা করা হয়েছে গনিমাতের ধনসম্পদ সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে, দুনিয়াতেই কাফেরদের ধ্বংস করার সতর্কবাণী শুনানো হয়েছে, যেসব আয়াতই মদিনায় নাজিল হয়েছে।
মুমিনদের অন্তর থেকে পার্থিব স্বার্থের সকল কামনা বিদূরিত হবার পর আল্লাহ তাআলা স্বয়ং অগ্রসর হয়ে তাদেরকে সাহায্য দানের সুসংবাদ প্রদান করেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর পবিত্র দ্বীনকে মানবসমাজের জীবন বিধান হিসেব প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে ঐরূপ সাহায্য দানের ওয়াদা করেন। মু’মিনদের কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ ও সাহসিকতার পুরস্কারস্বরূপ তাদের প্রতি পার্থিব জীবনে সাহায্য নাজিল হয়নি বরং এটা আল্লাহতায়ালার নিজেরই সিদ্ধান্ত ছিল। আর এ সিদ্ধান্তের অন্তর্নিহিত কল্যাণকারিতা আমরা আজ উপলব্ধি করতে পারছি।
দাওয়াতে দ্বীনের কাজে আগ্রহী সকল দেশ, জাতি ও বংশের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ বিষয়টি সম্পর্কে ভালো করে চিন্তা করা প্রয়োজন। এ সূক্ষ্ম বিষয়টিই দাওয়াতে দ্বীনের সমগ্র পথ ও তার প্রতিটি মনযিল ও মোড় সুস্পষ্ট করে তুলে ধরে এবং যারা পরিণাম ফলের তোয়াক্কা না করেই পথের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে দৃঢ়সঙ্কল্প, তাদের অন্তরে অটল ধৈর্যশক্তি দান করে। তারা মনে করে, আল্লাহ তাআলা দাওয়াতে দ্বীন ও এ পথের আহ্বায়কদের যে পরিণামই নির্ধারণ করে রেখেছেন তা যথার্থ। তারা সহকর্মীদের মৃতদেহের ওপর দিয়ে চরম বিপদসঙ্কুল খুনরাঙা পথ ধরে এগিয়ে যাবার সময় আশু বিজয় লাভের আশায় উদগ্রীব হবে না। অবশ্য স্বয়ং আল্লাহতায়ালাই যদি দাওয়াতে দ্বীনের আন্দোলনকে পূর্ণত্ব প্রদান করে তার দ্বীনকে মুমিনদের প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তাহলে সে তো ভালো কথা। অবশ্য যদি এরূপ সিদ্ধান্ত হয় তবে তা নিছক আল্লাহ তায়ালারই মর্জি বলতে হবেÑ মু’মিনদের কষ্টসহিষ্ণুতা ও ত্যাগের পুরস্কারস্বরূপ নয়। কারণ এ পৃথিবী কর্মফল প্রাপ্তির ক্ষেত্র নয়।
গর্ত খননকারীদের কাহিনীর ওপর মন্তব্য প্রসঙ্গে কুরআন অপর একটি তথ্যের প্রতিও ইঙ্গিত করেছে। আমাদের প্রত্যককেই সে বিষয়ে মনোযোগ দেয়া উচিত। কুরআন বলে- ‘‘এবং এ ঈমানদার লোকদের সাথে তাদের শত্রুতার একমাত্র কারণ ছিল এই যে, তারা প্রবল পরাক্রান্ত ও প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছে।” (সূরা বুরুজ : ৮)
সকল যুগের ও সকল বংশের লোকদেরই গভীর মনোযোগ সহকারে আয়াতে বর্ণিত তথ্য সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। ঈমানদার ও বিরোধী দলের মধ্যে লড়াই অনুষ্ঠিত হয় শুধুমাত্র ঈমান, আকিদা ও চিন্তাধারার পার্থক্যের দরুন। অন্য কোনো পার্থিব স্বার্থের কারণে নয়। বিরোধী পক্ষ মুমিনদের ঈমানকে সহ্য করতে পারে না। তাদের সকল ক্রোধ ও শত্রুতার মূল কারণ হচ্ছে মু’মিনদের আকিদা বিশ্বাস। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ অথবা বংশীয় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন- এ লড়াইয়ের লক্ষ্য কখনোই নয়। এ জাতীয় বিরোধ তো সহজেই মিটানা অথবা নিয়ন্ত্রিত করা সম্ভব। কিন্তু এখানে তো নির্ভেজাল আদর্শের লড়াই চলছে। বিরোধের বিষয়বস্তু হচ্ছে, কুফরি ব্যবস্থা চলবে, না ঈমান? জাহেলিয়াত থাকবে না ইসলাম?
মক্কার মুশরিকগণ নবী (সা)-এর নিকট ধনসম্পদ, শাসনক্ষমতা ও অপরাপর পার্থিব সুযোগ সুবিধা দানের প্রস্তাব পেশ করেছিল। তাদের স্বার্থ ছিল মাত্র একটি। আর সেটি হলো, নবী করিম (সা) যেন আকিদা বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব কলহ বন্ধ করে তার বিনিময়ে তাদের নিকট থেকে অন্য সুযোগ সুবিধা ও স্বার্থ আদায় করে নেন। নবী (সা) যদি তাদের ইচ্ছা পূরণে সম্মত হতেন, তাহলে তো মুশরিকদের সাথে তাঁর কোনো বিবাদই থাকতো না। তাহলে, বোঝা গেল যে ঝগড়ার মূল বিষয় হচ্ছে ঈমান ও কুফর অর্থাৎ জীবন সম্পর্কিত আকিদা বিশ্বাস। যে ক্ষেত্রেই দুশমনদের সম্মুখীন হোক না কেন, মুমিনদের সর্বদা বিবাদের মূল বিষয়টি সম্পর্কে সজাগ থাকতে হবে। কেননা, শত্রু দলের শত্রুতা ও ক্রোধের কারণ হচ্ছে এই যে, মুমিনগণ সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং তারা একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই আনুগত্য করে শুধু তাঁরই সামনে মাথা নত করে থাকে।
শত্রুপক্ষ মুমিনদেরকে লড়াইয়ের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে বিভ্রান্ত করা এবং তাদের অন্তরের প্রজ্বলিত ঈমানের অগ্নিশিখাকে নিভিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে আকিদা বিশ্বাসের লড়াইকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অথবা গোত্রীয় বিবাদের রূপ দেয়ার অপচেষ্টা চালাতে পারে। তাই মু’মিনদের কখনো প্রতারিত হলে চলবে না। তাদের বুঝতে হবে যে, পরিকল্পিত উপায়ে ষড়যন্ত্র মারফত তাদের পদচ্যুত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ যুদ্ধে যারা এ জাতীয় ধুয়া তোলে, তারা প্রকৃতপক্ষে মুমিনদেরকে চূড়ান্ত বিজয়ের অমূল্য হাতিয়ার থেকে বঞ্চিত করতে আগ্রহী। এ বিজয় আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গর্তে নিক্ষিপ্ত ঈমানদারদের মতো অটল মানোন্নয়নজনিত পার্থিব লাভের আকুতিতেও অর্জিত হতে পারে।
আজকের দুনিয়াতে, বিশেষ করে খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রতারণামূলক প্রচার ও ইতিহাস বিকৃতকরণ প্রচেষ্টার মধ্যে আমরা বিভ্রান্তির অপচেষ্টা প্রত্যক্ষ করছি। তারা বলে বেড়াচ্ছে যে, ক্রুশ যুদ্ধের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল সাম্রাজ্য লাভ। তাদের এ উক্তি একেবারেই মিথ্যা। সত্যি কথা এই যে, ক্রুশ যুদ্ধের অনেক পরে ক্রুশপন্থীদল সাম্রাজ্যবাদের মুখোশ ধারণ করে। কারণ, ক্রুশীয় আকিদা বিশ্বাসের পক্ষে মধ্যযুগে যেরূপে আত্মপ্রকাশ করা সম্ভবপর ছিল ঠিক সেরূপে আজ পুনরায় ময়দানে আসা সম্ভব নয়।
এ জন্য তাদেরকে নতুন মুখোশ ধারণ করতে হয়েছে। কারণ ক্রুশের আকিদা বংশ-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকল মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে রচিত গলিত ধাতু নির্মিত প্রাচীরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। উল্লিখিত মুসলমানগণের মধ্যে কুর্দী গোত্রের সালাহুদ্দিন, মামলুক গোত্রের তুরান শাহ প্রমুখ ব্যক্তিগণ নিজেদের গোত্রীয় ও বংশীয় পার্থক্য ভুলে গিয়ে শুধু ঈমানী শক্তিকে অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেন এবং একমাত্র ইসলামের পতাকা হস্তে বিজয় লাভ করেন।
“ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার একমাত্র কারণ হচ্ছে এটা যে, তারা (ঈমানদারেরা) প্রবল পরাক্রান্ত ও সদা প্রশংসিত আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করেছিলেন।” (সূরা বুরুজ : ৮)
আল্লাহ তায়ালার বাণী বর্ণে বর্ণে সত্য এবং প্রবঞ্চক, ভোজবাজ ও অত্যাচারী দল মিথ্যাবাদী ও পথভ্রষ্ট।

SHARE

Leave a Reply